Tagged: কৃষক ও শহুরে চাকুরে

কৃষক ও শহুরে চাকুরেদের প্রবন্ধ

Image

একটি ছোট্ট গল্প বলি, যেটাকে দৃষ্টান্তও বলা যায়। আমার এক বন্ধু এ গল্পটি বলে আমাকে অনেকদিন চন্দ্রাহত করে রেখেছিল। তার মতে, আমাদের দেশের কৃষকরা অধিকাংশই চরম বোকা, বলা যায় বোকার হদ্দ। তারা আয়ব্যয়ের হিসাব জানেন না। সারা বছর মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ৫০ হাজার টাকা একসাথে পেলে তারা খুশিতে আটকানা।

অথচ বীজ সার মুজুরি যন্ত্রপাতি কীটনাশক ইত্যাদি বাবদ বিভিন্ন কিস্তিতে হয়তো ৫০ হাজার টাকা বা তারও অধিক খরচ হয়ে গেছে। সেটা তারা কখনও যোগ করে দেখেন না। ফসল বিক্রিতে মাত্র ৫০ হাজার টাকা পেয়েই তারা আবার স্বপ্নের বীজ বুনতে শুরু করেন আগামি বছরের জন্য। এভাবেই চলছে তাদের জমি ও ফসলকে নিয়ে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জীবনচক্র। এথেকে ওঠে আসার কোন তাগিদ তাদের নেই, বরং একে তারা উপভোগ করছে। এটি পুরোটাই যেন আত্মিক বিষয় – কোন আর্থিক বিষয় এখানে নেই, নেই কোন লাভ-লোকসানের হিসাব। কী লাভ হলো মাঝখানে এই গাধার খাটুনি খেটে? আমার বন্ধুর এই প্রশ্নে আমি যোগ দেই, কী লাভ হলো?

এবিষয়টি নিয়ে এভাবে কখনও ভাবি নি, তাই মহাচিন্তিত আমি এবং উত্তেজিতও। হঠাৎ একদিন ‘আইনস্টাইনের হাতের আপেলের’ মতো আমি চমকে ওঠলাম। তাই তো! আমরা যারা শিক্ষিত জনতার কাতারে পড়ি, আমরাও তো একই রকম জীবনচক্রে আবদ্ধ হয়ে আছি। মাসে একগোছা পাঁচ’শ আর একহাজার টাকার নোট পেয়ে ভুলে যাই মাবাবা আত্মীয়স্বজন প্রতিবেশী আর বন্ধুর কথা। ভুলে যাই পুকুর নদী মাঠঘাট আর জোৎস্নারাতের কথা। যেখান থেকে বেড়ে ওঠেছি বড় হয়েছি বৃদ্ধি পেয়েছি দেহে মনে আর আত্মায় – সেই গ্রামের কথা ভুলে যাই। ভুলে যাই বাড়িভাড়া গাড়িভাড়া গ্যাস বিদ্যুৎ পানি বিল আর দারোয়ানের বেতন বাবদ কত টাকা খরচ করেছিলাম। মাস শেষ হবার ঠিক এক সপ্তাহ পূর্বেই ওই একগোছা নোট শেষ হয়ে যায়। অগ্রীম বেতনে চালাই বাকি এক সপ্তাহ। তবু মনে মনে খুশি এজন্যে যে, আমি শহরে আছি।
অবচেতনে অতিক্রম করে চলেছি পিতামাতা থেকে পাওয়া উত্তরাধীকারের জীবনটি। মাড়িয়ে চলেছি টিএস ইলিয়টের এই আধুনিক ওয়েস্ট ল্যান্ড, কিন্তু কিশোরকুমারে গানের মতো ‘চিতাতেই সব শেষ’।
হুমায়ুন আজাদের দর্শনমতো ‘সবকিছু নষ্ট’ হয়ে যাবে। কিং সলোমনের জীবনাভিজ্ঞতার মতো ‘সবকিছুই অসার’ আর ‘বাতাসের পেছনে দৌড়ানো’ – তবু দৌড়ে চলেছি। উদাসীন পথিকের মতো। অবশেষে মৃত্যু এসে সকলকে একাকার করে দিয়ে যায়।

চল্লিশ বা পঞ্চাশ অতিক্রম হবার পর অথবা বয়স যখন ষাট পেরিয়ে যায়, তখন দেখি শহরের মানুষ আর গ্রামের মানুষ সকলেই এক। পোশাকের ব্যতিক্রম আর ঘরের আসবাবপত্রের বৈচিত্র ছাড়া আর কোন উত্তম বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায় না শহুরে মানুষগুলোর জীবনে। তখন মনে পড়ে যায় সকল অপচয় আর নষ্ট জীবনের কথা। তখন যদি ‘কন্ট্রোল জেড’ দিয়ে তখন যদি আনডু করা যেতো! ভাল কাজ করার যখন কোন সামর্থ্য আর অবশিষ্ট থাকে না, তখন প্রচণ্ড ইচ্ছা জাগে স্বজাতির জন্য কিছু করার। তখন মাথা ঠুকে ঠুকে কপালে তিলক পরে গেলেও হতাশা রেখা মুছে যায় না।

এযাবত আমাদের দেশে ম্যাগসেসে এওয়ার্ড পেয়েছেন মোট ১১জন। তাদের প্রায় সকলেই বেসরকারি বা ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সামাজিক উন্নয়নে অবদান রেখেছেন। যেমন: স্যার ফজলে হাসান আবেদ (১৯৮০), ড. মুহাম্মদ ইউনূস (১৯৮৪), জাফরুল্লাহ চৌধুরী (১৯৮৫), এঞ্জেলা গোমেজ (১৯৮৭), অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ (২০০৪), মতিউর রহমান (২০০৫), এএইচএম নোমান খান (২০১০) প্রমূখ। তারা সকলেই স্ব স্ব কর্ম দিয়ে আমাদের সমাজকে একটি উন্নততর অবস্থানে নিয়ে যেতে চেয়েছেন। ব্যক্তিগত সামর্থ্য ও কর্মদক্ষতাকে তারা সমাজের উন্নয়নে ব্যবহার করেছেন। পুরস্কার হলো তাদের এ কৃতীত্বের স্বীকৃতি।

অতি সম্প্রতি (২০১২) ম্যাগসেসে এওয়ার্ড পেয়েছেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, পরিবেশ সুরক্ষায় তার নিরলস কর্মকাণ্ডের জন্য। জাহাজভাঙ্গা শিল্পের বিস্তৃতির ফলে পরিবেশের ভয়ানক দূষণ রোধে রিজওয়ানা তার পরিচালিত ‘বাংলাদেশ পরিবেশবাদী আইনজীবী সংগঠন’ বেলা’র মাধ্যমে কাজ করেছেন। বিভিন্ন শিল্প কারখানায় শিশুশ্রম প্রতিরোধেও তিনি জোড়ালো ভূমিকা পালন করেছেন।

আমরা সকলেই কাজ করছি এবং করি। কাজ করেই আমাদের জীবনের সার্থকতা বিচার করি। কারও কাজের প্রকৃতিই এরকম যে, তা সমাজের উন্নয়নের জন্য নিবেদিত; আবার কারও কাজ হয়ত সরাসরি সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখে না। এ উভয় ধরণের পেশাজীবী নিয়েই আমাদের সমাজ। মনে অনেক প্রশ্ন জাগে – শুধুই বিদ্ধ হই ভেতরে। শুধুই কি জমাখরচের জন্য আমাদের কাজ? শুধুই কি পরিবার বিস্তৃত করার জন্য আমাদের কাজ? আমরা কি পারি না সামর্থ্য থাকতেই সমাজের জন্য কিছু করতে? তাতে কোন এওয়ার্ড আসুক আর না আসুক অন্তত এটুকু তো বলতে পারবো যে, আমাদের জীবনকে একটি মহৎ উদ্দেশ্যে পরিচালনা দিয়েছিলাম!

*ফটো ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।

**লেখাটি প্রথম আলো ব্লগে প্রকাশিত হয়েছে এবং সেখানে পাঠকের জ্ঞানগর্ভ মন্তব্য রয়েছে