Tagged: ইংরেজি ৩য় পত্র

ইংরেজি ৩য় পত্র: শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইংরেজির ভীতি দূর করার পরীক্ষিত উপায়

১.  ইংরেজি ৩য় পত্র কোথা থেকে আসলো

গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের বাইরে পড়ালেখার সুযোগ খুবই সীমিত। অনেক শিক্ষার্থী বাড়িতে পড়াশুনার অনুকূল পরিবেশ পায় না। প্রাইভেট পড়াও সকলের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না।  ফলে গণিত এবং ইংরেজির মতো জটিল বিষয়গুলোতে তাদের আজন্ম ভয়। পরিবেশ এমন দাঁড়িয়েছে যে, নিজের চেষ্টাটুকুও করার প্রেরণা তারা পায় না। অতএব, শুধু দু’একটি বিষয়ে দুর্বলতার জন্য তারা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়।

সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, পল্লী অঞ্চলের যেসব শিক্ষার্থী পাবলিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়, তাদের অধিকাংশই (প্রায় ৮০ শতাংশ) ইংরেজিতে দুর্বলতার কারণে।  গণিত হয়তো চর্চা করলেই হয়ে যায়, কিন্তু ইংরেজি বিষয়ে বাস্তব কোন চর্চার সুযোগ তাদের নেই। প্রাইভেটে যা পড়ানো হয়, তাও শুধুই পরীক্ষা পাশকে লক্ষ্য করে।  প্রায়োগিক জ্ঞান তাদের প্রায় শূন্যে।  অধিকাংশ শিক্ষক প্রায়োগিক ধারণা রাখেন না, কারণ তারাও পরীক্ষা পাশের জন্যই ইংরেজি শিখেছিলেন। এভাবেই এগিয়েছে আমাদের বিদ্যালয়ভিত্তিক ইংরেজির চর্চা!

তবু এদের ভেতর থেকেই যারা মেধাবী শিক্ষার্থী হয়ে বেরিয়ে এসেছে, তাদের ইংরেজি দক্ষতার বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে স্নাতক পাশের পর। উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত তাদের ইংরেজির চর্চা পরীক্ষা পাশ পর্যন্তই আবদ্ধ থাকে।

এর পরিণতি সকলেরই জানা।  উচ্চমাধ্যমিক কেন, স্নাতক পাশ করেও আমাদের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি পত্রিকার পাঠোদ্ধার করতে পারেন না, অথবা ইংরেজিতে স্বাধীনভাবে কথোপকথন চালিয়ে যেতে পারে না।  ইংরেজিতে একটি দরকারি চিঠি বা ইমেল লেখতে গেলে তাদের আঙ্গুল ভাঙ্গে।

এসবই হলো, পরীক্ষামুখী শিক্ষাব্যবস্থার ফল।  আমাদের দেশে শিক্ষার্থীরা মূলত পরীক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত। পরীক্ষাই তাদের বিদ্যার্জনের একমাত্র লক্ষ্য, জীবনে প্রয়োগ নয়।

বাস্তবক্ষেত্রে এর পরিণতি আরও ভয়াবহ। ইংরেজি বিষয়টি বাধ্যতামূলক হলেও কর্মক্ষেত্রে গিয়ে অনেক স্নাতক/স্নাতকোত্তর পাশ শিক্ষার্থী ইংরেজিতে যোগাযোগ রক্ষা করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে।  ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা দিয়ে অনেকে উতড়ে যায়, কিন্তু অনেকেই ছাত্রজীবনের ভীতি কাটিয়ে ওঠতে পারে না।

ইংরেজি ১ম পত্র এবং ২য় পত্রে শিক্ষার্থী যতই ভালো করুক, বাস্তব ক্ষেত্রে তাদের জ্ঞান পরীক্ষার খাতা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। এর কারণ হলো, তারা সীমিত কয়েকটি অধ্যায় পড়ে আর কয়েকটি রচনা ও দরখাস্ত মুখস্থ করলেই ইংরেজিতে পাশ করতে পারে।  কমিউনিকেটিভ ইংরেজি প্রবর্তন করার পরও গাইড বইয়ের বহুল প্রচলনের কারণে শিক্ষার্থীরা যথেষ্ট চর্চা ছাড়াই পরীক্ষার জন্য ‘দারুণ প্রস্তুতি’ গ্রহণ করতে পারে।  পরীক্ষায় হয়তো এ+ গ্রেইডও পেয়ে যায়।  তারপরও তারা বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষা অতিক্রম করতে পারে না।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ইংরেজি প্রথম এবং দ্বিতীয় পত্রকে প্রয়োগমুখী করতে পারে নি। এটি শুধু ইংরেজির ক্ষেত্রে নয়, সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কর্তৃপক্ষ  হয়তো করতে চেয়েছে, কিন্তু শিক্ষক আর পুস্তক ব্যবসায়ীদের যৌথ অসহযোগিতার কারণে ইংরেজি শিক্ষা প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারে নি।

 

এখানে আরেকটি সমস্যা হলো, শিক্ষার্থীরা ‘শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায়’ এই ঘাটতির কারণ বুঝতে পারে না। বুঝতে চায়ও না।  তাদের দরকার পরীক্ষায় পাশ এবং তাদের শিক্ষকও সেপথই দেখায়। এ ত্রুটি পদ্ধতিগত।  এককভাবে শিক্ষকদেরকে দায়ি করা যায় না।

 

২.  ইংরেজি ৩য় পত্রের প্রেক্ষিত

গ্রামীণ এলাকার পিছিয়ে-পড়া শিক্ষার্থীদের অসচেতন ঘাটতিকে পূরণ করার জন্য ইংরেজি ৩য় পত্রের প্রচলন করা হয়েছে। অনেকটা পরীক্ষামূলকভাবেই এ পদ্ধতির শুরু। শিক্ষার্থীকে পরিপূর্ণভাবে ইংরেজি শিক্ষাদানে ১ম পত্র এবং ২য় পত্রের ঘাটতির পটভূমিতে ২০০৫ সালে ইংরেজি ৩য় পত্রের শুরু হয় একটি গ্রামীণ বিদ্যালয়ে।

ঘাটাইলের (টাঙ্গাইল) গুডনেইবার্স হাই স্কুল এবং প্রতিবেশী প্রাইমারি স্কুলে তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ইংরেজি ৩য় পত্র বাধ্যতামূলক করা হয়।  ফলে তৃতীয় শ্রেণী থেকেই শিক্ষার্থী তার শিক্ষকের সাথে একটু একটু করে ইংরেজিতে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে।  সুুযোগ পেয়েছে না বলে বলতে হয়, ইংরেজি বলতে তারা বাধ্য হয়েছে।

পাঠ্যপুস্তকের (১ম পত্র) বিষয়কেই অনানুষ্ঠানিক পরিবেশে উপস্থাপন করা হয়েছে শিক্ষার্থীদের কাছে। অতিরিক্ত বিষয় হওয়াতে, এটি তাদের মানসিক চাপের কারণ হয় নি। কিন্তু আনন্দের বিষয় হয়েছে, কারণ পরীক্ষা পদ্ধতির সরলতা।

ইংরেজি ৩য় পত্রে শিক্ষককে প্রশ্ন তৈরি আর উত্তরপত্র মূল্যায়ন  ছাড়া বাড়তি কোন কিছুই করতে হয় না। সিলেবাস এবং প্রশ্ন সম্পর্কে পূর্বেই ধারণা দেবার কারণে শিক্ষার্থীরা নিজে থেকেই প্রস্তুতি নিতে পারে।

ইংরেজি ৩য় পত্রের আরেক নাম প্রাকটিস ইংরেজি বা প্রায়োগিক ইংরেজি। প্রথম পত্রের (সাহিত্য) সিলেবাস থেকে ‍পরিকল্পনা করা হয়েছে প্রাকটিস ইংলিশ-এর। এর দু’টি অংশ ক) মৌখিক পরীক্ষা এবং খ) লিখিত পরীক্ষা, ‘আনসিন’ অংশ থেকে।

একই পাঠ্য পুস্তক থেকে অতিরিক্ত পরীক্ষা দেবার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষার্থীরা যে উপকারটি পায়, তা হলো পাঠ্য বিষয়ের ওপর তাদের স্বাভাবিক আকর্ষণ।  ফলে ১ম এবং ২য় পত্রে তাদের অকৃতকার্য হবার সম্ভাবনাও আর থাকে না।

ঘাটাইলের স্কুলটিতে ইংরেজি ৩য় পত্র প্রচলনের এক বছর পরই দেখা গেলো যে, ইংরেজি বিষয়ে অকৃতকার্যতার হার কমে যাচ্ছে। পাবলিক পরীক্ষায় প্রস্তুতি গ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা বলতে শুরু করলো, “ইংরেজিতে আমার ফেইল করার কোন আশংকা নেই। আমার ভয় ‘অমুক বিষয়ে’ বা গণিতে ইত্যাদি…”  তখন তাদের ভয় কেবল একটি বিষয়ে নেমে আসে, সেটি হলো গণিত।

স্ব স্ব শ্রেণীর ইংরেজি বিষয়ের ওপর যে শিক্ষার্থীদের ভয়টুকু কেটেছে, এটিই ছিল ৩য় পত্রের প্রাথমিক সুফল। উদ্দীষ্ট সুফল হলো, কথা বলতে পারা এবং ইংরেজিতে শব্দভাণ্ডার সৃষ্টি করা।  পরবর্তি অনুচ্ছেদগুলোতে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

 

English 3rd Paper

৩.  উদ্দেশ্য/ প্রত্যাশিত উপকারিতা

ইংরেজি ৩য় পত্রের সুফল ইতোমধ্যেই আলোচনা করা হয়েছে। অতি সংক্ষেপে বললে, ইংরেজি তৃতীয় পত্রের উদ্দেশ্যগুলো হলো নিম্নরূপ-

ক) ইংরেজি পাঠ্যবিষয়ে শিক্ষার্থীর উপলব্ধি বা বোধশক্তি বৃদ্ধি করা

খ) শিক্ষার্থীকে প্রায়োগিক ইংরেজিতে দক্ষ করে তোলা

গ) পরীক্ষা পাশের চাপ থেকে মুক্ত থেকে শেখার জন্য ইংরেজির চর্চাকে উৎসাহিত করা

ঘ) আত্মঅধ্যয়নে উৎসাহিত করে ইংরেজির প্রতি শিক্ষার্থীর সাধারণ ভীতি দূর করা এবং

ঙ) ইংরেজির ভিত্তি মজবুত করে ইংরেজি শিক্ষকের জন্য শ্রেণীকক্ষের পাঠদান সহজতর করা।

 

৪.  প্রক্রিয়া/ প্রয়োগের পদ্ধতি

  • মোট নম্বর ১০০। দু’টি সমান ভাগ:  লিখিত ৫০ এবং মৌখিক ৫০।
  • মৌখিক ৫০। ওরাল টেস্ট। ১৫টি প্রশ্ন, মান ৩ =৪৫। আচরণে ৫।  মোট ৫০।  একটি পরিপূর্ণ উত্তরের জন্য ৩।  প্রশ্ন বুঝে ‘মোটামুটি’ সঠিক উত্তর দিতে পারলে ২।  উত্তরে যদি বুঝা যায় প্রশ্নটি শিক্ষার্থী বুঝতে পেরেছে তবে ১ নম্বর পাবে।  এবিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশ আছে।
  • লিখিত ৫০।  কমপ্রিহেনসিভ টেস্ট। শূন্যস্থান পূরণ ২০, সত্যমিথ্যা ১০, শব্দার্থ ১০, বাক্যতৈরি ৫, শ্রোতলিপি ৫ =৫০।
  • মৌখিক এবং লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরি করা হয় সংশ্লিষ্ট শ্রেণীর ইংরেজি ১ম পত্রের ‘পাঠদানকৃত’ অংশ থেকে।
  • লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরি এবং পরীক্ষকদের আচরণ নিয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা আছে। এর মাধ্যমে পরীক্ষার বস্তুনিষ্ঠতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা হয়।

 

৫.  অভিজ্ঞতা

চালু হবার পর পাঁচ বছর এক নাগারে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।  শিক্ষার্থীদের ইংরেজির ভিত শুধু মজবুত হয়, তা নয়।  তাদের ভয় কেটে যায় স্থায়িভাবেই।  অসচেতন দুর্বলতা অসচেতনভাবেই দূরীভূত হয় ইংরেজি ৩য় পত্রের মাধ্যমে।

যারা ওই পাঁচ বছরের মধ্যে লেখাপড়া করেছিল, তারা উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ে ভালো ফলাফল করেছে।  অনেকেই ইংরেজি বিষয়ে ‘সম্মান’ পড়ার প্রেরণা পেয়েছে এবং ভালো ফলাফল করেছে।

এরই মধ্যে পাশ্ববর্তি প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি ৩য় পত্র শুরু করেছে। wisdom-valley

অভিজ্ঞতা বললে এই প্রবন্ধ শেষ করা যাবে না।  একটি গবেষণার বিষয় হতে পারে।  তবে পরবর্তি কোন পোস্টে এবিষয়ে আরও লেখার চেষ্টা করবো।

 

 


লেখার সূত্র:  ইংরেজি বিষয়ে ৪বছরের প্রত্যক্ষ শিক্ষকতা,  ৮ বছর বিদ্যালয় পরিচালনা এবং ইংরেজি শিক্ষকদের সংগঠন পরিচালনার সময়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধান।  ইংরেজি ৩য় পত্র একটি প্রয়োগসিদ্ধ পদ্ধতি।

 

 

ইংরেজি ৩য় পত্রের বয়স তখন তিন।

ইংরেজি ৩য় পত্রের বয়স তখন তিন।