Tagged: ভালো লেখার রহস্য

লেখার ‘মুড’ না থাকলে আপনি কী করেন/করবেন? লেখকের মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল ভাঙার উপায়…

writers-block (2)

১.

কেউ বলেন বসন্তকাল এলে আমার লেখার ভাব আসে।  পাখ-পাখালির ডাক আর ফুলের গন্ধ আমার জন্য নিয়ে আসে লেখার বার্তা। শরতের শুভ্র কাশফুলের মেলা কোন লেখকের জন্য অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। বলুন, শীত না এলে কি কিছু লেখা যায়? কিন্তু কেউ আবার বলেন, বর্ষাকালই আমার লেখার সময়। টিনের চালে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ আমার লেখার মুডকে সচল করে দেয়। কেউ বলেন সবঋতুতেই আমি লেখতে পারি, শুধু রাতটা একটু গভীর হতে হয়।

 

কেউ কেউ একটু অদ্ভুত কিসিমের। বলে কিনা, হাতের কাজ শেষ না করে আমি লেখতে বসে পারি না! বাচ্চাকে ঘুম পাড়িয়ে, হাড়িপাতিল ধুয়ে, বাচ্চার বাপরে ‘গুডবাই’ জানিয়ে তারপর আমি লেখার মুড হাতে পাই। বাসনকোসন ধোয়ার সময় হলো বই লেখার পরিকল্পনা করার শ্রেষ্ট সময় (আগাথা ক্রিস্টি, ক্রাইম নোভেলিস্ট)। কেউবা বলে, গ্যাসবিদ্যুৎপানির বিল, বাড়িভাড়া, স্কুলের বেতন, গাড়ির তেল, অর্থাৎ মাসের সব বিল পরিশোধ না করা পর্যন্ত আমি লেখায় মন বসাতে পারি না। অতএব লেখালেখি সবকিছু মাসের পনের তারিখের পর।

 

আরেক পক্ষ আছে যারা ব্লগার নামে পরিচিত। তাদের কেউ কেউ বলেন, ব্লগের টেম্পলেট ছাড়া তাদের লেখার মুড আসে না। এমনকি অফলাইনে বা এমএস-ওয়ার্ডে গেলেও হবে না। ব্লগ ছাড়া লেখার ভাব আসে না!

 

পরীক্ষা খারাপ হয়েছে, বা আম্মুর সাথে ঝগড়া হয়েছে, অথবা সোয়ামি/বিবির সাথে কিঞ্চিৎ মনোমালিন্য হয়েছে, অথবা কাছের বন্ধুটির সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। এরকম পরিস্থিতিতে কি কিছু লেখা যায়, বলুন?

 

এরা সকলেই পরিস্থিতির কাছে আবদ্ধ। পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলে তারা লেখতে পারেন না। ভাবনার স্বাধীনতা হয়তো এদের আছে, তবে সেটি কোন একটি শর্তের অধীন। এটি এক প্রকার মানসিক অবস্থা, যাকে নেতিবাচক-ইতিবাচক কিছুই বলা যায় না।

 

লেখার জন্য ‘ভাবনার স্বাধীনতাকে’ বিবেচনায় এনে, চলুন দুনিয়ার লেখককুলকে দু’ভাগে ভাগ করে নেই।  একদলের নাম দিলাম, গণ্ডিভুক্ত। আরেক দলের নাম গণ্ডিমুক্ত। গণ্ডিভুক্ত যারা, তারা সবসময় লেখার জন্য একটি অজুহাত/কারণ/উসকানির প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন। অতএব, লেখার শুরুতে যাদের কথা বললাম, তারা হলেন গণ্ডিভুক্ত।

 

এবার বলছি, গণ্ডিমুক্ত লেখকদের কথা। কবি টাইপের এই লেখকেরা একটু স্বাধীনচেতা। কবি টাইপ বলতে অত্যাবশ্যকভাবে কবি বা কবিতার লেখককে বলছি না। কবিতার লেখক হতে পারেন, অথবা গল্প/প্রবন্ধের লেখকও হতে পারেন। লেখক মানসকে বুঝাচ্ছি। তারা চলন্তগাড়িতেও দিব্বি লেখে যান। হাঁটতে দৌড়াতে সাঁতার কাটতে ওয়ার্কআউটে ঘুমাতে ইয়ে করতে সবকিছুতে তারা লেখে চলেন। কলম নিয়ে অথবা কলম ছাড়া। কমপিউটারে অথবা শূন্য আকাশে। লেখে অথবা না লেখে। সকল অবস্থায় তারা লেখে চলেন। কিছু লেখা কাগজে পায় প্রকাশ, কিছু লেখা থেকে যায় মস্তিষ্কে। লেখা থেমে থাকে না।

 

উচ্ছ্বাস আবেগ চেতনা দ্বারা যারা তাড়িত হন, তাদের না আছে পরিস্থিতির প্রয়োজন, না আছে কোন প্রতিবন্ধকতা। মার্কিন কবি ও সমাজকর্মী মায়া এন্জেলো’র মতে, মানুষের ভেতরে না-বলা-কাহিনির যে বেদনা, এর চেয়ে পীড়াদায়ক আর কিছু নেই।

 

২.

লেখক কখনও পরাধীন নন। তিনি পরিস্থিতির অপেক্ষায় থাকেন না, পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন। তিনি খণ্ডকালীন লেখকও নন। তিনি দিনের চব্বিশ ঘণ্টা এবং সপ্তাহের সাতদিনই লেখক। হতে পারে, তার অন্য একটি পেশাগত নাম আছে। হতে পারে, তার অন্য একটি সামাজিক পরিচয় আছে। তিনি লেখক সবসময়ের। কিন্তু মনের ভেতর একটি অদৃশ্য দেয়ালের কারণে গভীর জীবনদর্শন থাকলেও অনেকেই লেখতে পারে না। তার আত্মপ্রকাশের বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে একটি মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল। নিজে ছাড়া কেউ তা জানে না।

 

প্রশ্ন হলো, এই মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল কীভাবে অতিক্রম করা যায়? লেখক কি সবসময়ই পরিস্থিতি-নির্ভর হয়ে থাকবেন বা থাকেন? আমি মনে করি, না। লেখার চিন্তা মাথায় থাকার পরও লেখতে না পারার এই সমস্যাটি প্রাথমিক পর্যায়ের। কেউ স্বাভাবিক নিয়মেই একে অতিক্রম করেছে, কেউবা সচেতন চেষ্টার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে।

 

মনস্তাত্ত্বিক দেয়ালটি ভাঙার জন্য প্রথমেই নিজের সাথে বোঝাপড়াটুকু শেষ করে নেওয়া প্রয়োজন। বিষয়টি একান্তই নিজের সাথে নিজের। প্রশ্নটি হলো কেন লেখক হতে হবে? কী ‘বিষয়’ আছে যে, তা লেখে যেতে হবে? ডায়েরি লেখে লেখক হয়েছিলেন জার্মানির অ্যান ফ্রান্ক। তিনি বলেছিলেন, লেখার মধ্য দিয়ে আমি সব (নেতিবাচকতা) ঝেড়ে ফেলতে পারি। আমার দুঃখ সব দূর হয়ে যায়, সেখানে জন্ম নেয় সাহস। তার মতে, লেখার মধ্য দিয়ে সমাজে নিজের আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয়।

 

যারা নিজের সময়-সমাজ-প্রেক্ষিতকে ইতিহাসের ক্যানভাসে এঁকে যেতে চান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য, তারা লেখা থেকে শক্তি পাবেন। মার্কিন ছোটগল্প লেখক স্কট ফিটজেরাল্ট বলেছেন, আপনি ‘বলতে চান’ বলেই যে লেখছেন বিষয়টি তা নয়, বরং আপনার ‘বলার কিছু আছে’ বলেই আপনি লেখেন

জীবনকে এর নিজস্বতায় না দেখলে এই বলার ভঙ্গি সৃষ্টি হয় না। এটি আসে স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই – জীবনকে যাপন করার মধ্য দিয়ে। সচল রাখতে হয় স্বাভাবিক অনুভূতিগুলো: আনন্দ পাওয়া, মজা পাওয়া, বিস্মিত হওয়া, তৃপ্ত হওয়া ইত্যাদি। লেখক নিজে যদি বিস্মিত না হন, তবে তার কথা পাঠককে কখনও বিস্মিত করবে না। লেখক অনুভূতিপ্রবণ। তার অশ্রু ঝরলে পাঠকেরও অশ্রু ঝরবে (রবার্ট ফ্রস্ট)।

 

৩.

মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল। প্রতিনিয়ত আমরা ভেতরের অগণিত দেয়াল ভেঙ্গে চলি। এভাবে আমরা সামাজিক প্রাণীতে উন্নীত হই। মনে পড়ে, প্রাইমারি স্কুলের লাজুক সময়ের কথা অথবা ছোটবেলার স্বার্থপর সময়গুলোর কথা, যখন সবকিছুকে ‘নিজের’ মনে হতো? দেয়াল ভাঙ্গার মধ্যেই যেন নিজেকে প্রকাশের সকল রহস্য আটকে আছে। লেখতে গেলে প্রথম যে দেয়ালটি ভাঙতে হয় তা হলো, নিজের সামর্থ্য সম্পর্কে ভয়ঙ্কর অবিশ্বাস। এত লেখকের ভিড়ে আমি আর কী লেখবো, এরকম মনোভাব লেখক সত্ত্বাকে জন্মের আগেই মৃত্যু ঘটায়।

 

লেখক হবার বিষয়টি স্বাভাবিক হোক, কিংবা সচেতন প্রচেষ্টার মাধ্যমে হোক, লেখক কিছু প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলেন। স্বাভাবিক ধারাতেই দেয়াল ভেঙ্গে চলেন। এগুলো তাকে লেখক হিসেবে স্বাধীন সত্ত্বা দান করে। অভ্যাসবশতই মানুষ এমন কিছু করে, যা তাকে লেখক হিসেবে গড়ে তোলে। যেমন: বইপড়া, প্রকৃতির প্রতি অনুভূতিশীল হওয়া, রোজনামচা রাখা ইত্যাদি। কেউবা ইচ্ছাকৃতভাবেই কিছু অতিরিক্ত কাজ করেন, যার মধ্য দিয়ে তিনি লেখকের মনোভাব লাভ করেন। এসব নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা করার চেষ্টা করেছি। কিছু বিষয়কে আমি তারকাচিহ্নিত করেছি, যা নবীন লেখকদের জন্য বিশেষ উপকারী।

 

  • প্রিয় লেখকের বই পড়া: প্রিয় এবং নিজের ঘরানার লেখক/বিষয়ে বই পড়া। পড়ার বিকল্প একটি বিষয়ই আছে। সেটি হলো, পড়া। ইন্টারনেটের যুগে পড়া আরও সহজ হয়েছে।
  • প্রচলিত মাধ্যমের সাথে সংযোগ রাখা: অনেক সময় একটি সিনেমা দেখে লেখক অনুপ্রাণিত হয়ে সম্পূর্ণ মৌলিক একটি রচনা সৃষ্টি করেন। ব্লগ/পত্রিকা পড়া, নাটক দেখা এবং বন্ধুর সাথে আড্ডা দেবার অভ্যাসকে ধরে রাখা।
  • চোখ-কান-নাক সচল রাখা: নিজের পর্যবেক্ষণকে সচল রেখে এবং অনুভূতিশীল থেকে সামাজিক জীবনকে বোঝার চেষ্টা থাকা।
  • *লেখার উদ্দেশ্য থাকা: নজরুল চেয়েছিলেন ঔপনিবেশিক শাসনের বিলুপ্তি আর নিজের সমাজে সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্য। স্টিভ জবসের বায়োগ্রাফার (ওয়াল্টার আইজাকসন) চেয়েছিলেন তার লেখায় স্টিভ জবসকে মানুষ চিনুক।
  • লেখার অডিয়েন্স ঠিক থাকা: লেখার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পাঠকশ্রেণী লেখকের মনে থাকা। অনেক নবীন ব্লগার আছেন, যারা ব্লগের পাঠকদের মনোভাবকে লক্ষ্য করে লেখেন। (এটি অবশ্য সকলের ক্ষেত্রে কার্যকর নয়।)
  • প্রতিদিন লেখা: লেখক হতে চাইলে আপনাকে প্রতিদিন লেখতে হবে, কারণ (পানি আনতে) কূয়োর কাছে আপনি মাঝে মাঝে যান না, প্রতিদিনই যান (ওয়াল্টার মোসলি)।
  • সহজ উপস্থাপনা: লেখার বিষয় ও ভাষাকে যথাসম্ভব সহজ ও প্রাঞ্জল রাখার চেষ্টা।
  • *ঘুমানো/ ঠাণ্ডা মেজাজ: সুযোগ পেলে লেখার পূর্বে ঘুমিয়ে নেওয়া। ঘুমের ওপর ওষুধ নেই। সেরা মুড-বুস্টার। মেজাজ স্বাভাবিক তাপমাত্রায় থাকলে ভালো। এলক্ষ্যে অনেকে ইয়োগা চর্চা করেন।
  • গুণী মানুষের উদ্ধৃতি: উদ্ধৃতিকে বলা যায় একেকটি দর্শন-কণা যা একটি জীবনমুখী সত্যকে মূর্ত করে তোলে। লেখার ধারণা সৃষ্টি করার জন্য উদ্ধৃতি বিশেষভাবে সাহায্য করে।
  • ধর্ম ও ইতিহাস: ধর্মীয় পুস্তক এবং ইতিহাস উভয়েরই নিজস্ব কিছু তথ্য ও সত্য রয়েছে, যা না পড়লে অন্য কোথাও জানার সুযোগ নেই। অথচ লেখকের প্রেরণার জন্য তা অত্যন্ত প্রয়োজন।
  • নিজস্বতাকে গ্রহণ করা: সবারই স্বকীয়তা আছে। কথা বলার ভঙ্গি যেমন এক নয়, লেখার ভঙ্গিও সকলের এক হয় না। নিজের স্বাভাবিক প্রকাশভঙ্গিকে বুঝা এবং মেনে নেবার মধ্যে লেখক স্বত্ত্বা গড়ে ওঠে।
  • লেখক পরিচয়: লেখক হিসেবে পরিচয় দেওয়া। তাতে লেখক হিসেবে দায়িত্ববোধ সৃষ্টি হয়। বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হলেও, পরিশেষে বিশাল সুফল নিয়ে আসে।
  • লেখক মানস: লেখকের মনে থাকতে হয় লেখকের মানসিকতা। বিষয় থেকে ব্যক্তিকেন্দ্রীকতা আলাদা করা। নিজের সমাজ-পরিস্থিতিকে লেখ্যরূপ দেবার সার্বক্ষণিক চিন্তা।
  • মানুষের সাথে সম্পর্ক: মানুষের সাথে সহজাত সম্পর্কের মধ্য দিয়ে আসে লেখার মৌলিক উপাদান। মানুষের আচরণকে বুঝতে না পারলে লেখার বিষয় খুঁজে পাওয়া কঠিন।
  • প্রেরণার নিজস্ব উৎসকে খুঁজে নেওয়া: ভিক্টোর হুগো কফির গন্ধ না পেলে লেখতে পারতেন না।
  • *নোট রাখা: যখন ভাবনা তখনই লেখে রাখার ব্যবস্থা রাখা। নোটবুক/ডায়েরি/ট্যাব/স্মার্টফোনে লেখে রাখলেই পাখির মতো চঞ্চল ভাবনাগুলোকে আটকে রাখা যায়।
  • *মুক্তলেখা: দিনের একটি স্বস্তিদায়ক সময়কে বেছে নিয়ে ১০মিনিট যেকোন বিষয়ে লেখা।
  • *ছোট ছোট কথা: হয়তো সব লেখাই সাহিত্য হবে না। তবু সবকিছু লেখে প্রকাশ করার অভ্যাস রাখুন। ফেইসবুকে হলেও লেখুন। বন্ধুকে মেসেজ পাঠাবেন: যত্ন করে গুছিয়ে লেখুন আপনার বার্তা। ছোট ছোট কথা হতে পারে ভবিষ্যত লেখার পাথেয়।

 

 

লেখার মুড/মনোভাব বিষয়ক এই পোস্টগুলোতে শুধুই কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হলো। কোন নীতিমালা বা মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। পাঠক আছেন বিভিন্ন মতের/পথের ও মনোভাবের। সবার জন্য সবকিছু একই সাথে প্রযোজ্য হবে না, হবার নয়। এই লেখার বড় ত্রুটি হলো, সংক্ষিপ্ততা। বিশদ কোন আলোচনা নেই। তাই ওপরের আলোচনাকে শুধুই একটি রেফারেন্স হিসেবে বিবেচনা করলে বাধিত থাকবো। এটি কোন নির্দেশিকা/পরামর্শ নয়।

 

.

.
—————————
*ছবিটি libbycole.files.wordpress.com থেকে নেওয়া।

**প্রথম প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৬:৫০। সামহোয়্যারইন ব্লগ ডট নেট

ভালো লেখার গোপন রহস্য ফাঁস

writersblock1

ভালো লেখার তিনটি গোপন রহস্য আছে, তুমি তা জানো? এক অধ্যাপক জিজ্ঞেস করলেন তার ছাত্রকে। ছাত্র তো নির্বাক। ভাবছে স্যারের মনের কথা বলার জন্যই ভূমিকা করছেন। তাই ছাত্র অপেক্ষার দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকলো স্যারের দিকে। শেষে জিজ্ঞেসই করতে হলো, স্যার আপনি কি তা জানেন? অন্য দিকে উদাসীন দৃষ্টি দিয়ে স্যার বললেন, নাহ, আমিও জানি না।

কৌতুকটি সমারসেট মমের মজার কথাটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি বলেছিলেন, উপন্যাস লেখার তিনটি কৌশল আছে। দুর্ভাগ্যবশত কেউই তা জানে না! এই হলো ভালো লেখার রহস্য; যা কেউ জানে না। অথচ কৌশল নিয়ে আমরা কত সময় নষ্ট করি। অনেকে লেখাই বন্ধ করে দেই!

লেখা নিয়ে খ্যাতিমান লেখকদের বৈচিত্রময় মনোভাব যেকোন পাঠককে আকৃষ্ট করে এবং চিন্তিতও করবে। ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি-খ্যাত ঔপন্যাসিক হেমিংওয়ের ভাষ্যমতো, লেখক হবার জন্য লেখার কোন প্রয়োজন নেই। টাইপরাইটারের সামনে গিয়ে রক্তক্ষরণ করলেই তা হয়ে যাবে লেখা। লেখক হতে হলে ভাষাজ্ঞানের চেয়েও দরকারি বিষয় হলো একটি বিদগ্ধ হৃদয়।

লেখতে লেখতে শুধু লেখাই হয় না, আবিষ্কারও করা যায়। বেকনের ভাষায়, পড়া মানুষকে পরিপূর্ণ করে, সংলাপ মানুষকে প্রস্তুত করে আর লেখায় মানুষকে শুদ্ধ করে। কীভাবে একটি কবিতা শেষ হবে এই ভেবে রবার্ট ফ্রস্ট কখনো কবিতা লিখতে শুরু করেন নি। লেখতে লেখতে তিনি আবিষ্কার করেছিলেন নিজেকে।

কিন্তু কী লিখবো? আমার ছাত্রজীবনে এ প্রশ্নের উত্তরে আমার প্রিয় শিক্ষক বলেছিলেন, “কিছু যে লেখতে পারছো না, তা-ই লেখো।” আমি হাহাহা করে ওড়িয়ে দিয়েছিলাম। “লেখা বন্ধ করলেন তো লেখকের তালিকা থেকে বাদ পড়লেন (রে ব্যাডবেরি)।” কে শুনে কার কথা! আমিও শুনি নি। অন্যান্য সহপাঠিদের মতো, রচনা চিঠি আর প্যারাগ্রাফ সব মুখস্ত করেই পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছি!

সকলেই কিন্তু নজরুল জীবনানন্দ নন, কেউ কেউ মৃত্যুর পূর্বেও লেখক হয়ে বিদায় নেন, আর তা হয় কালোত্তীর্ণ। আপনার জীবনের গন্তব্য কী? এরকম প্রশ্নের জবাবে সদ্য অবসরপ্রাপ্ত এক সফল পাবলিক সার্ভেন্ট (বাংলায় সরকারি কর্মকর্তা) বলেছিলেন, “আমি এখন লেখালেখিতেই জীবন শেষ করতে চাই।” পাঠক থাকুক আর না-ই থাকুক, হিসেব করলে দেখবো যে, আমরা অনেকেই লেখক। হয়তো পাঠক ভিন্নতর হতে পারে; হয়তো গল্প উপন্যাস কবিতা পত্রিকা আর প্রবন্ধের পাঠকেরা যা পড়েন, তা সকলে লেখেন না।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও এককালের সংবাদকর্মী স্যার উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন: রাজনীতি বা রাজনীতিবিদ নিয়ে আমি আর কিছুই করছি না। এই যুদ্ধ শেষ হলে সম্পূর্ণভাবে আমি লেখা আর আঁকায় মনোনিবেশ করতে চাই। অতএব চার্চিলের মতো সফল রাষ্ট্রনায়কের জীবনের গন্তব্য ছিলো লেখক হওয়া।

সকলেই লেখেন না, কেউ কেউ শুধু বলেই যান, আর অন্যে তা লেখে হয়ে যায় লেখক। কারও মুখের কথাই লেখা হয়ে যায় যদি তাতে ‘প্রাণ’ থাকে। “নেপোলিয়নের প্রতিটি কথা এবং তার লেখার প্রতিটি লাইন পড়ার মতো, কারণ তাতে আছে ফ্রান্সের প্রাণ।” বলেছিলেন অ্যামেরিকান প্রবন্ধকার র‌্যাল্ফ ওয়ালডো ইমারসন। এমন ব্যক্তিদেরকে মনে নিয়েই হয়তো বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বলেছিলেন, “হয় পড়ার মতো কিছু লেখো, নয়তো লেখার মতো কিছু করো।
**লেখাটি একটি পাবলিক ব্লগসাইটে প্রকাশিত হয়েছিলো (ডিসেম্বর ২০১২), যেখানে বিজ্ঞ পাঠকদের মন্তব্য রয়েছে! প্রথমে (অগাস্ট ২০১২) পোস্ট দেওয়া হয়েছিল প্রথম আলো ব্লগে, কিন্তু সেই ব্লগ এখন আর নেই।