Tagged: নারীর কাজের অধিকার

তানিয়াদের সকাল: নারীর জন্য কি কাজ আছে?

স্বামীকে বিদায় জানিয়ে দরজাটি বন্ধ করার পর মুহূর্তেই অভিমান আর বিষণ্নতায় পেয়ে বসলো তানিয়াকে। তানিয়া আহমেদ। সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট। স্বামী পারভেজ আহমেদ। ব্যাংকার। একমাত্র সন্তানকে নিয়ে নিউক্লিয়াস পরিবার – সঙ্গে ভাইবোন মাবাবা কেউ নেই। সকলেই গ্রামে বা অন্য শহরে।

পৌরফোনে তানিয়ার চাকরির দশ বছর পূর্ণ হলো আজ। সহকর্মীরা আজ তাকে নিয়ে কী কী করতো, কে কী ভাষায় অভিনন্দন জানাতো তা-ই ভাবছেন তানিয়া, আর বাসন মাঝছেন। জানালায় আকাশ দেখছেন আনমনে। কতকিছুই না মনে পড়ছে তার আজ! পৌরফোনে চাকরিটা হবে যখন বুঝতে পারলেন, তখন থেকেই তিনি বুঝতে পারলেন যে চাকরিটা তার করা হবে না। চাকুরির ইন্টারভিউতে নিয়োগকারীই সাধারণত প্রশ্ন করে, শর্ত দেয় – তানিয়ার বেলায় ছিলো তার উল্টো। ছুটি হবে কি না, মা হতে পারবেন কিনা, যাতায়াতের জন্য ট্রান্সপোর্ট হবে কি না ইত্যাদি। প্রশ্নকারীরা বিস্মিত হলেও উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলেন, কারণ তানিয়ার স্পষ্টবাদিতা তাদের পছন্দ হয়েছিলো। তারা মজাই পাচ্ছিলেন। বেতন ভাতা ইনক্রিমেন্ট প্রমোশন ইত্যাদি বিষয়ে কোন আগ্রহই নেই তানিয়ার। তার আগ্রহ ছিলো কাজটি কেমন হবে, সেটা করতে পারবেন কিনা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিলো অফিস তার যাতায়াতের ব্যবস্থা করবে কি না। খুশিতে কাঁদতেছিলেন তানিয়া ইন্টারভিউ রুমেই। কারণ চাকরিটা তার হয়েই গেলো এবং তা তখনকার বাজারে বেশ মোটা-বেতনের চাকরিই বলা যায়। স্বামী তো খুশি এবং বিস্মিতও; যেন এই প্রথম পারভেজ বুঝতে পারলেন যে স্ত্রীরা স্বামীর চেয়ে বেশি বেতন পেলে সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। চাকরি করার আনন্দ আর না করতে পারার আশংকায় হাবুডুবু তানিয়া বেতনের পরিমাণ নিয়ে কখনও ভাবেন নি।

আজ দশম বছরে তানিয়াকে জানালায় তাকিয়ে কাঁদতে হচ্ছে। চাকরিটা আছে বলেই হয়তো তানিয়াকে কাঁদতে হচ্ছে। অথচ প্রতিবারই তানিয়া অফিস থেকে একটি লাল চিঠির আশংকা করেন। এভাবে কতদিন সে অফিসকে ঠকাবে? এভাবে কতদিন শুনতে হবে মেয়েরা ফাঁকিবাজ, যখনতখন অফিসে অনুপস্থিত থাকে? সিনিয়র সহকর্মীরা তাকে বড্ড ভালোবাসে, তাকে বুঝার চেষ্টা করে এবং সহমর্মীতা দেখায়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সমপর্যায়ের সহকর্মীদের নিয়ে, যাদের নিয়োগ হয়েছে তারই সময়ে, তারা টিজিং করেই যাচ্ছে।

অমিতের জন্মের পর নির্ধারিত মাতৃ-ছুটির পরও তানিয়াকে একমাস বেশি ছুটি নিতে হয়েছিলো। এক সহকর্মী তো বলেই ফেললো, “বাব্বা! এতদিন পরও চাকরি থাকে! পরজনমে যেন নারী হয়ে জন্ম নেই, খোদার কাছে আমার এই প্রার্থনা!”

আরেক সহকর্মী তার চিরাচরিত শার্লকহোমস-টাইপের প্রশ্ন নিয়ে সেদিন চায়ের আড্ডাটিকে মাটি করে দিয়েছিলো। “আচ্ছা, এত অনুপস্থিত থাকার পরও আপনি এবার প্রমোশন পেলেন কী করে? বসও তো আপনাকে নিয়ে কোন কটুকথা বলতে শুনি নি!” তানিয়া এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে চান না। ছেলেরা ভালো করলে কোন প্রশ্ন নেই, সেটা স্বাভাবিকভাবে সকলে মেনে নেয়, কিন্তু মেয়েরা কর্মস্থলে সুনাম অর্জন করলে সকলেই সন্দেহের চোখে তাকায়। প্রতিষ্ঠানের জন্য এতো পরিশ্রম করেও তাকে নিরন্তর এরকম অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।

হঠাৎ অমিতের ‘আম্মু’ ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেলেন তানিয়া। অমিত ঘুম থেকে ওঠেছে। বাবার ভক্ত হলেও অমিত আজ মাকে বাসায় পেয়ে বেজায় খুশি। “জাহানারা খালা আসে নি কেন, আম্মু?” তানিয়া তার কী উত্তর দেবে? জাহানারা আসে বেড়িবাঁধের বস্তি থেকে। বিধবা জাহানারা গত দু’তিন মাস ধরে তানিয়াদেরকে সাহায্য করছে। তার প্রধান কাজ অমিতকে দেখাশুনা করা। ঠিক গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলো যে কীভাবে জাহানারা টের পেয়ে যায় সেটা তানিয়া আজও বুঝতে পারেন নি। যেদিন তানিয়ার অফিসে থাকার খুবই দরকার, ঠিক সেদিন জাহানারা আসে না! “আম্মু আম্মু, আবার যদি খালা না আসে তাহলে আব্বুকে বলো আমার সাথে থাকতে।” তা কী করে হয়! জাহানারা না আসলে তো তানিয়াকেই বাসায় থাকতে হবে। এই তো স্বাভাবিক। অমিতকে বুকে জড়িয়ে তানিয়া আরেকটি দিন অফিসের কথা ভুলে যাবার চেষ্টা করেন।

নারীর কথা: কেনো আমি একটি কর্মজীবন পাবো না?

আমি অনেকবার ভেবেছি জবটি করবো কি করবো না। অগণিত চাকরির প্রস্তাব আমি ফিরিয়ে দিয়েছি বিভিন্ন সামাজিক পারিবারিক ও যোগাযোগ সমস্যার কারণে। বর্তমান প্রস্তাবটি সব দিক দিয়ে উপযুক্ত মনে হচ্ছে। এটি আমার যোগ্যতা ও ব্যক্তিগত জীবন-দর্শনের সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। সকল বিবেচনায় একটি উপযুক্ত চাকরি হওয়া সত্ত্বেও চাকরিটি আমি করবো কিনা, সে সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না।

চাকরি করার পথে অনেকগুলো বাধার মধ্যে বড় দুটি বাধা হলো আমার মা হওয়া এবং আমার স্ত্রী হওয়া। আমি মা হতে চলেছি আগামি আট-ন’মাসের মধ্যে। প্রথমটি নিয়ে চিন্তিত নই, কারণ যে প্রতিষ্ঠানে যোগ দিবো, সেখানে মাতৃত্বকালীন ছুটি পাওয়া যাবে। তারপর একটি কাজের মানুষ যোগাড় করে নেবো। দ্বিতীয় বিষয়, আমার স্ত্রী হওয়ার বিষয়টিতে যে কেউ আঁতকে ওঠতে পারেন। তবে কি স্ত্রী হওয়া নারীর জন্য অস্বাভাবিক কিছু? না, তা মোটেই নয়। আমি মূলত আমার স্বামীর বিষয়টি মনে নিয়েই এ কথা বলেছি।

আমার স্বামীর কথা বলি। আমরা ভালোবেসে বিয়ে করেছি। তার যে বিষয়টিতে আমি বেশি দুর্বল ছিলাম, তা হলো নারীর প্রতি তার অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভক্তি। আমার স্বামী খুব মাতৃভক্ত মানুষ, এখনও বাড়িতে গেলে মায়ের হাতে ভাত খায়। নারী ঘর থেকে বের হয়ে কাজ করুক এবং দেশের কর্মশক্তিতে যোগ দিক এরকম মনোভাব সে সবসময়ই প্রকাশ করতো। রাস্তা-ঘাটে নারীর চলাচলে সামাজিক বাধা, পাবলিক বাহনে তাদের যাতায়াতের সমস্যা ইত্যাদি বিষয়ে আমার স্বামী সবসময়ই সোচ্চার।

এখনও তার মনোভাবের কোন পরিবর্তন দেখি না। কিন্তু আমার চাকরি করার বিষয়টি ওঠে আসাতে তাকে একদম নিশ্চুপ এবং নিরাবেগ দেখছি। এখন পর্যন্ত হ্যাঁ বা না কিছু পরিষ্কার করে বলছে না। “চাকরিটি কি করবো” এরকম প্রশ্নের জবাবে তার “হ্যাঁ, করো না!” জবাবে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না তার মনের কথাটি আসলে কী? এমনও নয় যে আমি তার বিশ্বাস ভঙ্গ করবো, কারণ নিজের সততায় আমার আত্মবিশ্বাস আছে। আমার স্বামীরও ওরকম আশঙ্কা আছে বলে মনে করি না।

সবমিলিয়ে এক কঠিন সময় অতিক্রম করছি আমি এখন। শুধুই চাকরি করবো বলে পড়াশুনা করি নি, কিন্তু শুধুই গৃহিনী হয়ে কিচেন মাস্টার হয়ে জীবন শেষ করবো – এরকম চিন্তাও করি নি। অন্যদিকে আমার স্বামীকেও আমি ভালোবাসি এবং আমি চাই সে ভালো থাকুক এবং তার কর্মজীবন গড়ে ওঠুক। এপর্যন্ত তার ক্যারিয়ারে বাধা সৃষ্টি করে এরকম কিছুই করি নি,বরং তাকে দিনের কাজের জন্য প্রস্তুত করতে যা-কিছু করণীয় সবই করে যাচ্ছি, যার বিবরণ এখানে শেষ করা যাবে না। আমি একজন সফল গৃহিনী থাকতে চাই, তাই বলে কি আমি একটি কর্মজীবন পাবো না?