Tagged: পাঠদান

পাঠপরিকল্পনা বা লেসন প্লানিং করা শিক্ষকদের জন্য কতটুকু আবশ্যক?

পাঠ্যবই বা সমাধান দেখে পড়িয়েছেন এমন শিক্ষক যেমন দেখেছি, তেমনই দেখেছি আত্মনির্ভরশীল তুখোড় শিক্ষক। ক্লাসের প্রতিটি মিনিটকে তারা প্রয়োগ করেছেন পরিকল্পিত উপায়ে। তাদেরকে আমি কর্মজীবনেও ভুলতে পারি না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পর্যন্ত আমি পাঠপরিকল্পনার প্রচলন দেখেছি। আমার চোখে যারা সফল শিক্ষক ছিলেন, তাদেরকে প্রত্যেককেই পরিকল্পনামাফিক ক্লাস নিতে দেখেছি। কিন্তু হালে অনেকেই আমাকে বিভ্রান্ত করেছেন এবং করতে পেরেছেনও। তারা বলছেন, এটি অহেতুক কালক্ষেপন – শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করার পর শিক্ষক আর পাঠ্যপুস্তক এ দু’য়ে মিলে সৃষ্টি হয় জীবন্ত পাঠপরিকল্পনা। সেখানে আরেকটি লিখিত পরিকল্পনা মানে কী! এসব বিতর্ক নিয়েই বর্তমান লেখাটি।

কার্যকর পাঠদান মানেই হলো পরিকল্পনাভিত্তিক পাঠদান। পৃথিবীর সফল ক্লাসরুম টিচিংগুলো সম্পন্ন হয়েছে পরিকল্পনামাফিক পাঠদানের ফল হিসেবে। কিন্তু আমাদের দেশে ‘প্রদর্শনী বা ডেমোনস্ট্রেশন ক্লাস’ ছাড়া পরিকল্পনাভিত্তিক পাঠদানের প্রচলন খুবই কম। শিক্ষকতাকে পেশাদারী মনোভাব নিয়ে গ্রহণ না করার কারণে অনেকে পাঠপরিকল্পনাকে অভ্যাসে পরিণত করতে পারেন না। বিএড অথবা এমএড পর্যায়ে পাঠপরিকল্পনার ছবক পেলেও নিজ নিজ শ্রেণীকক্ষে সেটি প্রয়োগ করার অভ্যাস অনেক শিক্ষকের নেই।

ইতিবাচক কারণেই অনেকে পাঠপরিকল্পনা করতে চান না। একটি কারণ হলো, অতি আত্মবিশ্বাস। কেউ কেউ আবার দু’এক বছর শিক্ষকতা করে মনে করেন, পাঠপরিকল্পনা করার মতো নিম্নস্তরে তারা আর নেই।

পাঠপরিকল্পনা মূল বিষয়গুলো হলো:

  • কী পড়াবেন
  • কীভাবে পড়াবেন এবং
  • কীভাবে মূল্যায়ন করবেন

এসব দ্বিধা্দ্বন্দ্বের সঠিক উত্তর না নিয়ে শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করার মানেই হলো আত্মপ্রবঞ্চনা। শিক্ষার্থীর প্রতিও প্রতারণা।

কিন্তু এই পাঠপরিকল্পনা বা লেসনপ্লান নিয়ে পেশাদার শিক্ষকদের মনে আছে প্রচণ্ড দ্বিধা আর সিদ্ধান্তহীনতা। কেউ কেউ মনে করেন সুদক্ষ শিক্ষকদেরকে পাঠপরিকল্পনা করতে হয় না। কিন্তু অন্যরা বলেন, দক্ষতার শুরুই হয় পরিকল্পনাভিত্তিক পাঠদানের ফলে। পেশাদারিত্বের কোন্ স্তরে গেলে পাঠপরিকল্পনা ছাড়া পাঠদান করা যায়, এবিষয়ে আছে অনেক মতভেদ।

 

লেভেল ১/ অনেক গুরুত্বপূর্ণ:

আপনি যদি নতুন শিক্ষক হন, তবে পরিকল্পনাহীন শ্রেণীকক্ষকে মনে হবে একটি নরক অথবা অপরিচিত জঙ্গল। কীভাবে পথ অতিক্রম করবেন আগে থেকে ছক কাটা না থাকলে নির্ঘাৎ বাঘের মুখে। মিশ্র সামর্থ্যের একটি শ্রেণীকক্ষে পরিকল্পনাহীন শিক্ষাদান আপনার জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে। শিক্ষার্থীর ধারণ ক্ষমতা, পূর্বজ্ঞান ইত্যাদি সম্পর্কে কোনই ধারণা রাখলেন না, অকষ্মাৎ শুরু করলেন আপনার বক্তৃতা। এটি শিক্ষার্থীর মনে বিভ্রান্তি, প্রশ্ন, অযাচিত কৌতূহল এবং বিব্রতকর প্রশ্নের সৃষ্টি করতে পারে।

শ্রেণীকক্ষে প্রবেশের পূর্বে কী পড়াবেন, কীভাবে পড়াবেন এবং কীভাবে শিক্ষার্থীদের অর্জন যাচাই করবেন – এ সম্পর্কে পুরোপুরি একটি ধারণা নিতে হবেই। পাঠপরিকল্পনায় বা লেসনপ্লানে ঠিক ওই বিষয়গুলোই একটি কাঠামো আকারে পরিকল্পনা করতে হয়। পরিকল্পনা থাকলে নিশ্চিন্তে আপনি পথ অতিক্রম করতে পারবেন এবং শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের জবাব দিতে অথবা অযাচিত প্রশ্নকারীকে থামিয়ে দিতে আপনাকে কালক্ষেপণ করতে হবে না।

পরিকল্পনা মতোই পাঠদান চলবে, সেটি নয়। পাঠদানের সময় আংশিক অথবা পুরোপুরিই পরিবর্তন হতে পারে। সেটিও করতে আপনাকে সাহায্য করবে একটি পূর্বপ্রস্তুত পাঠপরিকল্পনা।

আপনি একজন পুরাতন এবং অভিজ্ঞ শিক্ষক হলেও পাঠপরিকল্পনা আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এর একটি কারণ হলো, পাঠদান পর্যবেক্ষণ। আপনার পাঠদানকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে অথবা অন্যদের জন্য সেটিকে আদর্শ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে – সে রকম পাঠদানের জন্য একটি পূর্বপরিকল্পনা অত্যাবশ্যক। পাঠপরিকল্পনা দেখে আপনি একজন শিক্ষকের অনেককিছু বলে দিতে পারবেন। তার শিক্ষাদানের কৌশল, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সামর্থ্য, শিক্ষার্থীর প্রতি তার মনোভাব – অনেক কিছু।

পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট পাঠ্যবইটিও শিক্ষার্থীর সার্বিক সামর্থ্য বা চাহিদা চিন্তা করে প্রণীত হয় না। সেখানে শিক্ষককে কিছু-না-কিছু করতেই হয়। শিক্ষককে সহজীকরণ করতে হয়, দৃষ্টান্ত প্রস্তুত করতে হয়, মূল্যায়নের জন্য পর্যায়ক্রমিক প্রশ্নপত্র তৈরি করতে হয়। এগুলোর কোনটাই হয়তো পাঠ্যবইয়ে নেই। এসব ক্ষেত্রে নতুন-পুরাতন, অভিজ্ঞ-অনভিজ্ঞ সবার জন্যই পাঠপরিকল্পনা আবশ্যক।

 

লেভেল ২/ তত গুরুত্বপূর্ণ নয়

দীর্ঘ সময় ধরে প্রকাশ, পুনঃপ্রকাশ, পুনঃসংস্করণ, পরিবর্ধন ইত্যাদি কারণে কিছু কিছু পাঠ্যবই নিজে থেকেই শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী-বান্ধব হয়ে থাকে। সেখানে শিক্ষকের কাজ শুধুই অনুসরণ করে যাওয়া।

কিছু পাঠ্যবইয়ের সাথে ‘শিক্ষক সহায়িকা’ থাকে। শিক্ষক যদি আন্তরিকভাবে সেই শিক্ষক সহায়িকা পড়েন এবং প্রাসঙ্গিকভাবে শ্রেণীকক্ষে প্রয়োগ করতে পারেন, তবে সেক্ষেত্রে পাঠপরিকল্পনার প্রয়োজন কমে আসে।

অভিজ্ঞতার এই পর্যায়ে শিক্ষক পার্বিক বা টার্মিনাল লেসনপ্লান করতে পারেন। তাতে একটি সেশনে/টার্মে যাবতিয় পাঠ ও পার্বিক পরীক্ষার পরিকল্পনা অন্তর্ভূক্ত থাকে। এই দৈনিক পাঠপরিকল্পনার সমন্বিত রূপ। টার্মিনাল লেসন প্লানে গৃহীত সিলেবাস মোতাবেক পাঠ্যবিষয় সংক্রান্ত যাবতিয় পরিকল্পনা সংক্ষেপে তুলে রাখেন। এসব ক্ষেত্রে দৈনিক পাঠপরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে যায়।

অল্প সময়ের নোটিসে আপনাকে একটি ক্লাস নিতে হলো, অথবা অন্য কোন শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে তার ক্লাসটি আপনি নিচ্ছেন, সেক্ষেত্রে পাঠপরিকল্পনা করা কঠিন। এরকম পাঠদান থেকে আপনার কাছ থেকে প্রত্যাশাও হয়তো কম থাকে।

একই বিষয়ে পাঠদান করে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকলে লিখিত পরিকল্পনা না থাকলেও পাঠদান বাধাগ্রস্ত হয় না। শুরুতে ৯০% সময় ব্যয় করতেন আর ১০% সময় ব্যয় করতেন শ্রেণীকক্ষ ব্যবস্থাপনায়। অভিজ্ঞতার সাথে এখন সময় বদলেছে। আপনি ৯০% সময় ব্যয় করেন ব্যবস্থাপনায় এবং মাত্র ১০% সময় নিয়ে আপনি পরিকল্পনা করতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে শিক্ষকের মস্তিষ্কে একটি পাঠপরিকল্পনা তৈরি হয়ে যায়।

 

লেভেল ৩/ একদম গুরুত্বপূর্ণ নয়

একই বিষয়ে একই পাঠ্যবই নিয়ে পাঠদান করে আসছেন বহুদিন। হয়তো শুরুর দিনগুলোতে পাঠপরিকল্পনাও করেছিলেন। এখন আপনি জানেন, কোন্ অধ্যায়ে শিক্ষার্থীদের সমস্যা হয় এবং কোন্ অধ্যায়গুলোতে তত সময় দিতে হয় না। আপনি জানেন, পাঠ্যবই এবং শিক্ষার্থীদের সামাজিক এবং ধারণাগত পার্থক্য; জানেন তাদের উপলব্ধি করার সামর্থ্য। এসব ক্ষেত্রে লিখিত পাঠপরিকল্পনায় সময় নষ্ট না করে সরাসরি পাঠদানের প্রতি মনোনিবেশ করা জরুরি।

এমন একটি পর্যায়ে শিক্ষকদের আসতে পারাটাও একটি শ্রমসাধ্য ব্যাপার। এটি অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ স্তর। শিক্ষকতার প্রাথমিক পর্যায়ে যারা প্রচুর পাঠপরিকল্পনা করেছেন, তারাই এক সময় পাঠপরিকল্পনাকে অগ্রাহ্য করতে পারেন।

লেসনপ্লান ‘একদম গুরুত্বপূর্ণ নয়’ এরকম স্তর নিয়ে একাডেমিশিয়ানদের মধ্যেও মতভেদ আছে। সবাই পাঠপরিকল্পনার পক্ষে – সেটি লিখিত হোক কিংবা অলিখিত, দৈনিক হোক কিংবা মাসিক বা পার্বিক। লেসনপ্লান ছাড়া লেসন দেওয়ার চিন্তা করা যায় না।

 

বর্তমান পোস্টের চিত্ররূপ

 

লেসনপ্লান কি শিক্ষকের পেশাদারিত্ব অর্জনের প্রতিবন্ধতা?

দিনে অনেকগুলো ক্লাস নিয়ে অথবা একাধিক বিষয়ে পাঠদান করলে প্রতিটির জন্য আলাদা আলাদা পাঠপরিকল্পনা করা কঠিন। প্রতিটি বিষয়ের পাঠদান নিয়ে আলাদাভাবে মনোনিবেশ করা অত্যন্ত পীড়াদায়ক হয়ে পড়ে ব্যস্ততম শিক্ষকদের জন্য। যেসব শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব, উপস্থিত জ্ঞান, পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারার ক্ষমতা আছে, তারা প্রাথমিকভাবে লেসনপ্লানের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারেন না। অল্প সময়ে বেশি শিক্ষার্থীকে মনোযোগ দেবার জন্য তারা মানসিক শক্তির ওপর নির্ভর করেন। তারা ভুলক্রমে একে পেশাদারিত্ব অর্জনের অন্তরায় হিসেবেই দেখেন।

কিন্তু লেসনপ্লান পেশাদারিত্ব অর্জনের সোপান। এটি ৫টি সুস্পষ্ট উপায়ে শিক্ষককে উন্নততর পর্যায়ের নিয়ে যায় – ১) বিষয়ভিত্তিক পাঠদানের সামর্থ্য বৃদ্ধিতে এটি সাহায্য করে; ২) প্রয়োগ, অংশগ্রহণমূলক এবং মূল্যায়ন-ভিত্তিক পাঠদানে শিক্ষককে প্রস্তুত করে; ৩) পাঠ্যবিষয় এবং শিক্ষার্থীর ব্যাকগ্রাউন্ড ও ধারণ ক্ষমতার মধ্যে যথোপযুক্ত সেতুবন্ধন করা যায়; ৪) শিক্ষক পূর্ব থেকেই পাঠ্যবিষয় সম্পর্কে নিজের দুর্বলতা কাটিয়ে উদ্দিষ্ট শিক্ষার্থীর জন্য নিজেকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত করতে পারেন; ৫) নিয়মিত পরিকল্পনা করার এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষক এক পর্যায়ে লেসনপ্লানের ঊর্ধ্বে ওঠে যেতে পারেন। তিনি প্রতিটি বিষয়ের মানসিক লেসনপ্লান সৃষ্টি করতে পারেন।

 

তথ্যসূত্র: বিভিন্ন উৎস; ব্যক্তিগত অনুসন্ধান এবং শিক্ষক হিসেবে অভিজ্ঞতা।

 

▶প্রাসঙ্গিক কয়েকটি পোস্ট:

যেসব কাজ করে আমাদের শিক্ষকেরা শিশুদের মেধা ও সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করছেন

শ্রেণীকক্ষ ব্যবস্থাপনার ১২টি উপায়

 

আপনার ক্লাসে কেন শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বেশি? শ্রেণীকক্ষ ব্যবস্থাপনার কয়েকটি প্র্যাকটিকেল টিপস।

[ছবটি s3.amazonaws.com এর সৌজন্যে]

[ছবিটি s3.amazonaws.com এর সৌজন্যে]

ইন্টারনেট ভিত্তিক যোগাযোগের বহুমাত্রিকতার ফলশ্রুতিতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, শিক্ষাদান, শিক্ষকতা, শ্রেণীকক্ষ, পাঠ্যপুস্তকগুলো কি ক্রমেই জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে? আমাদের শ্রেণীকক্ষগুলো কি প্রজন্মের চাহিদাকে ধারণ করতে পেরেছে? অথবা আমাদের শিক্ষকেরা? শিক্ষার্থীরা কেন বিশেষ কোন শিক্ষকের ভক্ত, অথবা কিছু বিশেষ ক্লাসে কেন তাদের উপস্থিতি বেশি, তা কি কখনও ভেবে দেখেছেন? কিছু শিক্ষার্থী কেন একটি ক্লাসে আন্তরিকভাবেই  অংশ নেয়, তা নিয়ে কখনও কি আলাদাভাবে চিন্তা করেছেন? নিজের পাঠদানের মান, কৌশল অথবা এর কার্যকারিতা নিয়ে কখনও ভেবেছেন কি? কঠিন বিষয়ের পাঠদানও উপভোগ্য হয় এবং শিক্ষার্থীরা সেখান থেকে উপকৃত হয়। সবই শিক্ষকের সৃজনশীল পাঠ ব্যবস্থাপনার কারণে। শিক্ষককে বলা হয় সর্বশ্রেষ্ঠ পাঠ্য উপকরণ।

অন্যদিকে শিক্ষককে আমরা একটি রাজ্যের সম্রাট বলতে পারি। সেই রাজ্যটি হলো তার শ্রেণীকক্ষ, যেখানে সবকিছু তার ইচ্ছায় হয়। তিনিই সর্বময় কর্তা – সবা্ই তার অনুসারী অথবা অনুগামী। একটি নির্দিষ্ট সময়ে তিনি কীভাবে শ্রেণীকক্ষ ব্যবস্থাপনা করে সর্বাধিক সুফল নিশ্চিত করবেন, এটি একান্তই শিক্ষকের দায়।

ক্লাসরুমকে শিক্ষকের আঁতুরঘরও বলা যায়, কারণ একমাত্র এখানেই তিনি নিজেকে ষোলকলায় প্রকাশ করতে পারেন।  পাঠদান অথবা বিষয়ভিত্তিক বক্তৃতার এই শিল্পকে তিনি এখানে চর্চা করতে পারেন। এখানে আছে নির্লোভ নির্মোহ শিক্ষার্থীরা, যারা তার পাঠদান শিল্পের বিচারক, মূল্যায়ক এবং ভোক্তা তো বটেই।

 

ক্লাসরুম ম্যানেজমেন্ট/ শ্রেণীকক্ষ ব্যবস্থাপনায় সৃজনশীলতাকে অনুপ্রাণিত করার জন্য কয়েকটি প্র্যাকটিকেল টিপস:

 

>বছর/ সিজন/ টার্মের শুরুটা আনুষ্ঠানিকভাবে করুন। উদ্বোধনী ক্লাস নিন। তাতে জানিয়ে দিন কী করা যাবে, কী করা যাবে না। কোন্ কোন্ ব্যতিক্রম গ্রহণযোগ্য, কোন্ সময়ে নয়। আপনার প্রত্যাশাগুলো জানিয়ে দিন। গত টার্মে কোন ব্যতিক্রম/নেতিবাচক অভিজ্ঞতা হলো স্পষ্টভাষায় জানিয়ে দিন এবার কেন সেটি আর করা যাচ্ছে না। জানিয়ে দিন পরীক্ষা/ ক্লাস টেস্ট/মূল্যায়ন কেমন হবে।

>শিক্ষার্থীর মনে আশা জাগিয়ে তুলুন। কঠিন বিষয়গুলো নিয়ে তাদের মনে অনেক হতাশা আর ভয় থাকে। যদি তারা গণিতের শিক্ষার্থী হয়, বলুন গণিতের দফারফা হবে  এবার। আর কোন ভয় নেই, কারণ আপনি আছেন তাদের সঙ্গে।

>নির্ধারিত সময় শেষ হবার পূর্বে প্রস্তুত/সতর্ক করুন, জানিয়ে দিন। তবে একটু নরম করে। “বাচ্চারা তোমাদের আর মাত্র ৫মিনিট সময় আছে! গো ফাস্ট!” সবসময় এরকম কঠোর না হলে ভালো। একটু কৌশল করে বলতে পারেন, “বাচ্চারা, তোমরা যদি এখনও শেষ না করতে পারো, ঠিক আছে। চালিয়ে যাও। আর ৫মিনিট পর দিলেই হবে।”

>বিশেষ সময়গুলো বিশেষভাবে বলুন এবং বিশেষভাবে শুরু করুন। সাইলেন্ট মোমেন্ট/ ডু নাউ/ নিজে করো সেশন ইত্যাদি। এসবের উদ্দেশ্য হলো, শিক্ষার্থীকে বিশেষভাবে মনোযোগী রাখা। তারা সাধারণত বিশেষ কোন কারণ ছাড়া কিছু করতে ভালোবাসে না।

>শিক্ষার্থীদের বয়সানুপাতিক আচরণগুলো বুঝার চেষ্টা করুন। শিক্ষার্থীরা মাঝেমাঝে খুশগল্পে মেতে ওঠতে পারে/ নিজেদের মধ্যে হুসহাস আলোচনায় ডুবে যেতেই পারে। আপনি যা করবেন, তা হলো প্রথমতো মেনে নেওয়া। তারপর একটি পদ্ধতি বের করুন, যার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তারা আবার ক্লাসে ফিরে আসতে পারে: হাততালি/ ওয়ান-টু-থ্রি ইত্যাদি।

>নেতিবাচক শিক্ষার্থীকে সাবধানে হ্যান্ডল করুন! সব শিক্ষার্থী সব শিক্ষককে পছন্দ নাও করতে পারে। এরকম অপছন্দের জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের কোন দায় নাও থাকতে পারে।  এমনও হতে পারে, কোন শিক্ষার্থী এমনিতেই উদাসীন। কিন্তু শিক্ষকের চাই একসঙ্গে সবার মনযোগ। আপনার অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়ে বলুন, “বাচ্চারা, দেখো! আমাকে বা আমার কথায় তোমরা সবসময় গুরুত্ব দিতে হবে এমন কথা নেই। আমি এমনটা আশাও করি না। কিন্তু শ্রেণীকক্ষে এর ব্যতিক্রম করা যায় না। সেটি তোমাদেরই কল্যাণে। অতএব এখন থেকে আমাকে পছন্দ না হলেও, অন্তত পছন্দ করার/ মনযোগ দেবার ভাণ করো। দেখো চেষ্টা করে।”

>শিক্ষার্থীদের ক্লাসওয়ার্ক টাইমে শ্রেণীকক্ষে হাঁটুন। দেখুন তাদেরকে। বুঝুন তাদের দক্ষতার নমুনা। দেখুন তাদের ব্যক্তিত্ব। দেখান আপনারও ব্যক্তিত্ব। দেখিয়ে দিন আপনিই শ্রেণীকক্ষের শাসক। কিন্তু ঘটঘট করে শব্দ করে হাঁটবেন না। তাদের ডিসটার্ব হয়!

>প্রতিটি শিক্ষার্থীকে আপনার মনযোগটুকু (teacher’s attention) দিন। প্রত্যেককে। কেউ যেন বাদ না যায়। এটিই শিক্ষকের প্রধান কাজ, যা বইয়ে নেই কিন্তু আপনি দিতে পারেন। দুর্বলকে শক্তি দিন, লাজুককে সুযোগ দিন। তাদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলুন।

>স্পষ্ট ভাষায় এবং উচ্চস্বরে কথা বলুন। স্পষ্টস্বরে প্রতিটি শব্দ নিক্ষেপ করুন। এটি পবিত্র শ্রেণীকক্ষ, জ্ঞানগৃহ। অধিকাংশ বিষয়ে আপনিই প্রথম তাদেরকে ধারণা দিচ্ছেন। এখানে মানুষ তৈরি হয়। শিক্ষকের বক্তব্য পবিত্রগ্রন্থ থেকে ‘মাত্র সামান্য একটু’ পিছিয়ে আছে। (অবশ্য কেউ কেউ সমানই বলে থাকেন।) তাই কণ্ঠে রাখুন পবিত্র আত্মবিশ্বাস। কথা জোরে বলুন। তবে রুক্ষস্বরে নয়, তাদের কানের ক্ষতি হয়!

>শিক্ষার্থীদেরকে তাদের অগ্রগতি দেখান। গত পরীক্ষার চেয়ে এবারের পরীক্ষায় তারা কীভাবে ভালো করেছে, সেটি নিজেও দেখুন, তাদেরকেও দেখতে দিন। তাদেরকে বুঝিয়ে দিন যে, আপনিই পারেন তাদেরকে দুর্বলতা থেকে ওঠিয়ে নিয়ে আসতে। তাতে তাদের বিশ্বাস বেড়ে যাবে, নিজেদের প্রতি এবং আপনার প্রতিও।

>শ্রদ্ধা দেখান শিক্ষার্থীদের প্রতি। গুরুজনদের যেভাবে দেখায় সেভাবে নয়। তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, তাদের প্রচেষ্টা, তাদের আত্মসম্মানকে শ্রদ্ধা করুন। সবসময়। নির্ভুল না হলেও তাদেরকে উত্তর দেবার চেষ্টাকে স্বীকৃতি দিন।

>স্বভাব একটু পাগলাটে হলে তাতে অপরাধবোধ নেবেন না। শিক্ষার্থীরা কেতাদুরস্ত শিক্ষক চায় হয়তো, কিন্তু ভালোবাসে না। ভালোবাসে তাদেরকেই যারা একটু তাদের মতো দুরন্ত, অবোঝ, পাগলাটে এবং যাদের কিছু-না-কিছু ঘাটতি আছে। উইয়ার্ড এর বাংলা কি ‘কিম্ভুতকিমাকার’? সেটি হলেও মন্দ নয়।

 

mmmainul_teachingtips

 

 


পুনশ্চ: আপনারা যারা শিক্ষকতা করছেন, তারা হয়তো সবাই ভেবেচিন্তে এপথে আসেন নি। ব্যাপার না। সব পেশাতেই এরকম উল্টোপথে-চলা মানুষ আছে। এপেশায় একটু বেশি, এই যা! কেউ কেউ আবার দারুণ মানিয়ে নিতে পারেন। তারা জিনিয়াস! অনেকেই পারেন না। ভালো শিক্ষক হতে চাইলেও চলমান দৃষ্টান্তগুলো ততটা প্রেরণাদায়ক নয় বলে আবার পিছিয়ে আসেন। ফলে আরলি ড্রপআউট, অর্থাৎ চাকরি বদল অথবা প্রতিষ্ঠান বদল। অথবা দেখা গেলো যে, প্রতিষ্ঠানই আপনাকে বদল করে দিলো!  চাকরি গ্রহণের শুরুর কয়েক বছর এরকম চলে। সবাই তো আঁকাবাঁকা পথকে সোজা করতে পারেন না। পরিস্থিতিও ভালো থাকে না। যেমন ধরুন, শিক্ষার্থীদের অবাধ্যতা। পাঠে অমনোযোগ। অনুপস্থিতি। দেরিতে আসা। বারবার বলে দেবার পরও ভুলে যাওয়া, বা বুঝতে না পারা। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা। এসব পরিস্থিতিতে মেজাজ খিটখিটে থাকে, যা বাসায় ফিরলেও ঠাণ্ডা হয় না। তারপরও শিক্ষকতাকে যারা মনেপ্রাণে মেনে নিয়েছেন, শিক্ষাদানে তারা অপার আনন্দ লাভ করেন। তারা সৃজনশীল। তারা সৃজনকারীও।

শিক্ষাদানের সময়টি এখনও আমি অনুভব করি। এই ভিডিওটি আমাকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছে

 

যেসব কাজ করে আমাদের শিক্ষকেরা শিশুদের মেধা ও সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করছেন!

8

তুমি আছো তবু তুমি নেই!  পরিস্থিতি ঠিক এরকমই।  শিক্ষক উপস্থিত, প্রতিদিন পড়াচ্ছেন, পরীক্ষা নিচ্ছেন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন করছেন -তবুও যেন তিনি নেই।  ঘাটতি কাটছে না।  এই ঘাটতি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে খুঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে।  শিশুদের বিকাশকে করছে বাধাগ্রস্ত।  এমন কয়েকটি বিষয় নিয়ে বর্তমান লেখাটি।

 

আমাদের দেশে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের হার মাত্র ৫৭.৭৩ শতাংশ।  অর্থাৎ ৪২ শতাংশ শিক্ষক কোন প্রায়োগিক ধারণা ছাড়াই আমাদের শিশুদের মুখোমুখি হচ্ছেন।  এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা চাকরির আগেই প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, নাকি পরে নিয়েছেন, সেটি অবশ্য স্পষ্ট নয়।

তবে বাস্তব চিত্রটি আরও বিপদজনক, কারণ ব্যক্তিগতভাবে বেড়ে ওঠা বিদ্যালয়গুলো এই প্রতিবেদনে নেই। পৌর এলাকায় ছত্রাকের মতো বেড়ে ওঠা ইংরেজি মাধ্যম এবং কেজি স্কুলগুলোও এখানে নেই।  কিছু সুপরিচিত বিদ্যালয় বিষয়ভিত্তিক পাঠদানের ওপর তাদের শিক্ষকদেরকে প্রশিক্ষণ দিলেও, শিশু মনস্তত্ত্ব বা শিশুর অন্যন্য চাহিদাকে কেন্দ্র করে কোন প্রশিক্ষণ প্রায় নেই।  এটি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক (বিএড অথবা এমএড পর্যায়ে) শিক্ষায়ই থাকে।

শিশুর বয়স অনুপাতে পাঠদান এবং পাঠ মূল্যায়ন করতে পারা একটি বিশেষায়িত জ্ঞান।  প্রশিক্ষণ অথবা বাস্তব অভিজ্ঞতা কোন কিছুই নেই, এমন শিক্ষকই বেশি থাকায় শিশুর চাহিদার বিষয়টি উপেক্ষিত থাকছে।

শিশুর মনমানসিকতা এবং তাদের বৈচিত্রময় চাহিদাকে না বুঝে আমাদের অধিকাংশ শিক্ষক প্রায় জোর করেই পাঠ্যপুস্তককে গলাধকরণ করাচ্ছেন। ফলে শিশুরা তাদের উপযুক্ত পাঠ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং বিদ্যালয় হয়ে যাচ্ছে পরীক্ষা পাশ করানোর এজেন্সি।

 

এমন একটি পরিস্থিতি যে, এসব ভয়ংকর পরিস্থিতি নিয়ে তাত্ত্বিকভাবে অনেক কিছুই বলার সুযোগ আছে।  অনেক প্রায়োগিক ত্রুটি হচ্ছে, যা স্থায়ি প্রভাব ফেলছে শিশুদের প্রতিভা বিকাশে।  এবিষয়ে বিস্তারিত বললে পাঠকের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটবে।

কিন্তু কিছু মৌলিক বিষয়ে আমাদের মতো আমজনতার সচেতনতার প্রয়োজন।  তা না হলে পারস্পরিক জবাবদিহিতা গড়ে ওঠবে না।  তাতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠতে পারে।  তাই শুধু মৌলিক কিছু বিষয় নিয়ে বর্তমান লেখাটি।

 

শিশু মনস্তত্ত্ব বিষয়ে প্রায়োগিক জ্ঞান না থাকায় অনেক শিক্ষক ‘ঠিক এভাবে’ শিশুদের প্রতিভার বিনাশ করছেন:

 

1

১) অপ্রয়োজনীয় শব্দ/বিষয়/পরিভাষাকে পাঠের মূল বিষয় হিসেবে পরিচিত করিয়ে

বাঁশে তেল মাখার পর এটি কেন অথবা কীভাবে পিচ্ছিল হয় শিশুকে এসব বুঝার আগেই, তৈলাক্ত বাঁশ দিয়ে বানরের ওঠানামাকে পাটিগণিতের মূল বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।

নীলনদ মিশরের আশির্বাদ, পক্ষান্তরে হুয়াংহু চিনের দুঃখ; অথবা হাওয়াই রাজ্যের রাজধানী হনুলুলু এসব বিষয় মুখস্থ করানোর জন্য এদেশে শিশুদের ওপর শারীরিক নির্যাতন হয়েছে।  অথচ নিজের দেশের তিনটি প্রধান নদীর অবস্থানকে সেভাবে শেখানো হয় নি।  নিজের গ্রামের পাশের শাখা নদীটি কোথা থেকে  এলো, অথবা এটি আদৌ নদী নাকি নদ, সেটিও সেভাবে বুঝানো হয় নি।

‘ডাক্তার আসিবার আগেই রোগী মারা গেলো’ এর ইংরেজি অনুবাদ করতে পারাকে ইংরেজির জ্ঞান বলে তুলে ধরা হয়েছে।  কথা বলা নয়, অনুবাদ আর শব্দার্থ শিখতে পারাকেই ভাষাজ্ঞান বলে বিশ্বাস করানো হয়েছে।  ফলে তারা অনুবাদ শিখলেও ভাষাগত জ্ঞান থেকেছে অধরা।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটিই এমন।  যখন যা প্রয়োজন, তখন সেটি  শেখানো হয় নি। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় পরিভাষা, বয়সের অনুপযুক্ত ইতিহাস ও ভূগোল শেখানোর জন্য শিশুর মনস্তত্ত্বে স্থায়িভাবে আঘাত হানা হয়েছে।

 

2

২) অনুপযুক্ত বিষয় চাপিয়ে দিয়ে

পাঠদানকে সহজ করা অথবা ‘বোধগম্য অংশে’ ভাগ করা শিক্ষকের প্রাথমিক দায়িত্ব।  প্রশিক্ষণের অভাবে হোক, অথবা প্রতিশ্রুতিশীলতার অভাবে, অধিকাংশ শিক্ষক সেটি করেন না।

উপরন্তু, শিশুদের জন্য যা উপযুক্ত নয়, সেসব বিষয় চাপিয়ে দেন: যা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন, সেটি দেওয়া হয় মুখস্ত করার জন্য।  যে বিষয় দেওয়া হয় শুধুই প্রাথমিক ধারণা দেবার জন্য, সেটি প্রয়োগ করতে বাধ্য করা হয়।

লেখা থেকে শোনা, তারপর পড়া, তারপর শেখা।  তারপর প্রয়োগ।  শব্দ রচনা থেকে বাক্য রচনা।  বাক্য থেকে অনুচ্ছেদ। তারপর রচনা বা চিঠি।  এসব পারম্পরিক প্রক্রিয়া আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে অনুপস্থিত।

রচনা, চিঠি, ভাবসম্প্রসারণ, অনুচ্ছেদ – এসব বিষয় শিশুদের স্বাভাবিক চিন্তা থেকে আসা উচিত।  এখানে শুদ্ধতা নয়, চর্চাকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।  কিন্তু একটি শুদ্ধ রচনা পরীক্ষার খাতায় লেখার জন্য শিশুদেরকে মুখস্ত করতে বাধ্য করা হয়।

রোট লানিং বা বোধহীন মুখস্ত করার প্রবণতা শিশুদের স্বাভাবিক বিচার শক্তিকে নষ্ট করে দেয়।

আমাদের শিশুরা সৃজনশীল কোনকিছু লেখতে পারে না।  ইংরেজি কী লেখবে, বাংলাই তো লেখতে শিখে নি!

 

 

3

৩) নিজেই সবকিছু করে দিয়ে

পাঠ্যবইয়ে লেখাই থাকে ‘নিজে করো’।  কিন্তু দয়ার্দ্র্য শিক্ষক সেটি শিশুকে দিয়ে করাতে চান না!

পাঠ্যবইয়ের অনেক বিষয়ই শিশুরা হয় ‘একা অথবা দল’ হিসেবে করে ফেলতে পারে।  তাতে শিক্ষকেরও শ্রম কমে যায়।  কিন্তু শিক্ষক সেটি না বুঝার কারণে, অথবা নিজের প্রয়োজনীয়তা অটুট রাখার জন্য, শিক্ষার্থীদেরকে নিজে থেকে কিছু করাতে চান না।

শিশুরা চ্যালেন্জ নিতে এবং নিজেই কিছু করে দেখাতে পছন্দ করে।  কিন্তু অনেক শিক্ষক শিশুদের এই স্বাভাবিক প্রবণতাকে শিক্ষাদানের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

ফলে শিশুরা পরনির্ভশীলতা থেকে ওঠে আসতে পারে না। পাঠ্যবইয়ের বাইরে তারা কিছুই করতে বা লেখতে বা সৃষ্টি করতে পারে না।

বড় ক্ষতি হলো, তারা নিজে থেকে কিছুই করার সাহস পায় না, কারণ শিক্ষাজীবনে এই অভ্যাসটি তাদের গঠিত হয় নি।

 

 

4

৪) নিজের দায়িত্ব পালন না করে

পাঠপরিকল্পনা না করা।  এই অভ্যাসটি প্রায় নেই বললেই চলে।  আমাদের শিক্ষকেরা ক্লাসের আগে পাঠপরিকল্পনা (লেসন প্লান) তৈরি করাকে অতিরিক্ত কাজ বলে মনে করেন। অথচ এটি তাদেরই পেশাগত দক্ষতাকে শানিত করে।  পরিকল্পনা ছাড়া কার্যকর এবং অংশগ্রহণমূলক পাঠদান অসম্ভব।

পরীক্ষা এবং শ্রেণীকক্ষ ভিত্তিক পাঠদানের জন্য উপযুক্ত প্রস্ততি না নেওয়া।  যেহেতু দৈনন্দিন পাঠদানের জন্য কোন পূর্বপ্রস্তুতি নেই, একই কারণে পরীক্ষা বা গুরুত্বপূর্ণ কোন মূল্যায়নের জন্য শিশুরা কার্যকর দিকনির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হয়।

কোন্ বিষয়টি শিশুদের বৈচিত্রময় সামর্থ্যের সাথে সাংঘর্ষিক, শিক্ষক এসব বিষয়ে ধারণা রাখেন না।  ফলে কঠিন বিষটি তাদের দায়িত্বহীনতার কারণে আরও কঠিন হয়ে আবির্ভূত হয় শিশুদের মাঝে।

নিয়মিত শিক্ষার্থীদের সাথে না থাকা।  কিছু বিশেষ সময় শিশুদের দরকার হয় শিক্ষকের সঙ্গ – মাবাবার কার্যকারিতা কম। শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে থেকেও শিশুদের থেকে অনেক দূরে থাকেন।  সেটি মনস্তাত্ত্বিক অথবা ভৌগলিক উভয়ই হতে পারে।

একটি কঠিন বিষয়ের সমাধানের সময়, শিক্ষকের সাহচর্য্য প্রয়োজন।  শিক্ষক তার ব্যক্তিত্ব ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ দিয়ে নিজেকে শিশুদের মধ্যে ‘এভেইলেবল’ রাখবেন, এটিই প্রত্যাশিত।  এই প্রত্যাশিত আচরণটি শিক্ষকদের মধ্যে পাওয়া যায় না।

অভিভাবকদেরকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত না করা। শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন বিদ্যালয় এবং অভিভাবকের সমন্বিত প্রচেষ্টা।  অভিভাবককে যথাসময়ে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, যা অনেক শিক্ষক পালন করেন না, অথবা এর গুরুত্ব মূল্যায়ন করেন না।

 

 

5

৫) শুধুই পাঠ্যপুস্তকের অনুশীলনী মোতাবেক পাঠদান করে

পাঠ্যপুস্তকে দেওয়া অনুশীলনী মোতাবেক পাঠদান করা সহজ, তার প্রধান কারণ সেটি বাজারের নোটে সমাধান করা আছে। দ্বিতীয় কারণ হলো, এতটুকুতেই শিক্ষক অভ্যস্ত।

পাঠ্যপুস্তকের বাইরে যাওয়া কঠিন, কারণ তাতে শিক্ষকের অতিরিক্ত চিন্তা করতে হয়। ভালোমতো ভাবতে না পারলে শিক্ষার্থীদের কাছে বিব্রত হবার সম্ভাবনা।  বিব্রত হবার ভয় আছে, কারণ আমাদের শিক্ষকেরা ‘সবজান্তা’ হিসেবেই নিজেকে প্রদর্শন করতে চান।

কিছু বিষয়ে ঘাটতি থাকতে পারে, কিছু বিষয় শিক্ষার্থীদের সমবেত চেষ্টা থেকে বের হয়ে আসতে পারে।  এটি আমাদের অধিকাংশ শিক্ষক বিশ্বাস করতে নারাজ।

পাঠ্যবইয়ের বিষয় নিয়েই অতিরিক্ত প্রশ্নপত্র সৃষ্টি করা যায় এবং তাতে শিশুদের মধ্যে আগ্রহ ও কৌতূহল বৃদ্ধি পায়।  নতুন বিষয়কে সমাধান করে তারা আনন্দ পায়।  বড় সুফল হলো, তাদের দক্ষতার বিস্তৃতি ঘটে।

পাঠ্যপুস্তকে সীমাবদ্ধ থাকার এই প্রবণতার ভয়ংকর দিকটি হলো, শিশুরা পাঠ্যবিষয়কে জীবনের সাথে মেলাতে পারে না।  পাঠ্যবইয়ে গুরুজনকে সালাম জানাবার বিষয়টি শিখে পরীক্ষার খাতায় লেখে আসলেও, সামনে কোন বয়স্ক ব্যক্তিকে পেলে তারা সম্মান জানাতে ভুলে যায়।

জীবন আটকে যায় পাঠ্যপুস্তকের পাতায়।

 

 

6

৬) পরীক্ষা/গাইডবুকমুখী পাঠদান করে

প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিটি আবশ্যিক বিষয়ে ‘শিক্ষক সহায়িকা’ আছে।  প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষক সেটি অনুসরণ করেন না।

অপ্রত্যাশিত হলেও, এটি প্রচলিত সত্য যে, পরীক্ষার লক্ষ্যেই তারা পাঠদান করেন।  আমাদের সমাজে শিক্ষক  এবং অভিভাবকের যৌথ প্রয়াসটি হলো: বিদ্যাদান নয়, পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি প্রদান করা।

যেহেতু পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতেই হবে, সেহেতু গাইড বই পড়ো।  গাইড পরীক্ষায় পাশ করালেও, এটি সবসময়ই জীবনের দিকনির্দেশনায় ‘মিসগাইড’ করে।

ফলে শিশুরা বিদ্যার জন্য পড়ার সুযোগ বা স্বাধীনতা কিছুই পায় না। এমনকি নিজের চেষ্টায় ‘স্বাভাবিক সামর্থ্য  দিয়ে পাশ করার’ সুযোগ থেকেও তারা বঞ্চিত।  কৃত্রিম উপায়ে জিপিএ ফাইভ পাওয়াতে পারলেই আমাদের শিক্ষকগণ খুশি।

অধিকাংশ শিশুদের তাদের ঐকান্তিক চাওয়া ও স্বপ্নের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে যুক্ত করতে পারে না।

 

 

7

৭) পাঠ্যপুস্তকই জীবনের সবকিছু, বাকি সব অপাঠ্য -এমন ধারণা দিয়ে

“আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, স্বশিক্ষাই একমাত্র শিক্ষা।” বলেছেন আইজাক আসিমভ।  প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হয়তো পরীক্ষায় পাশ করায়, কিন্তু প্রতিষ্ঠিত সত্য হলো,  কর্মসংস্থানের পরীক্ষায় এসে সকলেই একবার করে হাবুডুবু খেতে হয়।

পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের শিক্ষক (এবং অভিভাবকেরা) পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞানকেই বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় মনে করেন।  তাদের এই অপবিশ্বাস তারা শিশু এবং সন্তানদের মধ্যেও ইনজেক্ট করেন।  অবুঝ শিশুরা তখন কিছুই বুঝতে পারে না, যে পর্যন্ত না জীবনের প্রধান পরীক্ষা অর্থাৎ কর্মসংস্থানের মুখোমুখি হচ্ছে।

পরিণতি হলো ঘরকুনো হয়ে শুধুই পাঠ্যপুস্তকের বিষয় গলাধকরণ করা।  পরীক্ষা, শিক্ষক আর অভিভাবকের  সমবেত চাপের কারণে নিজেদের পছন্দের বইটিও তারা পড়তে পারে না।  বরং ‘আউট বই’ পড়াকে তারা অপরাধ হিসেবেই বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছে।

নজরুলের মতো উড়নচণ্ডেরাই প্রতিভাবান হয়। মাটির সাথে যুক্ত না থাকলে যেমন তরু বাঁচে না, প্রকৃতি থেকে বিযুক্ত শিক্ষা কখনও ফলদায়ক হতে পারে না।

এরকম একমুখী চাপের কারণে শিশুরা তাদের স্বাভাবিক জ্ঞানার্জন ও প্রাকৃতিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়।

 

 

আমাদের শিক্ষানীতিতে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু শ্রেণীকক্ষের পাঠদানকে উন্নয়ন করার জন্য বিশেষ কোন ব্যবস্থা আজও নেওয়া হয় নি। পাঠদান সম্পর্কে মৌলিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই এদেশে চাকরি পাওয়া যায়।

আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঘিরে বিস্তর গবেষণা হচ্ছে।  অনেক উন্নয়নও হচ্ছে।  কিন্তু উন্নয়নের নামে যখন শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করা হয়, তখন ধরেই নেওয়া যায় যে, প্রাথমিক শিক্ষার কোন ভবিষ্যত নেই।

 

[প্রথম প্রকাশে লেখাটি ৬২০০ বার শেয়ার হয়েছে:  সামহোয়্যারইন ব্লগ/ ১০ এপ্রিল ২০১৬]

 

বিদ্যালয় আমারে শিক্ষিত হতে দিলো না

▶সাউথপোলার অথবা স্বশিক্ষিত ক্ষণজীবীরা [৬ অগাস্ট ২০১৬]

 


 

টীকা:

১) ব্যতিক্রম কি নেই: ইচ্ছাকৃতভাবেই কিছু বিষয়কে সরলিকরণ করা হয়েছে, যেন প্রচলিত শিক্ষাদান পদ্ধতিতে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা যায়।  আমার জানামতেই অনেক শিক্ষক এবং অভিভাবক আছেন, যারা শিশুদের সৃজনশীলতাকে প্রেরণা দেবার জন্য নিজেদের ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়াকে বিসর্জন দিয়েছেন। এমন রত্নগর্ভা মাতা আমাদের মধ্যে আছে।  দুঃখের বিষয় হলো, তাদের সংখ্যাটি খুবই নগণ্য।

২)  শিক্ষানীতিও কি দায়ি নয়:  প্রজাতন্ত্র হোক কিংবা রাজতন্ত্র, রাষ্ট্রই সবকিছু নির্ধারণ করে দেয়। যার ক্ষমতা, তারই দায় থাকে।  শিক্ষানীতিই সবকিছুর জন্য দায়ি। এবিষয়ে আলাদাভাবে লেখার খায়েশ আছে।

৩) দৃষ্টান্তগুলো কি পর্যাপ্ত: দৃষ্টান্তগুলো কেবলই একেকটি প্রতীক।  এগুলোর যথার্থতার চেয়ে প্রাসঙ্গিকতাকে বেশি বিবেচনা করা হয়েছে।

৪) সৃষ্টিহীন শিক্ষা কি স্রষ্টাহীন দেশের জন্য দায়ি:  পশ্চিমারা শিক্ষায় আবিষ্কারে অভিযানে এগিয়ে থাকে, এটিই যেন স্বাভাবিক। গুটি কয়েক জগদীশ, রবীন্দ্রনাথ আর ফজলুর রহমান ছাড়া এদেশে আর কোন প্রতিভাবান নেই বা ছিল না। কেন নেই, কেন ছিল না সেটি নিয়ে মাঝে মাঝে ভাবিত হই।  দেশের সৃষ্টিহীন শিক্ষা ব্যবস্থা কি এর জন্য দায়ি?