Tagged: প্রকল্প ব্যবস্থাপনার উপায়

প্রজেক্ট ম্যানেজার: পেশাদারিত্বের ৭টি বিষয়

professionalism-mmmainul

প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক, পর্ব ৮। ব্যাকগ্রাউন্ড যা-ই হোক, প্রজেক্ট ম্যানেজারকে পেশাদারিত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে কাজ করতে হয়। প্রজেক্ট ম্যানেজারের পেশাদারিত্ব কীভাবে গড়ে ওঠে এবিষয়ে পঞ্চম পর্বে আলোচনা করা হয়েছে। প্রজেক্ট ম্যানেজার পদ একটি নেতৃত্ব প্রয়োগের স্থান। এখানে ব্যক্তিকে ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করতে হয়। পারিবারিক বা ব্যক্তিগত কারণে কর্মপরিবেশকে প্রভাবিত করা যায় না। কর্মীদের সামনে নিজেকে আদর্শ হিসেবে দেখাতে হয়। তাকে হতে হয় পেশাদার। এপর্বে ‘পেশাদারিত্ব’ বিষয়টিতে আলাদাভাবে আলোকপাত করা হবে।

পেশাদারিত্ব মানে হলো:

১) এমন কিছু করতে পারা, যা শুধু বেতনে/অর্থে পরিশোধ করা যায় না

পেশাদাররা অর্থের বিনিময়ে মানসম্পন্ন পণ্য বা সেবা দান করেন। কিন্তু এর মানে অর্থ উপার্জনই তাদের উদ্দেশ্য নয়, অর্থের সর্বোচ্চ মূল্য প্রদান করা। পেশাদারিত্ব মানে শুধু ভালো একটি চাকরি/ব্যবসায় করা নয়। পেশাদারিত্ব মানে এমন কিছু যা শুধু বেতনে বা অর্থে পরিশোধ করা যায় না। পেশাদারিত্ব মানে ভালো/মজার কাজ করা নয়, পেশাদারিত্ব হলো কাজ থেকে ভালো/মজাকে খুঁজে পাওয়া।

২) আত্ম অনুসন্ধান ও প্রত্যাশার চেয়ে বেশি করার সামর্থ্য

পেশাদরিত্ব যেন ‘অন্ধের হাতি দেখার মতো’ অস্পষ্ট একটি বিষয়। প্রফেশনালিজম/পেশাদারিত্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণাগুলো খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত। পুরো বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা আমরা রাখি না, অথচ নিজ নিজ সুবিধামতো একে ব্যবহার করি। ফলে প্রকৃত পেশাদারিত্ব অনেকের কাছে অধরা থেকে যায়। এবিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পেতে হলে, নিজেদের পূর্বধারণাকে ভালোমতো যাচাই করে নেওয়া দরকার। দরকার আত্ম অনুসন্ধান এবং নিজের পেশায় প্রত্যাশার চেয়ে বেশি দিতে পারার সামর্থ্য।

৩) নিজের পেশার প্রতি শ্রদ্ধা ও একনিষ্ঠতা

পরিশ্রম করলে এমনিতেই সবাই তা দেখতে পায়। তখন স্বীকৃতি আপনাআপনিই চলে আসে। আমরা নিজেদেরকে পেশাদার হিসেবে পরিচিত করতে পারি না, কারণ এটি এমন গুণ যা অন্যেরা আমাদের মধ্যে দেখতে পাবে বলে আশা করি। পেশাদারিত্ব আসে নিজ পেশার প্রতি শ্রদ্ধা ও একাগ্রতা থেকে। কোন কারণে নিজ পেশা বা কাজের প্রতি আগ্রহ/মনোযোগ কম থাকলে, সে কাজে আমরা পেশাদারিত্ব অর্জন করতে পারি না।

৪) দক্ষতার সাথে আবেগ ও ব্যক্তিত্বের মিশ্রণ

পেশাদারিত্বকে অনেকে ‘দক্ষতার’ সাথে ‘আবেগ’ ও ‘ব্যক্তিত্বের’ মিশ্রণ বলে মনে করেন। দক্ষতা চেষ্টা করলেই অর্জন করা যায়, কিন্তু পেশাদারিত্ব পেতে হলে সেই দক্ষতাকে নিজের আবেগ ও চেতনার সাথে সংমিশ্রণ ঘটাতে হয়। তখন কাজকে আর ‘শ্রম’ বলে মনে হয় না, কাজ হয়ে যায় আত্মসিদ্ধির মাধ্যম। পেশাদারিত্ব এমন একটি বিষয়।

৫) ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা ও নির্ভরযোগ্যতা

বড় কাজে কেউ আমাদের ওপর আস্থা করলে আমরা সম্মানিত বোধ করি। মানুষের মধ্যে আস্থা অর্জন করতে হলে প্রথমেই দরকার দায়িত্বশীলতা। শুধু কাজ করলে তাতে মজা পাওয়া যায় না, যদি তাতে ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা ও আবেগের যোগসূত্র না থাকে। তখন কেবলই মায়না বা মুজুরির সাথে ওজন করার প্রবণতা সৃষ্টি হয়। এই প্রবণতা পেশাদারিত্ব অর্জনের বড় বাধা। যারা কাজ শেখান এবং যারা কর্মগুরু (মেন্টর), তারা শিষ্যকে অর্থের আকর্ষণ থেকে দূরে থাকার দীক্ষা দেন। পেশাদাররা নিজ কাজে জীবনের সার্থকতা খুঁজে পায়। তারা কখনও নিজের পবিত্র সময় ও শ্রমকে অর্থের পাল্লায় মাপে না।

৬) নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠা এবং জীবনের উদ্দেশ্যকে খুঁজে পাওয়া

পেশায় আত্মতৃপ্তি পাওয়া একটি সৌভাগ্যের বিষয়। কিন্তু সৌভাগ্য নাকি পরিশ্রমীদের জন্যই বরাদ্দ। জীবনের জন্য অর্থসম্পদ একটি দরকারি উপকরণ। ব্যক্তি জীবনের মৌলিক চাহিদা মেটাবার জন্য অর্থ খুবই প্রয়োজন। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন, ব্যক্তির পেশাদারিত্ব এবং নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠা লাভ। পেশাদারিত্ব হলো, কাজের মধ্যে জীবনের উদ্দেশ্যকে খুঁজে পাওয়া। পেশাদাররা অর্থকে অবহেলা করেন না, কারণ কাজ উত্তম হলে অর্থ আসে স্বাভাবিকভাবেই।

৭) আত্মসম্মান দ্বারা অনুপ্রাণিত জীবন

পেশাদারিত্ব হলো আত্মসম্মান দ্বারা অনুপ্রাণিত কর্মজীবন। যাদের আত্মসম্মানবোধ আছে, তাদের লক্ষ্য থাকে সবসময় নিজের সেরাটুকু প্রয়োগ করা। এজন্য তারা অন্যের সহযোগিতা নিতে অথবা অন্যের মতামত নিতেও দ্বিধা করে না। মানুষ সম্মান ও সুনাম পেতে চায়। এটি খুবই স্বাভাবিক একটি চাওয়া। এই আকাঙক্ষাটি যাদের তীব্র, তারা নিজ নিজ কাজকে একাগ্রতার সাথে সম্পাদন করতে চায়। তারা চায় সকলে তাদের কাজের প্রশংসা করুক যা তাকে আরও উন্নততর কাজ পাবার সুযোগ করে দেবে। যার আত্মসম্মান আছে, সে জীবন ও কর্মজীবনকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে।

professionalism_mmmainul2

পেশাদারিত্বের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা চলতে থাকবে।


পূর্বের পর্বগুলো:

▶ পর্ব ৭: এ দুই রকমের ম্যানেজার থেকে সাবধান থাকুন

▶ পর্ব ৬: ১৩ উপায়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকে রাখুন হাতের মুঠোয়!

▶ পর্ব ৫:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনা: পেশাদারিত্ব কার দায়?

▶ পর্ব ৪:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ৫টি প্রক্রিয়া: পেশাদারিত্বের শুরু

▶ পর্ব ৩:  ৯টি তত্ত্বে প্রকল্পের সংজ্ঞা এবং সহজ কিছু দৃষ্টান্ত

▶ পর্ব ২:  যে ৫টি কারণে দৈনন্দিন জীবনে প্রকল্প আমাদেরকে উপকৃত করে

▶ পর্ব ১:  প্রকল্প ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক: কেন এবং কীভাবে

১৩ টি উপায়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকে নিয়ে আসুন হাতের মুঠোয়!

banner6-crop

প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক, পর্ব ৬। প্রকল্প ব্যবস্থাপককে সফল হতে হলে, অর্থাৎ একটি একটি করে প্রকল্পগুলোকে বাস্তবায়ন করে নিজের প্রোফাইলকে সমৃদ্ধ করতে চাইলে, বিষয়টিকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিণত করতে হবে। এটি আর প্রাতিষ্ঠানিক এসাইনমেন্ট হয়ে থাকতে পারবে না। তবেই তিনি আত্মসিদ্ধির উপলব্ধি পাবেন, পারবেন আরও বৃহত্তর প্রকল্পের ব্যবস্থাপক হতে। তিনি তখন নিজেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক হিসেবে নিজেকে দেখতে পাবেন। এপর্বে আলোচনা করা হবে কীভাবে প্রকল্প ব্যবস্থাপনার খুঁটিনাটি বিষয়কে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসা যায়, তার ১৩টি উপায়।

 

প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় কোন বায়বীয় বা এবস্ট্রাক্ট বিষয় নেই, সবকিছু দৃশ্যমান এবং সরাসরি। পরিকল্পনা, ডেডলাইন, বাজেট, সঠিক কর্মী – এর সবকিছু যুক্তিনির্ভর এবং পরিমাপযোগ্য। পথও আপাত দৃষ্টিতে সরল। এই সরল পথই জটিল আকার ধারণ করে উপযুক্ত পরিকল্পনা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাবে। সৃষ্টি হয় অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিবন্ধকতা ও সম্পর্কের অবনতি। তবে প্রকল্প ব্যবস্থাপককে লক্ষ্যচ্যুত হলে হবে না। তার রাস্তা সরলই রাখতে হবে যেকোন মূল্যে। তার মন ভেঙ্গে পড়লে চলবে না; তার মেজাজ খারাপ হলে চলবে না, পাছে কোন পক্ষ পরিণত হয় বিপক্ষে। তাকে হাল ধরে রাখতে হয়। তবেই প্রকল্প উদ্দীষ্ট লক্ষ্যে গিয়ে পৌঁছায়।

 

১) সঠিক প্রকল্প হাতে নিন:

খরচের সাথে ফলাফলের তুলনা করুন; বেইসলাইনের সাথে উদ্দীষ্ট সুফল নিয়ে ভাবুন। ভাবুন প্রকল্পের মেয়াদ ও চৌহদ্দি নিয়ে। প্রকল্পের কাজ নিয়েও ভাবুন, সমজাতীয় প্রকল্প কি আরও কেউ করেছে? তাদের কী ফল হয়েছিল? এর ফলাফল কি প্রমাণ করা যাবে? ভাবুন, প্রকল্পটি কার ইচ্ছায়/ কার পৃষ্ঠপোষকতায় গৃহীত হয়েছে। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় নিয়ে ভাবুন, এটি কি বাস্তবসম্মত? কোন্ কোন্ খাতে খরচ ও ঝুঁকি প্রাক্কলনের উর্ধ্বে চলে যেতে পারে?  সঠিক প্রকল্পটি যে কোন কারণে আপনার হাতে আসে নি এবং সাংগঠনিক কারণে এ থেকে বের হওয়াও সম্ভব নয়। তবে এর ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করুন, প্রাক্কলন করুন এর অপ্রত্যাশিত সমস্যা/ব্যয়সমূহ। পুনর্বার পরিকল্পনা করুন। প্রস্তুতি/ব্যবস্থা নিন প্রকল্প শুরুর মুহূর্তেই।

 

২) প্রকল্পটি পুনর্বার পরিকল্পনা করুন:

প্রকল্পটি সঠিকভাবে পরিকল্পিত হয়েছে এবং এর সবকিছু অত্যন্ত সুচারুরূপে চিহ্নিত করা হয়েছে, এ বিশ্বাস নিয়ে শুরু করে নিজের বিপদ ডেকে আনবেন না। পুনর্বার পরিকল্পনায় নামুন, অনুসন্ধান করুন এর ভেতর বাহির। প্রকল্পের কাজ, খরচ ও আর্থিক পরিকল্পনা, গুণগত মান, সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি, কর্মী পরিকল্পনা, সংশ্লিষ্ট ক্রয়, প্রকল্পের পক্ষ-বিপক্ষ  এবং সমন্বয়ের বিষয়গুলো সমালোচকের দৃষ্টিতে দেখুন, কারণ এখন থেকে এর সমস্ত বা অধিকাংশ দায় আপনার ওপর আরোপিত হবে। পুনঃপরিকল্পনায় সংশ্লিষ্ট কর্মীদেরকে যুক্ত করুন সক্রিয় দায়িত্ব দিয়ে। পুনর্বার পরিকল্পনা করে নিজের ভাষায় প্রকল্প প্রস্তাবনাটি আবার লেখুন। এঁকে রাখুন এর গুরুত্বপূর্ণ মাইনস্টোনগুলো। চোখের সামনে বা দৃশ্যমান স্থানে ঝুলিয়ে রাখুন এর মনিটরিং চার্ট ও সময়ছক।

 

৩) কর্মীদেরকে প্রকল্পের প্রত্যাশা ও মাইলস্টোন নির্ধারণে উপযুক্তভাবে সম্পৃক্ত করুন

প্রকল্পের কর্মী আপনার মূল কর্মশক্তি, যাকে মূলধন বা যন্ত্রাংশের মতো ব্যবহার করা চলে না। তাদেরকে শুরু থেকে পরিকল্পনা ও লক্ষ্য নির্ধারণে কাজে লাগান। এপ্রক্রিয়ায় দেখুন কার কত সামর্থ্য। দেখুন কার কোন্ কাজে আত্মবিশ্বাস বেশি। প্রকল্পের পক্ষ-বিপক্ষ এবং সুবিধাভোগীদেরকেও যথাযথভাবে অংশ নিতে দিন। তারা সবাই চেতনে-অবচেতনে আপনাকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেবে, যা প্রকল্পের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো, একটি শক্তিশালী এবং পেশাদার কর্মী দল। প্রথমত, প্রকল্পের কর্মীদের সামর্থ্যের মান দেখে নিন। যাদের ঘাটতি আছে, তাদেরকে প্রকল্পের কাজের আলোকে গড়ে তুলুন। দ্বিতীয়ত, যারা প্রস্তুত তাদেরকে দায়িত্ব দিন, চ্যালেন্জ দিন।

 

৪) প্রকল্পের কাজের মানদণ্ড ও সময়ছক নির্ধারণ করুন

কর্মী ও সংশিষ্ট পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে প্রকল্পের মানদণ্ড বা গুণগতমানের স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করুন। এক্ষেত্রে অন্য কোন সমজাতীয় কোন প্রতিষ্ঠান/প্রকল্প থেকে বেন্চমার্ক নির্ধারণ করতে পারেন। প্রকল্পকে বাস্তবায়ন করে এর উদ্দীষ্ট গন্তব্যে নিয়ে যেতে হলে কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে আপস করা চলবে না, সেটি নির্ধারণ করুন। কোথায় কতটুকু ব্যতিক্রম সহনীয় সেটিও ঠিক করুন। নির্ধারণ করুন গুরুত্বপূর্ণ পর্বগুলো ঠিক কখন শেষ হওয়া চাই।

 

৫) প্রকল্প বাস্তবায়নের অভ্যন্তরীণ ও বহিস্থ ঝুঁকিসমূহ সুপারিশসহ চিহ্নিত করুন

প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে ভেতরে বাইরে, সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিকভাবে, আঞ্চলিক বা সামাজিকভাবে কী কী ঝুঁকি বা প্রতিবন্ধকতা আসতে পারে, সেটি প্রকল্পের কর্মী ও পক্ষ-বিপক্ষদের নিয়ে নির্ধারণ করুন। সবাইকে একই টেবিলে হয়তো নিয়ে আসা যাবে না। বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে হলেও প্রকল্পের  ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো নিরসনের পরিকল্পনা লিবিবদ্ধ করুন। স্পর্শকাতর কিছু ঝুঁকি যা ‍শুধু প্রকল্প ব্যবস্থাপককেই মুখোমুখি হতে হয়, সেগুলো উপযুক্তভাবে লিপিবদ্ধ করুন। কিছু অভ্যন্তরীন ঝুঁকি যা কর্মী এবং পৃষ্ঠপোষক সংস্থার সম্পর্কের সাথে জড়িত, সেগুলো যথাযথভাবে চিহ্নিত করুন। ঝুঁকি এবং এই সংশ্লিষ্ট প্রতিবন্ধকতাগুলো যথাসময়ে যথানিয়মে নিরসন করুন।

 

৬) মনিটরিং ও মূল্যায়নের বিষয় এবং সময় নির্ধারণ করুন

প্রকল্পের প্রস্তাবনা মোতাবেক মনিটরিং ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করুন। প্রকল্পের অগ্রগতি সমন্বয় সভা কখন কীভাবে হবে, সেটি পূর্বেই সংশিষ্টদের নিয়ে পরিকল্পনা করুন অথবা অবগত করুন। অগ্রগতি সমন্বয় সভাগুলো নিয়মিত আয়োজন করুন, তবে যথাসম্ভব সহজ, স্বল্পদৈর্ঘ ও সংক্ষিপ্ত রাখুন। এসব সভায় যেন অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ করে আগেই সবকিছু চূড়ান্ত করে রাখুন। সম্ভাব্য ব্যর্থতা বা দুর্বলতাগুলো সম্পর্কে আগেই তথ্য সংগ্রহ করে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকুন। অগ্রগতি সমন্বয় সভাগুলো মানসিক চাপমুক্ত এবং প্রাণচঞ্চল রাখুন এবং কর্মীদেরকে সামর্থ্য মোতাবেক পরিচালনার দায়িত্ব দিন।

 

৭) কর্মীকে তার কাজের বিপরীতে যথাযথ ফিডব্যাক দিন

কর্মীদেরকে যথাসময়ে তাদের কাজের বিপরীতে আপনার মনোভাব জানিয়ে দিন। নেতিবাচক হলে ব্যক্তিগতভাবে, ইতিবাচক হলে সমন্বয় সভায়। ইতিবাচক বলার সময় আন্তরিক এবং উদার হোন, নেতিবাচক বলার সময় নিজের ভাবাবেগকে নিয়ন্ত্রণ করুন। ব্যক্তিগত সাক্ষাতে নেতিবাচক ফিডব্যাক দেবার সময়, অবশ্যই কর্মীর ইতিবাচক দিকটিকে প্রথমত জানিয়ে দিন। নেতিবাচক সংবাদটিকে যথাসম্ভব কম কথায় এবং সরাসরি জানিয়ে দিন। সে সাথে জানিয়ে দিন কর্মীর প্রতি আপনার ইতিবাচক এবং আশাবাদী মনোভাবটুকু। নেতিবাচক ফিডব্যাগ যেন কোন পক্ষেই হতাশার সৃষ্টি না করে, সেদিকটি খেয়াল রাখতে হবে।

 

৮) প্রকল্প ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তির সুযোগ নিন

প্রকল্প ব্যবস্থাপনার যে অ্যাপলিকেশন আছে, সেটি প্রাসঙ্গিকতা সাপেক্ষে ব্যবহার করুন। পরিকল্পনা গ্রহণ, অগ্রগতির সমন্বয়, চেকলিস্ট রাখা, যোগাযোগ ইত্যাদি কাজে প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করুন। ইমেলের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ, বিস্তৃত এবং স্পর্শকাতর বিষয়গুলো আলোচনা করে ফায়সালা করে নিতে পারেন। অনেকেই অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ মাধ্যম টেক্সট মেসেজের সুবিধা নিয়ে থাকেন। তাতে কাজের পরিস্থিতি হালকা থাকে, সৃষ্টি হয় মানবিক যোগাযোগ।

 

৯)  প্রকল্পের অগ্রগতিকে সবার কাছে দৃশ্যমান রাখুন

অগ্রগতি সমন্বয় সভার পর প্রকল্পের অগ্রগতি এবং আসন্ন কর্মসূচিকে সবার সামনে দৃশ্যমান রাখুন। কেউ কেউ একটি ভালো অবস্থানে না পৌঁছানো পর্যন্ত অগ্রগতির চিত্র প্রকাশ করেন না। আবার কেউ কেউ নেতিবাচক পরিস্থিতি না হওয়া পর্যন্ত তা কর্মীদের সামনে আনতে চান না। কর্মীদের মনস্তাত্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা নিন। তবে স্ট্যান্ডার্ড হলো, প্রকল্পের অগ্রগতি সবার সামনে রাখা, সেটি ইতিবাচক বা নেতিবাচক যা-ই হোক। প্রকল্পের অগ্রগতির স্বার্থেই এর সঠিক চিত্র কর্মী এবং স্টেইকহোল্ডার জানা উচিত। প্রকল্পের ভৌগলিক চিত্রটিও শুরু থেকেই সবার সামনে রাখুন, এটি ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি করে।

 

১০)  প্রকল্পের সফলতার জন্য আপনার ব্যক্তিগত আগ্রহ দেখান

প্রকল্প একটি প্রাতিষ্ঠানিক বিষয় হলেও কর্মীদের ব্যক্তিগত আবেগের প্রয়োগ না হলে প্রকল্পটি সঠিক মানদণ্ড নিয়ে সফল হবে না। কোন যান্ত্রিক অথবা আমলাতান্ত্রিক উপায়ে কর্মীদের ব্যক্তিগত আবেগের প্রয়োগ করা যায় না। একটিই উপায়, সেটি হলো প্রকল্প ব্যবস্থাপককে ব্যক্তিগতভাবে কাজটিকে নিতে হবে। প্রকল্পের সফলতার সাথে নিজেকে জড়িত রেখে এর পেছনে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে সময় ও শ্রম দিতে হবে। প্রকল্প প্রধান পরিশ্রমী ও আন্তরিক না হলে, কর্মীদের কাছ থেকে সেটি আশা করা যায় না। পরিশ্রমী এবং নিবেদিতপ্রাণ কর্মীকে যথাযথভাবে পুরস্কৃত করুন।

 

১১)  পৃষ্ঠপোষক সংস্থার সাথে যথাযথ সম্পর্ক রক্ষা করুন

পৃষ্টপোষক সংস্থা বা প্রধান অফিসকে কাজের অগ্রগতি ও চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট এবং ইতিবাচক তথ্য প্রদান করুন। প্রকল্পের কাজে ও বাজেটে কোন পরিবর্তন আনতে হলে উপযুক্ত কারণ ও প্রমাণ প্রদর্শন করুন। যত আগে সম্ভব, ততই মঙ্গল। প্রকল্প ব্যবস্থাপক তার আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্ব দিয়ে উপস্থাপনা করলে এসব বিষয় খুব সহজেই নিরসন হয়। কোন বিষয়ে সহযোগিতা বা অংশগ্রহণের প্রয়োজন হলে সেটি যথাসময়ে প্রধান অফিসকে অবগত করুন। আপনার এখতিয়ারের বাইরে কোন কাজ করে, পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানের অনাস্থার শিকার হবেন না, সেটি আপনার প্রকল্পের সফলতার জন্য মঙ্গলজনক হবে না।

 

১২)  প্রকল্পের পক্ষ-বিপক্ষ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাথে উপযুক্ত যোগাযোগ রক্ষা করুন

নির্দিষ্ট ছক ও নির্দেশনা অনুযায়ি যারা প্রকল্পের পক্ষ বা বিপক্ষ তাদেরকে উপযুক্তভাবে প্রকল্পের কাজে সম্পৃক্ত করুন। এক্ষেত্রে প্রকল্প ব্যবস্থাপকের যোগাযোগ দক্ষতা, বুদ্ধিমত্তা ও উপস্থিত জ্ঞান অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে। সাধারণত বিপক্ষ শক্তিই প্রকল্প বাস্তবায়নের ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দেয়। প্রকল্প ব্যবস্থাপককে মনে রাখতে হবে যে, তার পক্ষ শক্তিই বেশি প্রভাবশালী এবং ক্ষমতাবান। এবিষয়টি কাজে লাগাতে পারলে, প্রকল্পের প্রতিপক্ষ কোন ক্ষতি করতে পারে না। উপযুক্ত কর্মী ব্যবস্থাপনা অনেক ঝুঁকিকে দৃশ্যমান হবার আগেই কমিয়ে আনতে পারে।

 

১৩) গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সংরক্ষণ করুন

কর্মীসহ নির্দিষ্ট পক্ষ-বিপক্ষের সাথে সংঘটিত সব বিষয়ের যথাযথ নথিভুক্তি নিশ্চিত করুন। নিশ্চিত করুন যে, সব আনুষ্ঠানিক কাগজপত্র প্রকল্পের মূল লক্ষ্যের সাথে সমানুপাতিক। আলোচনায় অনেক কিছুই আসে, অনেক অনানুষ্ঠানিক বা বিস্তারিত বিষয় চলে আসে। নথিভুক্তিতে শুধুমাত্র প্রাসঙ্গিক এবং ‘প্রকল্পের মূল দলিলের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি’ অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে সংশ্লিষ্ট খুটিনাটি কাগজপত্র, সমর্থনসূচক ছোটখাট নোট  ইত্যাদি অত্যন্ত তুচ্ছ হলেও প্রকল্পের প্রতিবেদন তৈরিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দলিলে পরিণত হয়। প্রকল্প শেষ হলে এর সফলতা ও ‘অর্জিত অভিজ্ঞতা’ নিয়ে প্রবন্ধ লিখুন এবং প্রকাশ করুন। এটি খুব দরকার।

 

13-steps-topm-crop

প্রকল্পকে বাস্তবায়নের পথে নিয়ে যেতে হলে অনেক কৌশলগত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যা প্রকল্প ব্যবস্থাপক তার প্রকল্পের পরিক্রমায় জানতে পারেন। কিছু বিষয় অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই মোকাবেলা করতে হয়, শিখিয়ে দেওয়া যায় না। তবে সেই অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য যে মৌলিক যোগ্যতা প্রকল্প ব্যবস্থাপকের প্রয়োজন, সেটিই উপরে তুলে ধরার চেষ্টা করা হলো।  পাঠকের মন্তব্য থেকে আরও কিছু শেখার আশা করছি।

 

পরবর্তি পর্বে নিয়ে আসবো প্রকল্পের ব্যর্থতা বিষয়ক আলোচনা।

 

 

পূর্বের পর্বগুলো:

▶ পর্ব ৫:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনা: পেশাদারিত্ব কার দায়?

▶ পর্ব ৪:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ৫টি প্রক্রিয়া: পেশাদারিত্বের শুরু

▶ পর্ব ৩:  ৯টি তত্ত্বে প্রকল্পের সংজ্ঞা এবং সহজ কিছু দৃষ্টান্ত

▶ পর্ব ২:  যে ৫টি কারণে দৈনন্দিন জীবনে প্রকল্প আমাদেরকে উপকৃত করে

▶ পর্ব ১:  প্রকল্প ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক: কেন এবং কীভাবে

 


Sources consulted:

1. European Commission, EuropeAid Cooperation Office (2004) Aid Delivery Delivery Methods: Project Cycle Management Guidelines. Brussels, Belgium.

2. Institute, P.M. and Project, M.I. (2013) A guide to the project management body of knowledge (PMBOK guide). Fifth Edition. United States: Project Management Institute.