Tagged: ব্লগিং নিয়ে ব্লগিং

সামু’র প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে ‘আমার’ সাক্ষাৎকার

 

১। আমাকে আমার প্রশ্ন: কী খবর… ব্লগ নিয়ে এত গবেষণা করলেন, অথচ এখন ব্লগে দেখাই যাচ্ছে না কেন?
আমার উত্তর: গবেষণা করি নি – পড়াশোনা করেছিলাম। তারপর যা উপলব্ধি হয়েছে, তা-ই তাৎক্ষণিকভাবে লেখে দিয়েছি।

২। আআপ্র: তার মানে হলো, আপনি আজকাল আর পড়ছেন না! তাই লেখছেন না? কী লজ্জার বিষয়!
আউ: আংশিক সত্য। আজকাল কাজের পড়া ছাড়া ‘পড়ার জন্য পড়া’ তেমন হচ্ছে না। কাজের পড়ায় বেশি আনন্দ পাচ্ছি মনে হচ্ছে। কাজকর্ম বিষয়ক লেখাগুলো ব্যক্তিগত ব্লগে তুলে রাখছি।

৩। আআপ্র: এখানে নয় কেন? যা ব্যক্তিগত ব্লগে দিতে পারেন, সেটি তো এখানেও প্রকাশ করতে পারেন। ব্লগের মায়া কি কমে গেলো?
আউ: এখানে প্রকাশ না করার অনেক কারণের মধ্যে একটি হলো, পাঠকের মন্তব্যের উত্তর দিতে পারবো না বলে। ব্লগের জন্য আগের মতোই মায়া আছে এ কথা বললে মিথ্যা হবে। তবে ব্লগকে মন থেকে মুছে ফেলি নি। এটা অনেক ব্লগারের জন্য সহজ কাজ নয়। তবু মায়া একটু কমে গেছে। মায়া-মহব্বত-ভালোবাসা প্রেমিকার প্রতিও এক থাকে না সবসময়।

৪। আআপ্র: তো বলছেন, মায়া কিছু কমেছে। সবকিছুর পেছনে কারণ থাকে। ব্লগের প্রতি মায়া কমে যাওয়ার কারণটা কি সহব্লগারদের জন্য শেয়ার করা যায়?
আউ: কাজের ব্যস্ততা আছে, এটি আগেও ছিল। তবু একে বাতিল করা যায় না। এটি একটি কারণ। অন্যদিকে, নানাভাবে ব্লগও তার আকর্ষণ হারিয়েছে। কর্তৃপক্ষ বা প্রতিষ্ঠাতাদেরও ব্লগের প্রতি মায়া কমেছে। এটিও প্রকৃতির নিয়ম। অথবা বলা যায়, তাদের কর্মপন্থায় পরিবর্তন এসেছে।

৫। আআপ্র: এসব কারণ দেখিয়ে যদি ব্লগে না আসেন, তবে কি বিষয়টি একটু আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেলো না? ব্লগের প্রতি ব্লগারের দায় বলে তো একটা বিষয় আছে। সেটি কি আপনি করছেন?
আউ: অভিযোগ মেনে নিচ্ছি। আত্মকেন্দ্রিক সমাজের প্রভাব আমার ওপরও পড়েছে। কিন্তু আমার অধিকাংশ পোস্টই ব্লগ এবং ব্লগের উন্নয়ন বিষয়ক। ব্লগের প্রতি ব্যক্তিগত দায় থেকে ব্লগার এবং কর্তৃপক্ষ সবারই জন্য লেখেছি। এই ব্লগেই আছে। মুছে ফেলিনি। সময় বদলেছে, ব্লগারদেরও রকম বদলেছে। পড়ার অভ্যাস বদলেছে। মাঝেমাঝে মনে হয়, আমার লেখার প্রাসঙ্গিকতা এসময়ের ব্লগে নেই। এর দায়ও হয়তো আমারই।

৬। আআপ্র: এসব যুক্তি ব্লগে না আসার কারণ হিসেবে যথেষ্ট নয়। যা হোক, এবার একটি ‘সার্বজনীন প্রশ্ন’ করি – ব্লগারের সাক্ষাৎকার নিলে এটি জিজ্ঞেস করতে হয়। ‘ব্লগ আর আগের মতো নেই’ এবিষয়ে আপনার অভিমত কী? 
আউ: সহমত। ব্লগ আর আগের মতো নেই, এটি সার্বজনীন সত্য কথা। ব্লগ হলো সময়ের সাক্ষী। সময় ও নদী এক জায়গায় থাকে না। অতএব ব্লগও আর আগের মতো নেই। তবে আক্ষেপের বিষয় হলো, ব্লগ খারাপ আর শূন্যতার দিকে মোড় নিয়েছে। এটি হতে দেওয়া উচিত ছিল না। কিছু মানুষ বা প্রতিষ্ঠান থাকা উচিত, যারা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবে। তারা আজ তেমনভাবে নেই। মান্না দে’র কফিহাউস (কলকাতার কলেজ স্ট্রিট) যেমন স্নিগ্ধতা হারিয়ে শুধুই প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ব্লগের অবস্থা আজ ঠিক তেমন।

৭। আআপ্র: এর কারণ কী? কী উপায় আছে এ থেকে বের হবার? 
আউ: এ থেকে বের হবার কোন উপায় দেখছি না, কারণ এমন পরিস্থিতি একদিনে একজনের মাধ্যমে হয় নি। এটি অনিবার্য পরিণতির দিকে যাচ্ছে। ভেতরে হয়তো অনেক কারণই আছে, কিন্তু বাইরের (সামাজিক ও রাজনৈতিক) কারণগুলো বড়ই খতরনাক। এখানে প্রতিরোধ সৃষ্টি করা কঠিন। তবু সামু কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ যে, অন্যান্য ব্লগের মতো একে তারা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় নি। যেকোন ভাবে চালিয়ে রেখেছে। দু’একজন অন্তপ্রাণ ব্লগার আছেন, যারা এখনও আগের মতোই লেখে যাচ্ছেন, মন্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। দু’এক বছর যাবত লেখছেন, এমন কিছু দায়িত্বশীল ব্লগার আছেন। আর নতুনেরা তো বরাবরই সুপার একটিভ। হয়তো তাদের জন্যই ব্লগটি টিকে আছে।

৮। আআপ্র: ব্লগের অব্স্থা এর চেয়ে কি ভালো হতে পারতো না? অন্তত সামু তো সব থেকে আলাদা! 
আউ: হয়তো হতে পারতো, কারণ সব বাংলা ব্লগের অবস্থা ম্রিয়মান। বন্ধ অথবা সংকোচিত। এর কিছু সুবিধা এ ব্লগ পেতে পারতো। বাংলা ব্লগের পাইয়োনিয়ার হিসেবে এব্লগের অবস্থা আরও ভালো হতে পারতো। এবং আমি বলছি, ভালোই তো। অন্য যেকোন বাংলা ব্লগের চেয়ে সামু’র অবস্থা নিঃসন্দেহে ভালো। তবে এখানে যারা ৪/৫/৭ বছর আগে ব্লগিং করেছেন/করছেন তাদের স্বপ্ন আর আকাঙ্ক্ষা ছিল হয়তো আরও ওপরে। তারা হয়তো একটু বেশিই প্রত্যাশা করে ফেলেছিল!

৯। আআপ্র: সামু কি কালজয়ী প্লাটফর্ম হতে পারে না? ব্লগার সহযোগে সামু কি সময়ের প্রতিবন্ধকতাকে জয় করতে পারে না?
আউ: অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষকে এভাবে চাপ দেওয়া যায় না। অনেকে শুরু করতে পারে, চালিয়ে যেতে পারে না। শুরু করার জন্য যে ধরণের মেধা প্রতিভা প্রতিশ্রুতিশীলতা দরকার, চালিয়ে যাবার জন্য হয়তো একটু ভিন্ন ধরণের চালিকা শক্তি বা এড্যাপ্টাবিলিটি প্রয়োজন হয়। ব্লগাররা তো অধিকাংশই ঘরকুনো, তা না হলে তারা ব্লগ লেখবে কীভাবে। ব্লগ টিকিয়ে রাখতে মাঝেমাঝে বাইরের শক্তিরও দরকার হয়।

১০। আআপ্র: এত বড় উত্তর দিলে তো পাঠক পড়বে না। যাহোক, সংক্ষেপে সামু’র প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী মূলক একটি বক্তৃতা দিন! 
আউ: সামু আজও যেভাবে দাঁড়িয়ে আছে, সেটি বাংলা ভাষার জন্য এবং বাংলাভাষী লেখক-পাঠকের জন্য সৌভাগ্য ও গৌরবের বিষয়। একাদশ প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে সামহোয়্যারইন ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা, কর্মী এবং ব্লগার-পাঠককে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা! সে সাথে মহান বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা!!

*পাবলিক ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৬

ব্লগ ফেসবুক সহ ভার্চুয়াল মাধ্যমে লেখালেখি করে সাহিত্যের মূল স্রোতে কি মিশতে পারছেন অনলাইন লেখকরা?

Capture

 

নক্ষত্র ব্লগঃ শুভেচ্ছা আপনার জন্য! কেমন আছেন?

মাঈনউদ্দিন মইনুল: ধন্যবাদ। ভালো আছি ঈশ্বরের কৃপায়।

 

নক্ষত্র ব্লগঃ ব্লগ, ফেসবুক সহ ভার্চুয়াল মাধ্যমে সম সাময়িক লেখালেখি নিয়ে আপনার কি মতামত ?

মাঈনউদ্দিন মইনুল: একটা সময় ছিলো যখন কোন সৃজনশীল লেখা প্রকাশিত হবে কিনা, তা সম্পাদকের মেজাজের ওপর নির্ভর করতো। জীবন-সায়াহ্নে এসে নিজ লেখার মর্যাদা পেয়েছেন অথবা মৃত্যুর পর তার লেখা প্রকাশিত হয়ে মরনোত্তর পুরস্কার পেয়েছেন, আমাদের সমাজে এমন দৃষ্টান্তও আছে। কিন্তু এখন আমরা আছি অবাধ মত-প্রকাশের যুগে। মতপ্রকাশের সবচেয়ে শক্তিশালি এবং লেখক-বান্ধব মাধ্যম হলো ব্লগ বা ব্লগিং, সাম্প্রতিক কালে যার সংজ্ঞা ও ব্যবহার বিশালভাবে বিস্তৃত হয়েছে। তবে সবকিছুরই ভালো-মন্দ দিক আছে। মুক্তবাণিজ্যে যেমন প্রতিযোগিতা বেড়ে যায় এবং মানসম্পন্ন পণ্যই টিকে থাকে, তেমনি মুক্ত-প্রকাশের এ সময়ে ভালো এবং মান-সম্পন্ন লেখাই টিকে থাকবে আর সফল হবে। সারভাইভাল অভ দ্য ফিটেস্ট!

 

নক্ষত্র ব্লগঃ বর্তমানে ব্লগ, ফেসবুকসহ ভার্চুয়াল মাধ্যমে যারা লিখছেন তাদের মাঝে কাদের লেখা আপনার কাছে ভালো লাগে?

মাঈনউদ্দিন মইনুল: অনেকের লেখাই ভালো লাগে। যাদের লেখা ভালো লাগে, তাদের ব্লগীয় আচরণ খুবই নেতিবাচক। ফলে তারা পাঠকপ্রিয়তা পাচ্ছেন না। তাদের লেখার প্রতি সম্মান হেতু নামগুলো উল্লেখ করতে চাই না। এখানে প্রবাসীদের সংখ্যাটি উল্লেখ করার মতো। মাঝে মাঝে মনে হয় যারা প্রবাসে থাকেন, গণতন্ত্র স্বদেশ ঐতিহ্য মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং নিপীড়িত মানুষের পক্ষে আঙ্গুল চালনায় তাদেরই সাহস বেশি। এর পেছনেও কারণ থাকতে পারে!

 

নক্ষত্র ব্লগঃ ব্লগ ফেসবুক সহ ভার্চুয়াল মাধ্যমে যারা লিখছেন তাদের সমাজের প্রতি কতটুকু দায়বদ্ধতা আছে বলে মনে করেন? তারা কি তা পালন করছে বলে মনে করেন?

মাঈনউদ্দিন মইনুল: তাদের দায়বদ্ধতা নানা কারণেই বেশি। আমার মতে, তারা তা অনেকটাই পালন করছেন। এধারা বজায় রাখতে একটি সুস্থ ব্লগসাইটের খুবই প্রয়োজন আজ। এবিষয়ে অনেক কিছুই বলার আছে, যা এখানে বলে শেষ করা যাবে না।

 

নক্ষত্র ব্লগঃ সাম্প্রতিক সময়ের লেখক/ব্লগারদের মাঝে কাদেরকে আপনি প্রতিশ্রুতিশীল বলে ভাবছেন?

মাঈনউদ্দিন মইনুল: ২০০৫, ২০০৬ বা ২০০৭ এর পোস্টগুলো দেখে আমি অনেক চমৎকৃত হই। পোস্টগুলো কালের সাক্ষী হয়ে যুগ-যুগান্তরে ভেসে ওঠবে কমমিউটারের পর্দায়। আমাদেরকে মনে রাখা প্রয়োজন যে, ব্লগাররা নিজের সময় ও অর্থকে খরচ করে, কোন বিনিময়ের আশা না করেই লিখে যাচ্ছেন। তারা লিখে যাচ্ছেন আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাচ্ছেন একেকটি পদচিহ্ন। তাই সাধারণভাবে সকল ব্লগারকেই প্রতিশ্রুতিশীল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। টিকে থাকা বা নিয়মিত লিখে যাবার প্রশ্নে প্রতিশ্রুতিশীল ব্লগারের সংখ্যা খুব কম বলতে হয়। কিন্তু সম্প্রতি ব্যক্তিগত, প্রযুক্তিগত বিষয়ে এবং সংবাদ ও তথ্যভাণ্ডার হিসেবে বাঙলা ব্লগের সংখ্যা বাড়ছে।

 

নক্ষত্র ব্লগঃ ব্লগকে বলা হচ্ছে বিকল্প মিডিয়া? এই বিষয়ে আপনার কি মত?

মাঈনউদ্দিন মইনুল:  ‘বিকল্প’ গণমাধ্যম তো বটেই, কিছুদিনের মধ্যেই এটি হবে একমাত্র গণমাধ্যম।

 

নক্ষত্র ব্লগঃ আপনার পড়া সবশেষ পোষ্ট কোনটি এবং তা কোন ব্লগে পড়েছেন?

মাঈনউদ্দিন মইনুল: আমাদের ছুটি ব্লগে আন্দামান ভ্রমণ

 

নক্ষত্র ব্লগঃ ব্লগে ফেসবুকে লেখকদের লেখার মান কেমন বলে মনে করেন আপনি?

মাঈনউদ্দিন মইনুল: উন্নত, মাঝারি এবং নিম্ন সব মানের লেখাই ব্লগে আছে। লেখা যত উন্নত, লেখকের সংখ্যাও তত কম। নিম্নমানের লেখাই ব্লগে বেশি, এর কারণ হলো নবীন এবং লক্ষ্যহীন ব্লগারের উপস্থিতি। তবে পাবলিক ব্লগে একে নেতিবাচক হিসেবে আমি দেখছি না। অনেকেই লেখতে লেখতে পড়া শিখছেন, এবং তাতে তাদের লেখারও উন্নয়ন হচ্ছে। উন্নত লেখা কম হলেও সমস্যা ছিলো না, যদি সেগুলো নিয়মিত প্রকাশিত হতো। ভালো লেখেন এরকম ব্লগাররা অনিয়মিত। তাৎপর্যপূর্ণ আন্তঃযোগাযোগ এবং মিথষ্ক্রিয়া বৃদ্ধি করতে পারলে আর ব্লগকে সৃজনশীল এবং প্রতিশ্রুতিশীল লেখকদের আড্ডাস্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে, ভালো লেখকদের সংখ্যা যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে নবীন লেখকদের লেখার মান।

 

নক্ষত্র ব্লগঃ ব্লগ ফেসবুক সহ ভার্চুয়াল মাধ্যমে লেখালেখি করে সাহিত্যের মুল স্রোতে কি মিশতে পারছেন লেখক ব্লগাররা?

মাঈনউদ্দিন মইনুল: পত্রিকার মাধ্যমেই সাহিত্যের প্রথম প্রকাশ এবং ‘প্রথম প্রাপ্তি’ হয় – বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এটিই হয়ে এসেছে দীর্ঘ দিন থেকে। পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমটি কিন্তু আজ বিবর্তিত রূপ নিয়েছে। সকলেই জানেন যে, দেশের সবগুলো পত্রিকা এখন গুরুত্বসহকারে অনলাইন সংস্করণ প্রকাশ করে। নিয়মিত আপডেটও করে। এমন পরিস্থিতিতে সাহিত্যের ‘মূল’ স্রোত অবশেষে কোনটি হয়, সে নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের বহুল প্রসারে প্রিন্ট মাধ্যমের সাহিত্য ‘মূল ধারাটিকে’ কতটুকু ধরে রাখতে পেরেছে বা পারবে, সেখানে প্রশ্ন আছে। সাহিত্যের প্রথাগত সংজ্ঞায়ও পরিবর্তন আসন্ন। অতএব অবশেষে ‘কার স্রোতে কে মেশে’ বলা মুশকিল।

 

নক্ষত্র ব্লগঃ সম্প্রতি ব্লগারদের লেখা বিভিন্ন সংকলন/বই প্রকাশিত হচব্লগ ফেসবুক সহ ভার্চুয়াল মাধ্যমে লেখালেখি করে আসছে। এ বিষয়ে আপনার অবস্থান জানতে চাই।

মাঈনউদ্দিন মইনুল: যতদিন পর্যন্ত ব্লগ বা ইন্টানেটে প্রকাশিত লেখাগুলো ‘একমাত্র নির্ভরযোগ্য’ মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা না পাচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত বই/সংকলন ছাপানো যেতে পারে। পৃথিবীর সকল তথ্য ও সাহিত্য এখন চলে আসছে কমপিউটার বা মোবাইলের স্ক্রিনে। ব্যক্তিগতভাবে আমি ব্লগেই থেকে যাবার পক্ষপাতি।

 

নক্ষত্র ব্লগঃ একটি ব্লগ এবং ব্লগারদের ইতিবাচক দিক কোনটি বলে মনে করেন আপনি?

মাঈনউদ্দিন মইনুল: প্রশ্নটি বেশ জটিল, কারণ এর বিভিন্ন উত্তর হতে পারে। এবিষয়ে বিভিন্ন লেখায় অনেক কথা বলেছি। এখানে শুধু এটুকুই বলতে চাই: ব্লগ এবং ব্লগারদের প্রত্যাশিত ইতিবাচক দিকটি হলো, সকল ধারার পাঠক-লেখকের সাথে মিশতে পারা এবং ভিন্নমতের সাথে সহাবস্থান করতে পারা। এটি অক্ষুণ্ন থাকলে বাঙলা ব্লগ আরও এগিয়ে যাবে অদূর ভবিষ্যতে।

 

নক্ষত্র ব্লগঃ আপনার শৈশব কোথায় কেটেছে? পারিবারের কথা এবং শিক্ষাজীবন নিয়ে কিছু কথা জানতে চাই।

মাঈনউদ্দিন মইনুল: শৈশব কেটেছে কিশোরগঞ্জের মেঘনা পাড়ে আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। একক পরিবারে আমরা দু’কন্যার জনক ও জননী। শিক্ষা জীবনের অধিকাংশ কেটেছে ঢাকায়। প্রথমে ইংরেজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করি ঢাকার একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে। গ্রামীণ শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিয়ে ব্যাপ্ত ছিলাম বিগত কর্মজীবনের অধিকাংশ সময়। বর্তমানে ২০,০০০ শিশুর শিক্ষা ও বেড়ে ওঠার অধিকার নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছি।

 

নক্ষত্র ব্লগঃ আপনার জীবনের আনন্দময় স্মৃতি কোনটি যা মনে হলে এখনো আপনার ভালো লাগে।

মাঈনউদ্দিন মইনুল: অনেকগুলো। এমুহূর্তে উল্লেখযোগ্যটি মনে করা কঠিন। ২০০৭ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিলের স্পনসরশিপে কাজাখস্তানে একটি সেমিনারে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার স্মৃতিটুকু বেশ আনন্দময় ছিলো। কারাখস্তান স্বাধীন রাষ্ট্র হলেও এখনও সেখানে সোভিয়েত রাশার জৌলুস দেখে মুগ্ধ হয়েছি। আলমাতি শহরটি পর্বত ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে পরিপূর্ণ।

 

নক্ষত্র ব্লগঃ প্রিয় বই এর নাম?

মাঈনউদ্দিন মইনুল: এখানেও দু’একটি বলে শেষ করা যায় না। শুধু উল্লেখযোগ্য একটির নাম হলো: ক্রিস্টোফার মারলো’র ডক্টর ফস্টাস। মন্দের বিপক্ষে মানুষের আত্মিক যুদ্ধের একটি চমৎকার ছবি। এর প্লট ও ডায়ালগগুলো আমি পনের বছর পরও স্পষ্ট মনে করতে পারি।

 

নক্ষত্র ব্লগঃ আপনার প্রিয় লেখক কারা?

মাঈনউদ্দিন মইনুল: প্রিয় লেখক বলা আর প্রিয় রাজনৈতিক দল বলা এখন একই রকম ঝুঁকিপূর্ণ। শুধু রাজনীতিতে নয়, বই পড়াতেও এখন পলিটিক্স ঢুকে গেছে! রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলকে নিয়ে এখানে ব্যক্তিগত ঝগড়া হতে পারে। আমার প্রিয় লেখকেরা কারও কারও চোখে বিতর্কিত। তাই স্বদেশের অনেক প্রিয় লেখকের নাম বলা থেকে বিরত থাকলাম। প্রিয় কবিদের মধ্যে আছেন শামসুর রাহমান ও রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। আছেন নিমুলেন্দু গুণ। ছাত্র জীবনে আমি ব্রিটিশ লেখক রবার্ট ব্রাউনিং, টেনিসন, কোলরিজ এবং মার্কিন লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, ওয়াল্ট হুইটম্যান ও রবার্ট ফ্রস্ট-এর ভক্ত ছিলাম। চলমান জীবনে স্বার্থপরের মতো পেশাগত বই পড়ে যাচ্ছি। তাছাড়া ব্লগারদের লেখা, বিশেষত যারা নবীন, তাদের পোস্ট পড়া আমার প্রিয় অভ্যাস, যদিও সবসময় মন্তব্য দেই না।

 

নক্ষত্র ব্লগঃ অবসর সময়ে আপনি নিশ্চয় সিনেমা দেখেন। আপনি কি জানাবেন আপনার প্রিয় মুভী/সিনেমার নামগুলো?

মাঈনউদ্দিন মইনুল: অবসরে খবর দেখি – বেশিরভাগই ‘বেখবর’! খুব বেশি সিনেমা দেখার সময় হয় না। তারে জামিন পার, রাং দে বাসান্তি, পা, থ্রি ইডিয়টস দেখে দারুনভাবে উপভোগ করেছি। দেশের চলচ্চিত্রে শঙ্খনীল কারাগার, শ্রাবণ বেঘের দিন, মুক্তির গান, থার্ড পারসন সিংগুলার নাম্বার বা টেলিভিশনকে আমার কাছে বিশেষ মনে হয়। ইংরেজি Knowing বা 2012 সিনেমা দু’টো আত্মিকভাবে চেতনা-জাগানিয়া বলে মনে হয়েছে।

 

নক্ষত্রব্লগঃ আপনার প্রিয় গান কোনটি?

মাঈনউদ্দিন মইনুল: ‘এমন একটি মা দেনা, যে মায়ের সন্তানেরা… ফেরদৌস ওয়াহিদ।আমি দেশীয় গানের ভক্ত এবং এবিষয়ে সর্বভুক! একটি বললে অনেকের প্রতি অবিচার হবে। বিশেষত লালন, রবীন্দ্রনাথ নজরুলের গানের ভীষণ ভক্ত আমি। আধুনিক গায়কদের মধ্যে এসডি বর্মন, ভূপেন হাজারিকা, মান্না দে, ফেরদৌস ওয়াহিদ, নিয়াজ মোর্শেদ, শ্রীকান্ত, তপন চৌধুরি, নচিকেতা, এবং হায়দার হুসেনের গান ভালো লাগে। আইয়ুব বাচ্চু, জেমস বা হাসানের কয়েকটি ব্যান্ড সঙ্গীতও আমার প্রিয়।

 

নক্ষত্রব্লগঃ আপনার প্রিয় শিল্পী কারা?

মাঈনউদ্দিন মইনুল: এক সাথে বলে দিয়েছি ওপরে।

 

নক্ষত্র ব্লগঃ নক্ষত্র ব্লগ নিয়ে আপনার মতামত/পরামর্শ/উপদেশ কি?

মাঈনউদ্দিন মইনুল: অল্প সময়ে অনেক ব্লগারের সমন্বয ঘটিয়ে নক্ষত্র চমক দেখিয়েছে। সঞ্চালনাও এখন পর্যন্ত খুব ভালো। পরামর্শ/উপদেশ তো সকলেই দিতে পারে, উদ্যোগ নিতে পারে ক’জন? তবু জিজ্ঞাসার উত্তর দিচ্ছি: সব বাঙলা ব্লগেই একটি চ্যালেন্জ রয়েছে, নক্ষত্র’রও তাই। সেটি হলো নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। দ্বিতীয়ত, নিয়মিত বিচক্ষণ এবং ফলপ্রসূ সঞ্চালনা। আর্থিক স্বালম্বীতার জন্য ব্লগ নিজেই নিজের পথ বের করতে পারে – শুধু সুযোগ করে দিতে হবে। লেখার মান নির্ণয় করতে পারেন না বা সাহিত্য/ব্লগ রসিক নন, এমন ব্যক্তি যেন সঞ্চালনা পরিষদে না থাকেন। তবে নবীন ব্লগারদেরকে ওঠিয়ে নিয়ে আসার মতো মেকানিজমও থাকতে হবে ব্লগে। সামাজিক মূল্যবোধ, স্বদেশ চেতনা, মানবাধিকার এবং জলবায়ূ ইস্যুতে বাঙলা ব্লগকে আরও তৎপর হতে হবে।

 

নক্ষত্রঃ আমাদের সময় দেবার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

মাঈনউদ্দিন মইনুল: নক্ষত্র ব্লগে শুভ কামনা করছি।

 

 

 

————-

১৩ নভেম্বর ২০১৩ তারিখের কথা।  তখন নক্ষত্র ব্লগ কেবল শুরু হলো। এখন তারা ই-কমার্সসহ বিশাল এক ওয়েবপোর্টালের মালিক। ব্লগ শুধুই একটি অংশ। নক্ষত্র চাইলো ব্লগারদেরকে প্রেরণা দিতে। আমিও তাদের প্রশ্নের জবাবে সেভাবেই নিজের কথা জানালাম। মূল সাক্ষাৎকারটি এখানে

 

 

 

————-

ব্লগ বিষয়ে সাম্প্রতিক কিছু লেখা

আদর্শবাদী ব্লগার বনাম সৃজনশীল ব্লগার

ব্লগ ও ব্লগিং সম্পর্কে এক্সপার্টদের ৩৯ উক্তি

একটি ব্লগসাইট যেভাবে প্রসার লাভ করতে পারে

অন্যের পোস্টে সৃজনশীল মন্তব্য দেবার ১০ উপায়

ব্লগিং নিয়ে আমার কিছু প্যাচাল

ব্লগিং নিয়ে আমার কিছু প্যাচাল

“পাঠকের একটি চিন্তাশীল মন্তব্যকে আমি নিজের লেখার চেয়েও বেশি মূল্যায়ন করি। পাঠকের মন্তব্য দেখে আমি বারবার ফিরে যাই নিজের লেখায়। নিজেকে অন্যের চোখে দেখে ভীষণভাবে প্রভাবিত হই। একেকটি মন্তব্য যেন নিজেকে দেখার একেকটি আয়না।” একজন বিখ্যাত অনলাইন একটিভিস্টের মন্তব্য। অন্য একজন অনলাইন লেখক অকপটে বললেন, “মন্তব্য ছাড়া নিজের লেখাকে নিজেই আমি চিনতে পারি না। কম বা হালকা মন্তব্যের লেখাগুলোকে যেন অন্যের সন্তানের মতো অচেনা লাগে!” আমি মনে করি, লেখা এবং মন্তব্য দু’টিই মৌলিক হতে পারে। যদি প্রশ্ন করা হয়, লেখা এবং মন্তব্যের মধ্যে কোনটিকে বেশি মনযোগ এবং গভীরভাবে দেখা হয়? আমি বলবো, মন্তব্য। একটি মৌলিক মন্তব্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট পোস্টদাতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারেন। একটি লেখা লেখকের আত্মা – মন্তব্য দেওয়া মানে হলো, তার আত্মায় প্রবেশ করা। সংখ্যা কম হলেও তাৎপর্য অনেক!

নিজের পোস্ট প্রকাশ করা এবং অন্যের পোস্টে মন্তব্য দেওয়া – মাত্র দু’টি কাজ করেই ইন্টারনেটের ভারচুয়াল সমাজে  আমরা নিজেদের অস্তিত্বকে ধরে রেখেছি। ফেইসবুক হোক আর ব্লগ হোক, প্রক্রিয়াটি প্রায় একই রকম। ভালো পোস্ট দিতে না পারলে তাতে কারও সাথে সম্পর্ক নষ্ট হয় না, কিন্তু ভালো মন্তব্য না্ করতে পারলে সম্পর্কে তো চির ধরেই, ভারচুয়াল ভাবমূর্তিও নষ্ট হয়। ভালো লেখক মানেই হলো ভালো পাঠক। কিন্তু ইন্টারনেটে ‘ভালো মন্তব্যকারী’ না হলে ভালো পাঠক হবার হবার কোন মূল্য নেই। ভালো পাঠক হওয়া সত্ত্বেও ‘ভালো মন্তব্য’ করা হয়ে ওঠে না এরকম অনেক লেখক, গল্পকার ও ছড়াকার আমি দেখেছি। পড়েছেন বুঝেছেন কিন্তু কীভাবে এর ‘প্রতিক্রিয়া’ প্রকাশ করবেন, সেটি নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যান। ‘ভালো হয়েছে’, ‘দারুণ’ অথবা শুধু ‘ধন্যবাদ’ দিয়েই শেষ করেন। তাতে পোস্টদাতা মনে করতে পারে, আপনি তার লেখাই পড়েন নি।

ভালো মন্তব্য করতে ‘না পারার পেছনে’ অনেক কারণ আছে, কিন্তু ‘পারার পেছনে’ কী কী উপায় আছে  – সেটি নিয়েই এখানে কথা বলতে চাই।

(১) আপনার ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রতি গুরুত্ব দিন:

পোস্ট/লেখাটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে? কিছু পোস্ট আছে আপনাকে হাসাবে, কিছু বিষয় আপনাকে বিষাদাক্রান্ত করবে, কিছু লেখা আপনাকে নতুন তথ্য জানাবে, কিছু বিষয় আপনার হৃদয়কে স্পর্শ করবে, কিছু বিষয় আপনার প্রিয়জনের কথা মনে করিয়ে দেবে, অথবা আপনাকে স্মৃতিকাতর করে তুলবে, আপনাকে ঈশ্বরপ্রেমে মগ্ন করবে, আপনাকে কাঁদাবে অথবা আপনার দীর্ঘদিনের বিশ্বাসকে দেবে নাড়া। এরকম যদি হয়, তবে কেন তা হলো, মন্তব্যে প্রকাশ করুন।

(২) আপনার প্রতিক্রিয়া/মনোভাবটি বুঝে নিন:

প্রকাশিত পোস্টের বিষয়ে কি আপনি একমত?  লেখক বা পোস্টদাতা একটি বিষয় তুলে ধরেছেন, যাতে আপনি একমত অথবা দ্বিমত। দ্বিমত হলে ‘অব্যক্তিকভাবে’ অর্থাৎ ব্যক্তিগত আক্রমণ না করে আপনার কারণটি তুলে ধরুন। একমত হলেও সেখানে কিছু অতিরিক্ত মতামত তুলে ধরতে পারেন।

(৩) লেখার আলোকে আপনার অভিজ্ঞতাকে পর্যবেক্ষণ করুন:

আপনারও কি একই অভিজ্ঞতা হয়েছে কখনও? যদি হয়ে থাকে, তবে যতটুকু বলা যায় সংক্ষেপে তুলে ধরতে পারেন। না হলেও ‘কেন হয় নি’ বলতে পারেন, যদি উপযুক্ত এবং প্রাসঙ্গিক মনে করেন।

(৪) আপনার ‘ধারণাগত উন্নয়নের’ বিষয়টি মূল্যায়ন করুন:

যে বিষটি আপনি সামনে পেলেন, তাতে কি নতুন কোন ধারণা হয়েছে? নতুন কিছু কি শিখতে পেরেছেন? নতুন কোন উপলব্ধি? তাহলে তা অকপটে তুলে ধরুন আপনার মন্তব্যে। তাতে আপনি ছোট হবেন না, আপনার মন্তব্যের গ্রহণযোগ্যতাই কেবল বৃদ্ধি পাবে।

(৫) আপনার সন্তুষ্টির বিষয়টি মূল্যায়ন করুন:

যে বিষটি আপনি দেখলেন বা পড়লেন, তাতে কি আপনি পুরোপুরি সন্তুষ্ট? আরও কি কিছু বাকি আছে জানার? কিছু বিষয়ে কোন অপূর্ণতা আছে কি? বন্ধুত্বপূর্ণ ভঙ্গিতে সে বিষয়টিতে লেখক/পোস্টদাতার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন। বিষয়টি স্পর্শকাতর হলে ব্যক্তিগত বার্তার মাধ্যমে তা জানাতে পারেন। তাহলে পোস্টদাতা আপনার প্রতি মনে মনে কৃতজ্ঞ থাকবেন।

ভারচুয়াল লেখককে ভালো ‘মন্তব্যকারীও’ হতে হয়

ভারচুয়াল লেখককে ভালো ‘মন্তব্যকারীও’ হতে হয়

(৬) পোস্টদাতাকে আরেকটু জানার চেষ্টা করুন:

হয়তো লেখার বিষয়টিতে পোস্টদাতার পূর্বের কোন লেখার সংযোগ আছে, অথবা লেখকের সামাজিক পরিচয়ের যোগসূত্র আছে। পোস্টদাতার প্রোফাইলে ক্লিক করে মুহূর্তের মধ্যে জেনে নিন তার ব্যাকগ্রাউন্ড: তিনি কে, কী বিষয়ে লেখেন, কী তার উদ্দেশ্য ইত্যাদি ইত্যাদি। পাঠক বা মন্তব্যকারী সম্পর্কে তার কী মনোভাব সেটি জানার জন্য পূর্বের কোন পোস্টে ক্লিক করতে পারেন। সবকিছুই আপনার মন্তব্যকে সমৃদ্ধ করবে, সৃজনশীল করবে। খেয়াল রাখবেন, লেখকের বর্তমান লেখার ওপর ভিত্তি করেই আপনাকে মন্তব্য করতে হবে।

(৭) বিষয়টি সম্পর্কে আরেকটু জানার চেষ্টা করুন:

কবিতা হলে ভালোমতো পড়ে নিন, দুঃখের কবিতায় উচ্ছ্বাসপূর্ণ মন্তব্য দেবেন না! অথবা কবিতা পড়ে বলবেন না, গল্পটি ‘দারুণ হয়েছে!’ শোকবার্তায় ‘আনন্দের’ ইমোটিকোন দেবেন না! একবার ভুল হলে, আপনার ভারচুয়াল ইমেজ স্থায়িভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। বিষয় সম্পর্কে জানতে প্রয়োজনে আরও খোঁজ নিন। ইন্টারনেটে চাইলে পাওয়া যায় না এমন কোন তথ্য প্রায় নেই। বাংলায় সার্চ দিলেও আপনি অনেক তথ্য পেয়ে যাবেন।

(৮)  মন্তব্যের কাঠামো নির্ধারণ করুন:

মন্তব্যের ঘরে শুধুই আপনার মন্তব্য দেবেন, নাকি পোস্টদাতার লেখা থেকে উদ্ধৃত করবেন? শুধুই মন্তব্য দিলে, সুস্পষ্টভাবে লিখুন আপনার প্রতিক্রিয়া। একাধিক বিষয়ে মন্তব্য দিতে একাধিক অনুচ্ছেদ ব্যবহার করুন। উদ্ধৃতি দিতে চাইলে, খেয়াল করবেন: লেখকের দুর্বল বিষয়টি যেন ওঠে না আসে! লেখক যে বিষয়টিতে আলোকপাত করতে চেয়েছেন, ঠিক সেটি খুঁজে বের করতে চেষ্টা করুন।

(৯) তুলনামূলক মূল্যায়ন করুন:

অন্য কারও লেখার সাথে কোন বিষয় সামঞ্জস্য/বিরোধপূর্ণ হলে তা গঠনমূলকভাবে তুলে ধরতে পারেন। ‘অন্য কেউ’ বলতে বর্তমান বা অতীতের, অনলাইন বা অফলাইনের যে কেউ হতে পারেন। লেখকেরও অন্য কোন লেখা/পোস্টের সাথে বর্তমান বিষয়টির মূল্যায়ন হতে পারে। তুলনামূলক মূল্যায়ন করতে যেয়ে কাউকে যেন ‘ব্যক্তিগতভাবে অবমূল্যায়ন’ না  করা হয় খেয়াল রাখতে হবে। অনেকে কৌশলগত কারণে ‘তুলনা’ পর্যন্ত গিয়ে থেমে যান, ‘মূল্যায়ন’ করতে চান না। আলোচনা করুন বিস্তারিতভাবে, কিন্তু সমালোচনা করুন সাবধানে! মূল্যায়ন একটি স্পর্শকাতর বিষয়, উপযুক্ত তথ্য-উপাত্ত এবং যুক্তি প্রদর্শন না করতে পারলে বিষয়টিতে না আগানোই হবে উত্তম।

(১০) ভারচুয়াল সততা রক্ষা করুন: 

অনলাইনে এটি সহজ, কারণ এখানে স্বার্থের দ্বন্দ্ব কম। বাস্তব জীবনে নিজের আবেগ-উচ্ছ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করা সাধারণত কঠিন, কিন্তু আঙ্গুলকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ! নিজের ইচ্ছার বাইরে কাউকে খুশি করার চাপে থাকবেন না। সপ্তাহে ৫০০ লেখা পড়ে ৫০০টি ‘জেনুইন’ মন্তব্য দেওয়া প্রায় অবাস্তব, অসম্ভব এবং অগ্রহণযোগ্য। হয় আপনি বিদ্যাসাগরের জিন বহন করছেন, না হয় ভারচুয়াল প্রতারণা করছেন! দায়িত্বশীল মন্তব্য করে ভারচুয়াল ব্যক্তিত্ব তুলে ধরা, আর ‘সেরা মন্তব্যকারী’ হওয়া এক বিষয় নয়। আপনি কোনটি হতে চান, বেছে নিন। ভালো লাগলে পড়ুন, ইচ্ছে হলে মন্তব্য দিন। চাপে থাকারও প্রয়োজন নেই। মন্তব্য করার ক্ষেত্রে সততা রক্ষা করুন এবং বস্তুনিষ্ঠভাবে লেখার মূল্যায়ন করুন, লেখককে যেন লক্ষবস্তু না করেন।

শেষ কথা:

মন্তব্যে স্বকীয়তা/নিজস্বতা রাখা কেবলই চেষ্টা আর ইচ্ছার ব্যাপার। যদি কিছু না বলতে পারেন, তবে অন্তত প্রচলিত শব্দাবলীকে এড়িয়ে নতুন শব্দ ব্যবহার করুন। তারপরও কিছু বলতে না পারলে দয়া করে মন্তব্য দেবেন না। অনেকেই মনে করেন, শুধু নিজের পোস্ট তৈরি করার সময়ই মনোযোগী হতে হয়, সৃজনশীল হতে হয়। আমি তাতে শতভাগ দ্বিমত পোষণ করছি, কারণ তাতে ভারচুয়াল ব্যক্তিত্বের দ্বিমুখী অবস্থানটি পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়। পোস্ট দেওয়া এবং মন্তব্য দেওয়া – দু’টি ভূমিকাই সমান গুরুত্বের। দু’টিতেই সমানভাবে দায়িত্বশীল হতে হয়। লেখা এবং প্রতিক্রিয়া উভয়ের সাথে আপনার নিজের নামটি জড়িয়ে আছে। পোস্ট এবং মন্তব্য দু’টিই আপনার, কোনটির মালিকানা অস্বীকার করার কায়দা নেই।

2222-crop

*পরের পোস্টে ‘ভারচুয়াল ব্যক্তিত্ব’ িএবং ‘মন্তব্যের প্রকার ও কাঠামো’ নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

______________________________________________

প্রথম আলো ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া

সামহোয়ারইন ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া

Capture010913