Tagged: আন্দামান নিকোবর; ভ্রমণ

আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে সংঘটিত নির্যাতনে বাঙালি বিপ্লবীদের হিস্যা

5458d23192142

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পূর্বের সময় পর্যন্ত আন্দামান ছিলো এক অপার্থিব নরক। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহীদের ধরে এনে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের গভীর জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে এসেছিলো ইংরেজরা। সেখানে নিরাশ্রয় অবস্থায়, অসুখে, অভুক্ত অবস্থায় হিংস্র পশুর আক্রমণে বেশির ভাগ বন্দীর মৃত্যু হয়। ম্যালেরিয়া, কলেরা, প্লেগ ইত্যাদি রোগে দু’মাসেই মৃত্যুবরণ করেন ২৯২ বন্দী। তাছাড়া অবিভক্ত ভারতের মুক্তিপিপাসু হাজার হাজার বিপ্লবীকে জোর করে আন্দামানে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। ১৯০৬ সালে সেলুলার জেলটি নির্মিত হয়। উপমহাদেশের প্রতিটি বিপ্লবের সাথে যেমন বাঙালি জড়িত, তেমনি আন্দামান-নিকোবর দ্বীপমালায় সংঘটিত ব্রিটিশদের নারকিয় নির্যাতনেও ছিলেন বাঙালি সন্তান। তাদের উত্তরসুরীরা এখনও সেখানে বসবাস করছে। ভ্রমণের জন্য পিপাসু হয়ে আছি সেই কত বছর ধরে। এই পিপাসা মেটাতে গিয়ে যা কিছু অনুসন্ধান করেছি, তারই সংক্ষিপ্ত রূপ বর্তমান লেখাটি।

.

মিথিকেল ভ্যালি:

ইংরেজ শাসক কর্তৃক নির্বাসিত বন্দীদের কাছে আন্দামানকে মনে হতো পৃথিবীর বাইরের এক দেশ। যেন পুরাণ থেকে ওঠে আসা এক উপত্যকতা। একটি পৌরাণিক উপত্যকা – মিথিকেল ভ্যালি।

.

কালাপানি:

ভারতবর্ষের লোকজনের কাছে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ‘কালাপানি’ নামেই অধিক পরিচিত ছিলো। আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি কালো পানিতে ছিলো হাঙরের বসবাস। কেউ সাঁতার কেটে ভয়ঙ্কর ওই পানি ও মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ফিরে আসা ছিলো অসম্ভব ও অকল্পনীয়। ব্রিটিশরাজের নির্যাতন ও অভিশপ্ত বন্দীত্ব থেকে বাঁচার জন্য তবু অনেক কয়েদি মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে ঝাপ দিতো কালো পানিতে। আর বরণ করতো নিশ্চিত মৃত্যু – কারও দেরিতে কারও তৎক্ষণাৎ। যে কারণেই মৃত্যু হোক, বন্দীদের শেষ আশ্রয় ছিলো এই কালাপানি।

.

মহারাজ:

মহারাজ নামের জাহাজটি ব্যবহার করা হতো আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের জিনিসপত্র ও কয়েদি বহন করার কাজে। কোন সাধারণ যাত্রী এই জাহাজে নেওয়া হতো না। আন্দামানের নেবার সময় কয়েদিদের পায়ে লাগানো হতো ডাণ্ডাবেরি আর হাতে হাতকড়া। জাহাজটির নিচে ছিলো জেলের মতো একটি জায়গা। চারদিন অতিক্রম করে আন্দামানে না পৌঁছানো পর্যন্ত এটিই ছিলো তাদের জেল। এখনও কলকাতা থেকে যাত্রীবাহী জাহাজ ছুটে যায় পোর্ট ব্লেয়ারের দিকে। তবে সেটির নাম ‘এম ভি রামমোহন’! সংস্কারবাদী নেতা রাজা রামমোহনের নামে।

.

অত্যাচারের ইউনিভার্সিটি:

আন্দামানের সেলুলার জেলে ৭টি উইংয়ের আওতায় ছিল ৭০০ সেল। নির্যাতন আর একাকীত্বের মধ্যে থেকেও তারা বিশ্বাসঘাতকতা বা অত্যাচারির পক্ষ গ্রহণ করেন নি। বরং এ থেকে আত্মচেতনা ও স্বদেশপ্রেমের দীক্ষা নিতেন স্বাধীকার আন্দোলনের আমরণ সংগ্রামীরা। কয়েদিদের কাছে এই কারাগার ছিল অত্যাচারের এক বিভৎস বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো।

.

পুরো নাম: আন্দামান এন্ড নিকোবর আইল্যান্ডস
রাজধানী: পোর্ট ব্লেয়ার, ৩টি জেলা
ভাষা: বাংলা, ইংরেজি, হিন্দী, তেলেগু, তামিল ও নিকোবরি
আয়তন: ৮ হাজার ২৫০ বর্গ কিলোমিটার
দ্বীপ সংখ্যা: ৫৭২টি, জনবসতি আছে ১৩১টিতে
বর্তমান জনসংখ্যা: ৩ লাখ ৫৬ হাজার
মূল দেশ: ভারত, কলকাতা থেকে ১২৫৫ কিলোমিটার দূরত্বে
অবস্থান: বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ সীমার ওপারে ভারত মহাসাগরে

.

.

টাইমলাইন: আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ
১৭৭৭ – আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাসভূমি আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপূঞ্জে ব্রিটিশরা একটি সমীক্ষা চালায়
১৭৮৮ – উপনিবেশ স্থাপনের জন্য ব্রিটিশ নৌবাহিনীর সুপারিশ
১৭৮৯ – গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিসের নির্দেশক্রমে চাটহাম দ্বীপে ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপন এবং পোর্ট কর্নওয়ালিস নাম প্রদান
১৭৮৯ – লেফটেনেন্ট ব্লেয়ার একই বছরে সমীক্ষা চালিয়ে এর নাম দেন ‘পোর্ট ব্লেয়ার’
১৮৩৮ – ওহাবি আন্দোলনের ২০০ বিপ্লবীকে আন্দামানে দ্বীপান্তর, যাদের অধিকাংশই ছিলেন বাঙালি
১৮৫৭ – সিপাহী বিপ্লবে ৭৭৩ বিদ্রোহীকে আন্দামানে নির্বাসন
১৮৫৮ – ভাইপার দ্বীপে ব্রিটিশ সরকারের অধীনে একটি কারাগার ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় জনবসতি স্থাপন
১৯০৬ – পোর্ট ব্লেয়ারে নতুন একটি সেলুলায় জেল নির্মিত হবার পর ভাইপার দ্বীপের কারাগারকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়
১৯৪২ – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জাপানিরা আন্দামান দখল করে নেয়
১৯৪৩ – সুভাস বসুর নেতৃত্বাধীন ‘আজাদ হিন্দ সরকারের’ কাছে হস্তান্তর এবং ভারতীয় পতাকা উত্তোলন
১৯৪৫ – জাপানি সেনাবাহিনী ব্রিটিশদের কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং দ্বীপপুঞ্জগুলো ব্রিটিশরাজের অধীনে ফিরে আসে
১৯৪৭ – আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপূঞ্জ ভারতের অধীনে চলে আসে

.

.

আন্দামানে বাঙালির দুঃখগাঁথা:

সূর্যসেন তিতুমীরের চেতনা বহনকারী বাঙালির অস্তিত্ব ছাড়া উপমহাদেশের কোন সংগ্রামের কথা চিন্তা করা যায় না। তাই আন্দামানের সেলুলার জেলে বাঙালির ত্যাগ যে বেশি হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ওহাবি আন্দোলনের নির্বাসিতদের মধ্যে যেমন বাঙালির সংখ্যা অধিক, তেমনি সিপাহী বিপ্লব এবং স্বদেশী আন্দোলনেও বাঙালির ত্যাগ সবচেয়ে বেশি। সেলুলার জেলের দু’তলার ১৩টি ফলকে খোদিত আছে ৩৩৬ বিপ্লবীর নাম, যাদের অধিকাংশই বাঙালি।

.

আন্দামান এখন:

আন্দামানের সেলুলার জেলগুলোতে এখন আর কোন বন্দী নেই। ভারত এবং সার্বিকভাবে উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি স্মারক হিসেবে টিকে আছে আন্দামান। অবিভক্ত ভারতের ‘বাস্টিল দুর্গ’ বলা যায়। প্রবেশ করলেই বুঝা যায় ব্রিটিশ শাসকদের ভয়াবহ রূপ, যা এত বছর পরও মুছে যায় নি।

.

.

ছবি, ট্রাভেলগ, ভিডিও লিংক:
ক) প্রখ্যাত বিপ্লবী ‘শের আলিকে’ নিয়ে একটি ভিডিও। অবশ্য দ্রষ্টব্য!
খ) সেলুলার জেলে নির্যাতনের শিকার, উল্লেখযোগ্য কয়েকজন নেতার তালিকা।
গ) আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জকে নিয়ে একটি ‘অবশ্য পাঠ্য’ ট্রাভেলগ
ঘ) পেশাদার ফটোগ্রাফারদের ফটো অ্যালবাম-১
ঙ) পেশাদার ফটোগ্রাফারদের ফটো অ্যালবাম-২
চ) গুগল মামার ফটো ভাণ্ডার।

.

.

.

satellite map

———————–
তথ্যসূত্র:
১) আমাদের ছুটি ব্লগ
২) ভারতীয় সংসদীয় যাদুঘরের হোমপেইজ
৩) ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাস
৪) প্রচ্ছদ ছবিটি blog.travelwithsmile.com থেকে নেওয়া।

———————————————————————————–

[ ঘুড়ি ব্লগে প্রথম প্রকাশ ]  নিচের সমস্ত তথ্যাদি ঘুড়ি ব্লগ থেকে আনা হয়েছে।
———————————————————————————–