Tagged: চিঠি লেখা

প্রথম আলো ব্লগের ‘প্রিয়চিঠি আয়োজনে’ চিঠি নির্বাচন: মাটির ময়না’র চিঠি

[[ প্রিয় চিঠি আয়োজন নিয়ে প্রকাশিত মোট চারটি লেখায় ‘সাহিত্য আয়োজন’ সম্পর্কে আমার অভিমত, অভিজ্ঞতা এবং পরামর্শ নির্দ্বিধায় প্রকাশ করেছি। সহব্লগারদের যেকোন লেখায় যেমন দ্বিধাহীন মতামত দেই, এক্ষেত্রেও আমার স্বভাবের ব্যতিক্রম করি নি। এবার নির্বাচকের ভূমিকায় থেকে নিজের দ্বিধার সাথে একটু বেশিই যুদ্ধ করেছি এবং ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা থেকে ‘আয়োজক-আয়োজিত’ সকলের সম্পর্কেই মন্তব্য করেছি। কেউ পড়েছেন, কেউ আবার মন্তব্য দিয়ে উৎসাহিতও করেছেন। সকলকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা!  ]]

শুরুতেই প্রিয়চিঠি আয়োজনে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে যুক্ত সকল সম্মানীত সহব্লগারকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। সম্মানীত উপদেষ্টা মণ্ডলি এবং নির্বাচক মণ্ডলিকে জানাচ্ছি আন্তরিক অভিনন্দন। চিঠিলেখা আয়োজনে কী বিশাল অভিজ্ঞতা ও ধারণা অর্জনের সুযোগ হয়েছে, তাতে ব্লগে কতটুকু কর্মচঞ্চলতার সৃষ্টি হয়েছে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আগেই বিস্তারিত বলেছি। আয়োজকের একনিষ্ঠতা এবং নির্বাচকের সমস্যা নিয়েও আলোকপাত করেছি‘প্রাক নির্বাচনী’ লেখাগুলোতে। প্রিয় চিঠি নির্বাচনের কাজটি কেন জটিল এবং ভবিষ্যতে এসব জটিলতাকে মোকাবেলা কীভাবে একটি সফল আয়োজন করা যায়, এসব নিয়ে বিগত ৩টি পোস্টেআমার ব্যক্তিগত মতামত তুলে ধরেছি। অতএব এসব নিয়ে আর কিছু বলছি না।
.
.
.
১) প্রিয় চিঠি নির্বাচনে বিবেচ্য বিষয়গুলো
পরিস্থিতির সার্বিক মূল্যায়ন করে, প্রিয়চিঠি নির্বাচনে বেশকিছু বিষয়কে মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করেছি। তাদের মধ্যে ৩টি বিষয় সম্মানীয় সহব্লগারদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরছি:
.
 চিঠির পটভূমি
 চিঠির বক্তব্যে সমাজ-সংশ্লিষ্টতা
 পাঠকের মনে আবেদন সৃষ্টি করার ক্ষমতা
.
চিঠি নির্বাচনে কোন শর্ত যুক্ত না থাকার সুবাদে, ইচ্ছাকৃতভাবেই ‘ভাষা শব্দচয়ন এবং বানানের’ বিষয়টিকে আমি চিঠি নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হিসেবে নেই নি। আমার অভিজ্ঞতায়, চিঠির স্বাভাবিক কোন পাঠক ভাষা ও শব্দচয়ন দিয়ে চিঠির পরিমাপ করেন না। বরং তারা এক নিঃশ্বাসে ‘ইতি’ পর্যন্ত গিয়ে চিঠির বক্তব্য হৃদয়ঙ্গম করতে সচেষ্ট হয়। ইউনিকোডে লেখতে গিয়ে অনিচ্ছায় অনেক বানানের ভুল হয়েই যায়। তারপরও বিষয়টিকে মন থেকে পুরোপুরি মুছে দিই নি। চেতনে অবচেতনে বানান ও ভাষার ভুলও পর্যবেক্ষণ করেছি।শব্দচয়ন অনেক উচ্চতর ভুল বিবেচনা করে এসব আমি আমলেই নিই নি।
.
.
অন্তত ২০টি চিঠি আমি প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করেছি। এগুলো হলো: কুদরতির প্রতি কাজী আনোয়ার হোসেনের চিঠি, মেজদা’র প্রতি গোলাম মোস্তফার চিঠি, আকাশের প্রতি কথামানবীর ১ম এবং ২য় চিঠি, প্রিয়তমেষূকে আলভিনা চৌধুরীর চিঠি, জননীর প্রতি সেলিনা হোসেনের চিঠি, শ্বশুরের প্রতি ফেরদৌসার চিঠি, তৌফিক মাসুদ কর্তৃক স্বপ্নদূতের চিঠি, স্বাধীনতা নিয়ে মোসাদ্দেকের চিঠি, বাঙলা ভাষাকে নিয়ে পলাশ বসুর চিঠি, রিয়াদ অরণ্য কর্তৃক উপস্থাপিত ‘নানাজানের চিঠি’, সাইদুল ইসলাম কর্তৃক শান্তিরক্ষী’র চিঠি, বান্ধবীর প্রতি জান্নাতীর চিঠি, নাসরিন চৌধুরী লিখিত রাজকন্যার চিঠি, বাবার প্রতি দীপ্ত দিপাঞ্জনের চিঠি, অনিন্দিতার প্রতি ‘আমি কালপুরুষের’ চিঠি, অসংজ্ঞায়িত মেহেদীকর্তৃক মা’কে লেখা চিঠি (২য়), শেমভিল হোসেন কর্তৃক ঘরজামাইয়ের চিঠি, নুসরাত জাহান আজমী কর্তৃক পিতা এবং অতীত বিষয়ক চিঠি এবং সব শেষে মৃত স্ত্রীর প্রতি মাটির ময়নার চিঠি।
.
.
ব্লগার মাটির ময়না’র চিঠির স্ন্যাপশট

[ব্লগার মাটির ময়না’র চিঠির স্ন্যাপশট]

 

২) প্রিয়চিঠি নির্বাচন এবং নির্বাচিত হবার ভিত্তিঅনেক দ্বিধাদ্বন্দ্বের মুখোমুখি হয়ে প্রথমে ১৬৫ থেকে ২০, তারপর ৩টি চিঠিতে আমি প্রাথমিকভাবে দৃষ্টি নিবদ্ধ করি। ওপরে উল্লেখিত শেষ ৩টি চিঠিকে আলাদা করে আয়োজকের কাছে প্রেরণ করি। তিনটি চিঠিকে নির্বাচন করলেও আমি অগ্রাধিকার নম্বর উল্লেখ করেছিলাম। অন্যান্য নির্বাচককে সুযোগ দেবার জন্যই ওই ব্যবস্থাটি রেখেছিলাম। অবশেষে মাটিরময়না’র ‘লাল রঙে রাঙাইয়া দিমু তোমার সিঁথি’ শীর্ষক চিঠিটি আমি চূড়ান্ত বলে নির্বাচন করার সুযোগ পাই। অধিকাংশ চিঠিতেই লিখিতভাবে আমার তাৎক্ষণিক মন্তব্য দিয়েছি। তাই শুধু চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত চিঠি সম্পর্কে আলোচনা করছি, এবং উল্লেখিত শর্তাবলীর আলোকে আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন তুলে ধরছি:

স্ত্রীর প্রতি স্বামী চিঠি। এটি স্বাভাবিক কোন প্রেমের চিঠি নয়। মৃত স্ত্রীর কাছে একজন অসহায় নিগৃহীত স্বামীর চিঠি। দেশ সমাজ সংসার এবং শেষে পুত্রের কাছে নিগৃহীত এক পিতার হাহাকার। চিঠিতে ফুটে ওঠেছে আমাদের সূর্যসন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের বর্তমান জীবন চিত্র। চিত্রিত হয়েছে একটি অকৃতজ্ঞ সমাজের ধ্বংসের ছবি। শুধু চিঠি বললে ভুল হবে, অল্প কথায় একটি সমাজচিত্র।

 

 চিঠির পটভূমি
“আমি যখন যুদ্ধ থাইকা আইলাম ফিইরা, তোমারে সিদুর দিতে গেছলাম যখন তুমি তো আমারে সিদুর লাগাইতে দিলা না। দিব্যি দিলা তোমার বইনের ইজ্জত লইয়া যেই রাজাকারের বাইচ্চারা খেলছে তাগো ভগবার বিচার না করা পর্যন্ত তুমি সিদুর দিবা না। রতনের মা, তুমি চাইয়া দেখো চাইরদিকে, দেশের বাতাসে এহন বিচারের গর্জন, তাগো বিচার করতাছে ভগবান। ভগবান কারো মাপ দেই নাই রতনের মা। তুমি আমার লাইগা অপেক্ষা করো রতনের মা, আমি আইতাছি লাল রঙ্গে রাঙ্গায় দিমু আমি তোমার সিথিঁ।”

চিঠিতে বহুমুখী পটভূমি রচনা করা হয়েছে বহুমুখী উদ্দেশ্যে। এখানে আছে মুক্তিযুদ্ধ, সাম্প্রদায়িকভাবে ছোট একটি গোষ্ঠির মুক্তযুদ্ধে অংশগ্রহণের সাক্ষ্য আর আছে সন্তানের কাছে পিতার প্রবঞ্চনার চিরচেনা চিত্র। আমি লক্ষ্য করেছি মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি এবং একজন মুক্তিযোদ্ধার জীবন যুদ্ধের বিষয়টি। যদিও যোদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে রাজনীতি হচ্ছে বিভিন্ন পক্ষে, তবু বিচারের আবশ্যকতা তুলে ধরা হয়েছে চিঠিটিতে।

 

 চিঠির বক্তব্যে সমাজ সংশ্লিষ্টতা
“তুমি শুনলে অনেক খুশি হইবা, তোমার রতন এখন অনেক বড় হইছে। অনেক বড় সাহেবের চাকরী করে সে। মেলা টাকা রোজগার করে। অনেক কথা কইতেও শিখছে আমাগো রতন। আমারে সেদিন কইলো, তার এই ছোড ঘরের মধ্যে আমি থাকলে তার পরিবারের কষ্ট হইয়া যায়। জায়গা নাকি অনেক কম ঘরে। ও, রতনের মা, এতো বড় একটা ঘরের মইধ্যে আমি সারে পাচঁ ফুটের একটা মানুষ কতো আর জায়গা খাই?”

আমাদের সমাজ অনেক এগিয়ে গেছে….প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে…..মাথাপিছু আয় বেড়েছে…..কর্মসংস্থান বেড়েছে। সে সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সমাজের অবক্ষয়। পশ্চিমা ‘এবং প্রতিবেশী প্রাচ্যের’ আগ্রাসনে বেড়েছে সাংস্কৃতিক চরিত্রহীনতা। মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি তো দূরের কথা পিতার স্বীকৃতিই মিলছে না আজ। আমরা হয়তো নিকৃষ্ট দৃষ্টান্তগুলো হয় দেখি না, না হয় মনে রাখি না – অথবা দু’একটা উত্তম দৃষ্টান্ত দেখে আত্মতৃপ্তিতে থাকি। কিন্তু যারা এসব প্রবঞ্চনার শিকার, তাদের কাছে উত্তম বলে পৃথিবীতে কিছু নেই। যেমন নেই, রিক্সাওয়ালা মল্লিক মিয়ার কাছে, যিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে দেশের জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন।

 

 পাঠকের মনে আবেদন সৃষ্টি করার ক্ষমতা
“দুই যুগ হয় আমি তোমার হাতের পায়েস খাইনা। তোমার সেই ঘন্টার পর ঘন্টা সময় দিয়ে পায়েস আর কেউ বানায় না গো । সেই কষ্ট, সেই মায়া, সেই ভালোবাসা আর কোন পায়েসে আমি পাইনা। ভগবানের কাছে মাঝে মাঝে কই তোমারে কি একটা দিনের জন্য ছুটি দেয়া যায়না?…… তোমার চুলে দেয়া সেই বাসনা তেলের বোতলটা এখনো রাইখা দিছি ……আইচ্ছা রতনের মা, ঐ পারে গেলে কি মানুষের চুল পাকে? তোমারও কি চুল্পাইকা গেছে? নাকি এহনো , যেমন আছলা তেমন আছো? ……. আমি সেই আগের মতো জোয়ান নাই গো রতনের মা। তবুও কি পারবা আমারে চিনতে?”

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির ‘অবসেশন’ – বাঙালির অস্তিত্ব। মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে লিখিত চিঠিতে রয়েছে আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র। ফলে চিঠির বিষয় ইতিমধ্যেই পাঠকের মন কেড়েছে। চিঠিতে আবেগ ছিলো কানায় কানায় পূর্ণ, যা প্রথম থেকেই পাঠকের নজর আটকে দেয়। এ আবেগ যথার্থ পরিমিত এবং প্রাসঙ্গিক। চিঠি পড়লে কখনও মনে হবে না এটি ‘সুকুদা’ ছাড়া অন্য কেউ লেখেছে। প্রতিটি অনুচ্ছেদ যেন একেকটি প্লট।

 

৩) মাটির ময়নার চিঠিতে ‘পাখির চোখে দৃষ্ট’ বিষয়গুলো

*বিষয়: মৃত স্ত্রীর কাছে স্বামীর চিঠি
*পটভূমি: মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তি সামাজিক জীবন
*লেখকের ভঙ্গি: স্ত্রীর প্রতি সমাজ, সন্তান ও জীবন নিয়ে অনুযোগ
*মূল বক্তব্য: একজন স্বাধীনকর্মীর পরাধীন জীবনে মৃত্যুর অপেক্ষা আর মৃত স্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের অপেক্ষা।
*ভাষা: চলিত এবং আঞ্চলিক ভাষার ‘আরামদায়ক’ মিশ্রণ
*লেখার আকার: ৬৮২ শব্দ, ৬ অনুচ্ছেদ, ১.৫ পৃষ্ঠা।
*ঘটনা পরিক্রমা: “রতনের মা, তোমারে ছাড়া আমি হাপাই গেছি।আর কতো পথ চলুম একলা একলা?” সঙ্গীহারা ‘সুকুদা’র অনুযোগ দিয়ে শুরু চিঠি শুরু হলেও লেখক দক্ষতার সাথে গেয়ে গেছেন সমাজ পরিবর্তন আর অবক্ষয়ের গান। স্বাধীনতা পরবর্তি পারিবারিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের শিকার হয়েছেন স্বাধীনতা-কর্মী ‘সুকুদা’।

নিজ পুত্রের কাছে প্রবঞ্চনার শিকারও হয়েছেন। প্রিয়তমা স্ত্রীকে ঠিক আগের মতোই দেখতে চান সুকুদা, যেমন দেখেছিলেন ২৬ বছর আগে। সৎভাবে চাকরি করতে না পেরে চাকুরি ছেড়ে দেন। এক ফাঁকে বলে যান, মুক্তিযোদ্ধা মল্লিক মিয়ার কথা, যে এখন রিক্সাওয়ালা। স্বজনহীন সুকুদা এখন মৃত্যুর দিন গুণে সময় অতিক্রম করছেন, যেমন অনেক মুক্তিযোদ্ধা করছেন আমাদের সময়ে।

 

৪) অন্যান্য পাঠকের অভিমত

সম্মানীত সহব্লগার মাটিরময়নার চিঠিটিতে কয়েকজন সহব্লগারের মন্তব্যকে আমি উল্লেখিত শর্তাবলীর সাথে প্রাসঙ্গিক মনে করছি:

রব্বানী চৌধুরী: এ চিঠি যেন সমাজের দর্পন। মন ছুঁয়ে যাওয়া চিঠি। আবেগের ছোঁয়ায় লেখা এ চিঠি খুব ভালো লাগলো।
মেঘনীল: ছুয়ে গেলো। শুরুটা যেমন করলা শেষটা ও দারুন। একটানা পড়ার পড়ে একটা হাহাকারবোধ জন্ম নিলো।
নুসরাত জাহান আজমি: আমাদের সমাজের বেশকটি সমস্যাই তুলে ধরা হয়েছে চিঠিটাতে। গত হওয়া স্ত্রীর কাছে স্বামীর দুই যুগ পর লেখা চিঠিটাতে আবেগ ছিল অনেক বেশি।
ফেরদৌসী বেগম শিল্পী: দুঃখ-কষ্ট, প্রেম-ভালোবাসা আর দেশপ্রেম সব মিলিয়ে বেশ সুন্দর চিঠি লিখেছেন মাটিরময়না ভাই। ভীষণ ভালো লাগলো।
ঘাস ফুল: মৃত স্ত্রীর কাছে লেখা চিঠিটার মধ্যে কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। রতনের মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠেছে বাবা মার প্রতি সন্তানদের অবজ্ঞার কথা, আবার কিছু দুর্নীতির কথা। রতনের বাবা চাকুরি হারায়/সময়ের আগেই অবসর নিতে বাধ্য হয় দুর্নীতিকে মেনে নিতে পারে নাই বলে। মুক্তির জন্য যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করা হল, কিন্তু এখনো কি আমাদের মুক্তি মিলেছে, সেই প্রশ্নটাও ওঠে এসেছে চিঠির মধ্যে। মুক্তিযোদ্ধাদের করুন চিত্রও চিঠিতে ছোট্ট আকারে তুলে ধরেছ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সংখ্যা লঘুদের অংশগ্রহণের ব্যাপারটি ওঠে এসেছে।

 

৫) যা বলা যায় এবং যাদেরকে বলা যায় – তার সবই তাদেরকে বললাম!

প্রিয় চিঠি আয়োজন নিয়ে প্রকাশিত মোট চারটি লেখায় ‘সাহিত্য আয়োজন’ সম্পর্কে আমার অভিমত, অভিজ্ঞতা এবং পরামর্শ নির্দ্বিধায় প্রকাশ করেছি। সহব্লগারদের যেকোন লেখায় যেমন দ্বিধাহীন মতামত দেই, এক্ষেত্রেও আমার স্বভাবের ব্যতিক্রম করি নি। এবার নির্বাচকের ভূমিকায় থেকে নিজের দ্বিধার সাথে একটু বেশিই যুদ্ধ করেছি এবং ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা থেকে ‘আয়োজক-আয়োজিত’ সকলের সম্পর্কেই মন্তব্য করেছি। কেউ পড়েছেন, কেউ আবার মন্তব্য দিয়ে উৎসাহিতও করেছেন। সকলকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা!

 প্রিয় চিঠি: ‘লাল রঙে রাঙাইয়া দিমু তোমার সিঁথি

 

———————————————————-
প্রিয়চিঠি আয়োজন উপলক্ষে পূর্বতন লেখাগুলো:
প্রাক-নির্বাচনী বক্তব্য ১: প্রাপ্তির কথা
প্রাক-নির্বাচনী বক্তব্য ২: নির্বাচক হিসেবে চ্যালেন্জগুলো
প্রাক-নির্বাচনী বক্তব্য ৩: ভবিষ্যৎ আয়োজনের জন্য কিছু পরামর্শ

চিঠিলেখা আয়োজনে প্রাকনির্বাচনী বক্তব্য ৩: সাহিত্য প্রতিযোগিতা আয়োজনের কতগুলো নির্দেশনা

চিঠিলেখা আয়োজনে প্রাকনির্বাচনী বক্তব্য ২: সাহিত্য মূল্যায়নের সমস্যাগুলো

ভবিষ্যত আয়োজনে যা করা যেতে পারে:

আয়োজকদের আন্তরিকতায় কোন কমতি নেই, একথা নিশ্চিতে বলা যায়। কর্তব্যনিষ্ঠারও কমতি দেখি নি। যার যার কর্মজীবনের মধ্যে থেকে এর চেয়ে বেশি আশা করা যায় না। এজন্য প্রথমেই নিঃশর্ত সাধুবাদ জানাই। শুধু প্রসঙ্গ এসেছে বলে কিছু মতামত রেখে যেতে চাই ভবিষ্যতের জন্য। নির্বাচক হিসেবে শত অযোগ্যতা নিয়েও ব্যক্তিগত দায় থেকেই কিছু বলছি। আমার মতে, ব্লগ যেহেতু একটি পাবলিক প্লেইস, সেখানে উপযুক্ত পরিকল্পনা করেই মাঠে নামা উচিত। এখানে নানা মুণির নানা মত – অথচ সকল মুণিকেই একই ছাতার নিচে রাখা চাই। অন্তত একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। এজন্য চাই যথেষ্ট পরিকল্পনা, হোমওয়ার্ক ও দূরদর্শিতা। খুঁটিনাটি বিষয়গুলো প্রথম পোস্টেই জানিয়ে দিলে ভবিষ্যতে আরও ভালো প্রতিযোগিতার আয়োজন হতে পারে প্রথম আলো ব্লগে। প্রথম বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশ হবার পূর্বে কমপক্ষে ১০টি পর্যায় অতিক্রম করা উচিত। লেখা মূল্যায়নের সহজ কিছু নির্দেশক বা পরিমাপক পূর্বেই প্রকাশ করলে সকল শ্রেণীর লেখকদের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি হবে। তাছাড়া, সঞ্চালক বা ব্লগ কর্তৃপক্ষকে উপযুক্তভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে – এর বিকল্প নেই।

.

1111

[বিস্তারিত নিম্নে উল্লেখ করা হয়েছে]

সাহিত্য প্রতিযোগিতা যে কোন জনসংশ্লিষ্ট কোন আয়োজনের জন্য একটি চেকলিস্ট থাকলে একদৃষ্টে বুঝা যায় কী করা হলো, আর কী করা হলো না। ‘Forming-Storming-Performing’ নীতির আলোকে তৈরিকৃত নিম্নের চেকলিস্টটি কোন চূড়ান্ত বিধি নয় – এ নিয়ে আলোচনা হতে পারে, যোগবিয়োগও হতে পারে। তবু তালিকাটি একটি ভালো আয়োজনের জন্য চিন্তার খোরাক যোগাতে পারে:

• প্রস্তুতি/আহ্বায়ক কমিটি গঠন
• লেখার বিষয় নির্ধারণ
• লেখার মাধ্যম নির্ধারণ
• প্রকাশনার মাধ্যম নির্ধারণ
• কর্তৃপক্ষ/সঞ্চালক প্যানেলের সাথে আলোচনা
• নির্বাচক কমিটি গঠনের বিজ্ঞপ্তি
• নির্বাচক কমিটি গঠন
• লেখক/অংশগ্রহণকারীদের জন্য সমতল পরিবেশ নিশ্চিতকরণ
• লেখা মূল্যায়নের নির্দেশক নির্ধারণ
• স্বীকৃতি/সম্মাননা প্রদানের মাধ্যম নির্ধারণ
• অংশগ্রহণের বিজ্ঞপ্তি
• লেখা সংগ্রহ ও মূল্যায়ন
• বিশেষ অতিথি ও বিশেষ স্থান
• যথাসময়ে ফলাফল বা স্বীকৃতি প্রদানের অনুষ্ঠান

কিছু বর্ণনা দেবার চেষ্টা করলাম:

I. প্রস্তুতি/আহ্বায়ক কমিটি গঠন: একটি প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা যেতে পারে যারা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে ১ থেকে ৫ পর্যন্ত কাজগুলোর দেখাশুনা করবেন।

II. লেখার বিষয় নির্ধারণ: ‘কী বিষয়ে লেখতে হবে’ সেটা নির্ধারণ করতে হবে – স্মৃতিচারণ, স্বদেশ, মুক্তিযুদ্ধ, বর্ষাকাল ইত্যাদি যা-হোক আগে সুস্পষ্ট করতে হবে।

III. লেখার মাধ্যম নির্ধারণ: কবিতা, প্রবন্ধ, ছোটগল্প, ছড়া নাকি স্মৃতিকথা? ফরম্যাট ঠিক করা থাকলে সকল প্রতিযোগী একই মনোভাব নিয়ে অগ্রসর হবেন।

IV. প্রকাশনার মাধ্যম নির্ধারণ: জমাকৃত লেখাগুলো কীভাবে প্রকাশ পাবে- পিডিএফ নাকি ছাপানো, ছাপানো হলে কী সাইজের ইত্যাদি। এখানে প্রকাশক বা সম্পাদকের তথ্য দেওয়া থাকলে আরও ভালো।

V. সঞ্চালক প্যানেলের সাথে আলোচনা: সঞ্চালক বা ব্লগ কর্তৃপক্ষের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করে তাদের সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিযোগিতাটি ব্লগ কর্তৃপক্ষের নীতিমালার সাথে মানানসই কিনা তাও দেখতে হবে।

VI. নির্বাচক কমিটি গঠনের বিজ্ঞপ্তি: নির্বাচক কমিটিতে যারা আসবেন তারা কিসের ভিত্তিতে নির্বাচিত হচ্ছেন সেটা আগেই প্রচার করা উচিত। যেমন, সময় বা লেখার সংখ্যার বিচারে তাদের জৈষ্ঠ্যতা, পাঠকের/সহব্লগারদের গ্রহণযোগ্যতা, পাঠকের মন্তব্যের ভিত্তিতে জৈষ্ঠ্যতা, লেখার মানের ভিত্তিতেও হতে পারে। এসব বিষয়গুলো পূর্বেই ব্লগে প্রকাশ করলে প্রতিযোগিতার বিষয়ে গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।

VII. নির্বাচক কমিটি গঠন: বিভিন্ন পর্যায়ের ব্লগার এবং সঞ্চালক কমিটির সদস্যদের সমন্বয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচক কমিটি গঠন করে ঘোষণা দিতে হবে। সাক্ষাতে সভা করা অসম্ভব হলে, গ্রুপচ্যাটিং ইত্যাদি করে ভারচুয়াল সভা করা যেতে পারে।

VIII. লেখক/অংশগ্রহণকারীদের জন্য সমতল পরিবেশ নিশ্চিতকরণ: উপরোক্ত শর্তগুলো অতিক্রম করলে স্বাভাবিকভাবেই সকলের অংশগ্রহণের সমান সুযোগ সৃষ্টি হবে। প্রেরণা পাবেন সকল পথের সকল মনের ব্লগারগণ।

IX. লেখা মূল্যায়নের নির্দেশক নির্ধারণ: প্রচলিত নির্দেশকগুলো হতে পারে এরকম – ক) ভাষা (শুদ্ধ বানান, সাধু ও চলিত ভাষার অবিমিশ্রিত ব্যবহার), খ) লেখার বিষয় (লেখাটি কি সময়ের প্রতিনিধিত্ব করছে, নাকি ইতিহাসের সাক্ষী হচ্ছে নাকি বিনোদন দিচ্ছে ইত্যাদি), গ) লেখার আকৃতি (কত শব্দের, কত পৃষ্ঠার, কোন্ কী বোর্ড ইত্যাদি), ঘ) কী কী বিষয়ে লেখা যাবে না, তাও উল্লেখ করে দেওয়া যায়।

X. স্বীকৃতি/সম্মানতা প্রদানের মাধ্যম নির্ধারণ: শ্রেষ্ঠ যদি সত্যিই শ্রেষ্ঠ হয়, তবে তাকে স্বীকৃতি দিতে কোন বাধা থাকে না। স্বীকৃতি যদি সঠিক ভিত্তির ওপরে স্থাপিত হয়, তবে কী দিয়ে তা প্রদান করা হলো, সেটি খুব বিবেচ্য নয়। তবে যা-ই হোক, সেটা ঘোষণা থাকা ভালো। শুধু একটি সনদপত্র/ক্রেস্ট দিয়েও স্বীকৃতি হতে পারে। হতে পারে একটি সুন্দর বই।

XI. অংশগ্রহণের বিজ্ঞপ্তি: উপরোক্ত ১০টি পর্যায় অতিক্রম করার পর নির্দ্বিধায় বিজ্ঞপ্তি প্রদান করা যায়। বিজ্ঞপ্তি যত দীর্ঘই হোক সেটা সংশ্লিষ্টরা অবশ্যই পড়বেন। তাই লেখার দৈর্ঘ নিয়ে চিন্তিত না হয়ে পরিপূর্ণতার দিকে খেয়াল দিতে হবে।

XII. লেখা সংগ্রহ ও মূল্যায়ন: প্রথমত অংশগ্রহণকারী সকল প্রতিযোগীর নাম ও লেখা তালিকাভূক্ত করতে হবে। কেউ যেন বাদ না পড়েন! অযোগ্যতা থাকলে তা আলাদা মন্তব্যে উল্লেখ করা যায়, কিন্তু তালিকায় নাম অবশ্যই থাকা চাই। পূর্বঘোষিত মাপকাঠি/শর্তাবলীর আলোকে প্রতিটি লেখাকে মূল্যায়ন করে, ‘ডিমিনিশিং’ পদ্ধতিতে তালিকা ছোট (শর্টলিস্টিং) করে আনা যায়। তাতে সকলেই সুবিচার পাবেন।

XIII. বিশেষ অতিথি ও বিশেষ স্থান: সম্মাননা বা স্বীকৃতি প্রদানের জন্য একটি অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রতিযোগিতার সফল সমাপ্তি ঘটাতে হবে। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিশেষ অতিথি নির্বাচন করে তার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ স্থান হলেও পূর্ব থেকেই সেটি নিশ্চিত করে রাখতে হবে। সম্মাননা অনুষ্ঠানের জন্য একটি আলাদা পোস্ট দেওয়া উত্তম। তবে খসড়া পরিকল্পনাটি প্রথম পোস্টেই প্রকাশ করা যায়।

XIV. যথাসময়ে ফলাফল বা স্বীকৃতি প্রদানের অনুষ্ঠান: এমনভাবে স্থান ও তারিখ নির্ধারণ করতে হবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া যার কোন পরিবর্তন হবে না। যথাসময়ে এবং যথাস্থানে অনুষ্ঠান শুরু করতে হবে। ৬টার অনুষ্ঠান ৯টায় হলে, অনুষ্ঠানের মান এবং সম্মান দু’টোই কমে যায়।

শেষ কথা হলো, সকলকে ধন্যবাদ এবং শুভেচ্ছা!

কিছু সমস্যার কথা যোগ না করলে যেমন ‘প্রাপ্তির কথা’ বিশ্বাসযোগ্য হয় না, তেমনি কিছু পরামর্শ বা সুপারিশ না দিয়ে শুধু ‘সমস্যার কথা’ বলাও দায়িত্বহীনতা। এক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষায় কতটুকু সফল হলাম, পাঠক বলতে পারবেন। আমি বিশ্বাস করি, ব্লগারের পরিচয় হলো তার লেখায়। কিন্তু সকলেই তো রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত-রৌদ্র নন যে, নিজের প্রেরণায় লেখে যাবেন একটির পর একটি মাস্টারপিস। অধিকাংশ ব্লগারের প্রয়োজন পর্যাপ্ত প্রণোদনা বা প্রেষণা। লেখালেখিতে ব্লগারদেরকে তৎপর রাখার জন্য কতৃপক্ষকেই উদ্যোগ নিতে হয়। তা না হলে দলাদলি, ফেইকনিক, মেরুকরণ, ব্যানকরণ, ব্লককরণ ইত্যাদি নেতিবাচক উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করলে, অঙ্গুলি চলে যায় সঞ্চালকের দিকে। মাঝখানে পরে শান্তিপ্রিয় ব্লগাররা ভুল বুঝাবুঝির শিকার হন। ব্লগে ব্লগারদের কর্মচঞ্চলতা বাড়াতে বিভিন্ন আয়োজন নিয়মিত এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকুক, এই কামনা করছি। প্রিয়চিঠি আয়োজনে সংশ্লিষ্ট সকলকে শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

*প্রথম ছবি আলো ব্লগ থেকে নেওয়া, গ্রাফ-ছবিটি পোস্টদাতার তৈরি।

[ প্রথম আলো ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া ]

.

প্রথম আলো ব্লগে চিঠি লেখা আয়োজনের নির্বাচক হবার অভিজ্ঞতা

.

এবিষয়ে পূর্বের পর্ব: 

চিঠিলেখা আয়োজনে প্রাকনির্বাচনী বক্তব্য ২: সাহিত্য মূল্যায়নের সমস্যাগুলো

প্রাকনির্বাচনী বক্তব্য ১: ‘চিপায় পড়িয়ে যাহা হয়’

চিঠিলেখা আয়োজনে প্রাকনির্বাচনী বক্তব্য ১: চিপায় পড়িয়ে যাহা হয়!

d3683c5f8da

১) চিপায় পড়িলে যাহা হয়: কিঞ্চিৎ গৌড়চন্দ্রিকা

কথায় আছে, কাহাকেও যদি একটু চিপায় ফেলিতে চাও, তবে তাহাকে নিকাহ করাইয়া দাও অথবা নির্বাচনে খাড়া করাইয়া দাও। আমার মনে হয়, সবকিছুরই আপডেট রহিয়াছে, বিবর্তন রহিয়াছে। অতএব এখন বলা উচিত, কাহাকেও চুপানি খাওয়াইতে চাইলে, বিচারক বানাইয়া দাও। চিঠিলেখা আয়োজনে বিচারক কমিটির অন্য সকলেই অভিজ্ঞ বিজ্ঞজন – একমাত্র আমিই হাতুড়ে লেখক! কী যাতনায় দিনাতিপাত করিতেছি, না পারি কহিতে – না পারি সহিতে। কারণ, ব্লগে লেখালেখি’র কর্মসূচি বৃদ্ধি করিবার নিমিত্তে আয়োজক মহাশয়কে তাগিদ দিতাম। এ্রইবার তাহার বিশেষ কর্মব্যস্ততার মধ্যে ইহা শুরু করাতে খুশিই হইয়াছিলাম। কিন্তু খুশি বিনাস করিলো নির্বাচক হবার প্রস্তাবে। তথাপি অন্য সকল ব্লগীয় প্রস্তাবের মতো নিরাপত্তিতে মানিয়া নিলাম। এখন আমার সামনে যোগ্যতম পত্রলিখকবৃন্দ আর পিছনে আয়োজকবৃন্দ। মধ্যিখানে আমি! যাহা হোক, আমি বর্তমানে কেমন শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় আছি তাহার বর্ণনা দিব পরবর্তি পোস্টে। এইবার বলি প্রাপ্তির কথা।

.

২) যাহা আমি শিখিলাম:

ছেলেবেলায় পাঠ্যপুস্তকে অনেক চিঠিই পড়িয়াছি। সঙ্গত কারণেই পিতার কাছে টাকা চাহিয়া পুত্রের চিঠিখানি বিশেষ খেয়াল আছে। লেখাপড়া মনযোগ বৃদ্ধি করতঃ ভালো ফলাফলের প্রেরণা দিয়া ছোটভাই/বোনের কাছে পত্র লিখ। তখন নিজেরই পড়াশুনার ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা! তথাপি তাহা খেয়াল আছে কিন্তু গুরুত্ব দিই নাই। চিঠির মর্যাদা তখন এতটা উপলব্ধি করি নাই, এইবার যাহা করিলাম। চিঠিলেখা আয়োজনে সম্পৃক্ত থাকিয়া বিরল অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হইলাম; বিচিত্র রকমের লেখার সাথে পরিচিত হইলাম আর জানিলাম চিঠি কাহাকে বলে, কত প্রকার এবং তাহা কী কী। বৈচিত্রময় চিঠির সমারোহে পড়িয়া চিঠি সম্পর্কে সকল পূর্ব ধারণার সংস্কার হইয়া গেলো। একজন প্রিয় সহব্লগার শুধু রিহার্সাল পর্ব দিয়াই চিঠিলেখা আয়োজনকে অনেক সার্থক করিয়া দিয়েছেন। ভিতরে ‘দ্রব্য’ থাকিলে যাহা হয়! তাহার চিঠিগুলোতে বাংলার সমাজ ও পারিবারিক জীবনের সুখ ও বিষাদের যে চিত্র ফুটিয়া ওঠিয়াছে তাহাতে অনেকের মতো আমিও মুগ্ধ।

.

৩) যাহা আমাকে বিমুগ্ধ করিয়াছে:

কবি কবিতা লেখিবেন, গল্পকার লেখিবেন গল্প – কিন্তু চিঠির বেলায় ব্যতিক্রম। সকলেই চিঠি লেখিতে পারেন। চিঠিতে কবিতার মতোই মনের গভীর অভিব্যক্তি প্রকাশ পাইতে পারে। তাই, চিঠি পড়ে সহব্লগারদের মনের গতিপথ সম্পর্কে কিছুটা জানিবার সুযোগ পাইলাম। কাহারো প্রেমিক-প্রেমিকার খবরও পাইয়া গেলাম এই যাত্রায়! একটি বিষয় আমাকে খুবই অনুপ্রাণিত করিয়াছে, তাহা হইলো: অধিকাংশ চিঠিই শুধু প্রেমের জন্য নহে, যদিও চিঠি স্বভাবগতভাবে প্রেমের কথাই কহে। সহব্লগাররা যে শুধুই প্রেম নামক একমুখি আবেগে ব্যপ্ত নহে, ইহা একটি জাতীয় সুখবর বলা যাইতে পারে। ‘জাতীয় সুখবর’ এইজন্যেই বলিলাম, কারণ স্বদেশকে নিয়া, মুক্তিযুদ্ধকে নিয়া, ভাষা আন্দোলনকে নিয়া, বাঙলাকে নিয়া, বিডিআর বিদ্রোহ, হরতাল, সাভার ট্রাজিডি নিয়ে বেশ কিছু চমৎকার চিঠি পড়িবার সৌভাগ্য আমার হইয়াছে। ইহাতে সহব্লগারদের স্বদেশ প্রেমের এক প্রেরণাদায়ক প্রমাণ পাইলাম। আরও ভালো লাগিয়াছে পিতা-মাতার প্রতি ভালোবাসা এবং তাহাদের প্রতি সহ-ব্লগারদের অনুভূতির প্রকাশ দেখিয়া। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চিঠি লিখা হইয়াছে পিতা-মাতার প্রতি। পিতারূপে শ্বশুরকে লক্ষ্য করিয়াও চিঠি লিখা হইয়াছে। তাহারা যে আমাদের জীবনে কতটুকু প্রভাব বিস্তার করিয়া আছেন, তাহা পরিমাপ করা না গেলেও অনুভব করিবার সুযোগ পাইলাম।

ইহাছাড়া প্রিয় প্রথম আলো ব্লগকে নিয়াও পত্র লিখিয়াছে আমাদের ক’জন সহব্লগার, যাদের অধিকাংশই প্রবাসী। প্রবাসীরাই কি তবে ব্লগকে বেশি প্রেম করেন? এই প্রশ্ন নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা চলিতে পারে। তবে আমি পূর্বাহ্নেই প্রবাসীদের পক্ষ নিয়া রাখিলাম! পক্ষপাতিত্ব না করিলে বিচারক হওয়া যায় না।

.

৪) চিঠিলেখা আয়োজনে ব্লগের কাটতি বাড়িয়াছে:

প্রথম আয়োজনে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম না। বিভিন্ন আলোচনায় ভাবিয়াছিলাম তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে চিঠিলেখার আর কী প্রয়োজন থাকিতে পারে। গণমানুষের সাহিত্য হিসাবে চিঠির যে আলাদা একটি গুরুত্ব রহিয়াছে, তাহা প্রায় ভুলিতেই বসিয়াছিলাম। উপরন্তু এই আয়োজনে অনেক ভালো কিছু লেখকের সন্ধান পেলাম, যাহারা ব্লগে নিয়মিত আসেন না, কেবলই চিঠিলেখা উপলক্ষে আসিয়াছেন। অথবা, আসলেও শুধু পড়িতেন আর মাঝে মাঝে মন্তব্য করিতেন, কিন্তু নিজেরা তেমনভাবে লিখিতেন না। যাহারা নিয়মিত লিখেন, তারাও ভিন্ন কিছু লেখার প্রয়াস পাইলেন এই উপলক্ষে। ব্লগার, পাঠক, অতিথির যাতায়াত বাড়িয়াছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এইসবই চিঠিলেখা আয়োজনের কারণে হইয়াছে। দীর্ঘদিনের বিরতির পর চিঠিলেখা আয়োজনের বদৌলতে আলো ব্লগে আঘাত, মানে হিটও বাড়িয়াছে এই দিনগুলোতে। একটি পাবলিক ব্লগে এই অর্জন অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক। আশা করছি আলোব্লগের কর্তারা এই কর্মচঞ্চলতাকে একটি স্থায়ি রূপ দিবার চেষ্টা করিবেন।

.

৫) চিঠি নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বক্তব্য: সকল চিঠির উপস্থাপনা শেষ হইলে, পরের পোস্টে বিস্তারিত জানাইবার চেষ্টা করিব।

[প্রথম আলো ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া]

** প্রথম আলো ব্লগে চিঠি লেখা আয়োজনের নির্বাচক হবার অভিজ্ঞতা