Tagged: politics

ম্যাকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’ থেকে: পড়ুন নিজ দায়িত্বে!

prince-cover

ম্যাকিয়াভেলি সম্পর্কে প্রথমে পড়েছিলাম ছাত্রজীবনে। পড়ে থমকে গিয়েছিলাম, **য় বলে কী! মানুষ জন্মগতভাবেই নাকি শঠ, প্রতারক আর বিশৃঙ্খল – ডাণ্ডা ছাড়া ঠাণ্ডা থাকে না। ইতিহাস নাকি শুধুই বিজয়ীদের সৃষ্টি। ধার্মিকতার চেয়ে ভাণ ধরে থাকা নাকি অধিক গুরুত্বপূর্ণ! কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছিল সেখান থেকেই। দ্য প্রিন্স-খ্যাত ম্যাকিয়াভেলিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক বলা হয় এত বিতর্কিত কথা বলার পরও। কিন্তু কোথায় পাওয়া যাবে তার সেই কালজয়ী বই, দ্য প্রিন্স? পড়তেই হবে আমাকে, দেখতে হবে আরও কী আছে তাতে।

নৈতিকতার সাথে শাসনের কর্তৃত্ব ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শাসন তিনিই করবেন যিনি নিজে সৎ। দেশ শাসন করতে গেলে নীতিবান হতে হবে, সৎ হতে হবে। প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের সাথে থাকতে হবে মিল। এটা অত্যন্ত প্রচলিত একটি বিশ্বাস যে, সততা ও নৈতিকতা দিয়েই জনসাধারণের শ্রদ্ধা ও আনুগত্য আদায় করা যায়।

ম্যাকিয়াভেলি ঠিক এবিষয়টিতেই সজোরে আঘাত করেছেন তার দ্য প্রিন্স গ্রন্থের মাধ্যমে। নিজ দেশের শাসককে দেশ চালানোর জন্য সাদামাটা কিছু প্রায়োগিক জ্ঞান দেয়াই ছিল দ্য প্রিন্স-এর মূল উদ্দেশ্য, সাহিত্যচর্চা নয়। তার মতে শাসনক্ষমতার বৈধতা কোন নৈতিকতার মাপকাঠিতে আবদ্ধ নয়; কর্তৃত্ব আর ক্ষমতাই এখানে মূল বিষয়। যার ক্ষমতা আছে সে-ই শাসন করবে, নৈতিকতা কাউকে ক্ষমতায় বসায় না। সততা ও নৈতিকতার সম্পূর্ণ বিপরীতমুখে বসে ম্যাকিয়াভেলি বলছেন যে, ক্ষমতা অর্জন আর ক্ষমতা রক্ষা করাই রাজনীতির মূল নীতি। ক্ষমতার উপযুক্ত ব্যবহার দিয়েই জনগণের আনুগত্য অর্জন করতে হয়। রাজনীতি মানেই হলো ক্ষমতা ‘গ্রহণ আর প্রয়োগের’ নীতি। শাসকের প্রতি জনগণের ভালবাসা এবং জনগণের ভয় দুটোই থাকতে হবে। যদি দুটোই না থাকে সেক্ষেত্রে ভয়টি অন্তত থাকতে হবে। দেশের আইনশৃঙ্খলা বলতে বুঝাবে উপযুক্ত সংখ্যক সৈন্য বা আইনপ্রয়োগকারীর উপস্থিতি। নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ছাড়া শাসনের অধিকারের কোনই মূল্য নেই ম্যাকিয়াভেলির কাছে।

ম্যাকিয়াভেলি তার রাজনৈতিক মতাদর্শ থেকে অধিকার এবং বৈধতার ব্যাপারগুলো সম্পূর্ণ মুছে ফেলেন। আইন এবং শক্তি তার পরিবেশনায় একাকার হয়ে যায়। তিনি বলেন, “যেহেতু উত্তম অস্ত্র ছাড়া উত্তম আইন প্রতিষ্ঠিত হয় না, তাই অস্ত্র ছাড়া অন্য কোন কিছুকেই আমি বিবেচনায় আনবো না।” ম্যাকিয়াভেলির মতে, চরম ক্ষমতাশালী শাসককে জনগণ সর্বান্তকরণে মান্য করতে বাধ্য।
ম্যাকিয়াভেলিয়ান শাসকের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য থাকে:

১) ভয় বা ভালবাসা সৃষ্টিকারী তবে ঘৃণিত হবেন না;

২) জনগণের সমর্থন থাকবে;

৩) ব্যক্তিগত গুণাবলীর প্রকাশ থাকবে;

৪) অস্ত্র অর্থাৎ শক্তির প্রয়োগ থাকবে এবং

৫) বুদ্ধিমত্তা থাকবে।

 

ব্যক্তিগত গুণের বিষয়ে একটি দামি কথা বলেছেন তিনি: গুণ থাকার চেয়ে গুণের ভাণ করা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ! বুদ্ধিমত্তারও একটি আলাদা সংজ্ঞা আছে তার কাছে: জনগণের মনে ভয় এবং ভালবাসা জাগানোর মধ্যে উত্তম ভারসাম্য রক্ষা করতে পারাই হলো বুদ্ধিমত্তা।

 

নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি, ১৪৬৯ থেকে ১৫২৭ খ্রিস্টাব্দ। পুরো নাম নিকোলো ডি বারনার্ডো ডেই ম্যাকিয়াভেলি। ইটালিয়ান ইতিহাসবিদ, কূটনৈতিক, দার্শনিক এবং রেনেসাঁ যুগের লেখক। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক এবং ফ্লোরেন্স-ভিত্তিক এক মধ্যযুগীয় কূটনীতিক। রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়েছেন আর রাজনীতি নিয়ে যারা ঘাটাঘাটি করেন, তারা হয়তো ম্যাকিয়াভেলির নাম প্রতিদিনই জপেন। নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি লিখিত গ্রন্থগুলো হলো: দ্য প্রিন্স, ফ্লোরেনটাইন হিস্টরিজ, দ্য ডিসকোর্স, দ্য আর্ট অভ ওয়ার এবং মান্দ্রাগোলা। এগুলোর মধ্যে দ্য প্রিন্স-এর জন্যই তিনি আজ আমাদের কাছে স্মরণীয় এবং উল্লেখযোগ্য। পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত আর সমালোচিত এ বইটি লেখা হয়েছিল ১৫১৪ সালে কিন্তু প্রকাশ পেয়েছিল ১৫৩২ সালে, তার মৃত্যুর পর। ডাব্লিউ কে ম্যারিয়ট কর্তৃক ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে দ্য প্রিন্স প্রকাশিত হয় ১৯০৮ সালে।

দ্য প্রিন্স লেখা হয়েছিল অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে এবং ম্যাকিয়াভেলির কর্মজীবনে পুনর্বাসনের প্রচেষ্টা হিসেবে। বিখ্যাত হবার জন্য নয়, ক্ষমতাসীন রাজা মেডিসি’র দয়াদৃষ্টি লাভের জন্য রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টিতে ভরপুর এ গ্রন্থটি লেখা হয়েছিল। মূলত ম্যাকিয়াভেলি ছিলেন মেডিসি প্রশাসনের বিপক্ষে এবং এজন্য মেডিসি’র ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পর নির্যাতনটাও সহ্য করতে হয়েছিল ম্যাকিয়াভেলিকে সেরকমই। দেওয়া হয়েছিল বাধ্যতামূলক অবসর। এ অবসরে থেকেই জন্ম নেন লেখক ম্যাকিয়াভেলি।

 

নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি’র দ্য প্রিন্স থেকে কিছু উল্লেখযোগ্য উদ্ধৃতি:

শুধুই তুলনা ও বিশ্লেষণের জন্য উদ্ধৃতিগুলো উপস্থাপন করা হলো। এর কিছু কিছু অত্যন্ত আপত্তিজনক এবং লৌমহর্ষক, তবে অধিকাংশ কথাই কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক এবং ব্যক্তি জীবনে বিবেচনার দাবী রাখে।

১) আপনার উপস্থিতি সকলেই দেখতে পায়, আপনি আসলে কেমন, তা মাত্র কয়েকজনে বুঝে।

২) যদি কাউকে আঘাত করতেই হয়, তা এমন তীব্র করা উচিত যাতে তার প্রতিশোধপরায়নতাকে আর ভয় পেতে না হয়।

৩) বিপদের মুখোমুখী না হয়ে মহৎ কিছুই অর্জিত হয় নি।

৪) *ভালবাসার কারণ না হয়ে ভয়ের কারণ হওয়াই অধিক নিরাপদ কারণ ভালবাসার সাথে দায়বদ্ধতার সম্পর্ক আছে; মানুষের সংকীর্ণতার কারণে তা সুযোগ পেলেই লঙ্ঘিত হতে পারে। কিন্তু আপনাকে ভয় পেলে শাস্তির ভয়ে তারা তা লঙ্ঘন করতে পারে না।

৫) সত্যি কথাটি বললে যে আপনি অপমানিত হবেন না, একথাটি না জানানো পর্যন্ত মানষের তোষামোদ আপনি থামাতে পারবেন না।

৬) সকল পথই বিপদজনক, তাই বিপদকে এড়িয়ে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়, বিপদকে হিসেব করে সুদৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ভুল করে উচ্চাকাঙক্ষা করুন, ভুল করে আলসেমি করবেন না। সাহসী কাজ করার জন্য শক্তি সঞ্চয় করুন, কষ্টভোগ করার জন্য শক্তির দরকার নেই।

৭) মানুষ প্রধানত দু’টি তাড়নায় পরিচালিত হয়: ভালবাসা অথবা ভয়।

৮) মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে এতই সহজ এবং তাদের তাৎক্ষণিক চাহিদা দ্বারা এতই নিয়ন্ত্রিত যে, একজন প্রতারকের জন্য ঠকাবার লোকের অভাব হয় না।

৯) সিংহ ফাঁদ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে না এবং শেয়াল পারে না নেকড়ে থেকে নিজেকে নিরাপদে রাখতে। তাই আপনাকে শেয়াল হতে হবে যাতে ফাঁদ চিনতে পারেন, আর সিংহ হতে হবে যাতে নেকড়ে তাড়াতে পারেন।

১০) *যেহেতু ভয় আর ভালবাসা একসাথে থাকতে পারে না, আমাদেরকে অবশ্যই যেকোন একটি বেছে নিতে হয়। ভালবাসার পাত্র হওয়ার চেয়ে ভয়ের পাত্র হওয়াই অধিক নিরাপদ।

১১) ফলই উপায়কে বিচার করে।

১২) যে প্রতারণা করতে চায়, সে প্রায়ই এমন কাউকে পাবে যে প্রতারিত হতে চায় ।

১৩) ইচ্ছা যদি বড় হয়, তাহলে প্রতিবন্ধকতা বড় থাকতে পারে না।

১৪) *মানুষকে হয় আদর করা উচিত, নয়তো পিষে মারা উচিত। ছোটখাটো আঘাত করতে পরিশোধ নেবার সুযোগ নেবে, কিন্তু যদি তাকে সম্পূর্ণ অচল করে দেন তাহলে তাদের আর কিছুই করার থাকে না।

১৫) মানুষ সাধারণত ছুঁয়ে নয় দেখেই বিচার করতে চায়। এর কারণ হলো, সকলেই দেখতে পারে, কিন্তু খুব কম লোকই স্পর্শ করে অনুভব করতে পারে।

১৬) এটা মনে রাখতে হবে যে, একটি নতুন পদ্ধতি পরিকল্পনা করার মতো কঠিন কিছুই হতে পারে না; একটি নতুন পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি সন্দেহজনক এবং একটি নতুন পদ্ধতিকে পরিচালনা দেবার চেয়েও কঠিন কিছু হতে পারে না। এর কারণ হলো, একজন অগ্রগামী উদ্যোক্তাকে রক্ষণশীলদের বৈরিতার মুখে পড়তে হয় যারা পুরাতন পদ্ধতির সুবিধাভোগী। নতুন পদ্ধতির সুবিধা প্রত্যাশী বা সমর্থনকারীর সম্ভাবনা বিরল।

১৭) ধারাবাহিকভাবে সফলতা পেতে চাইলে সময়ের সাথে আচরণ পরিবর্তন করতে হবে।
১৮) মানুষ কীভাবে জীবনধারণ করে আর কীভাবে করা উচিত – তাতে এতই ব্যবধান যে, কেউ যদি কী হচ্ছে সেটা নিয়ে অনুসন্ধান না করে, কী হওয়া উচিত সেটা নিয়ে অনুসন্ধান করে, তাহলে তার এই শিক্ষা তাকে রক্ষা না করে তাকে ধ্বংস করে।

১৯) যেমন খুশি তেমনই সাজো।

২০) *ধার্মিকতা দেখানোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নেই।

২১) ইতিহাস লেখা হয় বিজয়ীদের দ্বারা।

২২) বুদ্ধিমানদের উচিত মহান ব্যক্তিদের পথ অনুসরণ করা এবং তাদেরকে অনুসরণ যারা উৎকর্ষ অর্জন করেছেন। এতে তাদের মহত্বটুকু না পেলেও কোনভাবে তার কিছু অংশ পাওয়া যায়।

২৩) ভালবাসা এবং ভয় দুটিই পাওয়া উত্তম। তবে দুটিই একসাথে না পেলে মানুষের ভয় পাওয়াটাই অধিকতর ভাল।

২৪) *একজন শাসকের বুদ্ধির পরিমাপ করার প্রথম পদ্ধতিটি হলো: তাঁর চারপাশের লোকগুলোর দিকে দৃষ্টি দেওয়া।

২৫) প্রয়োজনের তাগিদ না পেলে মানুষ ভাল কাজ করে না। সুযোগ পেলে তারা যা খুশি তা-ই করে, তাতে বিশৃঙ্খলা আর বিভ্রান্তি নিয়ে আসে।

২৬) যুদ্ধ, এর আকার আর উপাদান ছাড়া একজন রাষ্ট্রনায়কের আর কোন বস্তু বা চিন্তা থাকা উচিত নয়। একজন শাসকের জন্য এটিই উপযুক্ত শিল্পকলা।

২৭) *যুদ্ধ এড়ানোর কোন সুযোগ নেই। তবে স্থগিত করা যায় এবং এর সুবিধা পাবে আপনার শত্রু।

২৮) প্রত্যেকেই ‘কী হওয়া উচিত’ বুঝার জন্য ‘কী হয়েছে’ নিয়ে অনুসন্ধান করা উচিত। পৃথিবীর সকল যুগে সংঘটিত বিষয়ের প্রাচীন নিদর্শন রয়েছে।

 

২৯) মানুষ সম্পর্কে সাধারণভাবে এটা বলা যায়: তারা অকৃতজ্ঞ, অবাধ্য, অসৎ এবং শঠ; বিপদে আতঙ্কিত এবং লাভের প্রত্যাশী। প্রেমের বাধ্যকতা এই ঘৃণ্য প্রাণীরা সুযোগ পেলেই ভেঙ্গে ফেলে, কিন্তু শাস্তির ভয় তাদেরকে শৃঙ্খলায় বেধে রাখে।

মানুষ, সমাজ এবং রাষ্ট্রনীতি নিয়ে ম্যাকিয়াভেলি’র চিন্তাচেতনা এতই প্রতিক্রিয়াশীল যে, তা পড়ার পর আমি বগিচ্যুত হবার যোগার। পরে আমাকে আবার মহাত্মা গান্ধী ও গৌতম বুদ্ধ পড়তে হয়েছিল। বিশেষত *তারকাচিহ্নিত বক্তব্যগুলোর ব্যাপারে পাঠককে সংবিধিবদ্ধ সতর্কিকরণ করছি: এগুলো অনুসরণ করলে আপনি ভয়ংকর প্রাণীতে অধঃপাতিত হবার উজ্জ্বল সম্ভাবনা আছে!

 

যা-ই হোক, আমাদের দেশের হরতাল-অবরোধে পুলিশের লাঠিচার্জে বিরোধীদল কেন ম্যাকিয়াভেলি’র নাম করে সরকারকে সমালোচনা করে, এখন বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে গেলো। ম্যাকিয়াভেলিয়ান, মধ্যযুগীয় আর লৌমহর্ষক – শব্দগুলো প্রায় একই অর্থে ব্যবহৃত হয়, কারণ ওই সময়ে প্রেম জাগানোর চেয়ে ভয় জাগানোই ছিল অধিকতর নিরাপদ। খেয়াল রাখতে হবে আমরা কিন্তু মধ্যযুগে নেই আর!

 

 


পঠনতালিকা:
Atkinson, J.B. and D. Sices (eds.), 1996, Machiavelli and His Friends: Their Personal Coorespondence, DeKalb: Northeastern Illinois University Press.
Machiavelli, N., 1965, The Chief Works and Others, A. Gilbert (trans.), 3 vols., Durham: Duke University Press.
Machiavelli, N., 1988, The Prince, Q. Skinner and R. Price (eds.), Cambridge: Cambridge University Press.

দ্য ইকোনোমিস্ট: হলুদ সাংবাদিকতা যাদের নীতি ও মাধ্যম

ECONOMIST

সংবাদ মাধ্যম হলো আধুনিক গণতন্ত্রে জনগণের অধিকার আদায়ে অন্যতম শক্তি, দ্বিতীয় সংসদ। কিন্তু চিন্তা করে দেখুন, যারা এদেশের মানুষ নয়, একটি দেশের স্বার্থের সাথে যাদের সম্পর্ক নেই, যাদের সম্পর্ক নেই সে দেশের কৃষ্টি-কালচার ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাথে — সেরকমের একটি সংবাদ মাধ্যমের কী দায় আছে সেদেশের মানুষের জন্য সত্যিকার সংবাদ প্রকাশের? গরম সংবাদ পরিবেশ করে বৈশ্বিক রাজনীতিতে ঘোলাজলের সৃষ্টি করা এবং তাতে কিছু মাছ ধরে নিতে পারলে, কী দরকার আছে একটি ভিন দেশের ইতিহাস আর স্বাধীনতার সংগ্রামকে গৌরবান্বিত করার?

বাংলাদেশের ইতিহাসে, পানি ঘোলাটে করে সবচেয়ে বেশি মাছ ধরার মোক্ষম সুযোগ হলো এখন। খবর বিক্রি করার উপযুক্ত বাজারও এখনই, কারণ এখন একটি পরাজিত পক্ষ মরিয়া হয়েছে তাদের অস্তিত্ত্ব টেকানোর জন্য, চামড়া বাঁচানোর জন্য। তারা কোন সময়ই দেশের মাটির পক্ষে ছিলো না, তারা চায় নি এদেশের স্বাধীনতা। পশ্চিমা প্রভাবশালী দেশগুলো যারা এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সুষ্পষ্টভাবে বিরোধীতা করেছে, সেসব দেশকে তারা সকল উপায়ে ক্ষেপিয়ে তুলছে এদেশের বিরুদ্ধে।

“It is often forgotten that the bloodshed in the spring was not all one-sided, and that the east Bengalis killed thousands of non-Bengalis.” (এটা প্রায়ই ভুলে যাওয়া হয় যে, মার্চের রক্তপাত কোনভাবেই একচেটিয়া ছিলো না। ভুলে যাওয়া হয় যে, বাঙালিরা হাজার হাজার অবাঙালিকে হত্যা করেছে।) দ্য ইকোনোমিস্ট, ডিসে/১৯৭১।

৩০ লাখের চেয়ে দ্য ইকোনোমিস্ট-এর কাছে হাজারের গুরুত্ব অনেক বেশি!

শুধু বর্তমান সরকার নয় বিগত যে কোন সরকারের আমলে দ্য ইকোমিস্ট-এর পরিবেশিত সংবাদগুলোতে একটু নজর দিয়ে দেখুন, তারা কাদের জন্য সংবাদ পরিবেশ করে।

গবীবের বউ সকলেরই বাউজ। বাংলাদেশের স্বার্থ ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক নিয়ে তাদের পেশাদারি বিশ্লেষণ দেখে যে কেউ বিভ্রান্ত হতে পারেন।
দেশের স্বার্বভৌমত্বের অন্যতম প্রতীক বিচারব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ ও ধ্বংস করে দেবার জন্য দ্য ইকোনোমিস্ট বর্তমানে কাজ করে যাচ্ছে। একাত্তরে দেশের মানবতা বিরোধী অপরাধের জন্য স্থাপিত আদালতের এক সম্মানীত বিচারকের ইমেল ও স্কাইপে আইডি হ্যাক করে তারা সেই বিচারপতিকে ব্লাকমেইল করছে। বিচারকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কোন মূল্য দ্য ইকোনোমিস্ট-এর কাছে নেই।

এদেশের মানুষকে সঠিক সংবাদ দেবার তাদের এতই দরকার? এদেশের প্রধান জাতীয় দৈনিক যেমন: প্রথম আলো, ইনকিলাব, ইত্তেফাক, ডেইলি স্টার, কালের কণ্ঠ প্রভৃতি পত্রিকার চেয়েও তারা এদেশের মানুষের প্রতি বেশি দরদী হয়ে পড়েছে।

এদের সংবাদ পরিবেশ করে পোস্টের আকার বৃদ্ধি করতে চাই না। দ্য ইকোমিস্ট-এর কয়েকটি শিরোনামের ভাষা দেখুন:
>বাংলাদেশ: আঁধারের চূড়ান্ত (নভে/২০১২)
>বাংলাশের বিষাক্ত রাজনীতি: হে দিল্লী কিছু করো! (মে/২০১২)
>বাংলাদেশ: এভাবে নয় (জুন/২০১০)
>বিডিআর বিদ্রোহের পর বাংলাদেশ: মন্দ নাকি উন্মত্ত? (মার্চ/২০০৯)
>বাংলাদেশ: মাইনাস টু সমাধান (সেপ/২০০৭)
>বাংলাদেশ: এক বেগমের পতন (খালেদার গ্রেপ্তারের পর) (মার্চ/২০০৭)
>বাংলাদেশের নির্বাচন ২০০১: বিন লাদেনের পক্ষে ভোট? (সেপ/২০০১)

অধিকাংশ সংবাদে কোন পাঠক মন্তব্য পাওয়া যায় নি।

সাংবাদিকেরা অবশ্যই সংবাদের পেছনে থাকবেন। তারা খবরের পেছনের খবরকে বের করে নিয়ে আসবেন পাঠকের জন্য। ঘটনার রহস্য উন্মোচন করে তারা পাঠককের সামনে সত্যিকার চিত্রটি তুলে ধরবেন। কিন্তু এর মানে তো এই নয় যে, তারা প্রতিনিয়ত একটি দেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, যোদ্ধাপরাধের বিচার – এসব বিষয় নিয়ে দায়িত্বহীন সংবাদ পরিবেশ করে যাবে! দেশের আইনের বাইরে থাকার সুযোগ নিয়ে তারা যাচ্ছে-তাই মতামত দিয়ে যাচ্ছে। বিভেদ সৃষ্টি করছে ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের।

দ্য ইকোনোমিস্ট আজকাল দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে মিঠা মিঠা কথা বলছে, তা কেবল বৃহত্তর সংবাদমাধ্যমগুলোর মতের সাথে সুর মেলানোর জন্য; এবং তাদের অন্যান্য ধ্বংসাত্মক সংবাদগুলো আমাদেরকে খাওয়ানোর জন্য। তারা কখনো এদেশের পক্ষে কথা বলে নি।

দেশের অবস্থান জানার জন্য দেশী সংবাদ মাধ্যমকে আমরা যদি বিশ্বাস না-ই করি, তবে ইকোনোমিস্ট ছাড়াও আরও বিদেশী মাধ্যম আছে, যাদের সততা শত বছর ধরে পরীক্ষীত। তাদের বিশ্লেষণে দৃষ্টি দিলে দ্য ইকোনোমিস্টকে বুঝা যায়। শুধু আওয়ামিলীগ নয়, বিগত যেকোন সরকারের সময়ের ইকোনোমিস্ট দেখুন। তারা সংবাদ বিক্রি করার জন্য সংবাদ লেখে। দেশের মানুষের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা, রাজনৈতিক মেরুকরণ জাগিয়ে রাখা, বিদেশ-নির্ভরতা বাড়িয়ে তোলা, দেশের রাজনীতিতে পাশ্চাত্য নেতৃত্বের স্থায়িকরণ আর হলুদ সাংবাদিকতা তাদের ব্যবসায়ের নীতি ও মাধ্যম।