Tagged: প্রেম

প্রেমের আরেক নাম!!!

love

(১) ভালোবাসার আদিরূপ
——————————————

ভালবাসার চারটি ধরন : স্নেহ মায়া মমতা, বন্ধুর সাথে হৃদ্যতা, বিপরীত লিঙ্গের সাথে প্রেম আর ঈশ্বরে আসক্তি বা ভক্তি। এই প্রকারভেদ আবিষ্কার করেছেন গ্রিক প্রেম-পণ্ডিত বা দার্শনিকগণ।

তাদের ভাষায় প্রথমটির নাম হলো storge বা affection যার অর্থ পিতামাতার ভালবাসা বা পারিবারিক ঘনিষ্টতা। শুধু মানুষই না, সকল প্রাণীরই সন্তানের প্রতি মাবাবার বা মাবাবার প্রতি সন্তানের ভালবাসা আছে। পারিবারিক বন্ধনই স্টোর্জ বা পারিবারিক ভালবাসার মূল ভিত্তি।

দ্বিতীয়টির নাম philia বা friendship, সাধারণত সমগোত্রীয় সমবয়সী বা অভিন্ন চিন্তাচেতনার মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে ফিলিয়া বলে। বন্ধুত্ব অতি প্রাচীন একটি সামাজিক সম্পর্ক। সত্যিকার বন্ধু প্রেমের চেয়েও গভীর, তা যারা পেয়েছে তারা আরও ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবে। নিজের জন্য নয় বন্ধুটি যেন ভালো থাকে – এরকমের অনুভূতি থেকে এর সৃষ্টি। আমাদের সমাজে শিক্ষাজীবন বা বাল্যজীবনে এরকমের বন্ধুত্ব পেয়ে থাকি, যা কর্মজীবনের বাস্তবতায় এসে অনেকটা ফিকে হয়ে যায়। কারও কারও থেকে যায় আমৃত্যু। তারা ভাগ্যবান।

তৃতীয়টির নাম eros বা romance বাংলায় প্রেম, গভীর প্রেম। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি শাশ্বত জৈবিক আকর্ষণ। এই ভালবাসা প্রলয়ংকরী এবং সৃষ্টিকারী উভয়ই। এটি ধ্বংস করতে পারে আবার অসম্ভবকে সৃষ্টি করতে পারে। পৃথিবীর অনেক সৃষ্টি ও ধ্বংসের উৎস এই প্রেম। দার্শনিক প্ল্যাটো অবশ্য এর মাঝামাঝি এক আদর্শিক প্রেমের কথা বলেছেন, যাতে দৈহিক ঘনিষ্টতাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, যাকে আমরা বলে থাকি প্ল্যাটোনিক প্রেম। আবার সিগমান্ড ফ্রয়েড সেটাকে অস্বীকার করে গেছেন।

চতুর্থটির নাম agape বা unconditional love। ঈশ্বরের সাথে শর্তহীন সম্পর্কের নামকে বলা হয় আগাপে অন্য ভাষায় charitable love। আমাদের সুফিবাদ অনেকটা এর কাছাকাছি। ঈশ্বরের অস্তিত্বে দেহ-মন-শরীরে গ্রহণ করে পরম একাত্মতা বোধ করার নামই আগাপে বা খোদা-প্রেম। নজরুল গেয়েছেন, “খোদারও প্রেমে সরাবও পিয়ে…বেহুঁস হয়ে রই পড়ে।” ঈশ্বরবাদীদের মতে, এ-ই হলো সর্বোত্তম প্রেম, যা আমাদেরকে নিঃস্বার্থভাবে স্বজাতিকেও ভালবাসতে শক্তি যোগায়। মাদার তেরিজা বলেছিলেন, প্রতিটি মানুষের মধ্যে আমি ঈশ্বরকে দেখতে পাই।

.

(২) পবিত্র গ্রন্থাবলীতে ভালোবাসার কথা
———————————————–

ইসলাম ধর্মে ভালোবাসা:

পবিত্র কুরআন শরীফে ৬৯ বার ভালোবাসা শব্দ বা ধারণাটি উল্লেখিত হয়েছে। সেখানেও চার প্রকার ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে। তবে তা উপরের প্রকারভেদের মতো নয়।

ক) বিষয়-আসয়ের প্রতি ভালোবাসা: তারা এই পৃথিবীকে ভালোবাসে পরকালকে ভালোবাসে না – আল্লাহ বিশ্বাসত্যাগীদেরকে পথ দেখান না (১৬:১০৭)।
খ) মানবিক ভালোবাসা: আজিজের স্ত্রী ক্রীতদাসকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করছে আর সেই ক্রীতদাস তাকে হিংস্র ভালোবাসায় অনুপ্রাণিত করছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি ওই নারী ধ্বংস হচ্ছে (১২:৩০)।
গ) আল্লাহ’র প্রতি ভালোবাসা: আল্লাহ’র প্রতি ভালোবাসার কারণে শ্রমজীবী, অনাথ এবং বন্দীকে তারা খাবার দেয় (৭৬:৮)।
ঘ) মানুষের প্রতি আল্লাহ’র ভালোবাসা: আল্লাহ’র জন্য তোমার সম্পদকে ব্যবহার করো, ধ্বংসের জন্য তোমার হাতকে ব্যবহার করো না কিন্তু ভালো কাজ করো। যারা ভালো কাজ করে, তাদেরকে আল্লাহ ভালোবাসেন (২:১৯৫)।

.

হিন্দু ধর্মে ভালোবাসা:

সনাতন ধর্মে, অর্থাৎ পবিত্র ভগবদ গীতায় ভালোবাসাকে মূল বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ভালোবাসাই সবকিছু। এখানে দু’প্রকার ভালোবাসার কথা আছে। ঈশ্বরের প্রতি মানুষের ভালোবাসা এবং মানুষের প্রতি ঈশ্বরের ভালোবাসা। একটি অন্যটির সাথে সম্পর্কযুক্ত।
*মানুষ যেভাবেই চেষ্টা করুক না কেন তাদের ভালোবাসাকে আমি ভালোবাসা দিয়ে উত্তর দিই। যে পথেই তারা চেষ্টা করুক, সেটা অবশেষে আমার দিকে ফিরে আসে। (গীতা ৪:১১)
*আমি শুরু এবং শেষ, আদি এবং পরিণতি, আশ্রয় গৃহ এবং সত্য প্রেমিক, গর্ভাশয় এবং মৃত্যুহীন বীজ। (গীতা ৯:১৮)
*তুমি যদি তোমার মনকে আমার দিকে ফেরাও, আর সমস্ত অন্তকরণ দিয়ে আমাকে মান্য করো, তবে নিশ্চয়ই তুমি আমাকে পাবে; এটি আমার প্রতিজ্ঞা, কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি। (গীতা ১৮:৬৫)

.

বৌদ্ধ ধর্মে ভালোবাসা:

বৌদ্ধ ধর্মে, যেখানে ভালোবাসাকে আত্মিক মুক্তির পথ হিসেবে ধরা হয়, বলা হয়েছে জীবে প্রেম করার কথা। জীবে প্রেমই ঈশ্বরের আরাধনা। ছোট বড় সভ্য অসভ্য ইতর প্রাণী – সকল জীবকেই সমানভাবে দেখা হয়েছে। বৌদ্ধা ধর্মীয় নেতা দালাই লামা বলেছিলেন, দয়াই তার ধর্ম। বলা বাহুল্য, বৌদ্ধ ধর্মকেও ভালোবাসা বা প্রেমের ধর্ম বলা হয়।

বৌদ্ধ ধর্মেও চার প্রকার ভালোবাসার দীক্ষা দেওয়া হয়: ভালোবাসা বা প্রেম (love/ love kindness), করুণা (compassion), সহানুভূতি (sympathetic joy) এবং প্রশান্তি (equanimity)। বৌদ্ধ ধর্মের ভাষা পালিতে এগুলোকে একসাথে ‘ব্রহ্মবিহার’ বলা হয়, যার অর্থ দাঁড়ায় ঈশ্বরাশ্রয় বা ঈশ্বরসদৃশ। ‘যাকে ভালোবাসো তাকে মুক্তি দাও’ – কথাটি প্রধানত বৌদ্ধ ধর্মের কথা।

.

খ্রিষ্ট ধর্মে ভালোবাসা:

পবিত্র বাইবেলে যীশু নিঃশর্ত ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কথা বলেছেন, “যারা তোমাকে ভালোবাসে, যদি শুধু তাদেরকেই তুমি ভালোবাসো, তবে সেখানে কৃতীত্বের কী আছে? পাপীরাও কী তা-ই করে না?” (লুক ৬:৩২) খ্রিষ্টবিশ্বাসীরা মূলত “ঈশ্বর নিজেই প্রেম” বলে বিশ্বাস করেন। ঈশ্বরকেই সকল ভালোবাসার উৎস বলে জানেন।

এক নিঃস্বার্থ ভালোবাসার দীক্ষা নিয়ে থাকেন খ্রিষ্টবিশ্বাসীরা। বাইবেলে বলা আছে: “ভালোবাসা ধৈর্য্য ধরে, দয়া করে, হিংসা করে না, গর্ব করে না, অহংকার করে না, খারাপ ব্যবহার করে না, নিজের সুবিধার চেষ্টা করে না, রাগ করে না, কারও খারাপ ব্যবহারের কথা মনে রাখে না, খারাপ কিছু নিয়ে আনন্দ করে না বরং যা সত্য তাতে আনন্দ করে। ভালোবাসা সবকিছুই সহ্য করে, সকলকেই বিশ্বাস করতে আগ্রহী, সব কিছুতে আশা রাখে আর সব অবস্থায় স্থির থাকে।” (১করিন্থীয় ১৩:৪-৭)

.

.

৩) উপসংহার – ভালোবাসাটি আসলে কী জিনিস? খায় নাকি পড়ে?
——————————————————–

আমার বন্ধুর বাসায় একদিন পৌঁছামাত্রই তার দু’টি যমজ ছেলে সাড়া বাড়িজুড়ে ছুটাছুটি শুরু করলো। হঠাৎ আমার গালে বেমক্কা এক ঘুষি! সাথে সাথে অপর যমজটিও আমার অন্য গালে! আমি তো রীতিমতো স্তম্ভিত। নির্বিকার বন্ধুটি হেসে বললো, আমার ছেলেরা তো তোমাকে পছন্দ করে ফেলেছে। আজ আর তুমি বাসায় ফিরতে পারবে না, ওদের ঘুমের আগে!” সত্যিই তা হলো – আমাকে তারা আসতে দেবে না – খেলতে হবে তাদের সাথে! শেষে তাদের ঘুমের পর আমি বাসায় ফিরি! ভালোবাসার প্রকাশও একেক জনের একেক রকম।

‘মানুষ ধর মানুষ ভজ/ শুন বলিরে পাগল মন’ গানটি শুনলে আমি আচ্ছন্ন হয়ে যাই এক বিশেষ অনুভূতিতে। মন চায়, নেমে পড়ি রাস্তায় – কী হবে ঘর সংসার টাকাকড়ি দিয়ে? সত্যিই প্রেম কত ব্যাপক একটি বিষয়, অথচ এ বিষয়টিতেই মানুষের কত রকমের অনুভূতি হয়। একেক বয়সে ভালোবাসার অভিজ্ঞতা একেক রকম! ভাবতেই অবাক লাগে। তরুন বয়সে ভালোবাসা তো নিছকই ‘বিপরীত লিঙ্গের প্রতি দৈহিক আকর্ষণ’।
মূলত ভালোবাসার প্রতি সীমাবদ্ধ ধারণার কারণেই এর অপব্যবহার হয় বেশি। সকলকে ভালোবাসা জানাই!!

 

 

 


*সূত্র: ব্যক্তিগত অধ্যয়ন। ছবি – ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।

**পুনশ্চ: ধর্মগ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দিতে বরাবরই ভয় পাই – এবারও বেশ সাবধানে তা করেছি। তবে অনুবাদগত কিছু ত্রুটি থাকতেই পারে। শুধুই ভালোবাসার বিষয়টি আলোচনা করার জন্য এই অবতারণা। কোন ধর্মীয় বিষয় এখানে আলোচ্য নয়। তাই, বিষয়টিকে সেভাবেই গ্রহণ করলে কৃতার্থ হবো।

::কপটতায় মোড়ানো প্রেম::

দৃষ্টি পড়তেই কপট ঔদাসীন্যে
মুখ ঘুরিয়ে নিলে তুমি।
আবার মনোযোগ দিলাম কপট কাজে,
কপট ব্যস্ততায় মগ্ন হয়ে উপলব্ধি করলাম
তোমার দৃষ্টির আলো আমাকে
ধৌত করে যাচ্ছে।
আর আমি শুদ্ধ হচ্ছি।

ভাবছি কী দেখছো তুমি
যা খুঁজছো, তা কি তুমি দেখো আমাতে?
হঠাৎ তোমার কপট ডাকে সচকিত হলাম
“এই রিকশা” বলে তুমি কপট আগ্রহ দেখালে
চলে যাবার
যা কেবল আমি বুঝেছি।

ছাদে এসে কপট ব্যস্ততা দেখালে
ফুলগাছে পরিচর্যার
কপট ব্যস্ততায় কাপড় গোছাচ্ছো তুমি
আর বুঝতে চেষ্টা করছো
আমি এখনও আছি কি না।
হঠাৎ চাহনীতে এক মিলিসেকেন্ড
তুমি আমাকে দেখলে
আর আমি ধন্য হয়ে গেলাম!

কপট দৃষ্টিতে আবহাওয়া বুঝার জন্য
তোমার পেছনের আকাশে তাকাই-
নীলাকাশে অস্থির মেঘ:
মেঘগুলো একে অন্যের সাথে
ভাবের খেলা করছে, যেমন তুমি-আমি!
তুমিও মেঘ দেখছো, আমিও।
দু’জনের দৃষ্টি একই মেঘরাশিতে!

ভালোবাসা ছাড়া বাকি সবই কি তবে কপট?
মেনে নিলাম, তোমার জন্য।
কপট আমি কপট তোমাকে
অকপট ভালোবাসি।
তুমি কি তা বুঝো?

 

একটি কমিউনিটি ব্লগে একবার প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে রয়েছে পাঠকের তাৎ্ক্ষণিক মতামত।