Tagged: project management

ম্যানেজার হিসেবে আপনি কতটুকু দক্ষ?

banner9

প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে ড্রিম ম্যানেজার, পর্ব ৯।  ব্যবস্থাপনা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নয় যে, পাশ করার পর আর উন্নয়নের প্রয়োজন নেই।  আইনজীবী চিকিৎসক ইত্যাদি পেশার মতো এখানেও নিরন্তর অধ্যাবসায় প্রয়োজন। পেশাদারিত্ব একটি ব্যক্তিগত দায়। প্রতিটি পদক্ষেপ প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি সম্পর্ককে পর্যালোচনা করতে হয়। এমন একটি পর্যালোচনার জন্য আজকের পর্বটি।

নিচের কুইজটি মাত্র দশ মিনিটে ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে একটি চমৎকার মানসিক অবস্থান তৈরি করে দেবে। ম্যানেজারের দক্ষতা সম্পর্কে এই উচ্চতর মূল্যায়নটি একটি ইংরেজি ম্যাগাজিন থেকে পাওয়া। বিষয়গুলো এতোই চিন্তা-জাগানিয়া যে, সহকর্মীদের সাথে শেয়ার না করে পারলাম না।

১. ভালো ব্যবস্থাপক… ক) সিদ্ধান্ত নিতে পারে; খ) সহকর্মীদের সাথে সামাজিক অনুষ্ঠানে সময় দেয়; গ) নিজের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করার জন্য আলোচনা করে।

২. ভালো ব্যবস্থাপক দিনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করে… ক) কর্মীদের একক কাজের মূল্যায়নে; খ) উর্ধতন কর্মকর্তার প্রত্যাশা পূরণে; গ) সহকর্মীদেরকে প্রশিক্ষণদানে।

৩. একজন ব্যবস্থাপকের প্রাথমিক দায়িত্ব হলো… ক) প্রত্যাশারও বেশি কাজ করা; খ) বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন; গ) সহকর্মীর মাধ্যমে কাজের বাস্তবায়ন।

৪. একজন ব্যবস্থাপকের পক্ষ থেকে যা গ্রহণযোগ্য নয়, তা হলো… ক) সহকর্মীকে সহানুভূতি দেখানো; খ) মেজাজ বিগড়ে যাওয়া; গ) কর্মীদের জন্য ব্যক্তিগত প্রশংসাপত্র তৈরি।

৫. কর্মীদের দায়বদ্ধতা মুহূর্তেই কমে যায় যখন ব্যবস্থাপকেরা… ক) একই মেজাজে থাকেন না; খ) নির্ধারিত সময়ের আগে অফিস ত্যাগ করেন; গ) অফিসের দরজা বন্ধ রাখেন।

৬. নতুন ব্যবস্থাপক হিসেবে প্রথমেই যা করতে হয়, তা হলো… ক) আপনার প্রকল্প থেকে প্রেরণযোগ্য প্রতিটি প্রতিবেদন মনযোগ দিয়ে দেখা; খ) সহকর্মীকে কাজের নির্দেশ (ডেলিগেট) দিতে শেখা; গ) সহকর্মীদের সাথে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারের আয়োজন করা।

৭. আপনার প্রকল্পটি যখন কর্তৃপক্ষের রোষাণলে পড়ে, তখন… ক) ব্যবস্থাপক সকল অভিযোগের ধারক হবেন; খ) সমস্যাটি বের করে সমাধান খুঁজবেন; গ) শান্ত থাকবেন।

৮. ব্যবস্থাপককে অবশ্যই বুঝতে হবে যে... ক) কর্মীরা প্রশংসা এবং স্বীকৃতি পেলে বেশি কাজ করে; খ) কাজ না থাকলে কর্মীদের আগ্রহ কমে যায়; গ) অর্থনৈতিক সুবিধা থাকলে প্রত্যাশার বেশি কাজ করে।

৯. যখন কোন কিছু শেখাতে হয়… ক) অফিসের বাইরে আয়োজন করুন; খ) কর্মীদের চেষ্টা ও শেখার আগ্রহকে পুরস্কৃত করুন; গ) একাধিক পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দিন।

১০. সহকর্মীরা যখন ভিন্ন একটি উপায়ে কাজটি করতে পারে, তখন… ক) সেটি গ্রহণ করা উচিত, কারণ সহকর্মীদের থেকেও শেখার সুযোগ হয়; খ) এটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, কারণ তারা ভুল করতে পারে; গ) পরিস্থিতি অনুযায়ি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

skill_test_dreammanager


নম্বর মূল্যায়ন: প্রতিটি সঠিক উত্তরের জন্য ১০ বিবেচনা করুন
৮০-১০০: আপনি একজন দক্ষ এবং অভিজ্ঞ ব্যবস্থাপক।
৬০-৭০: যেসব ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হয়েছে সেগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করুন।
৬০ এর নিচে: বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবুন, হয়তো ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আপনার উন্নয়ন জরুরি!

ব্যবস্থাপনা একটি সহজ কাজ একথা কেউ কখনও বলে নি। কাজের উন্নয়নের জন্য আমাদেরকে কর্মীর চাহিদা নিয়ে আরও ভাবতে হবে। প্রত্যেক ব্যবস্থাপক তার অধীনস্থ কর্মীর অভিভাবক। তাদেরকে গেঁথে তোলার মধ্যেই রয়েছে তার প্রকল্পের উন্নয়নের সম্ভাবনা।


আপনার ব্যবস্থাপকীয় দক্ষতা কতটুকু?
[ উত্তর ও পর্যালোচনা ]

১/ক ] সিদ্ধান্ত নিতে হলে সাহসের প্রয়োজন। সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পারার জন্য পর্যাপ্ত তথ্য হয়তো আপনার নেই। তাই ভুল হতেই পারে। ভীতু বা দায়িত্ব-এড়িয়ে-চলা নেতাকে কোন কর্মীই পছন্দ বা শ্রদ্ধা করে না।

২/গ ] কর্মীর উন্নয়ন করা ব্যবস্থাপকের প্রধান দায়িত্ব। বাস্তবে দেখা যায়, প্রশিক্ষণের সময় পাওয়া কঠিন। তবু কৌশলে সময় বের করে নিতে হবে, কারণ এটি কর্মীর এমন এক চাহিদা যা পূরণ হলে প্রতিষ্ঠান এগিয়ে যায়।

৩/গ ] কর্তৃপক্ষ চায়, ব্যবস্থাপকের নেতৃত্বে প্রকল্প/দলটি দক্ষতা এবং গতিশীলতার সাথে কাজ করুক। কর্মীকে কাজে সম্পৃক্ত করা মানে হলো দলের সবাই কর্মতৎপর হওয়া। ব্যবস্থাপক যত নিজের কাজে ব্যস্ত, তদারকি ততই দুর্বল এবং দলের কার্যকারীতা ততই কম।

৪/খ ] হতাশ হওয়া খুবই স্বাভাবিক এবং মানবিক। এমন পরিস্থিতির জন্যই ব্যবস্থাপক, কিন্তু মেজাজ বিগড়ে যাওয়া মানসিক অপরিপক্কতার লক্ষণ। আবেগ দমনে রাখতে পারা একটি বড় গুণ এবং কঠোর আত্মনিয়ন্ত্রণের পরিচয়।

৫/ক ] ব্যবস্থাপক যখন একদিন থাকেন খোশমেজাজে, অন্যদিন চরমভাবে ক্ষিপ্ত – এটি কর্মীর মনেও খারাপ ধারণার সৃষ্টি করে। ব্যবস্থাপকের সংযত এবং অভিন্ন আচরণ কর্মীর মনে প্রেরণা যোগায়।

৬/খ ] সুদক্ষ ব্যবস্থাপক নিজেই যখন কাজটি করেন, সেটি হয় সঠিক এবং দ্রুত। সুদক্ষ ব্যবস্থাপকেরা যখন অভিজ্ঞতার অভাবে থাকেন, তখন তারা কর্মীকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করতে পারেন না। নতুন ব্যবস্থাপকের প্রথম কাজ হলো, কর্মীকে কাজের নির্দেশনা দিতে শেখা এবং একই সাথে তাদেরকে শেখানো। এতে তার জন্য ব্যবস্থাপনার কাজটি সহজ হয়।

৭/ক ] পরিস্থিতি খারাপ হয়ে গেলে কাঁধ শক্ত করে দলের দায়িত্ব নিন। সমস্ত তপ্ত বাক্য আপনিই গ্রহণ করুন, এটিই ব্যবস্থাপকের দায়। অধিনস্ত কর্মীকে চাপমুক্ত রাখুন, যেন তারা স্বাভাবিক কাজ চালিয়ে যেতে পারে। ব্যবস্থাপক যখন দায় এড়িয়ে কর্মীর ওপর তুলে দেয়, কর্মীরা তার প্রতি আস্থা, শ্রদ্ধা ও আনুগত্য সবই হারায়।

৮/ক ] প্রশংসা পেতে এবং নিজেদেরকে ‘আলাদা’ ভাবতে সকল কর্মীই পছন্দ করে। কর্মীর কর্মদক্ষতার সর্বোচ্চ সুফল পেতে এরকম পরিস্থিতির খুবই প্রয়োজন। কর্মমুখর পরিবেশ সৃষ্টিতে অবদান রাখা ব্যবস্থাপকের প্রধান কাজ।

৯/গ ] নতুন ধারণা রপ্ত করানোর জন্য প্রশিক্ষণার্থীর বিভিন্ন ইন্দ্রিয়গুলোর ব্যবহার করুন। আপনার বিষয়টিতে তাদেরকে শুনতে দিন, বুঝতে দিন, দেখতে দিন করতেও দিন। সবাই একভাবে শেখে না।

১০/ক ] নতুন কিছু শেখার জন্য মানুষের কোন নির্ধারিত বয়স-সীমা নেই। সহকর্মীর বিশেষ গুণ থেকে শিখলে ব্যবস্থাপকের মান ক্ষুণ্ন হয় না, বরং বাড়ে। একই সাথে কর্মীরও সংশ্লিষ্ট ভালো দিকটি থেকে প্রতিষ্ঠান উপকৃত হয়।

লেখাটি প্রজেক্ট ম্যানেজারের পেশাদারিত্বের উন্নয়নে শুধু একটি অধ্যয়ন/অনুসন্ধানের জন্য। কোন উত্তরই অকাট্য/অখণ্ডনীয় হিসেবে বিবেচনার করার জন্য নয়।


প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ম্যানেজার/ পূর্বের পর্বগুলো:

▶ পর্ব ৮: পেশাদারিত্বের ৭টি বিষয়

▶ পর্ব ৭: এ দুই রকমের ম্যানেজার থেকে সাবধান থাকুন

▶ পর্ব ৬: ১৩ উপায়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকে রাখুন হাতের মুঠোয়!

▶ পর্ব ৫:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনা: পেশাদারিত্ব কার দায়?

▶ পর্ব ৪:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ৫টি প্রক্রিয়া: পেশাদারিত্বের শুরু

▶ পর্ব ৩:  ৯টি তত্ত্বে প্রকল্পের সংজ্ঞা এবং সহজ কিছু দৃষ্টান্ত

▶ পর্ব ২:  যে ৫টি কারণে দৈনন্দিন জীবনে প্রকল্প আমাদেরকে উপকৃত করে

▶ পর্ব ১:  প্রকল্প ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক: কেন এবং কীভাবে

প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ৫টি প্রক্রিয়া। পর্ব ৪

banner-crop

প্রকল্প ব্যবস্থাপক থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক, পর্ব ৪। আলোচ্য বিষয়, প্রকল্প ব্যবস্থাপনার পাঁচটি প্রক্রিয়া নিয়ে সহজ কিছু কথা। উন্নয়ন প্রকল্পে ‘বেইসলাইন’ বলে একটি বিষয় থাকে। বেইসলাইন হলো যেখান থেকে প্রকল্পের অগ্রগতি হিসেব করা যায়। পর্বতারোহীরা একেকটি ‘বেইস’ অতিক্রম করে পর্বতশৃঙ্গের দিকে এগিয়ে যায়।  একেকটি ‘বেইস’ থেকে পরিমাপ করা যায় কতটুকু উচ্চতায় আরোহীরা ওঠতে পেরেছে।  অতএব বেইসলাইনকে ‘প্রকল্প শুরুর পূর্বের  অবস্থা’ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। বেইসলাইন সঠিক এবং গ্রহণযোগ্য হতে হয়, কারণ এর ওপর ভিত্তি করে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা বিবেচিত হয়। এটি প্রকল্পের প্রাথমিক পরিধি নির্ণয় করার জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রকল্পের সফলতা প্রমাণ করার জন্যও অত্যাবশ্যক। কিন্তু বেইসলাইনের পাশাপাশি একটি প্রকল্পে কী কী কাজ কীভাবে করতে হয়, সেসম্পর্কে পরিচ্ছন্ন দিকনির্দেশনা না থাকলে, শুদ্ধ বেইসলাইন থাকলেও প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে না। এপর্বে প্রকল্পের বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এবং উন্নয়ন প্রকল্পের কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা হবে।

প্রকল্পের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করতে হলে এবিষয়গুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি:

  • প্রকল্পের শুরু কোথা থেকে হয়? কোন্ অবস্থায় গেলে বলা যায়, প্রকল্পটি শুরু হলো?
  • প্রকল্পের শেষ কোথায়? কোন্ অবস্থানে পৌঁছালে বলা যায়, প্রকল্পটি শেষ হলো?
  • উন্নয়ন প্রকল্পে কী কী বিষয় থাকতে হয়?
  • সাধারণত প্রকল্পে কী কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়?

 

 

▶ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কর্তৃক গৃহীত প্রকল্পের সংজ্ঞা ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা চক্র

ইউরোপিয়ান কমিশন (ইইউ’র উদ্যোগ) উন্নয়ন প্রকল্পের সংখ্যা দিয়েছে এভাবে: প্রকল্প হলো কতগুলো ধারাবাহিক কর্মকাণ্ডের সমষ্টি যার উদ্দেশ্য হলো নির্দিষ্ট মেয়াদে এবং নির্দিষ্ট খরচে কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের বাস্তবায়ন।

তাদের মতে প্রকল্পের থাকতে হবে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য:

>সুনির্দিষ্ট অংশীজন/স্টেইকহোল্ডার, বা প্রকল্পের সাথে জড়িত বিভিন্ন পক্ষসমূহ। তারা প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রত্যক্ষ/পরোক্ষভাবে এবং ইতিবাচক/নেতিবাচকভাবে প্রভাব বিস্তার করে।

কাজের সমন্বয়, কাজের ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক বিষয়াদির সুস্পষ্ট বর্ণনা।

>একটি তত্ত্বাবধান এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে প্রকল্পের অগ্রগতি নিশ্চিত হবে।

>আর্থিক এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ, যাতে মনে হবে যে আর্থিক খরচের চেয়েও প্রকল্পের উপকারিতা অধিক।

 

pcm_ec1

ইউরোপিয়ান কমিশন প্রকল্প ব্যবস্থাপনার জন্য ‘প্রকল্প ব্যবস্থাপনা চক্র’ নামে কিছু পারম্পরিক কার্যাবলীকে তুলে ধরেছে, যা উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য আদর্শ। এই চক্র মানে হলো ‘একটির পর আরেকটি’ কাজের বিন্যাস। একটির ‘আগে’ আরেকটি করা চলবে না।

১.  কর্মসূচি/প্রোগ্রাম:  কোন দেশের উন্নয়নের জন্য ইউরোপিয়ান কমিশনের কৌশলগত অবস্থান। এপর্বে পৃষ্ঠপোষক/দাতা কোন্ দিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সেটি বাস্তবায়নের নিরীখে বিবেচিত হয়। কর্মসূচি হলো প্রকল্পের বৃহৎ রূপ।

২.  প্রকল্প চিহ্নিতকরণ: প্রকল্প গ্রহণের উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত করে নির্দিষ্ট উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

৩.  প্রকল্প পরিকল্পনা:  কাজ ও আর্থিক বিষয়গুলো উদ্দেশ্যের সাথে সমন্বয় রেখে বিস্তারিতভাবে লেখা হয়। এপর্যায়ে আর্থিক সহযোগিতা নিশ্চিত হয়।

৪.  বাস্তবায়ন:  উদ্দেশ্যের সাথে সমন্বয় রেখে প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের বাস্তবায়ন ও তত্ত্বাবধান করা হয়।

৫.  মূল্যায়ন:  প্রকল্পের অর্জনকে নির্দিষ্ট মাপকাঠিতে পরিমাপ করা হয় এবং অর্জিত অভিজ্ঞতা নথিভুক্ত করা হয়।

 

▶ ব্যবস্থাপনা চক্র এবং ব্যবস্থাপনা ‘প্রক্রিয়া’ এক নয়

ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রকল্প ব্যবস্থাপনা চক্রে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের স্তর বিন্যাস করা হয়েছে। তাদের প্রকল্প ব্যবস্থাপনা চক্রে প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অত্যাবশ্যক বিষয়গুলো ওঠে এসেছে।  তাতে ‘প্রকল্প ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়াগুলো’ আলোচনা সহজ হবে।

একটি প্রকল্প শুরু হয় সুনির্দিষ্ট কিছু উদ্দেশ্য ও সীমিত মেয়াদ নিয়ে। এর সাথে থাকে সুনির্দিষ্ট কিছু পক্ষ। প্রকল্পের কার্যাবলীতে অপ্রাসঙ্গিক কোন বিষয় বা কাজ থাকা মানেই হলো, প্রাসঙ্গিক এবং দরকারি কাজের অনুপস্থিতি। অনির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার মানেই হলো, সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে সময় দিতে না পারা। প্রকল্পকে সফল সমাপ্তির দিকে পরিচালনা দিতে হলে দরকার কিছু সুনির্দিষ্ট দক্ষতা, জ্ঞান ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা। পেশাদারী রীতিতে প্রকল্পের কর্মকাণ্ডকে পরিচালনা দিয়ে একে বাস্তবায়ন করে সমাপ্তির দিকে নিয়ে আসার জন্য প্রয়োজন কিছু সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া। এই লেখায় সেই সার্বজনীন প্রক্রিয়াগুলোকে পরিচিত করানো হবে।

 

▶ প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ৫টি প্রক্রিয়া

একটি প্রকল্পের চিন্তা সংশ্লিষ্টদের মাথায় আসার সাথে সাথেই বলা যায়, প্রকল্পের ‘আরম্ভের শুরু’। তাই ‘আরম্ভকে’ প্রকল্প পরিকল্পনায় একটি পর্যায় বা প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এপর্যায়ে যত তথ্য-উপাত্ত সংগৃহীত হবে, এসবই প্রকল্পের ‘পরিকল্পনার’ জন্য আবশ্যক।  ফলে ‘পরিকল্পনাকে’ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরিকল্পনার পর স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে ‘বাস্তবায়নের’ কথা। বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সাথে ‘তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ’ ওতপ্রোতভাবে জড়িত।  সঠিকভাবে তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ করার ফলশ্রুতিতে আসে একটি প্রকল্পের সফল ‘সমাপ্তি’।

সাধারণভাবে ৫টি প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা সীমাবদ্ধ: ১) আরম্ভ ২) পরিকল্পনা্ ৩) বাস্তবায়ন ৪) তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ এবং ৫) সমাপ্তি। একটি প্রকল্পকে আরম্ভ থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত নিয়ে যাবার পথে প্রক্রিয়াগুলো ‘পাশাপাশি’ কাজ করে।

পাঁচটি প্রক্রিয়া স্বাধীন, অর্থাৎ প্রকল্পের সফলতার জন্য আলাদভাবে প্রতিটি প্রক্রিয়ার সমাপ্তি হওয়া প্রয়োজন। তবে স্বাধীন হলেও প্রক্রিয়াগুলো পৌনপুনিক এবং পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। একটি আরেকটির সাথে জড়িত। আরম্ভ না হলে পরিকল্পনা বা বাস্তবায়নের চিন্তা করা যায় না। তেমনিভাবে তত্ত্বাবধান না করলে প্রকল্পের কাজগুলো সঠিকভাবে নির্ধারিত সময়ে শেষ হবে না। ফলে প্রকল্পটি ‘সমাপ্তির’ দিকে যেতে পারবে না।

‘পৌনপুনিক’ বলতে বুঝানো হচ্ছে যে, একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে ‘আরম্ভ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন তত্ত্বাবধান এবং সমাপ্তি’ থাকতে হয়। নতুবা কাজগুলো প্রকল্পের শর্ত পূরণ করে শেষ হতে পারবে না। যেমন: পরিকল্পনার সাথে বাস্তবায়ন এবং বাস্তবায়নের পরিকল্পনার বিষয়গুলো পৌনপুনিক। বাস্তবায়ন করতে গিয়ে পরিস্থিতি বিবেচনায় কোন পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করতে চাইলে, পরিকল্পনায় সংশোধন আনতে হবে। তবে এসব পরিবর্তনের জন্য সুনির্দিষ্ট যুক্তি এবং প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। কারও খামখেয়ালিমতো কোন প্রতিষ্ঠিত পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা যায় না।

 

processgroup-best

 

১) আরম্ভ:

  • প্রকল্পের প্রাথমিক পরিধি/সীমানা/কার্যাবলী নির্ধারণ
  • আর্থিক উৎস নির্ধারণ
  • প্রকল্পের পৃষ্ঠপোষক ও কর্মীসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনকে চিহ্নিতকরণ
  • তথ্য সংগ্রহ

 

২) পরিকল্পনা:

  • প্রকল্পের লক্ষ্য কাজ ও খরচের সীমানা নির্ধারণ
  • পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্টানের সাথে কৌশল ও পদ্ধতিগত সম্পর্ক সুস্পষ্ট করা
  • পরিকল্পনা বিষয়ক কাগজপত্র: যেমন, প্রকল্প প্রস্তাবনা বা প্রকল্প ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা

 

৩) বাস্তবায়ন:

  • কর্মী ও উপকরণের ব্যবস্থাপনা
  • পৃষ্ঠপোষক ও সংশ্লিষ্ঠ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশা মোতাবেক কাজের অগ্রগতি
  • পরিকল্পনা মোতাবেক কাজের বাস্তবায়ন ও সম্ভাব্য সমন্বয় সাধন

 

৪) তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ:

  • পরিকল্পনার সাথে অগ্রগতির তদারকি
  • বর্তমান সমস্যার সমাধান এবং ভবিষ্যত প্রতিবন্ধকতার পূর্বাভাস প্রদান
  • সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর (প্রকল্পের মালিক, দাতা, সুবিধাভোগী, ক্রেতা) মধ্যে সমন্বয় সাধন

 

৫) সমাপ্তি:

  • কাজ ও চুক্তির সমাপ্তি নিশ্চিতকরণ
  • কাজের মূল্যায়ন ও অনুমোদন: শেষ না হলেও ‘শেষ’ বলে বিবেচনা করতে হতে পারে
  • তথ্য ও ফলাফল (প্রতিবেদন, অভিজ্ঞতার বিবরণ) সংগ্রহ করা
  • সমাপনী আনুষ্ঠানিকতাগুলো পরিকল্পনামতো শেষ করা

 

প্রকল্পের পাঁচটি অত্যাবশ্যক প্রক্রিয়া সম্পর্কে ‘প্রাথমিক ধারণা’ দেবার জন্য যথাসাধ্য সংক্ষেপ করা হলো। প্রাসঙ্গিক আলোচনার সময় আরও দৃষ্টান্ত এবং বিস্তৃত আলোচনা করা হবে।

 


Sources consulted:

1. European Commission, EuropeAid Cooperation Office (2004) Aid Delivery Delivery Methods: Project Cycle Management Guidelines. Brussels, Belgium.

2. Institute, P.M. and Project, M.I. (2013) A guide to the project management body of knowledge (PMBOK guide). Fifth Edition. United States: Project Management Institute.

প্রকল্প সম্পর্কে ৯টি ধারণা এবং কিছু সহজ দৃষ্টান্ত। পর্ব ৩

 

Capture3

 

প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক, পর্ব ৩। এবারের বিষয় প্রকল্পের ধারণা। প্রকল্প সম্পর্কে একদমই ধারণা নেই, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু ভাষা বদলের পাশাপাশি প্রকল্পের ধারণাও বিস্তৃতি পেয়েছে। এখন আর প্রজেক্ট কোন নির্দিষ্ট কাজের সাথে আবদ্ধ নেই। প্রকল্প একটি সার্বজনীন ধারণায় রূপ নিয়েছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এখন যেকোন কাজের সাথে যুক্ত করা যায়। তবু কিছু মৌলিক বিষয় প্রায় একই আছে। একটি বিষয় এখনও বদলায় নি, তা হলো, প্রকল্পে থাকতে হবে সুর্নিদিষ্ট উদ্দেশ্য। একটি প্রকল্পে এক বা একাধিক উদ্দেশ্য থাকবে, যা নির্দিষ্ট সময়ে অর্জিত হবে।

প্রকল্প সম্পর্কে লেখালেখি শুরু করার প্রথম উদ্দেশ্য ছিলো, বাংলা ভাষায় প্রকল্পের জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা, যেন প্রজেক্ট-এর মৌলিক ধারণাগুলো পাঠকের মস্তিষ্ক এবং মননে স্পর্শ করতে পারে। এপর্বে উদাহরণসহ প্রকল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচিত হলো।

 

▶ প্রকল্প সম্পর্কে ৯টি টুকরো ধারণা

১)  প্রকল্প একটি ‘সাময়িক উদ্যোগ’ যার উদ্দেশ্য হলো: একটি নির্দিষ্ট পণ্য, সেবা অথবা ফলাফল সৃষ্টি করা। এই অস্থায়ি স্বভাবের কারণেই প্রকল্পের নির্দিষ্ট শুরু এবং শেষ আছে।

২)  সাময়িক/ অস্থায়ি মানে এই নয় যে, প্রকল্পটি স্বল্পমেয়াদি। স্বল্পমেয়াদি বা দীর্ঘমেয়াদি যেকোন একটি হতে পারে। মূল বিষয়টি হলো, এটি চিরকালীন বা অনির্দিষ্ট নয়। এবং এর কর্মকাণ্ড ও মেয়াদ সুনির্দিষ্ট। প্রতিষ্ঠান এবং ‘কর্মসূচির’ সাথে তুলনা করলেই এর পার্থক্য স্পষ্ট দেখা যায়।

৩) প্রকল্পকে বলা যায় একটি সিঁড়ি বা পথপরিক্রমা, যার মাধ্যমে আমরা একটি উচ্চতায় পৌঁছাই। ‘গন্তব্যে যাওয়াকে’ মনে করি প্রকল্পের উদ্দীষ্ট ফল। এই গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত যত প্রচেষ্টা বা আয়োজন, সেটির নাম হতে পারে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা। যিনি সেটি পরিচালনা করেন, তিনি হতে পারেন প্রকল্প ব্যবস্থাপক। করপোরেট পর্যায়ে একটি প্রোডাক্ট বা পণ্যের পরিকল্পনা, বাজার গবেষণা, পণ্যের উৎপাদন এবং বিস্তৃত বাজারে সেটি পৌঁছানো পর্যন্ত কর্মকাণ্ডকে প্রজেক্ট হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে।

৪)  কয়েকটি ‘অবধারিত কারণে’ প্রকল্পের পরিসমাপ্তি ঘটে। যেমন: ক. প্রকল্পের উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হলে; খ. প্রকল্পের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন সম্ভব না হলে; গ. পরিস্থিতির কারণে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পেলে/ না থাকলে; অথবা ঘ. প্রকল্পের মালিক বা পৃষ্ঠপোষক সেটি আর চালাতে না চাইলে।

৫) প্রকল্প সাময়িক, কিন্তু এর ফলাফল সাময়িক নয়।  একটি ‘প্রকল্পের পরিণতি’ যুগ যুগ ধরে প্রজন্মান্তরে টিকে থাকতে পারে। যেমন: সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ অথবা যমুনার নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু। ক্যানসার নিরাময়ের কারণ অনুসন্ধানের সাথে জড়িত ‘বিশেষায়িত গবেষণাকে’ একটি প্রকল্প বিবেচনা করলে, বুঝতে পারা যায় প্রকল্পের ফল কত ব্যাপক। অতএব, প্রকল্পের ফল মূর্ত এবং বিমূর্ত (বস্তুগত এবং ধারণাগত) উভয়ই হতে পারে।

৬) ‘অনন্যতা’ বা তুলনাহীনতাকে প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করা যায়। একটি প্রকল্পের উদ্দেশ্য বা ফলাফল অন্যটির সাথে মিল থাকতে পারে না। তাহলে সেটি প্রকল্প নয়, কর্মসূচি। কর্মসূচি হলো প্রতিষ্ঠানের চলমান এবং পৌনপৌনিক কাজ। কিন্তু প্রকল্পের থাকে নিজস্ব কিছু উদ্দেশ্য, কলাকৌশল এবং সুবিধাভোগী। একই ডিজাইনের বিল্ডিং হলেও, ভৌগলিক অবস্থান এবং বিভিন্ন ক্রেতার কারণে একেকটি বিল্ডিং নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অনন্য।

৭)  প্রজেক্ট দৈনন্দিন কার্যক্রম (অপারেশনস) থেকে আলাদা। প্রজেক্ট সাময়িক, কিন্তু অপারেশনস চলমান। প্রজেক্ট নির্দিষ্ট মেয়াদে শেষ হয়ে যায়, অপারেশনস পৌনপুনিক। উদ্দেশ্য, কাজ এবং কৌশলের দিক দিয়ে প্রাত্যাহিক কাজের সাথে প্রজেক্টকে মেলানো যায় না।  কিছু বিশেষ উদ্দেশ্য, সমস্যা বা ফলাফলকে লক্ষ্য করে প্রকল্প ‘বাস্তবায়িত’ হয়।  প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য কার্যক্রম ‘পরিচালিত’ হয়। নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এবং অংশীজনকে (stakeholder) কেন্দ্র করে প্রকল্প পরিকল্পিত হয় বলে এর বাস্তবায়নের জন্য বিশেষায়িত জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কাজের লক্ষ্য হলো ‘কাজটি সঠিকভাবে করা বা চালিয়ে যাওয়া’, কিন্তু প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো দ্বিমুখী, ‘কাজটি সঠিকভাবে শুরু করা’: সঠিক এবং শুরু। প্রকল্প ও কার্যক্রমে (অপরাশেনস) সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ভূমিকাগুলো আলাদাভাবে বিবেচনা করলে এসব পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

৮)  প্রকল্পকে আরও বুঝতে পারার জন্য কয়েকটি সহজ দৃষ্টান্ত হতে পারে এরকম: ক. কোন একটি পণ্যের উদ্ভাবন করা, যা হতে পারে সম্পূর্ণ নতুন অথবা পূর্বের কোন পণ্যের বর্ধিত রূপ; খ. প্রতিষ্ঠানের পণ্য উৎপাদন/বিপণনে নতুন সক্ষমতা সৃষ্টিকারী কোন পদ্ধতি বা প্রক্রিয়ার উদ্ভাবন; গ. বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজনের সমন্বয়ে একটি সফল সম্মেলনের আয়োজন করা; ঘ. একটি নির্দিষ্ট এলাকার অধিবাসীদের সামাজিক, আর্থিক, আচরণগত বা স্বাস্থ্যগত সমস্যার সমাধানে বিশেষ সুফল দেখাতে পারা; ঙ. একটি নির্দিষ্ট এলাকায় শতকরা হিসেবে সাক্ষরতার হার বাড়াতে পারা; চ. প্রতিষ্ঠানের চলমান কার্যক্রমে নতুন একটি কৌশলের উদ্ভাবন এবং/বা সফল প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারা; ছ. একটি সফল গবেষণা সম্পন্ন করতে পারা যা থেকে পরীক্ষীত ফলাফল/প্রমাণাদি পরিবর্তিতে ব্যবহার করা যায় ইত্যাদি।

৯) গান্ট চার্টের (বিশেষ প্রকার মূল্যায়ন ছক) প্রণেতা হেনরি লরেন্স গান্টকে (১৮৬১-১৯১৯) প্রকল্প ব্যবস্থাপনার জনক বলা হয়। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন যান্ত্রিক প্রকৌশলী ছিলেন। প্রকল্প পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং নিয়ন্ত্রণের কিছু জনপ্রিয় কৌশল আবিষ্কার করেন মিস্টার গান্ট। উনবিংশ শতাব্দির প্রথম দশকে তিনি গান্ট চার্টের প্রবর্তন করে ব্যবস্থাপনার কাজকে সকলের জন্য সহজতর করে দেন। তবে এউদ্দেশ্যে প্রথম চার্টটি আবিষ্কৃত হয় ১৮৯০ সালে পোলিশ প্রকৌশলী ও অর্থনীতিবিদ ক্যারল অ্যাডামেকি’র মাধ্যমে। বর্তমানে আমরা অনেক অগ্রসর সময়ে বাস করছি এবং আরও ব্যাপক গবেষণার ফল হিসেবে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় এসেছে আমূল পরিবর্তন।

 

প্রকল্প পরিকল্পনার সহজ কিছু ধাপ/পর্যায়

  • সমস্যা চিহ্নিতকরণ অথবা প্রকল্প হিসেবে নেবার প্রয়োজন আছে কিনা যাচাই করা।
  • সম্ভাব্য সমাধানের উপায় নির্ধারণ করা, যা পরবর্তিতে আরও সুষ্পষ্ট হবে।
  • প্রত্যাশিত সুফল বা গন্তব্য নির্ধারণ করা।
  • কী কী প্রচেষ্টা/উপকরণ দিতে হবে সেটি স্পষ্ট করা।
  • কোন্ কোন্ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে কী প্রকার যোগাযোগ করতে হবে সেটি নির্ধারণ করা।
  • কাজকে সামর্থ্য মোতাবেক ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করে নেওয়া।
  • সম্ভাব্য বিপদ/ প্রতিবন্ধকতা/ ব্যর্থতাগুলো চিহ্নিত করা।
  • সময়ছক নির্ধারণ করা: কোন্ সময়ান্তে কোন্ কাজটি শেষ হবে সেটি নির্ধারণ করা।
  • সময়ছক অনুসারে প্রজেক্ট বাস্তবায়নে মনোনিবেশ করা: শেষ না হওয়া পর্যন্ত একটি কাজে মনযোগ ধরে রাখা।
  • সম্পন্ন কাজগুলো ভালোভাবে চিহ্নিত করে রাখা এবং সেটি সবসময় দৃষ্টির সামনে রাখা।
  • দিন/সপ্তাহ/মাস শেষে সম্পন্নকৃত কাজের অবস্থা/অগ্রগতি/ফলাফল দেখা।
  • লক্ষ্যে পৌঁছাবার স্বার্থে সম্ভব হলে প্রক্রিয়া/পদ্ধতি/সময়ছককে পরিবর্তন/শিথিল/সহজ করা।
  • প্রয়োজনে কর্মপরিকল্পনায় পরিবর্তন/সংশোধন আনা।

একটি আউটলাইন: পরিকল্পনার কাজটি সহজ শর্তে শুরু হওয়া উচিত

>একটি আউটলাইন: পরিকল্পনার কাজটি সহজ শর্তে শুরু হওয়া উচিত

 

▶ যেসব কারণে প্রকল্প আমাদের জীবনকে সহজ করে দেয়

  • প্রকল্প মানে হলো, কোন কাজে বিশেষভাবে মনোনিবেশ করার সুযোগ সৃষ্টি।
  • প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করা হলে, কাজকে যুক্তিসঙ্গতভাবে (ভালোমন্দ পক্ষপাতহীনভাবে বিবেচনা করা যায়) পরিকল্পনা করা যায়।
  • প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করা হলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে তাৎপর্যপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।
  • ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং পেশাগত কাজগুলো গঠনমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ হয়।
  • যে কাজটি জটিল এবং সময়সাপেক্ষ, সেটিকে প্রকল্প হিসেবে নিতে পারি।
  • একটি ক্ষুদ্র প্রকল্প সম্পন্ন করতে পারলে নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।
  • একটি নতুন ভাষা/দক্ষতা শেখার কাজকে প্রকল্প হিসেবে নিতে পারি।
  • বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি/ সরকারি চাকরির জন্য প্রস্তুতির কাজকে প্রজেক্ট হিসেবে নিতে পারি।
  • নিজের দেহের অস্বাভাবিক ওজন/অসুস্থতাকে ধারাবাহিক উপায়ে কমাবার জন্য প্রকল্প হিসেবে নিতে পারি।

 

>পরবর্তি পর্ব

▶ পর্ব ২:  যে ৫টি কারণে দৈনন্দিন জীবনে প্রকল্প আমাদেরকে উপকৃত করে

▶ পর্ব ১:  প্রকল্প ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক: কেন এবং কীভাবে


Sources consulted:

1. Profile of Henry Gantt & the history of the Gantt chart (2012) Available at: https://www.siliconbeachtraining.co.uk/blog/profile-of-henry-gantt-history-of-gantt-chart (Accessed: 2 September 2016).

2. History.com (no date) Karol Adamiecki 1896. Available at: http://projectmanagementhistory.com/The_Harmonogram.html (Accessed: 2 September 2016).

3. Gantt (2016) What is a Gantt chart? Gantt chart information, history and software. Available at: http://www.gantt.com/ (Accessed: 2 September 2016).

4. Institute, P.M. and Project, M.I. (2013) A guide to the project management body of knowledge (PMBOK guide). Fifth Edition. United States: Project Management Institute.

যে ৫টি কারণে দৈনন্দিন জীবনেও ‘প্রকল্প’ আমাদেরকে উপকৃত করে। পর্ব ২

capture2

 

প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক, পর্ব ২। এপর্বের উদ্দেশ্য হলো আমাদের দৈনন্দিন কাজের সাথে কীভাবে ‘প্রজেক্ট ধারণাটি’ জড়িয়ে আছে, সেটি তুলে ধরা।

কাজই জীবন। আর জীবন হলো কাজমুখী আচরণের সমষ্টি। দৈনন্দিন জীবনে আমরা অনেক কাজ করে থাকি, যার উদ্দেশ্য থাকে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ও ঠিক করা থাকে। এসব কাজের কিছু লক্ষ্য আছে স্বল্পমেয়াদি; কিছু দীর্ঘমেয়াদি।

আমরা কাজ করি এবং তাতে প্রয়োজনীয় সময় ও প্রচেষ্টা প্রয়োগ করি। পরিশেষে কিছু সুফল প্রত্যাশা করি, যার কিছু পরিমাপ করা যায়, কিছু সুফলকে গাণিতিকভাবে পরিমাপ করা যায় না। পরিমাপ করতে পারি অথবা না পারি, কাজ শেষে একটি ফল বা পরিণতি তো অবশ্যই থাকে।

এসব কাজের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে থাকে অনেক পক্ষ। তারা ব্যক্তি অথবা সংস্থা উভয়ই হতে পারে। এসব ব্যক্তি বা সংস্থা আমাদেরকে উপকরণ অথবা পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করে। অন্যরা হয়তো সাহায্য করে না, তবে অংশগ্রহণ দিয়ে একটি কাজকে সফল এবং/বা তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।  এসবই হলো একটি প্রকল্পের কিছু আনুষঙ্গিক উপাদান।

প্রকল্প ব্যবস্থাপক হিসেবে আমরা যখন এসব বিষয়কে দেখি, তখন আরও পেশাদারভাবে তা মূল্যায়ন করতে পারি এবং অধিকতর সুফল নিশ্চিত করে পারি। একটি প্রকল্পে যারা সুবিধাভোগী, তারা স্বাভাবিকভাবেই এর বাস্তবায়নে সহযোগিতা করে। কিন্তু যারা ওই প্রকল্পের কারণে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তারা কোনভাবেই ওটাতে সাহায্য দেবে না, বরং বাধাগ্রস্ত করতে চাইবে। একটি দৃষ্টান্ত দেই। গ্রামীন জনপদে একটি পায়ে-চলার রাস্তা নির্মাণ করতে গেলে, আমরা প্রথমেই জমিদাতার বিরোধীতার শিকার হয়েছিলাম।

‘প্রকল্প তত্ত্বে’ মজার বিষয়টি হলো, প্রকল্প বাস্তবায়নে যারা প্রতিপক্ষ অথবা বৈরিতা সৃষ্টি করে, তারাও প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে চিহ্নিত হয়। তাতে প্রকল্প প্রধান ওসব প্রতিপক্ষ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ইতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ পান। এভাবে প্রতিপক্ষকেও যথাযোগ্য গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্পের সুফল নিশ্চিত করা হয়।।

 

কীভাবে প্রজেক্ট বা প্রকল্পের ধারণা আমাদের দৈনন্দিন কাজগুলোকে ফলদায়ক এবং উদ্দেশ্যমুখী করে তোলে?  কীভাবে প্রকল্প তত্ত্ব দিয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত এবং পেশাগত কাজকে আরও সফল করে তুলতে পারি? আমরা দেখতে পাবো যে, কাজকে ‘প্রকল্প’ হিসেবে গ্রহণ করলে, কাজে মনসংযোগ বেড়ে যায় এবং সংশ্লিষ্ট মানুষগুলোর সাথে ভবিষ্যতমুখী সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।

প্রকল্পভিত্তিক কাজ আমাদেরকে নিম্নোক্ত সুবিধা এনে দেয়:

১)  কাজ শুরু এবং শেষ করার ‘সময়’ নির্দিষ্ট থাকে। তাতে কাজে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনিবেশ করা যায়, যেন নির্দিষ্ট দিনে কাজটি শেষ হয়। শুরু এবং শেষ করার ‘সময়’ নির্ধারণ করা থাকলে অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় নষ্ট হয় না, অথবা অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে মনযোগ যায় না। নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করার জন্য বাকি সব উপাদান উদ্দেশ্যমাফিক প্রয়োগ করা হয়। এভাবে কাজটি যখন নির্দিষ্ট মেয়াদশেষে পরিণতির দিকে যায়, তখন আমাদের মনে আসে ‘অর্জনের তৃপ্তি’, যা পরবর্তি কোন উদ্যোগে প্রেরণা দেয়।

) কাজ হয় ফলাফলমুখী। জীবনে অনেক কাজ করি, যার কোন সুষ্পষ্ট ফল নির্ধারিত থাকে না। কাজ না করলে অন্যরা অলস বলবে অথবা অসামাজিক বলবে, এজন্য হয়তো করি। কেন করছি তাও জানি না, অথবা হয়তো মজা পাচ্ছি এজন্যই করে যাচ্ছি। আমাদের জীবনে এমন অনেক কাজ আছে, যা আমাদের পূর্বপূরুষরা করছেন বলেই করে যাচ্ছি। অথচ জানি না, কেন তা করছি। প্রতিষ্ঠাতা প্রেজিডেন্টের মৃত্যুর পর তার সন্তানের মালিকানায় কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান যখন ধ্বংস অথবা অধঃপতনে যায়, তখন নিশ্চিত বলা যায় যে, উভয়েরই লক্ষ্য এবং প্রচেষ্টা এক ছিল না। কিন্তু কাজকে প্রকল্প হিসেবে নিলে, তার ফলাফল সুর্দিষ্ট থাকে।

৩) প্রচেষ্টার সাথে এর ফলাফলকে ‘সংযোগ’ করা যায়। প্রতিটি কাজের সাথে এর প্রত্যাশিত ফলাফলগুলো সংযুক্ত করা থাকে। আমরা সকলেই কাজ করছি এবং সার্বিকভাবে সুফলও কিছু আসছে। তাতে প্রতিষ্ঠানের প্রধান ভাবছেন যে, সবকিছু ঠিক আছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়শেষে দেখা যাচ্ছে যে, প্রতিষ্ঠান লাভবান হচ্ছে না, অথবা উৎপাদন খরচ কমছে না। এর কারণ হলো, কোন্ কাজের কারণে কোন্ সুফল আসছে, কোন্ কাজের ফলে কোন্ সুফল আসছে না, সেটি আলাদাভাবে বের করা যাচ্ছে না। আমাদের ‘কিছু কিছু প্রচেষ্টায়’ যখন প্রত্যাশিত সুফল আসে না, তখন বিশ্লেষণ করে দেখতে পারি কেন তাতে সুফল আসছে না, যদি প্রকল্প হিসেবে কাজটিকে গ্রহণ করি।

৪) কাজের সাথে জড়িত মানুষগুলোকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা যায়। একটি কাজ সফল করে তোলার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে আমাদের সম্পর্ক রাখতে হয়। তাদের সাথে যথাযথ সম্পর্কের ওপর নির্ভর করছে কাজের সফলতা। নির্মাণ প্রকল্প হলে, নির্মাণ সামগ্রীর (রড, সিমেন্ট, বালি, ইট ইত্যাদি) সরবরাহকারীদের সাথে যথাযথ সম্পর্ক থাকতে হয়। অন্যদিকে সম্পর্ক থাকতে হয় সেসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে, যারা নির্মাণ কাজের অনুমোদন দেয় অথবা কাজের গুণগত মান নির্ধারণ করে। প্রকল্প তত্ত্বে প্রতিটি কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম তালিকাভুক্ত থাকে, সে সাথে নির্ধারিত থাকে তাদের সাথে আন্তঃযোগাযোগের উপায়। মানুষের আচরণ কখন কেমন হয়, সেটি পূর্বেই বলা যায় না। কাজেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাথে আন্তঃযোগাযোগের বিষয়গুলো নির্ধারিত থাকলে, প্রকল্প কর্মীরা ব্যক্তিগত ভাবাবেগের ঊর্ধ্বে থেকে তাদের সাথে সঠিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে।

৫) একটি প্রকল্পে প্রতিপক্ষ বা বৈরিতা সৃষ্টিকারীকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয় না। বরং দেখা হয় সম্ভাব্য অংশীজন (potential stakeholder) হিসেবে। এসব প্রথাগত প্রতিপক্ষকে পরিকল্পিত উপায়ে মোকাবেলা করে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পকে বাস্তবায়নের দিকে নিয়ে যায় প্রকল্প কর্মীরা। নেতৃত্বে থাকেন প্রকল্প ব্যবস্থাপক। প্রতিপক্ষকে প্রকল্পের প্রভাবক হিসেবে দেখা হয়।  আবেগ বা সংবেদনশীলতা দিয়ে যাচাই করা হয় না, কিন্তু প্রকল্পের ব্যর্থতার কারণ হিসেবে তাদেরকে দেখা হয়। প্রকল্প ব্যবস্থাপকের ইতিবাচক মনোভাবের কারণে অনেক সময় সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ ‘সম্ভাব্য সহায়কে’ পরিণত হয়।

 

শুধু গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি যুক্তি তুলে ধরা হলো। তাতে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, প্রকল্প আমাদের জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে। আমাদের জীবন যেন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রকল্পেরই একটি সমষ্টি, যাকে পারিভাষিকভাবে কর্মসূচি (program) বলা চলে। হয়তো একদিন পোর্টফোলিও হিসেবেও উপস্থাপন করতে পারবো। এভাবে ক্রমান্বয়ে প্রকল্পের মৌলিক বিষয়ের কাছে এগিয়ে যাবো। তখন প্রকল্প তত্ত্বকে জীবন থেকে কর্মজীবনে প্রয়োগ করার প্রেরণা পাবো।

 

এপর্বের মূল উদ্দেশ্য ছিলো, জীবন-ঘনিষ্ট দৃষ্টান্ত দিয়ে প্রকল্পের কয়েকটি মৌলিক বৈশিষ্ট আলোচনা করা।  পরবর্তি লেখায় বাস্তবভিত্তিক ব্যাখ্যা দিয়ে ‘প্রকল্পকে’ আরও স্পষ্ট করার ইচ্ছা আছে। (১ সেপ্টেম্বর ২০১৬)

 

 

 


▶পর্ব ১: প্রকল্প ব্যবস্থাপক থেকে ‘স্বপ্ন ব্যবস্থাপক’

▶পর্ব ৩: ৯টি তত্ত্বে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা।

প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক: কেন এবং কীভাবে?

project-manager

একটি প্রজেক্টের ম্যানেজার হতে পারা অপরিমেয় অভিজ্ঞতা প্রাপ্তির সুযোগ এনে দেয়। একটি প্রজেক্ট যেন একটি স্বপ্নের মতো; সঠিকভাবে শেষ হলে স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুখ পাওয়া যায়। কিন্তু কিছু কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ছাড়া আমাদের কর্মসমাজে ‘প্রজেক্ট’ এবং ‘ম্যানেজার’ ধারণাগুলো সুষ্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় না। অনেক প্রজেক্ট সৃষ্টি হয়, কেবল মাঝপথে থেমে যাবার জন্য। অনেক প্রজেক্ট শুরুই হয় না। অনেক প্রজেক্ট শুরু হয়, কিন্তু শেষ হয় না। অনেক প্রজেক্ট শেষ হয়, তবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।  কিছু প্রজেক্ট সফলভাবেই শেষ হয়, তবে যে গন্তব্যকে লক্ষ্য করে সেগুলোর সূচনা, তা শেষ পর্যন্ত ঠিক থাকে না।  কিছু প্রজেক্ট সফলভাবে শেষ হয়ে ‘সঠিক গন্তব্যেই’ পৌঁছায়, কিন্তু খরচ ও সময়মাত্রা বেড়ে যায় অসহনীয়ভাবে ।

বেসরকারি সংস্থায় অনেক প্রজেক্ট প্রপোজাল হয় এবং তাতে কিছু প্রকল্পে দাতাগোষ্ঠি অনুমোদন দিয়ে অর্থযোগান দেন। এসব প্রকল্প যেভাবেই শেষ হোক, দেশের নিপীড়িত জনগোষ্ঠির কিছু উন্নয়ন হয়। এসব উন্নয়ন সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক এবং সুদূরপ্রসারী। কিন্তু পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে পেশাদারিত্বের অভাবে উদ্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জিত হয় না, অথবা কিছু ক্ষেত্রে হলেও তা প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয় না। সেখানে পেশাদারিত্ব একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দেয়।

 

পেশাদারিত্ব কার বেশি দরকার, দাতার নাকি বাস্তবায়নকারী সংস্থার?  এটি স্তর বিশেষে ভিন্ন হয়। যারা প্রকল্পের পরিকল্পনা করেন, এবং যারা বাস্তবায়ন করেন, তাদের উভয় পক্ষেরই পেশাদারিত্ব থাকতে হয়। তবে সেটি আপেক্ষিক; বাস্তবায়নকারীর পেশাদারিত্ব আর অর্থদাতা প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্বকে একই মাত্রায় দেখা যায় না। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বা তৃতীয়পক্ষের দ্বারা প্রকল্প পরিকল্পনা করালে, যথাযথ সমন্বয় না থাকলে প্রকল্প বাস্তবায়কদের সাথে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।  তাতে সফলভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কমে যায়।

কর্পোরেট হোক বেসরকারি সংস্থা হোক, প্রকল্পকে ‘প্রকল্প’ হিসেবে গ্রহণ না করলে তাতে সফলতার আশা করা যায় না।  প্রকল্পের স্বভাবটি হলো এই যে, এটি নির্দিষ্ট সময়ান্তে শেষ হবে; এর উপকরণ ও পদ্ধতি হবে ফলাফল-কেন্দ্রিক।  প্রকল্পের কর্মীদের লক্ষ্য থাকবে একটিই: নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে প্রকল্পটি সঠিকভাবে শেষ করা এবং প্রতিবেদন করা।

আমাদের দেশে কিছু নির্মাণ প্রকল্পের দিকে দৃষ্টি দিলেই বুঝতে পারি, একটি প্রকল্পকে ‘প্রকল্প’ হিসেবে না নিলে কী বিপদ হতে পারে। দেশে ব্যক্তি ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ইমারত, বৃহৎ সেতু, ফ্লাইওভার ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা একটি বিশেষায়িত জ্ঞান। একজন আমজনতার দৃষ্টিতেও যদি তাকাই, তবে অনেক সীমাবদ্ধতা ও অনিয়মের চিত্র আমাদের সামনে ফুটে ওঠে।

 

দাতাগোষ্ঠিকে প্রকল্পের স্বপ্ন দেখিয়ে অনেক অনুদান আসে বাংলাদেশে। লক্ষ্য থাকে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠিকে নির্দিষ্ট সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উন্নয়ন দেখাবার। দাতা অথবা বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্বের অভাবেই হোক, অথবা অসততার কারণেই হোক, সব প্রকল্প ‘ফলাফলমুখী প্রচেষ্টা’ দেখাতে পারে না, যতটা তাদের প্রতিবেদনে দেখা যায়।

এদেশে প্রকল্প অথবা ফলাফলমুখী উদ্যোগ বা উদ্যোক্তার যে কত অভাব, তা একটি সহজ পর্যবেক্ষণ (hypothetical observation) থেকে বুঝতে পারা যায়। তা হলো, দেশীয় প্রতিষ্ঠানে বিদেশী সিইও’র উপস্থিতি। এদেশেরই প্রতিষ্ঠান এদেশেরই মূলধন, ভোক্তাও এদেশেরই; কিন্তু প্রধান নির্বাহী আসেন সুদূর পশ্চিম দেশ থেকে; অথবা প্রতিবেশি কোন দেশ থেকে। সুনির্দিষ্ট দৃ্ষ্টান্ত এবং গবেষণা দিয়ে এটি প্রমাণ করা যায়, কিন্তু আপাত দৃষ্টিতে বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য।

 

দেশের প্রাতিষ্ঠানিক আচার-আচরণ এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক অবস্থান যদি ‘পাখির চোখেও’ একবার  দেখি, তবে চলমান স্থবিরতা (creeping pace) এবং অবহেলার চিত্রটি চোখে পড়ে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকে বিশেষায়িত জ্ঞান বা দক্ষতা হিসেবে দেখা হচ্ছে না এখনও। সরকারি প্রকল্পগুলোতে পদাধিকার বলে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে এরকম বালখিল্যতার কারণেই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের মুখ দেখে না। একবছরের প্রকল্প শেষ হয় চতুর্থ বছরে; নষ্ট হয় সময়; অপচয় হয় জনগণের টাকা; প্রলম্বিত হয় জনদুর্ভোগ।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও এর ব্যতিক্রম নেই, যিনি প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ব্যক্তি, তিনিই প্রকল্পেরও অধিকর্তা। যিনি প্রকল্পের মৌলিক বিষয়গুলোই জানেন না, তাকে দেওয়া হয় ‘কর্মসূচি’ পরিচালনার দায়িত্ব। এখানে কর্মসূচিকে ‘প্রকল্প’ বলা হয়, প্রকল্পের তো কোন চিহ্নই থাকে না।  বছরের পর বছর চলে যায়, প্রকল্প শেষ হয় না। কারণ খুঁজলে দেখা যায়, সেখানে ‘শেষ’ বলে কোন বিষয় আদতেই ছিলো না। এতে প্রকৃতপক্ষে কাদের উন্নয়ন হয় আর কাদের ক্ষতি হয়, বুঝতে পারার জন্য গবেষণা করতে হয়।  প্রকল্পের ‘স্বাভাবিক পরণতি’ হিসেবে সুফল আসে না, সুফল দেখতে গবেষণার অপেক্ষা করতে হয়।

 

প্রকল্পকে বাস্তবায়নের পথে নিয়ে যাবার পরিক্রমায় কিছু অনন্য অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়।  একে শুধু ‘অভিজ্ঞতা’ বললে কমই বলা হয়। এই অভিজ্ঞতা এতই অমূল্য যে, এটি শিক্ষা, প্রশিক্ষণ অথবা শুধুই অর্থের বিনিময়ে পাওয়া যায় না।  অনেক সময়, অধ্যবসায় এবং লক্ষ্যভিত্তিক প্রচেষ্টার পরিণতিতে আসে ‘প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা’।

কর্মজীবনের শুরুতে কয়েকটি ক্ষুদ্রাকৃতির প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ হয়েছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করার সময়ে, কয়েকটি ফলমুখী কর্মসূচি (result-focused program) বাস্তবায়ন করার অভিজ্ঞতা হয়েছে।  ২০০৪ থেকে ২০১১ পর্যন্ত, আট বছরে নিয়মিত কাজের পাশাপাশি, পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত তিনটি এসাইনমেন্টকে ‘প্রকল্প’ হিসেবে বাস্তবায়ন করার সুযোগ নিয়েছিলাম। এসবের পাশাপাশি, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা (project management) সংক্রান্ত কিছু সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছিলো। প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং প্রাসঙ্গিক প্রশিক্ষণের এই দীর্ঘ পরিক্রমায় কিছু উপলব্ধি সৃষ্টি হয়েছে, যা উপরোক্ত শিরোনামে তুলে ধরতে চাই, যেন দেশের অভিজ্ঞ প্রকল্প ব্যবস্থাপকদের মতামত পাওয়া যায়। তাতে যদি প্রকল্প ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে চলমান স্থীতাবস্থা থেকে এগিয়ে যাবার পথ সৃষ্টি হয়, সেটি হবে পরম আনন্দের বিষয়।

 

 

Capture

 

▶ প্রকল্প ব্যবস্থাপক থেকে ‘স্বপ্ন ব্যবস্থাপক’

উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে একযুগেরও বেশি সময় ধরে কাজ করতে গিয়ে শিখেছি যে, একটি প্রকল্প শুধু একটি স্বপ্ন নয়; স্বপ্নের চেয়ে একটু সহজ। কারণ, ভালোভাবে চিন্তা করতে পারলে এবং পরিকল্পনাগুলো সুর্নিদিষ্ট করতে পারলে, বাস্তবায়নের সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ। প্রকল্প এবং জীবনের পরিকল্পনা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা এবং এসংক্রান্ত একাডেমিক জ্ঞান ঝালাই করছি কিছুদিন যাবত। সহজভাবে একটু একটু করে লেখে যাবো সপ্তাহান্তে। শপথ নিয়েছি, বেশি চাপ নেবো না মাথায়, তাহলে শুরুই করা যাবে না। প্রকল্প নিয়ে লেখালেখিকেও ‘আরেকটি প্রকল্প’ হিসেবে নিয়েছি, কারণ ৫৫০জন (ফেইসবুকের ২৫০ এবং ওয়ার্ডপ্রেসের ৩০০) পাঠকের প্রতি আরও বেশি গুরুত্ব দিতে চাই।

  • শুরু: শনিবার ৩ সেপটেম্বর থেকে, শনিবার বিকাল ৩টায়
  • লেখার স্টাইল: যেভাবে মাথায় আসছে, সেভাবেই ব্লগে তুলে দিচ্ছি
  • লেখার মান: বিষয় এবং ভাষার প্রাঞ্জলতার প্রতিই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি
  • ভাষা: ইংরেজি এবং পারিভাষিক শব্দ যথাসম্ভব এড়িয়ে চলছি

 

আমাদের ব্যক্তিগত জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোকে মাইক্রো-প্রজেক্ট হিসেবে দেখতে পারি। তাতে কঠিন কাজগুলোতে আরও নির্দিষ্টভাবে মনোনিবেশ করা যায়।  ‘প্রকল্পের ধারণা’ কীভাবে প্রাত্যাহিক জীবনেও আমাদের প্রচেষ্টাকে ফলমুখী করে তোলে, সেটি পরবর্তি পোস্টে তুলে ধরবো। পাঠককে পরবর্তি পোস্টগুলো অনুসরণ করার অনুরোধ জানিয়ে প্রথম পর্বটি শেষ করছি।  (২৫ অগাস্ট ২০১৬)

 

 


পরবর্তী পর্ব