Tagged: বাঙালি হৃদয়ের উষ্ণতা

বাঙালি হৃদয়ের উষ্ণতা

গল্পটি বাঙালি হৃদয়কে শীতের বিকালে একটু উষ্ণতা দিতে পারে। বিদেশি বা শ্বেতবর্ণের হলেই যে ধনী নয়, আমাদের এক অবাঙালি বন্ধু বাংলাদেশিদেরকে প্রতিদিন প্রমাণ করে চলেছেন। পেশাগত বন্ধুরা হয়তো তার এ রূপটি জানেন না। তবে দারোয়ান, রিক্সাওয়ালা আর খাবারের দোকানদার তাকে চিনে নিয়েছেন। জীবিকার জন্য শিক্ষকতা এবং দেশেবিদেশে ঘুরে বেড়িয়ে চিত্র প্রদর্শনী তার কাজের অংশ।

ঘটনাক্রমে তিনি আমাদের পারিবারিক বন্ধুও। এশিয়ারই একটি শি্ল্পোন্নত দেশে তার আদি নিবাস। স্বভাবে চলনে মননে তিনি একজন শিল্পী। এদেশে একটি আন্তর্জাতিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে কোনমতে জীবিকা নির্বাহ করেন। আচরণে ভনিতা নেই, পোশাকে নেই বিলাসিতা। উপায়ও নেই। অর্থ আর খাদ্যের অভাব তার নিত্যসঙ্গী। কিন্তু আনন্দের শেষ নেই! আমি দেখেছি, শিল্পী সাহিত্যিকদের জীবনে অভাব অনেকটা অবিচ্ছেদ্য বিষয়। (কবি কী বলেন?)

তার প্রতিটি দিন নিয়েই একটি গল্প লেখা যায়। সম্প্রতি শীতের ছুটি এবং চিত্রপ্রদর্শনীকে একযোগ করে তিনি ইতালিতে গিয়েছিলেন। মাধ্যম বাংলাদেশ বিমান। তার গল্পটি আজ আমার কাছে এসেছে ব্রেইকিং নিউজ হিসেবে।

বাংলাদেশে ফেরার পথে আবিষ্কার হলো যে, ডলার শেষ! ভাগ্য ভালো যে বিমানবন্দরে আসার পর এটি জানা গেছে। কিন্তু ঢাকা পর্যন্ত ফিরতে পারবে এটি নিশ্চিত হলেও বিমান ছাড়তে আরও পুরো একবেলা বাকি। এ একবেলা কে তাকে খাওয়াবে? সঙ্গে আছে কিছু টাকা, যা বিনিময়যোগ্য নয়! বোকার মতো চেষ্টা করলেন একে ডলারে রূপান্তর করতে।

ঘুরতে ঘুরতে কিছু বাঙালি-মতো মানুষের দেখা পেলেন তিনি। প্রায় দু’বছর বাংলাদেশে থাকার অভিজ্ঞতায় তিনি বুঝতে পারলেন, তারা বাঙালি। আধা বাংলায় তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তার হাতের টাকাগুলোকে ডলারে পরিণত করার কোন বুদ্ধি তাদের জানা আছে কি না। স্বাভাবিকভাবেই তারা কোন সমাধান দিতে পারলেন না। কিন্তু আধা-বাংলা আধা-ইংরেজিতে তাদের কথোপকথন চলতে থাকলো। একপর্যায়ে, তারা বুঝতে পারলেন যে, এই অবাঙালি চিত্রশিল্পীর প্রধান প্রয়োজন হলো একবেলা খাওয়া। তারপর ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে বাসা পর্যন্ত যেতে তার আর অর্থের অভাব হবে না। কিন্তু খাবারের প্রয়োজনটি এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজনে রূপ নিয়েছে।

বিষয়টি বুঝতে পারার পর বাঙালি বন্ধুরা আর তাকে ছাড়লেন না। তাদের সাথেই ম্যাকডোনান্ডস-এ তাকে খাওয়ালেন এবং তার প্রিয় পানীয় কফিও তা থেকে বাদ গেলো না। বাঙালিরাও হয়তো মজা পেলেন, কারণ এরকম বদান্যতা গ্রহণে তার কোন অস্বস্তি নেই, বরং নিয়মিত ঘটনা।

এর পরের ঘটনাটি একটু ভিন্ন রকমের। আশেপাশের কয়েকজন ভারতীয় যাত্রী বিষয়টি ভালো চোখে দেখলো না। তাদের কোন অভিজ্ঞতার আলোকে তারা এতে প্রতারণার সম্ভাবনা দেখতে পেলো। কীভাবে একজন নিরীহ নারীকে প্রতারণার হাত থেকে বাঁচানো যায়, তারা উপায় খুঁজতে লাগলো। একটি সময়ে যখন বাঙালি বন্ধুরা তাকে ছেড়ে ওয়াশরুম অথবা স্মোকিংরুমে গেলেন, তখন ওই ভারতীয় ‘স্বেচ্ছাসেবীরা’ তাকে বাঁচাতে এলো। কিন্তু আমাদের অবাঙালি বন্ধুটি এতে মনে মনে বিরক্ত হলেন, কারণ তাদেরকেও তিনি প্রথমে বাঙালি মনে করে সাহায্য চেয়েছিলেন, যাতে তারা অপারগতা প্রকাশ করেছিল। বিরক্তি প্রকাশ না করে তিনি ভারতীয় সহযাত্রীদেরকে জানালেন যে, তারা তার পূর্ব পরিচিত। অতএব এবিষয়ে আর কথা নয়।

যা হোক বাঙালিরা ঢাকা বিমানবন্দর পর্যন্ত তার সঙ্গে ছিলেন এবং ঢাকায় এসে সিএনজিতে তোলে দিয়ে তারা বিদায় নিয়েছিলেন। বলা যায়, বাসা পর্যন্ত তারা তার সঙ্গেই ছিলেন, কারণ সিএনজি ড্রাইভারের মোবাইল ফোনে কল দিয়ে তারা তার বাসায় পৌঁছানো নিশ্চিত করেছিলেন।▲

————
ফেইসবুক স্ট্যাটাস: ৬ জানুয়ারি ২০১৭