Tagged: যোদ্ধাপরাধ

অ্যামনেস্টি কী লেখেছে তা কি অ্যামনেষ্টি জানে!

একাত্তরের মার্চ থেকে সংঘটিত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনির সুপরিকল্পিত হত্যাকে গণহত্যা বলতে রাজি ছিল না কিছু পশ্চিমা দেশের জনপ্রতিনিধি। যদিও তাদের দেশের মানুষগুলো ছিল বাঙালির পক্ষে, তারা নিজ দেশের জনগণের মনকে বুঝতে পারে নি। গণহত্যাকে সচেতনভাবেই অস্বীকার করা হয়েছে, কারণ গণহত্যাকে স্বীকার করার মানে হলো বাংলাদেশকে স্বীকার করা। কাজেই এটি ছিল তাদের রাজনৈতিক অবস্থান। অপরদিকে এটি ছিল বাঙালির অস্তিত্বের বিষয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে আজ চুয়াল্লিশ বছর। ‘কারও সাথে শত্রুতা নয় – সকলের সাথে বন্ধুত্ব’ নীতি প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ একটি শত্রুতামুক্ত বৈশ্বিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছে। একই প্রক্রিয়ায় যোদ্ধাপরাধের বিচার সম্পন্ন করে বাংলাদেশ যখন ভবিষ্যতমুখী হবার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই সেই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী একে প্রতিহত করার জন্য মাঠে নেমেছে। পরাজিত পক্ষ এবং তাদের বিদেশী মিত্ররা এমন কিছু বাদ নেই, যা তারা করছে না।

 

মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে অ্যামনেস্টির অবস্থান সকলের কাছেই বোধগম্য, যদিও সকলক্ষেত্রে তারা একইভাবে সরব হতে পারে নি। কিন্তু বাংলাদেশ সম্পর্কে অ্যামনেস্টির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে নিজেদের বস্তুনিষ্ঠতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে মনে হয়েছে, এটি তাদের সচেতন বক্তব্য নয়। একাত্তরের গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে তারা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।  তারা ভুলে গেছে নুরেমবার্গ অথবা টোকিওতে সংঘটিত যোদ্ধাপরাধ বিষয়ক ট্রাইবুনালের কথা। যেমন তারা ভুলে যায় ফিলিস্তিন, ইরাক এবং আফগানিস্তানের গণহত্যার কথা। এভাবে তারা তাদের মানবাধিকারের স্লোগানকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে ফেলেছে।

 

‘আন্তর্জাতিক মান’ নিয়ে একটি আপ্তবাক্য বারবার তুলে ধরা হচ্ছে, কোন ব্যাখ্যা বা যুক্তি ছাড়াই। ‘আন্তর্জাতিক মান কী’ তা আজও কেউ বলতে পারে নি। মজার ব্যাপার হলো অ্যামনেস্টিও একইভাবে কোন দিকনির্দেশনা ছাড়াই বিচারের ‘আন্তর্জাতিক মান’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দেখা গেছে যে, প্রতিবেদনটি তাদের হলেও এর ভাষা ও ভোকাবুলারি ছিল পরিচিত, যা পরাজিত শক্তিরা আগেই ব্যবহার করে গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক মানের কথা বললে, বিশ্বের অন্যান্য স্থানে সংঘটিত যোদ্ধাপরাধের বিচারের সাথে তুলনা করতে হবে।  সেক্ষেত্রে সামনে আসে নুরেমবার্গ এবং টোকিওর বিচার কার্য। সেই তুলনায় বাংলাদেশের যোদ্ধাপরাধের বিচারকার্যে পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়েছে আসামীপক্ষকে। তারা যেন প্রস্তুতি নিয়ে নিজেদের পক্ষে সাক্ষ্যপ্রমাণ ও যুক্তি দাঁড় করাতে পারে, এর সুযোগ তারা পেয়েছেন। শেষ মুহূর্তে এসে ভুয়া সার্টিফিকেটও দাখিল করার সুযোগ তারা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই যোদ্ধাপরাধের বিচার কাজকে অসহযোগিতা করে এসেছে। সেখানকার জনৈক রাষ্ট্রদূত স্টিফেন র‌্যাপ যোদ্ধাপরাধের বিচারপ্রক্রিয়াকে কাছে থেকে যাচাই করেছেন। তার মতে, উভয় পক্ষ আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ পেয়েছে এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে তিনি পুরোপুরি সমর্থন করে গেছেন।

 

যোদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদেরকে ‘বিরোধী দলীয় নেতা’ হিসেবে পরিচিত করানোকে একটি অপকৌশল বলা যায়। এর উদ্দেশ্য হলো, বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনীতি সম্পর্কে অবগত নয়, এমন পাঠককে বিভ্রান্ত করা। অথবা, এটি নিতান্তই তাদের অজ্ঞতার পরিচয়। একটি দেশের অভ্যন্তরীন ইতিহাস, সংবিধান, আইন ইত্যাদি পর্যালোচনা না করেই তারা একটি নিবন্ধ লেখে ফেলে।

 

যোদ্ধাপরাধের বিচার একটি জুডিশিয়াল প্রক্রিয়ার বিষয়। এখানে আবশ্যিকভাবেই বাদী-বিবাদীর দ্বন্দ্ব আছে। এর ব্যবস্থাপনা নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ মতামত থাকবেই। একাধিক আন্তর্জাতিক সংগঠন বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক বিচার সম্পর্কে তাদের উদ্বেগের কথা প্রকাশ করেছে। অধিকাংশই বস্তুনিষ্ঠতার দাবি রাখে। কিন্তু অ্যামনেস্টির মতো একপাক্ষিক প্রতিবেদন আগে কেউ লেখে নি।

 

স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিরও অপরাধ আছে, একথা বলে অ্যামনেস্টি বুঝাতে চাচ্ছে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শুধু নাৎসি বাহিনি নয়, প্রতিপক্ষ জোটেরও বিচার হওয়া চাই! এ কথা বলে তারা শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের মহান অবদানকেই ছোট করে নি, স্বাধীনতা সংগ্রামকেও অস্বীকার করেছে। প্রশ্ন হলো, এ অভিযোগটি কি তারা সচেতনভাবেই দিয়েছে?

 

এটি ভুলে গেলে চলবে না যে, যোদ্ধাপরাধীর বিচার হয় বিজয়ী শক্তির মাধ্যমে। এখানে যখন স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকেও বিচারের দাবী করা হয়, তখন বলতে হয় যে, অ্যামনেস্টি কী বলছে তারা তা বুঝতে পারছে না। মুক্তিযোদ্ধাদের বিপক্ষে সুস্পষ্টভাবে অভিযোগ দিয়ে অ্যামনেস্টি একটি রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছে, যা কোন মানবাধিকার সংগঠনের জন্য অনাঙ্ক্ষিত।

 

প্রশ্ন হলো, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কীভাবে এত আত্মবিশ্বাস পায়। কীভাবে তারা একটি সার্বভৌম দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারে? কীভাবে তারা একটি দেশের জনগণের অনুভূতিকে আঘাত করে প্রতিবেদন লেখতে পারে? কোথায় তাদের ভিত? তার আগে প্রশ্ন করতে হবে, দেশের মৌলিক ইস্যুতে আমাদের রাজনীতিবিদেরা কি কখনও ঐকবদ্ধ হতে পেরেছেন? এসব প্রশ্নের সদোত্তর মিলবে না, কারণ এদেশের রাজনীতিতে এমন পক্ষও আছে যারা যেকোন মূল্যে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চায়। জনগণের জন্য রাজনীতি যেন শুধুই বক্তৃতার বিষয়। যোদ্ধাপরাধের বিচারের আয়োজন যারা করছেন, তারাও কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য/উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাদের নেই? তা যদি না হতো, তবে অ্যামনেস্টির মতো ভিনদেশি এই প্রতিষ্ঠান আজ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন লেখতে পারতো না।