Category: শিক্ষা

হুন্ডি কেন অবৈধ?

jiggasha

 

 

হুন্ডি কি?  হুন্ডি প্রথার উৎপত্তি কোথা থেকে? এটি কেন অবৈধ?


 

সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা:

হুন্ডি একটি  নীতিবহির্ভূত এবং দেশের আইন দ্বারা নিষিদ্ধ অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থ হস্তান্তর/স্থানান্তর ব্যবস্থা। Bill of Exchange বা বিনিময় বিল নামেও পরিচিত। বাণিজ্যিক লেনদেন এবং ঋন আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো। এখনও হয়। তবে তা অবৈধভাবে এবং অবৈধ উদ্দেশ্যে।

 

বিস্তারিত সংজ্ঞা:

বাণিজ্যিক আদান বা ঋণ সশ্লিষ্ট লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত লিখিত  এবং শর্তহীন দলিল, যার মাধ্যমে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে নির্দেশিত পরিমাণ টাকা লেনদেন হয়। এই ব্যবস্থা মুগল আমলে পরিচিত লাভ করে, কিন্তু ব্রিটিশ আমলে জনপ্রিয়তা পায়। এখনও প্রবাসী চাকুরিজীবীরা একে আড়ালে ব্যবহার করছেন।

বর্তমান বিশ্বের ব্যাংকিং পদ্ধতি অনুসরণ করে হয় না বলে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়। তাই হুন্ডি ব্যবস্থাকে অবৈধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

 

ইতিহাস সূত্র:

মুগল আমলে প্রতিষ্ঠিত অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থ লেনদেন ব্যবস্থাটি ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলে বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। তারা একে দেশীয় ব্যবস্থা বলে মেনে নেয়। তবে বৈধতা দেবার জন্য রানীর সিলসহ স্ট্যাম্প ব্যবহারের প্রচলন করে।

Hundi Stamp (British India)

“হুন্ডি অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার অংশ হওয়ার কারণে এর আইনগত অবস্থান নেই এবং সরকারের আওতাধীন আলোচনার কোন বিধিও নেই। হুন্ডি সাধারণত বিনিময় বিল হিসেবে বিবেচিত হলেও তা প্রায়শ দেশজ ব্যাংকার্স দ্বারা ইস্যুকৃত পে-অর্ডার চেকের সমমান হিসেবে ব্যবহূত হয়। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলিতে শাখা অফিস অথবা প্রধান ব্যাংকিং হাউসগুলিতে কুঠির মাধ্যমে হুন্ডি ব্যবসা চলত। বলা হয়, বাণিজ্যিক ভারতের সকল অংশে জগৎ শেঠের ব্যাংকের শাখা অফিস ছিল। কিন্তু বাংলায় উপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠার প্রভাবে তাঁদের আর্থিক শক্তির পতন শুরু হয় এবং আঠারো শতকের শেষে দেউলিয়া হয়ে পড়ে।” [বাংলাপিডিয়া]

 

সংবাদপত্রে দৃষ্টান্ত:

“গুলশান ও শোলাকিয়ার হামলার অর্থ এসেছিল হুন্ডির মাধ্যমে”। দৈনিক প্রথম আলো, ১৯ সেপটেম্বর

 


সূত্র: বাংলাপিডিয়া, বেশতো এবং হেল্পফুলহাব ডট কম। ব্রিটিশ সময়ের হুন্ডির ছবিটি ইন্ডিয়াস্ট্যাম্প ডট ব্লগস্পট ডকম থেকে।

ডার্ক মুভি ব্ল্যাক কেন? ব্ল্যাক মুভি ডার্ক কেন?

jiggasha

 

ডার্ক মুভি ব্ল্যাক কেন? ব্ল্যাক মুভি ডার্ক কেন?


 

সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা:

ডার্ক মুভি বা কমেডিতে অন্ধকার মানে হলো মন্দ, ভয়ংকর, নোংরা…. এবং অবশ্যই অন্ধকারও।  

মূল থিমটি ‌’খারাপ‘ ‘নেতিবাচকএবংআঁধার  হরর (ভয় জাগানো) চলচ্চিত্রগুলো এর অন্তর্ভুক্ত হতেই পারে

এর উপজীব্য হলো: রহস্য, ভয়, ত্রাশ, নোংরামি, যাদুমন্ত্র, অযাচার লৌমহর্ষক দৃশ্য, রক্ত, হত্যা ইত্যাদি। মোটেই ভালো কিছু নয়, তবে সৃজনশীল এবং স্পেশাল ইফেক্ট নির্ভর।

 

dark= evil, nasty, frightening….

 

দৃষ্টান্ত: সেশন নাইন, দ্য টাইম অভ্ দ্য উল্ফ, সাইলেন্ট হিল ইত্যাদি….

 

বিস্তারিত সংজ্ঞা:

ডার্ক মুভি/কমেডিতেওডার্কঅর্থ প্রায় একই: অর্থাৎ বিষাদময় ব্যঙ্গ।  চরিত্রে থাকে হারানোর বেদনা…. যে হারানোর কোন ক্ষতিপূরণ নেই

 

ব্ল্যাক কমেডি সাথে এর অনেকটাই মিল আছে:  ব্ল্যাক কমেডিতে থাকে ধর্ষণ, গণহত্যা, মানুষের মানুষ খাওয়া ইত্যাদি বিষয়।  অনেকে ব্ল্যাক কমেডি আর ডার্ক কমেডিকে একসাথে দেখে

 

দৃষ্টান্ত:  টাফ গাইস ডোন্ট ডান্স, দ্য বেইকার, দ্য গার্ড, ব্যাড সান্টা ইত্যাদি

অন্য টার্মগুলো নাম থেকেই সাধারণ দর্শক আঁচ করতে পারেন। তবে যারা গভীরভাবে এর সাথে যুক্ত আছেন, তাদের কাছে গভীর অর্থ আছে

 

ডার্ক বা ব্ল্যাক থেকে একশমাইল দূরে থাকুন!  মানুষ যা দেখে তা-ই শেখে, অথবা অবচেতনে গ্রহণ করে। মানুষ যা দেখে, তার ওপর তার চরিত্র গঠন অনেকটাই নির্ভরশীল। মনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এরকম বিষয়গুলো দেখতে রোমাঞ্চকর, কিন্তু স্লো পয়জনের মতো চরিত্রকে ধ্বংস করে দেয়। 

 

ইতিহাস সূত্র:

ডার্ক বা ব্ল্যাক মুভি টার্মটি মূলত ‘ডার্ক কমেডি’ থেকে এসেছে। ডার্ক কমেডি একটি অতি প্রাচীন বিষয়, যা গ্রিক ও ইংলিশ সাহিত্য ও থিয়েটার থেকে গৃহীত। বিষয়টির সাথে এরিস্টটল, শেইকসপিয়র প্রমুখের নাম জড়িয়ে আছে।  ডার্ক কমেডি’র উদ্দেশ্য ছিল ভয়ংকর, মারাত্মক বা গুরুতর বিষয়কে হালকা উপস্থাপনায় চটুল বা বোধগম্য করে তোলা। বিষয়ের কারণেই ব্ল্যাক কমেডিটি একটি বিতর্কিত বিষয়।  [উইকিপিডিয়া]

 

 

ব্লগ/ সংবাদপত্রে দৃষ্টান্ত:

সাইফ সামির/ সামহোয়্যারইন ব্লগ: দি ডার্ক নাইট, মুভি রিভিউ

 

সূত্র: বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম।

‘বয়কট’ শব্দটি যেভাবে ‍ব্রিটিশ ঔপনিবেশের কালো অধ্যায়কে তুলে ধরে…

jiggasha

‘বয়কট’ শব্দটি কীভাবে ব্রিটিশদের কালো অধ্যায়কে উন্মুচিত করে? 


 

চার্লস সি বয়কট (১৮৩২-১৮৯৭) ছিলেন একজন ইংরেজ খাজনা আদায়কারী, তাদের ভাষায় এস্টেট ম্যানেজার। তার দায়িত্ব ছিল আইরিশ কৃষকদের ক্ষুদ্র আয় থেকে উচ্চহারে খাজনা আদায় করা। কাজটি ছিল কঠিন, কারণ কৃষকদের আয়ের তুলনায় খাজনা ছিল অত্যন্ত বেশি। কৃষকরা এক সময় একত্রিত হয়ে মি. বয়কটকে একঘরে করে দেয়। সেখান থেকে ‘বয়কট’ শব্দটির উৎপত্তি।

 

আভিধানিক অর্থ: ইংরেজি ও বাংলা

boycott:  withdraw from social/commercial relations (with a country/organization/person).  Oxford Dictionary.

boycott:  বর্জন/একঘরে করা; কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠি বা দেশের সাথে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা। বাংলা একাডেমির অভিধান।

 

যেভাবে মি. বয়কট ‘বয়কট’ হলেন:

মি. বয়কটের নিষ্ঠুর খাজনা আদায়ের অত্যাচার থেকে আইরিশ কৃষকরা বাঁচার জন্য উপায় খুঁজতে থাকে। কিন্তু বিশেষ কোন সমাধান তারা পায় নি। মি. বয়কট তাদেরই সমাজে বাস করে তাদেরকেই শোষণ করতেন।

অবশেষে কৃষকরা একদিন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে বয়কটের বিপক্ষে। তাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবার চেষ্টা করে। তাতেই তারা ক্ষান্ত হলো না, তাদের এলাকা থেকে বয়কট যেন কোন কিছু কিনতে না পারে, সে বিষয়ে সকলে ঐক্যবদ্ধ হলো। একসময় বয়কট তার জমিতে কাজ করার জন্য বা তার ফসল কাটার জন্য দিনমুজুরও পেলেন না।

বয়কটকে এভাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করে দেবার ঘটনা থেকেই ইংরেজি শব্দ ভাণ্ডারে বয়কট/boycott শব্দটি সংযোজিত হয়। এর অর্থ হলো সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা। অর্থাৎ একঘরে করা।

 

বয়কট শব্দের প্রচলন যেভাবে শুরু হলো:

মূলত ‘বয়কট’ হলো ইংল্যান্ডি ব্যবহৃত পারিবারিক উপাধি। জিওফ্রি বয়কট নামে আরেকজন বয়কট আছেন, যিনি বিখ্যাত হয়েছিলেন ক্রিকেটার হিসেবে। জিওফ্রি বয়কট (১৯৬২-১৯৮৬) হলেন প্রথম ব্রিটিশ যিনি টেস্ট ক্রিকেটে ৮০০০ রানের মালিক। (ডিকশনারি ডট কম)

সমসাময়িক সংবাদমাধ্যমগুলো তাৎক্ষণিকভাবে শব্দটি লুফে নেয় এবং ব্যবহার করতে শুরু করে। পরবর্তিতে জাপানি ভাষায়ও ‘বয়কটো’ শব্দটি প্রচলিত হয়।

আমাদের বাংলাদেশেও এখন বয়কট শব্দটিকে আর অনুবাদ করতে হয় না। বাংলা লেখায়ও কোন ব্যাখ্যা ছাড়াই এটি ব্যবহৃত হয়।

 

 


সূত্র: ১৬/জানু/১৯৯৮, ডায়েরি থেকে। বয়কটের ছবিটি হিস্টরিআয়ারল্যান্ড ডটকম থেকে নেওয়া।

 

স্বশিক্ষিত ক্ষণজীবীরা: বলছিলাম সাউথ পোলারদের কথা…

স্বশিক্ষিত প্রতিভাবানরা

স্বশিক্ষিত প্রতিভাবানরা

 

মালয়েশিয়া নামের দেশটির অধিকাংশ মোবাইল গ্রাহকের তথ্য এখন হ্যাকারদের হাতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষকোটি টাকা হ্যাকারদের দখল থেকে মুক্ত করা যায় নি। অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনের টুইটার একাউন্ট হ্যাক হয়েছিল। রাশিয়ান হ্যাকাররা লক্ষ লক্ষ ইমেল একাউন্ট হ্যাক করেছে। বিশ্ববিখ্যাত হ্যাকারের নাম হলো জুলিয়ান অ্যাসান্জ, যিনি উইকিলক্স-এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশের কূটনৈতিক দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করছেন। পানামা পেপার এবং এবারে প্যারাডাইজ পেপারস এর মতো গোপন প্রতিবেদন দিয়ে ফাঁস করে দেওয়া হয়েছে কীভাবে তথাকথিত জনপ্রিয় ব্যক্তিরা দেশের কর ফাঁকি দিয়ে বিদেশে ব্যবসা করছেন।

“প্রিয় হ্যাকার, দয়া করে একটু কি বলবেন, কীভাবে আমাদের ব্যাংকের তথ্যগুলো চুরি করলেন?” কোন হ্যাকার কি খুব সহজেই এ প্রশ্নের উত্তর দেবে? অথচ এরকম প্রশ্নের উত্তর জানতে চায় এমন ব্যক্তি বা সংস্থার সংখ্যা এখন আর গোনা যায় না। কিন্তু কেমন হয় যদি হ্যাকারসহ ‘সমাধানটিকে’ কব্জা করা যায়? চাকুরির বাজারে পেশাদার হ্যাকারদের চাহিদাটি এমনই ‘বিশেষ’ যে, একে সাধারণ বলা যায় না। অথচ দেখা যাবে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডিও পেরোতে পারে নি অনেকে। বিল গেটসের কথাই মনে করে দেখুন: “গণিতে আমি খুবই কাঁচা ছিলাম কিন্তু বন্ধুটি ছিলো খুবই দক্ষ। বর্তমানে সে একটি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী আর আমি সেই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান।”

শুধু পাশ্চত্যে নয়, প্রাচ্যেও ‘অশিক্ষিত’ প্রকৌশলীদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। ‘অশিক্ষিত’ শব্দটি ব্যবহার করায় আমার আপত্তি আছে। শুধু সনাক্ত করার জন্য বললাম – আদতে তারা স্বশিক্ষিত এবং শৌখিন প্রকৌশলী।

“ধীরে ধীরে প্রচলিত শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় বা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়া গুগলকর্মীর সংখ্যা বাড়ছে। গুগলের কিছু কিছু টিমে ১৪ শতাংশ কর্মীর প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ডিগ্রি নেই।” এটি একটি পত্রিকার খবর । অবশ্য গুগল জানিয়েছে যে, প্রাতিষ্ঠানিক সনদপ্রাপ্ত কোন প্রার্থীর যদি কোডিং এবং গাণিতিক বিষয়ে দক্ষতা থাকে, তবে তারাও অগ্রাধিকার পাবে।

.

আরও কিছু দৃষ্টান্ত

ছোটবেলায় ভিডিও গেম খেলতে খেলতে যে ছেলে/মেয়েটি সময় এবং অর্থ অপচয় করে মা-বাবার যন্ত্রণার কারণ হয়েছে, সে ছেলে/মেয়েটি চৌদ্দ বছর না পেরোতেই চাকরি পেয়ে গেলো একটি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানে। উচ্চ বেতনে এবং ভিআইপি মর্যাদায়। ভিআইপি মর্যাদার একটি চিহ্ন হলো, যে কোন সময় যে কোন জায়গায় অফিস করতে পারবেন। বাসায় থাকলেও চলবে। শুধু অন্য কোন সমগোত্রীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ রাখা যাবে না। বিশ্বাস করা কঠিন হলেও একটি ‘প্রতিযোগিতা-প্রবণ’ ভিডিও গেম তৈরির প্রতিষ্ঠানে বিষয়টি অসম্ভব নয়।

প্রতিভা এবং অধ্যাবসায়ের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গুরুত্বহীন। বিখ্যাত অ্যাপেল কম্পিউটারের জনক স্টিভ জবসও ছোটবেলায় তেমনই এক শিশু ছিলেন। মার্ক জাকারবার্গ বা বিল গেট্স-এর বেলায়ও কথাটি ঠিক, কারণ তারা প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যা অর্জনের পূর্বেই নিজ নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠা পান।

.

স্বশিক্ষিত প্রতিভাবানরা, যারা কিছু দেশে ‘সাউথপোলার’ হিসেবে সমাদৃত

কারিগরি বিষয়ে সাউথ পোলারদের আধিপত্য বেশি হলেও সৃজনশীল সকল পেশায়ই তাদের আধিক্য আছে। লেখক উপন্যাসিক গল্পকার বা ব্লগার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, এমন অনেক ব্যক্তিই আমাদের সামনে আছেন, যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ভালোমত শুরু বা শেষ করতে পারেন নি।

‘যা পছন্দ তাতেই লেগে থাকার’ বিষয়টি আমাদের দেশের শিক্ষা পদ্ধতি বা সমাজ ব্যবস্থায় ততটা স্বীকৃতি পায় না। ক্রিকেটের অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান যখন খেলতে শুরু করেন, তখন তিনি মা-বাবার আনুকূল্য পান নি। দাদাজান বিনাচিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করার কারণে পিতার অখণ্ডনীয় নির্দেশ হলো ছেলে/মেয়েকে ডাক্তারই হতে হবে। খোঁজ নিয়ে দেখা যাবে, সে হয়তো সঙ্গীত বা ছবি আঁকাআঁকিতে ইতোমধ্যেই নিজ প্রতিষ্ঠানে খ্যাত অর্জন করেছে। ভারতীয় ‘থ্রি ইডিয়টস’ ছবিটির কাহিনী এরকম সমাজের কথাই বলে।

.

সাউথপোলারদের স্বভাব ও জীবনে সাধারণত যা থাকে:

*আগ্রহ: মাত্র দু’একটি বিষয়ে তাদের আগ্রহ থাকে কেন্দ্রীভূত;
*কৌতূহলী: বিষয়টিতে কৌতূহল নিবৃত্ত করতে চেষ্টা করে মরিয়া হয়ে;
*বেদনাহত/ বিষাদাক্রান্ত: জীবনে থাকে এক বা একাধিক না-পাওয়ার বেদনা;
*প্রচলিত অর্থে অক্ষম: শারীরিক/মানসিক অক্ষমতা থাকতে পারে;
*বঞ্চিত: থাকতে পারে সামাজিক উপেক্ষা/বঞ্চনার বেদনা;

*মেইভারিক: সাধারণত প্রচলিত দৃষ্টান্তের বিপক্ষে তাদের অবস্থান, একটু বাউণ্ডুলে – একটু বিপ্লবী;
*একমুখী/একগুঁয়ে: অন্য কোন বিষয়, তা যতই কামনার বিষয় হোক, তারা সেগুলো উপেক্ষা করতে পারে;
*প্রেরণায় চালিত: তারা প্রেরণার কাঙ্গাল এবং কারও চোখে স্বার্থপরও;
*দৃষ্টান্ত:  কাজী নজরুল ইসলাম, ম্যাক্সিম গোর্কি, বেন্জামিন ফ্রাংকলিন, লিওনার্দো দ্য ভিন্চি, আরনেস্ট হেমিংওয়ে
*ক্ষণজন্মা: প্রেরণার খাবার দিতে গিয়ে শরীরের চাহিদাকে উপেক্ষা করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বীকৃতি পাবার পূর্বেই মৃত্যু!

.

অতএব, সাউথপোলার কারা?

যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেয়েও নিজের প্রতিভা এবং মজ্জাগত মেধার সফল প্রয়োগ করে কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করেছে, পশ্চিমা বিশ্বের ‘অলিখিত ভাষায়’ তারা ‘সাউথ পোলার’ হিসেবে পরিচিত। আমাদের দেশে ‘স্বশিক্ষিত’ অভিধায় আংশিতভাবে তারা পরিচিত। ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে তাদের সরব উপস্থিতি আমরাও টের পাবো। কর্মক্ষেত্রে সফলতার মূল মন্ত্র হলো: ‘যা ভালোবাসো তা-ই করো এবং যা করো তা-ই ভালোবাসো।’ প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার বিষয়টি এক সময় এসে ফাইলবন্দি হয়ে যায়। শুধু দক্ষতা আর যোগ্যতার বিষয়টিই তখন মুখ্য হয়ে ওঠে। আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে চাইলে ‘ভেতরের শক্তিকে’ কাজে লাগাতে হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রাকৃতিকভাবে অর্জিত নিজের অমূল্য শক্তির প্রয়োগ ঘটাতে হবে।

.

কেন এই নামকরণ?

সাউথ পোল বা দক্ষিণ মেরু এমন একটি জায়গা যেখানে ক্যামেরার দৃষ্টি যায় না।  খুব বেশি আলোচনা নেই দক্ষিণ মেরু নিয়ে। সকলেই উত্তর মেরু নিয়ে মুখর হয়ে থাকে, কারণ এটি অনুসন্ধানীদের জন্য সহজ এবং প্রচলিত উপায়ে ভ্রমণ করা যায়।  কিন্তু দক্ষিণ মেরু একটি অনাবিষ্কৃত অঞ্চল। দক্ষিণ মেরুকে বুঝার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয়।আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা দিয়েই তথাকথিত মেধাবীদেরকে বের করে আনা যায়।  পরীক্ষার ফলাফল দিয়েই তাদেরকে নির্ধারণ করা হয়।  কিন্তু স্বশিক্ষিতদেরকে আবিষ্কার করতে হয় এবং তাতে চেষ্টা লাগে।  সমাজের প্রচলিত মাণদণ্ডে তারা অনেকাংশেই অনাবিষ্কৃত। তারা দক্ষিণমেরুর বাসিন্দা, তারা সাউথপোলার।
.

.

সাউথপোলারদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হওয়া উচিত?

পরিবার: পরিবারই মানুষের গড়ে ওঠার সূতিকাগার।  এখান থেকেই শিশু তার অভ্যাসগুলোকে বেছে নেয় এবং নিজেকে আবিষ্কার করে। মা-বাবার দায়িত্ব হবে, প্রথমত তাদের সন্তানের স্বাভাবিক প্রবণতাটি বুঝা।  যেহেতু সকলেই শিশুবিশেষজ্ঞ নন, তাদের উচিত হবে সন্তানের পছন্দ মতো তাদেরকে খেলতে এবং কিছু করতে দেওয়া।  গান, ছবি আঁকা, কিছু বানানো অথবা কিছু ভাঙ্গা… এসব বিষয় আপাত দৃষ্টিতে ক্ষতিকর হলেও সন্তানের ভবিষ্যতের এজন্য এসবের সুযোগ করে দিতে হবে।

প্রতিষ্ঠান:  প্রতিষ্ঠান অবশ্য এককভাবে কিছু করতে পারে না, যদি না দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সমর্থন না থাকে। তবু অনেক শিক্ষক প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র হয়ে অনেক শিশুকে জীবনের পথ দেখিয়েছে।  তারা শুধুমাত্র একটি কাজ করেছেন, তা হলো শিক্ষার্থীদের যেকোন সৃষ্টিকে স্বীকৃতি বা প্রেরণা দেওয়া।  শিক্ষকের প্রশংসা মানেই হলো সামনে যাবার পাথেয়।  কবি নজরুলকে তার শিক্ষকরাই আবিষ্কার করেছিলেন। তাই শিক্ষকদের উচিত হবে, শিক্ষার্থীদের নিজস্বতাকে সম্মান করা এবং একইভাবে সকলকে পড়ালেখার জন্য চাপ না দেওয়া।

সমাজ:  ইতিহাস বলে যে, সমাজ সবসময়ই প্রতিভাবানদেরকে দেরিতে চিনেছে। সমাজ একটি বৃহত্তর পরিসর।  একে নির্দেশ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। মা-বাবাই সমাজের নিকটতম প্রতিনিধি।  তারা যদি নিজেদেরর সন্তানকে চিনতে না পারেন, তবে সমাজের কাছে শিশুরা আরও বেশি অচেনা হয়ে যায়।  প্রথম দায়িত্ব হলো, মা-বাবার।  বন্ধু এবং প্রতিবেশীর সামনে সন্তানদেরকে তিরষ্কার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।  তাহলেই বন্ধুবান্ধব এবং প্রতিবেশীরা সেই শিশুকে ভালোমতো মূল্যায়ন করতে পারবে।

.

.

[সর্বশেষ সম্পাদনা, ১৩ নভেম্বর ২০১৭। একটি ফেইসবুক স্ট্যাটাস বিস্তৃত হয়ে এই লেখার উদ্ভব।  প্রথম প্রকাশ প্রথম আলো ব্লগ; তারপর সামহোয়্যারইন ব্লগ/ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ ]

.

.


টীকা: প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিতদের মধ্যেও ‘সাউথপোলার সিনড্রোম’ থাকা অসম্ভব নয়!

উৎসর্গ: পৃথিবীর তাবৎ সাউথপোলারদেরকে।
উৎস: পর্যবেক্ষণ এবং ব্যক্তিগত প্রেরণা।

৬৬তম জাতিসঙ্ঘ এনজিও সম্মেলন: অংশগ্রহণকারীর অভিজ্ঞতা

জাতিসঙ্ঘের ডিপার্টমেন্ট অভ্ পাবলিক ইনফরমেশন (UN DPI/NGO Conference) এর এনজিও বিষয়ক সম্মেলনটি প্রথমবারের মতো কোন এশিয়ান দেশে হলো। মূলত ৬৬টি সম্মেলনের ৬০টিই হয়েছে নিউইয়র্কে, ৫টি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে এবং ১টি সম্প্রতি হয়ে গেলো দক্ষিণ কোরিয়ার পর্যটন নগরি গিয়ংজুতে। গিয়ংজু সউল থেকে ৪/৫ ঘণ্টার দূরত্বে, দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে। কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন নিদর্শনে পূর্ণ। সম্মেলনের উদ্দেশ্য এবং আয়োজন সম্পর্কে ধারণা দেবার জন্য এই লেখা।

অফিসের বিগ বস যখন সেদিন আচমকা ডেকে নিয়ে বললেন, ‘আপনাকেই যেতে হবে, সব কাজ গুছিয়ে ফেলুন’ তখন আমি একই সাথে খুশি এবং চিন্তিত। চিন্তিত ছিলাম কারণ ডিপার্টমেন্টে নিয়মিত ব্যস্ততাটুকু কীভাবে কাটিয়ে ওঠবো ভাবছিলাম। অন্যদিকে খুশি ছিলাম, কারণ এটি কোন প্রাতিষ্ঠানিক সেমিনার নয়, জাতিসঙ্ঘের এনজিও বিষয়ক সম্মেলন। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, এনজিও প্রতিনিধি, সিভিল সোসাইটি প্রতিনিধি এবং শিক্ষাবিদরা একত্রিত হয় এই সম্মেলনে। জাতিসঙ্ঘের কোন সম্মেলনে যোগ দিতে পারা আমার জন্য বিশাল প্রাপ্তি। ফলে আমি হ্যাঁ অথবা না, কিছুই বলতে পারলাম না। বলার সুযোগও ছিল না।

 

‘মানসম্মত শিক্ষা’, সম্মেলনের মূল আলোচ্য বিষয়। বিশ্ব নাগরিকের জন্য মানসম্মত শিক্ষা। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিক্ষার বিস্তার ও পৃষ্ঠপোষকতায় বেসরকারি সংস্থার অবদান সুবিদিত। তাই জাতিসঙ্ঘ চায়, এমডিজি পর্যায়ে যেমনভাবে এনজিওগুলো সহায়তা দিয়েছে, সেটি এসডিজিতেও অব্যাহত থাকুক।

জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব বান কি মুন বললেন, কোন বড় কর্মসূচি এনজিও’র সহযোগিতা ছাড়া অকল্পনীয়। একই সাথে যুবসমাজকে তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। ‘আমি কোরিয়ার মানুষ। কোরিয়া আজকের মতো ছিল না। অনেক কষ্ট করতে হয়েছে আমাদের। এক সময়ে খোলা আকাশের নিচে বিদ্যা লাভ করেছে যে ছেলেটি, সে আজ জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব হয়ে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।’ উদ্বোধনী পর্বের এ মুহূর্তটি ছিল আবেগপূর্ণ। হাজার প্রতিনিধির বিশাল সম্মেলন কক্ষটিতে পিনপতন নিরবতা।

আবেগ (প্যাশন) থাকতে হবে নিজেদের কাজে। সেই সাথে থাকতে হবে মমত্ববোধও (কমপ্যাশন)। বান কি মুনের এই কথাগুলো আমাকে স্পর্শ করলো।

তারপর বক্তৃতায় এলেন মি. ইল হা ই, গুড নেইবারস ইন্টারন্যাশলের প্রতিষ্ঠাতা প্রেজিডেন্ট। তিনি সম্মলেনের সহ-সভাপতি। শিশুর অধিকার ও মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে গুড নেইবারস-এর দু’টি কর্মশালা ছিল। ছিল প্রদর্শনী স্টল। প্রদর্শনীতে সেইভ দি চিলড্রেন ও ওয়ার্ল্ড ভিশনসহ সকল বড় এনজিওদের মাঝে বাংলাদেশের কোন সংস্থাকে দেখা গেলো না। জানি না কেন।

যা হোক, ব্ক্তৃতায় এলেন, রাশেদা কে চৌধুরি। তিনি গণশিক্ষার বিশ্ব ফোরামের ভাইস-প্রেজিডেন্ট। একই সাথে বাংলাদেশের গণসাক্ষরতা অভিযানের প্রধান। শাড়ি-পড়া রাশেদা আপাকে দেখে গর্বিত বোধ করলাম। শেষ দিকে তার সাথে ছবি তোলার প্রতিযোগিতায় আমি যেতে চাই নি। অন্যদেশকে সুযোগ দিলাম। তবে দেখা করেছি, কথা বলেছি।

তিন দিনের সম্মেলনে মোট পাঁচটি রাউন্ড টেবিল আলোচনা ছিল। সবগুলোতেই অংশ নিয়েছি। একটিতে প্যানেলিস্ট হিসেবে আবার রাশেদা কে চৌধুরীকে পেলাম। মানসম্মত শিক্ষার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিমতটি তিনিই রাখলেন। তিনি বললেন, সবার আগে রাষ্ট্রগুলো তাদের জাতীয় নীতিতে শিক্ষাকে সেভাবে গ্রহণ করতে হবে। মুহুরমুহু করতালির মাঝে আমার হাতগুলোও ছিলো। শিক্ষার মান ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিয়ে অনেক আলোচনাই হলো, যা এই লেখায় তুলে ধরা সম্ভব নয়।

ইউথ ককাস। যুব সম্মেলন। প্রতিদিন সকালে আয়োজিত হয়েছে তরুণ-তরুণীদের নিয়ে যুব সম্মেলন। প্রথমটিতে স্বয়ং জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব উপস্থিত ছিলেন।

দেখা হলো ঢাকা আহসানীয়া মিশন এবং আহসানীয়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেজিডেন্ট জনাব কাজী রফিকুল আলমের সাথে। বয়স্ক ভদ্রলোক একাই সম্মেলনের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। আমাকে দেখে বিস্মিত। কীভাবে এলাম! যা হোক, তার সাথে দ্বিতীয়বার দেখা হলো সম্মেলন কক্ষে।

অধিকার নিয়ে, রাষ্ট্রীয় অপব্যবস্থা নিয়ে, সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা নিয়ে এবং মুক্তমতের জন্য মানুষের জীবন দেওয়া… ইত্যাদি বিষয়ে এতো সাহসী এবং শানিত বক্তব্য আমি কখনও শুনি নি, দেখি নি। দর্শক সকলে স্তব্ধ, তারপর বজ্রপাতের মতো করতালি। অবশেষে বক্তার সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, তার বক্তৃতা অগণিত মানুষকে শক্তি দেয়, এটি তিনি জানেন কি না। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। ছবি তোললাম এবং পরিচয় বিনিময় করলাম। তিনি জাতিসঙ্ঘের এনজিও বিষয়ক এসোসিয়েশনের চেয়ারপার্সন, ব্রুস নট।

সম্মেলনে ছিল নজিরবিহীন নিরাপত্তা। পুরো গিয়ংজুতে গিয়ংজুর মানুষ ক’জন জানতে পারলাম না, কারণ রাস্তাঘাট সব ফাঁকা। হয়তো মানুষ আসলেই কম। শুধুই সম্মেলনের অংশগ্রহণকারী। অংশগ্রহণকারীদেরকে সম্মেলনের অনেক পূর্বেই প্রাথমিক নিরাপত্তার পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়েছে। নিরাপত্তা সনদ নিজ দেশ থেকেই পাওয়া গেছে, ইমেলে। তারপর সেই সনদ নিয়ে যেতে হয়েছে নিবন্ধন বিভাগে। সেখানে পাসপোর্ট তথ্য যাচাই করে, একই সাথে ফটো তুলে তৈরি করা হয় পরিচয়পত্র। পরিচয়পত্র নিয়ে নিরাপত্তার সর্বশেষ আনুষ্ঠানিকতা শেষে সম্মেলন কেন্দ্রে প্রবেশ।

সুপরিকল্পিত আয়োজন। দৈনিক খাবারের জন্য আলাদাভাবে ত্রিপল টানিয়ে ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইংরেজিতে নির্দেশ, লোকেশন ম্যাপ, ইংরেজিভাষী পুলিশ। আবর্জনা ব্যবস্থাপনা। সবকিছু গুছানো। সবশেষে সীমাহীন খাবারের আয়োজন নিয়ে গণ বুফে। আন্তর্জাতিক খাবারের বিশাল মেলা। সবার জন্য। কয়েকটি কক্ষ নিয়ে আয়োজিত হয় এই খাবারের মেলা। খেলাম এবং ঘুরে ঘুরে তদন্ত করলাম, কোথাও কোন ঘাটতি আছে কিনা। পেলাম না। হাজার মানুষ একসাথে খেলেন, কোনকিছুর অভাব ছিল না। আমার মতে এটি ছিলো সম্মলনের বড় আকর্ষণ। কোরিয়ান আয়োজকরা দেখিয়ে দিলো যে, তারা যতই হিসেবি হোক না কেন খাবারের বেলায় ততটা হিসেব করে না।

 

মোবাইল ফোনে তোলা কিছু ছবি:

 

001 002 003

3-Rasheda Chowdhury 2-Ilha Yi President 1-Ban Ki Moon

013 012 011

008 007 005 004


7-Exhibition Stall
4-Group PHoto

শেষ ছবিটি শুধুই গুড নেইবার্স প্রতিনিধিদের।

 

 

তাৎক্ষণিক প্রকাশ: ৪ঠা জুন ২০১৬/ সামহোয়্যারইন ব্লগ/ পাঠকপ্রতিক্রিয়া

যেসব কাজ করে আমাদের শিক্ষকেরা শিশুদের মেধা ও সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করছেন!

8

তুমি আছো তবু তুমি নেই!  পরিস্থিতি ঠিক এরকমই।  শিক্ষক উপস্থিত, প্রতিদিন পড়াচ্ছেন, পরীক্ষা নিচ্ছেন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন করছেন -তবুও যেন তিনি নেই।  ঘাটতি কাটছে না।  এই ঘাটতি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে খুঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে।  শিশুদের বিকাশকে করছে বাধাগ্রস্ত।  এমন কয়েকটি বিষয় নিয়ে বর্তমান লেখাটি।

 

আমাদের দেশে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের হার মাত্র ৫৭.৭৩ শতাংশ।  অর্থাৎ ৪২ শতাংশ শিক্ষক কোন প্রায়োগিক ধারণা ছাড়াই আমাদের শিশুদের মুখোমুখি হচ্ছেন।  এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা চাকরির আগেই প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, নাকি পরে নিয়েছেন, সেটি অবশ্য স্পষ্ট নয়।

তবে বাস্তব চিত্রটি আরও বিপদজনক, কারণ ব্যক্তিগতভাবে বেড়ে ওঠা বিদ্যালয়গুলো এই প্রতিবেদনে নেই। পৌর এলাকায় ছত্রাকের মতো বেড়ে ওঠা ইংরেজি মাধ্যম এবং কেজি স্কুলগুলোও এখানে নেই।  কিছু সুপরিচিত বিদ্যালয় বিষয়ভিত্তিক পাঠদানের ওপর তাদের শিক্ষকদেরকে প্রশিক্ষণ দিলেও, শিশু মনস্তত্ত্ব বা শিশুর অন্যন্য চাহিদাকে কেন্দ্র করে কোন প্রশিক্ষণ প্রায় নেই।  এটি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক (বিএড অথবা এমএড পর্যায়ে) শিক্ষায়ই থাকে।

শিশুর বয়স অনুপাতে পাঠদান এবং পাঠ মূল্যায়ন করতে পারা একটি বিশেষায়িত জ্ঞান।  প্রশিক্ষণ অথবা বাস্তব অভিজ্ঞতা কোন কিছুই নেই, এমন শিক্ষকই বেশি থাকায় শিশুর চাহিদার বিষয়টি উপেক্ষিত থাকছে।

শিশুর মনমানসিকতা এবং তাদের বৈচিত্রময় চাহিদাকে না বুঝে আমাদের অধিকাংশ শিক্ষক প্রায় জোর করেই পাঠ্যপুস্তককে গলাধকরণ করাচ্ছেন। ফলে শিশুরা তাদের উপযুক্ত পাঠ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং বিদ্যালয় হয়ে যাচ্ছে পরীক্ষা পাশ করানোর এজেন্সি।

 

এমন একটি পরিস্থিতি যে, এসব ভয়ংকর পরিস্থিতি নিয়ে তাত্ত্বিকভাবে অনেক কিছুই বলার সুযোগ আছে।  অনেক প্রায়োগিক ত্রুটি হচ্ছে, যা স্থায়ি প্রভাব ফেলছে শিশুদের প্রতিভা বিকাশে।  এবিষয়ে বিস্তারিত বললে পাঠকের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটবে।

কিন্তু কিছু মৌলিক বিষয়ে আমাদের মতো আমজনতার সচেতনতার প্রয়োজন।  তা না হলে পারস্পরিক জবাবদিহিতা গড়ে ওঠবে না।  তাতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠতে পারে।  তাই শুধু মৌলিক কিছু বিষয় নিয়ে বর্তমান লেখাটি।

 

শিশু মনস্তত্ত্ব বিষয়ে প্রায়োগিক জ্ঞান না থাকায় অনেক শিক্ষক ‘ঠিক এভাবে’ শিশুদের প্রতিভার বিনাশ করছেন:

 

1

১) অপ্রয়োজনীয় শব্দ/বিষয়/পরিভাষাকে পাঠের মূল বিষয় হিসেবে পরিচিত করিয়ে

বাঁশে তেল মাখার পর এটি কেন অথবা কীভাবে পিচ্ছিল হয় শিশুকে এসব বুঝার আগেই, তৈলাক্ত বাঁশ দিয়ে বানরের ওঠানামাকে পাটিগণিতের মূল বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।

নীলনদ মিশরের আশির্বাদ, পক্ষান্তরে হুয়াংহু চিনের দুঃখ; অথবা হাওয়াই রাজ্যের রাজধানী হনুলুলু এসব বিষয় মুখস্থ করানোর জন্য এদেশে শিশুদের ওপর শারীরিক নির্যাতন হয়েছে।  অথচ নিজের দেশের তিনটি প্রধান নদীর অবস্থানকে সেভাবে শেখানো হয় নি।  নিজের গ্রামের পাশের শাখা নদীটি কোথা থেকে  এলো, অথবা এটি আদৌ নদী নাকি নদ, সেটিও সেভাবে বুঝানো হয় নি।

‘ডাক্তার আসিবার আগেই রোগী মারা গেলো’ এর ইংরেজি অনুবাদ করতে পারাকে ইংরেজির জ্ঞান বলে তুলে ধরা হয়েছে।  কথা বলা নয়, অনুবাদ আর শব্দার্থ শিখতে পারাকেই ভাষাজ্ঞান বলে বিশ্বাস করানো হয়েছে।  ফলে তারা অনুবাদ শিখলেও ভাষাগত জ্ঞান থেকেছে অধরা।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটিই এমন।  যখন যা প্রয়োজন, তখন সেটি  শেখানো হয় নি। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় পরিভাষা, বয়সের অনুপযুক্ত ইতিহাস ও ভূগোল শেখানোর জন্য শিশুর মনস্তত্ত্বে স্থায়িভাবে আঘাত হানা হয়েছে।

 

2

২) অনুপযুক্ত বিষয় চাপিয়ে দিয়ে

পাঠদানকে সহজ করা অথবা ‘বোধগম্য অংশে’ ভাগ করা শিক্ষকের প্রাথমিক দায়িত্ব।  প্রশিক্ষণের অভাবে হোক, অথবা প্রতিশ্রুতিশীলতার অভাবে, অধিকাংশ শিক্ষক সেটি করেন না।

উপরন্তু, শিশুদের জন্য যা উপযুক্ত নয়, সেসব বিষয় চাপিয়ে দেন: যা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন, সেটি দেওয়া হয় মুখস্ত করার জন্য।  যে বিষয় দেওয়া হয় শুধুই প্রাথমিক ধারণা দেবার জন্য, সেটি প্রয়োগ করতে বাধ্য করা হয়।

লেখা থেকে শোনা, তারপর পড়া, তারপর শেখা।  তারপর প্রয়োগ।  শব্দ রচনা থেকে বাক্য রচনা।  বাক্য থেকে অনুচ্ছেদ। তারপর রচনা বা চিঠি।  এসব পারম্পরিক প্রক্রিয়া আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে অনুপস্থিত।

রচনা, চিঠি, ভাবসম্প্রসারণ, অনুচ্ছেদ – এসব বিষয় শিশুদের স্বাভাবিক চিন্তা থেকে আসা উচিত।  এখানে শুদ্ধতা নয়, চর্চাকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।  কিন্তু একটি শুদ্ধ রচনা পরীক্ষার খাতায় লেখার জন্য শিশুদেরকে মুখস্ত করতে বাধ্য করা হয়।

রোট লানিং বা বোধহীন মুখস্ত করার প্রবণতা শিশুদের স্বাভাবিক বিচার শক্তিকে নষ্ট করে দেয়।

আমাদের শিশুরা সৃজনশীল কোনকিছু লেখতে পারে না।  ইংরেজি কী লেখবে, বাংলাই তো লেখতে শিখে নি!

 

 

3

৩) নিজেই সবকিছু করে দিয়ে

পাঠ্যবইয়ে লেখাই থাকে ‘নিজে করো’।  কিন্তু দয়ার্দ্র্য শিক্ষক সেটি শিশুকে দিয়ে করাতে চান না!

পাঠ্যবইয়ের অনেক বিষয়ই শিশুরা হয় ‘একা অথবা দল’ হিসেবে করে ফেলতে পারে।  তাতে শিক্ষকেরও শ্রম কমে যায়।  কিন্তু শিক্ষক সেটি না বুঝার কারণে, অথবা নিজের প্রয়োজনীয়তা অটুট রাখার জন্য, শিক্ষার্থীদেরকে নিজে থেকে কিছু করাতে চান না।

শিশুরা চ্যালেন্জ নিতে এবং নিজেই কিছু করে দেখাতে পছন্দ করে।  কিন্তু অনেক শিক্ষক শিশুদের এই স্বাভাবিক প্রবণতাকে শিক্ষাদানের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

ফলে শিশুরা পরনির্ভশীলতা থেকে ওঠে আসতে পারে না। পাঠ্যবইয়ের বাইরে তারা কিছুই করতে বা লেখতে বা সৃষ্টি করতে পারে না।

বড় ক্ষতি হলো, তারা নিজে থেকে কিছুই করার সাহস পায় না, কারণ শিক্ষাজীবনে এই অভ্যাসটি তাদের গঠিত হয় নি।

 

 

4

৪) নিজের দায়িত্ব পালন না করে

পাঠপরিকল্পনা না করা।  এই অভ্যাসটি প্রায় নেই বললেই চলে।  আমাদের শিক্ষকেরা ক্লাসের আগে পাঠপরিকল্পনা (লেসন প্লান) তৈরি করাকে অতিরিক্ত কাজ বলে মনে করেন। অথচ এটি তাদেরই পেশাগত দক্ষতাকে শানিত করে।  পরিকল্পনা ছাড়া কার্যকর এবং অংশগ্রহণমূলক পাঠদান অসম্ভব।

পরীক্ষা এবং শ্রেণীকক্ষ ভিত্তিক পাঠদানের জন্য উপযুক্ত প্রস্ততি না নেওয়া।  যেহেতু দৈনন্দিন পাঠদানের জন্য কোন পূর্বপ্রস্তুতি নেই, একই কারণে পরীক্ষা বা গুরুত্বপূর্ণ কোন মূল্যায়নের জন্য শিশুরা কার্যকর দিকনির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হয়।

কোন্ বিষয়টি শিশুদের বৈচিত্রময় সামর্থ্যের সাথে সাংঘর্ষিক, শিক্ষক এসব বিষয়ে ধারণা রাখেন না।  ফলে কঠিন বিষটি তাদের দায়িত্বহীনতার কারণে আরও কঠিন হয়ে আবির্ভূত হয় শিশুদের মাঝে।

নিয়মিত শিক্ষার্থীদের সাথে না থাকা।  কিছু বিশেষ সময় শিশুদের দরকার হয় শিক্ষকের সঙ্গ – মাবাবার কার্যকারিতা কম। শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে থেকেও শিশুদের থেকে অনেক দূরে থাকেন।  সেটি মনস্তাত্ত্বিক অথবা ভৌগলিক উভয়ই হতে পারে।

একটি কঠিন বিষয়ের সমাধানের সময়, শিক্ষকের সাহচর্য্য প্রয়োজন।  শিক্ষক তার ব্যক্তিত্ব ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ দিয়ে নিজেকে শিশুদের মধ্যে ‘এভেইলেবল’ রাখবেন, এটিই প্রত্যাশিত।  এই প্রত্যাশিত আচরণটি শিক্ষকদের মধ্যে পাওয়া যায় না।

অভিভাবকদেরকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত না করা। শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন বিদ্যালয় এবং অভিভাবকের সমন্বিত প্রচেষ্টা।  অভিভাবককে যথাসময়ে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, যা অনেক শিক্ষক পালন করেন না, অথবা এর গুরুত্ব মূল্যায়ন করেন না।

 

 

5

৫) শুধুই পাঠ্যপুস্তকের অনুশীলনী মোতাবেক পাঠদান করে

পাঠ্যপুস্তকে দেওয়া অনুশীলনী মোতাবেক পাঠদান করা সহজ, তার প্রধান কারণ সেটি বাজারের নোটে সমাধান করা আছে। দ্বিতীয় কারণ হলো, এতটুকুতেই শিক্ষক অভ্যস্ত।

পাঠ্যপুস্তকের বাইরে যাওয়া কঠিন, কারণ তাতে শিক্ষকের অতিরিক্ত চিন্তা করতে হয়। ভালোমতো ভাবতে না পারলে শিক্ষার্থীদের কাছে বিব্রত হবার সম্ভাবনা।  বিব্রত হবার ভয় আছে, কারণ আমাদের শিক্ষকেরা ‘সবজান্তা’ হিসেবেই নিজেকে প্রদর্শন করতে চান।

কিছু বিষয়ে ঘাটতি থাকতে পারে, কিছু বিষয় শিক্ষার্থীদের সমবেত চেষ্টা থেকে বের হয়ে আসতে পারে।  এটি আমাদের অধিকাংশ শিক্ষক বিশ্বাস করতে নারাজ।

পাঠ্যবইয়ের বিষয় নিয়েই অতিরিক্ত প্রশ্নপত্র সৃষ্টি করা যায় এবং তাতে শিশুদের মধ্যে আগ্রহ ও কৌতূহল বৃদ্ধি পায়।  নতুন বিষয়কে সমাধান করে তারা আনন্দ পায়।  বড় সুফল হলো, তাদের দক্ষতার বিস্তৃতি ঘটে।

পাঠ্যপুস্তকে সীমাবদ্ধ থাকার এই প্রবণতার ভয়ংকর দিকটি হলো, শিশুরা পাঠ্যবিষয়কে জীবনের সাথে মেলাতে পারে না।  পাঠ্যবইয়ে গুরুজনকে সালাম জানাবার বিষয়টি শিখে পরীক্ষার খাতায় লেখে আসলেও, সামনে কোন বয়স্ক ব্যক্তিকে পেলে তারা সম্মান জানাতে ভুলে যায়।

জীবন আটকে যায় পাঠ্যপুস্তকের পাতায়।

 

 

6

৬) পরীক্ষা/গাইডবুকমুখী পাঠদান করে

প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিটি আবশ্যিক বিষয়ে ‘শিক্ষক সহায়িকা’ আছে।  প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষক সেটি অনুসরণ করেন না।

অপ্রত্যাশিত হলেও, এটি প্রচলিত সত্য যে, পরীক্ষার লক্ষ্যেই তারা পাঠদান করেন।  আমাদের সমাজে শিক্ষক  এবং অভিভাবকের যৌথ প্রয়াসটি হলো: বিদ্যাদান নয়, পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি প্রদান করা।

যেহেতু পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতেই হবে, সেহেতু গাইড বই পড়ো।  গাইড পরীক্ষায় পাশ করালেও, এটি সবসময়ই জীবনের দিকনির্দেশনায় ‘মিসগাইড’ করে।

ফলে শিশুরা বিদ্যার জন্য পড়ার সুযোগ বা স্বাধীনতা কিছুই পায় না। এমনকি নিজের চেষ্টায় ‘স্বাভাবিক সামর্থ্য  দিয়ে পাশ করার’ সুযোগ থেকেও তারা বঞ্চিত।  কৃত্রিম উপায়ে জিপিএ ফাইভ পাওয়াতে পারলেই আমাদের শিক্ষকগণ খুশি।

অধিকাংশ শিশুদের তাদের ঐকান্তিক চাওয়া ও স্বপ্নের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে যুক্ত করতে পারে না।

 

 

7

৭) পাঠ্যপুস্তকই জীবনের সবকিছু, বাকি সব অপাঠ্য -এমন ধারণা দিয়ে

“আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, স্বশিক্ষাই একমাত্র শিক্ষা।” বলেছেন আইজাক আসিমভ।  প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হয়তো পরীক্ষায় পাশ করায়, কিন্তু প্রতিষ্ঠিত সত্য হলো,  কর্মসংস্থানের পরীক্ষায় এসে সকলেই একবার করে হাবুডুবু খেতে হয়।

পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের শিক্ষক (এবং অভিভাবকেরা) পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞানকেই বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় মনে করেন।  তাদের এই অপবিশ্বাস তারা শিশু এবং সন্তানদের মধ্যেও ইনজেক্ট করেন।  অবুঝ শিশুরা তখন কিছুই বুঝতে পারে না, যে পর্যন্ত না জীবনের প্রধান পরীক্ষা অর্থাৎ কর্মসংস্থানের মুখোমুখি হচ্ছে।

পরিণতি হলো ঘরকুনো হয়ে শুধুই পাঠ্যপুস্তকের বিষয় গলাধকরণ করা।  পরীক্ষা, শিক্ষক আর অভিভাবকের  সমবেত চাপের কারণে নিজেদের পছন্দের বইটিও তারা পড়তে পারে না।  বরং ‘আউট বই’ পড়াকে তারা অপরাধ হিসেবেই বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছে।

নজরুলের মতো উড়নচণ্ডেরাই প্রতিভাবান হয়। মাটির সাথে যুক্ত না থাকলে যেমন তরু বাঁচে না, প্রকৃতি থেকে বিযুক্ত শিক্ষা কখনও ফলদায়ক হতে পারে না।

এরকম একমুখী চাপের কারণে শিশুরা তাদের স্বাভাবিক জ্ঞানার্জন ও প্রাকৃতিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়।

 

 

আমাদের শিক্ষানীতিতে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু শ্রেণীকক্ষের পাঠদানকে উন্নয়ন করার জন্য বিশেষ কোন ব্যবস্থা আজও নেওয়া হয় নি। পাঠদান সম্পর্কে মৌলিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই এদেশে চাকরি পাওয়া যায়।

আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঘিরে বিস্তর গবেষণা হচ্ছে।  অনেক উন্নয়নও হচ্ছে।  কিন্তু উন্নয়নের নামে যখন শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করা হয়, তখন ধরেই নেওয়া যায় যে, প্রাথমিক শিক্ষার কোন ভবিষ্যত নেই।

 

[প্রথম প্রকাশে লেখাটি ৬২০০ বার শেয়ার হয়েছে:  সামহোয়্যারইন ব্লগ/ ১০ এপ্রিল ২০১৬]

 

বিদ্যালয় আমারে শিক্ষিত হতে দিলো না

▶সাউথপোলার অথবা স্বশিক্ষিত ক্ষণজীবীরা [৬ অগাস্ট ২০১৬]

 


 

টীকা:

১) ব্যতিক্রম কি নেই: ইচ্ছাকৃতভাবেই কিছু বিষয়কে সরলিকরণ করা হয়েছে, যেন প্রচলিত শিক্ষাদান পদ্ধতিতে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা যায়।  আমার জানামতেই অনেক শিক্ষক এবং অভিভাবক আছেন, যারা শিশুদের সৃজনশীলতাকে প্রেরণা দেবার জন্য নিজেদের ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়াকে বিসর্জন দিয়েছেন। এমন রত্নগর্ভা মাতা আমাদের মধ্যে আছে।  দুঃখের বিষয় হলো, তাদের সংখ্যাটি খুবই নগণ্য।

২)  শিক্ষানীতিও কি দায়ি নয়:  প্রজাতন্ত্র হোক কিংবা রাজতন্ত্র, রাষ্ট্রই সবকিছু নির্ধারণ করে দেয়। যার ক্ষমতা, তারই দায় থাকে।  শিক্ষানীতিই সবকিছুর জন্য দায়ি। এবিষয়ে আলাদাভাবে লেখার খায়েশ আছে।

৩) দৃষ্টান্তগুলো কি পর্যাপ্ত: দৃষ্টান্তগুলো কেবলই একেকটি প্রতীক।  এগুলোর যথার্থতার চেয়ে প্রাসঙ্গিকতাকে বেশি বিবেচনা করা হয়েছে।

৪) সৃষ্টিহীন শিক্ষা কি স্রষ্টাহীন দেশের জন্য দায়ি:  পশ্চিমারা শিক্ষায় আবিষ্কারে অভিযানে এগিয়ে থাকে, এটিই যেন স্বাভাবিক। গুটি কয়েক জগদীশ, রবীন্দ্রনাথ আর ফজলুর রহমান ছাড়া এদেশে আর কোন প্রতিভাবান নেই বা ছিল না। কেন নেই, কেন ছিল না সেটি নিয়ে মাঝে মাঝে ভাবিত হই।  দেশের সৃষ্টিহীন শিক্ষা ব্যবস্থা কি এর জন্য দায়ি?

 

 

 

ইংরেজি ৩য় পত্র: শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইংরেজির ভীতি দূর করার পরীক্ষিত উপায়

১.  ইংরেজি ৩য় পত্র কোথা থেকে আসলো

গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের বাইরে পড়ালেখার সুযোগ খুবই সীমিত। অনেক শিক্ষার্থী বাড়িতে পড়াশুনার অনুকূল পরিবেশ পায় না। প্রাইভেট পড়াও সকলের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না।  ফলে গণিত এবং ইংরেজির মতো জটিল বিষয়গুলোতে তাদের আজন্ম ভয়। পরিবেশ এমন দাঁড়িয়েছে যে, নিজের চেষ্টাটুকুও করার প্রেরণা তারা পায় না। অতএব, শুধু দু’একটি বিষয়ে দুর্বলতার জন্য তারা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়।

সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, পল্লী অঞ্চলের যেসব শিক্ষার্থী পাবলিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়, তাদের অধিকাংশই (প্রায় ৮০ শতাংশ) ইংরেজিতে দুর্বলতার কারণে।  গণিত হয়তো চর্চা করলেই হয়ে যায়, কিন্তু ইংরেজি বিষয়ে বাস্তব কোন চর্চার সুযোগ তাদের নেই। প্রাইভেটে যা পড়ানো হয়, তাও শুধুই পরীক্ষা পাশকে লক্ষ্য করে।  প্রায়োগিক জ্ঞান তাদের প্রায় শূন্যে।  অধিকাংশ শিক্ষক প্রায়োগিক ধারণা রাখেন না, কারণ তারাও পরীক্ষা পাশের জন্যই ইংরেজি শিখেছিলেন। এভাবেই এগিয়েছে আমাদের বিদ্যালয়ভিত্তিক ইংরেজির চর্চা!

তবু এদের ভেতর থেকেই যারা মেধাবী শিক্ষার্থী হয়ে বেরিয়ে এসেছে, তাদের ইংরেজি দক্ষতার বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে স্নাতক পাশের পর। উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত তাদের ইংরেজির চর্চা পরীক্ষা পাশ পর্যন্তই আবদ্ধ থাকে।

এর পরিণতি সকলেরই জানা।  উচ্চমাধ্যমিক কেন, স্নাতক পাশ করেও আমাদের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি পত্রিকার পাঠোদ্ধার করতে পারেন না, অথবা ইংরেজিতে স্বাধীনভাবে কথোপকথন চালিয়ে যেতে পারে না।  ইংরেজিতে একটি দরকারি চিঠি বা ইমেল লেখতে গেলে তাদের আঙ্গুল ভাঙ্গে।

এসবই হলো, পরীক্ষামুখী শিক্ষাব্যবস্থার ফল।  আমাদের দেশে শিক্ষার্থীরা মূলত পরীক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত। পরীক্ষাই তাদের বিদ্যার্জনের একমাত্র লক্ষ্য, জীবনে প্রয়োগ নয়।

বাস্তবক্ষেত্রে এর পরিণতি আরও ভয়াবহ। ইংরেজি বিষয়টি বাধ্যতামূলক হলেও কর্মক্ষেত্রে গিয়ে অনেক স্নাতক/স্নাতকোত্তর পাশ শিক্ষার্থী ইংরেজিতে যোগাযোগ রক্ষা করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে।  ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা দিয়ে অনেকে উতড়ে যায়, কিন্তু অনেকেই ছাত্রজীবনের ভীতি কাটিয়ে ওঠতে পারে না।

ইংরেজি ১ম পত্র এবং ২য় পত্রে শিক্ষার্থী যতই ভালো করুক, বাস্তব ক্ষেত্রে তাদের জ্ঞান পরীক্ষার খাতা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। এর কারণ হলো, তারা সীমিত কয়েকটি অধ্যায় পড়ে আর কয়েকটি রচনা ও দরখাস্ত মুখস্থ করলেই ইংরেজিতে পাশ করতে পারে।  কমিউনিকেটিভ ইংরেজি প্রবর্তন করার পরও গাইড বইয়ের বহুল প্রচলনের কারণে শিক্ষার্থীরা যথেষ্ট চর্চা ছাড়াই পরীক্ষার জন্য ‘দারুণ প্রস্তুতি’ গ্রহণ করতে পারে।  পরীক্ষায় হয়তো এ+ গ্রেইডও পেয়ে যায়।  তারপরও তারা বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষা অতিক্রম করতে পারে না।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ইংরেজি প্রথম এবং দ্বিতীয় পত্রকে প্রয়োগমুখী করতে পারে নি। এটি শুধু ইংরেজির ক্ষেত্রে নয়, সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কর্তৃপক্ষ  হয়তো করতে চেয়েছে, কিন্তু শিক্ষক আর পুস্তক ব্যবসায়ীদের যৌথ অসহযোগিতার কারণে ইংরেজি শিক্ষা প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারে নি।

 

এখানে আরেকটি সমস্যা হলো, শিক্ষার্থীরা ‘শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায়’ এই ঘাটতির কারণ বুঝতে পারে না। বুঝতে চায়ও না।  তাদের দরকার পরীক্ষায় পাশ এবং তাদের শিক্ষকও সেপথই দেখায়। এ ত্রুটি পদ্ধতিগত।  এককভাবে শিক্ষকদেরকে দায়ি করা যায় না।

 

২.  ইংরেজি ৩য় পত্রের প্রেক্ষিত

গ্রামীণ এলাকার পিছিয়ে-পড়া শিক্ষার্থীদের অসচেতন ঘাটতিকে পূরণ করার জন্য ইংরেজি ৩য় পত্রের প্রচলন করা হয়েছে। অনেকটা পরীক্ষামূলকভাবেই এ পদ্ধতির শুরু। শিক্ষার্থীকে পরিপূর্ণভাবে ইংরেজি শিক্ষাদানে ১ম পত্র এবং ২য় পত্রের ঘাটতির পটভূমিতে ২০০৫ সালে ইংরেজি ৩য় পত্রের শুরু হয় একটি গ্রামীণ বিদ্যালয়ে।

ঘাটাইলের (টাঙ্গাইল) গুডনেইবার্স হাই স্কুল এবং প্রতিবেশী প্রাইমারি স্কুলে তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ইংরেজি ৩য় পত্র বাধ্যতামূলক করা হয়।  ফলে তৃতীয় শ্রেণী থেকেই শিক্ষার্থী তার শিক্ষকের সাথে একটু একটু করে ইংরেজিতে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে।  সুুযোগ পেয়েছে না বলে বলতে হয়, ইংরেজি বলতে তারা বাধ্য হয়েছে।

পাঠ্যপুস্তকের (১ম পত্র) বিষয়কেই অনানুষ্ঠানিক পরিবেশে উপস্থাপন করা হয়েছে শিক্ষার্থীদের কাছে। অতিরিক্ত বিষয় হওয়াতে, এটি তাদের মানসিক চাপের কারণ হয় নি। কিন্তু আনন্দের বিষয় হয়েছে, কারণ পরীক্ষা পদ্ধতির সরলতা।

ইংরেজি ৩য় পত্রে শিক্ষককে প্রশ্ন তৈরি আর উত্তরপত্র মূল্যায়ন  ছাড়া বাড়তি কোন কিছুই করতে হয় না। সিলেবাস এবং প্রশ্ন সম্পর্কে পূর্বেই ধারণা দেবার কারণে শিক্ষার্থীরা নিজে থেকেই প্রস্তুতি নিতে পারে।

ইংরেজি ৩য় পত্রের আরেক নাম প্রাকটিস ইংরেজি বা প্রায়োগিক ইংরেজি। প্রথম পত্রের (সাহিত্য) সিলেবাস থেকে ‍পরিকল্পনা করা হয়েছে প্রাকটিস ইংলিশ-এর। এর দু’টি অংশ ক) মৌখিক পরীক্ষা এবং খ) লিখিত পরীক্ষা, ‘আনসিন’ অংশ থেকে।

একই পাঠ্য পুস্তক থেকে অতিরিক্ত পরীক্ষা দেবার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষার্থীরা যে উপকারটি পায়, তা হলো পাঠ্য বিষয়ের ওপর তাদের স্বাভাবিক আকর্ষণ।  ফলে ১ম এবং ২য় পত্রে তাদের অকৃতকার্য হবার সম্ভাবনাও আর থাকে না।

ঘাটাইলের স্কুলটিতে ইংরেজি ৩য় পত্র প্রচলনের এক বছর পরই দেখা গেলো যে, ইংরেজি বিষয়ে অকৃতকার্যতার হার কমে যাচ্ছে। পাবলিক পরীক্ষায় প্রস্তুতি গ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা বলতে শুরু করলো, “ইংরেজিতে আমার ফেইল করার কোন আশংকা নেই। আমার ভয় ‘অমুক বিষয়ে’ বা গণিতে ইত্যাদি…”  তখন তাদের ভয় কেবল একটি বিষয়ে নেমে আসে, সেটি হলো গণিত।

স্ব স্ব শ্রেণীর ইংরেজি বিষয়ের ওপর যে শিক্ষার্থীদের ভয়টুকু কেটেছে, এটিই ছিল ৩য় পত্রের প্রাথমিক সুফল। উদ্দীষ্ট সুফল হলো, কথা বলতে পারা এবং ইংরেজিতে শব্দভাণ্ডার সৃষ্টি করা।  পরবর্তি অনুচ্ছেদগুলোতে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

 

English 3rd Paper

৩.  উদ্দেশ্য/ প্রত্যাশিত উপকারিতা

ইংরেজি ৩য় পত্রের সুফল ইতোমধ্যেই আলোচনা করা হয়েছে। অতি সংক্ষেপে বললে, ইংরেজি তৃতীয় পত্রের উদ্দেশ্যগুলো হলো নিম্নরূপ-

ক) ইংরেজি পাঠ্যবিষয়ে শিক্ষার্থীর উপলব্ধি বা বোধশক্তি বৃদ্ধি করা

খ) শিক্ষার্থীকে প্রায়োগিক ইংরেজিতে দক্ষ করে তোলা

গ) পরীক্ষা পাশের চাপ থেকে মুক্ত থেকে শেখার জন্য ইংরেজির চর্চাকে উৎসাহিত করা

ঘ) আত্মঅধ্যয়নে উৎসাহিত করে ইংরেজির প্রতি শিক্ষার্থীর সাধারণ ভীতি দূর করা এবং

ঙ) ইংরেজির ভিত্তি মজবুত করে ইংরেজি শিক্ষকের জন্য শ্রেণীকক্ষের পাঠদান সহজতর করা।

 

৪.  প্রক্রিয়া/ প্রয়োগের পদ্ধতি

  • মোট নম্বর ১০০। দু’টি সমান ভাগ:  লিখিত ৫০ এবং মৌখিক ৫০।
  • মৌখিক ৫০। ওরাল টেস্ট। ১৫টি প্রশ্ন, মান ৩ =৪৫। আচরণে ৫।  মোট ৫০।  একটি পরিপূর্ণ উত্তরের জন্য ৩।  প্রশ্ন বুঝে ‘মোটামুটি’ সঠিক উত্তর দিতে পারলে ২।  উত্তরে যদি বুঝা যায় প্রশ্নটি শিক্ষার্থী বুঝতে পেরেছে তবে ১ নম্বর পাবে।  এবিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশ আছে।
  • লিখিত ৫০।  কমপ্রিহেনসিভ টেস্ট। শূন্যস্থান পূরণ ২০, সত্যমিথ্যা ১০, শব্দার্থ ১০, বাক্যতৈরি ৫, শ্রোতলিপি ৫ =৫০।
  • মৌখিক এবং লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরি করা হয় সংশ্লিষ্ট শ্রেণীর ইংরেজি ১ম পত্রের ‘পাঠদানকৃত’ অংশ থেকে।
  • লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরি এবং পরীক্ষকদের আচরণ নিয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা আছে। এর মাধ্যমে পরীক্ষার বস্তুনিষ্ঠতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা হয়।

 

৫.  অভিজ্ঞতা

চালু হবার পর পাঁচ বছর এক নাগারে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।  শিক্ষার্থীদের ইংরেজির ভিত শুধু মজবুত হয়, তা নয়।  তাদের ভয় কেটে যায় স্থায়িভাবেই।  অসচেতন দুর্বলতা অসচেতনভাবেই দূরীভূত হয় ইংরেজি ৩য় পত্রের মাধ্যমে।

যারা ওই পাঁচ বছরের মধ্যে লেখাপড়া করেছিল, তারা উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ে ভালো ফলাফল করেছে।  অনেকেই ইংরেজি বিষয়ে ‘সম্মান’ পড়ার প্রেরণা পেয়েছে এবং ভালো ফলাফল করেছে।

এরই মধ্যে পাশ্ববর্তি প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি ৩য় পত্র শুরু করেছে। wisdom-valley

অভিজ্ঞতা বললে এই প্রবন্ধ শেষ করা যাবে না।  একটি গবেষণার বিষয় হতে পারে।  তবে পরবর্তি কোন পোস্টে এবিষয়ে আরও লেখার চেষ্টা করবো।

 

 


লেখার সূত্র:  ইংরেজি বিষয়ে ৪বছরের প্রত্যক্ষ শিক্ষকতা,  ৮ বছর বিদ্যালয় পরিচালনা এবং ইংরেজি শিক্ষকদের সংগঠন পরিচালনার সময়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধান।  ইংরেজি ৩য় পত্র একটি প্রয়োগসিদ্ধ পদ্ধতি।

 

 

ইংরেজি ৩য় পত্রের বয়স তখন তিন।

ইংরেজি ৩য় পত্রের বয়স তখন তিন।

 

আমার ইংরেজি (না) শেখার কারণগুলো: “বাক্যের একক শব্দ”

VF9UBSGE86BA

স্কুল এবং কলেজ মিলিয়ে এক যুগ সাধনা করেও আমরা কেন ইংরেজি বলতে বা লিখতে পারছি না, সেটা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে, এবং হচ্ছে। গবেষণা সফল হলেও গবেষণার ফল প্রমাণিত হচ্ছে না। অর্থাৎ উচ্চমাধ্যমিক পাস করেও বাস্তবিকভাবে আমরা ইংরেজিতে কথা বলতে পারি না। পৌর এলাকায়, বিশেষত যারা অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত সমাজে বড় হচ্ছে, তারা কিছু সফলতা দেখালেও, জাতীয়ভাবে সমীকরণ টানলে, ফলাফল একই আসে। বিজাতীয় ভাষা নিয়ে এটি এক জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। আমরা যদি একক সমস্যার দিকে দৃষ্টিপাত করি, তবে কিছু তথ্য বের হয়ে আসতে পারে। আমরা নিজেদের কথাই বলি। ইংরেজিতে নিজেদের দুর্বলতার কারণ নিয়ে, নিজের শিক্ষাজীবনে যদি ঢুঁ মারি, তবে কী পাই? ইংরেজি ভাষাটিতে আমার ব্যর্থতা বা অনীহার সূত্র কোথায়? গ্রামার জানার পরও কেন আমি ইংরেজি বলার সময় শব্দ হাতড়িয়ে বেড়াই? ফ্লূয়েন্সি বাড়ানো বা সাবলীলভাবে ইংরেজি বলতে পারার জন্য আমি অনেক পথই মাড়িয়েছি। গ্রামার পড়েছি, শিখেছি। বাজারে প্রচলিত সব ব্যবস্থাই আমি গ্রহণ করেছি এবং প্রতিটি মাধ্যম থেকেই আমি কিছু-না-কিছু শিখেছি, শিখিনি শুধু ইংরেজি।

আমি ৬০ দিনের র‌্যাপিড অ্যাকশন ইংলিশ স্পিকিং কোর্স-এর বই পড়েছি। ৬০ দিনের চুক্তিতে ইংরেজি শেখায়, এটি সেই বই। এই বই ‘সেবন করিবার পরে’ যারা উপকৃত হয়েছে, তাদের ছবিও আছে কাভারপেইজে। বইটি পড়ে আমি দেখেছি, ইংরেজি শেখাক বা না শেখাক, ভাষা একটি শিখিয়েছে তারা। মজার ব্যাপার হলো, বুঝতেই পারিনি যে, আমি ইংরেজি শিখছি, নাকি আসলে বাংলা শিখছি। সত্তর শতাংশ শব্দই বাংলা! প্রতিটি শব্দ ও এক্সপ্রেশন বাংলায় অনুবাদ করে দেওয়া হয়েছে। ইংরেজি শিখতে না পারলেও প্রচুর বাংলা এক্সপ্রেশন আমাকে নতুন করে শিখতে হয়েছিল। আমি শিখেছি, কীভাবে দোকানদারের সাথে শুদ্ধ বাংলায় দরকষাকষি করতে হয়; কীভাবে ডাক্তারের সাথে কথা বলতে হয়, বন্ধুর সাথে বা সহপাঠির সাথে কীভাবে মানসম্পন্ন বাংলায় কথা বলতে হয়। বুঝতে পারলাম, অন্তত বাংলার জন্য হলেও র‌্যাপিড অ্যাকশন শীর্ষক বইটির দরকার ছিল। বই কিনে কেউ দেউলে হয় না, এই সত্য এখনও অঠুট আছে!

এরপর আমি এফবি মেথডের অফিসে গেলাম। তারা একটি অসম্ভব কার্যকর ও যুগান্তকারী পদ্ধতিতে ইংরেজি শেখাচ্ছেন এবং এই বলে ব্যাপক ভিত্তিক প্রচার প্রচারণা চালিয়েছেন গত কয়েক দশক ধরেই। রাস্তাঘাটে দেয়ালে টিনের চালে খালের পাড়ে নদীর ধরে বাসের পেছনে রিক্সার পেছনে লঞ্চ-স্টিমারে সাইনবোর্ড-বিলবোর্ড-ব্যানারে পত্রিকা এবং ইলেকট্রনিক মাধ্যমে তারা প্রচুর বিজ্ঞাপন ছড়িয়েছেন। হেলিকপ্টার দিয়েও কিষাণ-কিষানীদের উদ্দেশ্যে বিজ্ঞাপন ফেলেছে কিনা, আমি শুনিনি। যা হোক, এফবি নামটি এসেছে সেই অসম্ভব মেথডের প্রতিষ্ঠাতা বা আবিষ্কারকের নাম অনুসারে। তার নাম ফাকিউল বুলু – শুনেছি বন্ধুরা তাকে ‘ফাঁকা বুলি’ নামে ডাকে। হয়ত জুনিয়ররা তাকে ডাকতো ফাকি ভাই বলে। জনাব ফাঁকা বুলি একটি সরকারি কলেজের ইংরেজির শিক্ষকও। এফবি মেথডের প্রথম ক্লাসে তিনি ইংরেজি শিক্ষার প্রচলিত পদ্ধতিকে ব্যর্থ এবং ত্রুটিপূর্ণ বলে, একটি জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিলেন। বলা বাহুল্য, তিনি নিজেও সেই ‘ঘৃণিত’ পদ্ধতিতেই ইংরেজি শিখে এফবি মেথডের উদ্ভাবক হয়েছেন! তার বাগ্মীতা এবং আত্মবিশ্বাস দেখে মুগ্ধ হলাম আমরা এবং বিশেষত আমি। আমি খুব সাবধানে প্রত্যাশার একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম: এবার তাহলে আমার ইংরেজি বলা হবেই! আর মিস্ নাই! এফবি মেথডে বাংলা বাক্যের ‘শেষ অংশটি’ দিয়ে ইংরেজি বাক্যটি তৈরি করার সূত্র ধরিয়ে দেওয়া হয়। প্রচলিত কিছু বাক্যের ইংরেজি করার জন্য এ পদ্ধতি একদম মন্দ নয়। এফবি মেথডে আমাকে দিয়ে শত শত বাক্য লেখানো হলো। সবই মেথড ভিত্তিক। মেথডের বাইরে গেলেই খবর আছে! মজার ব্যাপারটি হলো, ওই বাক্যগুলোর সবই এখন আমার খাতায় আছে। কারও সঙ্গে ইংরেজি বলতে গেলেও আমার মনে পড়ে, নির্দিষ্ট বাক্যটি আমার ‘এফবি মেথডের’ খাতায় লেখা আছে। কিন্তু বলার সময় বাক্যটি আমার মুখে ওঠছে না, কারণ খাতায় থাকলেও মাথায় ওঠেনি! কীভাবে ওঠবে, জনাব ফাকা বুলি ভাই, সে রকম কোন মেথড আমাকে দেননি যে!

 

আরও কিছু মেথড, পদ্ধতি, কৌশল এবং আরও কিছু স্পোকেন ইংরেজি সেন্টারে নাকানি-চোবানি খেলাম। তারপরও আমি বুঝতে পারলাম না: আমি কি গ্রামার বুঝি না, নাকি ইংরেজি বুঝি না? আমার দুর্বলতাটি আসলে কোথায়? কীভাবে আমি চেষ্টা করছি? আমি কি গ্রামার শিখি, নাকি ইংরেজি শিখি? আমার ইংরেজি শেখার লক্ষ্য কি গ্রামার শেখা, নাকি ইংরেজি শেখা? কোনটা আগে শেখা উচিত ছিল আমার: গ্রামার নাকি ইংরেজি (ভাষার প্রয়োগ)? শুধু কি চর্চার অভাবে আমার ইংরেজি বলা হচ্ছে না, নাকি অন্য কিছু?  আমি কি ‘বলতে’ দুর্বল, নাকি লিখতে দুর্বল? কোথায় আমার সমস্যা?

চর্চায় পাওয়া যায় জয়ের রহস্য। অনেক চর্চা হলো। কিছু উপাত্ত খুঁজে পেলাম, যা অনেকেই হয়তো গ্রহণ করবেন না। কেউ কেউ করবেন। রহস্যটি হলো ‘বাক্যের একক শব্দ’। বাক্য গঠন নয়, শব্দ এবং এর ব্যবহারই আগে শেখা দরকার। ভাষার একক যদি ধ্বনি হয়, তবে বাক্যের একক হয় ‘শব্দ’। বাক্য ছাড়া যেমন ভাষার পূর্ণতা আসে না, তেমনি শব্দ ছাড়া বাক্য হয় না। যে কোন ভাষা শেখার প্রথম সিঁড়ি হলো, পড়া। যেহেতু ইংরেজি ভাষাভাষী দেশে বাস করছি না, সেহেতু আমি শুনে শুনে ইংরেজি শিখতে পারি না। ইংরেজি কেন ‘লিখতে’ পারি না, সে কথায় পরে আসি। না পড়লে লেখবো কী?

প্রশ্ন হলো, আমি কেন ইংরেজি পড়তে পারি না? কারণ, শব্দ জানা নেই। ইংরেজি বাক্য বুঝার জন্য শব্দ জানা চাই। আমি শব্দ জানি না, তাই পড়তে আমার ভালো লাগে না। ছয় শব্দের একটি বাক্যে চারটি শব্দই আমার ‘জীবনে প্রথম দেখা’। সেই অজানা শব্দেরা আমার ওপর বোঝা হয়ে আসে – আমি আর এগুতে পারি না। পড়া বন্ধ করে দিই। অতএব ইংরেজি পড়তে আমার অনীহার সূত্র কোথায়? সূত্র একটিই, বাক্যের একক শব্দ। শব্দ জানি না, তাই বাক্য বুঝি না। অচেনা শব্দেরা আমার মনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। বিষয়টি এখন (২০০৫) আমার কাছে দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে গেলো।

 

গ্রামার! আসলে তুমি কী?  গ্রামার কি শুধুই সূত্রভাণ্ডার, নাকি শব্দভাণ্ডার? আমি গ্রামার শিখেছি – পার্টস অভ স্পিচ ন্যারেশন ইত্যাদি শিখেছি। শিখেছি টেনস ট্রান্সফরমেশন অভ স্পিচেস এজিকটিভ কেইস আর্টিকেল ভয়েস এবং অবশেষে ট্রান্সলেশন। যেকোন রকমের বাক্যকে ইংরেজিতে, প্রাকৃতিক ইংরেজিতে রূপান্তর আমি করতে পারি। আমি একজন সুদক্ষ ট্রান্সলেটর। ডাক্তার আসার আগে রোগী মারা গেলে, আমি সেটি ইংরেজিতে লিখে দিতে পারি। রোগী আসার আগে ডাক্তার মারা গেলেও, তা আমি ইংরেজিতে প্রকাশ করতে পারি। কিন্তু ইংরেজি বলতে গেলে আমি শব্দ হাতড়ে বেড়াই। তাৎক্ষণিকভাবে শব্দ বের হয়ে আসে না আমার ভেতর থেকে। মনে হয় বুকে পিস্তল ঠেকালেও মুখে স্বাভাবিক ইংরেজি আসবে না। ইংরেজি কথোপকথনে তাই ‘ইয়ে… মানে…’ ইত্যাদি বাংলা ধ্বনি আমার চলে আসে। আমার শ্রোতা ধৈর্য হারিয়ে ফেলে – আমিও তাল হারিয়ে ফেলি। কেন এই ‘তালহারা’ পরিণতি? কারণ একটিই – বাক্যের একক শব্দ। আমি শব্দ জানা থাকলে সেটি অবশ্যই আমার কথায় বের আসতো। গ্রামার আমাকে ঠেকাতে পারতো না।

কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শব্দ আমি শিখি নি, শিখতে হয় নি। পাঠ্যবইয়ের শব্দই আমাকে সব শিখতে হয় নি। আমার প্রিয় ইংরেজি শিক্ষক আমাকে সবকিছু প্রিয় বাংলায় তর্জমা করে বুঝিয়ে দিয়েছেন ক্লাসে। এইনশেন্ট মেরিনারের এলবাট্রস পাখি হত্যার বিচার; জিম-ডেলার অমর প্রেমের কাহিনি ইত্যাদি স্পষ্ট বাংলায় বুঝিয়ে দিয়েছেন, আমাদের দয়ালু ইংরেজি স্যার। মুগ্ধ হয়েছি স্যারের অনুবাদ করার দক্ষতা দেখে। মুখস্ত করেছি প্রশ্নের উত্তর, মুখস্ত করেছি রচনা আর চিঠি। আমার ইংরেজি শিক্ষক বিফলে-মূল্য-ফেলত টাইপের সাজেশ্চন দিতে পারতেন। তিনি পরামর্শ দিতেন গ্যারান্টির সাথে! সাজেশ্চন দেবার দিন ক্লাসে ঢুকেই প্রবল আত্মবিশ্বাসে তিনি বলে ওঠতেন – প্রশ্নফাঁস! অর্থাৎ তার পরামর্শ নেওয়া আর ফাঁশ-হওয়া প্রশ্ন পড়া একই কথা। তার সাজেশ্চন দেবার দক্ষতাই তাকে ‘তুখোড় ইংরেজি শিক্ষকের’ গৌরব এনে দেয় এলাকায়। মাত্র দু’টি রচনা দিয়ে আমি অষ্টম থেকে দশম শ্রেণী অর্থাৎ মাধ্যমিক পরীক্ষা পাস করতে পেরেছিলাম!

আগেই বলেছি, অনুবাদ আমার অনেকটাই ‘প্রাকৃতিক’ হয়। শুধু কথা বলার সময় ‘প্রাকৃতিক’ ইংরেজিতে কথা বলতে পারি না। বাংলাকে যেভাবে সরাসরি কথায় প্রকাশ করতে পারি, ইংরেজিকে সেভাবে পারি না। ইংরেজি বলতে তাই আমাকে অনুবাদের আশ্রয় নিতে হয়। অর্থাৎ আমি আমার ‘চিন্তাকে মনে মনে ইংরেজিতে ট্রান্সলেশন’ করি। তারপর তা প্রকাশ করি ইংরেজিতে। তাহলে কীভাবে আমি ইংরেজিতে সাবলীলভাবে কথা বলতে পারবো? কীভাবে তা অনর্গল হবে? আমি তো আমার মনের ভাবকে অনুবাদ করছি কেবল –  কথা তো বলছি না! প্রশ্ন হলো, কখন আমি আমার চিন্তা বা মনের ভাবকে ‘সরাসরি’ ইংরেজিতে প্রকাশ করতে পারবো? কখন আমাকে আর অনুবাদ করতে হবে না?

আমার শিক্ষাজীবনে প্রতিবারই বাক্যের প্রতি অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে গিয়ে শব্দকে চেনা হয়নি। শব্দের প্রতি আমার আগ্রহ কখনও ছিলো না, যত আগ্রহ ছিলো বাক্য এবং বাক্যগঠনের প্রতি। শিখতে চেয়েছি শুধুই গ্রামার। হয়েছিও একজন গ্রামারিয়ান। আমি গ্রামার বুঝি, বুঝাতেও পারি, কিন্তু ইংরেজি কীভাবে বলতে হয় বা স্বাভাবিকভাবে লিখতে হয় – আমি শিখিনি। শেখাতেও পারি না।  আমি বুঝি নি (পড়ুন: বুঝতে হয় নি) যে, শব্দের অর্থ এবং শব্দের ব্যবহার জানা হলেই বাক্য গঠন সহজ হয়ে যায়। আমার পুরো শিক্ষাজীবনে বুঝতে পারিনি যে, বাক্যের একক শব্দ।  এই ক্ষুদ্রতম উপাদানটির দিকে আমি কখনও গুরুত্ব দিই নি। দুর্ভাগ্য, আমার ইংরেজি শিক্ষকগণও সেদিকে দৃষ্টি দিতে কোনদিন বলেননি। তারা কখনও বলেনি “তোমরা তোমাদের পাঠ্যবইয়ের নতুন নতুন ইংরেজি শব্দ কখনও স্মৃতি থেকে হারাবে না।” বলেন নি, “তোমরা একটি নতুন ইংরেজি শব্দকে সাদরে গ্রহণ করো। একটি শব্দ মানেই, একটি নতুন ধারণা – নতুন উপলব্ধি। উপভোগ করো শব্দের অর্থ এবং এর ব্যবহার। পঠিত অংশের বাক্যরীতি অনুসারে, নতুন শব্দ দিয়ে নিজেদের পছন্দমতো বাক্য তৈরি করো।” বলেন নি, “বীজগণিতের সূত্র, বিজ্ঞানের থিওরি, পদার্থবিজ্ঞানের সংকেত-যোজনী, পেশাগত অবস্থানের কারণে তোমাদের কাছে একসময় অপ্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু আজ তোমার পাঠ্যবইয়ে যে নতুন শব্দটি শিখবে, তা চিরদিন তোমার প্রয়োজন পড়বে। ভাব প্রকাশে সঙ্গ দেবে তোমাকে সারাটি জীবন।” আমার কোন শিক্ষক বলেন নি, “তোমরা কমপ্রিহেনশন করো: তাতে ইংরেজিতে বোধশক্তি বাড়বে। প্রশ্নোত্তর করার দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। নতুন শব্দের প্রয়োগ হবে – ইংরেজি শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে।” এসব তারা কখনও বলেন নি।

 

ইংরেজি শিক্ষার সবচেয়ে কার্যকর এই মাধ্যমটির অনুপস্থিতি যে কত ভয়ানক ও বিপর্যয়কর ছিলো, তা উপলব্ধি করা যায় বোর্ড প্রণীত বর্তমান (২০০৫) সিলেবাস থেকে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের সিলেবাসে যেভাবে গ্রামারকে বর্জন করে, কমপ্রিহেনসিভ শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা শব্দ দিয়ে বাক্য সম্পূর্ণ করার বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়েছেন।  তাতে বুঝা যাচ্ছে, ‘বাক্যের একক শব্দ’ তত্ত্বটি এবার তারা হৃদয়ঙ্গম করেছেন। হয়তো এবার কিছু ইংরেজি শেখা হবে।

লেখার দক্ষতা বাড়ানোর জন্য আমার শিক্ষক তেমনভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেন নি। তাহলে কি চিঠি অনুচ্ছেদ ভাবসম্প্রসারণ ও রচনা মুখস্থ করতে হতো পুরো ছাত্রজীবন? কোন শিক্ষককে বলতে শুনিনি, “এবারে অনুষ্ঠিত পিকনিক/শিক্ষাসফরের ওপর তোমরা প্রত্যেকে একটি সুন্দর প্রবন্ধ লিখে নিয়ে আসবে। আমি দেখতে চাই, ভাব প্রকাশের দক্ষতা কার কতো বেশি। সবচেয়ে ভালো লেখা এবারের দেয়ালপত্রিকায়/স্মরণিকায় প্রকাশ করা হবে।” ইত্যাদি। তা হয় নি। গরুর চার পা, দু কান, চোখ শিং, এক লেজ, এক নাক – ইত্যাদি প্রতিনিয়ত দেখার পরও তাই আমাদেরকে ‘গরু রচনা’ মুখস্ত করতে হয়।

 

এতসব ‘না শেখা’ থেকে কী শিখেছি আমি?

আমি শিখেছি, গাইতে গাইতে যদি গায়েন হয়, তবে ‘লেখা শিখার’ জন্য চাই লেখার নিয়মিত চর্চা। পড়া শেখার জন্য চাই, পড়া। পড়তে হবে যেকোন শর্তে, ডিকশনারি থেকে শব্দের অর্থ খুঁজতে হলেও প্রচুর ইংরেজি পড়তে হবে। খুব তাড়াতাড়িই ডিকশনারি দেখার প্রয়োজন কমে আসে। আস্তে আস্তে শব্দের অর্থ ধারণা করতে শিখি। একটি বাক্যের অধিকাংশ শব্দ জানা থাকলে, বাক্যটি আর অস্পষ্ট থাকে না। বাক্যের ভাব দেখে নতুন শব্দের অর্থ উদ্ধার করতে পারা একটি মজার বিষয়। অনেক সময় দেখা যায়, ধারণাকৃত অর্থটি ডিকশনারির সাথে মিলে যায়। এমন কি, ডিকশনারির চেয়েও ‘প্রাসঙ্গিক অর্থ’ পাঠক বের করতে পারেন। ডিকশনারির অর্থও কি চূড়ান্ত, এবসোলিউট? কখনও নয়। ডিকশনারির অর্থও ধারণাপ্রসূত – তবে সেটি একাধিক ব্যক্তির ভিন্ন ভিন্ন সময়ের ধারণা।

 

অনুবাদ ছাড়া কীভাবে ইংরেজি বলতে পারা যায়? উপা্য় একটিই। সেটি হলো, বাক্যের একক শব্দ। বাক্যগঠন নয়, শব্দের প্রাসঙ্গিকতাকে গুরুত্ব দিতে হবে প্রথমে। পড়তে হবে প্রচুর এবং লেখতে হবে। বাক্যের ভেতরের শব্দকে বুঝতে হলে, তথা শব্দকে ব্যবহার-উপযোগী করতে হলে, আমাকে পড়তে হবে এবং লেখতে হবে। কথা বলার সময় অনুবাদ অথবা বাক্যগঠনের দিকে প্রথমেই মনযোগ না দিয়ে শব্দের দিকে মনযোগী হতে হবে। প্রথমে ভুল নিয়েই বলে যেতে হবে। কথা বলা চালিয়ে যেতে হবে। শব্দ যথার্থ হলে, বাক্য একসময় যথার্থ হতেই হবে। কিন্তু গ্রামার নিয়ে শুরুতেই চিন্তিত হলে, কথা বলার প্রাকৃতিক প্রবাহটি বাধাগ্রস্ত হয়। শব্দ জানা থাকলে, গ্রামার আত্মস্থ হয় অবচেতনেই।

 

আমি শিখেছি, পার্টস অভ স্পিচ হলো ‘কথার একক’। বাক্যের একক যে ‘শব্দ’, এর ব্যাকরণসিদ্ধ প্রমাণ হলো পার্টস অভ্ স্পিচ। আটটি পার্টস অভ্ স্পিচ আমি ক্লাস ফাইভেই শিখেছিলাম। শিখি নি শুধু এর ব্যাপকতা। শিখি নি এর ব্যবহার। প্রথমে শিখতে হবে আরও শব্দ। পূর্বের শেখা শব্দ আরও বুঝার জন্য এবং বাস্তবসম্মত ব্যবহার শেখার জন্য পড়তে হবে। আমি শিখেছি যে, ইংরেজি ভাষার ‘অত্যাবশ্যক তিন প্রকার’ শব্দের প্রথমটি হলো ভার্ব বা ক্রিয়া। ভার্ব শব্দের মৌলিক অর্থই হলো ‘শব্দ’। কারণ, একটি ইংরেজি বাক্যের মূল শব্দটিই হলো ভার্ব। এক শব্দ দিয়েও বাক্য গঠন করা যায়, যদি সেটি হয় ভার্ব।

দ্বিতীয়টি হলো, ওই ক্রিয়াকে যে সম্পন্ন করে: অর্থাৎ নাউন বা বিশেষ্য। নাউন সম্পর্কে আমার উপলব্ধিটি খুবই সরল এবং এটি প্রচলিত ধারণার ব্যতিক্রম। নাউন মানেই ‘কোনকিছুর নাম’ নয়। যেমন, কাজের নাম তো নাউন নয়, ভার্ব। নাউন কেবল পৃথিবীর পাঁচটি বিষয়ের নাম। সেই পাঁচটি বিষয় হলো: ব্যক্তি, প্রাণী, বস্তু, জায়গা এবং ধারণা। অর্থাৎ ‘ব্যক্তি’ বুঝাতে যেসব শব্দ, ‘প্রাণী’ বুঝাতে যেসব শব্দ, ‘বস্তু’ বুঝাতে যেসব শব্দ, ‘জায়গা’ বুঝাতে যেসব এবং একটি ‘ধারণাকে’ পরিচিত করতে যে শব্দটি ব্যবহৃত – সেসব শব্দকে বলা যায় নাউন।

গুরুত্বের দিকে থেকে ইংরেজি ভাষার তৃতীয় শব্দটি হলো, নাউনের তথ্যদাতা, অর্থাৎ এজিকটিভ। বিশেষণ। এটি নাউন সম্পর্কে আমাদেরকে ‘অতিরিক্ত তথ্য’ প্রদান করে। তাই শব্দ শেখার সময় এ তিন প্রকার শব্দের দিকে বেশি নজর দিতে হয়। বাকিগুলো আপনা-আপনিই আত্মস্থ হয়।

ভার্ব, নাউন, এজিকটিভ – এই তিন প্রকার শব্দ এবং এদের ‘পারস্পরিক সম্পর্কটি’ জানা থাকলে ইংরেজির ৯০ শতাংশ শেখা হয়।

 

আমি যখন ইংরেজিতে ভাবতে পারবো, তখনই পারবো ইংরেজিতে সাবলীলভাবে কথা বলতে। এজন্য সর্বোৎকৃষ্ট পথটি হলো, প্রাত্যাহিক জীবনে ইংরেজিতে কথা বলা। এটি তো আমাদের দেশে প্রায় অসম্ভব। বিকল্প উপায়টি হলো, ইংরেজি পড়া। উত্তম হয়, সংবাদপত্র পড়া, কারণ এটি প্রাত্যাহিক জীবন নিয়ে লেখা। ইংরেজিতে ভাবতে পারার জন্য, আমাদেরকে প্রথমত পড়তে হবে। তাহলে শব্দ হাতড়ে বেড়াতে হবে না।  ‘পড়া’ আমাদের চিন্তার ক্ষেত্রকে বিস্তৃত করে। নতুন শব্দ ও নতুন ধারণার সাথে পরিচয় ঘটায়। সে সাথে পুরাতন শব্দ ও ধারণার সাথে সম্পর্ক হয় নিবিড়। শব্দের সাথে নিবিড় সম্পর্ক না থাকলে, কথা বলার সময় তাদেরকে পাওয়া যায় না। যেহেতু কথা বলার পরিবেশ আমার সীমিত, সেহেতু শব্দকে ব্যবহার-উপযোগী করে তোলার জন্য আমাকে লিখতে হবে। লিখতে হবে জীবনের কথা। লিখতে হবে চিঠি, ডায়েরি, দিনের কর্মসূচি, যাপিত জীবন, পরিচিত বিষয়ের টীকা ইত্যাদি। এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই ইংরেজিতে ভাবতে শেখায়।

পড়ার কথা আসলেই, প্রশ্ন জাগে: কী পড়বো? আমার তো ইংরেজি সংবাদপত্র ভালো লাগে না। মানে, দেখতে ভালই লাগে – চকচকে লেখা। কিন্তু পড়তে ইচ্ছে করে না। পড়তে শুরু করলে মনে হয়, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসবে, শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যাবো কিছুক্ষণ পড়লেই। তাহলে? তাহলে ভালো লাগার বিষয়গুলোই পড়তে হবে। পছন্দের বিষয় থেকেই শুরু হতে পারে ইংরেজি পড়া। তাই পাঠ্যপুস্তকে মজার গল্পগুলো পড়ি, ইংরেজি সংবাদপত্রের চিঠিপত্র অংশ পড়ি; খেলার পাতায় দৃষ্টি দিই; বিনোদনের পাতা পড়ি; জোকস/কমিক অংশটি বাদ দিই না। ভালো লাগতে শুরু করলে, সংবাদপত্রের তাজা ও মজাদার সংবাদগুলোও পড়ি। আর পড়ি ইংরেজি উপন্যাস। আমি বুঝেছি, ইংরেজি পড়ায় অভ্যস্ত হবার জন্য আমাকে পড়তে হবে, যে কোন শর্তে। আমার বিশ্বাস, ডিকশনারি ঘাটাঘাটি বেশিদিন করতে হয় না। এটি প্রমাণিত যে, দু’একটি শব্দ জানা থাকলে বাকি শব্দগুলোর ব্যবহারিক অর্থ উদ্ধার করা যায়। তারপরও নতুন নতুন শব্দ পড়তে আমার এখন ভালো লাগে। নতুন শব্দ শুধু অর্থ দিচ্ছে না – দিচ্ছে একটি নতুন ধারণা। মাঝেমাঝে নতুন ইতিহাসও পাওয়া যায়। কিছু কিছু শব্দের উৎপত্তির পেছনে রয়েছে মজার ইতিহাস। এসবকিছুর জন্য আমি শব্দ শিখি। শিখছি এখনও। ইংরেজি শব্দই আমাকে ইংরেজি শিখিয়েছে, গ্রামার নয়। কারণ, বাক্যের একক শব্দ।

 


লেখাটি ২০০৫ সালের।  অনেক ইংরেজি শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখাটি প্রস্তুত করা হয়েছিল।

বিদ্যালয় আমারে শিক্ষিত হতে দিলো না

posterJuri-crop

 

১) আজকাল পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে আমাদের মাননীয় মন্ত্রী-সচিবরা যেভাবে দৌড়াদৌড়ি করেন, তাতে প্রশ্ন জাগে: আসলে পরীক্ষা কারা দিচ্ছে আর কারা পাশ করছে। আমার স্কুল জীবনের এক বন্ধু মেট্রিকের টেস্ট পরীক্ষায় গণিতে ফেল করে হৃদয় উজাড় করে প্রধানশিক্ষকের কাছে অনুরোধ করেছিল, যেন তাকে একটিবার সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু বিদ্যালয়ের সুনামে অতিরিক্ত যত্ন্শীল প্রধানশিক্ষক সে অনুরোধে কর্ণপাত করলেন না। “আমার বিদ্যার্জন এখানেই শেষ” বলে সেই যে বিদ্যালয় ছাড়লো, আর তাকে দেখা যায় নি বিদ্যালয়ের আঙ্গিনায়। এইচএসসি’র প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষার ফলাফলে নিজের নাম না দেখে “আমার আর বাড়ি যাওয়া হলো না রে!” বলে আমার এক সহকর্মীর আদরের সন্তান আত্মহত্যা করে। তথাকথিত ভালো ছাত্র হয়েও শুধুমাত্র জিপিএ-৫ না পাওয়ার কারণে আত্মহত্যা করে আমাদের এই প্রিয় স্বদেশে।

 

উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া শিক্ষাব্যবস্থায় পরিচালিত আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যে এভাবে কত জীবন নষ্ট করছে কে জানে। পরিস্থিতিটি এরকম দাঁড়িয়েছে যে, “তুমি যদি শিক্ষিত হতে চাও, তবে তোমাকে পাশ করতে হবে।” আমাকে পাশ করতে হবে গণিত ইংরেজি ভূগোল বিজ্ঞান ইতিহাস পৌরনীতিতে। আমার কিসে আগ্রহ, আমার কিসে ঝোঁক বা আমি কী বিষয়ে নিজেকে গড়ে তুলতে চাই সেটা এখানে বিবেচ্য নয়। “আগে পাশ দাও, পরে যা-খুশি হও, অথবা না হও।”

 

পাবলিক বাসে বসলে অনেক মজার কথপোকথন শুনা যায়। দুই সহযাত্রী আমার পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন:
-ভাবছি একটা মাস্টার্স ডিগ্রি নিতেই হবে। শ্বশুরবাড়িতে মুখ দেখাতে পারছি না।
-তা কোন বিষয়ে আপনি মাস্টার্স করতে চান? অন্যজনের জিজ্ঞাসা।
-আমি তো বাণিজ্যে স্নাতক করেছি, কিন্তু বাণিজ্যের কোন বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়ার ধৈর্য্য এখন আমার নেই। তাই বাংলা অথবা ইসলামের ইতিহাসে পড়তে পারি।

এথেকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা তথা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কেমন ধারণা হয়?

 

২) স্যুটেট-বুটেড ব্যক্তিটি যখন তার বিএমডাব্লিউ’র জানালা দিয়ে পরিচ্ছন্ন রাস্তায় খালি বোতল বা সিগারেটের প্যাকেট ফেলে দিয়ে গাড়ি হাঁকে, তখন কি তাকে শিক্ষিত মনে হয়? পথচারিকে ধোয়াচ্ছন্ন করে দিয়ে কালো সানগ্লাস পরিহিত ব্যক্তিটি যখন সিগারেট ফুঁকে, তখন কি মনে হয় সে শিক্ষিত? মাত্র পাঁচটি টাকার জন্য আমরা যখন একজন খেটে-খাওয়া রিক্সাওয়ালার গায়ে হাত তুলি, তখন কি মনে হয়, শিক্ষা আমাদেরকে কিছু করতে পেরেছে? শহরের অধিকাংশ মানুষই উচ্চশিক্ষিত, তারপরও কি গাড়িতে ওঠার সময় লাইনে দাঁড়াবার জন্য তাদেরকে ধমকাতে হয় না? যে সমাজে নারীর জন্য গাড়িতে আলাদা বরাদ্দ করে রাখতে হয়, এবং বাসের চেংড়া যাত্রীদেরকে আসনে বসিয়ে রেখে বয়স্ক নাগরিককে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, সে সমাজের শিক্ষা যে কোন কাজের আসে নি, তা কি বলার অপেক্ষা রাখে?

 

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মান নিয়ে আলোচনা করতে খুব মজা পাই আমরা, কারন কিছু কিছু প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান পাবলিক প্রতিষ্ঠানের চেয়েও ভাল হবার পরও অন্যান্যদের জন্য তারা গলা উঁচু করতে পারছে না। তাছাড়া তাদের আছে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। অথচ দেশের একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে স্নাতক পড়ার জন্য এবার মাত্র দু’জন ছাত্র কোয়ালিফাই করেছে। এটি কি শিক্ষার্থীর দুর্বলতা, নাকি শিক্ষা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বলা মুসকিল। আমার প্রশ্ন, আমাদের কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি গুণগত মানের ক্ষেত্রে ‘গড়পরতা’ ওপরে ওঠতে পেরেছে? গড়পরতা সকলেই কি সনদপত্র বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান নয়?

 

৩) মার্কিন লেখক মার্ক টোয়েন (১৮৩৫-১৯১০) বলেছিলেন, “আমি কখনও আমার শিক্ষাকে বিদ্যালয় দ্বারা বাধাগ্রস্ত হতে দেই নি।” কমপিউটার জিনিয়াস বিল গেটসও খুব ভালো ছাত্র ছিলেন না। নিজের শিক্ষা সম্পর্কে হারবার্ড ড্রপআউট বিল গেটস এর একটি মজার উক্তি হলো এরকম: “গণিতে আমি খুবই কাঁচা ছিলাম কিন্তু আ্মার বন্ধু খুব ভালো ছিলেন গণিতে। বন্ধুটি বর্তমানে মাইক্রোসফটের একজন সেরা প্রকৌশলী আর আমি এর চেয়ারম্যান!”

বিখ্যাত কম্পিউটার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডেল’ এর মালিক মাইকেল ডেল কলেজে ওঠেই পড়াশুনা ছেড়ে দিয়েছিলেন কম্পিউটার বিক্রয়ের সময় বের করার জন্য।

কমপক্ষে ১০০০ প্রযুক্তির পেটেন্ট-এ্রর মালিক ও বিদ্যুতের আবিষ্কারক টমাস আলভা এডিসনের (১৮৪৭-১৯৩১) কথা কে না জানে! নিজ বিদ্যালয়ে ‘স্টুপিড’ বলে পরিচিত এই খ্যাতনামা বিজ্ঞানী মার খেতে খেতে শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন।

স্বশিক্ষিত কিন্তু কীর্তিমান মনীষীদের তালিকাটি একেবারে ছোট নয়। তারা প্রমাণ করেছেন, সত্যিকার শিক্ষা শুধুই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পণ্য নয়।

আমাদের নতুন শিক্ষানীতিতে অনেক বিষয়ই সংস্কার করা হয়েছে। কিন্তু পা্বলিক পরীক্ষার পাশের হারকে সরকারের কৃতীত্ব দেখানোর যে প্রবণতা দেখা দিয়েছে, তাতে বিভ্রান্ত না হয়ে পারি না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজেই আজ শিক্ষাবিস্তারের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সুশিক্ষিত মানেই স্বশিক্ষিত। শিক্ষার্থীর স্বাধীনতাই শিক্ষা বিস্তারের প্রধান উপায়। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীর স্বাধীনতাকে কেড়ে নিয়েছে। কেড়ে নিয়েছে তাদের স্বশিক্ষিত হবার সুযোগ। শিক্ষার্থীকে অবাধে তাদের পছন্দমতো শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ যদি না দেওয়া হয়, এবং সামগ্রিক শিক্ষার সাথে যদি নৈতিক শিক্ষাকে যুক্ত না করা হয়, তবে আমাদের বিদ্যালয়গুলোই হবে প্রকৃত শিক্ষাগ্রহণের প্রধান প্রতিবন্ধকতা।

  (৮ অক্টো ২০১২/ ব্লগস্পট থেকে স্থানান্তরিত)

https://d19tqk5t6qcjac.cloudfront.net/i/412.html

https://d19tqk5t6qcjac.cloudfront.net/i/412.html

বাংলা বানাণ কর্মসালা – আমার বানামে ভূল হয় না

Image

কর্মজীবনের শুরুতে শিক্ষা কর্মসূচিতে যুক্ত থাকার সময় বাংলা বানানের প্রতি সহকর্মীদের বিপজ্জনক উদাসীনতা দেখে একটি বানান প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে বাধ্য হয়েছিলাম। সে কর্মশালার শিরোনামটি ছিল “বাংলা বানাণ কর্মসালা – আমার বানামে ভূল হয় না”।

হইচই অবস্থা লেগে গিয়েছিলো: “স্যার এখানে তো অনেক ভুল…ব্যানারে এরকম ভুল!…আমরা তো আশ্চর্য…সবাই দেখে তো ভুল বানানে উৎসাহিত হবে” ইত্যাদি ইত্যাদি। ব্যানারের কারিগর তো সরাসরি আমার সাথে দেখা না করে ব্যানারই লেখবে না! আহা, বানানের প্রতি এত দরদ দেখে কেবল ওইদিনই খুশি হয়েছিলাম। এখনও যত্রতত্র অতি প্রচলিত শব্দগুলোতে বানানের ভুল দেখে কিছু না করতে পেরে অসহায় বোধ করি। নিজ ভাষার প্রতি নির্দয় ব্যবহার দেখে নিজেকেই প্রশ্ন করি: আমরা কি সত্যিই সে দেশের মানুষ, যে দেশে ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিল?

বিব্রতচিত্তে বলতে চাই, আমাদের প্রিয় ব্লগালয়গুলোতেও কিন্তু অনেক সুন্দর লেখা সুন্দর কবিতায় বানানের অপ্রত্যাশিত ভুল দেখে ব্যথিত হতে হয়। জানি না প্লেজিয়ারিজম রোধ করার অস্ত্র হিসেবে কেউ কেউ বানানের ভুল করেন কি না, কারণ লেখার গুণগত মানের দিকে তাকালে মনে হয় না, লেখকটি এত ক্ষুদ্র ভুলটি করতে পারেন। তবে স্বীকার করছি, বাংলা ইউনিকোডে সমস্যার কারণে অনেকেই সঠিক বানানটি জানলেও প্রকাশ করতে পারেন না; বিশেষত প্রবাসী ব্লগার, যারা স্বদেশের মতো বাংলা সফটওয়্যার সুবিধা পাচ্ছেন না।

বানানে ভুল কমবেশি সকলেই বুঝতে পারেন। অনেকে নানারকমের সমালোচনা করেই থেমে যান, সংশোধনের চেষ্টা করেন না। কেউ কেউ ‘আমার-ভুল-হয়-না’ সিনড্রোমে ভোগেন। এ লেখাটি মূলত বাংলা বানান নিয়ে আমার খুঁতখুঁতে মনোভাব থেকে সৃষ্ট, যা মূলত সহকর্মীদেরকে সহায়তা করার জন্য প্রস্তুত করেছিলাম। এখন সহ-ব্লগারদের যদি কোন কাজে লাগে তবেই খুশি। লেখাটিতে ১৫টি বানানরীতি উপস্থাপিত হয়েছে: প্রমিত ১ থেকে প্রমিত ১৫ পর্যন্ত। পরে আরও ২৪টি অতিরিক্ত তালিকা যুক্ত করা হয়েছে। শেষে আছে বাংলা বানান নিয়ে সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা। লেখকের বানান অভিজ্ঞতা এবং সচরাচর ব্যবহৃত শব্দগুলো নিয়ে বাংলা একাডেমির অভিধানের সহায়তায় তালিকাগুলো প্রস্তুত করা হয়েছে। বানানরীতির জন্য ড. এনামুল হক-এর ব্যকরণটি ব্যবহৃত হয়েছে। মূলত ছাত্রজীবনেও একই ব্যকরণ ছিল লেখকের সঙ্গী।

Image

প্রমিত ১) বাঙালি বালি কুমির মামি
=============================
বানানবিধি: তদ্ভব, দেশী, বিদেশী এবং মিশ্র শব্দে কেবল ই এবং উ ব্যবহৃত হবে। এমনকি স্ত্রীবাচক এবং জাতিবাচক শব্দের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।
উদাহরণ: বাড়ি গাড়ি শাড়ি হাতি তরকারি আরবি ফারসি বাঙালি ইংরেজি জাপানি ইতালি খালি বালি, রেশমি কুমির নানি মামি শাশুড়ি মুলা হিন্দি উনিশ উনচল্লিশ আসামি রুপা লটারি কোহিনুর
*ব্যতিক্রম হতে পারে যেসব শব্দে: রানী, পরী, গাভী। তাছাড়া নামবিশেষ্যের (proper noun) ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হতে পারে।

প্রমিত ২) রুপালি বর্ণালি প্রণালী
=========================
বিশেষণ (adjective) অর্থে ‘-আলি’ প্রত্যয়যুক্ত শব্দে ই হবে।
বর্ণালি রুপালি সোনালি মিতালি হেঁয়ালি চৈতালি খেয়ালি ভাটিয়ালি
কিন্তু বিশেষণ অর্থে না হলে ই হবে না: প্রণালী। তাছাড়া নামবিশেষ্যের (proper noun) ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হতে পারে: সাপ্তাহিক চিত্রালী।

প্রমিত ৩) বরণীয় ভারতীয় মাননীয়
============================
বিশেষণ (adjective) অর্থে ‘-ঈয়’ প্রত্যয়যুক্ত শব্দে ঈ হবে: জাতীয় (কিন্তু: জাতি)।
স্থানীয়, এশীয়, লক্ষণীয়, স্মরণীয়, বরণীয়, গোপনীয়, পানীয়, যিশায়ীয়, ভারতীয়, মাননীয়, বায়বীয়, প্রয়োজনীয়, পালনীয়, তুলনীয়, পূজনীয়, কমনীয়, পরিকল্পনীয়, অকল্পনীয়, নেতৃস্থানীয়, করিন্থীয়, শোচনীয়

প্রমিত ৪) সরকারি অনিষ্টকারী দুষ্কৃতকারী সরাসরি
========================================
‘-আরি’ যুক্ত অব্যক্তিক শব্দাবলীর শেষে ই হবে: সরকারি, দরকারি, তরকারি, মস্কারি, সরাসরি
‘যিনি করেন তাকে নির্দেশ করলে’ শেষে ঈ হবে: সাহায্যকারী, যিনি সাহায্য করেন: সাহায্যকারী, ব্রহ্মচারী, পরিবেশনকারী, দর্শনকারী, তদারককারী, দুষ্কৃতকারী, অনুসারী, অনিষ্টকারী, সহকারী

প্রমিত ৫) তুমি কী পড়? বই। তুমি কি ছাত্র? না।
=====================================
সর্বনাম, বিশেষণ এবং ক্রিয়া-বিশেষণ অর্থে ‘কী’ শব্দটি ঈ-কার দিয়ে লেখতে হবে। কী বলেছ? সে কী লেখেছে? কী আর বলব? কী করে যাই? এটা কী বই? কী আনন্দ!
অব্যয় হিসেবে ‘কি’ ই-কার দিয়ে লেখা হবে: সেও কি যাবে? কি তেল কি চাল সবকিছুতেই যেন আগুন!

Image

প্রমিত ৬) পারিশ্রমিক ভৌতিক সাহসিক শারীরিক
====================================
বিশেষণ (adjective) অর্থে ‘-ইক’ প্রত্যয়যুক্ত শব্দে প্রচলিত নিয়মে ই হবে।
সাংসারিক পৌনঃপুনিক মানবিক পারিবারিক শারীরিক আন্তরিক দাপ্তরিক প্রাকৃতিক জাগতিক ভৌতিক যৌগিক গণতান্ত্রিক পারিশ্রমিক সাহসিক বৈজ্ঞানিক নাগরিক ধার্মিক আহ্নিক বার্ষিক পার্বিক ঐচ্ছিক ঔপন্যাসিক সাম্প্রদায়িক গাণিতিক ভৌতিক প্রাকৃতিক
প্রত্যায়ান্তে ঈ থাকলে তা অপরিবর্তিত থাকবে: সস্ত্রীক, অলীক। বিশেষ্য পদে -ঈক হতে পারে: প্রতীক।

প্রমিত ৭) প্রাণ আয়রন প্রচণ্ড টেন্ডার
============================
> ণত্ব-বিধি অনুসারে ঋ, র এবং ষ-য়ের পর দন্ত্য-ন মূর্ধন্য-ণ হবে।
ঋণ ঘৃণা বিবরণ বিষ্ণু ব্যকরণ অনুকরণ নিমন্ত্রণ ভীষণ বিভীষণ কৃষাণ প্রাণ অরণ্য পরিত্রাণ ধরণ ধারণা ঘ্রাণ পরিণয় প্রণাম পরিণাম পরিণতি নির্ণয় বর্ণনা
ব্যতিক্রম: মৃন্ময়।

> তদ্ভব, দেশী, বিদেশী এবং মিশ্র শব্দে ণত্ব বিধি মানা হবে না, অর্থাৎ ণ-এর ব্যবহার করতে হবে না।
অঘ্রান কান কোরান ইরান গোনা ঝরনা পরান সোনা হর্ন আয়রন কেরানি ট্রেনিং বার্নার সাইরেন বার্নিশ শিরনি ড্রেন পরন

> বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত অবিকৃত সংস্কৃত শব্দে (তৎসম) ঠ, ট, ড এবং ঢ-য়ের পূর্বে ‘ণ’ ব্যবহৃত হয়: কলকণ্ঠ কণ্টক লুণ্ঠন দণ্ড প্রকাণ্ড প্রচণ্ড ঘণ্টা কাণ্ডকীর্তি খণ্ডন মণ্ডলী ভাণ্ডার কুণ্ডলী ঠাণ্ডা

> তদ্ভব, দেশী, বিদেশী এবং মিশ্র শব্দে ঠ, ট, ড এবং ঢ-য়ের পূর্বে ন ব্যবহার করা হবে: লন্ডন টেন্ডার।

প্রমিত ৮) নিষ্ঠা স্টেশন পুলিশ খ্রিষ্ট
============================
অবিকৃত সংস্কৃত শব্দে ষত্ব বিধি মানা হবে।
ক) ট এবং ঠ বর্ণের পূর্বে ষ ব্যবহৃত হবে। বৃষ্টি দুষ্ট নিষ্ঠা পৃষ্ঠা
খ) ঋ-য়ের পরে ষ লেখা হবে। বৃষ ঋষি বৃষ্টি।
গ) খাঁটি বাংলা, বিদেশী এবং মিশ্র শব্দে ষত্ব বিধি মানা হবে না, অর্থাৎ ষ-এর ব্যবহার করতে হবে না। স্টুডিও স্টেশন জিনিস মিসর গ্রিস মুসাবিদা টেক্স মাস্টার স্টিমার স্টোর

ব্যতিক্রম:
*পুলিশ শব্দটি ইংরেজি হলেও ব্যতিক্রম হিসেবে ‘পুলিশ’ লেখা হবে।
*খ্রিষ্ট যেহেতু বাংলায় আত্তীকৃত শব্দ এবং এর উচ্চারণও হয় সংস্কৃত কৃষ্টি, তুষ্ট ইত্যাদি শব্দের মতো, তাই ষ্ট দিয়ে খ্রিষ্ট শব্দটি লেখা যাবে।

প্রমিত ৯) মসলা পোশাক শার্ট কুয়েশ্চন
================================
বানানবিধি: বিদেশী মূল শব্দে শ এবং স উচ্চারণ অনুযায়ী ব্যবহৃত হবে। তবে ষ-য়ের কোন ব্যবহার নেই।
উদাহরণ: সাল সন হিসাব শহর শার্ট শরবত শয়তান পোশাক মসলা শখ কারিশমা সিলেবাস শেয়ার আপোস

ইংরেজি এবং আরবি শব্দের বাংলা বানান:
> উচ্চারণগত সঙ্গতি থাকলে S-য়ের স্থলে স ব্যবহৃত হবে: প্রফেসর, সাবজজ, সিনিয়র, সুপার, গ্যাস, স্যানিটারি, নার্স।
> মূল শব্দে sh, sion, ssion, tion থাকলে শ ব্যবহৃত হবে: শার্ট, শেড, মিশন, রেশন, ফেডারেশন, নেশন, পাবলিকেশন, করপোরেশন, ভিশন, টেনশন। ব্যতিক্রম: কুয়েস্চন।
> আরবি-ফারসি শব্দে সে, সিন্ এবং সোয়াদ (ﺹ ,ﺱ ,ﺙ) থাকলে স ব্যবহৃত হবে: সালাম, তসলিম, ইসলাম, মুসলিম, মুসলমান, সালাত।
> আরবি-ফারসি শব্দে শিন্ (ﺶ) থাকলে যথারীতি শ ব্যবহৃত হবে: এশা, শাবান, শাওয়াল, বেহেশ্ত।

Image

প্রমিত ১০) খাওয়ানো সহজ কিন্তু শেখানো সহজ নয়। > আগে নিজে শেখো তারপর শেখাও।
========================================
বানানবিধি: বাংলায় অ-কারের উচ্চারণ বহুক্ষেত্রে ও-কার হয়। এ উচ্চারণকে লিখিত রূপ দেবার জন্য অনেকে যথেচ্ছভাবে ও-কার ব্যবহার করেন, যা বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া গ্রহণযোগ্য নয়: ছিলো, করলো, বলতো, কোরছে, হোলে, যেনো, কেনো (কী জন্য) ইত্যাদি বানান সবক্ষেত্রে ঠিক নয়।

নিম্নোক্ত বিশেষ ক্ষেত্রে ও-কারের ব্যবহার গ্রহণযোগ্য: 
> আদেশ-নির্দেশ-অনুরোধ (অনুজ্ঞা) অর্থে যখন ক্রিয়াকে ব্যবহার করা হয়: এক বালতি পানি আনো; আমাকে ধরো; বাবা! একটা গল্প বোলো; একটা গাড়ি কেনো।
> কিছু কিছু ক্রিয়াকে যখন বিশেষ্য (noun) হিসেবে ব্যবহার করতে হয়। ক্রিয়া-বিশেষ্য: শিশুকে খাওয়ানো বড় কঠিন; শেখানো আমি এখনও শিখতে পারি নি; ঘুম তাড়ানো; ছেলে ভোলানো।
> যেসব শব্দে ও-কার না দিলে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে: মতো, ভালো, আলো, কালো, হলো, করানো, খাওয়াতো।

প্রমিত ১১) প্রথমত আঃ কার্যত উঃ
===========================
বানানবিধি: শব্দের শেষে বিসর্গ থাকবে না। প্রথমতঃ, কার্যতঃ ইত্যাদি গ্রহণযোগ্য নয়।
উদাহরণ: প্রধানত প্রয়াত ক্রমশ সাধারণত প্রায়শ মূলত বস্তুত প্রথমত কার্যত
ব্যতিক্রম: আঃ, উঃ ইত্যাদি আবেগপ্রকাশক শব্দের শেষে বিসর্গের ব্যবহার প্রচলিত আছে।

প্রমিত ১২) সাহিত্যপত্র সমাজভিত্তিক সংবাদপত্র
=======================================
বানানবিধি: সমাসবদ্ধ পদ একসঙ্গে লিখতে হবে।
উদাহরণ: রবিবার সংবাদপত্র প্রধানশিক্ষক সমস্যাপূর্ণ বিষয়সমূহ সমাজভিত্তিক দায়গ্রস্ত নেশাগ্রস্ত সাহিত্যপত্র হলফনামা শিশুরা ছাগলগুলি
ব্যতিক্রম: অস্পষ্টতা দূর করার জন্য কখনো কখনো হাইফেন ব্যবহার করতে নিষেধ নেই: কিছু-না-কিছু, না-বলা-কথা, ভবিষ্য-তহবিল, মা-মেয়ে, বে-সামরিক, সু-প্রতিবেশী।

প্রমিত ১৩) লালগোলাপ শুভেচ্ছা
===========================
বানানবিধি: বিশেষণ পদ সাধারণত অন্য পদের সাথে মিলবে না।
উদাহরণ: মৃদু বাতাস, লাল গোলাপ, তিন হাজার, এক জন, সুন্দর ফুল
ব্যতিক্রম: সমাসবদ্ধ হয়ে যদি অন্য কোন বিশেষ্য বা ক্রিয়াপদের গুণ বর্ণনা করে তবে স্বভাবতই তা যুক্তপদ হিসেবে একসঙ্গে লিখতে হবে: কতদূর যাবে; একজন শিক্ষক, তিনহাজার টাকা, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, লালগোলাপ শুভেচ্ছা, একসঙ্গে চলবে।

প্রমিত ১৪) আমি পড়ি নি
====================
বানানবিধি: নাই, নেই, নি, না–এই নঞর্থক অব্যয় পদগুলি শব্দের শেষে আলাদাভাবে লেখতে হবে।
উদাহরণ: বলে নাই, করে নি, যাব না, ভয় নেই

প্রমিত ১৫) জসিম উদ্দীন মধুসূদন
===========================
বানানবিধি: উদ্ধৃতি করার সময় মূল লেখায় যে বানান আছে তা-ই লেখতে হয়। লেখকের নামেও কোন পরিবর্তিত বানানরীতি কার্যকর নয়।
উদাহরণ: নমাজ (শিরোনাম), জসিম উদ্দীন, মাইকেল মধুসূদন, শামসুর রাহমান, খলিকুজ্জামান (অর্থনীতিবিদ), গীতাঞ্জলী।

সচরাচর যেসব শব্দে বানানের ভুল হয়
==============================

১) ত্রিভূজ অন্তভূজ গণিত মাণ নির্ণয় অভ্যন্তরীণ আহৃত দৌরাত্ম্য শূন্যস্থান আবিষ্কার পরিষ্কার পুরস্কার নমস্কার বর্ণনা কৌতূহল মধুসূদন কারণ তিরস্কার সরস্বতী দ্বন্দ্ব মুহূর্ত সত্ত্বত্যাগ ব্যবচ্ছেদ ন্যস্ত বাড়ি মামি উনিশ জাপানি ইংরেজি কুমির রানী বর্ণালি মিতালি সে কী লেখেছে? ঋণ ভীষণ ইরান আয়রন সাইরেন পরান ঘণ্টা প্রকা- লন্ডন দুষ্ট বৃষ্টি মাস্টার জিনিস খ্রিষ্ট মসলা শহর শরবত কারিশমা সিনিয়র সালাম শাবান ক্রমশ কার্যত প্রধানশিক্ষক প্রশ্নসমূহ জসিম উদ্দীন

২) উজ্জ্বল জ্বলজ্বলে জ্বলন্ত জ্বালানি জ্বালানো (কিন্তু:প্রজ্জলিত)।
প্রাঞ্জল অঞ্জলি শ্রদ্ধাঞ্জলি গীতাঞ্জলি

৩) পেশাজীবী কর্মজীবী ক্ষণজীবী দীর্ঘজীবী বুদ্ধিজীবী সম্মানী অভিমানী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিযোগী মেধাবী প্রতিরোধী একাকী বন্দী দোষী বৈরী মনীষী সঙ্গী

৪) প্রবণতা বুঝাতে : উন্নয়নশীল দানশীল উৎপাদনশীল ক্ষমাশীল নির্ভরশীল দায়িত্বশীল সুশীল ধৈর্যশীল

৫) জ্বর অধ্যক্ষ প্রতীক ব্যাখ্যা সংজ্ঞা আকস্মিক মূর্ছা ক্ষীণ মুখমণ্ডল গুণাগুণ শিথিল অনুরণন হাস্যাস্পদ সালিস সত্বর উচ্ছ্বসিত স্বেচ্ছাচারী কর্মচারী সীলমোহর বিচি নীচে বাণী নবী শ্বশুর শাশুড়ি ইতোমধ্যে পরিপক্ব লজ্জাকর পুণ্য ভাস্কর, দুষ্কর সুষমা নিষিদ্ধ ষোড়শ নিষ্পাপ কলুষিত বিষণ্ন ওষ্ঠ সম্মুখ সম্মান সংজ্ঞা ব্যাখ্যা আনুষঙ্গিক সঙ্গ সঙ্গতি রূদ্ধশ্বাস দুর্নাম অন্তঃস্থল নগণ্য আতঙ্ক জটিল গগণ তিথি অতিথি অন্য অন্যান্য

৬) সাৎ প্রত্যয়ের দন্ত্য-স মূর্ধন্য-ষ হয় না: ধূলিসাৎ, ভূমিসাৎ, অকস্মাৎ।

৭) নিপুণ, কণা, কল্যাণ, গুণ, বাণিজ্য, গৌণ (স্বভাবতই মূর্ধন্য-ণ হয়, নির্দিষ্ট কোন কারণ নেই)

৮) কারণ শব্দে দন্ত্য-ন ব্যবহারের কোনই কারণ নেই। ‘কারন’ সবসময়ই ভুল।

৯) বানানের বিকল্প নেই যেসব শব্দে: ঋণ, পুণ্য, শূন্য, শ্রবণ, মৃন্ময়, গণ, শীত, শ্রাবণ, দর্শন।

১০) ত-বর্গযুক্ত দন্ত্য-ন মূর্ধন্য-ণ হয় না: বৃন্ত, বৃন্দ, গ্রন্থ, আক্রান্ত।

১১) -অর্তী/-আর্থী: পরবর্তী, মধ্যবর্তী, অন্তর্বতী, পরীক্ষার্থী, প্রার্থী, বিদ্যার্থী, হিতার্থী

১২) নিরীহ অতীত লক্ষ্মী যক্ষ্মা উদ্বুদ্ধ টীকা পাঠটীকা বিনীত বাণী ভবিষ্যদ্বাণী জাতি (কিন্তু: জাতীয়)

১৩) মধ্যাহ্ন অপরাহ্ণ পূর্বাহ্ণ

১৪) গ্রামীণ প্রাচীন। ঐক্য ঐক্যবদ্ধ ঐক্যজোট কিন্তু:‘ঐকমত্যের সরকার’

১৫) পরীক্ষা প্রতীক্ষা অভীক্ষা নিরীক্ষা (কিন্তু শিক্ষা ভিক্ষা

১৬) আকাঙ্ক্ষা (ক্ষ-এর পূর্বে ঙ ব্যবহার্য)

১৭) পুনরাবৃত্তি পৌনঃপুনিক পুনঃপুন পুনরাবৃত্তি পুনরুক্তি

১৮) শাস্তিমূলক অমূলক ভ্রান্তিমূলক তুলনামূলক শিক্ষামূলক আকুতিমূলক

১৯) ক্ষীর ক্ষুর ক্ষেত কিছুক্ষণ লক্ষণ

২০) ভ-এর পরের উ-কারটি সাধারণত ঊ-কার হয়: ভূমি ভূ-সম্পত্তি অনুভূতি সহানুভূতি ভূত ভূতুড়ে ভূগোল প্রভূত বহির্ভূত ভূষিত ভ্রূকুটি ভূতপূর্ব। (ব্যতিক্রম প্রভু ভুল অন্তর্ভুক্ত অদ্ভুত

২১) সকল ‘হীন’ ঈ-কার দিয়ে হয়: বিহীন হীন চরিত্রহীন দায়িত্বহীন শব্দহীন অস্তিত্বহীন অন্তহীন প্রাণহীন গুরুত্বহীন ভাষাহীন শব্দহীন কর্মহীন তারহীন বন্ধনহীন

২২) দূর সুদূর দূরবর্তী রূপ স্বরূপ অপরূপ রূপবতী দূষণ দূষিত সূত্র

২৩) স্তূপ দূত রাষ্ট্রদূত ধূলা ধূমপান কটূক্তি স্ফূর্তি চূড়া চূড়ান্ত গোধূলী নির্মূল রূপ শূন্য ময়ূর

২৪) ‘রুপালি’ লেখা যায় বলে রূপক স্বরূপ রূপ রূপকল্প ইত্যাদি লেখতে যেন ভুল না করি।

Image

বাংলা বানানের সাতকাহন
====================

১ ]] বানান শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘বর্ণং’ থেকে যার অর্থ ‘শব্দের মধ্যস্থিত বর্ণসমূহের ক্রমবর্ণনা’।
বাংলা বানান বলতে বুঝায় বাংলায় ব্যবহৃত শব্দে বর্ণসমূহের ক্রমানুক্রমিক বর্ণনা।

২ ]] বাংলা বানান নিয়ে বিভ্রান্তির অন্ত নেই। উনিশ শতকের পূর্ব পর্যন্ত বাংলা বানানের নিয়ম বলতে কিছু ছিল না। তখন মোটামুটি সংস্কৃত ব্যাকরণের অনুশাসন অনুযায়ী বাংলা তৎসম শব্দের বানান নির্ধারিত হতো।

৩ ]] ১৯৩৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কিছু শব্দের বানানের নিয়ম বেধে দেয়, তাতে কিছু রক্ষণশীল পণ্ডিত বিরোধিতা করলেও রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রসহ অধিকাংশ পণ্ডিত ও লেখক সেসব নিয়ম সমর্থন করেন। যদিও পরবর্তিতে বিশ্বভারতী তাদের নিজস্ব বানানের নিয়ম বের করে বিভ্রান্তি চালিয়ে রাখে।

৪ ]] পাঠ্যপুস্তকে বানানের সমতাবিধানের উদ্দেশ্যে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ১৯৮৪ সালে গঠন করে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি যারা অভিন্ন বানানের জন্য কিছু নিয়ম সুপারিশ করেন। নানা কারণে সে নিয়ম বহুল প্রচলিত হয় নি।

৫ ]] জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ১৯৮৮ সালে কুমিল্লায় একটি কর্মশিবিরের আয়োজন করে বাংলা বানানে সমতা বিধানের লক্ষ্যে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে। সে নীতিমালা মোতাবেক ড. আনিসুজ্জামানের নেতৃত্বে বাংলা বানানের নিয়ম ও শব্দ তালিকা চূড়ান্ত করা হয় এবং ১৯৯২ সালে ‘পাঠ্য বইয়ের বানান’ নামে একটি পুস্তিকা বের হয়।

৬ ]] বাংলা একাডেমি আবার ড. আনিসুজ্জমানকেই সভাপতি করে বানানের নিয়মগুলিকে সূত্রবদ্ধ করার জন্য কমিটি গঠন করে। এ কমিটি বিশ্বভারতী, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড প্রবর্তিত পাঠ্য বইয়ের বানানরীতিকে সমন্বিত করে একটি অভিন্ন বানানের নিয়ম নির্ধারণ করেন, যা বাংলা একাডেমির ‘প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ বলে পরিচিত। প্রথম প্রকাশ ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর এবং পরিমার্জিত সংস্করণ ১৯৯৪ সালের জানুয়ারি।

৭ ]] উক্ত নিয়মকে অনুসরণ করে একই কমিটির অন্যতম সদস্য জামিল চৌধুরী প্রণয়ন করেন ‘বাংলা বানান-অভিধান’। ১৯৯৪ সালের জুনে বাংলা একাডেমি এটি প্রকাশ করে। বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত থাকার জন্য বাংলাদেশের সমসাময়িক সাহিত্য এবং পত্রপত্রিকায় ওই বানানকে ‘প্রমিত’ হিসেবে গণ্য করা হয়।

Image

শেষ কথা। ভুলের শেষ নেই। এই তালিকাতেও ভুল থাকতে পারে। কিন্তু ভুল নিয়ে এগিয়ে যাওয়া বা ‘বানানে আমি কাঁচা’ বা ‘আমার বানানে ভুল হয় না’ এরকম মনোভাব আমাদের অভ্যাস খারাপ করে দিতে পারে। এজন্য নির্ভুল থাকার উপায়টি হলো: শুদ্ধ বানানে আপোসহীন থাকা, সবসময়ই অনুসন্ধানে থাকা এবং নিশ্চিত না হয়ে ব্যবহার না করা। আজকাল শুদ্ধ বানানের অনেক সহায়তা পাওয়া যায় অনলাইনে এবং অফলাইনে। আশা করছি লেখাটি একটু হলেও সঠিক বানান সম্পর্কে আমাদেরকে সচেতন করবে।

 


প্রকাশিত:  সামহোয়্যাারইন ব্লগ।  সময়ের বিবর্তন ২০১২