Tagged: কথা আর কাজ

আমাদের আছে কথা বলার প্রতিভা!

রমজান মাসে ইফতারের মুহূর্তে চারপাশের শান্ত-নিরব পরিবেশটি কেমন লাগে? ফাঁকা রাস্তা, কোথাও কোন হইহুল্লা নেই, সকলেই নিজেদের মধ্যে শান্ত। একটি কর্মোদ্যমী দেশে দিনের বেলার রাস্তাঘাট অনেকটা এরকমই: কোথাও কোন অনাকাঙ্ক্ষিত জটলা নেই, এখানে-সেখানে লোক দাঁড়িয়ে নেই, সকলেই নিজ নিজ কর্মস্থলে কাজে নিমগ্ন।

কিন্তু ইফতার মুহূর্তটি পার হলেই চিত্রটি কেমন? রাস্তায় দাঁড়িয়ে, ওভারব্রিজে জড়ো হয়ে, ফ্লাইওভারে পায়চারি করে, রাস্তার কোনায় বসে আছে মানুষ। কথা বলছে অথবা এমনিতেই দাঁড়িয়ে আছে। হতাশ হয়ে ভাবি, তারা সেখানে কী করে?

পৃথিবীর মানুষ যখন পিঁপড়ের মতো ব্যস্ত হয়ে কাজ করছে, জীবিকার সন্ধান করছে, বিন্দু থেকে সিন্ধু গড়ছে, গড়ে তুলছে শিল্প নগর আর বাসস্থান, তখন আমরা কী করছি?

সারাদিনমান চায়ের স্টলে বসে থেকে মানুষ শুধু কী কথা বলে? বিদেশীদের চোখে আমরা কেমন, সেটা একটু বিবেচনা করলে বুঝতে পারবো আমাদের সার্বিক চিত্রটি অন্যান্য পরিশ্রমী জাতিগুলোর সাথে কতটা বেমানান। এদেশে কর্মরত বিদেশী অতিথিরা আশ্চর্য হয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। এদেশের মানুষগুলো শুধু কথা বলার এত সময় পায় কোথায়? তারা খায় কী?

কোরিয়ান, মালয়েশিয়ান, সিংগাপুরি প্রভৃতি যেসব জাতির জন্ম আমাদেরই সময়ে তারা এদেশকে ভাবতো দুগ্ধমধুপ্রবাহী ও সমৃদ্ধ একটি জাতিগোষ্ঠী হিসেবে। তারা আমাদের সমৃদ্ধিতে ঈর্ষা করতো। কিন্তু আজ তারা আমাদের কর্মদাতা, তারা এদেশের শ্রমিককে কাজ না দিলে আমাদের জাতীয় আয়ে হাত লাগে। তাদের উন্নয়নের খোঁজ নিলে হয়তো আমরা দেখবো যে, গড়ে ওঠার সংগ্রামে তাদের সাপ্তাহিক ছুটিও ছিলো না।

আর আমরা?  ছুটি পেলেই যেন বাঁচি, যেন কাজই জীবনের উদ্দেশ্য নয়, অবকাশে থাকাই আমাদের কাম্য। আমাদের সরকারগুলো ছুটি মঞ্জুর করতে পারলেই খুশি। চাকরির আগে ছুটি ক’দিন, কখন অফিস শেষ হয়, এসব নিয়ে আগেই দর কষাকষি করি। বার্ষিক সাপ্তাহিক পার্বিক ঐচ্ছিক অর্জিত বর্ধিত বাবার জন্ম মায়ের জন্ম মৃত্যু আগমন নির্গমন সকল পর্বের জন্য চাই ছুটি। বৎসরের প্রায় অর্ধেক দিন কাটে আমাদের ছুটিতে।

ছুটি নিয়ে ফিরে যাই কর্মহীনতায় আর সৃষ্টিহীনতায়, গড়ে তুলি অলস আর কর্মবিমুখ প্রজন্ম। আমরা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য কেমন লিগ্যাসি রেখে যাচ্ছি, তা কি একবার প্রশ্ন করি? কীসের কৃতীত্ব আমরা রেখে যাচ্ছি, যা নিয়ে তারা বড় হবে? যাকে তারা বাড়িয়ে তুলবে?

পরিহাসের বিষয় একটি বিষয়ে আমরা পারদর্শী: আমাদের আছে কথা বলার প্রতিভা। দিনে কথা রাতে কথা অফিসে কথা বাথরুমে কথা ঘুমানোর সময় কথা জেগে ওঠার সময় কথা হাঁটতে হাঁটতে কথা দৌড়াতে কথা সাঁতরাতে কথা ইয়ে করতে করতে কথা।  আমরা জানি না আমাদের কথা থেকে মুনাফা করে নিচ্ছে ভিনজাতিরা। বিনিয়োগের চেয়েও অধিক মুনাফা তারা পাঠায় তাদের মাতৃপ্রতিষ্ঠানে! ঠিক ইস্ট ইন্ডিয়ান কোম্পানিগুলো যা করতো আমাদের ওপর একসময়!

আমাদের কথা থেকে ব্যবসা করার জন্য তারা বিক্রি করছে কথা বলার মেশিন, স্থাপন করছে অগণিত কথাকেন্দ্র!  এক কোটি, দু’কোটি, তিন কোটি, চার কোটি এভাবে তারা আমাদের কথা-বলা জনতার সংখ্যা হালনাগাত করছে।  প্রেরণা দিচ্ছে আরও কথা বলার। আমরা হয়ে যাচ্ছি একটি সম্ভাবনাময় কথা-বলা জাতি! কবে আমরা কথা বলা থামিয়ে দিয়ে কাজ করতে শুরু করবো?