Tagged: শান্তিরক্ষী দিবস

আজ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী দিবস এবং বাঙালির গর্বের দিন

483184

১) সামরিক দিবসে বেসামরিক আমার কী করার আছে!

আজ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী দিবস। বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষীদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং বিভিন্ন ক্যাজুয়াল্টিতে জীবনদানকারী সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য এ দিবসকে বেছে নেওয়া হয়েছে। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশন প্রতিষ্ঠিত হবার পর বিভিন্ন সংঘর্ষ, দুর্ঘটনা ও রোগাক্রান্ত হয়ে প্রায় ৩,১০০ সেনা, পুলিশ ও ভলানটিয়ার জীবন দান করেন। এর মধ্যে শতাধিক বাংলাদেশি সেনাসদস্য আছেন যা ভিনদেশে শান্তিপ্রতিষ্ঠার জন্য আত্মাহুতি দিয়েছেন। বিশ্বের দুর্যোগ ও যুদ্ধাক্রান্ত দেশগুলোতে শান্তি ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় বাংলাদেশ সেরা অবদানকারী যদি না হতো; যদি সারাবিশ্বে বাংলাদেশ নজিরবিহীন সুনামের অধিকারী না হতো, যদি সেখানে দেশের সূর্যসন্তানদের আত্মত্যাগ না থাকতো – তবে শান্তিরক্ষী দিবস নিয়ে আমাদের সাধারণ বেসামরিক মানুষদের ভাবনার কোনই কারণ থাকতো না। তাছাড়া জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের সকল শান্তির যোগানদাতা নয়, হতেও পারে নি। কেউ কেউ মনে করেন, এই শান্তিরক্ষীরা আধিপত্যবাদীদেরই শান্তি রক্ষা করছে।

সেটি বিতর্কের বিষয় হয়েই থাকুক, কিন্তু বাংলাদেশের জন্য শান্তিরক্ষা বা পিসকিপিং মিশন একটি গৌরবের বিষয় এবং পেশাদারিত্ব অর্জনের সুযোগ। একই সাথে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি নির্ভরযোগ্য ও স্থায়ি মাধ্যম এটি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ি পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ এখন সর্বোচ্চ সদস্যদাতা দেশ।

“দরিদ্র দেশ হয়েও বাংলাদেশ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে সর্বোচ্চ সহায়তাদানকারী দেশ। প্রায় ১০,০০০ সেনা ও পুলিস বাহিনী দিয়ে বিশ্বের ৪৫টি দুর্যোগ-আক্রান্ত অঞ্চলে নিযুক্ত আছে।…..হয়তো অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে সেনাবাহিনীতে এতো সদস্য নেই কিন্তু জনসংখ্যা-অধ্যুষিত এ দেশটিতে ৩ লাখ সেনাবাহিনী রয়েছে যারা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈরি প্রকৃতিতে আগে থেকেই অভ্যস্ত। এরা জানে কীভাবে দ্বন্দ্ব নিরসন করতে হয়।” (আলজাজিরা)

নাবিবিয়া, ইউগান্ডা, মোজাম্বিক, কম্বোডিয়া, সোমালিয়া, রোয়ান্ডা, সিয়েরালিওন, তাজিকিস্তান, পশ্চিম সাহারা, কসোভো, পূর্ব তিমুর, কঙ্গো, আইভোরিকোস্ট, ইউগোস্লাভিয়া, ইথিওপিয়াসহ কমপক্ষে ২৫টি দেশে বাংলাদেশি সেনাবাহিনী বীরত্বের সাথে শান্তি রক্ষায় নিয়োজিত আছে।

Presentation2-crop

 

২) দরিদ্র দেশের অন্তরটা কিন্তু কখনও দরিদ্র ছিলো না

তথাকথিত উন্নত দেশের আত্মস্বীকৃত মুরুব্বিয়ানরা দরিদ্র বলে আমাদের অর্জন আর কৃতীত্বকে প্রায়ই ছোট করার চেষ্টা করেছে । কিন্তু দরিদ্র হলেও মহৎ উদ্দেশ্য আত্ম বলিদানে কখনও পিছপা হয় নি এ তীতুমির, সূর্যসেন আর ক্ষুদিরামের বাংলাদেশের মানুষগুলো। তা হলে ন’মাসে স্বাধীনতা আসতো না। স্বাধীন হবার পর অর্থাৎ সদস্য প্রাপ্তির পর (১৯৭৪) থেকেই বাংলাদেশ জাতিসংঘের অন্যতম শান্তিসহায়ক দেশ হিসেবে কাজ করে এসেছে। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সময় (১৯৮৮) থেকে ইরাকে সেনাবাহিনীর পাঠানোর মধ্য দিয়ে প্রত্যক্ষ সহায়তা শুরু করে বাংলাদেশ। শুরুতে কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিলো – উচ্চ বেতনে বিদেশে থাকার পর স্বদেশে ফিরে সেনাসদস্যরা অপেক্ষাকৃত কম বেতনে আমার কাজে ফিরবে কিনা এরকমের আশংকা ছিলো। কিন্তু স্বদেশপ্রেমী সেনাবাহিনী এরকম আশংকা মিথ্যা প্রমাণ করেছে।

বিবিসি বাংলাদেশের সাহসী শান্তিরক্ষীদেরকে ‘ক্রিম অভ্ পিসকিপারস’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের সাহসিকতা, পেশাদারিত্ব ও আত্মত্যাগের প্রশংসা করেছে (২০০৪)।
তাদের পেশাদরিত্বকে ‘হাইয়েস্ট অর্ডার’ বা উন্নতমানের বলা হয়েছে এবং বিভিন্ন উচ্চতর দায়িত্বেও আমাদের সেনাকর্মকর্তারা সুযোগ পেয়েছেন।

জাতিসংঘের ভাষ্যমতে বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীর চাহিদা বেড়েই চলেছে কারণ, এদেশের সেনাসদস্যদের শৃঙ্খলাবোধ প্রশংসনীয়। এই মে মাসেই আরও ৬০০ সেনা যুক্ত হয়েছে জাতিসংঘের মূল বাহিনীতে।

৩) ১৪৩২ বাংলাদেশী শান্তিরক্ষী পুরস্কৃত

২০১২ সালে লাইবেরিয়াতে বাংলাদেশি সেনাবাহিনীর পেশাদার কর্মকাণ্ডের জন্য ১৪৩২ সেনাকে ‘জাতিসংঘ মেডাল’ প্রদান করা হয়। স্থানীয় লাইবেরিয়ান সৈন্যদেরকে প্রকৌশলী প্রশিক্ষণে বিশেষ সফলতার জন্য তাদেরকে এ অসামান্য স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য ওই প্রশিক্ষণ ছিলো খুবই প্রয়োজনীয়।

৪) সিয়েরালিওনে এক টুকরো বাংলাদেশ 

বাংলাদেশ ছাড়াও একটি আফ্রিকান দেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বাংলাদেশ নামে রাস্তাঘাট। ভাবতেই কেমন লাগে। বাংলাদেশের জাতীয় দিবসে অন্য দেশের মানুষের উল্লাস। দেশটির নাম সিয়েরালিওন। বিভিন্ন সামাজিক সেবা ছাড়াও ৫৪ কিলোমিটারের একটি রাস্তা নির্মাণ করে দিয়েছে আমাদের সেনাবাহিনী। সিয়েরালিওনসহ আফ্রিকান দেশগুলোতে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিরও একটি সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রাণসহ কিছু কোম্পানি শুরুও করেছে। এসূত্র ধরে ২০১০ সালে সেখানে বাংলাদেশ দূতাবাস খোলা হয়েছে।

 

২০১৩ শান্তিরক্ষী দিবসের ফ্লাইয়ার

২০১৩ শান্তিরক্ষী দিবসের ফ্লাইয়ার

৫) ২০১৩ শান্তিরক্ষী দিবস (২৯ মে)

২০১৩ সালের শান্তিরক্ষী দিবসের প্রতিবাদ্য বিষয় হলো: নতুন চ্যালেন্জের সাথে খাপ খাওয়ানো। দু’টি উদ্দেশ্য হলো ১) শান্তিরক্ষায় জীবনদানকারী সদস্যদের স্মৃতিতে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন এবং ২) যেসব পুরুষ ও নারী সদস্য এখনও পর্যন্ত পেশাদারিত্ব, সাহসিকতা এবং আত্মত্যাগ নিয়ে কাজ করছেন তাদেরকে স্বীকৃতি দেওয়া। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতেও রয়েছে বিশেষ আয়োজন। বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রে যারা শান্তিরক্ষায় প্রাণ হারিয়েছেন বা আহত হয়েছেন, একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আজ তাদের আত্মীয়দেরকে সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে।

 

৬) শেষ কথা

এপ্রসঙ্গে বহির্বিশ্বের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে একটি কথা প্রচলিত আছে। প্রতিটি সরকারের শেষ দিনগুলোতে যখন নির্বাচন নিয়ে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তখন সকলেই একটি পরিচিত বিপদের আশংকা করে থাকে। তা হলো, সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ বা কুদেতা। ২০০৭ সালে হতে হতেও অবশেষে সেটা হয় নি। সকলেই বিস্মিত। এর কারণ প্রধান হলো, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সুনাম, শৃঙ্খলার খেতাব এবং আন্তজার্তিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের সম্পৃক্ততা। বহির্বিশ্বের সুনামের প্রতি সুবিচার করেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের সংবিধানকে সমুন্নত রাখছে। এবারও (২০১৩) এরকম একটি আশংকাকে তারা নাকচ করে দিয়েছে। বিষয়টি যদি তা-ই হয়, তবে আমাদের সেনাবাহিনীকে নিয়ে গর্ব করতেই পারি আমরা।

বাঙালির গর্ব করার জায়গাগুলো খুবই কম। ক্রিকেট, গার্মেন্টস শিল্প, ক্ষুদ্রঋণ ইত্যাদির মধ্যে বহির্বিশ্বে শান্তি রক্ষা করতে সমর্থ হওয়া একটি আন্তর্জাতিক গৌরবের বিষয়। গৃহযুদ্ধ বা দুর্ভিক্ষ আক্রান্ত কিছু দেশকে আমরা দিচ্ছি শান্তি ও সমৃদ্ধির দিশা। এখানে আমরা দেবার গৌরব লাভ করছি। বাংলাদেশ ছাড়া আরও ১১৭টি দেশ আছে, যাদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম অবস্থানে। বিনিময়ে আমরা পাচ্ছি দেশের প্রশিক্ষণকে বিদেশের বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার সুযোগ; পাচ্ছি অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা আর পাচ্ছি আন্তর্জাতিক সুনাম। তবে তা এমনিতেই আসে নি। কঠিন মূল্যও আমাদেরকে দিতে হয়েছে। শতাধিক সূর্যসন্তানকে আ্মরা হারিয়েছি বিদেশের মাটিতে। জানি না তাদের পরিবার শুধু আর্থিক সহায়তা নিয়ে কীভাবে দিনাতিপাত করছে। সেনাবাহিনী বলেই আমরা যেন তাদেরকে অন্য গ্রহের প্রাণী মনে না করি। তারা আমাদেরই কারও আত্মীয় বা সহকর্মী হয়ে থাকবেন। আজ এই বিশেষ দিনে, তাদেরকে স্মরণ করি পরম শ্রদ্ধায় আর পরিবারকে জানাই আন্তরিক সহমর্মিতা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নিয়ে সত্যিই আমরা গর্বিত।

তথ্যসূত্র:
১) বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হোমপেইজ
২) বিবিসি ও আলজাজিরা (টিভি ও অনলাইন সংস্করণ)
৩) ডেইলি নিউ এইজ
৪) দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক কালের কণ্ঠ ও দৈনিক জনতা

 

প্রথম আলো ব্লগ

প্রথম আলো ব্লগ

[একটি পাবলিক ব্লগসাইটে লেখাটি সঞ্চালক কর্তৃক নির্বাচিত হয়েছিলো]

 

আগ্রহী পাঠকের জন্য:

*নীল হেলমেটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

*একজন লাইবেরিয়ানের হৃদয়ে বাংলাদেশ, একজন সহব্লগারের লেখা

*দেশে এবং বিদেশে বাংলাদেশি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী সম্মান অর্জন করেছে

*বিবিসি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন

 

Presentation2-crop