Tagged: মুক্তিযুদ্ধ

অ্যামনেস্টি কী লেখেছে তা কি অ্যামনেষ্টি জানে!

একাত্তরের মার্চ থেকে সংঘটিত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনির সুপরিকল্পিত হত্যাকে গণহত্যা বলতে রাজি ছিল না কিছু পশ্চিমা দেশের জনপ্রতিনিধি। যদিও তাদের দেশের মানুষগুলো ছিল বাঙালির পক্ষে, তারা নিজ দেশের জনগণের মনকে বুঝতে পারে নি। গণহত্যাকে সচেতনভাবেই অস্বীকার করা হয়েছে, কারণ গণহত্যাকে স্বীকার করার মানে হলো বাংলাদেশকে স্বীকার করা। কাজেই এটি ছিল তাদের রাজনৈতিক অবস্থান। অপরদিকে এটি ছিল বাঙালির অস্তিত্বের বিষয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে আজ চুয়াল্লিশ বছর। ‘কারও সাথে শত্রুতা নয় – সকলের সাথে বন্ধুত্ব’ নীতি প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ একটি শত্রুতামুক্ত বৈশ্বিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছে। একই প্রক্রিয়ায় যোদ্ধাপরাধের বিচার সম্পন্ন করে বাংলাদেশ যখন ভবিষ্যতমুখী হবার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই সেই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী একে প্রতিহত করার জন্য মাঠে নেমেছে। পরাজিত পক্ষ এবং তাদের বিদেশী মিত্ররা এমন কিছু বাদ নেই, যা তারা করছে না।

 

মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে অ্যামনেস্টির অবস্থান সকলের কাছেই বোধগম্য, যদিও সকলক্ষেত্রে তারা একইভাবে সরব হতে পারে নি। কিন্তু বাংলাদেশ সম্পর্কে অ্যামনেস্টির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে নিজেদের বস্তুনিষ্ঠতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে মনে হয়েছে, এটি তাদের সচেতন বক্তব্য নয়। একাত্তরের গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে তারা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।  তারা ভুলে গেছে নুরেমবার্গ অথবা টোকিওতে সংঘটিত যোদ্ধাপরাধ বিষয়ক ট্রাইবুনালের কথা। যেমন তারা ভুলে যায় ফিলিস্তিন, ইরাক এবং আফগানিস্তানের গণহত্যার কথা। এভাবে তারা তাদের মানবাধিকারের স্লোগানকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে ফেলেছে।

 

‘আন্তর্জাতিক মান’ নিয়ে একটি আপ্তবাক্য বারবার তুলে ধরা হচ্ছে, কোন ব্যাখ্যা বা যুক্তি ছাড়াই। ‘আন্তর্জাতিক মান কী’ তা আজও কেউ বলতে পারে নি। মজার ব্যাপার হলো অ্যামনেস্টিও একইভাবে কোন দিকনির্দেশনা ছাড়াই বিচারের ‘আন্তর্জাতিক মান’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দেখা গেছে যে, প্রতিবেদনটি তাদের হলেও এর ভাষা ও ভোকাবুলারি ছিল পরিচিত, যা পরাজিত শক্তিরা আগেই ব্যবহার করে গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক মানের কথা বললে, বিশ্বের অন্যান্য স্থানে সংঘটিত যোদ্ধাপরাধের বিচারের সাথে তুলনা করতে হবে।  সেক্ষেত্রে সামনে আসে নুরেমবার্গ এবং টোকিওর বিচার কার্য। সেই তুলনায় বাংলাদেশের যোদ্ধাপরাধের বিচারকার্যে পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়েছে আসামীপক্ষকে। তারা যেন প্রস্তুতি নিয়ে নিজেদের পক্ষে সাক্ষ্যপ্রমাণ ও যুক্তি দাঁড় করাতে পারে, এর সুযোগ তারা পেয়েছেন। শেষ মুহূর্তে এসে ভুয়া সার্টিফিকেটও দাখিল করার সুযোগ তারা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই যোদ্ধাপরাধের বিচার কাজকে অসহযোগিতা করে এসেছে। সেখানকার জনৈক রাষ্ট্রদূত স্টিফেন র‌্যাপ যোদ্ধাপরাধের বিচারপ্রক্রিয়াকে কাছে থেকে যাচাই করেছেন। তার মতে, উভয় পক্ষ আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ পেয়েছে এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে তিনি পুরোপুরি সমর্থন করে গেছেন।

 

যোদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদেরকে ‘বিরোধী দলীয় নেতা’ হিসেবে পরিচিত করানোকে একটি অপকৌশল বলা যায়। এর উদ্দেশ্য হলো, বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনীতি সম্পর্কে অবগত নয়, এমন পাঠককে বিভ্রান্ত করা। অথবা, এটি নিতান্তই তাদের অজ্ঞতার পরিচয়। একটি দেশের অভ্যন্তরীন ইতিহাস, সংবিধান, আইন ইত্যাদি পর্যালোচনা না করেই তারা একটি নিবন্ধ লেখে ফেলে।

 

যোদ্ধাপরাধের বিচার একটি জুডিশিয়াল প্রক্রিয়ার বিষয়। এখানে আবশ্যিকভাবেই বাদী-বিবাদীর দ্বন্দ্ব আছে। এর ব্যবস্থাপনা নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ মতামত থাকবেই। একাধিক আন্তর্জাতিক সংগঠন বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক বিচার সম্পর্কে তাদের উদ্বেগের কথা প্রকাশ করেছে। অধিকাংশই বস্তুনিষ্ঠতার দাবি রাখে। কিন্তু অ্যামনেস্টির মতো একপাক্ষিক প্রতিবেদন আগে কেউ লেখে নি।

 

স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিরও অপরাধ আছে, একথা বলে অ্যামনেস্টি বুঝাতে চাচ্ছে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শুধু নাৎসি বাহিনি নয়, প্রতিপক্ষ জোটেরও বিচার হওয়া চাই! এ কথা বলে তারা শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের মহান অবদানকেই ছোট করে নি, স্বাধীনতা সংগ্রামকেও অস্বীকার করেছে। প্রশ্ন হলো, এ অভিযোগটি কি তারা সচেতনভাবেই দিয়েছে?

 

এটি ভুলে গেলে চলবে না যে, যোদ্ধাপরাধীর বিচার হয় বিজয়ী শক্তির মাধ্যমে। এখানে যখন স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকেও বিচারের দাবী করা হয়, তখন বলতে হয় যে, অ্যামনেস্টি কী বলছে তারা তা বুঝতে পারছে না। মুক্তিযোদ্ধাদের বিপক্ষে সুস্পষ্টভাবে অভিযোগ দিয়ে অ্যামনেস্টি একটি রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছে, যা কোন মানবাধিকার সংগঠনের জন্য অনাঙ্ক্ষিত।

 

প্রশ্ন হলো, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কীভাবে এত আত্মবিশ্বাস পায়। কীভাবে তারা একটি সার্বভৌম দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারে? কীভাবে তারা একটি দেশের জনগণের অনুভূতিকে আঘাত করে প্রতিবেদন লেখতে পারে? কোথায় তাদের ভিত? তার আগে প্রশ্ন করতে হবে, দেশের মৌলিক ইস্যুতে আমাদের রাজনীতিবিদেরা কি কখনও ঐকবদ্ধ হতে পেরেছেন? এসব প্রশ্নের সদোত্তর মিলবে না, কারণ এদেশের রাজনীতিতে এমন পক্ষও আছে যারা যেকোন মূল্যে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চায়। জনগণের জন্য রাজনীতি যেন শুধুই বক্তৃতার বিষয়। যোদ্ধাপরাধের বিচারের আয়োজন যারা করছেন, তারাও কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য/উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাদের নেই? তা যদি না হতো, তবে অ্যামনেস্টির মতো ভিনদেশি এই প্রতিষ্ঠান আজ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন লেখতে পারতো না।

গীতিকার গোবিন্দ হালদার: A Tribute

180115.pptx-crop

মুক্তিযুদ্ধের একটি সময়ে এরকম নিয়ম হলো যে, বিদেশী লেখক বা শিল্পীর গান স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রে পরিবেশন করা হবে না। ঠিক এভাবেই নিভৃতাচারি গোবিন্দ হালদারের নামটি আরও নিভৃতে হারিয়ে যায়। তার পূর্বে বেশ কিছুদিন তার রক্ত-গরম-করা গানগুলো স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রে পরিবেশিত হয়েছিল। ওই নীতিমালা গ্রহণের পর তার নামটি আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। এমনকি বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরও মুক্তিযুদ্ধে অবদানকারীদের তালিকায় তার নামটি থাকে নি। গোবিন্দ হালদারকে বাঙালী কেন তেমনভাবে জানে না, এই হলো দ্য ডেইলি স্টার থেকে প্রাপ্ত তথ্য।

এরপরের সরকারগুলো আর গোবিন্দ হালদারকে তেমনভাবে স্মরণ না করলেও, স্বাধীন বাংলাদেশের বেতার তার সাথে পরবর্তিতে একটি চুক্তি করে। কিন্তু চুক্তিমতো তিনি নিয়মিত গীতিকার হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। তার গানগুলো গাওয়া হলেও এর রয়্যালটি তিনি পুরোপুরি পান নি। “তারা আমাকে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত খরচের ভাউচার পাঠিয়েছে, আমি সইও করেছি।  তথাপি আমার ন্যায্য পাওনা থেকে আমি বঞ্চিত হয়েছি।” ১৯৮৫ সালের তারকালোকে প্রকাশিত তার নিবন্ধ থেকে উদ্ধৃত।

তিনি সেই গোবিন্দ হালদার, যিনি লেখেছিলেন- ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলো যারা’ ‘পূর্বদিগন্তে সূর্য ওঠেছে রক্ত লাল রক্ত লাল’ ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা’ ইত্যাদি জনপ্রিয় দেশের গানগুলো, যা শক্তি দিয়েছিল দেশপ্রেমিক বাঙালিকে, সাহস দিয়েছিল মুক্তিকামী যোদ্ধাদেরকে। দেশ স্বাধীন হবার পরপরই তার লেখা ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ গানটি যেন বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের আত্মার ধ্বনি হয়ে ওঠে। বীর শহীদদেরকে আপাময় বাঙালি শ্রদ্ধা জানাবার ভাষা খুঁজে পায় তার এই গানে। একাত্তর সালের যুদ্ধাবস্থায়ও গোবিন্দ হালদার তার নতুন প্রেরণদায়ক গানগুলো নিয়ে বিশেষ ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, যুদ্ধরত ও যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। মুক্তিকামী বাঙালির কাছে।

হালদার ১৯৩০ সালে ভারতের বনগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। বনগাঁওয়ে স্কুলজীবন শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তিতে তিনি ভারতের আয়কর বিভাগে চাকরি নেন এবং ১৯৮৮ সালে সেখান থেকে অবসর গ্রহণ করেন। প্রায় ৩,৫০০ সেমি-ক্লাসিক, বাউল, গণসঙ্গীত, আধুনিক গান এবং কীর্তন তিনি লেখেছেন। মেয়ে গোপা হালদারের মতে, প্রায় ৩,০০০ গান তার আজও অপ্রকাশিত। অনেক কবিতাও তার অপ্রকাশিত। অল ইন্ডিয়া রেডিও এবং দূরদর্শন তার কিছু গান প্রচার করেছে। ‘দূর দিগন্তে’ (১৯৮৯) নামে তার একটি কাব্য সংকলন বের হয়ে ছিল এবং ৫০০ কপির প্রায় সবগুলোই বিক্রি হয়েছিল। জানা যায়, অর্থাভাবে আর পুনর্মুদ্রণ করতে পারেন নি।

কিডনি সমস্যা নিয়ে গত ১৩ ডিসেম্বরে  কলকাতার জিতেন্দ্র নারায়ণ রয় পলিক্লিনিকে ভর্তি হন ৮৪ বছরের স্বদেশপ্রেমী গীতিকার গোবিন্দ হালদার। একমাসেরও বেশি সময় সেখানে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত ১৭ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন বাংলাদেশের এই অকৃত্রিম বন্ধু।

গত ডিসেম্বরে ভারত সফরের সময় আমাদের রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। আমাদের রাষ্ট্রপতি তাকে এই বলে সম্মান প্রদর্শন করেন: “তিনি আমাদেরই একজন। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন সাহসী যোদ্ধা ছিলেন।” অসুস্থতার খবর শুনে আমাদের প্রধানমন্ত্রীও তাকে ফোন করেছিলেন এবং তার চিকিৎসার যাবতিয় দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন মতাদর্শের সরকারগুলো তাকে যথাযথ মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হলেও, ২০১২ সালে স্ট্যান্ডিং ওভেশন সহকারে তাকে স্বাধীনতা-উত্তর সনদ প্রদান করে বাংলাদেশ সরকার। ফ্রেন্ডস অভ লিবারেশন ওয়্যার এওয়ার্ড নিতে অবশ্য তিনি আসতে পারেন নি, শারীরিক কারণে। তার কন্যা গোপা হালদার এসেছিলেন।

অনেক সাধারণ জীবনযাপন ছিল গোবিন্দ হালদারের। অসাধারণেরা আমজনতার কাছে এমনই ‘সাধারণ’ ছিলেন চিরকাল। এজন্যই হয়তো তার নামটি তত বিস্তৃতি পায়নি এই স্বাধীন বাংলাদেশে। কিন্তু তার অমর গানগুলো যতবার উচ্চারিত হবে দিগন্তে, ততবার মনে পড়বে সুরকার ও গীতিকার গোবিন্দ হালদারের কথা। শ্রদ্ধাঞ্জলি!

————————–

তথ্যসূত্র: দ্য ডেইলি স্টারসহ বিভিন্ন বাংলা পত্রিকা।

https://d19tqk5t6qcjac.cloudfront.net/i/412.html

https://d19tqk5t6qcjac.cloudfront.net/i/412.html

https://d19tqk5t6qcjac.cloudfront.net/i/412.html

https://d19tqk5t6qcjac.cloudfront.net/i/412.html

বিপুল ভট্টাচার্য – একজন সৈনিকের পতন: শ্রদ্ধার্ঘ্য

মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্যচিত্র দিয়ে তৈরি তারেক-ক্যাথরিনের ‘মুক্তির গান’ দেখার জন্য যে কী সংগ্রাম করেছিলাম সেদিন পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে! তখনও ছাত্র। সিনেমাহলে তখনও ছাড়া হয় নি। গায়ের লোম সব দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধকালীন স্লোগান শুনে আর বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাঙালির গেরিলা অপারেশনের চিত্র দেখে; আর একজন মরমী শিল্পীর গান শুনে। একটি গানের দল ট্রাকে করে মুক্তাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে গান গেয়ে প্রাণে শক্তি যুগিয়েছিলো মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধার পরিবার, শরণার্থী কেন্দ্রের বেদনাহত মানুষগুলোকে। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গান শুনতো স্বদেশের জন্য গৃহহারা মানুষগুলো, যেন গানেই তারা খাবার আর শক্তি পাচ্ছে! কেউ নিরবে চোখের পানি ফেলতো, কেউবা গানে দিতো কণ্ঠ। সেই গানের দলের প্রাণ ছিলেন একজন ষোল বছরের যুবক। তার চোখে ছিলো বিষণ্নতা; ঠোঁট-মুখ শুকনো; দেহে খুব মাংস নেই – কিন্তু কণ্ঠে ছিলো প্রাণ-জুড়ানো সুর আর শক্তি।

তিনি বিপুল ভট্টাচার্য, যাকে আমি পড়ে চিনেছিলাম। তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদ তাকে ‘মুক্তির গানের প্রাণ’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। বিপুল না থাকলে কোন মুক্তির গান হতো না। স্বদেশের অন্তরবিদীর্ণ-করা গানগুলোকে প্রাণ দিয়েছিলেন বিপুল তার যাদুকরি কণ্ঠ দিয়ে।

গতকাল টিভিতে সংবাদটি শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। বিশ্বাস করা কঠিন ছিলো। আজ ডেইলি স্টারে ‘ফল অভ্ এ সোলজার’ শিরোনামের খবরটি পড়ে নিশ্চিত হলাম: একাত্তরে শব্দসৈনিক এবং ‘মুক্তি সংগ্রাম শিল্পী সংস্থার’ অন্যতম প্রধান শিল্পী বিপুল ভট্টাচার্য আর নেই। ফুসফুস ক্যানসারের সাথে ২০১০ থেকেই যুদ্ধ করছিলেন বিপুল। গানও বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো আর আগে থেকেই।

ডালিয়া নওশিন, গানের দলের সহশিল্পী, জানালেন, বিপুল তখন খুবই তরুণ। খুবই উদ্যমী এবং আনন্দোচ্ছ্বল ছিলেন। দেশের দুর্যোগ পরিস্থিতি নিজের দরদি কণ্ঠ দিয়ে বিপুল বড় শিল্পী হিসেবে আভির্ভূত হন। আরেকজন সহশিল্পী শাহিন সামাদ বললেন, বিপুল শুধু তার বন্ধু ছিলো না, ছিলো তার শিক্ষকের মতো। স্বাধীন বাংলা বেতারের অন্যতম শব্দসৈনিক তিমির নন্দী ছিলেন বিপুলের বাল্যবন্ধু। তার মতে, বিপুলের ঈশ্বরপ্রদত্ত কণ্ঠ দিয়ে বাঙালির শেখরের গানগুলোকে জনপ্রিয় করেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের সাথে ওপপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন এই মহান শিল্পী, যিনি শেষ জীবনে গান না গাইতে পেরে আফসোস করে গেছেন। যতটুকু গেয়েছেন, তারই বা কতটুকু প্রতিদান তিনি পেয়েছিলেন, তিনিই তা বলতে পারবেন। ছাত্রজীবনে আমার তরুন হৃদয় দগ্ধ হয়েছিলো এই মরমী শিল্পীর দরদি গানে। দেশের প্রতি কতটুকু মায়া আর ভালোবাসা থাকলে এমন প্রাণ-জুড়ানো গান গাওয়া যায়! মুক্তির গানেই আসল বিপুলকে আমি দেখেছিলাম। কেউ যদি ‘মুক্তির গান’ না দেখে থাকেন, তবে বিপুলকে চেনা যাবে না, তার মূল্যও বুঝা যাবে না। আজ তার মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত এবং বেদনাহত। গভীর শ্রদ্ধা জানাই মহান শিল্পীকে!

———————————————-

*আজকের জাতীয় দৈনিকে বিপুল ভট্টাচার্য:
দ্য ডেইলি স্টার
দৈনিক প্রথম আলো
ঢাকা ট্রিবিউন

**মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমার লেখাগুলো
১) মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান
২) দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ
৩) কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি
৪) চরমপত্রের চরম লেখক


[‘মুক্তির গান’ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য: বাঁ থেকে চতুর্থজন বিপুল ভট্টাচার্য্য]

লেখাটি সঞ্চালক কর্তৃক নির্বাচিত হয়েছিলো।

লেখাটি সঞ্চালক কর্তৃক নির্বাচিত হয়েছিলো।

গণজাগরণের সহজিয়া

1111111

নষ্ট রাজনীতিতে মেতে থাকুক ভ্রষ্টরা
প্রজন্ম জেগেছে বিজয় আনার জন্য।
জয় বাংলা জন্মান্তরে এসেছে বাঙালির
চূড়ান্ত জয়ের জন্য।

তারা কি জানে যে,
মঞ্চ ভাঙলেও চেতনাকে ভাঙা যায় না,
ভাঙতে পারে না?
গণজাগরণ মঞ্চের সফলতা অর্জিত হয়েছে কত আগেই!
সারা বাংলাদেশে যা ছড়িয়ে পড়েছে
সেটা শাহবাগে আর না থাকলেই কী?
নতুন ফল জন্মনোর পর
বীজের আর কী প্রয়োজন!

 

[ শব্দনীড় ব্লগ – এ পাঠকের মন্তব্য ]

 

কী আশ্চর্য ‘জয় বাংলা’ বললে এখন আর কেউ আমুলিক বলছে না!!

আমার এক মুক্তিযোদ্ধা চাচা কথায় কথায় বলতেন ‘জয় বাংলা’ – বিস্মিত হলে ‘জয় বাংলা’, হতাশ হলেও একই কথা! আর আনন্দ পেলে তো কোন কথাই নেই। ছোটকালে তিনি অনেক গল্প শুনিয়েছেন গেরিলা যুদ্ধের। কীভাবে তারা একটির পর একটি অপারেশন সফল করে পাকবাহিনীর ঘাঁটিগুলো গুঁড়িয়ে দিচ্ছিলেন। অনেক ব্যথা-বেদনার স্মৃতিও আছে। আছে স্বজন হারানোর বেদনা। কিন্তু সব বেদনাকে মুহূর্তে ভুলে যেতেন যখন একটি অপারেশন বা গেরিলা আক্রমণের পরিকল্পনা সামনে আসতো। সকল ব্যথাকে অট্টহাসিতে ওড়িয়ে দিতেন একটি অপারেশন সফল হলে।

“তোমাদের এতো ত্যাজ আসতো কোথা থেকে?” অবুঝ আমি দু’গালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করতাম। জবাবে আমার চাচাটি অনেক কথাই বলতেন, যার সবকিছু আমি বুঝতাম না, শুধু একটি কথা ছাড়া। দু’চোখে রক্তরোষ নিয়ে তিনি সেদিন বলেছিলেন, “দূর বোকা, ওদের তো জয় বাংলার মতো একটি রক্ত-গরম-করা স্লোগানই নাই! ওরা কীভাবে আমাদেরকে পরাজিত করবে!” জয় বাংলা বললে নাকি রাতের ভুতও পালাতো, পাঞ্জাবি তো দূরের কথা!

সে জয়বাংলা দেশ স্বাধীন হবার পর হয়ে গেলো দলীয় স্লোগান। অসম যুদ্ধে জয় বাংলা ধ্বজাধারীদের আত্মার জোর দেখে প্রতিবেশী দেশসহ সারা পৃথিবী সাহস যোগালো, সহযোগিতা দিলো, গান গাইলো। মাত্র নয়মাসে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষায় দেশ স্বাধীন হলো, কিন্তু জয়বাংলা হয়ে গেলো প্রায় নিষিদ্ধ। জয়বাংলা হয়ে গেলো হিন্দুদের স্লোগান!

জয় বাংলা নামক একটি স্লোগানে দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা শক্তি যুগিয়েছিল। জয়বাংলা শুধুই একটি স্লোগান ছিল না, এটি ছিল যুদ্ধ-আক্রান্ত বাঙালির জাতীয় পরিচয়। “আপনি কি জয়বাংলার লোক?” এপ্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ হলে শুরু হতো বাঙালির মধ্যে নতুন আত্মীয়তা, নতুন সম্পর্ক। মুক্তিযুদ্ধকালে জয়বাংলা বলে ভারতে বিনামূল্যে ট্রেনভ্রমণ করা যেতো। কিন্তু আজকাল জয়বাংলা বললে হয়তো আমাকে প্রথমেই একটি গোষ্ঠীভুক্ত করা হবে, অথচ ব্যক্তিগতভাবে বৃহৎ কোন দলের প্রতিই আমার আনুগত্য নেই বা ছিলো না। জয় বাংলাকে আমি বিজয়-আনয়নকারী রণধ্বণি বলেই জানি।

আজ তরুণ প্রজন্ম জেগেছে, তারা ফিরিয়ে এনেছে মুক্তিযুদ্ধের সিকোয়েল – মুক্তিযুদ্ধ দুই! স্বদেশপ্রেমে রেনেসাঁ এনে তারা সমগ্র জাতিকে আজ একত্রিত করলো। কথা অনেক বলা হয়েছিলো, তাই তারা নির্দেশ দিলো “এবার নীরব হোন”। দেশবাসীকে তিন মিনিট নীরব করিয়ে তারা প্রমাণ করলো যে, জয় বাংলা ফুরিয়ে যায় নি। পদ্মা মেঘনা যমুনা যে আপনার আমার ঠিকানা, একথাই ভুলতে বসেছিলাম। আজ তারা স্মরণ করিয়ে দিলো তাদের লক্ষকণ্ঠের বজ্রধ্বনি দিয়ে যে, এদেশ স্বাধীন হয়েছিলো রাজনৈতিক একতা দিয়ে ধর্মীয় চেতনা দিয়ে নয়। আজ লক্ষ লক্ষ তরুণ একত্রিত হয়ে জয় বাংলাকে ফিরিয়ে এনে যেন বাংলা মা’কে শাড়ি পড়ালো, জয় বাংলার শাড়ি! কী আশ্চর্য ‘জয় বাংলা’ বললে এখন আর কেউ আমুলিক বলে গালি দেয় না। জয় বাংলা!

 

প্রথম আলো ব্লগে এবং সামহোয়ার ইন ব্লগে প্রকাশিত।