Tagged: আত্ম মূল্যায়ন

নার্সিসাস কাহিনির বাকি অংশ…

 নার্সিসাসের আত্মপ্রেমের পৌরানিক কাহিনিটি প্রায় সবারই জানা। নার্সিসাস প্রতিদিন একটি হ্রদের কিনারে বসে একদৃষ্টিতে পানির দিকে তাকিয়ে থাকতো। পানিকে দেখতে নয়, নিজেকে দেখতে। নিজের সৌন্দর্য্যে এতই মগ্ন থাকতো যে, নিজের অস্তিত্বের কথা ভুলে যেতো। ভুলে যেতো সকাল বিকাল দুপুরের কথা। আত্মমগ্ন এই যুবক একদিন সেই হ্রদের স্বচ্ছ পানিতে ঝাপিয়ে পড়লো! সাঁতরাতে নয়, অন্যমনস্কতার কারণে! গভীর পানিতে খেই হারিয়ে বেচারা ডুবেই মরলো। তারপর নার্সিসাসের পড়ে যাবার স্থানটিতে জন্ম নিলো একটি ফুলগাছ। নাম দেওয়া হলো, নার্সিসাস। আহা! নার্সিসাস যেন একটি দীর্ঘশ্বাসের নাম।
.
.
এবার চলে যাই গল্পের বাকি অংশে।
.
নার্সিসাসের মৃত্যুর পর বনদেবী এসে উপস্থিত হলেন সেই হ্রদের পাড়ে। এসে যা দেখলেন, তা দেবী নিজেও ধারণা করতে পারেন নি। তিনি দেখলেন হ্রদের পানি অশ্রুবিন্দুতে রূপান্তরিত হয়েছে। অথচ এটি ছিল স্বচ্ছ পানিতে পরিপূর্ণ ঝিকমিকে হ্রদ।
.
“তুমি কেন কান্না করছো?” বনদেবী বিস্ময় সংবরণ করে হ্রদকে জিজ্ঞেস করলেন।
“আমি নার্সিসাসের জন্য শোকাহত।” হ্রদের উত্তর।
.
দেবী ভাবলেন, তা হতেই পারে। নার্সিসাস তো সারাক্ষণ এই হ্রদের পাড়েই বসে থাকতো। এমন একজন সঙ্গী হারালে যে কেউ হতাশ হয়। দেবী বললেন,
“ওহ, বুঝেছি। সুদর্শন নার্সিসাসের জন্য তো তুমিই কান্না করবে।”
“নার্সিসাস বুঝি সুদর্শন ছিল?” হ্রদের নির্বিকার প্রশ্ন।
.
বনদেবী এবার আর নিজের বিস্ময় সংবরণ করতে পারলেন না। দেবী হলেও তো তার অনুভূতি আছে! এই বোকা হ্রদ এখন এসব কী বলছে?! নার্সিসাস দিনভর তো তার দিকেই তাকিয়ে তাকতো।
.
“নার্সিসাস সুদর্শন ছিল কিনা এটি তোমার চেয়ে কে আর বেশি জানে?” বনদেবীর সবিস্ময় জবাব।
.
প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন পেয়ে শোকাতুর হ্রদ নিরব হয়ে হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ কিছুই বললো না। বনদেবীও দৃষ্টি নামালেন না হ্রদের দিক থেকে।
.
কান্নারত হ্রদ এবার নিরবতা ভেঙ্গে উত্তর দেবার চেষ্টা করলো-
“আমি নার্সিসাসের মৃত্যুতে কান্না করছি, কিন্তু আমি কখনও নার্সিসাসের সৌন্দর্য্য লক্ষ্য করে দেখি নি। আমি কান্না করছি, কারণ যতবার নার্সিসাস আমার পাশে আসতো, ততবার আমি নিজেকে দেখতে পেতাম। নার্সিসাসের গভীর চোখের দৃষ্টিতে আমার সৌন্দর্য্য ভেসে ওঠতো। তাই প্রতিদিন আমি নার্সিসাসের অপেক্ষায় থাকতাম।”
.
.
গল্পের মর্মার্থ।
.
সমাজে আমরা একে অন্যের পরিপূরক। একজনের পরিপূর্ণতার জন্য প্রয়োজন অন্যের অংশগ্রহণ। কেউ একা একা পূর্ণতা পেতে পারে না। নিজেকে দেখার মানে অন্যকেও দেখার সুযোগ দেওয়া। কৃষক আত্মমগ্ন হয়ে ফসল না ফলালে সেটির উদ্বৃত্ত তিনি শহুরে মানুষগুলোকে দিতে পারতেন না।
.
আমরা সবাই আত্মমগ্ন হলেই সেটি স্বার্থপরতা, তা সবসময় ঠিক নয়। বরং নিজেদের আত্মমগ্নতায় আমরা অন্যকে প্রকাশ করি। সক্রেটিস বলেছেন, নিজেকে জানুন। আমাদের শিক্ষাগুরুরাও বলেন, নিজের জন্য একটি লক্ষ্য স্থির করতে। আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনে চিকিৎসক বলেন, নিজের যত্ন নিন। আত্মমগ্নতাই সৃষ্টির রহস্য বের করে দেয়। আত্মমগ্নতা আমাদেরকে আত্মবিকাশ, আত্মমূল্যায়ন ও আত্মপ্রকাশে সাহায্য করে।
.
আত্মউন্নয়ের সকল প্রশিক্ষণে আমরা আত্মমগ্নতার নির্দেশনাই পাই। শিক্ষা, জ্ঞানার্জন, ধ্যান, যোগব্যায়াম সবকিছুতে পাই আত্মমগ্নতার প্রেরণা। অথচ পৃথিবীর প্রায় সবকিছু আমাদেরকে আত্মমগ্ন হতে বাধা দেয়। এসব থেকে নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে থেকে অথবা বিচ্ছিন্ন রেখে আত্মমগ্ন হওয়া একটি কঠিন কাজ। এটিই আমাদের জীবনে পূর্ণতা প্রাপ্তির উপায়।
.
.
.

[পাওলো কোয়েলো’র “দি আলকেমিস্ট”-এর একটি অংশ অবলম্বনে]

ম্যানেজার হিসেবে আপনি কতটুকু দক্ষ?

banner9

প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে ড্রিম ম্যানেজার, পর্ব ৯।  ব্যবস্থাপনা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নয় যে, পাশ করার পর আর উন্নয়নের প্রয়োজন নেই।  আইনজীবী চিকিৎসক ইত্যাদি পেশার মতো এখানেও নিরন্তর অধ্যাবসায় প্রয়োজন। পেশাদারিত্ব একটি ব্যক্তিগত দায়। প্রতিটি পদক্ষেপ প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি সম্পর্ককে পর্যালোচনা করতে হয়। এমন একটি পর্যালোচনার জন্য আজকের পর্বটি।

নিচের কুইজটি মাত্র দশ মিনিটে ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে একটি চমৎকার মানসিক অবস্থান তৈরি করে দেবে। ম্যানেজারের দক্ষতা সম্পর্কে এই উচ্চতর মূল্যায়নটি একটি ইংরেজি ম্যাগাজিন থেকে পাওয়া। বিষয়গুলো এতোই চিন্তা-জাগানিয়া যে, সহকর্মীদের সাথে শেয়ার না করে পারলাম না।

১. ভালো ব্যবস্থাপক… ক) সিদ্ধান্ত নিতে পারে; খ) সহকর্মীদের সাথে সামাজিক অনুষ্ঠানে সময় দেয়; গ) নিজের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করার জন্য আলোচনা করে।

২. ভালো ব্যবস্থাপক দিনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করে… ক) কর্মীদের একক কাজের মূল্যায়নে; খ) উর্ধতন কর্মকর্তার প্রত্যাশা পূরণে; গ) সহকর্মীদেরকে প্রশিক্ষণদানে।

৩. একজন ব্যবস্থাপকের প্রাথমিক দায়িত্ব হলো… ক) প্রত্যাশারও বেশি কাজ করা; খ) বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন; গ) সহকর্মীর মাধ্যমে কাজের বাস্তবায়ন।

৪. একজন ব্যবস্থাপকের পক্ষ থেকে যা গ্রহণযোগ্য নয়, তা হলো… ক) সহকর্মীকে সহানুভূতি দেখানো; খ) মেজাজ বিগড়ে যাওয়া; গ) কর্মীদের জন্য ব্যক্তিগত প্রশংসাপত্র তৈরি।

৫. কর্মীদের দায়বদ্ধতা মুহূর্তেই কমে যায় যখন ব্যবস্থাপকেরা… ক) একই মেজাজে থাকেন না; খ) নির্ধারিত সময়ের আগে অফিস ত্যাগ করেন; গ) অফিসের দরজা বন্ধ রাখেন।

৬. নতুন ব্যবস্থাপক হিসেবে প্রথমেই যা করতে হয়, তা হলো… ক) আপনার প্রকল্প থেকে প্রেরণযোগ্য প্রতিটি প্রতিবেদন মনযোগ দিয়ে দেখা; খ) সহকর্মীকে কাজের নির্দেশ (ডেলিগেট) দিতে শেখা; গ) সহকর্মীদের সাথে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারের আয়োজন করা।

৭. আপনার প্রকল্পটি যখন কর্তৃপক্ষের রোষাণলে পড়ে, তখন… ক) ব্যবস্থাপক সকল অভিযোগের ধারক হবেন; খ) সমস্যাটি বের করে সমাধান খুঁজবেন; গ) শান্ত থাকবেন।

৮. ব্যবস্থাপককে অবশ্যই বুঝতে হবে যে... ক) কর্মীরা প্রশংসা এবং স্বীকৃতি পেলে বেশি কাজ করে; খ) কাজ না থাকলে কর্মীদের আগ্রহ কমে যায়; গ) অর্থনৈতিক সুবিধা থাকলে প্রত্যাশার বেশি কাজ করে।

৯. যখন কোন কিছু শেখাতে হয়… ক) অফিসের বাইরে আয়োজন করুন; খ) কর্মীদের চেষ্টা ও শেখার আগ্রহকে পুরস্কৃত করুন; গ) একাধিক পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দিন।

১০. সহকর্মীরা যখন ভিন্ন একটি উপায়ে কাজটি করতে পারে, তখন… ক) সেটি গ্রহণ করা উচিত, কারণ সহকর্মীদের থেকেও শেখার সুযোগ হয়; খ) এটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, কারণ তারা ভুল করতে পারে; গ) পরিস্থিতি অনুযায়ি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

skill_test_dreammanager


নম্বর মূল্যায়ন: প্রতিটি সঠিক উত্তরের জন্য ১০ বিবেচনা করুন
৮০-১০০: আপনি একজন দক্ষ এবং অভিজ্ঞ ব্যবস্থাপক।
৬০-৭০: যেসব ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হয়েছে সেগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করুন।
৬০ এর নিচে: বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবুন, হয়তো ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আপনার উন্নয়ন জরুরি!

ব্যবস্থাপনা একটি সহজ কাজ একথা কেউ কখনও বলে নি। কাজের উন্নয়নের জন্য আমাদেরকে কর্মীর চাহিদা নিয়ে আরও ভাবতে হবে। প্রত্যেক ব্যবস্থাপক তার অধীনস্থ কর্মীর অভিভাবক। তাদেরকে গেঁথে তোলার মধ্যেই রয়েছে তার প্রকল্পের উন্নয়নের সম্ভাবনা।


আপনার ব্যবস্থাপকীয় দক্ষতা কতটুকু?
[ উত্তর ও পর্যালোচনা ]

১/ক ] সিদ্ধান্ত নিতে হলে সাহসের প্রয়োজন। সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পারার জন্য পর্যাপ্ত তথ্য হয়তো আপনার নেই। তাই ভুল হতেই পারে। ভীতু বা দায়িত্ব-এড়িয়ে-চলা নেতাকে কোন কর্মীই পছন্দ বা শ্রদ্ধা করে না।

২/গ ] কর্মীর উন্নয়ন করা ব্যবস্থাপকের প্রধান দায়িত্ব। বাস্তবে দেখা যায়, প্রশিক্ষণের সময় পাওয়া কঠিন। তবু কৌশলে সময় বের করে নিতে হবে, কারণ এটি কর্মীর এমন এক চাহিদা যা পূরণ হলে প্রতিষ্ঠান এগিয়ে যায়।

৩/গ ] কর্তৃপক্ষ চায়, ব্যবস্থাপকের নেতৃত্বে প্রকল্প/দলটি দক্ষতা এবং গতিশীলতার সাথে কাজ করুক। কর্মীকে কাজে সম্পৃক্ত করা মানে হলো দলের সবাই কর্মতৎপর হওয়া। ব্যবস্থাপক যত নিজের কাজে ব্যস্ত, তদারকি ততই দুর্বল এবং দলের কার্যকারীতা ততই কম।

৪/খ ] হতাশ হওয়া খুবই স্বাভাবিক এবং মানবিক। এমন পরিস্থিতির জন্যই ব্যবস্থাপক, কিন্তু মেজাজ বিগড়ে যাওয়া মানসিক অপরিপক্কতার লক্ষণ। আবেগ দমনে রাখতে পারা একটি বড় গুণ এবং কঠোর আত্মনিয়ন্ত্রণের পরিচয়।

৫/ক ] ব্যবস্থাপক যখন একদিন থাকেন খোশমেজাজে, অন্যদিন চরমভাবে ক্ষিপ্ত – এটি কর্মীর মনেও খারাপ ধারণার সৃষ্টি করে। ব্যবস্থাপকের সংযত এবং অভিন্ন আচরণ কর্মীর মনে প্রেরণা যোগায়।

৬/খ ] সুদক্ষ ব্যবস্থাপক নিজেই যখন কাজটি করেন, সেটি হয় সঠিক এবং দ্রুত। সুদক্ষ ব্যবস্থাপকেরা যখন অভিজ্ঞতার অভাবে থাকেন, তখন তারা কর্মীকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করতে পারেন না। নতুন ব্যবস্থাপকের প্রথম কাজ হলো, কর্মীকে কাজের নির্দেশনা দিতে শেখা এবং একই সাথে তাদেরকে শেখানো। এতে তার জন্য ব্যবস্থাপনার কাজটি সহজ হয়।

৭/ক ] পরিস্থিতি খারাপ হয়ে গেলে কাঁধ শক্ত করে দলের দায়িত্ব নিন। সমস্ত তপ্ত বাক্য আপনিই গ্রহণ করুন, এটিই ব্যবস্থাপকের দায়। অধিনস্ত কর্মীকে চাপমুক্ত রাখুন, যেন তারা স্বাভাবিক কাজ চালিয়ে যেতে পারে। ব্যবস্থাপক যখন দায় এড়িয়ে কর্মীর ওপর তুলে দেয়, কর্মীরা তার প্রতি আস্থা, শ্রদ্ধা ও আনুগত্য সবই হারায়।

৮/ক ] প্রশংসা পেতে এবং নিজেদেরকে ‘আলাদা’ ভাবতে সকল কর্মীই পছন্দ করে। কর্মীর কর্মদক্ষতার সর্বোচ্চ সুফল পেতে এরকম পরিস্থিতির খুবই প্রয়োজন। কর্মমুখর পরিবেশ সৃষ্টিতে অবদান রাখা ব্যবস্থাপকের প্রধান কাজ।

৯/গ ] নতুন ধারণা রপ্ত করানোর জন্য প্রশিক্ষণার্থীর বিভিন্ন ইন্দ্রিয়গুলোর ব্যবহার করুন। আপনার বিষয়টিতে তাদেরকে শুনতে দিন, বুঝতে দিন, দেখতে দিন করতেও দিন। সবাই একভাবে শেখে না।

১০/ক ] নতুন কিছু শেখার জন্য মানুষের কোন নির্ধারিত বয়স-সীমা নেই। সহকর্মীর বিশেষ গুণ থেকে শিখলে ব্যবস্থাপকের মান ক্ষুণ্ন হয় না, বরং বাড়ে। একই সাথে কর্মীরও সংশ্লিষ্ট ভালো দিকটি থেকে প্রতিষ্ঠান উপকৃত হয়।

লেখাটি প্রজেক্ট ম্যানেজারের পেশাদারিত্বের উন্নয়নে শুধু একটি অধ্যয়ন/অনুসন্ধানের জন্য। কোন উত্তরই অকাট্য/অখণ্ডনীয় হিসেবে বিবেচনার করার জন্য নয়।


প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ম্যানেজার/ পূর্বের পর্বগুলো:

▶ পর্ব ৮: পেশাদারিত্বের ৭টি বিষয়

▶ পর্ব ৭: এ দুই রকমের ম্যানেজার থেকে সাবধান থাকুন

▶ পর্ব ৬: ১৩ উপায়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকে রাখুন হাতের মুঠোয়!

▶ পর্ব ৫:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনা: পেশাদারিত্ব কার দায়?

▶ পর্ব ৪:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ৫টি প্রক্রিয়া: পেশাদারিত্বের শুরু

▶ পর্ব ৩:  ৯টি তত্ত্বে প্রকল্পের সংজ্ঞা এবং সহজ কিছু দৃষ্টান্ত

▶ পর্ব ২:  যে ৫টি কারণে দৈনন্দিন জীবনে প্রকল্প আমাদেরকে উপকৃত করে

▶ পর্ব ১:  প্রকল্প ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক: কেন এবং কীভাবে