Tagged: blue ocean strategy

নীলসমুদ্র: প্রতিযোগিতামুক্ত পরিবেশ, সফলতার নতুন দিগন্ত!

নিজের পেনশনের টাকা দিয়ে ব্যবসায় শুরু করে নূরুল ইসলাম সাহেব মহাফ্যাসাদে পড়েছেন। একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং চারটি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঝখানে তার বইয়ের দোকান। দোকান শুরুর পূর্বে তিনি পাশ্ববর্তী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করেছিলেন। তারা সকলেই তাকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিল। সৌভাগ্যক্রমে বেশ ক’জন শিক্ষক তার কর্মজীবনের পূর্ব পরিচিতও। কিন্তু তবু তিনি সমগোত্রীয় বুকস্টোরগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় ঠিকতে পারলেন না।

 

এরকম পরিস্থিতিতে তার বড় ছেলে সফিকুল ইসলাম কিছুদিন দোকানে বসে দেখলেন যে, তার বাবার বইয়ের দোকানটির জেগে ওঠার কোনই সম্ভাবনা নেই।  তার প্রধান কারণ হলো প্রতিবেশী বুকস্টোরগুলো, যাদের আছে অনেকদিনের অভিজ্ঞতা এবং সুবিস্তৃত ক্রেতা সমাজ (customer base)। দীর্ঘদিন বইয়ের ব্যবসায় থেকে তারা সব বয়সের ক্রেতার আস্থা অর্জন করেছে। পার্শ্ববর্তী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা একনামে তাদেরকে চেনে। তিনি দেখলেন যে, নতুন একটি বুকস্টোর দিয়ে বৃহৎ বুকস্টোরগুলোর সাথে একটি ‘অসম প্রতিযোগিতায়’ লিপ্ত হয়েছেন তার বাবা। শেষ কথা হলো এই যে, বইয়ের দোকান দিয়ে তাদের আর বাণিজ্য করা সম্ভব নয়।

 

অতএব সফিকুল ইসলাম তার শিক্ষাজীবনের তাত্ত্বিক জ্ঞান দিয়ে বাজার গবেষণা করে দেখলেন যে, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করা প্রায় অসম্ভব। তাই তিনি বাবার সাথে পরামর্শ করে আপাতত শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে লক্ষ্য করে ব্যবসায়কে চাঙ্গা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এউদ্দেশ্যে তিনি বইয়ের প্রান্তিক সরবরাহকারীদের সাথে চুক্তি করলেন, যারা অপেক্ষাকৃত কমমূল্যে এমনকি সহজশর্তে বাকিতেও বই দিতে প্রস্তুত থাকবে। তাছাড়া, ব্যবসায়ের ধরণেও একটি বড় পরিবর্তন আনলেন: বুকস্টোরের স্থানকে সামান্য বিস্তৃত করে পাঠাগার সুবিধা যুক্ত করলেন। পার্শ্ববর্তী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন যে, বিদেশি দামিদামি বইগুলো আর কিনে পড়তে হবে না। নামমাত্র মূল্যে পাঠাগারের সদস্য হয়ে শিক্ষার্থীরা বই পড়তে পারবে এবং বাড়িতেও নিতে পারবে।

 

এভাবে তিনি ভিন্ন এবং অভিনব উপায়ে ক্রেতাদেরকে দোকানের দিকে আকৃষ্ট করলেন। ফলে অন্যান্য অভিজ্ঞ বুকস্টোরের সাথে তাদের আর প্রতিযোগিতায় যেতে হলো না। বাজারের অন্যান্য বুকস্টোরগুলোও তাদেরকে আর প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করলো না। দু’বছর পরের ফলাফল হলো অনেকটা এরকম:  বাপ-বেটার বইয়ের দোকানটি অবশেষে একটি লাভজনক ‘বাণিজ্যিক পাঠাগারে’ রূপান্তরিত হলো। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীতে তারা সীমাবদ্ধ থাকলো না: স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ অন্যান্য পেশার মানুষেরাও তাদের ক্রেতা হয়ে আসলো। অন্যদিকে বাজারে তাদের কোন প্রতিদ্বন্দ্বীও রইলো না। নিজেদের সৃজনশীলতায় তৈরি ক্রেতা দিয়েই তারা ব্যবসায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলেন।

 

(2)

বর্তমান যুগে কোন বিষয়ে পসার লাভ করতে হলে, দু’টি পথ আছে: ক) প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়া এবং খ) প্রতিযোগিতাকে এড়িয়ে যেতে পারা। প্রতিযোগিতা জয়ী হওয়া একটি কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ এবং অশুভ পথ, কারণ তাতে দ্বন্দ্ব বাড়ে, প্রতিপক্ষ সৃষ্টি হয়। এখানে জয় ছাড়া অন্যকিছু কাম্য নয়। এটি কোন খেলা নয় যে, পরাজয়কে সহজভাবে মানা যায়। এখানে হারা মানে হলো, ধ্বংস হয়ে যাওয়া। অতএব আধুনিক বিশ্বে, দ্বিতীয় উপায়টিই মানুষ বেছে নিচ্ছে। মানুষ আজকাল এমন পরিস্থিতিকে বেছে নিচ্ছে, যেখানে প্রতিযোগিতা বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক।

 

প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার জন্য হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতায় ‘রক্তাক্ত’ পরিবেশ সৃষ্টি করাকে বলা হয় ‘রেড ওশন’ বা লালসমুদ্র কৌশল। প্রতিপক্ষরা একে অন্যের ধ্বংস চায়। এটি কখনও কাম্য নয়, কিন্তু পরিস্থিতি বাধ্য করে।

 

অন্যদিকে, নিজেদের কৌশলে সৃজনশীল পরিবর্তন এনে প্রতিযোগিতার প্রভাবমুক্ত ব্যবসায়িক পরিবেশ সৃষ্টি করাকে বলা হয় ‘ব্লু ওশন’ বা নীলসমুদ্র কৌশল।  বাধাহীন নীলসমুদ্রে এগিয়ে চলে সফলতার জাহাজ। প্রতিপক্ষরা প্রতিবেশীর মতো হয়ে যায়। বর্তমান লেখাটি নীলসমুদ্রকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছে।

 

নীলসমুদ্র কৌশলের ৮টি বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যার পর্যালোচনা করলে এ সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন ধারণা পাওয়া যায়।  এই ৮টি বৈশিষ্ট্য সংশ্লিষ্ট প্রবক্তাদের নিজস্ব হোমপেইজ থেকে উদ্ধৃত:

 

১) এটি তথ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত

২) এটি ব্যতিকম এবং কম খরচের

৩) এটি বাজারে প্রতিযোগিতাহীন (uncontested) পরিস্থিতি সৃষ্টি করে

৪) সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এখান থেকে পদ্ধতি এবং কাঠামোগতভাবে সহায়তা লাভ করেন

৫) এটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়

৬) এতে ঝুঁকি কমে কিন্তু সুযোগ বাড়ে

৭) বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৌশল প্রতিষ্ঠিত হয় এবং

৮) এটি সমান-সমান জয়ের (win-win) পরিস্থিতি সৃষ্টি করে:

 

 003

১. এটি তথ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত: এই কৌশল তথ্যভিত্তিক এবং ১৫০বার পরীক্ষা করে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একশ’ বছরের পুরানো ৩০টি শিল্পউদ্যোগের ওপর এর পরীক্ষা হয়।

২. এটি ব্যতিক্রম এবং কম খরচের: নীলসমুদ্র কৌশলটি একই সাথে অভিনব এবং সাশ্রয়ী। লালসমুদ্রের সাথে তুলনা করে একে বিকল্পহীন কৌশল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

৩. এটি বাজারে প্রতিযোগিতাহীন (uncontested) পরিস্থিতি সৃষ্টি করে: প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়া নয়, কিন্তু একটি উদ্যোগকে পরিমার্জন করার মধ্য দিয়ে এখানে প্রতিযোগিতাকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ করে তোলা হয়।

৪. সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এখান থেকে পদ্ধতি এবং কাঠামোগতভাবে সহায়তা লাভ করেন: এই পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট শিল্পউদ্যোক্তা উপাত্ত এবং পদ্ধতিগত সহায়তা লাভ করেন। (এদের হোমপেইজে সহজভাবে একটি ফ্রেইমওয়ার্ক উপস্থাপন করা হয়েছে।)

৫. এটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়: বর্তমান পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ করে, অপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলোকে ছেঁটে দিয়ে ধারাবাহিকভাবে এটি অর্জিত হয়। এখানে ‘নন-কাস্টমারকে’ বানানো হয় কাস্টমার, অর্থাৎ যারা এখনও ক্রেতা হয় নি, তারাও ক্রেতাতে রূপান্তরিত হয়। চারটি সহজ ধাপে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

৬. এতে ঝুঁকি কমে কিন্তু সুযোগ বাড়ে:  উদ্যোক্তার একটি নতুন ধারণাকে আর্থিক তাৎপর্য দেওয়া হয়। বিমূর্ত ধারণাটি মূর্তিমান বস্তুতে পরিণত হয়। এতে নেতিবাচক ঝুঁকিকে ‘ইতিবাচক’ বা লাভজনক ঝুঁকিতে পরিণত করা হয়। ফলে ঝুঁকি পরিণত হয় সুযোগে।

৭. বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৌশল প্রতিষ্ঠিত হয়: কৌশলটি সামষ্টিক, অর্থাৎ সবকিছুকে অন্তর্ভুক্ত করে প্রণীত। এটি সহজে বুঝতে পারা যায় এবং বুঝাতে পারা যায়।

৮. এটি সমান-সমান জয়ের (win-win) পরিস্থিতি সৃষ্টি করে: এখানে কেউ প্রতিপক্ষ নয়, এমনকি ক্রেতাও নয়। ক্রেতা পায় অর্থের উপযুক্ত মূল্য এবং বিক্রেতা পায় লাভ। মূল্য, লাভ এবং ক্রেতা – এইটি তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে ক্রেতা ও বিক্রেতার জন্য সমান-সমান জয়ের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়।

 

 

উপসংহার:

বিজনেস এবং ক্যারিয়ার ডিভেলপমেন্ট-এর জন্য নীলসমুদ্র কৌশলটি সারা বিশ্বে আজ বহুল আলোচিত এবং একই সাথে সমাদৃত।  উন্নয়ন এবং সফলতার ‘হট ইস্যু’ হিসেবে একে দেখা হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের কোন গণমাধ্যমে নীলসমুদ্র বা ব্লু ওশন স্ট্র্যাটেজি নিয়ে তেমন কোন আলোচনা নেই দেখে বিস্মিত হয়েছি। সার্চ এন্জিনে খোঁজ নিয়ে দেখলাম, একটি বাংলা পত্রিকায় এবিষয়ে সামান্য কিছু আলোচনা করা করেছিল। তাতে ‘নীলসমুদ্র’ সম্পর্কে স্পষ্ট কোন ধারণা পাওয়া যায় না, বরং কঠিন কঠিন ব্যবসায়িক পরিভাষা দিয়ে আরও জটিল করা হয়েছে। একটি সুস্থ সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য নীলসমুদ্র কৌশলটি এদেশেও আলোচিত হোক, এজন্যই এই লেখার অবতারণা।

 

কীভাবে আমি ‘নীলসমু্দ্রকে’ পেলাম। আমাদের প্রতিষ্ঠানটি এর উন্নয়ন সহযোগীদের (সুবিধাভোগী) আর্থিক চাহিদা বিবেচনা করে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার জন্য কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। অর্থাৎ সহযোগীদেরকে আর্থিক স্বাবলম্বিতার পথ দেখানো হচ্ছে। এউদ্দেশ্যে বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগ নিয়ে চলছে চুলছেড়া বিশ্লেষণ। তারই অংশ হিসেবে ‘নীলসমুদ্র কৌশলের’ সাথে পরিচিত হই। বিষয়টির শেখড় যে এত গভীরে তা প্রথমে বুঝতে পারি নি। শুধু ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও ‘নীলসমুদ্র’ একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজের কথা বলে।

 

 

———————

টীকা:

ক) পারিভাষিক শব্দ এবং তাত্ত্বিক আলোচনাকে যথাসম্ভব পরিহার করা হয়েছে। পরবর্তী কোন সময়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করার ইচ্ছা আছে। তবে এবিষয়ে আগ্রহীরা ‘blue ocean’ লেখে বাটিচালান দিতে পারেন।

খ) তথ্যসূত্র: বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যক্তিগত পড়া; ব্লু ওশন স্ট্র্যাটেজি ডট কম; বিজনেস নিউস ডেইলি ডট কম এবং হার্বার্ড বিজনেস রিভিউ ডট ওআরজি