Tagged: project in life

যে ৫টি কারণে দৈনন্দিন জীবনেও ‘প্রকল্প’ আমাদেরকে উপকৃত করে। পর্ব ২

capture2

 

প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক, পর্ব ২। এপর্বের উদ্দেশ্য হলো আমাদের দৈনন্দিন কাজের সাথে কীভাবে ‘প্রজেক্ট ধারণাটি’ জড়িয়ে আছে, সেটি তুলে ধরা।

কাজই জীবন। আর জীবন হলো কাজমুখী আচরণের সমষ্টি। দৈনন্দিন জীবনে আমরা অনেক কাজ করে থাকি, যার উদ্দেশ্য থাকে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ও ঠিক করা থাকে। এসব কাজের কিছু লক্ষ্য আছে স্বল্পমেয়াদি; কিছু দীর্ঘমেয়াদি।

আমরা কাজ করি এবং তাতে প্রয়োজনীয় সময় ও প্রচেষ্টা প্রয়োগ করি। পরিশেষে কিছু সুফল প্রত্যাশা করি, যার কিছু পরিমাপ করা যায়, কিছু সুফলকে গাণিতিকভাবে পরিমাপ করা যায় না। পরিমাপ করতে পারি অথবা না পারি, কাজ শেষে একটি ফল বা পরিণতি তো অবশ্যই থাকে।

এসব কাজের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে থাকে অনেক পক্ষ। তারা ব্যক্তি অথবা সংস্থা উভয়ই হতে পারে। এসব ব্যক্তি বা সংস্থা আমাদেরকে উপকরণ অথবা পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করে। অন্যরা হয়তো সাহায্য করে না, তবে অংশগ্রহণ দিয়ে একটি কাজকে সফল এবং/বা তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।  এসবই হলো একটি প্রকল্পের কিছু আনুষঙ্গিক উপাদান।

প্রকল্প ব্যবস্থাপক হিসেবে আমরা যখন এসব বিষয়কে দেখি, তখন আরও পেশাদারভাবে তা মূল্যায়ন করতে পারি এবং অধিকতর সুফল নিশ্চিত করে পারি। একটি প্রকল্পে যারা সুবিধাভোগী, তারা স্বাভাবিকভাবেই এর বাস্তবায়নে সহযোগিতা করে। কিন্তু যারা ওই প্রকল্পের কারণে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তারা কোনভাবেই ওটাতে সাহায্য দেবে না, বরং বাধাগ্রস্ত করতে চাইবে। একটি দৃষ্টান্ত দেই। গ্রামীন জনপদে একটি পায়ে-চলার রাস্তা নির্মাণ করতে গেলে, আমরা প্রথমেই জমিদাতার বিরোধীতার শিকার হয়েছিলাম।

‘প্রকল্প তত্ত্বে’ মজার বিষয়টি হলো, প্রকল্প বাস্তবায়নে যারা প্রতিপক্ষ অথবা বৈরিতা সৃষ্টি করে, তারাও প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে চিহ্নিত হয়। তাতে প্রকল্প প্রধান ওসব প্রতিপক্ষ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ইতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ পান। এভাবে প্রতিপক্ষকেও যথাযোগ্য গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্পের সুফল নিশ্চিত করা হয়।।

 

কীভাবে প্রজেক্ট বা প্রকল্পের ধারণা আমাদের দৈনন্দিন কাজগুলোকে ফলদায়ক এবং উদ্দেশ্যমুখী করে তোলে?  কীভাবে প্রকল্প তত্ত্ব দিয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত এবং পেশাগত কাজকে আরও সফল করে তুলতে পারি? আমরা দেখতে পাবো যে, কাজকে ‘প্রকল্প’ হিসেবে গ্রহণ করলে, কাজে মনসংযোগ বেড়ে যায় এবং সংশ্লিষ্ট মানুষগুলোর সাথে ভবিষ্যতমুখী সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।

প্রকল্পভিত্তিক কাজ আমাদেরকে নিম্নোক্ত সুবিধা এনে দেয়:

১)  কাজ শুরু এবং শেষ করার ‘সময়’ নির্দিষ্ট থাকে। তাতে কাজে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনিবেশ করা যায়, যেন নির্দিষ্ট দিনে কাজটি শেষ হয়। শুরু এবং শেষ করার ‘সময়’ নির্ধারণ করা থাকলে অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় নষ্ট হয় না, অথবা অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে মনযোগ যায় না। নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করার জন্য বাকি সব উপাদান উদ্দেশ্যমাফিক প্রয়োগ করা হয়। এভাবে কাজটি যখন নির্দিষ্ট মেয়াদশেষে পরিণতির দিকে যায়, তখন আমাদের মনে আসে ‘অর্জনের তৃপ্তি’, যা পরবর্তি কোন উদ্যোগে প্রেরণা দেয়।

) কাজ হয় ফলাফলমুখী। জীবনে অনেক কাজ করি, যার কোন সুষ্পষ্ট ফল নির্ধারিত থাকে না। কাজ না করলে অন্যরা অলস বলবে অথবা অসামাজিক বলবে, এজন্য হয়তো করি। কেন করছি তাও জানি না, অথবা হয়তো মজা পাচ্ছি এজন্যই করে যাচ্ছি। আমাদের জীবনে এমন অনেক কাজ আছে, যা আমাদের পূর্বপূরুষরা করছেন বলেই করে যাচ্ছি। অথচ জানি না, কেন তা করছি। প্রতিষ্ঠাতা প্রেজিডেন্টের মৃত্যুর পর তার সন্তানের মালিকানায় কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান যখন ধ্বংস অথবা অধঃপতনে যায়, তখন নিশ্চিত বলা যায় যে, উভয়েরই লক্ষ্য এবং প্রচেষ্টা এক ছিল না। কিন্তু কাজকে প্রকল্প হিসেবে নিলে, তার ফলাফল সুর্দিষ্ট থাকে।

৩) প্রচেষ্টার সাথে এর ফলাফলকে ‘সংযোগ’ করা যায়। প্রতিটি কাজের সাথে এর প্রত্যাশিত ফলাফলগুলো সংযুক্ত করা থাকে। আমরা সকলেই কাজ করছি এবং সার্বিকভাবে সুফলও কিছু আসছে। তাতে প্রতিষ্ঠানের প্রধান ভাবছেন যে, সবকিছু ঠিক আছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়শেষে দেখা যাচ্ছে যে, প্রতিষ্ঠান লাভবান হচ্ছে না, অথবা উৎপাদন খরচ কমছে না। এর কারণ হলো, কোন্ কাজের কারণে কোন্ সুফল আসছে, কোন্ কাজের ফলে কোন্ সুফল আসছে না, সেটি আলাদাভাবে বের করা যাচ্ছে না। আমাদের ‘কিছু কিছু প্রচেষ্টায়’ যখন প্রত্যাশিত সুফল আসে না, তখন বিশ্লেষণ করে দেখতে পারি কেন তাতে সুফল আসছে না, যদি প্রকল্প হিসেবে কাজটিকে গ্রহণ করি।

৪) কাজের সাথে জড়িত মানুষগুলোকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা যায়। একটি কাজ সফল করে তোলার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে আমাদের সম্পর্ক রাখতে হয়। তাদের সাথে যথাযথ সম্পর্কের ওপর নির্ভর করছে কাজের সফলতা। নির্মাণ প্রকল্প হলে, নির্মাণ সামগ্রীর (রড, সিমেন্ট, বালি, ইট ইত্যাদি) সরবরাহকারীদের সাথে যথাযথ সম্পর্ক থাকতে হয়। অন্যদিকে সম্পর্ক থাকতে হয় সেসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে, যারা নির্মাণ কাজের অনুমোদন দেয় অথবা কাজের গুণগত মান নির্ধারণ করে। প্রকল্প তত্ত্বে প্রতিটি কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম তালিকাভুক্ত থাকে, সে সাথে নির্ধারিত থাকে তাদের সাথে আন্তঃযোগাযোগের উপায়। মানুষের আচরণ কখন কেমন হয়, সেটি পূর্বেই বলা যায় না। কাজেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাথে আন্তঃযোগাযোগের বিষয়গুলো নির্ধারিত থাকলে, প্রকল্প কর্মীরা ব্যক্তিগত ভাবাবেগের ঊর্ধ্বে থেকে তাদের সাথে সঠিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে।

৫) একটি প্রকল্পে প্রতিপক্ষ বা বৈরিতা সৃষ্টিকারীকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয় না। বরং দেখা হয় সম্ভাব্য অংশীজন (potential stakeholder) হিসেবে। এসব প্রথাগত প্রতিপক্ষকে পরিকল্পিত উপায়ে মোকাবেলা করে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পকে বাস্তবায়নের দিকে নিয়ে যায় প্রকল্প কর্মীরা। নেতৃত্বে থাকেন প্রকল্প ব্যবস্থাপক। প্রতিপক্ষকে প্রকল্পের প্রভাবক হিসেবে দেখা হয়।  আবেগ বা সংবেদনশীলতা দিয়ে যাচাই করা হয় না, কিন্তু প্রকল্পের ব্যর্থতার কারণ হিসেবে তাদেরকে দেখা হয়। প্রকল্প ব্যবস্থাপকের ইতিবাচক মনোভাবের কারণে অনেক সময় সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ ‘সম্ভাব্য সহায়কে’ পরিণত হয়।

 

শুধু গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি যুক্তি তুলে ধরা হলো। তাতে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, প্রকল্প আমাদের জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে। আমাদের জীবন যেন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রকল্পেরই একটি সমষ্টি, যাকে পারিভাষিকভাবে কর্মসূচি (program) বলা চলে। হয়তো একদিন পোর্টফোলিও হিসেবেও উপস্থাপন করতে পারবো। এভাবে ক্রমান্বয়ে প্রকল্পের মৌলিক বিষয়ের কাছে এগিয়ে যাবো। তখন প্রকল্প তত্ত্বকে জীবন থেকে কর্মজীবনে প্রয়োগ করার প্রেরণা পাবো।

 

এপর্বের মূল উদ্দেশ্য ছিলো, জীবন-ঘনিষ্ট দৃষ্টান্ত দিয়ে প্রকল্পের কয়েকটি মৌলিক বৈশিষ্ট আলোচনা করা।  পরবর্তি লেখায় বাস্তবভিত্তিক ব্যাখ্যা দিয়ে ‘প্রকল্পকে’ আরও স্পষ্ট করার ইচ্ছা আছে। (১ সেপ্টেম্বর ২০১৬)

 

 

 


▶পর্ব ১: প্রকল্প ব্যবস্থাপক থেকে ‘স্বপ্ন ব্যবস্থাপক’

▶পর্ব ৩: ৯টি তত্ত্বে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা।