Category: পড়া নিয়ে লেখা

প্রেমের আরেক নাম!!!

love

(১) ভালোবাসার আদিরূপ
——————————————

ভালবাসার চারটি ধরন : স্নেহ মায়া মমতা, বন্ধুর সাথে হৃদ্যতা, বিপরীত লিঙ্গের সাথে প্রেম আর ঈশ্বরে আসক্তি বা ভক্তি। এই প্রকারভেদ আবিষ্কার করেছেন গ্রিক প্রেম-পণ্ডিত বা দার্শনিকগণ।

তাদের ভাষায় প্রথমটির নাম হলো storge বা affection যার অর্থ পিতামাতার ভালবাসা বা পারিবারিক ঘনিষ্টতা। শুধু মানুষই না, সকল প্রাণীরই সন্তানের প্রতি মাবাবার বা মাবাবার প্রতি সন্তানের ভালবাসা আছে। পারিবারিক বন্ধনই স্টোর্জ বা পারিবারিক ভালবাসার মূল ভিত্তি।

দ্বিতীয়টির নাম philia বা friendship, সাধারণত সমগোত্রীয় সমবয়সী বা অভিন্ন চিন্তাচেতনার মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে ফিলিয়া বলে। বন্ধুত্ব অতি প্রাচীন একটি সামাজিক সম্পর্ক। সত্যিকার বন্ধু প্রেমের চেয়েও গভীর, তা যারা পেয়েছে তারা আরও ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবে। নিজের জন্য নয় বন্ধুটি যেন ভালো থাকে – এরকমের অনুভূতি থেকে এর সৃষ্টি। আমাদের সমাজে শিক্ষাজীবন বা বাল্যজীবনে এরকমের বন্ধুত্ব পেয়ে থাকি, যা কর্মজীবনের বাস্তবতায় এসে অনেকটা ফিকে হয়ে যায়। কারও কারও থেকে যায় আমৃত্যু। তারা ভাগ্যবান।

তৃতীয়টির নাম eros বা romance বাংলায় প্রেম, গভীর প্রেম। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি শাশ্বত জৈবিক আকর্ষণ। এই ভালবাসা প্রলয়ংকরী এবং সৃষ্টিকারী উভয়ই। এটি ধ্বংস করতে পারে আবার অসম্ভবকে সৃষ্টি করতে পারে। পৃথিবীর অনেক সৃষ্টি ও ধ্বংসের উৎস এই প্রেম। দার্শনিক প্ল্যাটো অবশ্য এর মাঝামাঝি এক আদর্শিক প্রেমের কথা বলেছেন, যাতে দৈহিক ঘনিষ্টতাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, যাকে আমরা বলে থাকি প্ল্যাটোনিক প্রেম। আবার সিগমান্ড ফ্রয়েড সেটাকে অস্বীকার করে গেছেন।

চতুর্থটির নাম agape বা unconditional love। ঈশ্বরের সাথে শর্তহীন সম্পর্কের নামকে বলা হয় আগাপে অন্য ভাষায় charitable love। আমাদের সুফিবাদ অনেকটা এর কাছাকাছি। ঈশ্বরের অস্তিত্বে দেহ-মন-শরীরে গ্রহণ করে পরম একাত্মতা বোধ করার নামই আগাপে বা খোদা-প্রেম। নজরুল গেয়েছেন, “খোদারও প্রেমে সরাবও পিয়ে…বেহুঁস হয়ে রই পড়ে।” ঈশ্বরবাদীদের মতে, এ-ই হলো সর্বোত্তম প্রেম, যা আমাদেরকে নিঃস্বার্থভাবে স্বজাতিকেও ভালবাসতে শক্তি যোগায়। মাদার তেরিজা বলেছিলেন, প্রতিটি মানুষের মধ্যে আমি ঈশ্বরকে দেখতে পাই।

.

(২) পবিত্র গ্রন্থাবলীতে ভালোবাসার কথা
———————————————–

ইসলাম ধর্মে ভালোবাসা:

পবিত্র কুরআন শরীফে ৬৯ বার ভালোবাসা শব্দ বা ধারণাটি উল্লেখিত হয়েছে। সেখানেও চার প্রকার ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে। তবে তা উপরের প্রকারভেদের মতো নয়।

ক) বিষয়-আসয়ের প্রতি ভালোবাসা: তারা এই পৃথিবীকে ভালোবাসে পরকালকে ভালোবাসে না – আল্লাহ বিশ্বাসত্যাগীদেরকে পথ দেখান না (১৬:১০৭)।
খ) মানবিক ভালোবাসা: আজিজের স্ত্রী ক্রীতদাসকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করছে আর সেই ক্রীতদাস তাকে হিংস্র ভালোবাসায় অনুপ্রাণিত করছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি ওই নারী ধ্বংস হচ্ছে (১২:৩০)।
গ) আল্লাহ’র প্রতি ভালোবাসা: আল্লাহ’র প্রতি ভালোবাসার কারণে শ্রমজীবী, অনাথ এবং বন্দীকে তারা খাবার দেয় (৭৬:৮)।
ঘ) মানুষের প্রতি আল্লাহ’র ভালোবাসা: আল্লাহ’র জন্য তোমার সম্পদকে ব্যবহার করো, ধ্বংসের জন্য তোমার হাতকে ব্যবহার করো না কিন্তু ভালো কাজ করো। যারা ভালো কাজ করে, তাদেরকে আল্লাহ ভালোবাসেন (২:১৯৫)।

.

হিন্দু ধর্মে ভালোবাসা:

সনাতন ধর্মে, অর্থাৎ পবিত্র ভগবদ গীতায় ভালোবাসাকে মূল বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ভালোবাসাই সবকিছু। এখানে দু’প্রকার ভালোবাসার কথা আছে। ঈশ্বরের প্রতি মানুষের ভালোবাসা এবং মানুষের প্রতি ঈশ্বরের ভালোবাসা। একটি অন্যটির সাথে সম্পর্কযুক্ত।
*মানুষ যেভাবেই চেষ্টা করুক না কেন তাদের ভালোবাসাকে আমি ভালোবাসা দিয়ে উত্তর দিই। যে পথেই তারা চেষ্টা করুক, সেটা অবশেষে আমার দিকে ফিরে আসে। (গীতা ৪:১১)
*আমি শুরু এবং শেষ, আদি এবং পরিণতি, আশ্রয় গৃহ এবং সত্য প্রেমিক, গর্ভাশয় এবং মৃত্যুহীন বীজ। (গীতা ৯:১৮)
*তুমি যদি তোমার মনকে আমার দিকে ফেরাও, আর সমস্ত অন্তকরণ দিয়ে আমাকে মান্য করো, তবে নিশ্চয়ই তুমি আমাকে পাবে; এটি আমার প্রতিজ্ঞা, কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি। (গীতা ১৮:৬৫)

.

বৌদ্ধ ধর্মে ভালোবাসা:

বৌদ্ধ ধর্মে, যেখানে ভালোবাসাকে আত্মিক মুক্তির পথ হিসেবে ধরা হয়, বলা হয়েছে জীবে প্রেম করার কথা। জীবে প্রেমই ঈশ্বরের আরাধনা। ছোট বড় সভ্য অসভ্য ইতর প্রাণী – সকল জীবকেই সমানভাবে দেখা হয়েছে। বৌদ্ধা ধর্মীয় নেতা দালাই লামা বলেছিলেন, দয়াই তার ধর্ম। বলা বাহুল্য, বৌদ্ধ ধর্মকেও ভালোবাসা বা প্রেমের ধর্ম বলা হয়।

বৌদ্ধ ধর্মেও চার প্রকার ভালোবাসার দীক্ষা দেওয়া হয়: ভালোবাসা বা প্রেম (love/ love kindness), করুণা (compassion), সহানুভূতি (sympathetic joy) এবং প্রশান্তি (equanimity)। বৌদ্ধ ধর্মের ভাষা পালিতে এগুলোকে একসাথে ‘ব্রহ্মবিহার’ বলা হয়, যার অর্থ দাঁড়ায় ঈশ্বরাশ্রয় বা ঈশ্বরসদৃশ। ‘যাকে ভালোবাসো তাকে মুক্তি দাও’ – কথাটি প্রধানত বৌদ্ধ ধর্মের কথা।

.

খ্রিষ্ট ধর্মে ভালোবাসা:

পবিত্র বাইবেলে যীশু নিঃশর্ত ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কথা বলেছেন, “যারা তোমাকে ভালোবাসে, যদি শুধু তাদেরকেই তুমি ভালোবাসো, তবে সেখানে কৃতীত্বের কী আছে? পাপীরাও কী তা-ই করে না?” (লুক ৬:৩২) খ্রিষ্টবিশ্বাসীরা মূলত “ঈশ্বর নিজেই প্রেম” বলে বিশ্বাস করেন। ঈশ্বরকেই সকল ভালোবাসার উৎস বলে জানেন।

এক নিঃস্বার্থ ভালোবাসার দীক্ষা নিয়ে থাকেন খ্রিষ্টবিশ্বাসীরা। বাইবেলে বলা আছে: “ভালোবাসা ধৈর্য্য ধরে, দয়া করে, হিংসা করে না, গর্ব করে না, অহংকার করে না, খারাপ ব্যবহার করে না, নিজের সুবিধার চেষ্টা করে না, রাগ করে না, কারও খারাপ ব্যবহারের কথা মনে রাখে না, খারাপ কিছু নিয়ে আনন্দ করে না বরং যা সত্য তাতে আনন্দ করে। ভালোবাসা সবকিছুই সহ্য করে, সকলকেই বিশ্বাস করতে আগ্রহী, সব কিছুতে আশা রাখে আর সব অবস্থায় স্থির থাকে।” (১করিন্থীয় ১৩:৪-৭)

.

.

৩) উপসংহার – ভালোবাসাটি আসলে কী জিনিস? খায় নাকি পড়ে?
——————————————————–

আমার বন্ধুর বাসায় একদিন পৌঁছামাত্রই তার দু’টি যমজ ছেলে সাড়া বাড়িজুড়ে ছুটাছুটি শুরু করলো। হঠাৎ আমার গালে বেমক্কা এক ঘুষি! সাথে সাথে অপর যমজটিও আমার অন্য গালে! আমি তো রীতিমতো স্তম্ভিত। নির্বিকার বন্ধুটি হেসে বললো, আমার ছেলেরা তো তোমাকে পছন্দ করে ফেলেছে। আজ আর তুমি বাসায় ফিরতে পারবে না, ওদের ঘুমের আগে!” সত্যিই তা হলো – আমাকে তারা আসতে দেবে না – খেলতে হবে তাদের সাথে! শেষে তাদের ঘুমের পর আমি বাসায় ফিরি! ভালোবাসার প্রকাশও একেক জনের একেক রকম।

‘মানুষ ধর মানুষ ভজ/ শুন বলিরে পাগল মন’ গানটি শুনলে আমি আচ্ছন্ন হয়ে যাই এক বিশেষ অনুভূতিতে। মন চায়, নেমে পড়ি রাস্তায় – কী হবে ঘর সংসার টাকাকড়ি দিয়ে? সত্যিই প্রেম কত ব্যাপক একটি বিষয়, অথচ এ বিষয়টিতেই মানুষের কত রকমের অনুভূতি হয়। একেক বয়সে ভালোবাসার অভিজ্ঞতা একেক রকম! ভাবতেই অবাক লাগে। তরুন বয়সে ভালোবাসা তো নিছকই ‘বিপরীত লিঙ্গের প্রতি দৈহিক আকর্ষণ’।
মূলত ভালোবাসার প্রতি সীমাবদ্ধ ধারণার কারণেই এর অপব্যবহার হয় বেশি। সকলকে ভালোবাসা জানাই!!

 

 

 


*সূত্র: ব্যক্তিগত অধ্যয়ন। ছবি – ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।

**পুনশ্চ: ধর্মগ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দিতে বরাবরই ভয় পাই – এবারও বেশ সাবধানে তা করেছি। তবে অনুবাদগত কিছু ত্রুটি থাকতেই পারে। শুধুই ভালোবাসার বিষয়টি আলোচনা করার জন্য এই অবতারণা। কোন ধর্মীয় বিষয় এখানে আলোচ্য নয়। তাই, বিষয়টিকে সেভাবেই গ্রহণ করলে কৃতার্থ হবো।

অসাম্প্রদায়িক নজরুলের জন্মজয়ন্তী

KNIHunting-crop

কী ভূমিকা দেবো বিদ্রোহী কবি নজরুলের? কী বৈশিষ্ট্য তাকে মানায়? কী তিনি করেন নি, তার জীবদ্দশায়? নজরুলের পরিপূর্ণ ভূমিকা লেখার সাধ্য কার আছে, আমি জানি না। যদি বলি, বাংলা সাহিত্যে বিদেশি শব্দকে কোন্ লেখক ভৃত্যের মতো খাটিয়েছেন? যদি বলি, কোন্ কবির লেখা একাধারে ইসলাম এবং হিন্দু দু’টি ধর্মেই সমাদৃত? কোন্ কবি একাধারে সৈনিক, সুরকার, গীতিকার, কণ্ঠশিল্পী, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, নাট্যকার, অভিনেতা, প্লেব্যাক সিংগার এবং চলচ্চিত্রকার ছিলেন? ব্যক্তিগত সামাজিক এবং কর্মজীবনে বিচিত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী বাঙালি কবির নাম কী? মেহনতি আর বঞ্চিত মানুষের জন্য কবিতা লেখে বাঙালির হুইটম্যান হয়েছিলেন কোন্ কবি? এরকম অনেক প্রশ্নের উত্তরে একটিই আসে নাম, কাজী নজরুল ইসলাম। ভাষার প্রয়োগেও নজরুল ছিলেন প্রথাবিরোধী, অনেকটা বিপ্লবী। নজরুল তার গান-কবিতা-গল্পে-প্রবন্ধে এমন সব শব্দরাজি ব্যবহার করেছেন, যা কেউ করেন নি আগে। বাংলা ভাষাকে বিদেশি শব্দ দিয়ে এতো সমৃদ্ধ কেউ করার সুযোগ পান নি, সাহসও পান নি।

নজরুলের জীবনী বা সাহিত্য জীবন নিয়ে অল্প কথায় বলে শেষ করা যাবে না। এ লেখাটি বস্তুত অসাম্প্রদায়িক নজরুলের চেতনাকে আলোকপাত করার জন্য।

জন্ম, ছেলেবেলা এবং লেখক নজরুল

ইংরেজি ১৮৯৯ সালের ২৪ মে এবং বাংলা ১৩০৬ সালের ১১ জ্যৈষ্ঠ তারিখে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নজরুল, যার ডাকনাম ছিলো দুখুমিয়া। পিতা কাজী ফরিদ আহমেদ ছিলেন মসজিদের ইমাম ও মাজারের খাদেম। ১৯০৮ সালের পিতার অকাল মৃত্যুর তাকেই পিতার ভূমিকায় গ্রহণ করে হতে হয় মাজারের খাদেম ও মসজিদের মোয়াজ্জিন। বয়স ১০ হতে না হতেই সংসারের দায়িত্ব নিতে হয় দুখুকে। কাজ করতে হয় রুটির দোকানে। গ্রামের মক্তবে শেষ হয় তার বাল্যশিক্ষা। ১৫ বছর বয়সে চাচার বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালে এসে স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে লেখাপড়া ভালোমতো শেষ না হতেই ফিরে যান পশ্চিমবঙ্গে এবং বিভিন্ন বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েন।

প্রবেশিকা পরীক্ষার পূর্বেই নজরুল যোগ দেন সেনাবাহিনীতে। ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণ তূর্য’ – নজরুলের সাহিত্য সাধনা এবং বৈচিত্রময় কর্মজীবন সবসময়ই পাশাপাশি চলেছে। মূলত করাচি সেনানিবাসেই নজরুলের লেখক জীবনের সার্থক সূচনা ঘটে।

অসাম্প্রদায়িক নজরুল

শান্তি, সাম্য, অধিকার, স্বাধিকার – কবি নজরুলের চেতনার একেকটি হীরকখণ্ড। সাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কার আর কুপমণ্ডুকতা ছিলো তার চেতনার প্রতিপক্ষ। তিনি ছিলেন চেতনার কবি। তিনি যেমন মেনে নেন নি নারীর প্রতি অবিচার আর বৈষম্য, তেমনি মেনে নেন নি দুর্বলের প্রতি সবলের আধিপত্য।

বিভিন্ন লেখায় তিনি হিন্দু-মুসলিম বিভেদের অবসান চেয়েছেন এবং দু’টি সম্প্রদায়ের মধ্যে সামঞ্জস্যকারী বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন গান ও কবিতায়। তিনি মুসলিমদের জন্য যেমন অসংখ্য হামদ নাত ও গজল লিখেছেন, তেমনি লিখেছেন হিন্দুদের জন্য অনেক গান ও কীর্ত্তন। একে অন্যের সাথে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গড়ে তোলার জন্য তিনি অসংখ্য গান ও কবিতা রচনা করেছেন এবং তাতে ইচ্ছাকৃতভাবে সাম্প্রদায়িক শব্দাবলীর প্রয়োগও করেছেন।

“আমি হিন্দু-মুসলমানের মিলনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী। তাই তাদের কুসংস্কারে আঘাত হানার জন্যই মুসলমানী শব্দ ব্যবহার করি, হিন্দু দেব-দেবীর নাম নিই। অবশ্য এরজন্য অনেক জায়গায় আমার সৌন্দর্যের হানি হয়েছে। তবু আমি জেনে শুনেই তা করেছি।” (শব্দ ধানুকী নজরুল ইসলাম, শাহাবুদ্দিন আহমদ)

নজরুলের ‘ধূমকেতু’ আজও আমাদের চেতনাকে নাড়া দেয়। ধূমকেতু বের হতো সপ্তাহে দু’বার। মূল উদ্দেশ্য স্বাধিকার আন্দোলনে স্বসস্ত্র বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। ধূমকেতু’র বিশেষ একটি সংখ্যার জন্যই নজরুল কুমিল্লায় আটক এবং রাজবন্দী হয়ে কলকাতায় প্রেরিত হন। ‘রাজবন্দীর জবানবন্দি’তে নজরুল বলেন-

“… আমি কবি। আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। কবির কণ্ঠে ভগবান সাড়া দেন, আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা ভগবানের বাণী। সে বাণী রাজবিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারে সে বাণী ন্যায়দ্রোহী নয়, সত্যাদ্রোহী নয়।”

‘সাম্যবাদি’ কাব্যগ্রন্থে কবি যা লিখেছেন, আজকের সুশীল সমাজ তাতে আঁতকে ওঠবেন। ‘সাম্যবাদি’, ‘মানুষ’ এবং ‘নারী’ কবিতায় নজরুল ধর্মীয় উগ্রতার বিপক্ষে মানবতার বাণী তুলে ধরেছেন। কাব্যিক খ্যাতির জন্য নয়, মানবতার জন্য তিনি লিখে গেছেন আমৃত্যু।

“গাহি সাম্যের গান-

যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান।

যেখানে মিশেছে হিন্দু-মুসলিম-বুদ্ধ-খ্রিশ্চান।

গাহি সাম্যের গান!

কে তুমি?- পার্সী? জৈন? ইহুদী? সাঁওতাল, ভীল, গারো?
কন্‌ফুসিয়াস্‌? চার্বআখ চেলা? ব’লে যাও, বলো আরো!” [সাম্যবাদি/ নজরুল]

নজরুলের সাম্যকে শুধুই সমাজতান্ত্রিকতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তিনি সামাজিক এবং সাম্প্রদায়িক সাম্যের জন্য লিখেছেন। শুধু মুসলিম বা শুধু হিন্দু নয়, সংস্কারাচ্ছন্ন সমাজকে জাগিয়ে তোলার জন্য তিনি সকলের কবি হয়ে ওঠেছিলেন। তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থে একজন রেনেসাঁ বা নবজাগরণের কবি।

চেতনায় নজরুল

“সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ/ চেতনাতে নজরুল

যতোই আসুক বিঘ্ন বিপদ/ হাওয়া হোক প্রতিকূল।

এক হাতে বাজে অগ্নিবীণা/ কণ্ঠে গীতাঞ্জলী

হাজার সূর্য চোখের তারায়/ আমরা যে পথ চলি।”

(ভূপেন হাজারিকার গান)

পাকিস্তানি শাসনামলে নজরুল দু’টি কারণে গুটিয়ে ছিলেন বাংলাদেশে: প্রথমত তিনি বাকরুদ্ধ ছিলেন; দ্বিতীয়ত অসাম্প্রদায়িক লেখার কারণে শাসকগোষ্ঠীর অবমূল্যায়ন ও কাফের খেতাব। স্বাধীন বাংলাদেশে পুরোদমে শুরু হয় নজরুল চর্চা। নজরুল সঙ্গীতে প্রশিক্ষণ, স্বরলিপি প্রকাশ এবং নজরুল সাহিত্যে গবেষণা পত্রিকা প্রকাশ পায়। তিনি হয়েছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এক নেপথ্য চেতনাসঙ্গী। নজরুলের গানগুলো অভাবনীয় চেতনা জাগিয়েছে মুক্তিসংগ্রামীদের। ‘কারার ঐ লৌহকপাট/ ভেঙ্গে ফেল কর রে লোপাট’ শুনলে বাঙালির গা শিউরে ওঠবে জন্ম জন্মান্তর। ‘চল চল চল’ আমাদের জাতীয় রণসংগীত। দেশের স্বাধীনতার নেপথ্য ধ্বনি, কাজী নজরুল আমাদের জাতীয় কবি, যিনি মূলত অবিভক্ত বাংলার সকলের কবি ছিলেন। বাংলাদেশ এবং ভারতের একাধিক রাস্তা ও এভিনিউ’র নামকরণ করা হয়েছে তার নামে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নজরুল ইনিস্টিউট এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নজরুল বিষয়ে পড়ানো হচ্ছে। ময়মনসিংহের ত্রিশালে নজরুলের বিদ্যাপিঠ দড়িরামপুর হাইস্কুলের পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

নজরুলের মৃত্যুতে বাংলাদেশ ও ভারত একসঙ্গে শোক প্রকাশ করে। মৃত্যুর পর বাংলাদেশে ছিলো দু’দিনের জাতীয় শোক দিবস আর ভারতের আইন সভার এক মিনিটের নিরবতা। সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে তার জানাজায় ১০ হাজারেরও বেশি লোক জমায়েত হয়।

মৃত্যু এবং রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথের সাথে সংশ্লিষ্ট নজরুলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও তথ্য আছে যা এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। রবীন্দ্রনাথের জন্মের ৩৮ বছর পর পৃথিবীতে এসেছেন নজরুল (১৮৯৯-১৮৬১)। দু’জনকে পরিপূর্ণ সমসাময়িকতায় যেমন আনা যায় না, তেমনি লেখক হিসেবে তাদের সামাজিক এবং দার্শনিক পটভূমিও এক করা যায় না। ফলে, নজরুল-রবীন্দ্রকে একই সারিতে দাঁড় করানোর চেষ্টা করাও অন্যায়।

সাহিত্য সমাজে উভয়েই উভয়ের প্রতি যথাযোগ্য শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। কারারুদ্ধ নজরুলকে উৎসর্গ করে রবীন্দ্রনাথ কবিতা লিখেছিলেন। ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথ মারা যাবার পর স্বপ্রণোদিত হয়ে নজরুল তার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করেন ‘রবিহারা’ ও ‘অস্তরবি’ কবিতাদ্বয়ের মাধ্যমে। ‘ঘুমাতে দাও শ্রান্ত রবিরে’ শিরোনামে একটি শোকগাঁথাও রচনা করেন। ‘রবিহারা’ কবিতাটি নজরুল নিজেই আবৃত্তিও করেন। তার ঠিক এক বছর পর নজরুল বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন এবং দীর্ঘ ৩৪ বছরের নিরবতার জীবন শেষে প্রেম ও মানবতার কবি নজরুল ১৯৭৬ সালের ২৯ অগাস্টে ঢাকায় মৃত্যু বরণ করেন।

রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরের বছরেই নজরুলের কবি জীবনের মৃত্যু হয়। মাত্র ২৮ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত লিখেই দুখুমিয়া নজরুলকে দুরারোগ্য ব্যাধিতে পড়তে হয়েছিলো। রবির আকাশে অন্য কোন তারাকে স্বাভাবিকভাবেই খুব স্পষ্ট দেখা যায় না। অথচ, কেউ কারও দ্বারা প্রভাবিত হবার প্রমাণও লেখায় নেই। প্রত্যেকেই স্বকীয় এবং ভিন্ন ভিন্ন সত্ত্বায় প্রতিষ্ঠিত। তবে রবীন্দ্রনাথের ৬৭ বছরের সাহিত্যজীবনের মতো  শারিরীক এবং মানসিকভাবে সুস্থ থাকলে, আমরা হয়তো অন্য উচ্চতায় নজরুলকে আজ দেখতে পেতাম।

এগারো জ্যেষ্ঠ জন্মজয়ন্তীতে বাঙালির জাতীয় কবির প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করছি।

কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রধান গ্রন্থসমূহ:

১) কাব্যগ্রন্থ:  অগ্নিবীনা (১৯২২), সঞ্চিতা (১৯২৫), ফণিমনসা (১৯২৭), চক্রবাক (১৯২৯)

২) কবিতা ও গান: দোলনচাপা (১৯২৩), বিষেরবাঁশি (১৯২৪), ভাঙ্গার গান (১৯২৪), ছায়ানট (১৯২৫), জিঞ্জির (১৯২৮), প্রলয়শিখা (১৯৩০)

৪) ছোট গল্প: রিক্তের বেদন (১৯২৫), শিউলী মালা (১৯৩১), ব্যথার দান (১৯৯২)

৫) উপন্যাস: বাঁধনহারা (১৯২৭), মৃত্যুসুধা (১৯৩০), কুহেলিকা (১৯৩১)

৬) নাটক: ঝিলিমিলি (১৯৩০), আলেয়া (১৯৩১), পুতুলের বিয়ে (১৯৩৩)

৭) প্রবন্ধ:  যুগবাণী (১৯২৬), ঝিঙে ফুল (১৯২৬), দুর্দিনের যাত্রী (১৯২৬)

Presentation1-crop

———————————————————————————————

গ্রন্থপঞ্জি:

১) বাংলাপিডিয়া, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম, ২০০৩।

২) দৈনিক সমকাল, ২২ জুন ২০১১।

৩) ডেইলি নিউ এইজ, আতাউর রহমান, ২৫ মে ২০১২।

 

** প্রথম আলো ব্লগে পাঠকপ্রতিক্রিয়া

লেখাটি প্রথম আলো ব্লগে সঞ্চালক কর্তৃক নির্বাচিত হয়েছিলো

লেখাটি প্রথম আলো ব্লগে সঞ্চালক কর্তৃক নির্বাচিত হয়েছিলো

আলবেয়ার ক্যামু’র দি আউটসাইডার একটি মন জাগানোর বই

প্রচ্ছদ: দি আউটসাইডার

প্রচ্ছদ: দি আউটসাইডার

“মা মারা গেছেন আজ। হয়তো গতকাল, আমি ঠিক জানি না।” এভাবেই শুরু হয় ‘দি আউটসাইডার’ উপন্যাসটি। প্রধান চরিত্রের দেওয়া প্রথম উক্তিটি বিভিন্নভাবে অগণিতবার ব্যবহৃত হয়ে বিখ্যাত হয়ে আছে সাহিত্য সমাজে। দর্শনভিত্তিক এ উপন্যাসটির ফরাসি নাম লেত্রঁজে (L’Étranger) । ইংরেজিতে ‘দ্য স্ট্রেইনজার’ নামটিও প্রচলিত। ‘দি আউটসাইডার’ একটি গভীর তত্ত্বভিত্তিক উপন্যাস, যেখানে জীবনের অযৌক্তিকতা (absurdism) ও অস্তিত্ববাদকে (existentialism) উপস্থাপনা করা হয়েছে অত্যন্ত সহজ এবং বাস্তবভিত্তিক জীবন দিয়ে। মানুষ হিসেবে জীবনের তাৎপর্যের অনুসন্ধান করা কতটুকু সার্থক তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে বিশ্বাসযোগ্য দৃষ্টান্ত ও উপমা দিয়ে।

মরসোঁ (Meursault) নৈতিকতা ও অনুভূতিহীন এক নায়ক, যার মুখ দিয়ে লেখক বলিয়েছেন জীবন সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গির কথা। বিষয়ের বিচারে উপন্যাসের ফরাসি শিরোনামই যথার্থ, যার অর্থ অপরিচিত বা অচেনা বা ভিনদেশী। নায়ক মরসোঁ সত্যিই অচেনা এক মানুষ। আমাদের সমাজে মরসোঁ’র মতো ব্যক্তি পছন্দনীয় নয়। সমাজ তাদেরকে একঘরে করেই রেখেছে যুগ যুগ ধরে। কখনও কখনও করেছে বাকরুদ্ধ অথবা নিপীড়ন অথবা হনন! অথচ তাদের জীবন ও দর্শন দিয়ে যে বিমূর্ত সত্যকে উপস্থাপন করেছেন তা বুঝার চেষ্টা ক’জনে করে?

দি আউটসাইডার থেকে প্রাপ্ত কিছু বিছিন্ন অনুভূতি জানাবার জন্য এ লেখা। এবিষয়ে আরও লেখা দিতে চাই। অনুবাদ করতে চাই ফরাসি লেখকের এই কালজয়ী ক্যাসিক উপন্যাসটি। তবে যেহেতু আমি কোন লেখক নই, সেক্ষেত্রে পাঠকের প্রেরণাই আমার একমাত্র সম্বল।

 

‘দি আউটসাইডার’ থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি:

১) “মিনিটখানেক পর সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, আমি তাকে ভালোবাসি কি না। উত্তরে আমি বললাম, আমার কাছে ওটার কোন অর্থ নেই। তাকে বললাম যে, ওরকম কোন চিন্তা আমার মনে নেই।” চতুর্থ অধ্যায়ে ম্যারির সাথে কথোপকথন। এখানে মরসোঁর নিরাবেগ এবং অনুভূতিহীন মনোভাবের একটি চিত্র পাওয়া যায়। সে সবসময় এরকমই ভাবলেশহীন পুরো গল্পে। তার উত্তরটি যতই সততায় পূর্ণ থাকুক, এতে অজ্ঞতারও পরিচয় পাওয়া যায়। এখানে ম্যারি’র প্রশ্নের আবেগের বিষয়টি মরসোঁ একটুও বুঝতে পারে নি। মরসোঁ’র কাছে প্রেমের কোন অর্থ নেই, মানে হলো তার জীবনেরও কোন অর্থ নেই। তার এরকম মনোভাবকে হয়তো পাঠক গ্রহণ করবেন না, কিন্তু ওরকম দৃষ্টিভঙ্গির পেছনের কারণটিকে কেউ গ্রহণ না করে পারবেন না।

২) “আমি তাকে বললাম যে, মানুষের জীবন খুব একটা বদলায় না; যত যা-ই হোক একজনের জীবন অন্যের জীবনের চেয়ে খুব একটা ভিন্ন নয় এবং আমি আমার জীবন নিয়েও তেমন অসন্তুষ্ট নই।” কথাগুলো বলছিলো গল্পের নায়ক এবং বর্ণনাকারী মরসোঁ তার বসকে। পঞ্চম অধ্যায়ে, মরসোঁ প্যারিসের অফিসে স্থানান্ততি হলে তার জীবনে কী উন্নয়ন আসবে, সেকথাই বলছিলেন তার বস। মরসোঁ’র উত্তরে মানুষের জীবন ও জীবনের গুণগত উন্নয়ন সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। মানুষের জীবনে খুঁটিনাটি বিষয়গুলো একেকজনের একেক রকমের হলেও একে অন্যের জীবনে বিশেষ কোন পার্থক্য নেই। সকলেরই জীবন প্রায় এক। জীবন সম্পর্কে এ নিরাশাবাদি দর্শনই সত্য হয় যখন শেষ অধ্যায়ে মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে তার জীবনের অবসান হয়।

৩) আমি উন্মুক্ত হলাম পৃথিবীর মৃদু উদাসীনতার সামনে।

৪) কীসে আমার আগ্রহ ছিলো, তা হয়তো নিশ্চিত জানতাম না, কিন্তু কীসে আমার আগ্রহ ছিলো না তাতে আমি নিশ্চিত ছিলাম।

৫) গ্রীষ্মের মাঝে আমি আমার মাঝে অনুভব করলাম এক অপ্রতিরোধ্য শীতকে। তাতে আমি খুশি হই। কারণ এটি আমাকে বলছে যে, পৃথিবীর আঘাত আমার ওপর যতই কঠিন হয়ে আসুক না কেন, আমার ভেতর আরও শক্তিধর এমন কিছু আছে, যা ওই আঘাতকে প্রতিরোধ করবে।

৬) আমি চেয়েছিলাম তাকে নিশ্চিত করতে যে, আমি অন্যদের মতোই – ঠিক অন্য দশজনের মতো।

ফরাসি শিরোনাম “লেত্রঁজে”

ফরাসি শিরোনাম “লেত্রঁজে”

দি আউটসাইডার সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক কিছু তথ্য:

 *প্রকৃত নাম: লেত্রঁজে (L’Étranger)

*ইংরেজি/পরিচিত নাম: The Outsider/ The Stranger

*মূল ভাষা: ফরাসি

*লেখার সময় ও স্থান: ৪০এর দশক, ফ্রান্স

*প্রকাশের সময় ও প্রকাশক: ১৯৪২, লাইব্রেরি গালিমার্দ

*সাহিত্যের প্রকার (type): উপন্যাস

*লেখার ধরণ (genre): অস্তিত্ববাদী, অপরাধ বিষয়ক লেখা

*লেখার পটভূমি: আলজেরিয়া, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিছু পূর্বে

*বাংলাদেশি সংস্করণ: ‘দি আউটসাইডার’ মুনতাসীর মামুন, কাকলি প্রকাশনী, ২০০৪

*মূলবক্তব্য: মরসোঁ আলজেরিয়ার এক অতি সাধারণ যুবক, যে ছিলো সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে একা ও অচেনা। মায়ের মৃত্যুর পর যথাযথ আবেগ দেখাতে পারে নি বলে সে শুরু থেকেই আবেগহীন মানুষ হিসেবে আবির্ভূত হয়। ঘটনার পরিক্রমায় হত্যা করে ‘আরবি’ হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তিকে। কোন বিশেষ কারণ ছাড়াই। এজন্য গ্রেফতার হয় মরসোঁ এবং মুখোমুখি হয় প্রথাগত বিচারের। এ হত্যার বিভিন্ন যৌক্তিক কারণ খুঁজে বের করে মরসোঁ’র সমাজ। তার সংগ্রাম ছিলো সেই যৌক্তিক কারণ আর আইনি ব্যবস্থার বিপক্ষে।

 

আলবেয়ার ক্যামু

আলবেয়ার ক্যামু

আলবেয়ার ক্যামু সম্পর্কে দু’টি কথা:

“আমার পেছনে হাঁটবে না, হয়তো আমি পথ দেখাবো না; আমার সামনে হাঁটবে না, হয়তো আমি অনুসরণ করবো না; ঠিক আমার সাথে হাঁটো এবং আমার বন্ধু হও।” এ উক্তির জন্য Albert Camus কে অনেক পূর্ব থেকেই জানতাম। “মানুষই একমাত্র প্রাণী যে নিজেকে মেনে নিতে চায় না।” তার আরেকটি উক্তি।

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী আলবেয়ার ক্যামু’র ইংরেজি বানান Albert Camus দেখে শুরুতেই বিভ্রান্ত হয়েছি। ফরাসি ভাষার এ হলো ব্যতিক্রম: বানানের সাথে উচ্চারণের মিল খুঁজে পাই না। ‘জাঙ্গল বুক’-খ্যাত রাডিয়ার্ড কিপলিং-এর পর তিনি হলেন সর্বকনিষ্ঠ নোবেল পুরস্কার বিজয়ী (১৯৫৭)। এ স্বীকৃতির মাত্র দু বছর পর ১৯৬০ সালে গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় তার। বুক পকেটে ছিলো ট্রেইনের টিকেট – পরিকল্পনা ছিলো পরিবারকে নিয়ে বেড়াতে যাবার!

১৯১৩ সালে আলজেরিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন আলবেয়ার ক্যামু এবং সেখানেই বড় হয়েছেন। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সমতল আর আফ্রিকা অঞ্চলের তপ্ত রৌদ্রে উন্মুক্ত আলজেরিয়া তার লেখায় তাপ ছড়িয়েছে দারুণভাবে। জন্মের পরবর্তি বছরে অর্থাৎ ১৯১৪ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মারা যান তার পিতা। বধির মায়ের অপ্রতুল সহায়তায় ক্যামু বড় হন। বাল্যজীবনের অবাধ জীবন পেয়ে ক্রিড়াবিদ হয়ে ওঠেন ক্যামু। আলজিয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের ছাত্র থাকা অবস্থায় যক্ষ্মা রোগে মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরে আসেন। অধিকাংশ জীবন কাটে পুলিসের কেরানি এবং বিক্রয়কর্মী হিসেবে। অবশেষে সাংবাদিকতায় যোগ দেন। তিনি বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন এবং কমব্যাট নামে একটি আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা চালাতেন। অন্যান্য উপন্যাস: দ্য প্লেইগ, দ্য ফল, আ হ্যাপি ডেথ, দ্য ফার্স্ট ম্যান। দর্শনভিত্তিক প্রবন্ধ: দ্য রেবেল এবং দ্য মিথ অভ সিসিফাস।

ক্যামু’র অযৌক্তিকতা ও অস্তিত্ববাদ:

অযৌক্তিকতা (absurdism)’র মধ্যে absurd মানে যৌক্তিক অযৌক্তিতা বুঝায় না, এর অর্থ হলো মানবিকভাবে অযৌক্তিক। দর্শনশাস্ত্রে উদ্ভট বা অযৌক্তিক বলতে মানব মনের সেই অন্তর্দ্বন্দ্বকে বুঝায়, যেখানে অভ্যন্তরীণ মূল্যবোধ বা জীবনের মানে খুঁজতে চায়, কিন্তু মানবিকভাবে যা অসম্ভব।

অযৌক্তিকতাবাদ ও অস্তিত্ববাদ (existentialism) অনেক কাছাকাছি ধারণা বহন করে। জীবনের অযৌক্তিকতাকে অস্তিত্বের সংগ্রাম দিয়ে মোকাবেলা করাই হলো অস্তিত্ববাদ। মূলত অযৌক্তিবাদ ধারণাটিকে আলবেয়ার ক্যামু অস্বীকার করার ফলশ্রুতিতে ইউরোপিয়ান অস্তিত্ববাদিদের বিশ্বাস ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। সুখ-দুঃখ, আলো-আঁধার, জীবন-মৃত্যু ইত্যাদি ধারণা পাশাপাশি উপস্থাপন করে ক্যামু অযৌক্তিকতাবাদের নতুন সংজ্ঞা উপস্থাপন করেন। সুখ অস্থায়ী এবং মানুষের জীবনের নিশ্চিত গন্তব্য মরণ। ক্যামু’র সাথে অযৌক্তিতাবাদ ও অস্তিত্ববাদের অন্যতম প্রবক্তারা হলেন ডেনমার্কের সোরেন কিয়ার্কাগাদ (Søren Kierkegaard)।

শেষ কথা:

ছাত্রজীবনে একবার পড়েছিলাম উপন্যাসটি, শুধুই ‘পড়েছি’ বলার জন্য – মনে তেমন দাগ কাটে নি। কিন্তু এবার পড়ে সত্যিই দারুণ নাড়া খেলাম পুরো অস্তিত্বে! বেশ কিছুদিন আবেশ কাটাতে পারি নি। তখনই ভেবেছিলাম, সমগ্র উপন্যাসটি অনুবাদ করবো, তাতে আরও অধ্যয়ন করার সুযোগ হবে। কিন্তু ইন্টারনেটে খ্যাতিমান লেখক ও গবেষক মুনতাসীর মামুন কর্তৃক অনূদিত একটি প্রচ্ছদ চোখে পড়ার পর সে উৎসাহে একটু ভাটা পড়েছে। অরুন্ধতী রায়ের ‘গড অভ স্মল থিংস’ ইংরেজি পড়ার পর যখন একটি বাংলা অনুবাদ পড়লাম, তখন অনুবাদের ছিরি দেখে রাগে দুঃখে মাথার চুল ছিঁড়তে মন চেয়েছিলো। এরপর থেকে পরিচিত কোন ইংরেজি লেখা আর বাংলা অনুবাদ পড়তে যাই না। অনুবাদ সত্যিই এক কঠিন কাজ – আমার মতে তা মৌলিক লেখার চেয়েও কঠিন! মৌলিক লেখায় কাউকে অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করতে হয় না, যা অনুবাদের বেলায় হয়। অনুবাদ সম্পর্কে এরকম ‘নিরাপত্তাহীনতার’ কারণে এখন নিজেই নিজেকে আস্থা করতে পারি না। এ পরিস্থিতিতে প্রিয় পাঠক ও সহব্লগারদের সদয় পরামর্শ কাম্য।

গ্রন্থপঞ্জি ও তথ্যসূত্র:

১. আলবেয়ার ক্যামু, দ্য স্ট্রেইন্জার, ভিনটিজ বুক (নিউ ইয়র্ক), ১৯৪৬: স্টুয়ার্ট গিলবার্ট কর্তৃক ফরাসি থেকে অনূদিত।

২. স্পার্কনোটস ডট কম এবং উইকিপিডিয়া।

৩. সকল ছবি গুগল অনুসন্ধান থেকে।

৪. বাংলায় আলবেয়ার ক্যামু নামে পরিচিত হলেও আসল উচ্চারণ আলবাখ ক্যামি। সূত্র: উইকিপিডিয়া।

*জীবন পরিক্রমা – রবার্ট ব্রাউনিং

images

১) বৃদ্ধ হও সাথে আমার!
সর্বোত্তম বাকিই রয়েছেজানার,
জীবনের শেষাংশের জন্য সৃষ্ট এই প্রথমাংশ:
তাঁর হাতে আমাদের সময়
যিনি বলেছেন, “সমগ্র পরিকল্পনাটি আমার,
যৌবন কেবল তার অর্ধেক; আস্থা করো ঈশ্বরে;
দেখো সমগ্রটি, ভয় না পেয়ে!”
.
২) পুষ্প সঞ্চয় অবাঞ্ছনীয় নয়,
যৌবন কামনায় বললে, “কোন্ গোলাপটি হবে আমার,
কোন পদ্মটি যাবো পেরিয়ে, কিন্তু আক্ষেপ করবো হারিয়ে?”
তারকারাজির অনুসরণ নয় তো অমঙ্গল,
জীবন বললে, “বৃহস্পতি নয়, নয় মঙ্গল;
আমারটি হবে সেই কল্পিত তারকা
যাতে সব আছে, সব যায় ছাড়িয়ে!”
.
৩) এমন নয় যে আশা আর দুরাশায়
যৌবনের ছোট্ট সময়টি অতিক্রম করাকে,
আমি ভুল মনে করি: বোকামি আর অকিঞ্চিতকর বলি!
বরং অবিশ্বাসকে মূল্য দিই আমি
ইতর প্রাণীর যা না হলেও চলে,
তারা পরিপূর্ণ এক মাংসপিণ্ডতেই নিঃশেষ,
আত্মিক চেতনায় ভাবলেশহীন।
.
.
৪) জীবনের অহংকার নিস্ফল হয় যেখানে
মানুষের জীবন শুধুই জৈবিক সুখে মেতে থাকে
তা খুঁজে পেয়ে তৃপ্ত থাকে:
এমন সুখভোগ শেষ হলে, পরে
নিশ্চিতভাবে তা মানুষকে শেষ করে;
ফসলপুষ্ট পাখির আর কিসের দুশ্চিন্তা?
পূর্ণউদর জানোয়ার কি অনিশ্চয়তায় অস্থির হয়?
.
.
৫) উল্লাস করো এজন্য যে আমরা সম্পর্কযুক্ত
তাঁর সঙ্গে যিনি যোগান দেন, কেড়ে নেন না,
সৃষ্টি করেন, ফিরিয়ে নেন না!
এমন এক চেতনা যা এ মাটির দেহে সয় না;
আমরা মাটি থেকে ঈশ্বরের নিকটবর্তী
যিনি দেন, তাঁর বংশ তা গ্রহণ করে,
আমি বিশ্বাস করি।
.
.
৬) তবে স্বাগত জানাও প্রতিটি দুর্ভাগ্যকে
যা ধরিত্রীর মসৃণতাকে করে বন্ধুর,
গ্রহণ করো প্রতিটি হুল যা দেখায় শুধু ভয়
বসে না, দাঁড়ায়ও না কিন্তু চলে যায়!
হোক আমাদের একগুণ আনন্দের
তিনগুণ দুঃখ!
কষ্টকে উপেক্ষা করে চেষ্টা করো;
বেদনায় শিক্ষা নাও, হিসাবে নিয়ো না;
সংগ্রামে সাহস করো, অভিযোগ কখনও না!
.
.
৭) আর তাতে প্রতিষ্ঠিত হয়
একটি পরস্পর-বিরোধী সত্য:
তাচ্ছিল্য থেকে সান্ত্বনা –
ব্যর্থতা থেকে জীবনের সফলতা;
সান্ত্বনা পাই চাওয়া আর না পাওয়ার ব্যবধানে:
(না পাওয়ার ব্যবধান যদি না-ই থাকে)
আমি তো ইতর প্রাণীতে নেমে গেলাম,
কিন্তু সৃষ্টির নিম্নস্তরে নামবো না আমি।
.
.
৮) সে প্রাণী ছাড়া আর কী
যার প্রাণ দেহের চাওয়ায় যায় মিশে,
যার আত্মা হাত-পায়ের ইচ্ছেমতো খেলে?
শুধু মানুষের জন্য এ পরীক্ষা –
দেহ তার সর্বোচ্চ চেষ্টায়
আত্মাকে কতটুকু এগিয়ে দিতে পারে নিঃসঙ্গ পরিক্রমায়?
.
.
images-crop
.
৯) তাই প্রাপ্ত দানগুলো হোক ব্যবহৃত:
অতীত ছিল পূর্ণতায় সমৃদ্ধ
শক্তি ছিল সর্বদিকে, উৎকর্ষতা প্রতি বাঁকে:
চক্ষু-কর্ণ করেছিল তাদের কাজ,
মস্তিষ্ক করেছিল সব সঞ্চয়:
হৃদয়ের কি উচিত নয় কৃতজ্ঞতায়
স্পন্দিত হয়ে একবার বলা
“কত উত্তম এ জীবন আর শিখন খেলা”?
.
.
১০) একবার কি বলা উচিত নয়
“প্রশংসা ঈশ্বর, তোমার হোক জয়!
আমি দেখেছি তোমার সম্পূর্ণ নকসা,
যে আমি দেখেছিলো তোমার পরাক্রম,
সে আমি দেখলো আজ তোমার প্রেম:
উত্তম তোমার পরিকল্পনা:
ধন্য আমি মানুষ হয়ে!
কারিগর, গড়ো আমাকে, সম্পন্ন করো,
— বিশ্বাস করি তোমার কাজে!”
.
.
১১) দেহ বড়ই আরামের;
দেহের গোলাপ-জালে বন্দি আত্মা
মিশে গিয়েও করে যায় শান্তির অন্বেষণ:
আত্মাকে তাই যদি পুরস্কৃত করা যেত
পাশবিক প্রাপ্তির সাথে সাম্য রক্ষার জন্য,
তাতে উচ্চতর ফল আসতো, কারণ
তাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা হতো।
.
.
১২) এমন যেন কখনও না বলি যে,
“দেহের চাওয়ার বিপক্ষে যুদ্ধ করে
আমি অগ্রসর হয়েছি, সমগ্রকে করেছি করায়ত্ত!”
পাখি যেমন পাখা ঝাপটিয়ে ওড়ে আর গায় গান,
চলো আর্তচিৎকারে বলি, “সকল ভাল আমাদের,
আত্মা দেহের চেয়ে, অথবা দেহ আত্মার চেয়ে
বেশি করে নি দান।”
.
.
১৩) এজন্য আমি বৃদ্ধকে করি আহ্বান
যৌবনের উত্তরাধিকার করো তারে দান,
জীবনের প্রচেষ্টা অতঃপর পূরণ করবে তার মেয়াদ:
সেখান থেকে সৃষ্টি করবো, অনুমোদন করবো
পরিপূর্ণ মানুষকে, যে হবে চিরদিনের জন্য
পরিপূর্ণ পশু হতে ভিন্ন: একজন অপরিপূর্ণ ঈশ্বর।
.
.
১৪) অতঃপর আমি নেব বিশ্রাম
আমার বিদায়ের পূর্বে,
আবার শুরু হবে দুঃসাহসিক আর নতুন অভিযান:
সেখানে নির্ভয় এবং শান্তভাবে
যখন আমি পরবর্তি যুদ্ধ শুরু করবো,
তখন পারবো বুঝতে কোন্ বর্মটি পড়বো।
.
.
১৫) যৌবন শেষে, আমি হিসাব করবো
আমার লাভ আর লোকসান:
দগ্ধ ছাইটুকু ফেলে দিয়ে, যা থাকে তা-ই হবে সোনা:
দেখবো আমি ওজন করে,
হয়তো প্রশংসা নয়তো ভৎসা:
যৌবনের সবই বিতর্কিত: বৃদ্ধ হলে আমি বুঝবো।
.
.
১৬) দেখো, যখন নেমে আসে সাঁঝ;
কোন এক মুহূর্তে বন্ধ হয় সব কাজ,
ধূসর অন্ধকারে গোধূলি জেগে ওঠে:
পশ্চিমাকাশ থেকে তখন মৃদুস্বরে কেউ বলে –
“এটি পেছনের দিনগুলোর সাথে করো যুক্ত,
এটি নাও আর যাচাই করো মূল্য বিশেষ:
এভাবে আরেকটি দিনের হলো শেষ।”
.
.
images-crop
.
.
.
১৭) তাই, বৃদ্ধ বয়সে এসে,
যদিও সকল বিতর্ক যায় ভেসে,
আমি পার্থক্য আর তুলনা করে বলতে চাই শেষে,
“প্রথম জীবনের সে আবেগই ছিল সার্থক,
সবকিছু মেনে নেওয়া ছিল নিরর্থক:
ভবিষ্যতকে এখন করতে পারি গ্রহণ
যেহেতু অতীতকে করেছি পরীক্ষণ।”
.
.
১৮) মানুষ বিশেষ কিছু পায় নি
শুধুই আত্মায় প্রাপ্ত প্রাণশক্তি ব্যতীত
যা দিয়ে সে আজ শিখে, আগামিকাল করবে কাজ:
এমনভাবে কাজ করো
যেন কারিগরের কাজকে অনুসরণ করতে পারো
তাতে আছে সঠিক কৌশলের ইঙ্গিত,
আছে যন্ত্রের সঠিক ব্যবহার কৌশল।
.
.
১৯) মঙ্গলের জন্যই, যৌবনকে
করতে হবে চেষ্টা, অনিশ্চিত প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে,
যাতে সে বানাতে পারে,
নির্ভর না করে অন্যের বানানো জিনিসে:
তাতে বার্ধক্য, বিবাদমুক্ত থেকে,
চেষ্টার পূর্বেই বুঝতে পারে।
যৌবন অপেক্ষা করেছিলো বার্ধক্যের:
বার্ধক্য নির্ভয়ে অপেক্ষা করবে মৃত্যুর।
.
.
২০)  এটিই যথেষ্ট, যদি তুমি সত্য
এবং মঙ্গল এবং অসীমকে
বুঝতে পারো, যেমন তোমার হাতকে
তোমার নিজের বলে বুঝতে পারো,
চূড়ান্ত প্রজ্ঞা নিয়ে,
আর সুনিশ্চিত তত্ত্ব দিয়ে;
অথচ যৌবন ছিল অর্বাচিনতায় পূর্ণ,
তাই (সত্য, মঙ্গল আর অসীমকে নিয়ে)
বার্ধক্যে নিজেকে মনে করো না
তুমি একা।
.
.
২১) থাকো তুমি সেখানেই, একবার এবং সবসময়,
আলাদা করে তুচ্ছ মন থেকে বৃহৎ মনকে,
স্বীকৃতি দিয়ে সকল স্থানের সকল ব্যক্তিকে!
সে কি আমি নয়, যার ত্রুটি বের করতো সকলে?
সে কি তারা নয়, যাদেরকে
আমার আত্মা থেকে করতাম ঘৃণা?
তা কি ঠিক ছিল?
(অন্তত) বার্ধক্যে যেন সত্য বলি
আর তাতে শান্তি আসুক অবশেষে!
.
.
২২) কিন্তু, কে এর বিচার করবে?
দশজনে যা ভালোবাসে, আমি করি তা ঘৃণা,
যা তারা এড়িয়ে যায়, তার অনুসরণ করি আমি,
যা বাতিল করে তা করি গ্রহণ?
দশজন, যারা চক্ষু-কর্ণে আমারই মতন:
আমরা সকলেই অনুমান করি,
তারা ওটা হলে আমি এটা:
কাকে গ্রহণ করবে আমার আত্মা?
.
.
২৩)এমন নয় যে, আমজনতার বিষয়
যাকে বলে ‘কাজ’, তাকেই করতে হবে অনুমোদন,
কৃত কাজ, দৃষ্টিগোচর হলেই হয়ে গেলো কাজ;
যার ওপরে, সাধারণের মানদণ্ডে,
আমজনতার হাত নেমে স্পর্শ নেয়,
তা নিমিষে তাদের মনে স্থান পেয়ে যায়,
মুহূর্তে তারা এর মূল্য নির্ধারণ করে ফেলে:
.
.
২৪) কিন্তু সেগুলো, যা মানুষের অঙ্গুলি-বৃদ্ধাঙ্গুলি
আঁকড়ে ধরতে ব্যর্থ হয়,
যা তারা এড়িয়ে যায়, হিসাবে নিতে পারে না;
সমস্ত অপরিণত বোধশক্তি,
অনিশ্চিত উদ্দেশ্যগুলো,
যাকে কাজ বলা চলে না,
তবু তা মানুষের ওজনকে বৃদ্ধি করে।
.
.
images-crop
.
.
.
২৫) চিন্তাগুলোকে কদাচিৎ প্রকাশ
করা যায় (দুনিয়ার) সংকীর্ণ কাজে,
কল্পনাগুলো ভাষা হয়ে যায় পালিয়ে;
যা-কিছু হতে পারি নি আমি,
যা-কিছু মানুষ উপেক্ষা করেছে আমাতে,
তার সবকিছু নিয়েই আমাকে গ্রহণ
করেছেন ঈশ্বর নিরাকার,
যার (কুমোরের) চাকে পানপাত্র পেয়েছে আকার।
.
.
২৬) হ্যাঁ কুমোরের চাকের রূপকটি
দেখো একবার ভেবে!
ভাবো কালের চক্র ঘুরে কীভাবে,
কেনই বা কাদারূপ আমি থাকি স্থির হয়ে, –
তুমি, যাকে মূর্খেরা করে প্ররোচনা,
যখন নেশায় তাদের করে প্রচঞ্চনা,
“জীবন যদি পালিয়ে যাবে, সবকিছু যাবে বদলে;
সবকিছু হয়ে যায় অতীত, তবে ধরো আজ’কে!”
.
.
২৭) নির্বোধ! যা কিছু স্থায়ি,
থাকে চিরদিন, বদল হয় না তা:
দুনিয়া বদলায়, আত্মা আর
ঈশ্বর থাকে নিশ্চল:
যা তোমাতে করেছে প্রবেশ,
তা ছিল, আছে আর থাকবে অনিমেষ;
কালের চক্র ঘুরে নয়তো থামে:
কুমোর আর মাটি থাকে চিরকাল।
.
.
২৮) চলন্ত ধারায় তিনি দিয়েছেন
তোমায় অস্তিÍত্ত্ব
ছিল যা আকৃতিবিহীন বস্তু,
চলন্ত বর্তমানকে অবশ্যই খুশি হয়ে ধরবে তুমি:
যন্ত্রের শুধু একটিই কাজ
আত্মাকে দেয়া সেই সাজ,
পরখ করা আর ঘুরিয়ে দেখা,
সন্তুষ্ট রূপে তোমাকে রাখা।
.
.
২৯) তাতে কী হবে, যদি পানপাত্রের
শুরুতে থাকে কিছু সহাস্য প্রেমদেবের নকসা
পাত্রের নিচে (কুমোরের হাত)
যদি না থামে, চাপও না দেয়?
তাতে কী হবে, যদি পানপাত্রের
গলার দিকে থাকে মাথারখুলির নকসা
গড়ে ওঠে (পানপাত্রের গলা)
নিয়ে আরও ভয়ংকর আকৃতি
মেনে নিতে হয় (কুমোরের হাতের) চাপ?
.
.
৩০) নিচের দিকে তাকিয়ো না
ওপরে তাকাও তুমি!
ভোজনালয়, উজ্জ্বল বাতিদান আর তূর্যের ধ্বনি,
পাত্রে ফুলে ওঠেছে নতুন পানীয়
মালিকের চকচকে ওষ্ঠদ্বয়!
স্বর্গের কাঙ্ক্ষিত পানপাত্র, তুমি,
মাটির চাক দিয়ে আর
কী দরকার তোমার?
.
.
৩১) কিন্তু আমার দরকার, আগের মতোই এখনও,
হে ঈশ্বর তোমাকে,
যে তুমি মানুষকে গড়ে তোলো;
আর দেখো, যখন আবর্তিত হওয়া ছিলো কষ্টের চূড়ান্ত,
আমি, সে চক্রের সাথে,
সকল আকারে আর রঙের প্রাচুর্যতায়,
যখন দিকভ্রান্ত ঘুরছি, – তখনও ভুলিনি গন্তব্য,
তোমার তৃষ্ণার জল হতে:
.
.
৩২) তোমার এই সৃষ্টিকে তাই গ্রহণ করো
করো এর ব্যবহার:
শুদ্ধ করো যত লুকিয়ে থাকা ত্রুটি;
কী দাগ আছে বস্তুটিতে;
কী বিকৃতি এর ব্যবহারকে বাধাগ্রস্ত করে!
আমার সময়টুকু রইলো তোমার হাতে!
পরিশুদ্ধ করো পানপাত্রকে তোমার নকশায়!
বার্ধক্য মূল্য দিক যৌবনকে,
আর মৃত্যু পূর্ণতা দিক বার্ধক্যকে!
.
.
=======================================
*মূল কবিতা: ‘রাবাই বিন এজরা’। ১৮৬৪ সালে ‘ড্রামাটিস পারসনাই’ গ্রন্থের অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয়। ৩২ পদেলেখা ১৯২ লাইনের কবিতাটি ৮ পদ করে ভাগ করা হয়েছে। কবিতার বাংলা নামটি অনুবাদকের দেয়া। ভাষাগত পার্থক্যের কারণে বাংলা অনুবাদে বেশি লাইন হয়েছে। রবার্ট ব্রাউনিং-এর স্বভাবগত অস্পষ্টতা দূর করার জন্য প্রথম বন্ধনীতে কিছু সংযুক্তিমূলক শব্দাবলী জুড়ে দেয়া হয়েছে, যাকে কবিতার অংশ মনে করা যাবে না।
.
.
*পটভূমি: কালোত্তির্ণ এ কবিতাটি জীবনের গভীর তত্ত্বে টইটুম্বুর। ‘রাবাই বিন এজরা’ প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গেসমসাময়িক সমাজে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। রাবাই ইবনে এজরা, রবার্ট ব্রাউনিং-এর জীবনদর্শনের মুখপাত্র,একটি ঐতিহাসিক চরিত্র (১০৯২-১১৬৭)। রাবাই মধ্যপ্রাচ্যের ভাষায় রাব্বি। রাবাই ইবনে এজরা ছিলেন একাধারেএকজন পদার্থবিজ্ঞানী, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ, দার্শনিক, কবি এবং শিক্ষক। ‘রাবাই বিন এজরা’ কবিতায় রবার্টব্রাউনিং বৃদ্ধ বয়স, জীবনের ব্যর্থতা এবং মহত্ব লাভের প্রচেষ্টাকে গৌরবান্বিত করেছেন।
.
.
browning-bio
*কবি পরিচিতি: পিতার পাঠাগারের সমস্ত সুবিধাকে গ্রাস করে ১৮ বছরেই কবিত্ব বরণ করেন রবার্ট ব্রাউনিং(১৮১২-১৮৮৯)। প্রধানত তিনি একজন মানুষের কবি (Poet of Man); মানুষকে ভালোবাসতেন এবং মানুষই ছিলতাঁর অধ্যয়নের বিষয়। তিনি ছিলেন আত্মা ও ব্যক্তিত্বের কবি। মানুষের চিন্তা, অনুভূতি এবং আকাঙ্ক্ষা ছিল তাঁরকবিতার প্রধান উপজীব্য। মানব আত্মার অভ্যন্তরে ছিল তার দৃষ্টি, তাই দক্ষতা দেখিয়েছেন জীবনের মনস্তাত্ত্বিকবিশ্লেষণে (psycho-analysis)। তাঁর কবি প্রতিভা গেঁথে আছে ড্রামাটিক মনোলগে (নাটকীয় এককালাপ)। কথোপকথনের রীতিতে রচিত তাঁর কবিতাগুলো অমিত্রাক্ষর ছন্দে (blank verse) লেখা। ব্রাউনিং-এর বৈচিত্রময়লেখার স্টাইলে টিএস ইলিয়ট (দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড-এর কবি) প্রভাবিত হয়েছিলেন।
.
.
*অনুবাদ নাকি হনুবাদ: পাঠক হিসেবে যা উপলব্ধি করেছি, প্রকাশ করতে পেরেছি তার খুব কমই। একটি ভাষাকেকখনও উপযুক্ত ভাবাবেগ দিয়ে অন্য ভাষায় অনুবাদ করা যায় না। কবিতা যে অনুবাদ করা যায় না, তা বলাইবাহুল্য। রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলী এজন্য কবি নিজেই অনুবাদ করেছিলেন। জসিম উদ্দীনের নকসী কাঁথার মাঠ-এরইংরেজি অনুবাদ দেখলে বুঝা যায় অনুবাদ কতটুকু সফল। ভাষান্তর হলেও ভাবান্তর হয় না। এক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে।কবিতা তো ভাবের বিষয়। আমার প্রিয় কবিদের একজন হলেন রবার্ট ব্রাউনিং, তাই তার কবিতার একটি জলছাপরাখার চেষ্টা করলাম মাত্র।
.
.
*কৈফিয়ত: উনবিংশ শতকের ব্রিটিশ ইংরেজির সাথে আজকের ইংরেজি ও শব্দশৈলির মধ্যে সৃষ্টি হয়েছেআকাশ-পাতাল পার্থক্য। অনেক শব্দের অর্থ ও প্রয়োগ গেছে বদলে। বলে রাখা প্রয়োজন যে, অভিধান সবসময় চূড়ান্তঅর্থ দিতে পারে নি, কেবল অর্থ নির্ণয় করায় সাহায্য দিতে পেরেছে, যদিও অনেক সময় বিভ্রান্তও করেছে অনুবাদককে। সতর্ক পাঠকের প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, অনুবাদক শব্দের ব্যবহারে খুব বেশি স্বাধীনতানিয়েছে। এভাবে ভুল না বুঝার জন্য নিচের কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটি স্পষ্ট করার চেষ্টা করলাম:
.
.
effect এর বর্তমান অর্থ কার্যকর করা (৫), কিন্তু কবিতায় এর অর্থ হলো সৃষ্টি করা
uncouth এর বর্তমান অর্থ অমার্জিত বা অশিষ্ট (১৯), কিন্তু কবিতায় এর অর্থ হলো অনিশ্চিত
.
.
এরকম অগণিত উদাহরণ আছে, যা উল্লেখ করে পাঠকের অস্বস্তি সৃষ্টি করতে চাই না। কিছু শব্দ আমাদের প্রচলিতঅভিধানে নেইও। অবশ্য ইন্টারনেট-এর বদৌলতে অধিকাংশ শব্দেরই ‘ইংরেজি সংজ্ঞা এবং ব্যবহার’ বের করাগেছে।
=======================================

মো ইয়ান কি নোবেল বিজয়ী প্রথম চীনা নাগরিক?

বলুন তো, কোন দেশের নোবেল প্রাইজ বিজয়ী এখন জেলের ভাত খাচ্ছেন এবং স্ত্রী গৃহবন্দী? উত্তর হলো চীন। কোন্ দেশের নোবেল বিজয়ী স্বদেশ থেকে বিতাড়িত? উত্তর হলো চীন। কোন্ দেশের নোবেল প্রাইজ বিজয়ী দেশের শত্রু হিসেবে বিবেচিত? উত্তর হলো চীন। চীনা বংশোদ্ভূত তিন ব্যক্তি নোবেল প্রাইজ পেয়েও কোন্ দেশ তা স্বীকার করে না? উত্তর হলো চীন। এসবই হলো ২০১১ এবং এর পূর্ব পর্যন্ত চীনের নোবেল প্রাইজের খবর। ২০১২ সাল সম্পূর্ণ উল্টো। সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ পেয়ে চীনের সরকারসহ সমগ্র দেশ উত্তেজনায় উন্মক্ত। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন কিষাণের ছেলে মো ইয়ান, যার আসল নাম গুয়ান মোয়ে।

সবাই বিস্মিত, এমন কি পুরস্কার বিজয়ী মো ইয়ান নিজেও। “আমি উল্লাসিত এবং আতংকিতও। এ প্রাইজের তেমন তাৎপর্য আছে বলে আমার মনে হয় না, যেহেতু স্বীকৃতি পাবার মতো আরও প্রতিভাবান লেখক চীনে আছেন।” বললেন মো ইয়ান কারণ, ইতিমধ্যেই পশ্চিমে এ পুরস্কার নিয়ে চুলছেড়া বিশ্লেষণ শুরু হয়ে গেছে। চীনে প্রকাশিত ‘গ্লোবাল টাইম্স’ এর সম্পাদক তো বলেই দিলেন: “তার মানে বুঝতে হবে, চীন ক্রমে শক্তিশালী হচ্ছে।” পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক বললেন, “এ পুরস্কার হলো চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তি ও উন্নয়নের অনিবার্য সুফল।” দেখুন উত্তেজনার নমুনা। তো পূর্বের নোবেল প্রাইজগুলো কিসের সুফল ছিলো?

রাষ্ট্রীয় সকল প্রচার মাধ্যমে পূর্বের সকল নোবেল বিজয়ীকে সযত্নে উপেক্ষা করা হচ্ছিল। নোবেল প্রাইজ বিজয়ের তিক্ত ইতিহাসকে ধামাচাপা দেয়ার সর্বশেষ প্রচেষ্টা হিসেবে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলা হলো: “মো ইয়ান কি চীনের প্রথম নোবেল বিজয়ী হতে পারে?”

এবার শুনাচ্ছি ২০১১ সাল পর্যন্ত চীনের নোবেল প্রাইজ অবজ্ঞা করার কাহিনী। ১৯৮৯ সালে ধর্মীয় গুরু দালাই লামা অর্জন করেন শান্তিতে নোবেল প্রাইজ। তিব্বতের স্বাধীনতা সংগ্রামে দালাই লামা নেতৃত্ব দেয়ায় সেটাকে চীনা সরকার স্বীকৃতি দেয় নি। এ হলো চীনের প্রথম নোবেল প্রাইজ বিজয়ের কথা।

চীন বংশোদ্ভূত গাও জিংজিয়ান ২০০০ সালে সাহিত্যে প্রথম নোবেল প্রাইজ লাভ করেন। কিন্তু হায় তিনি তখন ফ্রান্সের ইমিগ্রান্ট! তার ‘সউল মাউন্টেন’ নামের উপন্যাসটিতে চীনের কনিউনিস্ট সরকারের বিভিন্ন কার্যকলাপের সমালোচনা করা হয়। সুতরাং সেটা ব্যান করো! তাই হলো।

সবশেষ ২০১১ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার, যা দেওয়া হলো চীনের মানবাধিকার কর্মী ও ভিন্ন মতাবলম্বী লেখা লিউ জিয়াবাওকে। আর যায় কই, তাকে চিহ্নিত করা হলো রাষ্ট্রীয় শত্রু হিসেবে। এবার বুঝেন তার গন্তব্য কোথায় হবে?

এভাবে চীন জাতীয়ভাবে দু’বার নোবেল পেলেও, কমিউনিস্ট সরকারের বিরোধী হবার কারণে তাদের কেউই স্বীকৃতি পান নি। ২০০০ সালের নোবেল বিজয়ী ফ্রান্সের অভিবাসী হবার কারণে তাকে এমনিতেই হিসেব থেকে বাইরে রাখা হলো।
তাহলে স্বীকৃতি পেলেন কে? মো ইয়ান, ২০১২ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী। মো ইয়ান-এর বর্তমান পরিচিতি কী? চীনা লেখক সংগঠনের সহ-সভাপতি এবং ধারণা করা হয় যে তিনি ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির একজন সদস্যও। তিনি চীনা জাতীয় শিল্পকলা একাডেমির সাহিত্য বিষয়ের ডীনও।

মো ইয়ানের প্রতিভা নিয়ে আপাতত কিছুই বলছি না, বলছি নোবেল প্রাইজের রাজনীতিকরণ নিয়ে। পত্রিকা প্রকাশিত বিচার বিশ্লেষণ দেখলে বুঝা যায়, নোবেল প্রাইজের বিজয়ী নির্বাচনের আগে ও পরে হয় অনেক রাজনীতি, অথবা রাজায় রাজায় পীরিতি। দালাইলামা আর লিউ জিয়াবাওকে নোবেল প্রাইজ দিয়ে যেভাবে ক্ষেপিয়ে তোলা হয়েছিল হালের পরাশক্তি চীনকে, সেই অবস্থার দ্রুত প্রশমনের জন্য দরকার হয়ে পড়েছিলো আরেকটি নোবেল প্রাইজের। নিজেদের অগ্রগতি ও রাষ্ট্রীয় নীতিতে সমর্থন পাবার জন্য, এ নোবেল প্রাইজ পেতে চীনা সরকারও বিগত কয়েক বছর ধরে মরিয়া ছিলো।


১৯৮৯ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী দালাই লামা।


২০০০ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী গাও জিংজিয়ান।


২০১১ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী লিউ জিয়াবাও।


২০১২ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মো ইয়ান।

ম্যাকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’ থেকে: পড়ুন নিজ দায়িত্বে!

prince-cover

ম্যাকিয়াভেলি সম্পর্কে প্রথমে পড়েছিলাম ছাত্রজীবনে। পড়ে থমকে গিয়েছিলাম! মানুষ জন্মগতভাবেই নাকি শঠ, প্রতারক আর বিশৃঙ্খল – ডাণ্ডা ছাড়া ঠাণ্ডা থাকে না। ইতিহাস নাকি শুধুই বিজয়ীদের সৃষ্টি। ধার্মিকতার চেয়ে ভাণ ধরে থাকা নাকি অধিক গুরুত্বপূর্ণ! কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছিল সেখান থেকেই। ম্যাকিয়াভেলি, শুধু রাজনীতিতে নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতে রিয়েলিজম বা বাস্তববাদের প্রবক্তা (অন্যরা হলেন: থুসিডিডিস, হবস; বর্তমান সময়ে, মরগেনথাও এবং ওয়াল্ডজ)। দ্য প্রিন্স-খ্যাত ম্যাকিয়াভেলিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক বলা হয় এত বিতর্কিত কথা বলার পরও। কিন্তু কোথায় পাওয়া যাবে তার সেই কালজয়ী বই, দ্য প্রিন্স? পড়তেই হবে আমাকে, দেখতে হবে আরও কী আছে তাতে।

নৈতিকতার সাথে শাসনের কর্তৃত্ব ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শাসন তিনিই করবেন যিনি নিজে সৎ। দেশ শাসন করতে গেলে নীতিবান হতে হবে, সৎ হতে হবে। প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের সাথে থাকতে হবে মিল। এটা অত্যন্ত প্রচলিত একটি বিশ্বাস যে, সততা ও নৈতিকতা দিয়েই জনসাধারণের শ্রদ্ধা ও আনুগত্য আদায় করা যায়।

ম্যাকিয়াভেলি ঠিক এবিষয়টিতেই সজোরে আঘাত করেছেন তার দ্য প্রিন্স গ্রন্থের মাধ্যমে। নিজ দেশের শাসককে দেশ চালানোর জন্য সাদামাটা কিছু প্রায়োগিক জ্ঞান দেয়াই ছিল দ্য প্রিন্স-এর মূল উদ্দেশ্য, সাহিত্যচর্চা নয়। তার মতে শাসনক্ষমতা বৈধতা কোন নৈতিকতার মাপকাঠিতে আবদ্ধ নয়; কর্তৃত্ব আর ক্ষমতাই এখানে মূল বিষয়। যার ক্ষমতা আছে সে-ই শাসন করবে, নৈতিকতা কাউকে ক্ষমতায় বসায় না। সততা ও নৈতিকতার সম্পূর্ণ বিপরীতমুখে বসে ম্যাকিয়াভেলি বলছেন যে, ক্ষমতা অর্জন আর ক্ষমতা রক্ষা করাই রাজনীতির মূল নীতি। ক্ষমতার উপযুক্ত ব্যবহার দিয়েই জনগণের আনুগত্য অর্জন করতে হয়। রাজনীতি মানেই হলো ক্ষমতা ‘গ্রহণ আর প্রয়োগের’ নীতি। শাসকের প্রতি জনগণের ভালবাসা এবং জনগণের ভয় দুটোই থাকতে হবে। যদি দুটোই না থাকে সেক্ষেত্রে ভয়টি অন্তত থাকতে হবে। দেশের আইনশৃঙ্খলা বলতে বুঝাবে উপযুক্ত সংখ্যক সৈন্য বা আইনপ্রয়োগকারীর উপস্থিতি। নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ছাড়া শাসনের অধিকারের কোনই মূল্য নেই ম্যাকিয়াভেলির কাছে।

ম্যাকিয়াভেলি তার রাজনৈতিক মতাদর্শ থেকে অধিকার এবং বৈধতার ব্যাপারগুলো সম্পূর্ণ মুছে ফেলেন। আইন এবং শক্তি তার পরিবেশনায় একাকার হয়ে যায়। তিনি বলেন, “যেহেতু উত্তম অস্ত্র ছাড়া উত্তম আইন প্রতিষ্ঠিত হয় না, তাই অস্ত্র ছাড়া অন্য কোন কিছুকেই আমি বিবেচনায় আনবো না।” ম্যাকিয়াভেলির মতে, চরম ক্ষমতাশালী শাসককে জনগণ সর্বান্তকরণে মান্য করতে বাধ্য।

ম্যাকিয়াভেলিয়ান শাসকের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য থাকে:

১) ভয় বা ভালবাসা সৃষ্টিকারী তবে ঘৃণিত হবেন না;

২) জনগণের সমর্থন থাকবে;

৩) ব্যক্তিগত গুণাবলীর প্রকাশ থাকবে;

৪) অস্ত্র অর্থাৎ শক্তির প্রয়োগ থাকবে এবং

৫) বুদ্ধিমত্তা থাকবে।

ব্যক্তিগত গুণের বিষয়ে একটি দামি কথা বলেছেন তিনি: গুণ থাকার চেয়ে গুণের ভাণ করা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ! বুদ্ধিমত্তারও একটি আলাদা সংজ্ঞা আছে তার কাছে: জনগণের মনে ভয় এবং ভালবাসা জাগানোর মধ্যে উত্তম ভারসাম্য রক্ষা করতে পারাই হলো বুদ্ধিমত্তা।

নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি, ১৪৬৯ থেকে ১৫২৭ খ্রিস্টাব্দ। পুরো নাম নিকোলো ডি বারনার্ডো ডেই ম্যাকিয়াভেলি। ইটালিয়ান ইতিহাসবিদ, কূটনৈতিক, দার্শনিক এবং রেনেসাঁ যুগের লেখক। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক এবং ফ্লোরেন্স-ভিত্তিক এক মধ্যযুগীয় কূটনীতিক। রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়েছেন আর রাজনীতি নিয়ে যারা ঘাটাঘাটি করেন, তারা হয়তো ম্যাকিয়াভেলির নাম প্রতিদিনই জপেন। নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি লিখিত গ্রন্থগুলো হলো: দ্য প্রিন্স, ফ্লোরেনটাইন হিস্টরিজ, দ্য ডিসকোর্স, দ্য আর্ট অভ ওয়ার এবং মান্দ্রাগোলা। এগুলোর মধ্যে দ্য প্রিন্স-এর জন্যই তিনি আজ আমাদের কাছে স্মরণীয় এবং উল্লেখযোগ্য। পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত আর সমালোচিত এ বইটি লেখা হয়েছিল ১৫১৪ সালে কিন্তু প্রকাশ পেয়েছিল ১৫৩২ সালে, তার মৃত্যুর পর। ডাব্লিউ কে ম্যারিয়ট কর্তৃক ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে দ্য প্রিন্স প্রকাশিত হয় ১৯০৮ সালে।

দ্য প্রিন্স লেখা হয়েছিল অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে এবং ম্যাকিয়াভেলির কর্মজীবনে পুনর্বাসনের প্রচেষ্টা হিসেবে। বিখ্যাত হবার জন্য নয়, ক্ষমতাসীন রাজা মেডিসি’র দয়াদৃষ্টি লাভের জন্য রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টিতে ভরপুর এ গ্রন্থটি লেখা হয়েছিল। মূলত ম্যাকিয়াভেলি ছিলেন মেডিসি প্রশাসনের বিপক্ষে এবং এজন্য মেডিসি’র ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পর নির্যাতনটাও সহ্য করতে হয়েছিল ম্যাকিয়াভেলিকে সেরকমই। দেওয়া হয়েছিল বাধ্যতামূলক অবসর। এ অবসরে থেকেই জন্ম নেন লেখক ম্যাকিয়াভেলি।

নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি’র দ্য প্রিন্স থেকে কিছু উল্লেখযোগ্য উদ্ধৃতি:

শুধুই তুলনা ও বিশ্লেষণের জন্য উদ্ধৃতিগুলো উপস্থাপন করা হলো। এর কিছু কিছু অত্যন্ত আপত্তিজনক এবং লৌমহর্ষক, তবে অধিকাংশ কথাই কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং ব্যক্তি জীবনে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

১) আপনার উপস্থিতি সকলেই দেখতে পায়, আপনি আসলে কেমন, তা মাত্র কয়েকজনে বুঝে।

২) যদি কাউকে আঘাত করতেই হয়, তা এমন তীব্র করা উচিত যাতে তার প্রতিশোধপরায়নতাকে আর ভয় পেতে না হয়।

৩) বিপদের মুখোমুখী না হয়ে মহৎ কিছুই অর্জিত হয় নি

৪) *ভালবাসার কারণ না হয়ে ভয়ের কারণ হওয়াই অধিক নিরাপদ কারণ ভালবাসার সাথে দায়বদ্ধতার সম্পর্ক আছে; মানুষের সংকীর্ণতার কারণে তা সুযোগ পেলেই লঙ্ঘিত হতে পারে। কিন্তু আপনাকে ভয় পেলে শাস্তির ভয়ে তারা তা লঙ্ঘন করতে পারে না।

৫) সত্যি কথাটি বললে যে আপনি অপমানিত হবেন না, একথাটি না জানানো পর্যন্ত মানষের তোষামোদ আপনি থামাতে পারবেন না।

৬) সকল পথই বিপদজনক, তাই বিপদকে এড়িয়ে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়, বিপদকে হিসেব করে সুদৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ভুল করে উচ্চাকাঙক্ষা করুন, ভুল করে আলসেমি করবেন না। সাহসী কাজ করার জন্য শক্তি সঞ্চয় করুন, কষ্টভোগ করার জন্য শক্তির দরকার নেই।

৭) মানুষ প্রধানত দু’টি তাড়নায় পরিচালিত হয়: ভালবাসা অথবা ভয়।

৮) মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে এতই সহজ এবং তাদের তাৎক্ষণিক চাহিদা দ্বারা এতই নিয়ন্ত্রিত যে, একজন প্রতারকের জন্য ঠকাবার লোকের অভাব হয় না।

৯) সিংহ ফাঁদ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে না এবং শেয়াল পারে না নেকড়ে থেকে নিজেকে নিরাপদে রাখতে। তাই আপনাকে শেয়াল হতে হবে যাতে ফাঁদ চিনতে পারেন, আর সিংহ হতে হবে যাতে নেকড়ে তাড়াতে পারেন।

১০) *যেহেতু ভয় আর ভালবাসা একসাথে থাকতে পারে না, আমাদেরকে অবশ্যই যেকোন একটি বেছে নিতে হয়। ভালবাসার পাত্র হওয়ার চেয়ে ভয়ের পাত্র হওয়াই অধিক নিরাপদ।

১১) ফলই উপায়কে বিচার করে।

১২) যে প্রতারণা করতে চায়, সে প্রায়ই এমন কাউকে পাবে যে প্রতারিত হতে চায় ।

১৩) ইচ্ছা যদি বড় হয়, তাহলে প্রতিবন্ধকতা বড় থাকতে পারে না

১৪) *মানুষকে হয় আদর করা উচিত, নয়তো পিষে মারা উচিত। ছোটখাটো আঘাত করতে পরিশোধ নেবার সুযোগ নেবে, কিন্তু যদি তাকে সম্পূর্ণ অচল করে দেন তাহলে তাদের আর কিছুই করার থাকে না।

১৫) মানুষ সাধারণত ছুঁয়ে নয় দেখেই বিচার করতে চায়। এর কারণ হলো, সকলেই দেখতে পারে, কিন্তু খুব কম লোকই স্পর্শ করে অনুভব করতে পারে।

১৬) এটা মনে রাখতে হবে যে, একটি নতুন পদ্ধতি পরিকল্পনা করার মতো কঠিন কিছুই হতে পারে না; একটি নতুন পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি সন্দেহজনক এবং একটি নতুন পদ্ধতিকে পরিচালনা দেবার চেয়েও কঠিন কিছু হতে পারে না। এর কারণ হলো, একজন অগ্রগামী উদ্যোক্তাকে রক্ষণশীলদের বৈরিতার মুখে পড়তে হয় যারা পুরাতন পদ্ধতির সুবিধাভোগী। নতুন পদ্ধতির সুবিধা প্রত্যাশী বা সমর্থনকারীর সম্ভাবনা বিরল।

১৭) ধারাবাহিকভাবে সফলতা পেতে চাইলে সময়ের সাথে আচরণ পরিবর্তন করতে হবে।

১৮) মানুষ কীভাবে জীবনধারণ করে আর কীভাবে করা উচিত – তাতে এতই ব্যবধান যে, কেউ যদি কী হচ্ছে সেটা নিয়ে অনুসন্ধান না করে, কী হওয়া উচিত সেটা নিয়ে অনুসন্ধান করে, তাহলে তার এই শিক্ষা তাকে রক্ষা না করে তাকে ধ্বংস করে।

১৯) যেমন খুশি তেমনই সাজো।

২০) *ধার্মিকতা দেখানোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নেই।

২১) ইতিহাস লেখা হয় বিজয়ীদের দ্বারা।

২২) বুদ্ধিমানদের উচিত মহান ব্যক্তিদের পথ অনুসরণ করা এবং তাদেরকে অনুসরণ যারা উৎকর্ষ অর্জন করেছেন। এতে তাদের মহত্বটুকু না পেলেও কোনভাবে তার কিছু অংশ পাওয়া যায়।

২৩) ভালবাসা এবং ভয় দুটিই পাওয়া উত্তম। তবে দুটিই একসাথে না পেলে মানুষের ভয় পাওয়াটাই অধিকতর ভাল।

২৪) *একজন শাসকের বুদ্ধির পরিমাপ করার প্রথম পদ্ধতিটি হলো: তাঁর চারপাশের লোকগুলোর দিকে দৃষ্টি দেওয়া।

২৫) প্রয়োজনের তাগিদ না পেলে মানুষ ভাল কাজ করে না। সুযোগ পেলে তারা যা খুশি তা-ই করে, তাতে বিশৃঙ্খলা আর বিভ্রান্তি নিয়ে আসে।

২৬) যুদ্ধ, এর আকার আর উপাদান ছাড়া একজন রাষ্ট্রনায়কের আর কোন বস্তু বা চিন্তা থাকা উচিত নয়। একজন শাসকের জন্য এটিই উপযুক্ত শিল্পকলা।

২৭) *যুদ্ধ এড়ানোর কোন সুযোগ নেই। তবে স্থগিত করা যায় এবং এর সুবিধা পাবে আপনার শত্রু।

২৮) প্রত্যেকেরই ‘কী হওয়া উচিত’ সেটি বুঝার জন্য ‘কী হয়েছে’ নিয়ে অনুসন্ধান করা উচিত। পৃথিবীর সকল যুগে সংঘটিত বিষয়ের প্রাচীন নিদর্শন রয়েছে।

২৯) মানুষ সম্পর্কে সাধারণভাবে এটা বলা যায়: তারা অকৃতজ্ঞ, অবাধ্য, অসৎ এবং শঠ; বিপদে আতঙ্কিত এবং লাভের প্রত্যাশী। প্রেমের বাধ্যকতা এই ঘৃণ্য প্রাণীরা সুযোগ পেলেই ভেঙ্গে ফেলে, কিন্তু শাস্তির ভয় তাদেরকে শৃঙ্খলায় বেধে রাখে।

মানুষ, সমাজ এবং রাষ্ট্রনীতি নিয়ে ম্যাকিয়াভেলি’র চিন্তাচেতনা এতই প্রতিক্রিয়াশীল যে, তা পড়ার পর আমি বগিচ্যুত হবার যোগার। পরে আমাকে আবার মহাত্মা গান্ধী ও গৌতম বুদ্ধ পড়তে হয়েছিল। কিন্তু বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণে অনেককিছুই প্রাসঙ্গিক এবং শিক্ষণীয়। বিশেষত *তারকাচিহ্নিত বক্তব্যগুলোর ব্যাপারে পাঠককে সংবিধিবদ্ধ সতর্কিকরণ করছি: এগুলো বিশেষভাবে বিশ্লেষণ না করে সরাসরি প্রয়োগ করলে ভীষণ বিপদে পড়ার সম্ভাবনা আছে!

যা-ই হোক, আমাদের দেশের হরতাল-অবরোধে পুলিশের লাঠিচার্জে বিরোধীদল কেন ম্যাকিয়াভেলি’র নাম করে সরকারকে সমালোচনা করে, এখন বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে গেলো। ম্যাকিয়াভেলিয়ান, মধ্যযুগীয় আর লৌমহর্ষক – শব্দগুলো প্রায় একই অর্থে ব্যবহৃত হয়, কারণ ওই সময়ে প্রেম জাগানোর চেয়ে ভয় জাগানোই ছিল অধিকতর নিরাপদ। খেয়াল রাখতে হবে আমরা কিন্তু মধ্যযুগে নেই আর, তবে মধ্যযুগকে ইতিহাস থেকে বাদ দেবারও উপায় নেই, যেমন উপায় নেই রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণভাবে দুবৃত্তপনাকে দূর করার।


পঠনতালিকা:
Atkinson, J.B. and D. Sices (eds.), 1996, Machiavelli and His Friends: Their Personal Coorespondence, DeKalb: Northeastern Illinois University Press.
Machiavelli, N., 1965, The Chief Works and Others, A. Gilbert (trans.), 3 vols., Durham: Duke University Press.
Machiavelli, N., 1988, The Prince, Q. Skinner and R. Price (eds.), Cambridge: Cambridge University Press.