Tagged: মমতা

কলকাতা ভ্রমণের সারসংক্ষেপ

ভিনদেশে ভ্রমণকে স্বস্তিদায়ক করে তোলার জন্য আগেই কয়েকটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলাম। যথা: স্থানীয় খাবার খাবো, বিপদে না পড়লে ট্যাক্সি নেবো না, হোটেলের সাথে স্থায়ি চু্ক্তি করবো না, যেখানে রাত সেখানেই কাত হবো! অর্থাৎ যে এলাকায় আমার ভ্রমণ শেষ হবে, সেখানেই হোটেল খুঁজে রাত কাটাবো। অবশ্য কলকাতা না হলে ওরকম চিন্তা করা যেতো না। এয়ারপোর্ট থেকে বের হবার পথে ডলারকে রুপিতে রূপান্তর করে বের হলাম। কোন গাইড নেই, যাকে যখন পাই, তার কাছ থেকেই পরামর্শ নেবো। বের হবার পথে একজনকে পেয়ে শান্তি নিকেতনে যাবার কথা জিজ্ঞেস করতেই উত্তর এলো এভাবে: আপনি সান্তিনিকেতন যাবেন? তাহলে তো আপনাকে হাওড়া গিয়ে ট্রেনে ভোলপুরে যেতে হবে। বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য দ্বিতীয়বার যাকে সামনে পেলাম, তিনি উত্তরে বললেন: বাংলা মালুম নেহি। ইংরেজিতেও যা চাইলাম, তিনি হিন্দিতে সে বিষয়ে অপারগতা জানালেন। এবার ভাবলাম, সত্যিই তবে ভারতে আসা হলো। মাত্র এক ঘণ্টায় কলকাতায় নেমে আমার মনেই হয় নি যে, আমি কোন ভিন দেশে এসেছি।

হাঁটতে থাকলাম সামনের দিকে। ডান দিক দিয়ে বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় বের হয়ে যাচ্ছে কলকাতার ফ্লাইওভারগুলো। আধুনিক শহরের চিহ্ন চারপাশে। একটি সাইনবোর্ডে মমতা বন্দোপাধ্যায় আমাকে ‘পশ্পিমবঙ্গে স্বাগত’ জানালেন, জোড় হাতে। ভেতর থেকে কোন তাড়া না থাকলেও অনিশ্চিতভাবে দাঁড়িয়ে থাকলাম বাস স্টপে। পাশে যারা দাঁড়িয়ে আছেন, বেশভূষণে সকলকেই স্থানীয় মনে হচ্ছে। একটি মাত্র ব্যাকপ্যাকে আমাকেও খুব বেশি ‘বিদেশী’ দেখাচ্ছে বলে মনে হয় নি।

প্রায় মিনিট বিশেক পর একটি এসি বাস এসে থামলো। ওঠে জিজ্ঞেস করলাম কুটিঘাট যাবে কি না। বাস কন্ডাক্টর নিকটস্থ একটি বাস স্টপের নাম জানতে চাইলেও আমি কোন উত্তর দিতে পারলাম না। গরজও করলাম না। ভেতরে প্রবেশ করলাম – যেখানে বাস যাবে সেখানেই আমি যাবো! পাশের সহযাত্রীকে এবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘বেলুর মঠ যাবার জন্য কুটিঘাটে’ যাওয়া যায় কীভাবে। মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক স্মিত হেসে বললেন, এই বাসে তো আপনার ‘কোই ফায়দা’ নেই বাবু! তার বক্তব্য হলো, আমি নাকি সম্পূর্ণ উল্টোপথে চাচ্ছি। সাহায্যের জন্য তিনি বললেন, এবার আপনি ‘উল্টাডাঙ্গা’ নেমে ডান দিকের বাস ধরতে পারেন। উল্টোপথে এসেছি বলেই কি এখন আমাকে উল্টাডাঙ্গা নামতে হবে? B-)

যা হোক, বাস এগিয়ে চলেছে। দুদোল্য মনে এবার জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে সাইয়েন্স সিটিতে যাওয়া যায় কীভাবে। আমার পাশের সহযাত্রীটি এবার খুশি হলেন: এ বাসেই সাইয়েন্স সিটিতে যেতে পারবেন – এটি ঠিক সেখানেই থামিয়ে যাবে। স্বস্তি পেলাম, যাক একটি জায়গায় তো যাওয়া যাবে! অতএব গন্তব্য সাইয়েন্স সিটি। সচক্ষে যা দেখলাম, সাইয়েন্স সিটি হলো কলকাতার নির্মিয়মান একটি বিনোদন কেন্দ্র। স্পেইস থিয়েটারটি বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটারের চেয়ে বেশি কিছু নয়। রয়েছে টাইম মেশিন সিমিউলেটর যাতে আছে অতীত পৃথিবীর কিছু বাস্তব নির্দশন। আছে ত্রিমাত্রিক থিয়েটার এবং ইভোলিউশন পার্ক। প্রবেশপত্র মাত্র বিশ টাকা হলেও ভেতরে গিয়ে প্রতিটি প্রদর্শনীর জন্য আলাদা টিকেট কাটতে হয়। বেশি আকর্ষণ টাইম মেশিনে, কিন্তু সিট মাত্র তিরিশটি।

ব্যাকপ্যাক বুকে জড়িয়ে ধরে মুগ্ধ নয়নে কলকাতা দেখছি। ভক্সওয়াগন টাইপের হলুদ ট্যাক্সিতে পরিপূর্ণ। বড় বড় বিলবোর্ড। তাতে বেশির ভাগই ইন্সুরেন্স, ব্যাংক আর আবাসন বিষয়ক বিজ্ঞাপন। ঢাকার রাস্তা ঘাটের মতো রাজনীতিকদের ছবিতে কলকাতার দেয়াল পূর্ণ নয়। তবে মমতাহীন* মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নাম ও ছবি দেখতে পাচ্ছি বিভিন্ন ব্যানারে। পক্ষী প্রদর্শনী থেকে শুরু করে, নাট্য প্রতিযোগিতা কিংবা বিবেকানন্দের চেতনাসভা, সর্বত্রই মমতা। সিনেমার পোস্টারে প্রসেনজিতের ছবিই বেশি: জাতিস্মর, হনুমান ইত্যাদি। নতুন ছবি আসছে – চাঁদের পাহাড়। বাসে যাত্রীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে – এবার দাঁড়ানোর জায়গাটুকুও পূর্ণ হচ্ছে মেয়ে-পুরুষ যাত্রীদের দ্বারা। গণপরিবহনে নারী যাত্রীদের চিরাচরিত অস্বস্তি বা দ্বিধা দেখা যায় নি কলকাতার দিদি-মাসিদের মধ্যে। বাসের এক জায়গায় ইংরেজিতে লেখা আছে, একদম যতটুকু ভাড়া ততটুকুই দিতে হবে, বড় নোট দেওয়া যাবে না। আমি প্রমাদ গুণতে লাগলাম।

এসি বাস বিভিন্ন স্টপিজ পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে। ওদিকে এগিয়ে আসছে বাস কন্ডাক্টর! গন্তব্য জিজ্ঞেস করলে নিয়মিত যাত্রীদের মতোই আত্মবিশ্বাসের সাথে জানিয়ে দিলাম যে, এয়ারপোর্ট থেকে সাইয়েন্স সিটি থামবো। ধরিয়ে দিলাম পঞ্চাশ টাকার নোট। পাঁচ টাকা চেইন্জ আছে কিনা জানতে চাইলো, যা সঙ্গত কারণেই আমার কাছে নেই। হয়তো ভাড়া হবে পঁয়তাল্লিশ টাকা। এরকম পরিস্থিতি খুব সম্ভব তারা সমমানের একটি কুপন দেয় যা পরবর্তিতে একই বাসে যাতায়াতে ব্যয় করা যায়। কিন্তু আমার পাশের সহযাত্রীটি হিন্দিতে জানিয়ে দিলেন যে, আমি স্থানীয় নই এবং আমাকে টাকা দিয়েই নিষ্পত্তি করতে হবে। অবশেষে চল্লিশ টাকার টিকিটসহ দশ টাকা ফেরত পেলাম।

আরও চার-পাঁচটি স্টেশন অতিক্রম করার পর সাইয়েন্স সিটিতে নামার ডাক পেলাম। নেমে তো সাইয়েন্স সিটির কোন চিহ্নই পেলাম না। চারপাশের শহর দেখতে লাগলাম। প্রাচীন শহরের কোন নির্দশন এখানে পেলাম না। একটি পারিবারিক দল এসে আমাকে আচমকা জিজ্ঞেস করলো সাইয়েন্স সিটি কোনদিকে। এরকম আস্থাশীল জিজ্ঞাসায় ভেতর থেকে আনন্দিত হলেও তাদেরকে কোন সদুত্তর দিতে পারলাম না। তবে এরপর থেকে তাদের পিছু নিলাম। তারা রাস্তা পার হলেন, আমিও হলাম। ডান দিকে বাঁকানো একটি পায়ে-হাঁটা রাস্তায় আরেকটি বড় সড়কের বাঁ পাশে পেলাম সাইয়েন্স সিটির প্রবেশ পথ। সামনে ঢাকার শিশু পার্কে প্রবেশপথের মতো অস্থায়ি খাবারের বেশ কিছু দোকান। তবে কোথাও চটপটির দোকান নেই! নিচে বাস স্টপিজ, ওপরে ফ্লাইওভার।

বিজ্ঞানের কৃতীত্ব দেখার জন্য সাইয়েন্স সিটিতে আসি নি। মনে হয়, ভারতীয়রাও স্রেফ বিনোদনের জন্যই আসেন। সকল বয়সের দর্শনার্থীর ভিড় দেখে তাই মনে হলো। ভবনগুলোর মাঝখানে পার্ক এবং বসার জায়গায় বসে আছেন বিভিন্ন বয়সের দর্শনার্থীরা। লাইন ধরে প্রবেশ টিকিট নিলাম। ভেতরেও প্রতিটি প্রদর্শনীর জন্য দীর্ঘ লাইন পেলাম। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও টাইম মেশিনের পরবর্তি প্রদর্শনীর টিকিট পেলাম না। প্রথম দিনের ভ্রমণের ক্লান্তি, পেছনের ব্যাগ এবং দাঁড়ানোর ঝক্কি নেবার পর ‘না পাওয়ার’ বিষয়টি আরও ক্লান্ত করে দিলো। লাইন ছেড়ে বের হয়ে গেলাম – কিছুই দেখবো না! সিঙ্গাড়ার জোড়া পনের ও বিশ। সাথে কাগুজে থালায় পাতলা রকমের একটু সস। দোকানী পরিস্কারভাবে বাংলা বলতে পারে না – হিন্দি মিশ্রিত। সিঙ্গাড়াতেও মিশিয়েছে অজানা কোন মসলা। তবু শাহবাগের সিঙ্গাড়ার মতো মজা পেলাম না। ক্ষুধা মেটালাম। সামনের পার্কে বসে বিশ্রাম নিলাম ও চারপাশের কিছু দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করলাম। কিছুই না দেখে বের হলে সেটা পরে আফসোসের কারণ হবে। তাই স্পেইস থিয়েটারের টিকিটের জন্য ফের লাইনে দাঁড়ালাম। একটি এডভেন্চার মুভি। দেখলাম করোরেডো নদীতে পানির প্রবাহ। মোরাল হলো: মিঠা পানি ব্যবহারে আমাদেরকেও আরও মিতব্যয়ী হতে হবে।

কলকাতা ভ্রমণের সারসংক্ষেপ

কলকাতা ভ্রমণের প্রথম উদেশ্য ছিলো প্রাচীন এবং অবিভক্ত বাংলার প্রধান শহর ক্যালকাটাকে দেখা। সেটি পরবর্তি দিনগুলোতে দেখেছি। ব্রিটিশ আমলের লাল ও দীর্ঘ দালানগুলোতে পরিপূর্ণ কলকাতা শহর। চামড়ার ব্যাগে এখনও পানি বহন করে মানুষগুলো। রাস্তায় এখনও পানির কল আছে। ১৯৩২ সালে প্রতিষ্ঠিত নিজামস রেস্তোরাঁয় খেয়েছি। থেকেছি ধর্মতলার একটি হোটেলে, সেটিও একটি প্রাচীন ভবন। নিকটবর্তী এলাকা তালতলায় মাদার তেরিজা হোম এবং ভিক্টোরিয়া স্মৃতি প্রাসাদ। দু’টি জায়গাই ঐতিহাসিক এবং অতীত-বিলাসী হিসেবে আমার জন্য যথেষ্ট আনন্দদায়ক ছিলো। গিয়েছিলাম হাওড়া জেলায় অবস্থিত বেলুর মঠেও। উদ্দেশ্য হুগলি নদী দেখা। সেই ছুঁতোয় দেখা হলো বৃহৎ মন্দির দক্ষিণেশ্বরও। চোখে পড়েছে হাজী মুহম্মদ মহসিন চত্ত্বর, হাজী মহম্মদ মহসিন সরনি এবং বিদায় নিয়েছি কাজী নজরুল ইসলাম সরনি দিয়ে বিমানবন্দরে এসে। কথোপকথনে বাংলা ভাষার ব্যবহারে যে অবহেলা দেখেছি, তা যদি কলকাতার সত্যিকার চিত্র হয়, তবে সেটি হবে অত্যন্ত ব্যথাদায়ক। আমাদের মতো গর্ব ভরে ওখানে কেউ বাংলা বলতে শুনি নি। বাংলাকে নিজের ভাষা হিসেবে কেউ বলে নি আমার সামনে। উচ্চবিত্তরা ইংরেজি মেশায় আর নিম্নবিত্তরা মেশায় হিন্দি। কেবল ভিক্ষুক আর ঠেলাগাড়িওলাদের মুখে অমিশ্রিত বাংলা শুনার সৌভাগ্য হয়েছে। তবে সেটি খুবই নগণ্য।

*মমতাহীন মমতা বন্দোপাধ্যায় বলার কারণটি বোধ হয় সকলেরই জানা। তিস্তা পানিচুক্তিতে মমতার মারমুখী বিরুদ্ধাচরণ বাংলাদেশীদেরকে হতাশ করেছে। অন্যদিকে আমরা তার স্বদেশপ্রেমে মুগ্ধ হয়েছিলাম। কিন্তু বিষয়টি পুরোপুরি রাজনৈতিক চাল। খবরের ভেতরে গিয়ে অন্য খবর পেলাম। কেন্দ্রীয় সরকার এবং তৎকালীন অর্থমন্ত্রী প্রনব বাবুর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের একটি বিশেষ অনুদান না পাওয়ার কারণে হতাশ মমতা প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃক আয়োজিত ওই পানিচুক্তিতে পানি ঢেলেছেন। আরেকটি কারণ ছিলো, হাসিনা সরকারের বিরোধীতা করে পশ্চিমবঙ্গের উর্দভাষী বিহারি মুসলিমদের সমর্থনকে স্থায়ী করা। মমতা একজন ঝানু রাজনীতিবিদ না হলে শত বছরের কংগ্রেস থেকে বের হয়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে জনগণের কাছে এতো ‘আবেদনময়’ করতে পারতেন না।

কিছু ছবি: অনেক ছবি তুলেছি। সব দেওয়া গেলো না :(


[ দু’টি রাস্তার সংযোগ স্থলে ‘ইন্দিরা উদ্যান’ – স্থাপত্যটির শিরোনাম: নারীর ক্ষমতায়ন। নিচে শোয়া জীর্ণ-দেহী পুরুষটি কি শিরোনামটিকে তাচ্ছিল্য করছে না? ]