Tagged: কর্মজীবন

যে কারণে চাকুরি প্রার্থীদের জন্য সময়টি কঠিন

cccc

আমরা তো বিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায়ই ‘জীবনের লক্ষ্য’ নিয়ে রচনা লিখি। অবশ্য ডাক্তার, প্রকৌশলী, পাইলট বা ব্যারিস্টার ছাড়া আমাদের আর কোন লক্ষ্যও থাকে না। কিন্তু কতজনে তার লক্ষ্য মতো জীবনকে গড়তে পারে? তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যে বিষয়ে পড়া হয়, সেবিষয়ে কি সকলেরই চাকরি হয়? মাঝে মাঝে ভাবি আসলেই কি পেশা নির্বাচন করার ক্ষমতা আমাদের আছে? ডাক্তার, আইনজীবি আর প্রকৌশলী ছাড়া, আর কোন বিষয়ে কি ‘নিজের পছন্দমতো’ চাকরি হয়? এখন তো মনে হয় ডাক্তার-উকিল-প্রকৌশলীদেরও সে সুযোগ কমে যাচ্ছে। প্রতি বছর হাজার হাজার ডাক্তার বের হচ্ছে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে।

এমন পরিস্থিতিতে আমাদের জন্য মাত্র দু’টিই পথ: নিজের পছন্দের বিষয়ে সর্বোচ্চ দখল, না হয় যেকোন বিষয়ে কাজ করার মতো ‘অনুকূল’ মানসিকতা। হয় যেকোন চাকরিতে নিজেকে মানিয়ে চলতে হয়, না হয় নিজের বিষয়ে যথেষ্ট ধারণা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়। হয় চাকরি করো, না হয় চাকুরি সৃষ্টি করো। মাঝের জায়গাটি বড়ই ‘আরামহীন’: অনেকে একে ‘বেকার’ নামে চেনেন!

.

মানুষ দু’প্রকার: চাকুরি প্রার্থী েএবং চাকুরি দাতা

আগেই বলে রাখা ভালো ‘লেখক হওয়া’ কিন্তু একটি আত্মকর্মসংস্থানের নাম। তবে কর্মজগৎকে বিবেচনায় আনলে দু’রকমের কর্মজীবি আছে: নির্ধারক nominator এবং নির্ধারিত nominee । এক দল চাকরি দেয়, আরেক দল চাকরি করে। অথবা বলা যায়, এক দল পরিচালনা দেয়, আরেক দল ‘পরিচালিত হয়’।

যারা বিচক্ষণ, দূরদর্শী এবং নেতৃত্বদানে দক্ষ, তারা সাধারণত ‘নির্ধারকের’ ক্ষমতা ও সম্মান লাভ করেন। তারা অনেকটা প্রাকৃতিকভাবেই মেধাবী এবং স্বাধীনচেতা। চাকরি হোক অথবা ব্যবসায়, তারা হলেন নিজ বিষয়ের ওস্তাদ এবং চাকুরিদাতা।  এখানে প্রধান চ্যালেন্জ হলো মানুষকে পরিচালনা দেওয়া। তবে তারা সাধারণত চ্যালেন্জ-পিপাসু হয়। তারা নিয়তি বা ভাগ্যে খুব একটা বিশ্বাসী নয় – নিজেই নিজের ভাগ্যের নির্মাতা। নিজের পথের নির্দেশ নিজেই বের করে। গাড়ির ড্রাইভারের মতো।

পক্ষান্তরে ‘নির্ধারিতদের’ ভাগ্য লেখা থাকে ‘নির্ধারকদের’ হাতে। প্রতিশ্রুতিহীন এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষাহীন মনোভাব তাদের এপরিস্থিতির জন্য দায়ি। তারা কখনও সৃজনশীল হতে পারে না, যেমন পারে না দায়িত্বশীল হতে। নির্দেশের অপেক্ষায় থাকে আর থাকে বসের দয়ার ওপর নির্ভরশীল। অনেকে একে নিজের নিয়তির সাথে মিলিয়ে নেয়। তারা যেমন জীবনের লক্ষ্য স্থির করতে পারেন না, তেমনি পারেন না পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে। এখানে চ্যালেন্জের সীমা নেই, মানিয়ে চলতে পারলে উত্তম কর্মী। যেভাবে চালানো যায়, সেভাবেই তারা চলে। গাড়ির যাত্রীর মতো।

.

bbbb

“Never depend on single income. Make investment to create a second source.”  

-Warren Buffet, the World’s Richest Man

কর্মজগৎ মূলত দু’টি জনগোষ্ঠির হাতে আটকে আছে: নির্ধারক এবং নির্ধারিত। অনেকেই আত্মসচেতনতা আর ‘ব্যক্তিগত জেদের’ শক্তিতে এগিয়ে আসে। Success is a matter of choice – সময় থাকতে যারা টের পেয়ে যায়, তারা মাইগ্রেট করতে পারেন দ্রুত।

.

.

*কর্মসংস্থান নিয়ে প্রাসঙ্গিক আরেকটি লেখা

________________________________________________________________________

পুনশ্চ: প্রায় ন’টি বছর প্রতিষ্ঠানের ‘অপারেশন’ বিভাগে থাকার পর এবছরের শুরুতে ‘এডমিনিস্ট্রেশন’ বিভাগে স্থানান্তরিত হই। অর্থ, সম্পদ ও কর্মী সম্পর্কে অর্জিত হয় বিরল অভিজ্ঞতা। মানুষের কর্মক্ষমতা সম্পর্কে অনেক সংকীর্ণ ধারণা বিস্তৃত করার সুযোগ পাই। মানুষ পারে না, এমন কাজ পৃথিবীতে কমই আছে। শুধু একটু অন্তর্মুখী রাগের প্রয়োজন!

কর্মসংস্থান ব্যবসায় : একটি অনাবিষ্কৃত শোষণ ব্যবস্থা

Eye Opener-crop

“শহিদুল সাহেবের সাথে এতগুলো বছর অতিক্রম করে আমি আমার ক্যারিয়ারটাকে শেষ করে দিয়েছি। সারাটি জীবন ম্যানেজারই থেকে গেলাম। অথচ বিএ পাশ করার পর একাজটি পেয়ে আমি কত খুশি হয়েছিলাম। তখন দয়া করেই তৎকালীন ম্যানেজিং ডিরেক্টর শহিদুল সাহেব আমাকে ম্যানেজারের কাজটি দিলেন। চিঠিলেখা, কারখানার সাথে প্রডাকশন ফলো-আপ করা, হিসাব করা, বিদেশি ক্রেতাদের সাথে যোগাযোগ করা ইত্যাদি কাজে আমি দারুণ মজা পেতাম। এমএ’টা করারও আর প্রয়োজন বোধ করলাম না। ১৯৯৮ সালে আমার বেতন ছিলো ৬০০০ টাকা। বছর গড়ালেই কাজ বাড়তো, কিন্তু বেতন বাড়তো না। অনুযোগ করলেই বলা হতো, ‘তোমার তো কোন অভিজ্ঞতা ছিলো না। এখানে কাজ শিখার যে সুযোগ পেয়েছো, সেটারও তো একটু মূল্য আছে। কাজ শিখো, বেতন তুমি পাবে।’ সেই সেই সময় আর এলো না আজ ২০১৩ সালেও আমার বেতন মাত্র ২০,০০০ টাকা। এদিকে সংসারের সদস্য বেড়ে ৬জনে দাঁড়িয়েছে। মেয়ের স্কুলের বেতন ও প্রাইভেটের পড়ানোর খরচ।

“শহিদুল সাহেব এখন একই প্রতিষ্ঠানসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। অথচ আমি ম্যানেজারেই রয়ে গেলাম! আজ ভাবছি, কী ভুলই না করেছিলাম, তার আশ্বাসে আশ্বস্ত হয়ে! কত চাকরির প্রস্তাব দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে প্রত্যাখ্যান করলাম, তার হিসেব নেই। আজ আমিও প্রতারিত, সে সাথে আমার স্ত্রী-সন্তানকেও প্রতারনার ভুক্তভোগী বানালাম।”

.

.
গল্পটির সব বলা হয় নি। দরকারও নেই, কারণ এরকম গল্পের অভাব নেই আমাদের সমাজে। যা হোক, তরুণ ভাইবোনদেরকে আমি আগে বলতাম, যাচাই-বাছাই না করে প্রথমে যে কোন একটি কাজে ঢুকে পরতে। তাতে বেকারত্বও কাটবে, আবার অন্য একটি চাকরির জন্য যোগাযোগ করার খরচও জুটবে। বেকারকে কেউ চাকরি দিতে চায় না। এক সময় দেশের নতুন পাশ-করা গ্রাজুয়েটরা চাকরি বলতে শুধুই সরকারি চাকরিকেই মনে করতো। তাই, পাশ করেই একটি সরকারি চাকুরির জন্য আদা-জল খেয়ে লেগে যেতো আর পায়ের জুতা ক্ষয় করতো।

কিন্তু এখন ভিন্ন কথা। সময় পাল্টেছে, প্রতিযোগিতা বেড়েছে কর্মস্থলে। যোগ্যলোকের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে চাকরির সংস্থানও। করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে, বেড়েছে ব্যাংক-বীমা, আধা-সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য-পযুক্তির কল্যাণে নানাবিধ কাজের একটি বিশাল দরজা উন্মুক্ত হয়েছে। প্রাইভেটাইজেশনের কারনেও ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের সংখ্যা বেড়েছে সংখ্যাতীত ভাবে। ফলে চাকুরির খাতও বেড়েছে, সংখ্যাও বেড়েছে।

যোগ্য ব্যক্তিকে এখন আর বসে থাকতে হয় না। চাকুরির একটা ব্যবস্থা হয়েই যায়। চাকুরির রকম, স্থান, মান ইত্যাদি আপনার পছন্দ না হতে পারে, কিন্তু চাকুরি আছে বাজারে।

এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, দেখে-বেছে চাকুরি গ্রহণ করা এবং অধিকতর ভালো সুযোগ পেলে বর্তমান চাকুরির মায়া ত্যাগ করাই হলো উত্তম। কিছু প্রতিষ্ঠানে কাজ আছে, বেতনও ভালো, কিন্তু পদোন্নতি বা যোগ্যতা প্রদর্শনের সুযোগ নেই। চাকুরি করেই যদি খেতে হয়, তবে পেশাদারি আচরণ নিতেই হবে, এবং নিজের ক্যারিয়ার ডিভেলপমেন্ট-এর বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে।

কর্মসংস্থান আর ‘সুযোগ দেবার’ নামে নব-আবিষ্কৃত শোষণ ব্যবস্থাটি হলো, কম বেতনে এবং কম সুযোগে কোন প্রতিশ্রুতিশীল কর্মীকে ধরে রাখা। তাকে এমনভাবে সম্মোহন করা, যাতে সে অন্য চাকুরির সন্ধান না করে। পাঁচ-দশ বছর যাবার পর তার কর্মশক্তি যখন একটি কাজেই আটকে যায়, তখন প্রতিষ্ঠান তাকে আর আটকায় না। কিন্তু তখন তার আর কিছুই করার থাকে না।

তাই এখন সেই পরামর্শ আর আমি নতুন প্রজন্মকে দিই না। তাদেরকে একটিই কথা বলতে চাই: আপনি যে কাজ বা যে পেশা নিতে চান, সেই পেশার সাথে সম্পৃক্ত কাজেই যুক্ত হোন – বেতন না থাকলেও সেটি আপনাকে ক্যারিয়ান গঠনে এগিয়ে নিয়ে যাবে। অগত্যা কোন অড জবে আটকে গেলে, যত দ্রুত সম্ভব ওখান থেকে বের হয়ে আসুন। অনুসন্ধান করুন নিজের যোগ্যতা-ভিত্তিক কাজের।

Do What You Love and
Love What You Do!

কেন স্বীকৃতির আশা করা বৃথা

“আরে ওঠো না, ভাই! তুমি তো সত্যিই মারা পড়বে দেখছি! এই যে আমি তোমাকে সাহায্য করছি, তুমি শক্তি দাও। এক... দুই... তিন।”

“আরে ওঠো না, ভাই! তুমি তো সত্যিই মারা পড়বে দেখছি! এই যে আমি তোমাকে সাহায্য করছি, তুমি শক্তি দাও। এক… দুই… তিন।”

একজন কৃষকের গল্প* বলি, যার একটি ঘোড়া ও একটি ছাগল ছিলো।

একদিন ঘোড়াটি অসুস্থ হয়ে পড়লে কৃষক খুবই উদ্বিগ্ন হলেন।ওটি তার অতি আদরের। তিনি একজন প্রাণী-ডাক্তার ডাকলেন।

ডাক্তার অসুস্থ ঘোড়াকে পরীক্ষা করে বললেন, “ঘোড়াটি ভাইরাস আক্রান্ত হয়েছে। একে তিন দিন পর্যন্ত ঔষধ দিয়ে দেখতে হবে। যদি অবস্থার উন্নতি না হয়, তবে সংক্রমণ এড়ানোর জন্য মেরে ফেলতে হতে পারে।” পাশে থাকা ছাগলটি সবকিছু দেখছিলো।

পরদিন ঘোড়াটিকে ঔষধ দেওয়া হলো।

সবাই চলে গেলে পর, ছাগলটি ঘোড়ার কাছে এসে বললো, “সাহস করো,বন্ধু! গায়ে শক্তি নিয়ে ওঠে দাঁড়াও। নয়তো ওরা তোমাকে ঘুম পারিয়ে দেবে।”

দ্বিতীয় দিনেও ঔষধ দিয়ে তারা চলে গেলো।

ছাগলটি আবারও কাছে এসে বললো, “আরে ওঠো না, ভাই! তুমি তো সত্যিই মারা পড়বে দেখছি! এই যে আমি তোমাকে সাহায্য করছি, তুমি শক্তি দাও। এক… দুই… তিন।”

তৃতীয় দিনে ডাক্তার এসে ঔষধ দিলেন এবং মালিককে বললেন, “আপনার ভাগ্য খারাপ। ঘোড়াটিকে মনে হয় বাঁচানো যাবে না। আগামিকাল ঘোড়াটিকে সত্যিই মাটিতে পুঁতে দিতে হবে, না হলে ভাইরাস ছড়িয়ে মানুষ ও প্রাণী সকলের ক্ষতির কারণ হবে।

তারা চলে যাবার পর ছাগলটি কাছে এসে বললো, “শুনো বন্ধু ঘোড়া! এখন না হলে আর হবে না। তুমি চেষ্টা করো, আমিও শক্তি দিচ্ছি। এই যে…এক…দুই…তিন, হ্যাঁ আস্তে আস্তে শক্তি দাও। আরে বাহ্! তুমি তো পারছো…হ্যাঁ…আরেকটু। হাহ্! এই যে তুমি তো দাঁড়িয়ে গেছো, ভাই! চমৎকার!…তুমি তো অসাধ্য সাধন করলে! এবার দেখো তো হাঁটতে পারো কি না!”

কৃষক হঠাৎ এসে উপস্থিত! তিনি এসে দেখলেন, তার ঘোড়াটি মাঠজুড়ে দৌড়াচ্ছে। এ দৃশ্য দেখে খুশিতে আত্মহারা কৃষক চিৎকার করে বলতে লাগলেন, “তোমরা এসে দেখো…আমার ঘোড়াটি সুস্থ হয়ে গেছে! এটি দৌড়াচ্ছে। আমি মুগ্ধ! ছাগলটিকে জবাই করে আমরা একটি ভোজের আয়োজন করে মজা করবো!”

———————–
ব্যক্তিগত জীবনে এরকম অভিজ্ঞতা পেয়েছি অনেকবার। দেখেছি আরও বেশি। ভালো থাকাটাই সবচেয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভালো করতে থাকাটা জীবনের কঠিনতম সংগ্রামের একটি। কর্মজীবনে যারা গাধার খাটুনি খেটেও যথার্থ মূল্যায়ন পাচ্ছেন না, তবু পৈত্রিক স্বভাব নিয়ে প্রতিষ্ঠানের জন্য শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন, সেসব মানব সন্তানের জন্য গল্পটি উৎসর্গ করছি।

*গল্পটি মূল ইংরেজি থেকে সংগৃহীত। ছবি গুগল থেকে পাওয়া।

 

প্রথম আলো ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া