Tagged: পাঠপরিকল্পনা

পাঠপরিকল্পনা বা লেসন প্লানিং করা শিক্ষকদের জন্য কতটুকু আবশ্যক?

পাঠ্যবই বা সমাধান দেখে পড়িয়েছেন এমন শিক্ষক যেমন দেখেছি, তেমনই দেখেছি আত্মনির্ভরশীল তুখোড় শিক্ষক। ক্লাসের প্রতিটি মিনিটকে তারা প্রয়োগ করেছেন পরিকল্পিত উপায়ে। তাদেরকে আমি কর্মজীবনেও ভুলতে পারি না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পর্যন্ত আমি পাঠপরিকল্পনার প্রচলন দেখেছি। আমার চোখে যারা সফল শিক্ষক ছিলেন, তাদেরকে প্রত্যেককেই পরিকল্পনামাফিক ক্লাস নিতে দেখেছি। কিন্তু হালে অনেকেই আমাকে বিভ্রান্ত করেছেন এবং করতে পেরেছেনও। তারা বলছেন, এটি অহেতুক কালক্ষেপন – শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করার পর শিক্ষক আর পাঠ্যপুস্তক এ দু’য়ে মিলে সৃষ্টি হয় জীবন্ত পাঠপরিকল্পনা। সেখানে আরেকটি লিখিত পরিকল্পনা মানে কী! এসব বিতর্ক নিয়েই বর্তমান লেখাটি।

কার্যকর পাঠদান মানেই হলো পরিকল্পনাভিত্তিক পাঠদান। পৃথিবীর সফল ক্লাসরুম টিচিংগুলো সম্পন্ন হয়েছে পরিকল্পনামাফিক পাঠদানের ফল হিসেবে। কিন্তু আমাদের দেশে ‘প্রদর্শনী বা ডেমোনস্ট্রেশন ক্লাস’ ছাড়া পরিকল্পনাভিত্তিক পাঠদানের প্রচলন খুবই কম। শিক্ষকতাকে পেশাদারী মনোভাব নিয়ে গ্রহণ না করার কারণে অনেকে পাঠপরিকল্পনাকে অভ্যাসে পরিণত করতে পারেন না। বিএড অথবা এমএড পর্যায়ে পাঠপরিকল্পনার ছবক পেলেও নিজ নিজ শ্রেণীকক্ষে সেটি প্রয়োগ করার অভ্যাস অনেক শিক্ষকের নেই।

ইতিবাচক কারণেই অনেকে পাঠপরিকল্পনা করতে চান না। একটি কারণ হলো, অতি আত্মবিশ্বাস। কেউ কেউ আবার দু’এক বছর শিক্ষকতা করে মনে করেন, পাঠপরিকল্পনা করার মতো নিম্নস্তরে তারা আর নেই।

পাঠপরিকল্পনা মূল বিষয়গুলো হলো:

  • কী পড়াবেন
  • কীভাবে পড়াবেন এবং
  • কীভাবে মূল্যায়ন করবেন

এসব দ্বিধা্দ্বন্দ্বের সঠিক উত্তর না নিয়ে শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করার মানেই হলো আত্মপ্রবঞ্চনা। শিক্ষার্থীর প্রতিও প্রতারণা।

কিন্তু এই পাঠপরিকল্পনা বা লেসনপ্লান নিয়ে পেশাদার শিক্ষকদের মনে আছে প্রচণ্ড দ্বিধা আর সিদ্ধান্তহীনতা। কেউ কেউ মনে করেন সুদক্ষ শিক্ষকদেরকে পাঠপরিকল্পনা করতে হয় না। কিন্তু অন্যরা বলেন, দক্ষতার শুরুই হয় পরিকল্পনাভিত্তিক পাঠদানের ফলে। পেশাদারিত্বের কোন্ স্তরে গেলে পাঠপরিকল্পনা ছাড়া পাঠদান করা যায়, এবিষয়ে আছে অনেক মতভেদ।

 

লেভেল ১/ অনেক গুরুত্বপূর্ণ:

আপনি যদি নতুন শিক্ষক হন, তবে পরিকল্পনাহীন শ্রেণীকক্ষকে মনে হবে একটি নরক অথবা অপরিচিত জঙ্গল। কীভাবে পথ অতিক্রম করবেন আগে থেকে ছক কাটা না থাকলে নির্ঘাৎ বাঘের মুখে। মিশ্র সামর্থ্যের একটি শ্রেণীকক্ষে পরিকল্পনাহীন শিক্ষাদান আপনার জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে। শিক্ষার্থীর ধারণ ক্ষমতা, পূর্বজ্ঞান ইত্যাদি সম্পর্কে কোনই ধারণা রাখলেন না, অকষ্মাৎ শুরু করলেন আপনার বক্তৃতা। এটি শিক্ষার্থীর মনে বিভ্রান্তি, প্রশ্ন, অযাচিত কৌতূহল এবং বিব্রতকর প্রশ্নের সৃষ্টি করতে পারে।

শ্রেণীকক্ষে প্রবেশের পূর্বে কী পড়াবেন, কীভাবে পড়াবেন এবং কীভাবে শিক্ষার্থীদের অর্জন যাচাই করবেন – এ সম্পর্কে পুরোপুরি একটি ধারণা নিতে হবেই। পাঠপরিকল্পনায় বা লেসনপ্লানে ঠিক ওই বিষয়গুলোই একটি কাঠামো আকারে পরিকল্পনা করতে হয়। পরিকল্পনা থাকলে নিশ্চিন্তে আপনি পথ অতিক্রম করতে পারবেন এবং শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের জবাব দিতে অথবা অযাচিত প্রশ্নকারীকে থামিয়ে দিতে আপনাকে কালক্ষেপণ করতে হবে না।

পরিকল্পনা মতোই পাঠদান চলবে, সেটি নয়। পাঠদানের সময় আংশিক অথবা পুরোপুরিই পরিবর্তন হতে পারে। সেটিও করতে আপনাকে সাহায্য করবে একটি পূর্বপ্রস্তুত পাঠপরিকল্পনা।

আপনি একজন পুরাতন এবং অভিজ্ঞ শিক্ষক হলেও পাঠপরিকল্পনা আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এর একটি কারণ হলো, পাঠদান পর্যবেক্ষণ। আপনার পাঠদানকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে অথবা অন্যদের জন্য সেটিকে আদর্শ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে – সে রকম পাঠদানের জন্য একটি পূর্বপরিকল্পনা অত্যাবশ্যক। পাঠপরিকল্পনা দেখে আপনি একজন শিক্ষকের অনেককিছু বলে দিতে পারবেন। তার শিক্ষাদানের কৌশল, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সামর্থ্য, শিক্ষার্থীর প্রতি তার মনোভাব – অনেক কিছু।

পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট পাঠ্যবইটিও শিক্ষার্থীর সার্বিক সামর্থ্য বা চাহিদা চিন্তা করে প্রণীত হয় না। সেখানে শিক্ষককে কিছু-না-কিছু করতেই হয়। শিক্ষককে সহজীকরণ করতে হয়, দৃষ্টান্ত প্রস্তুত করতে হয়, মূল্যায়নের জন্য পর্যায়ক্রমিক প্রশ্নপত্র তৈরি করতে হয়। এগুলোর কোনটাই হয়তো পাঠ্যবইয়ে নেই। এসব ক্ষেত্রে নতুন-পুরাতন, অভিজ্ঞ-অনভিজ্ঞ সবার জন্যই পাঠপরিকল্পনা আবশ্যক।

 

লেভেল ২/ তত গুরুত্বপূর্ণ নয়

দীর্ঘ সময় ধরে প্রকাশ, পুনঃপ্রকাশ, পুনঃসংস্করণ, পরিবর্ধন ইত্যাদি কারণে কিছু কিছু পাঠ্যবই নিজে থেকেই শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী-বান্ধব হয়ে থাকে। সেখানে শিক্ষকের কাজ শুধুই অনুসরণ করে যাওয়া।

কিছু পাঠ্যবইয়ের সাথে ‘শিক্ষক সহায়িকা’ থাকে। শিক্ষক যদি আন্তরিকভাবে সেই শিক্ষক সহায়িকা পড়েন এবং প্রাসঙ্গিকভাবে শ্রেণীকক্ষে প্রয়োগ করতে পারেন, তবে সেক্ষেত্রে পাঠপরিকল্পনার প্রয়োজন কমে আসে।

অভিজ্ঞতার এই পর্যায়ে শিক্ষক পার্বিক বা টার্মিনাল লেসনপ্লান করতে পারেন। তাতে একটি সেশনে/টার্মে যাবতিয় পাঠ ও পার্বিক পরীক্ষার পরিকল্পনা অন্তর্ভূক্ত থাকে। এই দৈনিক পাঠপরিকল্পনার সমন্বিত রূপ। টার্মিনাল লেসন প্লানে গৃহীত সিলেবাস মোতাবেক পাঠ্যবিষয় সংক্রান্ত যাবতিয় পরিকল্পনা সংক্ষেপে তুলে রাখেন। এসব ক্ষেত্রে দৈনিক পাঠপরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে যায়।

অল্প সময়ের নোটিসে আপনাকে একটি ক্লাস নিতে হলো, অথবা অন্য কোন শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে তার ক্লাসটি আপনি নিচ্ছেন, সেক্ষেত্রে পাঠপরিকল্পনা করা কঠিন। এরকম পাঠদান থেকে আপনার কাছ থেকে প্রত্যাশাও হয়তো কম থাকে।

একই বিষয়ে পাঠদান করে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকলে লিখিত পরিকল্পনা না থাকলেও পাঠদান বাধাগ্রস্ত হয় না। শুরুতে ৯০% সময় ব্যয় করতেন আর ১০% সময় ব্যয় করতেন শ্রেণীকক্ষ ব্যবস্থাপনায়। অভিজ্ঞতার সাথে এখন সময় বদলেছে। আপনি ৯০% সময় ব্যয় করেন ব্যবস্থাপনায় এবং মাত্র ১০% সময় নিয়ে আপনি পরিকল্পনা করতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে শিক্ষকের মস্তিষ্কে একটি পাঠপরিকল্পনা তৈরি হয়ে যায়।

 

লেভেল ৩/ একদম গুরুত্বপূর্ণ নয়

একই বিষয়ে একই পাঠ্যবই নিয়ে পাঠদান করে আসছেন বহুদিন। হয়তো শুরুর দিনগুলোতে পাঠপরিকল্পনাও করেছিলেন। এখন আপনি জানেন, কোন্ অধ্যায়ে শিক্ষার্থীদের সমস্যা হয় এবং কোন্ অধ্যায়গুলোতে তত সময় দিতে হয় না। আপনি জানেন, পাঠ্যবই এবং শিক্ষার্থীদের সামাজিক এবং ধারণাগত পার্থক্য; জানেন তাদের উপলব্ধি করার সামর্থ্য। এসব ক্ষেত্রে লিখিত পাঠপরিকল্পনায় সময় নষ্ট না করে সরাসরি পাঠদানের প্রতি মনোনিবেশ করা জরুরি।

এমন একটি পর্যায়ে শিক্ষকদের আসতে পারাটাও একটি শ্রমসাধ্য ব্যাপার। এটি অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ স্তর। শিক্ষকতার প্রাথমিক পর্যায়ে যারা প্রচুর পাঠপরিকল্পনা করেছেন, তারাই এক সময় পাঠপরিকল্পনাকে অগ্রাহ্য করতে পারেন।

লেসনপ্লান ‘একদম গুরুত্বপূর্ণ নয়’ এরকম স্তর নিয়ে একাডেমিশিয়ানদের মধ্যেও মতভেদ আছে। সবাই পাঠপরিকল্পনার পক্ষে – সেটি লিখিত হোক কিংবা অলিখিত, দৈনিক হোক কিংবা মাসিক বা পার্বিক। লেসনপ্লান ছাড়া লেসন দেওয়ার চিন্তা করা যায় না।

 

বর্তমান পোস্টের চিত্ররূপ

 

লেসনপ্লান কি শিক্ষকের পেশাদারিত্ব অর্জনের প্রতিবন্ধতা?

দিনে অনেকগুলো ক্লাস নিয়ে অথবা একাধিক বিষয়ে পাঠদান করলে প্রতিটির জন্য আলাদা আলাদা পাঠপরিকল্পনা করা কঠিন। প্রতিটি বিষয়ের পাঠদান নিয়ে আলাদাভাবে মনোনিবেশ করা অত্যন্ত পীড়াদায়ক হয়ে পড়ে ব্যস্ততম শিক্ষকদের জন্য। যেসব শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব, উপস্থিত জ্ঞান, পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারার ক্ষমতা আছে, তারা প্রাথমিকভাবে লেসনপ্লানের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারেন না। অল্প সময়ে বেশি শিক্ষার্থীকে মনোযোগ দেবার জন্য তারা মানসিক শক্তির ওপর নির্ভর করেন। তারা ভুলক্রমে একে পেশাদারিত্ব অর্জনের অন্তরায় হিসেবেই দেখেন।

কিন্তু লেসনপ্লান পেশাদারিত্ব অর্জনের সোপান। এটি ৫টি সুস্পষ্ট উপায়ে শিক্ষককে উন্নততর পর্যায়ের নিয়ে যায় – ১) বিষয়ভিত্তিক পাঠদানের সামর্থ্য বৃদ্ধিতে এটি সাহায্য করে; ২) প্রয়োগ, অংশগ্রহণমূলক এবং মূল্যায়ন-ভিত্তিক পাঠদানে শিক্ষককে প্রস্তুত করে; ৩) পাঠ্যবিষয় এবং শিক্ষার্থীর ব্যাকগ্রাউন্ড ও ধারণ ক্ষমতার মধ্যে যথোপযুক্ত সেতুবন্ধন করা যায়; ৪) শিক্ষক পূর্ব থেকেই পাঠ্যবিষয় সম্পর্কে নিজের দুর্বলতা কাটিয়ে উদ্দিষ্ট শিক্ষার্থীর জন্য নিজেকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত করতে পারেন; ৫) নিয়মিত পরিকল্পনা করার এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষক এক পর্যায়ে লেসনপ্লানের ঊর্ধ্বে ওঠে যেতে পারেন। তিনি প্রতিটি বিষয়ের মানসিক লেসনপ্লান সৃষ্টি করতে পারেন।

 

তথ্যসূত্র: বিভিন্ন উৎস; ব্যক্তিগত অনুসন্ধান এবং শিক্ষক হিসেবে অভিজ্ঞতা।

 

▶প্রাসঙ্গিক কয়েকটি পোস্ট:

যেসব কাজ করে আমাদের শিক্ষকেরা শিশুদের মেধা ও সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করছেন

শ্রেণীকক্ষ ব্যবস্থাপনার ১২টি উপায়