Tagged: বিপ্লব

শ্রদ্ধাঞ্জলি: বিনোদ বিহারী চৌধুরীর তিন কাল ও বাঙালির শেষ বিপ্লবী

বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী

বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী

মাস্টারদা সূর্যসেন বলেছিলেন, ব্রিটিশরাজের হাত থেকে দেশকে স্বাধীন করার একটিই পথ হলো, ক্ষমতা দখল করা এবং প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করা। ত্রিমুখী লক্ষ্য নিতে হবে: প্রথমে দু’টি অস্ত্রাগার লুঠ করতে হবে তারপর উপড়ে দিতে হবে রেল লাইন, যাতে বাইরে থেকে খুব তাড়াতাড়ি সৈন্য আসতে না পারে। তৃতীয় কাজটি ছিলো, ইউরোপিয়ান ক্লাবকে উড়িয়ে দেওয়া, যেখানে ব্রিটিশ সৈন্য ও কর্মকর্তারা গান আর পান করে উল্লাস করে। সারা দেশ থেকে ব্রিটিশ সৈন্যরা জড়ো হবার পূর্বেই চট্টগ্রামকে স্বাধীন করতে হবে। নিজেদের জীবন দিয়ে স্বদেশীদের জন্য স্বাধীন করতে হবে দেশকে। হয় দেশের মুক্তি না হয় আত্মার মুক্তি। মাঝখানে কোন রাস্তা নেই। যুদ্ধ পরিকল্পনা উপস্থাপনার সময় কথাগুলো বলছিলেন বিনোদ বিহারীসহ প্রায় একশ’ তরুণের সামনে।

মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে প্রধান সহযোদ্ধারা ছিলেন প্রীতিলতা ওয়ায়েদ্দার, কল্পনা দত্ত, কালিপদ চক্রবর্তী, আম্বিকা চক্রবর্তী, মাখন ঘোষাল, তারাকিশোর দস্তিদার প্রমূখ অনেকে। বিনোদ বিহারী ছিলেন সূর্যসেনের তরুন সহযোগী। মাত্র ১৯ বছরের তরুন বিনোদকে পড়াশুনার পরামর্শ দিয়ে সস্নেহে এড়িয়ে যান মাস্টারদা। কিন্তু বিনোদের চাপে এবং অন্য কোন দলে যোগদানের হুমকিতে হাসিমুখে বরণ করেন।

চট্টগ্রামের তরুন বিপ্লব ১৯৩০

১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল বাঙালির ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল রাত। চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ। চরম সাহসিকতা ও চাঞ্চল্যকর রাত। সসস্ত্র বিপ্লবের জন্ম রজনী। ভারত স্বাধীনতার সংগ্রাম এগিয়ে গেলে চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ঘটনার ঔজ্জল্য কমে গেলেও এর গুরুত্ব ভোলার নয়।

সে রাতে ৬৫ তরুন বিপ্লবী স্বদেশপ্রেম আর স্বাধীনতার স্বপ্নে সজ্জিত হয়ে একত্রিত হয়েছিলেন মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে। তাদের লক্ষ্য ছিলো চট্টগ্রামকে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত করা। একযোগে তারা আক্রমণ করেছিলেন ব্রিটিশ সময়ের পুলিস স্টেশন, অস্ত্রাগার ও রেডিও স্টেশন।

অস্ত্র লুণ্ঠন, টেলিগ্রাফ অফিস ধ্বংস, রেললাইন কাকা, এবং দামপাড়া পুলিশ লাইনের অস্ত্র লুণ্ঠুন করে ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল থেকে তিন দিনের জন্য চট্টগ্রামকে স্বাধীন করে রাখেন ব্রিটিশ রাজের ক্ষমতা থেকে।

জঙ্গী বিপ্লবের শুরু। সূর্যসেন পলাতক। সমগ্র মহাভারত কেঁপে ওঠলো। একসময় সূর্যসেন ধরা পড়লেন। সাথে তারাকিশোর দস্তিদার ও তরুণী কল্পনা দত্ত। বিচার হলো সূর্যসেন ও তারাকিশোরের। ফাঁসি হলো তাঁদের। লাশ ফেলে দেওয়া হলো বঙ্গোপসাগরে। বিশ্বাসঘাতক আত্মীয়রা ১০,০০০ টাকার লোভ সংবরণ করতে না পেরে সূর্যসেনের সন্ধান জানিয়ে দেয় ব্রিটিশ পুলিসের কাছে। ১৯৩৪ সালের সূর্যসেনের ফাঁসি হয়।

বিপ্লবী চেতনায় দীক্ষিত হয়ে বিনোদ প্রথমবারের মতো সম্মুখযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন জালালাবাদ পাহাড়ে। সূর্যসেনের বিশ্বাসঘাতক আত্মীয়দেরকে হত্যা করেন বিনোদ বিহারীর দল। সেখানে তারা পুলিস দ্বারা বেষ্টিত হয়েছিলো। চোখের সামনে ১২জন সহযোদ্ধাকে মৃত্যুবরণ করতে দেখেন বিনোদ বিহারী।

গলায় বুলেটের আঘাত পেয়ে সহযোদ্ধাদের দুশ্চিন্তার কারণ হন। তাদের কেউ প্রস্তাব দিলো গুলি করে মেরে ফেলার, তাতে ব্যথা কমে যাবে! কিন্তু অন্যরা ভাবলো, হয়তো বিনোদ সুস্থ হয়ে ওঠবে।আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় চিকিৎসা নেন এবং সুস্থ হয়ে ওঠেন। ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত আত্মগোপনে থাকার পর গ্রেফতার হন এ বিপ্লবী। ব্রিটিশ রাজ তার মাথার দাম নির্ধারণ করেছিলো ৫০০ টাকা। ধরা পড়েন বিনোদ এবং গ্রেফতার হয়ে রাজপুতনায় কারাবন্দী হন বিনোদ বিহারী। সকল নির্যাতন এবং পাশবিকতাকে অতিক্রম করে তিনি ব্রিটিশদের বিদায় দেখেছেন। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল মিলে সাত বছর কাটিয়েছেন কারাগারে।

এর দু’বছর পরের ঘটনা। ব্রিটিশ সেনা অধ্যূষিত পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করে আহত হলেন পলাতক প্রীতিলতা ওয়ায়েদ্দার। ধরা পড়ে লাঞ্ছিত হবার ভয়ে পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে নিজেই নিজের জীবন নিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে প্রথম নারী শহীদ।

বিপ্লবের পরের দিনগুলো

স্বাধীনতা এসেছিলো। কিন্তু সুর্যসেন প্রীতিলতাদের সাথে যেরকম স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন সেটি তাদের পাওয়া হয় নি। দেশবিভাগের পর যখন হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেই ভারতে পারি দেন, তখন বিনোদ বিহারী চৌধুরী বেছে নিয়েছিলেন স্বদেশকেই। ছায়া স্বাধীনতার কঠিন পর্ব অতিক্রম করেন ১৯৪৭ এর পরের সময়টিতে। স্বপ্নভঙ্গ আর হতাশার সময়।

অবশেষে আসলো একাত্তর। বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের কাছে নিজের ভাগ্যকে ছেড়ে দেন। বছর শেষে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ পেয়ে নিজের অস্তিত্বও বিশ্বাসে নতুন শক্তি লাভ করেন।

বিনোদ বিহারী ব্রিটিশ-ভারতের সময় হতে বাংলাদেশ পর্যন্ত যাবতীয় রাজনৈতিক ও অধিকার আন্দোলনের সাক্ষী হয়ে সংগ্রাম করেছেন, প্রতিবাদ করেছেন। অর্জন করেছেন বিরল সম্মান ও সম্মাননা। আমৃত্যু তিনি অন্যায়, অবিচার, বৈষম্য আর সাম্প্রদায়িকতার বিপক্ষে সোচ্চার ছিলেন। মানবতাবিরোধী সংগ্রামে লড়াকু ভূমিকা পালন করে স্বদেশকে দিয়েছেন দীর্ঘসময়ের সঙ্গ। সাম্প্রতিক সময়েও তিনি ছিলেন চট্টগ্রামবাসীর অভিভাবকের মতো। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি থেকেছেন সকল মতের সকলের মধ্যমণি হয়ে।

জন্ম শতবার্ষিকীতে একটি দৈনিকের সাথে এক সাক্ষাৎকারে জীবনের শেষ চাওয়া কী জিজ্ঞেস করা হলো। উত্তরে তিনি যুবকদেরকে আরও সাহসী হতে বলেন। অবিচার এবং মিথ্যাকে ঘৃণা করার পরামর্শ দেন। “দেশকে ভালো বাসো। স্বদেশের মানুষের জন্য শ্রম দাও, দেশ বদলে যাবে।” ব্রিটিশ থেকে পাকিস্তান এবং পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হবার প্রক্রিয়ায় স্বদেশ ত্যাগের প্ররোচনা এসেছে বারবার। অনেকে চলেও গেছেন অপর বাংলায়। কিন্তু এতটুকু আত্মকেন্দ্রীক হতে পারেন নি বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী। স্ত্রী এবং দুই পুত্রসন্তান, সব হারিয়ে শেষ দিনগুলোতে নিজের অস্তিত্বের সাথে বিপ্লব করতে হয়েছে তাকে। স্বাধিকার আন্দোলনের সবগুলো ফটক অতিক্রম করে বাঙালি জাতির সর্বশেষ বিপ্লবী বিদায় নিলেন এ এপ্রিলেই, যে এপ্রিলে বিপ্লবের বীজ বুনেছিলেন ১৯৩০ সালে। কলকতার ফর্টিস হাসপাতালে ১০৩ বছর বয়সে গত ১০ এপ্রিল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মহান বিপ্লবীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি!

টাইমলাইন: বিনোদ বিহারী চৌধুরী

১৯১১: বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর জন্ম (১০ জানুয়ারি), চট্টগ্রাম
১৯২৭: আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবী দল ‘যুগান্তরে’ যোগদান
১৯২৯: কৃতীত্বের সাথে মাধ্যমিক পাশ (মেট্রিকুলেশন) করে বৃত্তি লাভ করেন

১৯৩০: চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনে সূর্যসেনের অন্যতম সহযোগী। সহসম্পাদক – কংগ্রেসের চট্টগ্রাম জেলা কমিটি।
১৯৩৩: অস্ত্রাগ্রার লুণ্ঠন মামলায় গ্রেফতার ও কারাবরণ।
১৯৩৪: প্রথম শ্রেণীতে উচ্চমাধ্যমিক (আই.এ) পাশ করেন – ব্রিটিশ রাজের ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকাবস্থায়
১৯৩৬: প্রথম শ্রেণীতে ডিসটিংশনসহ স্নাতক (বি.এ) পাশ করেন – ব্রিটিশ রাজের ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকাবস্থায়
১৯৩৯: ইংরেজিতে এম.এ পাশ করেন এবং দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে কর্মজীবনের শুরু
১৯৪০: চট্টগ্রাম কোর্টের আইনজীবি হিসেবে অনুশীলন শুরু করলেও শিক্ষকতাই ছিলো তার পেশা।
১৯৪০-১৯৪৬: বঙ্গীয় প্রাদেশিক নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং ১৯৪৬ সালে কংগ্রেসের চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক
১৯৪০: চট্টগ্রাম কোর্টের আইনজীবি কিরণ দাশের মেয়ে বিভা দাসকে বিয়ে করেন
১৯৫৪: পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের এমএলএ (১৯৫৪ পর্যন্ত)
২০১০: শততম জন্মদিনে তার জীবনীগ্রন্থ “অগ্নিঝড়া দিনগুলো” প্রকাশিত হয়।
২০১১: স্বাধীনতা পদক (সাল নিয়ে সন্দেহ আছে)
২০১৩: মৃত্যু (১০ এপ্রিল), কলকাতা ফর্টিস হাসপাতাল

সূত্র: দ্য ডেইলি স্টারসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম।