Tagged: এনামুল হক মানিক

:::গ্রন্থ আলোচনা: কাশফুল দোল খায়/এনামুল হক মানিক

0011-crop

 

সাহিত্যসাধনা একটি বৃদ্ধিবৃত্তিক কর্ম। এরজন্য প্রয়োজন নিয়মিত জ্ঞানতপস্যা।  প্রয়োজন সার্বজনীন জ্ঞানের চর্চা এবং জ্ঞানের সকল শাখায় সুগভীর অনুসন্ধান।  জ্ঞান ও আত্মঅনুসন্ধানের এই কঠিন সাধনায় ঈশ্বরবন্দনাকে যুক্ত করতে পারা একটি কঠিন এবং প্রথাবিরোধী কর্ম। যদিও জ্ঞানের সাধনার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে রয়েছে ধর্ম এবং দর্শন, তবু অনেকে একে সেকেলে মনে করেন।  এর প্রধান কারণ হলো এই যে, ধর্মচর্চা করলে মানুষ হিসেবে আমাদের দোষত্রুটিগুলো দৃষ্টিগোচর হয়ে পড়ে।  তাই জ্ঞান ও শিল্প সাধনার মধ্যে ঈশ্বরবন্দনা প্রায় অনুপস্থিত।  এই অপ্রীতিকর কাজটি করতে সচেষ্ট হয়েছেন এনামুল হক মানিক, তার ‘কাশফুল দোল খায়’ নামক প্রথম কাব্যগ্রন্থে।  প্রথম হলেও লেখায় ও ভাবপ্রকাশের মধ্যে একজন সুদক্ষ পর্যবেক্ষককে আমি দেখতে পেলাম। ধন্যবাদ শাহআলম বাদশা ভাইকে, বইটিতে আমার মতামত দেবার সুযোগ করে দেবার জন্য।

 

কবি এনামুল হক মানিক, উল্লেখিত গ্রন্থে ঈশ্বরের অস্তিত্ব তথা ঈশ্বর-বন্দনায় সচেষ্ট হয়েছেন বেশ যুক্তিসঙ্গতভাবেই।  প্রকৃতির সৌন্দর্য্যের মধ্যে তিনি ঈশ্বরের উপস্থিতি উপলব্ধি করেছেন।  ভোরের আভার মধ্যে তিনি খুঁজেছেন তার প্রিয়নবীকে। তার ‘কাঁদতে হবে খুব’ ছড়াটিকে কবিতা বলা উচিত।  তিন পদের কবিতায় পাঠকের জন্য আত্মসংশোধনের অমূল্য চেতনার সৃষ্টি করেছেন:

এই জীবনে তুমি যতো/ পেয়েছো আঘাত

খুঁজে দেখো বেশি দায়ী/তোমার নিজের হাত  (কাঁদতে হবে খুব/৪৬)

 

‘দীর্ঘ সফর’ ছড়া-কবিতায় কবি মৃর্ত্যু এবং তৎপরবর্তী জীবনের বিষয়ে পাঠককে সতর্ক করেছেন।  একই মর্মবেদনা সৃষ্টি করেছেন তার ‘কোথায় যাবো’ শীর্ষক লেখাটিতে:

কোথায় আছি কোথায় ছিলাম/ কোথায় যাবো শেষে

হিসেবটা কি তোমার-আমার/ তৈরি করা আছে? (কোথায় যাবো/ ৩৭)

 

‘কাশফুল দোল খায়’ এবং ‘সেরাসৃষ্টি’ ছড়াদ্বয়েও কবি সৃষ্টির বন্দনা করে ঈশ্বরের অস্তিত্বে আলোকপাত করেছেন-

 

শিশিরবিন্দুরা জমে সবুজঘাসে

মিষ্টি রোদের ছোঁয়ায় নিসর্গ হাসেে/ এসবই মহান আল্লাহর দান।  (কাশফুল দোল খায়/৭)

 

সৃষ্টি করলে আসমান জমিন/ হরেক রকম ফুল

সবার সেরা সৃষ্টি তোমার/ মুহাম্মদ রাসুল।  (সেরা সৃষ্টি/ ৩২)

 

‘কাশফুল দোল খায়’ নামটি শুনলে একটি ছড়াগ্রন্থের কথা মনে আসবে; শিশুগ্রন্থের কথাও মনে পড়তে পারে।  কিন্তু কবি তার জীবনযাত্রায় প্রাপ্ত সত্য ও অভিজ্ঞতাকে ছড়ার মালায় একত্রিত করার প্রয়াস পেয়েছেন উক্ত গ্রন্থের প্রতিটি ছড়া কবিতায়।  গ্রন্থের নামের প্রতি সুবিচার করেই হোক, অথবা ফুলের প্রতি কবির ভালোবাসার কারণেই হোক, ফুলকে কেন্দ্র করে বেশকিছু ছড়া তিনি উপহার দিয়েছেন। যথা- ফুল, হরেক রকম ফুল, ভালো লাগে, কাশফুল দোল খায় প্রভৃতি।

একই গ্রন্থে মহান একুশ, বাংলা ভাষা তথা স্বদেশ নিয়েও রয়েছে কিছু চমৎকার ছড়া-কবিতা।  প্রাত্যাহিক জীবনের দূষণগুলোও কবির দৃষ্টি এড়ায়নি।  নাগরিক জীবনের দৃশ্যমান আন্তরিকতার মধ্যেও যে ফরমালিনের মতো দূষণ লুকিয়ে আছে। বিষয়টি খুব সুন্দর এবং রসময় করে উপস্থাপন করেছেন তার ‘ফরমালিন’ এবং ‘গোলকধাঁধাঁ’ কবিতায়।  ‘ফরমালিন’ ছড়া থেকে একটি উদ্ধৃতি না দিয়ে পারছি না-

 

তিলে তিলে মারার চেয়ে/ মারো এককালীন

আর দিও না ভাইরা আমার/ খাদ্যে ফরমালিন।  (ফরমালিন/২১)

 

ব্লগে এনামুলক হক মানিকের বিচরণ থাকলেও, ব্লগ পোস্ট হিসেবে তার লেখা বেশি পড়া হয়ে ওঠে নি। এই না পড়ার পেছনে প্রথমত দায়ি সময়ের স্বল্পতা, তারপর দায়ি মানুষ হিসেবে আমার ব্যক্তিগত দুর্বলতা।  লেখা ও মন্তব্যের মধ্য দিয়ে যাদের সাথে ভাবের বিনিময় বেশি, তাদের লেখায় নজর দিতে দিতেই অবসর সময়টুকু শেষ হয়ে যায়। তবে দু’একটি লেখা যে পড়ি নি, বা মন্তব্য দেই নি – তা কিন্তু নয়।  পর্যাপ্ত না পড়ার কারণে একটি উপকার হয়েছে তা হলো, পুস্তকের পাতায় এনামুল হক মানিকের লেখাগুলোকে আরও স্বতন্ত্রভাবে দেখার সুযোগ হয়েছে।  একজন সহব্লগার হিসেবে তার লেখা পড়লে হয়তো, আমার মূল্যায়ন কিছুটা পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারতো।

 

শিশু সাহিত্যিক ও গীতিকার এবং আমাদের ব্লগার-বন্ধু শাহআলম বাদশা একটি সুন্দর মূল্যায়ন করে দিয়েছেন উক্ত বইয়ের ব্যাক-কাভারে। তাতে গ্রন্থটির সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্লগার হিসেবে আমি গর্বিত যে গতানুগতিক ধারার সাথে পাল্লা দিয়ে ‘অতি সাধারণ আচ্ছাদন’ নিয়ে কিছু অসাধারণ লেখা বের হয়ে আসছে আমাদের ব্লগারকুলের পক্ষ থেকে। এটি আমাকে বিশেষভাবে গর্বিত করেছে।  এখন থেকে এনামুল হক মানিকের লেখাগুলোতে আরও গুরুত্ব দিয়ে দৃষ্টিপাত করবো, এই প্রতিশ্রুতি দিলাম।  সহব্লগারদেরকেও একই অনুরোধ জানাবো।  অনুরোধ করবো তার ‘কাশপুল দোল খায়’ গ্রন্থটি সংগ্রহ করে উপরোক্ত মূল্যায়নকে যাচাই করার জন্য-

 

কাব্যগ্রন্থ:  কাশফুল দোল খায়

গ্রন্থকার:  এনামুল হক মানিক

প্রচ্ছদ:  আফসার নিজাম

পরিবেশক:  সাহস পাবলিকেশনস

গ্রন্থ পরিচিতি:  শাহ আলম বাদশা

মূল্য:  ৭৫