Tagged: কলকাতা

ফেলানী রোডের সেই দূতাবাসটিতে একদিন…

হরতাল আর অবরোধের দিনেও বিশাল লম্বা লাইন। এতো মানুষ ভারতে গিয়ে কী করবে? কেউ বলে ফরম নেওয়া শুরু করেছে, কেউ বলে, এখনও দেরি আছে। অথচ ঘড়িতে প্রায় দশটা! একজন মহিলা এসে দালালি করার সুযোগ চাচ্ছিলেন বার বার। “আসুন আমার সাথে, একদম প্রথমে জমা পড়বে আপনার আবেদন।” অন্যান্য কর্মসংস্থানের মতো দালালিতেও নারীদের অংশগ্রহণ দেখে উৎসাহিত হবো নাকি হতাশ হবো, ভাবছি। আমি প্রথমে না শুনার ভান করলাম। অফিস থেকে এসেছি – একটু তাড়া তো ছিলোই। তবু মনের সাথে যুদ্ধ করে অন্য সকল প্রার্থীদের মতো দাঁড়িয়ে থাকলাম লাইনে। খুব ‘সিরিয়াস প্রার্থী’ হলে হয়তো তাই করতাম। আধা ঘণ্টার পার না হতেই আমার পেছনে অনেক দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হলো। হঠাৎ একজন হিন্দু বৃদ্ধ এসে আমার সামনে দাঁড়ালেন। “বাবা, আপনার সাথে আমাকে নিন। বুড়ো মানুষ বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না।” একবার পেছনে তাকিয়ে অন্যদের প্রতিক্রিয়া দেখে নিলাম। অতএব শান্ত হয়ে মেনে নিলাম প্রাচীনকে।

এশিয়ার অনেক দেশ ঘুরেছি অথচ কলকাতাকে দেখা হয় নি আজও। অবিভক্ত বাংলার প্রাচীন শহর কলকাতাকে দেখার সখ সেই ছোট কাল থেকে। ছেচল্লিশ, সাতচল্লিশ আর একাত্তরের বাংলাদেশের সাথে কত গভীরভাবে জড়িয়ে আছে স্মৃতির শহর কলকাতা! বিগত দশকগুলোতে সুনীল বাবুর ‘পূর্ব-পশ্চিম’, এম আর আখতার মুকুলের ‘আমি বিজয় দেখেছি’ এবং ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের Era of Sheikh Mujibur Rahman পড়ার পর কলকাতাকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে ছিলাম। একসময় চিটাগং যাবার মতোই কলকাতায় যেতো এদেশের মানুষ। চিকিৎসা, বিয়ের বাজার বা শিক্ষার জন্য দক্ষিণবঙ্গের মানুষগুলো তো ঢাকায় না এসে কলকাতায় যাওয়াকেই সহজ মনে করতো। ‘হাত মে বিড়ি মু মে পান- লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ করতে করতে আমরাই এক সময় পাকিস্তানকে নিয়ে আসি। বাঙালি মুসলমানের সমর্থন না থাকলে পাকিস্তান হতে পারতো না। সে পাকিস্তান খরগ হয়ে আমাদের ওপরে চড়ে বসলো। আবার সেই আমরাই ‘জয় বাংলা’ বলে স্বাধীন করলাম বাংলাকে – পেলাম একান্ত নিজের বাংলাদেশকে। এতো দীর্ঘ ইতিহাস দু’বাক্যে বলে শেষ করা যায় না।

নাহ্ ভেবেছিলাম লাইন শেষ হলেই বুঝি ‘তাদের’ দেখা পাবো। প্রবেশ মুখেই সিকিউরিটি ডোর: সেটি পার হবার পর দেওয়া হলো ৫৯৯ নম্বর সিরিয়াল নম্বর। ভেতরের কক্ষে আমার মতো সিরিয়াল নম্বর নিয়ে অনেককে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে দেখলাম। অনিশ্চয়তা কমলো না। সাড়ে ন’টায় যদি আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হলো, তবে এতো মানুষের ভীড় কেন? সকলেই কি সাড়ে ন’টার প্রার্থী? নাহ্, তা তো হবার কথা নয়। খুঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, যার এপয়েন্টমেন্ট বারোটায় তিনিও সকালেই এসে উপস্থিত। ফেলানী রোডের কতৃপক্ষ কাউকেই নাখোশ করছেন না। তবে বসিয়ে রেখেছেন অনিশ্চিত অপেক্ষায়।

প্রায় আধাঘণ্টা অপেক্ষার পর আমার নম্বর ডাকা হলো। ভেবেছিলাম, এবার বুঝি পাবো ‘তাহার’ দেখা; মানে, যারা আমার কাগজপত্র গ্রহণ করে ভিসা দেবার প্রতিশ্রুতি দেবেন। কিন্তু এবারও হবে না। যুক্ত হলো আরেকটি সিরিয়াল ১৪২ নম্বর। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রে আদিষ্ট হয়ে তৃতীয় তলায় গিয়ে দেখি, এলাহী কাণ্ড। এতো মানুষ কখন এসেছে? আরেকটি আবদ্ধ কক্ষ। শীতের দিনের গরমে কারও অনুকম্পা পাওয়া যায় না। এসি তো বন্ধই, ফ্যানও বন্ধ! উঁচু সিলিং ও দরজায় ভিনদেশী কারুকার্য। মানুষগুলোর ভাষা ও বসনে ‘ভারত-ভারত’ ভাব! ভিসা-প্রার্থীদের প্রস্তুতি ও আবেদনপত্রের সাথে সংযুক্ত কাগজপত্রের বহর দেখে আমি ভড়কে গেলাম। কেউ কেউ বগলেও একটি ফাইল নিয়ে এসেছেন, যেন ভারত যাওয়াই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। অথচ আমি যে মাসখানেক আগে আবেদন করেছিলাম সেটিই প্রায় ভুলে গিয়েছিলাম! গরম আর অনিশ্চয়তায় সবকিছু ঝাপসা লাগছে।

আরও প্রায় এক ঘণ্টা বসে থাকার পর আমার ডাক আসলো। সব কাগজের মধ্যে বিদ্যুতের বিলই হলো তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণপত্র। ঠিকানা নিশ্চিত না হয়ে ভিসার আবেদন গ্রহণ করবে না। যা হোক, সব দাবি মেটানোর পর গৃহীত হলো আমার আবেদন ও পাসপোর্ট। খুব সম্ভব সামনের সপ্তাহের শুরুতেই পেয়ে যাবো কলকাতা যাবার ছাড়পত্র। ফেলানীসহ অগণিত সীমান্ত হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ভারতকে হয়তো কখনও ক্ষমা করতে পারবো না। তবু ‘পরদেশে আত্মীয়ের’ মতো কলকাতাকে একবার দেখে আসতে চাই। চোখের দেখা! কলকাতায় ‘থাকা ও ভ্রমণ’ সম্পর্কে অভিজ্ঞ সহব্লগারদের পরামর্শ চাই।

আরও পড়ুন:  একদিন কলকাতায়


[প্রথম প্রকাশ ও পাঠক প্রতিক্রিয়া/ ২৯ নভে ২০১৩: সামহোয়্যারইন ব্লগ]

একদিন কলকাতায়

সকালের কলকাতা: ট্যাক্সি ড্রাইভারের খপ্পড়ে

হুগলিতে ভেসে নদী, নগর ও সেতু দেখার লোভে সিদ্ধান্ত নিলাম আজ যাবো বেলুর মঠ দেখতে। মঠও দেখা যাবে নদীও দেখা যাবে। বলা বাহুল্য, নদী দেখাই প্রথম অগ্রাধিকার! কুটিঘাট থেকে প্রতি আধাঘণ্টা অন্তর ইন্জিনের নৌকা ছাড়ে। একটি মধ্যম মানের হোটেলে রাত্রি যাপনের পর ইন্ডিয়ান কম্বলের উষ্ণতা থেকে বের হলাম। টিভিতে প্রায় ৯০০ চ্যানেলে কেবলই ইন্ডিয়ান অনুষ্ঠান দেখা যায়। শুধু বাংলাতেই কমপক্ষে ৭০টি চ্যানেল। তাছাড়া কমপক্ষে ৪০টি চ্যানেল ভজন, অর্চনা, প্রার্থনা, যোগব্যায়াম ইত্যাদি বিষয়ের জন্য। শীত ঢাকার মতোই। তবু বিদেশের মাটিতে অসুস্থ হতে চাই নি বলে গরম পানি মিশিয়ে গোসল শেষ করলাম। পরোটা আর ডালের নাস্তা। পরোটা মানে বিশাল আকৃতির ‘লুচি ভাজা’ বলা যায়; ডাল মানেও বাংলাদেশের ডাল নয়। টমেটো পাঁচফোরণ ইত্যাদির ব্যঞ্জনায় সৃষ্ট ডালের তরকারি। শীতের দীর্ঘ রাতের পর ক্ষুধার্ত পেটে গরম পরোটা, খেতে মন্দ নয়। মূল্য মোট ৬০ টাকা! খেয়ে বের হলাম সকাল সাড়ে সাতটা।

.

সকালের কলকাতা যেন বিয়েবাড়ির সকাল। বিয়ে শেষ কনেসহ বরযাত্রীরা সব বিদায়। ছড়ানো ছিটানো জড়ি আর কাগজ টুকরোয় হুহু করে শূন্যতা। সবজায়গায় শূন্যতা থাকলেও বাসি উৎসবের চিহ্ন রয়েছে রাস্তায়। দেশী-বিদেশী ক্রেতা-দর্শনার্থীদের ভিড়ে গতরাতে সরগরম ছিলো এই এলাকাটি। এখন হোটেলগুলো ছাড়া সবকিছু বন্ধ। উৎসবের আমেজে পাবলিক কলে কাঁধে গামছা মুখে ব্রাশ নিয়ে গোসল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে নিম্ন-মধ্যবিত্ত কলকাতাবাসীরা। হঠাৎ গড়গড় করতে করতে সামনে এসে উপস্থিত করপোরেশনের পানির ট্রাক। আমার মতো আরলি-রাইজার মর্নিং ওয়াকার যারা, তারা সবাই রাস্তার এক কোণে একটি পিলারের পেছনে জড়ো হয়ে গেলো। ব্যাপার কী? ছেরছের করে পানির বর্ষণে ভাসিয়ে দিয়ে গেলো রাস্তার সব ধূলোবালি। ময়লাসহ পানি গিয়ে পড়লো পাশের গুপ্ত সুরঙে! রাস্তা পরিষ্কার রাখার কী চমৎকার আইডিয়া! কলকাতার পরিচ্ছন্ন রাস্তা দেখে গতকাল আমি এর কারণ খুঁজে পাই নি। মনে হয়েছিলো এক পশলা বৃষ্টি এসে ধুয়ে দিয়ে গেলো কলকাতার রাস্তাগুলোকে। পানির ট্রাক অতিক্রম করে ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতে থাকলাম। নিউমার্কেট সংলগ্ন রাস্তার মাথায় এসে দাঁড়াতেই হলুদ রঙের একটি ট্যাক্সি এসে দাঁড়ালো। ট্যাক্সি নেবার পরিকল্পনা না থাকলেও, ইতিস্তত করে ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম: বেলুর মঠে যাবার জন্য কুটিঘাট যাবার পথ সে জানে কি না। ‘কুঁদঘাট যাবেন তো? উঠুন না দাদা! উঠিয়ে!’ সকালের শান্ত শহর দেখার সিদ্ধান্তে ট্যাক্সিতে চড়ে বসলাম। ড্রাইভার অবাঙালি। গাড়িতে সকালের পুজো হয়েছে – গনেশ ও বিবেকানন্দের ছবি ঝুলানো। রাস্তা জুড়েও আগরের গন্ধ, যেন সমস্ত কলকাতা একটি পুজোমণ্ডপ! গাড়িতে ঝুলানো বিবেকানন্দ বাবুকে এড়িয়ে মোবাইল ফোনে ছবি তুলছি। গাড়ি চলতে চলতে পুরান ঢাকার মতো চাপা গলিতে প্রবেশ করলো। রাস্তা দু’পাশে মুদি দোকান থেকে শুরু করে ওষধ, ফটোস্টুডিও, ফলের দোকান সবকিছু চোখে পড়লো।

.

হঠাৎ একটু দ্বিধায় পড়ে গেলাম। ট্যাক্সিড্রাইভার আমাকে কুঁদঘাট নামক এক স্থানে এসে থামিয়ে দিয়েছে – এটিই কি কুটিঘাট? তবে নৌকাঘাট কোথায়? সামনে দেখতে পারছি মেট্রো রেলের স্টেশন! ড্রাইভার বাংলাও বুঝে না, ইংরেজিও বুঝে না। সত্তর টাকা বিল। নেমে পড়ার উপক্রম করতেই ড্রাইভার বুঝালো যে, বেলুর মঠে ট্যাক্সিতে গেলে সে রাজি আছে নিয়ে যেতে। বেশি সময় নেবে না, এক ঘণ্টা মতো। এখনও অনেক সকাল। আমি ভাবলাম প্রায় ৪৫ মিনিট পর যেহেতু ৭০ টাকা বিল হয়েছে, বেলুর মঠ পর্যন্ত ২০০ টাকার বেশি বিল হবে না। আস্তে আস্তে কলকাতা শহর দেখে যাওয়া যাবে। অতএব রাজি হয়ে ট্যাক্সিতেই থেকে গেলাম। অন্য দিক দিয়ে চলতে থাকলো গাড়ি। মূল সড়ক অতিক্রম করে, শাখা সড়ক পার হয়ে রবীন্দ্র সেতুতে ওঠলো আমাদের ট্যাক্সি। ড্রাইভারকে গতি কমিয়ে ছবি তোলার সুযোগ দিতে অনুরোধ করলাম। হালকা কুয়াশার চাদরে ঢেকে আছে হুগলি নদী।

.

ভাগীরথী-হুগলী নদীটি গঙ্গার একটি শাখা। মুর্শিদাবাদ জেলার ফারাক্কা বাঁধ থেকে আলাদা হয়ে প্রায় ২৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত এসে কলকাতা ও হাওড়া জেলার মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এর ওপরেই বিখ্যাত হাওড়া ব্রিজ। পটপট করে ইন্জিনের নৌকা যাচ্ছে বাঁ দিক দিয়ে। রেলিঙের কারণে ছবি তোলা হলো না, ইচ্ছেও হলো না। নদীতে দৃষ্টি আটকে গেলো। ভরা নদীতে যেন বর্ষার পানি। হালকা বাতাসে তিরতির করে পানি বইছে। মন উদাস করা দৃশ্য। বাংলা, তুমি কত রূপ জানো!

.

ব্রিজ পার হয়ে একটি ফ্লাইওভার অতিক্রম করে আরও প্রায় দেড় ঘণ্টা পর বেলুর মঠের সামনে এসে পৌঁছলাম। ভাড়া ২২০ হলেও ড্রাইভার একটি চার্ট দেখিয়ে বুঝালো যে ২২০= ৪৪০ টাকা। আমি নিজের ভুল নিয়ে আর কোন পরিতাপ না করে টাকা পরিশোধ করে বেলুর মঠে প্রবেশ করলাম। চল্লিশ একর জমির বিশাল বড় কমপাউন্ডের পাশে পাবলিক টয়লেট দেখে সবচেয়ে বেশি খুশি হলাম। পরিচ্ছন্ন শৌচাগারে এক টাকার সেবা নিলাম। সুরম্য মন্দির ও গোলাপি রঙ্গের গুম্বুজে পরিপূর্ণ হয়ে আছে রামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতিবাহী বেলুর মঠ। ছবি তোলতে মানা, ইচ্ছেও নেই। অনেক দর্শনার্থী, জুতো খুলে যখন-যেখানে-যেভাবে-প্রযোজ্য ভক্তি ও অর্জ্ঞ প্রদান করছে। আমার কোথাও প্রবেশের প্রয়োজন হয় নি।  এবারের উদ্দেশ্য নৌকাঘাটে গিয়ে ইন্জিনের নৌকা ধরা।

.

বেলুর মঠের এক পাশ দিয়ে একটি পকেট রাস্তা ধরে নৌকা ঘাটের দিকে হাঁটতে লাগলাম। কোন বাহন নেই, শুধুই হাঁটার রাস্তা। দু’পাশে বেলুর মঠের  স্মৃতি-পণ্য সাজিয়ে রেখেছে রকমারি দোকান। পাতার ছোট্ট থালায় চারটি পুড়ি ভাঁজ করে তার ওপর বুট ও গোলআলুর ডাল। এর নাম কচুরি! পরিবেশনার অভিনবত্ব দেখে খাবার ইচ্ছে জাগলো। মূল্য মাত্র দশ টাকা। তৃপ্তি নিয়ে খেলাম। নৌকাঘাট মাত্র এক মিনিটের দূরত্বে! ঘাটের গেইটে লেখা ‘এখান থেকে দক্ষিণেশ্বর যাবার নৌকা পাওয়া যায়।’ ভাড়া  দশ টাকা।  বাঁ দিকে মোড় নিয়ে জেটিতে প্রবেশ করলাম।

.

জেটির চার পাশে অনেক নৌকা চাক দিয়ে বাঁধা আছে। জেটি বেয়ে নামতেই দক্ষিণেশ্বরে যাবার ডাক পেলাম। নৌকার রশি খোলা – ইতোমধ্যেই জেটি থেকে বিচ্ছিন্ন। যেন আমার জন্যই অপেক্ষা করছে! লাফ দিয়ে গিয়ে বসার সাথে সাথে নৌকা বের করতে শুরু করলো পেন্ট শার্ট পরা আধুনিক মাঝিরা। সহযাত্রী হয়েছে কয়েকটি পরিবার, সাথে একটি শ্বেত বর্ণের বিদেশি দম্পতি। ক্যামেরা বের করে জেটির দৃশ্য ধারণ করছি, সাথে সাথে এসএলআর নিয়ে ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তারা। হয়তো ছবি তোলার  অনুমতি নিয়ে বিদেশীরা চিন্তিত ছিলেন। আমাকে দেখে তারাও উৎসাহিত হলেন। আমাকে অবশ্য সম্পূর্ণ বিদেশী মনে করে নি যাত্রী বা মাঝি কেউই। বেলুর মঠের ছবি তুললাম নদী থেকে – এবার কেউ মানা করার নেই। উজান পানি অতিক্রম করে প্রথমে নদী পার হলো আমাদের নৌকাটি। তারপর ডান দিকের তীর ঘেসে দক্ষিণেশ্বরের উদ্দেশ্যে আস্তে আস্তে চলতে থাকলো। বিপরীত দিক থেকে বেশ কিছু যাত্রীবাহী নৌকা আমাদেরকে অতিক্রম করে বেলুমঠের দিকে যাচ্ছিলো। নদীতে গণ-গোসলের দৃশ্য দেখছি আর স্মৃতিকাতর হচ্ছি ফেলে-আসা কিশোর জীবনকে নিয়ে। ওপর দিয়ে সেতু চলে গেলো একটি, সামনে আরেকটি দেখা যাচ্ছে। প্রায় ২৫ মিনিট পর ডানপাশে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের সুউচ্চ মিনার দেখা গেলো। উৎসব করে গোসল করতেছে মানুষগুলো। ছবি তুলে পাশের সহযাত্রীটিকে জিজ্ঞেস করলাম, আজ কোন বিশেষ ‘দিবস’ কিনা। তিনি জানালেন, এটি দক্ষিণেশ্বর মন্দির ঘাটের দৈনন্দিন দৃশ্য: গঙ্গাস্নান। নৌকা থেকে নেমে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের ভেতর দিয়ে বের হলাম। বেলা মাত্র সাড়ে এগারোটা! ট্যাক্সিকে জানালাম ধর্মতলা ভিক্টোরিয়া পার্কে যাবো। ভারতের সপ্তমাশ্চর্য্যের একটি। রাণী-সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই প্রাসাদে।

.

.

দুপুরের কলকাতা: ভারতে আমি যখন স্থানীয়!

মিটারের চেয়ে দ্বিগুন ভাড়া দিয়ে ভিক্টোরিয়া স্মৃতি প্রসাদে পৌঁছাতে আরও এক ঘণ্টা লাগলো। প্রবেশ মূল্য বিদেশীদের জন্য ১৫০টাকা, দেশীদের জন্য ১০টাকা। বিদেশী হিসেবে দিনভর দ্বিগুণ ট্যাক্সি ভাড়া দেবার পর একটি অনৈতিক সিদ্ধান্ত নিলাম। তা হলো: সত্যও বলবো না, মিথ্যেও বলবো না। অতএব ১০টাকা দিয়ে প্রবেশ ও প্রাসাদে যাবার টিকেট কিনলাম। একটু অপরাধবোধ সৃষ্টি হলো, তবে প্রাসাদ দেখার আনন্দে সব মিলিয়ে গেলো। প্রাসাদটিকে যাদুঘরের মতো সাজানো হয়েছে। একপাশে ব্রিটিশ চিত্রকলা ও ব্রিটিশ নেতানেত্রীর স্মৃতি চিহ্ন। পলাশীর যুদ্ধে ষড়যন্ত্রের বিজয়ী লর্ড ক্লাইভের সগর্ব স্টাচু দেখে মেনেই নিলাম যে, এটি ব্রিটিশ আমলের প্রাসাদ। অন্য দিকে একই সময়ের উপমহাদেশীয় নেতানেত্রীদের ছবি এবং উপমহাদেশীয় চিত্রকলা। নারীর ছবি, গ্রাম্য জীবনের ছবি। সউচ্চ সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠলাম। মাঝে বিশাল হলরুম। প্রাসাদের চার পাশে বিস্তির্ণ খোলা মাঠ, যা এখন অভিসারালয় বা ডেইটিং স্পটের রূপ নিয়েছে। ছবি তুললাম অনেক। শেষে প্রাসাদকে পেছনে রেখে নিজের একটি ছবি তুলাল লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। একজন অতিথিকে অনুরোধ করে ভারতে আমার একমাত্র ছবিটি তোলালাম। ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে পায়ে হেঁটে কলকাতা শহর দেখতে দেখতে ইন্দিরা স্কয়ার হয়ে ফিরে এলাম ধর্মতলায়।

.

.

রাতের কলকাতা: সম্মোহিত হয়ে কোথায় ঢুকে গেছি টের পেলাম অনেক পরে…

হোটেলে ফিরে বিশ্রাম নিয়ে সন্ধায় বের হলাম নিউমার্কেট সংলগ্ন এলাকায়। ঢাকার নিউমার্কেটের মতো রাস্তায় স্লোগান দিয়ে বিক্রি হচ্ছে শীতের জামা, জুতো থেকে শুরু করে মেয়েদের যাবতীয় দ্রব্য সামগ্রী। ‘ডেরছো ডেরছো!’ করে দাম হাঁকছে শিশুদের শীতের টুপি ও মাফলারের জন্য। ডেরছো মানে দেড়শ’ টাকা!  ‘লিয়ে যান, লিয়ে যান!’ নারী-পুরুষের মিশ্রিত জনস্রোতে আমি চলতে থাকলাম উদ্দেশ্যহীন। কেএফসি’র একটি আউটলেট দেখে মার্কেটের ভেতরে প্রবেশ করলাম। তার আগেই চোখে পড়লো ‘ধুম ত্রি’ – হাউজফুল। ছাত্রজীবনের বলাকা হলের কথা মনে পড়লো। হাউজফুল মানে হাউজফুল নয়: বাইরে টিকেট কাটতে হবে! কেএফসি’র সামনে অর্থাৎ সিনেমাহলের সামনে নারী-পুরুষ দর্শকেরা চক্রাকারে দাঁড়িয়ে আছে প্রবেশের অপেক্ষায়। যেমন নারী, তেমনি প্রৌঢ় বয়সের দর্শক। পরিবেশ একদম মন্দ নয়। একশ’ পঞ্চাশ কোটি রুপির ‘ধুম সিকোয়েলের’ সিনেমাটি শিকাগো, জুরিখ এবং মুম্বাইয়ে চিত্রায়িত। স্থানীয় ইংরেজি পত্রিকায় ব্লকবাস্টার হিসেবে ঘোষণা করে সপ্তাহটিকে ‘ডুমসডে’ হিসেবে খেতাব দিয়েছে। আমির খানের ডাবল ভূমিকা। ঢাকার জীবনে এরকম পরিস্থিতিকে কীভাবে সামাল দিতে হয়, আমি জানি। মোদ্দাকথা হলো, তিন ঘণ্টা ব্যাপী সিনেমা দেখার পরিস্থিতিই সৃষ্টি হতো না। কিন্তু নতুন ছবি, কলকাতার প্রেক্ষাগৃহ, আমিরখানের একশন, ক্যাটরিনার রিনঝিন উপস্থিতি, উদয় চোপড়ার প্রাণবন্ত হাসির দৃশ্যগুলো ইত্যাদি আকর্ষণ আমাকে প্রলুব্ধ করতে লাগলো। অভিষেকের কথা নাইবা বললাম! সম্মোহিত হয়ে বাইরে এসে ফের ‘ডেরছো ডেরছো’ ডাক শুনতে পেলাম। জামাকাপড়েরর দাম নয়, কালোবাজারির হাতে টিকিটের দাম! আসল মূল্য কমপক্ষে তার অর্ধেক হবে। লাইট কমতে শুরু করেছে! কখন টিকিট কেটে, কতটুকু অপেক্ষার পর কীভাবে প্রবেশ করেছিলাম তার কিছুই মনে নেই। হঠাৎ মনে হলো একটি আলো-আধারি পরিবেশে আমি বসে আছি, সামনে রুপালি পর্দায় ভারতীয় পণ্যের বিজ্ঞাপন। একটু পরই শুরু হচ্ছে প্রিয় অভিনেতা আমির খান অভিনীত ধুম ত্রি। বাকি কথা সকলেরই জানা। বিস্তারিত বললে সেটি সিনেমার রিভিউ হয়ে যাবে। লেখা আর দীর্ঘায়িত করতে চাচ্ছি না। সংক্ষিপ্ত বক্তব্য হলো, একজন অসম্ভব ক্ষমতার আমির খানকে দেখতে পেলাম বেশ বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে। মার্কিন মুলুকে পিত্রদত্ত পেশা ম্যাজিশিয়ান ও সার্কাস কর্মী এবং রহস্যময় ব্যাংক লুটেরার ভূমিকায়। প্রতিটি কৃতীত্বে ভারতীয় দর্শকদের মুহুর্মুহু করতালিতে বুঝতে পারলাম, আমির খান চাইলে অন্য অনেক চলচ্চিত্রাভিনেতার মতো রাজনীতিতেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারবেন। ভারতীয়রা হয়তো সিনেমা দেখেছিলো, আমি দেখেছিলাম ভারতীয়দেরকে – দেখেছিলাম তাদের সিনেমাহলের পরিবেশ।

কয়েকটি ছবি:

11 (3)

11 (5)

11 (6)সহযাত্রী আরেক বিদেশী তুলছেন গঙ্গাস্নানের ছবি।

11 (7)

দক্ষীণেশ্বর মন্দিরের ঘাটে পৌঁছে গেছি আমরা।

11 (8)

ভিক্টোরিয়া পার্কের প্রবেশ পথ – অদূরে ভিক্টোরিয়া প্রাসাদ।

11 (9)

প্রাসাদের ভেতর থেকে সামনের দৃশ্য।

11 (10)

প্রাসাদের পেছন অংশ।

11 (11)

সালে প্রতিষ্ঠিত সুদৃশ্য ভিক্টোরিয়া প্রাসাদ। কুইন্স ওয়ে, কলকাতা। ৫৬ মিটার উঁচু। স্থপতি উইলিয়াম ইমারসন।

11 (14)

কলকাতা ভ্রমণে লেখকের একমাত্র ছবিটি।

কলকাতা ভ্রমণের সারসংক্ষেপ

ভিনদেশে ভ্রমণকে স্বস্তিদায়ক করে তোলার জন্য আগেই কয়েকটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলাম। যথা: স্থানীয় খাবার খাবো, বিপদে না পড়লে ট্যাক্সি নেবো না, হোটেলের সাথে স্থায়ি চু্ক্তি করবো না, যেখানে রাত সেখানেই কাত হবো! অর্থাৎ যে এলাকায় আমার ভ্রমণ শেষ হবে, সেখানেই হোটেল খুঁজে রাত কাটাবো। অবশ্য কলকাতা না হলে ওরকম চিন্তা করা যেতো না। এয়ারপোর্ট থেকে বের হবার পথে ডলারকে রুপিতে রূপান্তর করে বের হলাম। কোন গাইড নেই, যাকে যখন পাই, তার কাছ থেকেই পরামর্শ নেবো। বের হবার পথে একজনকে পেয়ে শান্তি নিকেতনে যাবার কথা জিজ্ঞেস করতেই উত্তর এলো এভাবে: আপনি সান্তিনিকেতন যাবেন? তাহলে তো আপনাকে হাওড়া গিয়ে ট্রেনে ভোলপুরে যেতে হবে। বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য দ্বিতীয়বার যাকে সামনে পেলাম, তিনি উত্তরে বললেন: বাংলা মালুম নেহি। ইংরেজিতেও যা চাইলাম, তিনি হিন্দিতে সে বিষয়ে অপারগতা জানালেন। এবার ভাবলাম, সত্যিই তবে ভারতে আসা হলো। মাত্র এক ঘণ্টায় কলকাতায় নেমে আমার মনেই হয় নি যে, আমি কোন ভিন দেশে এসেছি।

হাঁটতে থাকলাম সামনের দিকে। ডান দিক দিয়ে বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় বের হয়ে যাচ্ছে কলকাতার ফ্লাইওভারগুলো। আধুনিক শহরের চিহ্ন চারপাশে। একটি সাইনবোর্ডে মমতা বন্দোপাধ্যায় আমাকে ‘পশ্পিমবঙ্গে স্বাগত’ জানালেন, জোড় হাতে। ভেতর থেকে কোন তাড়া না থাকলেও অনিশ্চিতভাবে দাঁড়িয়ে থাকলাম বাস স্টপে। পাশে যারা দাঁড়িয়ে আছেন, বেশভূষণে সকলকেই স্থানীয় মনে হচ্ছে। একটি মাত্র ব্যাকপ্যাকে আমাকেও খুব বেশি ‘বিদেশী’ দেখাচ্ছে বলে মনে হয় নি।

প্রায় মিনিট বিশেক পর একটি এসি বাস এসে থামলো। ওঠে জিজ্ঞেস করলাম কুটিঘাট যাবে কি না। বাস কন্ডাক্টর নিকটস্থ একটি বাস স্টপের নাম জানতে চাইলেও আমি কোন উত্তর দিতে পারলাম না। গরজও করলাম না। ভেতরে প্রবেশ করলাম – যেখানে বাস যাবে সেখানেই আমি যাবো! পাশের সহযাত্রীকে এবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘বেলুর মঠ যাবার জন্য কুটিঘাটে’ যাওয়া যায় কীভাবে। মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক স্মিত হেসে বললেন, এই বাসে তো আপনার ‘কোই ফায়দা’ নেই বাবু! তার বক্তব্য হলো, আমি নাকি সম্পূর্ণ উল্টোপথে চাচ্ছি। সাহায্যের জন্য তিনি বললেন, এবার আপনি ‘উল্টাডাঙ্গা’ নেমে ডান দিকের বাস ধরতে পারেন। উল্টোপথে এসেছি বলেই কি এখন আমাকে উল্টাডাঙ্গা নামতে হবে? B-)

যা হোক, বাস এগিয়ে চলেছে। দুদোল্য মনে এবার জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে সাইয়েন্স সিটিতে যাওয়া যায় কীভাবে। আমার পাশের সহযাত্রীটি এবার খুশি হলেন: এ বাসেই সাইয়েন্স সিটিতে যেতে পারবেন – এটি ঠিক সেখানেই থামিয়ে যাবে। স্বস্তি পেলাম, যাক একটি জায়গায় তো যাওয়া যাবে! অতএব গন্তব্য সাইয়েন্স সিটি। সচক্ষে যা দেখলাম, সাইয়েন্স সিটি হলো কলকাতার নির্মিয়মান একটি বিনোদন কেন্দ্র। স্পেইস থিয়েটারটি বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটারের চেয়ে বেশি কিছু নয়। রয়েছে টাইম মেশিন সিমিউলেটর যাতে আছে অতীত পৃথিবীর কিছু বাস্তব নির্দশন। আছে ত্রিমাত্রিক থিয়েটার এবং ইভোলিউশন পার্ক। প্রবেশপত্র মাত্র বিশ টাকা হলেও ভেতরে গিয়ে প্রতিটি প্রদর্শনীর জন্য আলাদা টিকেট কাটতে হয়। বেশি আকর্ষণ টাইম মেশিনে, কিন্তু সিট মাত্র তিরিশটি।

ব্যাকপ্যাক বুকে জড়িয়ে ধরে মুগ্ধ নয়নে কলকাতা দেখছি। ভক্সওয়াগন টাইপের হলুদ ট্যাক্সিতে পরিপূর্ণ। বড় বড় বিলবোর্ড। তাতে বেশির ভাগই ইন্সুরেন্স, ব্যাংক আর আবাসন বিষয়ক বিজ্ঞাপন। ঢাকার রাস্তা ঘাটের মতো রাজনীতিকদের ছবিতে কলকাতার দেয়াল পূর্ণ নয়। তবে মমতাহীন* মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নাম ও ছবি দেখতে পাচ্ছি বিভিন্ন ব্যানারে। পক্ষী প্রদর্শনী থেকে শুরু করে, নাট্য প্রতিযোগিতা কিংবা বিবেকানন্দের চেতনাসভা, সর্বত্রই মমতা। সিনেমার পোস্টারে প্রসেনজিতের ছবিই বেশি: জাতিস্মর, হনুমান ইত্যাদি। নতুন ছবি আসছে – চাঁদের পাহাড়। বাসে যাত্রীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে – এবার দাঁড়ানোর জায়গাটুকুও পূর্ণ হচ্ছে মেয়ে-পুরুষ যাত্রীদের দ্বারা। গণপরিবহনে নারী যাত্রীদের চিরাচরিত অস্বস্তি বা দ্বিধা দেখা যায় নি কলকাতার দিদি-মাসিদের মধ্যে। বাসের এক জায়গায় ইংরেজিতে লেখা আছে, একদম যতটুকু ভাড়া ততটুকুই দিতে হবে, বড় নোট দেওয়া যাবে না। আমি প্রমাদ গুণতে লাগলাম।

এসি বাস বিভিন্ন স্টপিজ পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে। ওদিকে এগিয়ে আসছে বাস কন্ডাক্টর! গন্তব্য জিজ্ঞেস করলে নিয়মিত যাত্রীদের মতোই আত্মবিশ্বাসের সাথে জানিয়ে দিলাম যে, এয়ারপোর্ট থেকে সাইয়েন্স সিটি থামবো। ধরিয়ে দিলাম পঞ্চাশ টাকার নোট। পাঁচ টাকা চেইন্জ আছে কিনা জানতে চাইলো, যা সঙ্গত কারণেই আমার কাছে নেই। হয়তো ভাড়া হবে পঁয়তাল্লিশ টাকা। এরকম পরিস্থিতি খুব সম্ভব তারা সমমানের একটি কুপন দেয় যা পরবর্তিতে একই বাসে যাতায়াতে ব্যয় করা যায়। কিন্তু আমার পাশের সহযাত্রীটি হিন্দিতে জানিয়ে দিলেন যে, আমি স্থানীয় নই এবং আমাকে টাকা দিয়েই নিষ্পত্তি করতে হবে। অবশেষে চল্লিশ টাকার টিকিটসহ দশ টাকা ফেরত পেলাম।

আরও চার-পাঁচটি স্টেশন অতিক্রম করার পর সাইয়েন্স সিটিতে নামার ডাক পেলাম। নেমে তো সাইয়েন্স সিটির কোন চিহ্নই পেলাম না। চারপাশের শহর দেখতে লাগলাম। প্রাচীন শহরের কোন নির্দশন এখানে পেলাম না। একটি পারিবারিক দল এসে আমাকে আচমকা জিজ্ঞেস করলো সাইয়েন্স সিটি কোনদিকে। এরকম আস্থাশীল জিজ্ঞাসায় ভেতর থেকে আনন্দিত হলেও তাদেরকে কোন সদুত্তর দিতে পারলাম না। তবে এরপর থেকে তাদের পিছু নিলাম। তারা রাস্তা পার হলেন, আমিও হলাম। ডান দিকে বাঁকানো একটি পায়ে-হাঁটা রাস্তায় আরেকটি বড় সড়কের বাঁ পাশে পেলাম সাইয়েন্স সিটির প্রবেশ পথ। সামনে ঢাকার শিশু পার্কে প্রবেশপথের মতো অস্থায়ি খাবারের বেশ কিছু দোকান। তবে কোথাও চটপটির দোকান নেই! নিচে বাস স্টপিজ, ওপরে ফ্লাইওভার।

বিজ্ঞানের কৃতীত্ব দেখার জন্য সাইয়েন্স সিটিতে আসি নি। মনে হয়, ভারতীয়রাও স্রেফ বিনোদনের জন্যই আসেন। সকল বয়সের দর্শনার্থীর ভিড় দেখে তাই মনে হলো। ভবনগুলোর মাঝখানে পার্ক এবং বসার জায়গায় বসে আছেন বিভিন্ন বয়সের দর্শনার্থীরা। লাইন ধরে প্রবেশ টিকিট নিলাম। ভেতরেও প্রতিটি প্রদর্শনীর জন্য দীর্ঘ লাইন পেলাম। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও টাইম মেশিনের পরবর্তি প্রদর্শনীর টিকিট পেলাম না। প্রথম দিনের ভ্রমণের ক্লান্তি, পেছনের ব্যাগ এবং দাঁড়ানোর ঝক্কি নেবার পর ‘না পাওয়ার’ বিষয়টি আরও ক্লান্ত করে দিলো। লাইন ছেড়ে বের হয়ে গেলাম – কিছুই দেখবো না! সিঙ্গাড়ার জোড়া পনের ও বিশ। সাথে কাগুজে থালায় পাতলা রকমের একটু সস। দোকানী পরিস্কারভাবে বাংলা বলতে পারে না – হিন্দি মিশ্রিত। সিঙ্গাড়াতেও মিশিয়েছে অজানা কোন মসলা। তবু শাহবাগের সিঙ্গাড়ার মতো মজা পেলাম না। ক্ষুধা মেটালাম। সামনের পার্কে বসে বিশ্রাম নিলাম ও চারপাশের কিছু দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করলাম। কিছুই না দেখে বের হলে সেটা পরে আফসোসের কারণ হবে। তাই স্পেইস থিয়েটারের টিকিটের জন্য ফের লাইনে দাঁড়ালাম। একটি এডভেন্চার মুভি। দেখলাম করোরেডো নদীতে পানির প্রবাহ। মোরাল হলো: মিঠা পানি ব্যবহারে আমাদেরকেও আরও মিতব্যয়ী হতে হবে।

কলকাতা ভ্রমণের সারসংক্ষেপ

কলকাতা ভ্রমণের প্রথম উদেশ্য ছিলো প্রাচীন এবং অবিভক্ত বাংলার প্রধান শহর ক্যালকাটাকে দেখা। সেটি পরবর্তি দিনগুলোতে দেখেছি। ব্রিটিশ আমলের লাল ও দীর্ঘ দালানগুলোতে পরিপূর্ণ কলকাতা শহর। চামড়ার ব্যাগে এখনও পানি বহন করে মানুষগুলো। রাস্তায় এখনও পানির কল আছে। ১৯৩২ সালে প্রতিষ্ঠিত নিজামস রেস্তোরাঁয় খেয়েছি। থেকেছি ধর্মতলার একটি হোটেলে, সেটিও একটি প্রাচীন ভবন। নিকটবর্তী এলাকা তালতলায় মাদার তেরিজা হোম এবং ভিক্টোরিয়া স্মৃতি প্রাসাদ। দু’টি জায়গাই ঐতিহাসিক এবং অতীত-বিলাসী হিসেবে আমার জন্য যথেষ্ট আনন্দদায়ক ছিলো। গিয়েছিলাম হাওড়া জেলায় অবস্থিত বেলুর মঠেও। উদ্দেশ্য হুগলি নদী দেখা। সেই ছুঁতোয় দেখা হলো বৃহৎ মন্দির দক্ষিণেশ্বরও। চোখে পড়েছে হাজী মুহম্মদ মহসিন চত্ত্বর, হাজী মহম্মদ মহসিন সরনি এবং বিদায় নিয়েছি কাজী নজরুল ইসলাম সরনি দিয়ে বিমানবন্দরে এসে। কথোপকথনে বাংলা ভাষার ব্যবহারে যে অবহেলা দেখেছি, তা যদি কলকাতার সত্যিকার চিত্র হয়, তবে সেটি হবে অত্যন্ত ব্যথাদায়ক। আমাদের মতো গর্ব ভরে ওখানে কেউ বাংলা বলতে শুনি নি। বাংলাকে নিজের ভাষা হিসেবে কেউ বলে নি আমার সামনে। উচ্চবিত্তরা ইংরেজি মেশায় আর নিম্নবিত্তরা মেশায় হিন্দি। কেবল ভিক্ষুক আর ঠেলাগাড়িওলাদের মুখে অমিশ্রিত বাংলা শুনার সৌভাগ্য হয়েছে। তবে সেটি খুবই নগণ্য।

*মমতাহীন মমতা বন্দোপাধ্যায় বলার কারণটি বোধ হয় সকলেরই জানা। তিস্তা পানিচুক্তিতে মমতার মারমুখী বিরুদ্ধাচরণ বাংলাদেশীদেরকে হতাশ করেছে। অন্যদিকে আমরা তার স্বদেশপ্রেমে মুগ্ধ হয়েছিলাম। কিন্তু বিষয়টি পুরোপুরি রাজনৈতিক চাল। খবরের ভেতরে গিয়ে অন্য খবর পেলাম। কেন্দ্রীয় সরকার এবং তৎকালীন অর্থমন্ত্রী প্রনব বাবুর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের একটি বিশেষ অনুদান না পাওয়ার কারণে হতাশ মমতা প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃক আয়োজিত ওই পানিচুক্তিতে পানি ঢেলেছেন। আরেকটি কারণ ছিলো, হাসিনা সরকারের বিরোধীতা করে পশ্চিমবঙ্গের উর্দভাষী বিহারি মুসলিমদের সমর্থনকে স্থায়ী করা। মমতা একজন ঝানু রাজনীতিবিদ না হলে শত বছরের কংগ্রেস থেকে বের হয়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে জনগণের কাছে এতো ‘আবেদনময়’ করতে পারতেন না।

কিছু ছবি: অনেক ছবি তুলেছি। সব দেওয়া গেলো না :(


[ দু’টি রাস্তার সংযোগ স্থলে ‘ইন্দিরা উদ্যান’ – স্থাপত্যটির শিরোনাম: নারীর ক্ষমতায়ন। নিচে শোয়া জীর্ণ-দেহী পুরুষটি কি শিরোনামটিকে তাচ্ছিল্য করছে না? ]