Tagged: dream manager

প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ৫টি প্রক্রিয়া। পর্ব ৪

banner-crop

প্রকল্প ব্যবস্থাপক থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক, পর্ব ৪। আলোচ্য বিষয়, প্রকল্প ব্যবস্থাপনার পাঁচটি প্রক্রিয়া নিয়ে সহজ কিছু কথা। উন্নয়ন প্রকল্পে ‘বেইসলাইন’ বলে একটি বিষয় থাকে। বেইসলাইন হলো যেখান থেকে প্রকল্পের অগ্রগতি হিসেব করা যায়। পর্বতারোহীরা একেকটি ‘বেইস’ অতিক্রম করে পর্বতশৃঙ্গের দিকে এগিয়ে যায়।  একেকটি ‘বেইস’ থেকে পরিমাপ করা যায় কতটুকু উচ্চতায় আরোহীরা ওঠতে পেরেছে।  অতএব বেইসলাইনকে ‘প্রকল্প শুরুর পূর্বের  অবস্থা’ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। বেইসলাইন সঠিক এবং গ্রহণযোগ্য হতে হয়, কারণ এর ওপর ভিত্তি করে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা বিবেচিত হয়। এটি প্রকল্পের প্রাথমিক পরিধি নির্ণয় করার জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রকল্পের সফলতা প্রমাণ করার জন্যও অত্যাবশ্যক। কিন্তু বেইসলাইনের পাশাপাশি একটি প্রকল্পে কী কী কাজ কীভাবে করতে হয়, সেসম্পর্কে পরিচ্ছন্ন দিকনির্দেশনা না থাকলে, শুদ্ধ বেইসলাইন থাকলেও প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে না। এপর্বে প্রকল্পের বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এবং উন্নয়ন প্রকল্পের কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা হবে।

প্রকল্পের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করতে হলে এবিষয়গুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি:

  • প্রকল্পের শুরু কোথা থেকে হয়? কোন্ অবস্থায় গেলে বলা যায়, প্রকল্পটি শুরু হলো?
  • প্রকল্পের শেষ কোথায়? কোন্ অবস্থানে পৌঁছালে বলা যায়, প্রকল্পটি শেষ হলো?
  • উন্নয়ন প্রকল্পে কী কী বিষয় থাকতে হয়?
  • সাধারণত প্রকল্পে কী কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়?

 

 

▶ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কর্তৃক গৃহীত প্রকল্পের সংজ্ঞা ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা চক্র

ইউরোপিয়ান কমিশন (ইইউ’র উদ্যোগ) উন্নয়ন প্রকল্পের সংখ্যা দিয়েছে এভাবে: প্রকল্প হলো কতগুলো ধারাবাহিক কর্মকাণ্ডের সমষ্টি যার উদ্দেশ্য হলো নির্দিষ্ট মেয়াদে এবং নির্দিষ্ট খরচে কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের বাস্তবায়ন।

তাদের মতে প্রকল্পের থাকতে হবে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য:

>সুনির্দিষ্ট অংশীজন/স্টেইকহোল্ডার, বা প্রকল্পের সাথে জড়িত বিভিন্ন পক্ষসমূহ। তারা প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রত্যক্ষ/পরোক্ষভাবে এবং ইতিবাচক/নেতিবাচকভাবে প্রভাব বিস্তার করে।

কাজের সমন্বয়, কাজের ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক বিষয়াদির সুস্পষ্ট বর্ণনা।

>একটি তত্ত্বাবধান এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে প্রকল্পের অগ্রগতি নিশ্চিত হবে।

>আর্থিক এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ, যাতে মনে হবে যে আর্থিক খরচের চেয়েও প্রকল্পের উপকারিতা অধিক।

 

pcm_ec1

ইউরোপিয়ান কমিশন প্রকল্প ব্যবস্থাপনার জন্য ‘প্রকল্প ব্যবস্থাপনা চক্র’ নামে কিছু পারম্পরিক কার্যাবলীকে তুলে ধরেছে, যা উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য আদর্শ। এই চক্র মানে হলো ‘একটির পর আরেকটি’ কাজের বিন্যাস। একটির ‘আগে’ আরেকটি করা চলবে না।

১.  কর্মসূচি/প্রোগ্রাম:  কোন দেশের উন্নয়নের জন্য ইউরোপিয়ান কমিশনের কৌশলগত অবস্থান। এপর্বে পৃষ্ঠপোষক/দাতা কোন্ দিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সেটি বাস্তবায়নের নিরীখে বিবেচিত হয়। কর্মসূচি হলো প্রকল্পের বৃহৎ রূপ।

২.  প্রকল্প চিহ্নিতকরণ: প্রকল্প গ্রহণের উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত করে নির্দিষ্ট উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

৩.  প্রকল্প পরিকল্পনা:  কাজ ও আর্থিক বিষয়গুলো উদ্দেশ্যের সাথে সমন্বয় রেখে বিস্তারিতভাবে লেখা হয়। এপর্যায়ে আর্থিক সহযোগিতা নিশ্চিত হয়।

৪.  বাস্তবায়ন:  উদ্দেশ্যের সাথে সমন্বয় রেখে প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের বাস্তবায়ন ও তত্ত্বাবধান করা হয়।

৫.  মূল্যায়ন:  প্রকল্পের অর্জনকে নির্দিষ্ট মাপকাঠিতে পরিমাপ করা হয় এবং অর্জিত অভিজ্ঞতা নথিভুক্ত করা হয়।

 

▶ ব্যবস্থাপনা চক্র এবং ব্যবস্থাপনা ‘প্রক্রিয়া’ এক নয়

ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রকল্প ব্যবস্থাপনা চক্রে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের স্তর বিন্যাস করা হয়েছে। তাদের প্রকল্প ব্যবস্থাপনা চক্রে প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অত্যাবশ্যক বিষয়গুলো ওঠে এসেছে।  তাতে ‘প্রকল্প ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়াগুলো’ আলোচনা সহজ হবে।

একটি প্রকল্প শুরু হয় সুনির্দিষ্ট কিছু উদ্দেশ্য ও সীমিত মেয়াদ নিয়ে। এর সাথে থাকে সুনির্দিষ্ট কিছু পক্ষ। প্রকল্পের কার্যাবলীতে অপ্রাসঙ্গিক কোন বিষয় বা কাজ থাকা মানেই হলো, প্রাসঙ্গিক এবং দরকারি কাজের অনুপস্থিতি। অনির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার মানেই হলো, সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে সময় দিতে না পারা। প্রকল্পকে সফল সমাপ্তির দিকে পরিচালনা দিতে হলে দরকার কিছু সুনির্দিষ্ট দক্ষতা, জ্ঞান ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা। পেশাদারী রীতিতে প্রকল্পের কর্মকাণ্ডকে পরিচালনা দিয়ে একে বাস্তবায়ন করে সমাপ্তির দিকে নিয়ে আসার জন্য প্রয়োজন কিছু সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া। এই লেখায় সেই সার্বজনীন প্রক্রিয়াগুলোকে পরিচিত করানো হবে।

 

▶ প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ৫টি প্রক্রিয়া

একটি প্রকল্পের চিন্তা সংশ্লিষ্টদের মাথায় আসার সাথে সাথেই বলা যায়, প্রকল্পের ‘আরম্ভের শুরু’। তাই ‘আরম্ভকে’ প্রকল্প পরিকল্পনায় একটি পর্যায় বা প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এপর্যায়ে যত তথ্য-উপাত্ত সংগৃহীত হবে, এসবই প্রকল্পের ‘পরিকল্পনার’ জন্য আবশ্যক।  ফলে ‘পরিকল্পনাকে’ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরিকল্পনার পর স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে ‘বাস্তবায়নের’ কথা। বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সাথে ‘তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ’ ওতপ্রোতভাবে জড়িত।  সঠিকভাবে তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ করার ফলশ্রুতিতে আসে একটি প্রকল্পের সফল ‘সমাপ্তি’।

সাধারণভাবে ৫টি প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা সীমাবদ্ধ: ১) আরম্ভ ২) পরিকল্পনা্ ৩) বাস্তবায়ন ৪) তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ এবং ৫) সমাপ্তি। একটি প্রকল্পকে আরম্ভ থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত নিয়ে যাবার পথে প্রক্রিয়াগুলো ‘পাশাপাশি’ কাজ করে।

পাঁচটি প্রক্রিয়া স্বাধীন, অর্থাৎ প্রকল্পের সফলতার জন্য আলাদভাবে প্রতিটি প্রক্রিয়ার সমাপ্তি হওয়া প্রয়োজন। তবে স্বাধীন হলেও প্রক্রিয়াগুলো পৌনপুনিক এবং পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। একটি আরেকটির সাথে জড়িত। আরম্ভ না হলে পরিকল্পনা বা বাস্তবায়নের চিন্তা করা যায় না। তেমনিভাবে তত্ত্বাবধান না করলে প্রকল্পের কাজগুলো সঠিকভাবে নির্ধারিত সময়ে শেষ হবে না। ফলে প্রকল্পটি ‘সমাপ্তির’ দিকে যেতে পারবে না।

‘পৌনপুনিক’ বলতে বুঝানো হচ্ছে যে, একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে ‘আরম্ভ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন তত্ত্বাবধান এবং সমাপ্তি’ থাকতে হয়। নতুবা কাজগুলো প্রকল্পের শর্ত পূরণ করে শেষ হতে পারবে না। যেমন: পরিকল্পনার সাথে বাস্তবায়ন এবং বাস্তবায়নের পরিকল্পনার বিষয়গুলো পৌনপুনিক। বাস্তবায়ন করতে গিয়ে পরিস্থিতি বিবেচনায় কোন পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করতে চাইলে, পরিকল্পনায় সংশোধন আনতে হবে। তবে এসব পরিবর্তনের জন্য সুনির্দিষ্ট যুক্তি এবং প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। কারও খামখেয়ালিমতো কোন প্রতিষ্ঠিত পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা যায় না।

 

processgroup-best

 

১) আরম্ভ:

  • প্রকল্পের প্রাথমিক পরিধি/সীমানা/কার্যাবলী নির্ধারণ
  • আর্থিক উৎস নির্ধারণ
  • প্রকল্পের পৃষ্ঠপোষক ও কর্মীসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনকে চিহ্নিতকরণ
  • তথ্য সংগ্রহ

 

২) পরিকল্পনা:

  • প্রকল্পের লক্ষ্য কাজ ও খরচের সীমানা নির্ধারণ
  • পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্টানের সাথে কৌশল ও পদ্ধতিগত সম্পর্ক সুস্পষ্ট করা
  • পরিকল্পনা বিষয়ক কাগজপত্র: যেমন, প্রকল্প প্রস্তাবনা বা প্রকল্প ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা

 

৩) বাস্তবায়ন:

  • কর্মী ও উপকরণের ব্যবস্থাপনা
  • পৃষ্ঠপোষক ও সংশ্লিষ্ঠ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশা মোতাবেক কাজের অগ্রগতি
  • পরিকল্পনা মোতাবেক কাজের বাস্তবায়ন ও সম্ভাব্য সমন্বয় সাধন

 

৪) তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ:

  • পরিকল্পনার সাথে অগ্রগতির তদারকি
  • বর্তমান সমস্যার সমাধান এবং ভবিষ্যত প্রতিবন্ধকতার পূর্বাভাস প্রদান
  • সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর (প্রকল্পের মালিক, দাতা, সুবিধাভোগী, ক্রেতা) মধ্যে সমন্বয় সাধন

 

৫) সমাপ্তি:

  • কাজ ও চুক্তির সমাপ্তি নিশ্চিতকরণ
  • কাজের মূল্যায়ন ও অনুমোদন: শেষ না হলেও ‘শেষ’ বলে বিবেচনা করতে হতে পারে
  • তথ্য ও ফলাফল (প্রতিবেদন, অভিজ্ঞতার বিবরণ) সংগ্রহ করা
  • সমাপনী আনুষ্ঠানিকতাগুলো পরিকল্পনামতো শেষ করা

 

প্রকল্পের পাঁচটি অত্যাবশ্যক প্রক্রিয়া সম্পর্কে ‘প্রাথমিক ধারণা’ দেবার জন্য যথাসাধ্য সংক্ষেপ করা হলো। প্রাসঙ্গিক আলোচনার সময় আরও দৃষ্টান্ত এবং বিস্তৃত আলোচনা করা হবে।

 


Sources consulted:

1. European Commission, EuropeAid Cooperation Office (2004) Aid Delivery Delivery Methods: Project Cycle Management Guidelines. Brussels, Belgium.

2. Institute, P.M. and Project, M.I. (2013) A guide to the project management body of knowledge (PMBOK guide). Fifth Edition. United States: Project Management Institute.

প্রকল্প সম্পর্কে ৯টি ধারণা এবং কিছু সহজ দৃষ্টান্ত। পর্ব ৩

 

Capture3

 

প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক, পর্ব ৩। এবারের বিষয় প্রকল্পের ধারণা। প্রকল্প সম্পর্কে একদমই ধারণা নেই, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু ভাষা বদলের পাশাপাশি প্রকল্পের ধারণাও বিস্তৃতি পেয়েছে। এখন আর প্রজেক্ট কোন নির্দিষ্ট কাজের সাথে আবদ্ধ নেই। প্রকল্প একটি সার্বজনীন ধারণায় রূপ নিয়েছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এখন যেকোন কাজের সাথে যুক্ত করা যায়। তবু কিছু মৌলিক বিষয় প্রায় একই আছে। একটি বিষয় এখনও বদলায় নি, তা হলো, প্রকল্পে থাকতে হবে সুর্নিদিষ্ট উদ্দেশ্য। একটি প্রকল্পে এক বা একাধিক উদ্দেশ্য থাকবে, যা নির্দিষ্ট সময়ে অর্জিত হবে।

প্রকল্প সম্পর্কে লেখালেখি শুরু করার প্রথম উদ্দেশ্য ছিলো, বাংলা ভাষায় প্রকল্পের জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা, যেন প্রজেক্ট-এর মৌলিক ধারণাগুলো পাঠকের মস্তিষ্ক এবং মননে স্পর্শ করতে পারে। এপর্বে উদাহরণসহ প্রকল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচিত হলো।

 

▶ প্রকল্প সম্পর্কে ৯টি টুকরো ধারণা

১)  প্রকল্প একটি ‘সাময়িক উদ্যোগ’ যার উদ্দেশ্য হলো: একটি নির্দিষ্ট পণ্য, সেবা অথবা ফলাফল সৃষ্টি করা। এই অস্থায়ি স্বভাবের কারণেই প্রকল্পের নির্দিষ্ট শুরু এবং শেষ আছে।

২)  সাময়িক/ অস্থায়ি মানে এই নয় যে, প্রকল্পটি স্বল্পমেয়াদি। স্বল্পমেয়াদি বা দীর্ঘমেয়াদি যেকোন একটি হতে পারে। মূল বিষয়টি হলো, এটি চিরকালীন বা অনির্দিষ্ট নয়। এবং এর কর্মকাণ্ড ও মেয়াদ সুনির্দিষ্ট। প্রতিষ্ঠান এবং ‘কর্মসূচির’ সাথে তুলনা করলেই এর পার্থক্য স্পষ্ট দেখা যায়।

৩) প্রকল্পকে বলা যায় একটি সিঁড়ি বা পথপরিক্রমা, যার মাধ্যমে আমরা একটি উচ্চতায় পৌঁছাই। ‘গন্তব্যে যাওয়াকে’ মনে করি প্রকল্পের উদ্দীষ্ট ফল। এই গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত যত প্রচেষ্টা বা আয়োজন, সেটির নাম হতে পারে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা। যিনি সেটি পরিচালনা করেন, তিনি হতে পারেন প্রকল্প ব্যবস্থাপক। করপোরেট পর্যায়ে একটি প্রোডাক্ট বা পণ্যের পরিকল্পনা, বাজার গবেষণা, পণ্যের উৎপাদন এবং বিস্তৃত বাজারে সেটি পৌঁছানো পর্যন্ত কর্মকাণ্ডকে প্রজেক্ট হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে।

৪)  কয়েকটি ‘অবধারিত কারণে’ প্রকল্পের পরিসমাপ্তি ঘটে। যেমন: ক. প্রকল্পের উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হলে; খ. প্রকল্পের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন সম্ভব না হলে; গ. পরিস্থিতির কারণে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পেলে/ না থাকলে; অথবা ঘ. প্রকল্পের মালিক বা পৃষ্ঠপোষক সেটি আর চালাতে না চাইলে।

৫) প্রকল্প সাময়িক, কিন্তু এর ফলাফল সাময়িক নয়।  একটি ‘প্রকল্পের পরিণতি’ যুগ যুগ ধরে প্রজন্মান্তরে টিকে থাকতে পারে। যেমন: সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ অথবা যমুনার নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু। ক্যানসার নিরাময়ের কারণ অনুসন্ধানের সাথে জড়িত ‘বিশেষায়িত গবেষণাকে’ একটি প্রকল্প বিবেচনা করলে, বুঝতে পারা যায় প্রকল্পের ফল কত ব্যাপক। অতএব, প্রকল্পের ফল মূর্ত এবং বিমূর্ত (বস্তুগত এবং ধারণাগত) উভয়ই হতে পারে।

৬) ‘অনন্যতা’ বা তুলনাহীনতাকে প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করা যায়। একটি প্রকল্পের উদ্দেশ্য বা ফলাফল অন্যটির সাথে মিল থাকতে পারে না। তাহলে সেটি প্রকল্প নয়, কর্মসূচি। কর্মসূচি হলো প্রতিষ্ঠানের চলমান এবং পৌনপৌনিক কাজ। কিন্তু প্রকল্পের থাকে নিজস্ব কিছু উদ্দেশ্য, কলাকৌশল এবং সুবিধাভোগী। একই ডিজাইনের বিল্ডিং হলেও, ভৌগলিক অবস্থান এবং বিভিন্ন ক্রেতার কারণে একেকটি বিল্ডিং নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অনন্য।

৭)  প্রজেক্ট দৈনন্দিন কার্যক্রম (অপারেশনস) থেকে আলাদা। প্রজেক্ট সাময়িক, কিন্তু অপারেশনস চলমান। প্রজেক্ট নির্দিষ্ট মেয়াদে শেষ হয়ে যায়, অপারেশনস পৌনপুনিক। উদ্দেশ্য, কাজ এবং কৌশলের দিক দিয়ে প্রাত্যাহিক কাজের সাথে প্রজেক্টকে মেলানো যায় না।  কিছু বিশেষ উদ্দেশ্য, সমস্যা বা ফলাফলকে লক্ষ্য করে প্রকল্প ‘বাস্তবায়িত’ হয়।  প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য কার্যক্রম ‘পরিচালিত’ হয়। নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এবং অংশীজনকে (stakeholder) কেন্দ্র করে প্রকল্প পরিকল্পিত হয় বলে এর বাস্তবায়নের জন্য বিশেষায়িত জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কাজের লক্ষ্য হলো ‘কাজটি সঠিকভাবে করা বা চালিয়ে যাওয়া’, কিন্তু প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো দ্বিমুখী, ‘কাজটি সঠিকভাবে শুরু করা’: সঠিক এবং শুরু। প্রকল্প ও কার্যক্রমে (অপরাশেনস) সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ভূমিকাগুলো আলাদাভাবে বিবেচনা করলে এসব পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

৮)  প্রকল্পকে আরও বুঝতে পারার জন্য কয়েকটি সহজ দৃষ্টান্ত হতে পারে এরকম: ক. কোন একটি পণ্যের উদ্ভাবন করা, যা হতে পারে সম্পূর্ণ নতুন অথবা পূর্বের কোন পণ্যের বর্ধিত রূপ; খ. প্রতিষ্ঠানের পণ্য উৎপাদন/বিপণনে নতুন সক্ষমতা সৃষ্টিকারী কোন পদ্ধতি বা প্রক্রিয়ার উদ্ভাবন; গ. বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজনের সমন্বয়ে একটি সফল সম্মেলনের আয়োজন করা; ঘ. একটি নির্দিষ্ট এলাকার অধিবাসীদের সামাজিক, আর্থিক, আচরণগত বা স্বাস্থ্যগত সমস্যার সমাধানে বিশেষ সুফল দেখাতে পারা; ঙ. একটি নির্দিষ্ট এলাকায় শতকরা হিসেবে সাক্ষরতার হার বাড়াতে পারা; চ. প্রতিষ্ঠানের চলমান কার্যক্রমে নতুন একটি কৌশলের উদ্ভাবন এবং/বা সফল প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারা; ছ. একটি সফল গবেষণা সম্পন্ন করতে পারা যা থেকে পরীক্ষীত ফলাফল/প্রমাণাদি পরিবর্তিতে ব্যবহার করা যায় ইত্যাদি।

৯) গান্ট চার্টের (বিশেষ প্রকার মূল্যায়ন ছক) প্রণেতা হেনরি লরেন্স গান্টকে (১৮৬১-১৯১৯) প্রকল্প ব্যবস্থাপনার জনক বলা হয়। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন যান্ত্রিক প্রকৌশলী ছিলেন। প্রকল্প পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং নিয়ন্ত্রণের কিছু জনপ্রিয় কৌশল আবিষ্কার করেন মিস্টার গান্ট। উনবিংশ শতাব্দির প্রথম দশকে তিনি গান্ট চার্টের প্রবর্তন করে ব্যবস্থাপনার কাজকে সকলের জন্য সহজতর করে দেন। তবে এউদ্দেশ্যে প্রথম চার্টটি আবিষ্কৃত হয় ১৮৯০ সালে পোলিশ প্রকৌশলী ও অর্থনীতিবিদ ক্যারল অ্যাডামেকি’র মাধ্যমে। বর্তমানে আমরা অনেক অগ্রসর সময়ে বাস করছি এবং আরও ব্যাপক গবেষণার ফল হিসেবে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় এসেছে আমূল পরিবর্তন।

 

প্রকল্প পরিকল্পনার সহজ কিছু ধাপ/পর্যায়

  • সমস্যা চিহ্নিতকরণ অথবা প্রকল্প হিসেবে নেবার প্রয়োজন আছে কিনা যাচাই করা।
  • সম্ভাব্য সমাধানের উপায় নির্ধারণ করা, যা পরবর্তিতে আরও সুষ্পষ্ট হবে।
  • প্রত্যাশিত সুফল বা গন্তব্য নির্ধারণ করা।
  • কী কী প্রচেষ্টা/উপকরণ দিতে হবে সেটি স্পষ্ট করা।
  • কোন্ কোন্ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে কী প্রকার যোগাযোগ করতে হবে সেটি নির্ধারণ করা।
  • কাজকে সামর্থ্য মোতাবেক ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করে নেওয়া।
  • সম্ভাব্য বিপদ/ প্রতিবন্ধকতা/ ব্যর্থতাগুলো চিহ্নিত করা।
  • সময়ছক নির্ধারণ করা: কোন্ সময়ান্তে কোন্ কাজটি শেষ হবে সেটি নির্ধারণ করা।
  • সময়ছক অনুসারে প্রজেক্ট বাস্তবায়নে মনোনিবেশ করা: শেষ না হওয়া পর্যন্ত একটি কাজে মনযোগ ধরে রাখা।
  • সম্পন্ন কাজগুলো ভালোভাবে চিহ্নিত করে রাখা এবং সেটি সবসময় দৃষ্টির সামনে রাখা।
  • দিন/সপ্তাহ/মাস শেষে সম্পন্নকৃত কাজের অবস্থা/অগ্রগতি/ফলাফল দেখা।
  • লক্ষ্যে পৌঁছাবার স্বার্থে সম্ভব হলে প্রক্রিয়া/পদ্ধতি/সময়ছককে পরিবর্তন/শিথিল/সহজ করা।
  • প্রয়োজনে কর্মপরিকল্পনায় পরিবর্তন/সংশোধন আনা।
একটি আউটলাইন: পরিকল্পনার কাজটি সহজ শর্তে শুরু হওয়া উচিত

>একটি আউটলাইন: পরিকল্পনার কাজটি সহজ শর্তে শুরু হওয়া উচিত

 

▶ যেসব কারণে প্রকল্প আমাদের জীবনকে সহজ করে দেয়

  • প্রকল্প মানে হলো, কোন কাজে বিশেষভাবে মনোনিবেশ করার সুযোগ সৃষ্টি।
  • প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করা হলে, কাজকে যুক্তিসঙ্গতভাবে (ভালোমন্দ পক্ষপাতহীনভাবে বিবেচনা করা যায়) পরিকল্পনা করা যায়।
  • প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করা হলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে তাৎপর্যপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।
  • ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং পেশাগত কাজগুলো গঠনমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ হয়।
  • যে কাজটি জটিল এবং সময়সাপেক্ষ, সেটিকে প্রকল্প হিসেবে নিতে পারি।
  • একটি ক্ষুদ্র প্রকল্প সম্পন্ন করতে পারলে নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।
  • একটি নতুন ভাষা/দক্ষতা শেখার কাজকে প্রকল্প হিসেবে নিতে পারি।
  • বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি/ সরকারি চাকরির জন্য প্রস্তুতির কাজকে প্রজেক্ট হিসেবে নিতে পারি।
  • নিজের দেহের অস্বাভাবিক ওজন/অসুস্থতাকে ধারাবাহিক উপায়ে কমাবার জন্য প্রকল্প হিসেবে নিতে পারি।

 

>পরবর্তি পর্ব

▶ পর্ব ২:  যে ৫টি কারণে দৈনন্দিন জীবনে প্রকল্প আমাদেরকে উপকৃত করে

▶ পর্ব ১:  প্রকল্প ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক: কেন এবং কীভাবে


Sources consulted:

1. Profile of Henry Gantt & the history of the Gantt chart (2012) Available at: https://www.siliconbeachtraining.co.uk/blog/profile-of-henry-gantt-history-of-gantt-chart (Accessed: 2 September 2016).

2. History.com (no date) Karol Adamiecki 1896. Available at: http://projectmanagementhistory.com/The_Harmonogram.html (Accessed: 2 September 2016).

3. Gantt (2016) What is a Gantt chart? Gantt chart information, history and software. Available at: http://www.gantt.com/ (Accessed: 2 September 2016).

4. Institute, P.M. and Project, M.I. (2013) A guide to the project management body of knowledge (PMBOK guide). Fifth Edition. United States: Project Management Institute.