Tagged: Brexit

যেসব কারণে ব্রিটেন ইইউ ছেড়ে বিশাল ভুল করেছে…

[courtesy: henry4school.fr]

 

তেতাল্লিশ বছরের উত্তেজনার পর ব্রিটেন এবার আত্মহত্যা করলো! ডেবিড ক্যামেরোনকে সন্তানহারা পিতার মতো বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। প্রতি বছর অক্সফোর্ড ডিকশনারি নতুন আবিষ্কৃত শব্দ তালিকা দেখিয়ে অহংকার করে, কিন্তু আমার দৃষ্টিতে Brexit হবে নিকৃষ্টতম ইংরেজি শব্দ। অবশেষে ব্রেক্সিটকে শব্দ হিসেবে অক্সফোর্ড গ্রহণ করে কিনা, জানি না। এখন তো তাদের প্রিন্টেড অভিধানও নেই!  ব’ হলো সকল ‘বদ’ এর শুরু, বি’তে ব্যাড এবং বি’তে ব্রেক্সিট, যার আরেক অর্থ আত্মহত্যা। কোনটি বেশি খারাপ, বাংলা বদ, নাকি ইংরেজি ব্যাড? আচ্ছা বদ থেকে ব্যাড এসেছে, নাকি ব্যাড থেকে বদের উৎপত্তি? তার আগে একটি গল্প বলে নেই।

 

ধনী বাবার আদুরে ছেলে। বসে বসে খায় আর খেলে খেলে পেটের ভাত হজম করে। বড় ভাই কাবুল কঠোর পরিশ্রম করে বাবার সম্পদকে বৃদ্ধি করে চলেছে। কিন্তু ছোট ভাই আবুল ‍শুধুই দিবাস্বপ্ন দেখে আর মাসে মাসে বান্ধবী বদলায়। দিবাস্বপ্নটি হলো, একদিন সে তার বাবার সম্পত্তির মালিক হবে। অন্তত অর্ধেক সম্পত্তির মালিক তো সে হবেই, কারণ মাত্রই দু’ভাই।  অতএব তার আর কাজ করার কী দরকার!

সে কোন কাজ করে না, করার প্রয়োজনও পড়ে না। ছোট সন্তান হিসেবে সকলেই তাকে স্নেহের দৃষ্টিতে দেখে। তাকে পরিবারের সদস্য হিসেবে মনে করলেও তার শ্রম বা কাজ নিয়ে কেউ ভাবে না। বড় ভাই, প্রতিবেশি, মা, আত্মিয়স্বজন সকলেই এটি মেনে নিয়েছে।  ফলে পারিবারিক আয়বৃদ্ধিতে ছোট ছেলের অবদান নিয়ে কেউ ভাবে না। অথচ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সে-ই সকলের আগে। কেনই বা হবে না, সে তো ছোট সন্তান! তার একটু বাড়তি অধিকার তো থাকতেই পারে! তাছাড়া এত সম্পত্তি কে ভোগ করবে?  তার কি সেখানে ভাগ নেই?  অন্তত অর্ধেক?

কিন্তু তার আর তর সইছে না। হইহুল্লা আড্ডাবাজি করার জন্য দরকার যখনতখন যেকোন পরিমাণ টাকাপয়সা। বান্ধবির সাথে সময় কাটাতেওতো টাকার দরকার। ওদিকে বাবা তো চাইলেই টাকা দিচ্ছে না! এই বুড়োটা কবে মরবে? এই সম্পদ কি তারই নয়? অন্তত অর্ধেক?

বাবা তো তাড়াতাড়ি মরবে বলে মনে হচ্ছে না। বরং কামকাজ করে ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠছে! তবে কী করা? সবাই তাকে পছন্দ করে, বাবা কেন তাকে পছন্দ করে না? কেন শুধু নিজের পায়ে দাঁড়াতে বলে?  বাবা তার বড় সন্তানের সাথে সবসময় হাসিমুখে কথা বলে, অথচ তাকে দেখলেই সব হাসি থেমে যায়। সমাজের সবাই তার বড়ভাইয়ের প্রশংসা করে। বাবাকে সকলে ডাকে ‘কাবুলের বাবা’। কিন্তু বাবা তো আবুলেরও বাবা! এভাবে  বড়ভাইয়ের গুণের কাছে আবুল যেন দিন দিন ছোট হতে হতে মিশে যাচ্ছে। এরকম অস্তিত্বহীনতায় সে আর থাকতে চায় না।

এনিয়ে দীর্ঘ ২৩ বছর সে ভেবেছে এবং অপেক্ষা করেছে।  এখন সে প্রাপ্ত বয়স্ক। আর কত? এবার বাবার সাথে একটা এসপার-ওসপার করা দরকার। অনেক চিন্তা করে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এক্সিট! সে পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যাবে। নাহ্ আর নয়!  বাড়ি থেকে বের হয়ে সে নিজের পায়ে দাঁড়াবে। স্বাধীন হয়ে গেলে সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। জীবনকে সে উপভোগ করতে চায়। তার কিসের এতো চিন্তা?  বাবার সম্পদ আছে না? অন্তত অর্ধেক?

ছোট ছেলে আবুলের ‘এক্সিট’ প্রস্তাবে বাবা স্তম্ভিত এবং ব্যথিত! প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করার মতো উপযুক্ত কোন কথা বাবা খুঁজে পেলেন না। সন্তানদের নিয়ে তার সব স্বপ্ন ভেঙ্গে চুড়মার! তিনি শুধু বললেন, আগামি এক সপ্তাহ সময় দিলাম তোমাকে। এক সপ্তাহ পর রাতের খাবারে যখন সকলে উপস্থিত থাকে, তখন তোমার মনের কথা সকলের সামনে প্রকাশ করবে।

একটি সপ্তাহ আবুলের জন্য দীর্ঘ সময়। তবু সে খুশি মনেই মেনে নিলো। কারণ সে ভেবেছিলো, তার বাবা সাথে সাথে প্রত্যাখ্যান করবে অথবা খালি হাতেই বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে।

এক সপ্তাহ পর আবুল রাতের খাবারের জন্য অপেক্ষা করলো।  সকলের উপস্থিতিতে সে জানিয়ে দিলো যে, সে আর পরিবারের সাথে থাকতে চায় না। প্রাপ্ত বয়স্ক হয়েছে এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার তার আছে। বাবা একদিন পরিবারের সকলের উপস্থিতিতে ছোট সন্তানকে তার সম্পদের ভাগ বুঝিয়ে দিলেন। ছোট সন্তান সব বিক্রি করে দিয়ে বাড়িছাড়া হয়ে গেলো।

দূরদেশে চলে গেলো আবুল, যেখানে পরিবার বা আত্মীনস্বজনদের কেউ তাকে পাবে না। বাবার সম্পদের টাকা পেয়ে আবুল ধনী হলেও, তার স্বভাবের পরিবর্তন হলো না। ফলে কিছুদিন হিসেব করে চলার পর পূর্বের উড়নচণ্ডে জীবনে ফিরে গেলো এবং কয়েক মাসের মধ্যে সব টাকা খরচ করে ফেললো। তৃতীয় মাসের এক ভোর সকালে আবুল তার বাবাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে ক্ষমা চেয়ে বললো, সন্তান হিসেবে নয়, বাড়ির চাকর হিসেবে বাবা যেন তাকে একটি কাজ দেয়। সন্তানহারা বাবা সন্তান পেয়ে এবারও স্তম্ভিত এবং বাক্যহারা। আবুল ক্ষমা পেলো, কাজও পেলো। কিন্তু আর সেই সন্তানের সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে পারলো না।

 


ইউরোজোনে থেকে কিছুই লাভ হয় নি আমাদের।  সব লাভ নিয়ে গেছে উত্তর আর পূর্ব ইউরোপিয়ানরা। উত্তর ইউরোপিয়ানরা দলে দলে এসে আমাদের দেশ ময়লা করে ফেলেছে। দেশটারে শেষ ‘করি দিছে’!

ব্রিটেন হলো ইউরোপের মুকুট। আছে এর শতবছরের গৌরব আর প্রতিপত্তি। ইউরোপের গড়পরতা দেশগুলোর মধ্যে ঐতিহ্যবাহী ব্রিটেন হারিয়ে যেতে বসেছিলো। ব্লা..ব্লা..

এই হলো ব্রেক্সিটপন্থীদের (৫১.৯/৪৮.১) মনোভাবের একটি সামারি পিকচার। অথচ বাস্তব পরিস্থিতি অন্যরকম। একান্তই একলা চলার মনোভাব থেকে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার ফল হিসেবে ৫১.৯% জনগণ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে থাকার বিপক্ষে মত দিয়েছে। এ মনোভাব বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং অগ্রগতির পরিপন্থী। ব্রিটেন একটি স্বার্থবাদী মনোভাব দেখিয়েছে। এতে তাদের কতটুকু লাভ হবে, সেটি দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এমুহূর্তে যতটুকু বলা যায়, তাতে তাদের ভবিষ্যৎ খুব উজ্জ্বল দেখা যাচ্ছে না।

 

ইউরোপের দরজা হিসেবে লন্ডন বা ইংল্যান্ডকে আর কেউ ব্যবহার করবে না।

ইউরোপের দরজা হিসেবে লন্ডন বা ইংল্যান্ডকে আর কেউ ব্যবহার করবে না। অন্তত পরিস্থিতি আর বিগত ৪৩ বছরের মতো এতো উদার হবে না। আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, পর্যটক, গবেষক সকলের জন্য লন্ডন ছিল সমগ্র ইউরোপের জন্য গেইটওয়ে। এই সুযোগকে বেশি কাজে লাগিয়েছে ব্রিটিশ ব্যবসায়িরা। তারা অন্যান্য ইউরোপিয় দেশে অবাধে রপ্তানি করেছে। ইংল্যান্ডও পেয়েছে বিশাল রাজস্ব আয়। উপকৃত হয়েছে ব্রিটিশ জনগণ।

 

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে থাকার সমস্ত সুবিধাগুলো হারালো।

ব্রিটেনবাসীরা সিদ্ধান্ত ফেললেও পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হতে কিছু সময় লেগে যাবে। তখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে থাকার সুবিধাগুলো হারাবে।

ব্রিটিশদের সূর্য একসময় ডুবতো না (সূর্য তো কখনও ডুবতো না আজও ডুবে না!)। এরকম বলা হতো, কারণ পৃথিবীটাকে ব্যান্ডেজ করে রেখেছিল ব্রিটিশ কলোনী। সে দিন আর নেই, চীন ভারত ইত্যাদি জনসংখ্যা বহুল দেশগুলোতে পুঞ্জিভূত হচ্ছে বিশ্ববাজারের মুনাফা।  এখন ব্রিটেনের একা থাকা মানে হলো বোকা থাকা।  জোটবদ্ধ থাকার সকল বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক ফায়দা হারাতে বসেছে আজকের ব্রিটেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন না হয় ছেড়েই দিলো, কিন্তু পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে ভৌগলিকভাবে কি বিচ্ছিন্ন থাকতে পারবে ব্রিটেন? বলতে কি পারবে, যাও তোমরা আর প্রতিবেশি নও? ফলে দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সম্পর্ক, কূটনৈতিক সুবিধাদি, জোটবদ্ধ হয়ে কোন সুবিধা আদায়, ইত্যাদি ক্ষেত্রে বন্ধ হয়ে যাবে সকল বিশেষ অধিকার।

ইইউ’র সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে বিছিন্ন হবার পর ইউরোপের দেশগুলোর সাথে স্বার্থের সম্পর্ক সৃষ্টির জন্য ব্রিটেনকে নতুনভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করতে হবে।একই ভাবে ইইউ’র সাথেও সম্পর্কের শর্তগুলো নতুনভাবে নির্ধারণ করে নিতে হবে।

 

বিশ্বরাজনীতিতে প্রভাব খাটাবার শেষ অস্ত্রটুকু শেষ হলো।

কূটনীতি শুরু করতে হবে একদম ‘অ্যালফাবেট এ’ থেকে। বিশ্বরাজনীতিতে প্রভাব খাটাবার শেষ অস্ত্রটুকু শেষ হলো। কমনওয়েলথ আর যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক তৈরি ও রক্ষার ক্ষেত্রে ব্রিটেন এখন আর ‘নেগোশিয়েটিং লেভারেজ’ পাবে না। উদ্যোগ নিতে হবে তাদেরকেই, কিন্তু অন্যরা পাবে এর সুবিধা।

কমনওয়েলথ বা সাবেক কলোনিগুলো তো আর বর্তমান কলোনি নয়। তারা স্বাধীন দেশ। অতএব কমনওলেথভুক্ত দেশগুলোর সাথেও নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

 

ব্যবসায়িক অংশীদার এবং শ্রম ও মূলধনের উৎস খুঁজতেও ব্রিটিশদেরকে এখন মরিয়া হয়ে দৌড়াতে হবে।

রাজনীতি না হয় বাদ দিলাম, ব্যবসায়িক অংশীদার এবং শ্রম ও মূলধনের উৎস খুঁজতেও ব্রিটিশদেরকে এখন মরিয়া হয়ে দৌড়াতে হবে। ভারত বা চীনের সাথে এককভাবে সম্পর্ক জোরদার করতে হবে নিজেদের তাগিদেই। বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেবার নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে।

 

ভাই ডেভিড ক্যামেরোন, আপনার শেষের হলো শুরু! 

প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরোনকে এবার দিন গুণতে হবে। রাজ্য শাসন আর আগের মতো কুসুমাস্তির্ণ হবে না, হবার নয়। মূলত তিনি এই গণভোট চান নি, বরং ইইউতে থাকার পক্ষে জোর তৎপরতা চালিয়েছেন। কিন্তু  নিজদলের ভিন্নপন্থীদেরকে থামিয়ে রাখা, নতুন কোন রক্ষণশীল মতের উত্থান ইত্যাদি বহুমুখি চাপে পড়ে সরকার প্রধান হিসেবে তাকে এই ‘বিষের পেয়ালা’ পান করতে হয়েছে। কিন্তু এবার নিজ দলেও তার প্রভাব কমে আসবে। দলের এক্সিটপন্থীরা তার বিপক্ষে অনাস্থা প্রস্তাব এনে তাকে নামিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনাকেও এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

 

ব্রিটেনের আর্থিক ক্ষতি।

পাউন্ড এবং স্টকমার্কেটে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এটি তাৎক্ষণিক না হলেও পর্যায়ক্রমে।  এরকম পরিস্থিতিতে ক্যামেরোনের হাত শক্ত না থাকা মানে হলো, ইইউ’র সাথে উপযুক্ত দর কষাকষিতে ব্যর্থতা।  ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও ছেড়ে দেবার পাত্র নয়।  আরও কোন অর্থনৈতিক শক্তি সম্বলিত সদস্য যাতে ইইউ ছাড়তে না পারে, এজন্য তারা একটু নিষ্ঠুরভাবেই ব্রিটেনকে ছাড়পত্র দেবে। তাতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ব্রিটেন এবং ব্রিটেনবাসী।

ইউরোপ ছিলো ব্রিটিশ পণ্যের বিস্তৃত এবং নির্ভরযোগ্য বাজার। ব্রিটিশ পণ্যগুলো আর আগের মতো বিশেষ অধিকার বা নামে মাত্র শুল্কে রপ্তানি করতে পারবে না কোন ইউরোপিয়ান দেশে। ফলে রপ্তানি পড়বে অনি্শ্চয়তার মুখে।

 

অভিবাসন, আসা-যাওয়া আর আগের মতো নয়।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রায় ১২ লাখ ব্রিটিশ।  তারা নিজ দেশে পাঠাচ্ছে তাদের দৈনিক ও মাসিক আয়। সমৃদ্ধ হচ্ছে  ইংল্যান্ড।  অবশ্য অন্যান্য ইউরোপিয়ান দেশ থেকেও ব্রিটেনে গিয়ে কাজ করছে এরকম দৃষ্টান্তও কম নয়। তবে ইইউ ছাড়ার পর ব্রিটেনের ক্ষতি হবে বেশি, কারণ বাণিজ্যিক স্বার্থ তাদেরই যে বেশি।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের শর্ত অনুযায়ি, ব্রিটেন ইউরোজোন ছাড়া অন্য কোন দেশে থেকে অভিবাসী দিতে নেওয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। ফলে বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে থেকে শ্রমিক রপ্তানি কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতি বছরই ব্রিটেন তাদের ভিজা দেবার শর্ত কঠোর করে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় গরিব দেশগুলো। ইংল্যান্ড যেহেতু ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এখন এসব দেশ থেকে মানুষ নেবার সম্ভাবনা বেড়ে যেতে পারে। লন্ডনে বাংলাদেশি বংশদ্ভূত রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীরা অন্তত এরকমই আশা করছেন।

 

ইউনাইটেড কিংডম এর ‘ইউনাইটেড’ থাকা অনিশ্চিত হয়ে গেলো।

ইংল্যান্ড, ওয়েলস, স্কটল্যান্ড এবং উত্তর আয়ারল্যান্ড নিয়ে ইউনাইডেট কিংডম বা যুক্তরাজ্য, যাকে এপর্যন্ত ব্রিটেন বলে এসেছি। স্কটিশরা ইইউতে থাকার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। আয়ারল্যান্ডও।  তারা যে ব্রিটিশ শাসনকে খুব একটা মেনে নিয়েছে তা কিন্তু নয় (২০১৪ সালে ৪৪ শতাংশ স্কটিশ স্বাধীন রাষ্ট্রের পক্ষে ভোট দিয়েছিল)। ইইউকে তারা ব্রিটিশদের ওপরে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পেয়েছিলো। এবার ব্রিটিশ-বিরোধী অংশটি আবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠতে পারে।

ইইউ ছাড়ার সিদ্ধান্তে হয়তো এককভাবে ব্রিটেনের উন্নতি হবে, হয়তো হবে না। সর্বশেষ পরিস্থিতি হয়তো খুব তাড়াতাড়ি জানতে পারবো না। কিন্তু যা জানতে পারলাম তা হলো, ব্রিটিশরা আধুনিকতা, পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়গুলোকে প্রত্যাখ্যান করেছে।  (২৪/জুন/২০১৬)

 

 

 

brexit-800x500

পরবর্তি ঘটনা প্রবাহ:  ভোটাররা আবার সুযোগ পেতে চান

ভোটার ১: যদিও আমি (ইইউ) ছাড়ার জন্যই ভোট দিয়েছি, ভোটের ফলাফলে সত্যিই আমি হতাশ। আজ সকালে ঘুম থেকে ওঠে যা দেখলাম তাতে আঘাত পেয়েছি। কিন্তু আমি যদি আবার সুযোগ পাই, তবে থেকে যাবার জন্যই ভোট দেবো।
ভোটার ২: মিথ্যাকে বিশ্বাস করে আমি ভোট দিয়েছিলাম এখন আমার খুব আফসোস হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমার ভোট সত্যিই ছিনতাই হয়েছে।
ভোটার ৩: আমি একটু আফসোসই করছি। আমি যা করলাম, এর পেছনে বিশেষ কোন যুক্তি ছিলো না।
ভোটার ৪: আমার ভোটটির জন্য আফসোস হচ্ছে।
ভোটার ৫: আমার ভোটটি যে এত বিশাল পরিণতিতে যাবে আমি বুঝতে পারি নি। ভেবেছিলাম অবশেষে আমরা (ইইউতে) থেকেই যাচ্ছি।

ব্রেক্সিটের প্রভাব ব্রিটেন এবং ব্রিটেনের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে। শঙ্কার বিষয় হলো: গণভোট-ভিত্তিক মেরুকরণ শুরু হয়েছে। এবার শুরু হবে গণভোটের যথেচ্ছা ব্যবহার। ট্রাম্প-স্টাইলের উগ্রজাতীয়তাবাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধকে করে তুলছে যুক্তিসঙ্গত পরিণতি। কিছু ঘটনা খুব দ্রুত ঘটে গেলো:

✦ব্রেক্সিট বর্ণবাদকে আধুনিক স্টাইলে প্রতিষ্ঠিত করলো আবার। অন্যদেশ থেকে আগত কিন্তু ব্রিটেনের নাগরিকেরা বর্ণবাদের স্বীকার হচ্ছে যেখানে সেখানে। স্কুলের বাচ্চারা ব্রিটিশ অরিজিন বাচ্চাদের বুলি’র স্বীকার হচ্ছে। এসব নোংরামির একনম্বর স্বীকার হচ্ছেন নারী।
✦ব্রেক্সিট বাস্তবায়িত হলে স্কটল্যান্ড খুব শিঘ্রই যুক্তরাজ্য থেকে বের হবার আয়োজন করবে।
✦ইইউ থেকে ইটালি, ফ্রান্সের মতো ধনী দেশগুলোর উগ্র-জাতিয়বাদী দলগুলোও নিজ নিজ দেশে গণভোটের জন্য চাপ দেবে।

✦ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস-ক্যালিফোর্নিয়ার লোকেরা গণভোটের চিন্তা করছে। তারাও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের হয়ে যাবে।

✦অনেকেই না বুঝে বা মিথ্যা প্রচারণায় প্রলুব্ধ হয়ে ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়েছে। কেউ কেউ মনে করেছে, তার ভোটে কিছু যাবে আসবে না। দিনশেষে ব্রিটেন ইইউতেই থেকে যাচ্ছে। সকালবেলা ঘুম থেকে জেগে তো চক্ষু চরক গাছ!
✦এরকম ১৯ লাখ ব্রিটিশ আবারও গণভোটের ব্যবস্থা করার জন্য চাপ দিয়েছে। কিন্তু ক্যামেরুন সাফ জানিয়ে দিলো, ’আর নয়। এত করে কইলাম শুনলা না। এবার প্রতিফল ভোগ করো। আমিও বিদায় নিচ্ছি।’ অজনপ্রিয় ক্যামেরুন আগেই বেশি কথা বলে বিষয়টাকে টক বানিয়ে ফেলেছিলেন। যা হোক।

✦ওদিকে যেসব গরীব দেশ শ্রমিক অথবা সস্তা শ্রমজাত পণ্য রপ্তানি করে একটু এগিয়ে যাবার ধান্ধা করছিলো, তারা পড়লো বিপাকে। বাংলাদেশ তার মধ্যে এক নম্বর।

 

ব্যক্তিগত পর্যালোচনা: ব্রিটেন কার স্বার্থে এ সিদ্ধান্তে গেলো?

দেশের জনগণ তো নিজেদের স্বার্থের কথাই ভাববে, এটিই স্বাভাবিক। দেশের যারা নেতা, তাদের দায়িত্ব আছে জনগণের মনোভাবকে আত্মকেন্দ্রীকতা থেকে পারস্পরিক সহযোগিতার দিকে পরিচালিত করা। আমার মনে হয়, যারা ব্রেক্সিটের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে, তারা সার্বিক বিষয়গুলো নিয়ে বেশি ভেবেছে। হয়তো ব্রিটেনের উন্নতি হবে, হয়তো হবে না। সর্বশেষ পরিস্থিতি হয়তো খুব তাড়াতাড়ি জানতে পারবো না। কিন্তু যা জানতে পারলাম তা হলো, ব্রিটিশরা আধুনিকতা, পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়গুলোকে প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইইউ বর্তমানে দুর্বল আছে বলেই ব্রিটেনের প্রস্থান সহজ হলো। তবে মনে রাখতে হবে যে, ব্রিটেন একটি রাষ্ট্র, কিন্তু ইইউ একটি রাষ্ট্রপুঞ্জ। তাদের সংগঠিত হবার শক্তি এবং প্রয়োজনীয়তা উভয়ই বেশি। পরিণতি যেকোন দিকে মোড় নিতে পারে। কিন্তু আমার ইনটুইশন বলছে যে, ব্রিটেন রাষ্ট্র হিসেবে শক্তিশালী হলেও সেটি কখনও ইইউ’র দুর্বল হবার কারণ হবে না।

ইউ’র ক্ষতি হবে এবং বেশ কিছু চ্যালেন্জের মুখে পড়বে, তাতে সন্দেহ নেই। কিছু দেশের ইইউ-বিরোধীরা (ফ্রান্স, ইটালি) ইতোমধ্যেই নিজ নিজ দেশে গণভোটের জন্য আওয়াজ তুলতে শুরু করেছে।

ইইউ ভেঙ্গে যেতে পারে, এর মানে এই নয় যে, ব্রিটেন সঠিক কাজটিই করেছে। ব্রিটেন একবিংশ শতাব্দিতে এসে একটি বিশ্বায়নবিরোধী এবং সামন্তবাদি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এজন্য ব্রিটেন তার নিজেদের ক্ষতি এবং ইইউ’র সংশ্লিষ্ট ক্ষতির জন্য দায়ি থাকবে। ইতিহাস কাউকে ছাড়বে না।

 

ব্রিটেন ঐতিহাসিক ভাবেই স্বার্থপর জাতি। এদেশকে শোষণ করা শেষ হবার পর, যখন নিচে গরম লাগা শুরু করেছে, তখন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নাম দিয়ে বিদায় নিয়েছে। ওরা দু’শ বছর নাগাদ না থাকলে ভারত উপমহাদেশে আরও আগেই গণতন্ত্র জন্ম নিতো এবং আজ আমরা আরও পরিপক্ক গণতন্ত্র নিয়ে আরও সমৃদ্ধ দেশে থাকতে পারতাম।

 

 

প্রথম প্রকাশ এবং পাঠক প্রতিক্রিয়া

 

 


ইইউ-বিযুক্ত যুক্তরাজ্য এবং বাংলাদেশ: প্রকাশিত খবর অনুসারে হাসিনা ব্যক্তিগতভাবেও প্রভাব খাটিয়েছেন, ব্রিটেনকে ইইউ’র পক্ষে ভোট দিতে। এর প্রধান কারণ হলো, দেশের রপ্তানি-জাত পণ্যের জন্য ইইউ’র বিস্তৃত বাজার ও জিএসপি সুবিধা।  ইইউ ছাড়ার কারণে বাংলাদেশকে ব্রিটেনের সাথে আলাদাভাবে চুক্তি করতে হবে। তাতে পূর্বের সুবিধা কতটুকু থাকবে সেটা সময়ই বলে দেবে।