Tagged: খ্যাতির বিড়ম্বনা

যেসব কারণে সেলিব্রেটিদেরকে হিংসা করতে ইচ্ছে হয় না

file (3)-crop

খ্যাতিমানদের জীবন নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই।  তারা কীভাবে তাদের প্রাত্যাহিক জীবনকে উপভোগ করছে, এসব নিয়ে নানা জল্পনাকল্পনা থাকে মানুষের মনে।  সামান্য অনুসন্ধান করে উচ্ছ্বসিত হবো নাকি হতাশ হবো সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না।  গসিপ বা ট্যাবলয়েড পত্রিকাগুলো কেন এত উল্টাসিধা সংবাদ ছাপে, এর কিছু কারণ খুঁজে পেয়েছি।  বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনে সামান্য দৃষ্টিপাত করে যা জেনেছি, তাতে তাদের প্রতি অনুকম্পা জাগে।

এঁরা কীভাবে বেঁচে আছেন, এটি একটি বিস্ময়ের বিষয় বটে। এদের না আছে বন্ধু, না আছে আত্মীয়। একটি পর্যায়ে নিজ পরিবারও হাতছাড়া! না আছে স্বাধীন চলাফেরা করার পথ, না আছে মৌলিক চাহিদা পূরণের সুযোগ। দায় বেশি আয় কম! আয় আছে তো দশগুণ দায়ও আছে। আছে আয়কর-ওয়ালা; আর আছে দাতাসংস্থার মিষ্ট চাপ। এঁরা না কইতে পারেন, না সইতে পারেন অবস্থা। একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরলাম। দৃষ্টান্তে বেশি গেলাম না, পাছে লেখা বড় হয়ে যায়!

খ্যাতিমান মানুষদের সামাজিক দায় বেশি। গায়ক, নায়ক, আঁকিয়ে, নাচিয়ে যে-ই হোক না কেন, বিখ্যাতদের সামাজিক দায়িত্ব বেড়ে যায় অনেক গুণে। তারা পান থেকে চুন কষলেই পত্রিকার শিরোনাম, সঙ্গে আসে মানুষের বদনাম। দু’দিনেই বিখ্যাত হয়ে যান কুখ্যাত। বউয়ের গায়ে হাত পড়লে পৃথিবীতে কোন স্বামী নেই, তার মাথা ঠাণ্ডা থাকবে। স্ত্রীকে অত্যুক্ত করতে দেখে যেকোন স্বামী অভিভাবকত্ব প্রমাণ করার জন্য হলেও ন্যূনতম প্রতিক্রিয়া দেখাবে। দেশের একজন খ্যাতিমান ক্রিড়াবিদ তার স্ত্রীর সম্মান রক্ষায় একটু চেষ্টা করায় গণমাধ্যমে তোলপাড় লেগে গেলো। শেষ পর্যন্ত বহিষ্কার! সামাজিক মাধ্যমে তাকে তুলোধুনা করা হলো। খ্যাতিমান মানুষদের ভালো থাকার দায়ও বেশি।

 

খ্যাতিমান মানুষদের ভুল করার সুযোগ সীমিত। কারণ মানুষ তাদেরকে দেবতা জ্ঞান করে। তারা রিক্সাওয়ারার খারাপ ব্যবহারে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেন না। তারা তরকারি ওয়ালার সাথে তর্কাতর্কিতে জড়িয়ে পড়তে পারেন না, টাকা যত বেশিই দাবি করুক।

খ্যাতিমান মানুষদের চুপ থাকার দায় বেশি। সব কথা, সব শব্দ তারা ব্যবহার করতে পারেন না – ট্যাগ লেগে যাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে! পরের দিনের সফর বাতিল! অন্যেরা যে কথা অহরহ বলে বেড়াচ্ছে, সেলিব্রেটিরা সেটি বললেন, তো মরলেন। খ্যাতিমান, আপনি কোন মডেলের সাথে প্রেমে জড়ালেন। সঙ্গে কিলকিল করবে টিকটিকির দল (প্রেস)। আপনার জান কয়লা বানিয়ে ফেলবে প্রশ্নের পর প্রশ্ন দিয়ে। বললেন, “ওটা আমার ব্যক্তিগত বিষয়।” উত্তরে তারা বলবে, সেলিব্রেটিদের সমস্ত তথ্য জনগণের সম্পদ। এবার আপানি যাবেন কই? ওই সাম্বাদিককে মারপিট করবেন? এটা আমপাবলিকের কাজ, আপনার নয়। যদি করেই ফেলেন, তবে নিশ্চিত থাকুন, দেশের গণমাধ্যম আপনাকে আত্মহত্যার পর্যায়ে নিয়ে যাবে। খ্যাতিমান মানুষদের সহনশীলতার দায়ও বেশি।

খ্যাতিমান মানুষদের চলার জায়গা সীমিত। তারা সব জায়গায় সব বাহনে চলতে পারেন না। তাতে তাদের সামাজিক স্ট্যাটাসে যা-ই হোক, নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। নিরাপত্তা কর্মীরা এসে সোজা পাজকোলা করে বাড়িতে পৌঁছে দেবে। সঙ্গে একটি বকাও দেবে, “আপনার মতো সম্মানী ব্যক্তি এভাবে চলাফেরা করছেন, আমাদেরকে আগে জানাবেন না?” খ্যাতিমান মানুষদের জনসমক্ষে থাকার সুযোগ সীমিত। খ্যাতিমান মানুষদের সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রটুকুও ছোট। বাথরুম থেকে বেডরুম পর্যন্ত সীমিত – অবশ্য যদি গোপনীয় সিসি ক্যামেরা না থাকে।

খ্যাতিমান মানুষদের মৌলিক চাহিদা পূরণের স্বাধীনতা কম। শুধু মৌলিক চাহিদা কেন, কোন চাহিদাই এরা নিজ চেষ্টায় পূরণ করতে পারবেন না। সেলুন থেকে শুরু করে হাসপাতাল পর্যন্ত কোত্থাও তাদের চলাফেরা করার সুযোগ নেই। বিখ্যাত হয়ে কর্মহীন হয়েছেন? তো গেছেন! এর চেয়ে ‘সুইসাইড খাইয়া হালান’! হরিণের নিজের মাংসই তার পয়লা শত্রু। আপনার খ্যাতি তখন আপনার বিপক্ষে কাজ করবে। শুধুমাত্র কৌতুকাভিনেতা হিসেবে পরিচিতির কারণে চাকরি হারাতে হয়েছে একজন পরিচিত খ্যাতিমানের। আর কোত্থাও তার কাজ জুটলো না। খ্যাতিমানদের গরিব হতে নেই, কেউ ভাত দেবে না – সুযোগ পেলে আপনাকে নিয়ে একটা সেলফি তুলতে পারে। ভুলেও টাকা বা কাজ অফার করবে না, পাছে আপনি অপমানিত হন!
এতসব দায়দায়িত্বের পরও মানুষের ইচ্ছে জাগে খ্যাতিমান হবার। হুমায়ূন আজাদের একটি প্রবচন অনেকটা এরকম: মানুষ যখন বিখ্যাত হতে চায়, তখন শুধুই চায় অন্যেরা তাকে দেখুক। কিন্তু কিছুদিন পরই সে কালোচশমা লাগিয়ে ঘুরে, যেন কেউ তাকে দেখতে না পায়। সেলিব্রেটি হওয়া অনেকটা দিল্লিকা লাড্ডুর মতো। না হলে আফসুস, হবার পরও আফসুসের অন্ত নেই।

তবে খ্যাতিমান মানুষদের মহৎ কাজ করার সুযোগ বেশি। তারা চাইলেই কয়েকশ’ লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে পারেন নিমিষে। একটি ফোনকলে গ্রামের ভাঙ্গাসেতুটি মুহূর্তে মেরামত সম্পন্ন! নিজের খরচ ছাড়াই প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গকে একটি জনমুখী কাজে সংযুক্ত করতে পারেন। খ্যাতিমান মানুষদের অন্যকে সহায়তা করার সুযোগ বেশি।

 

অর্জিত খ্যাতি আর আরোপিত খ্যাতি বলে দু’টি বিষয় আছে। যারা নিজেদের শ্রম ও মেধা দিয়ে খ্যাতি অর্জন করেন, তারা উপরোক্ত দায়সকল পূরণ করতে মজাই পান। কিন্তু খ্যাতি যাদের ওপর ইচ্ছা-অনিচ্ছায় এসে পড়েছে, তারা এর মূল্য বুঝতে পারেন না। তারা হঠাৎ সৌভাগ্য বা লটারির মতো খ্যাতিকে পেয়ে শুধু ‘পাবার বিষয়গুলোতে’ মনযোগ দেন। তারা ‘সামাজিক দায়ের’ মতো ব্যাপারগুলো বুঝতে পারেন না। কিন্তু বিখ্যাত হবার পর নেবার চেয়ে দেবার দায় বেশি, যদিও অনেকেই উল্টোটা করেন। উল্টোদিকে গেলেই পত্রিকার শিরোনাম – বিখ্যাত থেকে কুখ্যাত। তবে যারা খ্যাতির দায় পূরণ করতে পারেন, তারা অবশেষে সত্যিকারভাবে দেবতায় পরিণত হন। মৃত্যু তাদের বিদায় ঘটাতে পারে না। তারা অমর। (২৫ডিসে২০১৪)
.
.

.
—————————————–—————————————–
ফিচার ফটো: ফটো সার্চ ডট কম।