Tagged: ইন্টারনেট অফ থিংস

ইন্টারনেট অফ থিংস: ‘বস্তুর সাথে ইন্টারনেটের সংযোগ’ কী এবং কেন?

উৎস: থ্রিজি ডট কো ডট ইউকে

উৎস: থ্রিজি ডট কো ডট ইউকে

 

ইন্টারনেটে আজ পর্যন্ত যত তথ্য মজুদ আছে তার অধিকাংশই মানুষের স্পর্শের মাধ্যমে হয়েছে। মানুষ হয় টাইপ করেছে, অথবা রেকর্ড বাটনে চাপ দিয়েছে, অথবা ক্যামেরায় চাপ দিয়ে ‍ছবি তোলার মাধ্যমে ইন্টারনেটের বিশাল তথ্যভাণ্ডার সৃষ্টি করেছে। অর্থাৎ ইন্টারনেট বা কম্পিউটারের কার্যকারিতা পুরোমাত্রায় মানুষের ওপর নির্ভরশীল।

 

মানুষ মাত্রই ভুল। মানুষের অসীম চাহিদা, কিন্তু তার একক ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত, ত্রুটিপূর্ণ এবং নীতিভ্রষ্ট। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণে মানুষের চাহিদার প্রকার ও প্রকৃতি বেড়েছে। ফলে মানুষের স্পর্শের ওপর নির্ভরশীল থেকে বর্তমান বিশ্বের প্রযুক্তির চাহিদার যোগান দিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

 

ইন্টারনেটের সুবিধাকে মানুষের হাতের স্পর্শ থেকে স্বাধীন করার কাজটি কয়েক দশক ধরেই চলে এসেছে। এই প্রচেষ্টার তাত্ত্বিক নামই হলো ‘ইন্টারনেট অভ্ থিংস’ বা বস্তুর সাথে ইন্টারনেট বা ‘বস্তুগত ইন্টারনেট’।  সংক্ষেপে আইওটি।

 

ব্রিটিশ উদ্যোক্তা কেভিন অ্যাশটন তার একটি উপস্থাপনায় সর্বপ্রথম ‘ইন্টারনেট অভ্ থিংস’ কথাটির ব্যবহার করেন (১৯৯৯)। যদিও ইন্টারঅ্যাকটিভ এবং ইন্টারনেট-যুক্ত যন্ত্রের ধারণাটি আরও আগেই আলোচনায় এসেছে। ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কার্নেগি মিলান বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী কোক সরবরাহকারী মেশিন আবিষ্কার করে বিশ্বের সর্বপ্রথম ইন্টারনেট-কানেকটেড যন্ত্রের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

 

 

▶ ইন্টারনেট অভ্ থিংস কী

 

ইন্টারনেট অভ্ থিংস-এর প্রধান দিকটি হলো এই যে, প্রতিটি বস্তুরই সংযোগ করার ক্ষমতা থাকবে যেন সেটি তথ্য আদান-প্রদান করার মাধ্যমে ব্যবহারকারীকে কোন সিদ্ধান্ত নেবার সুযোগ দিতে পারে। যেমন: ফ্রিজে রাখা কোন অবশ্য প্রয়োজনীয় খাবার জিনিস শেষ হয়ে গেলে, ফ্রিজ তার নিজস্ব বিল্টইন সেন্সরের মাধ্যমে বুঝতে পারবে এবং মালিককে মনে করিয়ে দিতে পারবে।

 

‘থিংস’ বা বস্তু হতে পারে মানুষের ভেতরেরই একটি হৃদকম্পন পরিমাপক যন্ত্র যার মাধ্যমে সেই মানুষটি চিকিৎসকের সাহায্য ছাড়াই নিজের হার্টের অবস্থা বুঝতে পারবে।

‘থিংস’ হতে পারে গাড়ির চাকায় যুক্ত একটি সেন্সর, যার মাধ্যমে ড্রাইভার গাড়ির চাকায় গ্যাসের চাপ বুঝতে পারবে।

একটি স্মার্ট মিটার কেমন হতে পারে?  এটি নিজে থেকেই গাড়ির জ্বালানির পরিমাণ বুঝে আরেকটি জ্বালানি সরবরাহকারী যন্ত্রের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে।

শুধু সেন্সর নয় যোগাযোগ সক্ষমতা থাকতে হবে। প্রতিটি যন্ত্রেরই একটি আইপি অ্যাড্রেস থাকবে।  তাতে এটি আরেকটি যন্ত্র অথবা মানুষের সাথে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারবে।

 

 

▶ ইন্টারনেট অভ্ থিংস-এর ব্যবহার

 

সুন্দরবনের গাছ কাটা ও স্থানান্তর করা নিষিদ্ধ। হরিণ শিকার তো আরও নিষিদ্ধ। কিন্তু দুর্গম এবং হিংস্র প্রাণীর অভয়ারণ্য সুন্দরবনে চোর হয়তো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেখানে যাবেই।  কিন্তু আমাদের বনরক্ষকরা কি ততটুকু ঝুঁকি নেবেন?  তাদের তো কিছুই পাবার নেই!  জিপিএস-এর মাধ্যমে একাজটি সহজ করে দেবে ইন্টারনেট অভ্ থিংস।  এটি একই ক্ষীপ্রতায় সরকারের সংশ্লিষ্ট সকল পর্যায়ের কর্মকর্তার কম্পিউটারে ও স্মার্টফোনে প্রমাণসহ বার্তা পৌঁছে দেবে।  নিকটস্থ পুলিশ তৎক্ষণাৎ নিজের করণীয় ঠিক করতে পারবে।

 

রেলক্রসিংয়ে প্রায়ই মানুষ মারা যাচ্ছে এবং যানবাহনের ক্ষতি হচ্ছে।  রাস্তার মোড় মানেই যানজট, কারণ পুলিশ সময়মতো সিগনাল দিতে পারে না, অথবা ভিআইপিদেরকে রাস্তা দেবার জন্য উল্টোদিকে গাড়ি চলতে দিচ্ছে। সিগন্যাল দিলেও চালকেরা সেটি মানতে চায় না, অথবা না মানলেও রক্ষা পায়।  এমনও হয়েছে, পুলিশ বা যাত্রীর ওপর গাড়ি তুলে দিয়েছে।  মানুষ মানুষকে মানতে চায় না, ভয়ও পায় না। ফলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় যন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এখানে আইওটি’র কোন বিকল্প নেই, কারণ এখানে মানুষ মাত্রই ভুল এবং বিলম্ব।

 

সার্বিকভাবে কৃষি উন্নয়ন, ভবন ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবহন ব্যবস্থাপনাসহ স্মার্ট সিটি বিনির্মাণে ইন্টারনেট অভ্ থিংস-এর ব্যবহার দেখা যাবে।

 

উৎস: পোস্টস্কেইপ ডট কম

উৎস: পোস্টস্কেইপ ডট কম

 

 

▶ ইন্টারনেট অভ্ থিংস-এর আরও কিছু ব্যবহার:

 

১) পরিবারের বৃদ্ধ সদস্যটির দেখাশোনা।  তারা আমাদের বৃদ্ধ মা অথবা বাবা, যাদেরকে রেখে এসেছি গ্রামের বাড়িতে অথবা শহরেরই বাড়িতে। তার শরীরে কোন আকষ্মিক পরিবর্তনের কারণে তার চলাফেরায় পরিবর্তন আসলে অফিস থেকেই সেটি আঁচ করতে পারা যাবে।  পরিচর্যাকারী হয়তো সময়মতো ওষুধটুকু খাওয়াতে পারে নি অথবা দুপুর খাবারটুকু সময়মতো খেতে দিতে পারে নি।  মানুষের ভুল হতেই পারে!

২) আপনার ওয়ালেট অথবা মোবাইল ফোনটি হারিয়ে গেছে।  অথবা গাড়ির চাবিটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।  সকলের ব্যস্ততম মুহূর্তে মাথায়ও কাজ করছে না।  কীভাবে সেগুলোকে ট্র্যাক করবেন?  সমাধান আইওটি!

৩) নিজের বাসগৃহকে দুর্ঘটনার কবল থেকে মুক্ত রাখতে কে না চায়!  গ্যাসলাইন অথবা বিদ্যুৎলাইনের ত্রুটির কারণে, অথবা রান্নার চুলাটি সময়মতো বন্ধ না করার কারণে হঠাৎ অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকতে খবর দেবে আইওটি।  আপনি যেখানেই থাকুন না কেন!

৪)  ট্রাফিক ব্যবস্থপনার মতো, শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং লাইটিং সিস্টেমের ব্যবস্থা এমন কিছু কাজ যা নিয়মিত না করলে একজনের জন্য অনেকের সমস্য হয়।  লাইটিং সিস্টেমের ব্যবস্থাপনা শুধু সূর্যাস্তের সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়, আবহাওয়ার কারণে অনেক সময় বিকালেই রাতের অন্ধকার নেমে আসে।  অন্যদিকে ভূমিকম্প বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো ভয়ংকর প্রাকৃতিক দুর্যোগে রাতের আধারেও লাইটিং সিস্টেম বন্ধ করতে হয়। এসবের জন্য চাই আইওটি, অর্থাৎ যন্ত্রের সঙ্গে যন্ত্রের সংযোগ

 

 

▶ লেখককের কথা

 

আইওটি কোন নতুন বিষয় নয়।  তবে এর ব্যবহার ও কার্যকারীতা সম্পর্কে ক্রমেই নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সৃষ্টি হচ্ছে।  উন্নয়নকামী দেশগুলোর জন্য আইওটি এখনও অনেকটাই অধরা।  বাংলাদেশের বর্তমান সরকার আইওটি’র সাথে নগর ব্যবস্থাপনাকে সংযুক্ত করার চেষ্টা করছে।

আইওটি’র প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো,  সময়নিষ্ঠতা, ত্রুটিহীনতা এবং গুণগতমানের ধারাবাহিকতা।  আপাত দৃষ্টিতে এর কার্যকারিতা অসীম। তবে অনুভূতিপ্রবণ মানুষের চাহিদা ও গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রে এটি কতটুকু যত্মশীল, সেটি সময়ই বলে দেবে।

 

বর্তমান প্রবন্ধটিতে ইন্টারনেট অভ্ থিংস সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণাগুলো উপস্থাপন করা হলো।  উদ্দেশ্য, সকল পর্যায়ের পাঠককে ‘ইন্টারনেটের সঙ্গে বস্তুর সংযোগ’ সম্পর্কে মৌলিক ধারণা দেওয়া। তাত্ত্বিক আলোচনা যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।  পরিবর্তি কোন লেখায় আরও বিস্তারিত তুলে ধরার পরিকল্পনা আছে।  হাইপারলিংক দিয়ে প্রাসঙ্গিক সূত্র উল্লেখ করা হয়েছে।

 

উৎস: ক্রসবার-ইন্ক ডট কম

উৎস: ক্রসবার-ইন্ক ডট কম

 

*আইওটি নিয়ে বাংলা ভাষায় প্রথম প্রবন্ধ: বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর

 

 

 


নতুন বিষয় নিয়ে লেখা আরও কয়েকটি প্রবন্ধ:

ব্লু চিপ কী: ব্লু চিপ কোম্পানিগুলো কেন এত নির্ভরযোগ্য?

◀ নীলসমুদ্র/ লালসমুদ্র কী? কীভাবে প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতিতে লাভবান হওয়া যায়?