Category: প্রিয় সমাজ

পৌনপুনিক ধর্ষণের ঘটনায় আমার প্রতিক্রিয়া: ধর্ষকের শাস্তি হতেই হবে – নারী বিবস্ত্র থাকলেও অপরাধ ধর্ষকেরই।

ধর্ষকের মুখে যেমন শালীন পোশাকের আলোচনা মানায় না, সেরকমভাবে ধর্ষণের ঘটনার সময় ‘নারীর শালীন পোশাক’ নিয়ে আলোচনা প্রাসঙ্গিক নয়। কোন মেয়ে তার নিম্নরুচির কারণে অশালীন পোশাক পড়লে আমি যদি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ি, তবে আমার রুচি আর মূল্যবোধ কোথায় গিয়ে ঠেকে? তাই, পোশাকের শালীনতা নিয়ে অন্যদিন আলোচনা করা যাবে।

ছোট্ট একটি দৃশ্যপট তুলে ধরছি। কোন এক ক্ষয়িষ্ণু সমাজে একটি বিদ্যালয় শিশু ধর্ষিত হলো এক শালীন পোশাকের ধর্ষকের হাতে। ধর্ষককে সমাজের মুখোমুখি করা হলে, সে বললো, “মেয়েটি আমার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলো অশালীন পোশাকে। আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি নি। আমার কী দোষ? বলুন?” সেই সমাজের কর্তৃপক্ষ তা মাথানিচু করে মেনে নিলো। মুরুব্বিরা বললেন, “হ, তা তো হতেই পারে। মেয়েরা আজকাল যা বেপর্দা হয়েছে! ধর্ষণ তো হবেই।” মেয়েটিকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবার সুপারিশের মাঝখানে একটি ‘প্রগতিশীল সুপারিশ’ দিলেন অন্য একজন মুরুব্বি। তারপর তিনি মেয়েটিকে ডেকে নিয়ে বললেন, “যাও মেয়ে! বেপর্দা কাপড় পড়ো আবার বিচার নিয়ে আসো! এরপর থেকে সাবধানে থাকবে।” সেই ধর্ষকের যে শাস্তিই হোক না কেন, তা সে গৌরবের বলেই মনে করেছে, কারণ একজন অশালীন পোশাকের মেয়েকে শালীন হবার বাস্তব শিক্ষা সে দিতে পেরেছে।

এমন একটি পরিস্থিতিতে আপনার কী অবস্থান হবে? তবে কি অশালীন পোশাকের মেয়ের সংখ্যা অনুপাতে ‘শালীন ধর্ষকের’ সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাওয়া উচিত নয়? কোথায় গেলো আমাদের নীতিবোধ আর আত্মনিয়ন্ত্রণ?

“তুমি অধম বলে আমি উত্তম হবো না কেন?” নারীর পোশাক খাটো বলেই তাকে ধর্ষণ করতে হবে – এ হলো বিকৃত মানসিকতা, যা পশুর সাথে আমাদের পার্থক্যকে কমিয়ে দিচ্ছে দিনকে দিন। অন্তত ধর্ষণের সময় নারীর পোশাকের আলাপ করা উচিত নয়, তাতে অপরাধী প্রশ্রয় পায়। সমাজে শালীনতা, ব্যক্তিগত রুচিবোধ, পারিবারিক মূল্যবোধ – ইত্যাদি আলাপের সময় পোশাকের বিষয়টি প্রাসঙ্গিক, ধর্ষণের আলোচনায় নয়। ধর্ষক হলো নরপশু, তাকে ঘৃণা ও শাস্তি পেতে হবে। যারা ধর্ষণের ঘটনায় নারীর পোশাকের আলোচনা তুলেন, তারা প্রকারান্তরে ধর্ষকেরই পক্ষ নেন।

ধর্ষকের শাস্তি হতেই হবে, নারী বিবস্ত্র থাকলেও অপরাধ ধর্ষকেরই। ধর্ষককে দিতে হবে তাৎক্ষণিক শাস্তি আর আন্তরিক ঘৃণা।

প্রথম আলো ব্লগ – ৪ জানুয়ারি ২০১৩

ডায়েরি ২০১২: অলিম্পিক, ক্রিকেট এবং রাজনৈতিক মঙ্গা।

একসাথে ৩দিনের ছুটি পাওয়া মনে হয় ঠিক হয় নি। এই ছুটিগুলো ঈদের ছুটির সাথে যুক্ত করা গেলেই কেবল সর্বোচ্চ সুফল পাওয়া যেতো। যা-ই হোক ধন্যবাদ জানাই ভগবান কৃষ্ণকে যার জন্মদিন উপলক্ষে বৃহস্পতিবারে পেলাম অতিরিক্ত ছুটি।

এর ভেতর ঘটে গেল অনেকগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনা। গঠিত হলো আরও একটি রাজনৈতিক দল, বাংলাদেশ জাতিয়তাবাদি ফ্রন্ট, বিএনএফ। পুরাতন বোতলে নতুন মদ, নাকি নতুন বোতলে পুরাতন মদ – ভেবে পাচ্ছি না। পদ্মা সেতু নিয়ে সাপলুডু খেলা চলছেই। জানি না এ জাতির কপালে আরও কত আন্তর্জাতিক দুর্নাম জমা আছে।

স্বঘোষিত লিভিং লেজেন্ড হিসেবে পেলাম জামাইকান স্প্রিন্টার উসাইন বোল্টকে যিনি পরপর দুটি অলিম্পিকে শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছেন। ২০০ মিটার দৌড়ে শেষ দিকে গতি ধীর হয়ে আসার কারণ নিয়ে সমালোচকরা মুখর। তারা বলছেন একই দেশের নিকটবর্তি প্রতিদ্বন্দ্বীদেরকে সুবিধা দেবার জন্য বোল্ট তার সর্বোচ্চ চেষ্টা থেকে সরে এসেছেন। প্রতিযোগিতায় প্রথম হলেও ১৯.৩২ সেকেন্ডে ২০০মিটার একটি সহজ রেকর্ড, কারণ একই দেশের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইউহান ব্লেইক ইতিপূর্বে ১৯.২ করেছিলেন। যা-ই হোক, আজকের লেজেন্ডকে নিয়েই আপাতত আমরা সন্তুষ্ট থাকি।

ফুটবল মানেই আর ব্রাজিল না, একথাটি প্রমাণ করলেন আমাদের মেক্সিকান ভাইয়েরা। আহ! কী পেশাদারী খেলাটা দেখালেন তারা! আমাদের এন্টি-ব্রাজিল ভাইবোনেরা অনেক সুখ পেয়েছেন আশা করি! ব্রাজিলিয়ানদেরকে মনে হয়েছিল মেক্সিকানের মতো, আর মেক্সিকানদেরকে ব্রাজিলিয়ানদের মতো। কী চমৎকার পাসিং! হ্যাঁ, ব্রাজিলের নিজস্ব খেলা শেষ মিনিটে একটু দেখলাম।
পদক তালিকায় চীনের মনোপলিকে অন্তত একদিনের জন্য থামিয়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ওপরে ওঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র ৯৫ (সোনা ৪১), চীন ৮২ (সোনা ৩৭)।

এমনও হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র টিকে যেতেও পারে, যদিও এশিয়ান হিসেবে চীনের একচেটিয়া শ্রেষ্ঠ্যত্বে আমাদের ভাগ আছে। কিন্তু কত আর অন্যের জয়ে জয়ী হবো? অলিম্পিকে আওয়াজ তুলতে আমাদেরকে যে আর কত প্রজন্ম অপেক্ষা করতে হবে কে জানে!

তবুও ক্রিকেট আমাদেরকে বারবার গর্বিত করছে। এত হতাশার মধ্যেও সুখবর হলো অনূর্ধ ১৯ টি-টোয়েন্টি ওয়াল্ডকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেটের পরাশক্তি শ্রীলঙ্কাকে ২৫ রানে পরাজিত করেছে। প্রথম চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেছেন আমাদের সোনার ছেলেরা। আহা! কত সুখবরই দরকার আমাদের এই ‘রাজনৈতিক মঙ্গা’র দেশে!

 

১১ অগাস্ট ২০১২।

ইংলিশ বাংলিশ: আপনার ‘লেদার’ কি ফর্সা?

LISH

এক) আপনার ‘লেদারের’ রঙ কি ফর্সা?

আমার এক ফুফাতো ভাইয়ের ইংরেজিতে কথা বলার কঠিন ইচ্ছাশক্তি ছিলো। আমি তখন ষষ্ঠ কি সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। কথায় কথায় তিনি আমাকে ইংরেজি জিজ্ঞেস করতেন। ট্রান্সলেশন এবং বাংলা শব্দের ইংরেজি জানার জন্য আমাকে নাস্তানাবুদ করে রাখতেন। এমন কি পড়ার সময়ও আমার পাশে বসে থাকতেন। তিনি আমাকে স্নেহ করতেন। আমি কমপক্ষে দশ বছরের ছোট হবো তার।চক্ষুলজ্জার কারণে অন্যকে এসব জিজ্ঞেস করতেন না। আমি ভয়ে কোন আপত্তিও করতে পারতাম না, কারণ রাগলে খবর আছে। ভীষণ বদমেজাজী; তার বড়ভাইকেও মারার রেকর্ড তিনি ততদিনে করে রেখেছিলেন। সুঠাম দেহী, ফর্সা এবং দীর্ঘাকায়। পড়াশুনা বেশি করতে পারেন নি বিশেষ কারণে।

.

তার ইংরেজি বলার পদ্ধতিটি ছিলো বেশ মজার। বাংলা শব্দের ইংরেজিগুলো নিয়ে ‘নিজের মতো’ সাজিয়ে ইংরেজি বাক্য বলা। যেমন, আমি এখন গোসল করতে যাবো। তিনি সকল শব্দেরই ইংরেজি জানেন, শুধু ‘গোসল’ শব্দটি ছাড়া। তো আমাকে তার জিজ্ঞাসার বিষয়টি হলো ‘গোসলের’ ইংরেজি শব্দ কী? ধরুন, আমি তখন বললাম ‘বাথ’।

তিনি বাস্তবিকই এমন একটি পরিস্থিতিতে আছেন। অর্থাৎ, আমাকে অনেকক্ষণ বিরক্ত করার পর আসলেই এবার তার গোসলের সময় হয়েছে। তিনি হঠাৎ বলে ওঠলেন: “আই নাউ বাথ গো!” এই হলো তার ইংরেজি বলার কায়দা! কেমন বুঝলেন? কিন্তু আমি তখন কিছুই বুঝতাম না। মনে করতাম, ওটা ঠিকই আছে। কোন কিছু জিজ্ঞেস করার পূর্বে তার সবচেয়ে প্রচলিত ইংরেজি বাক্যটি হলো, হেলপ ডু। মানে ‘সাহায্য কর!’ জিজ্ঞেস করে জেনে নেবার সুযোগ না হলে বাংলা বাক্যের মধ্যেই তিনি তার সাধ্যমতো ইংরেজি শব্দ জুড়ে দিতেন।

.

পারিবারিকভাবে তাদের সকল ভাই-বোনের ফর্সা ত্বক। পক্ষান্তরে আমাদের বাড়ির সকলেরই গায়ের রং গাঢ়। মা-বাবার গায়ের রঙ শ্যামল হলেও আমরা ভাইবোনদের প্রায় সকলেরই গায়ের রঙ তামাটে। একদিন জিজ্ঞেস করলেন, “আমাকে বল তো, চামড়া শব্দের ইংরেজি কী?” কী উদ্দেশ্যে ‘চামড়া’ শব্দের ইংরেজি চাচ্ছেন আমি তখন বুঝি নি। আমি বললাম ‘লেদার’।

তিনি সাথে সাথে তার বাক্য ডেলিভারি দিয়ে বললেন, “তুই তো জানিস আমাদের পরিবারের সবারই ‘লেদার’ কিন্তু ফর্সা। অথচ, তোর ফুফু (মানে তার মা) কেমন একটি কালো মেয়েকে আমার জন্য দেখেছে। আচ্ছা তোদের ‘লেদার’ এতো কালো কেনো রে?” আমি তো একদম আঁতকে ওঠলাম, কিন্তু হাসলেই খবর আছে! হাড্ডি একটাও আস্ত থাকবে না! কী অভিনব ইংরেজি! ইংরেজরাও তার ইংরেজির মানে করতে পারবে না!

এরকম দৃষ্টান্তের অভাব নেই আমাদের চারপাশে।

.

.

দুই) ঈদ তো গেলো, কী কী ‘মার্কেটিং’ করলেন?

এটি একটি বহুল প্রচলিত মিসইউজ অভ ইংলিশ, যা কেবল বাংলাদেশী শিক্ষিতদের মধ্যে পাওয়া যায়। কত সুন্দর একটি বাংলা শব্দ ‘কেনাকাটা’। সেটি ব্যবহার না করে ইংরেজি ভাষার বারোটা বাজাতে এত ভালো লাগে! যারা বাজারজাতকরণ বিষয়টি নিয়ে স্নাতকোত্তর পড়ালেখা করেন, অর্থাৎ ‘মার্কেটিং’ এর ছাত্ররাও এ ভুলটি থেকে মুক্ত নয়। আহারে, আমরা যদি সত্যিই সকলে ‘মার্কেটিং’ করতাম, তাহলে ভিনদেশি বিজ্ঞাপনে আমাদের টিভি আর বিলবোর্ডগুলো ভরে থাকতো না! যা হোক, কেনাকাটা অর্থে ইংরেজি শব্দটি হবে ‘শপিং’।

.

আসসালামু আলাইকুমের পরিবর্তে আজকাল ‘গুড মর্নিং/আফটারনুন/ইভনিং/নাইট’ ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মনিরপেক্ষ শুভেচ্ছার প্রচলন বেড়ে গিয়েছে। এমনই একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকার সুবাদে আমাকেও গুড মর্নিং গুড আফটারনুন ইত্যাদি শুনতে হয় এবং শুনাতেও হয়। আমার এক সহকর্মী যাকে সম্প্রতি একটি পৌর এলাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে, সাধারণত ‘আদাব’ বলেই শুভেচ্ছা জানায়। অন্তর্মুখী টাইপের ছেলে: সামনাসামনি তাকাতেই লজ্জায় মরে, কথা বলবে কী! এযুগের ছেলে তো! ওর সম্পর্কে আমার একটু কৌতূহল বেশি হবার কারণ হলো, মজা পাই! সেদিন প্রধান অফিসে এসেছে শুনলাম, কিন্তু তার দেখা পেলাম না সারাটি দিন। হঠাৎ বিকালে চা-বিরতিতে দেখলাম পেছন ফিরে চা পান করছে। কী ব্যাপার অমুক বাবু কেমন আছেন? ‘স্যার ভালো আছি’ মুখ ফিরিয়েই উত্তর। মুখ ফিরে উত্তর দেওয়াতে একটু বিস্মিত হলেও কিছু বলি নি, গুরুত্বও দেই নি। পরে জানতে পারলাম, আমাদের এই বাঙালি বাবুটি সম্প্রতি ফ্রেন্চ-কাট নিয়েছেন তার দাড়িতে! হঠাৎ মুখমণ্ডলে এই পরিবর্তন আনার ফলে অফিসে ইতোমধ্যে অনেক হাসাহাসির সৃষ্টি হয়েছে। আসল ঘটনাটি ঘটলো সেদিন বিকেলে। মানে সন্ধায়। অপরিচিত নাম্বার দেখে সাথে সাথে কল রিসিভ করলাম। ওদিক থেকে ‘গুড নাইট’ বলে শুভেচ্ছা জানালেন আমাদের বাবুটি! কণ্ঠ বুঝতে না পেরে আমি আবার ‘হেলো’ বললাম। এবারও উত্তর এলো, গুড নাইট, স্যার। বলুন আমি এর কী উত্তর দেবো! এরপর যা বললো, তার সারমর্মটি হলো: সেদিন অফিসে সে ভালোভাবে কথা বলতে পারে নি, তার মুখে দাড়ি ছিলো এজন্য! দাড়ি রাখা তার কাছে একটি লজ্জার বিষয়!

.

শিক্ষিত সমাজে অনেকেই ‘গোসিপ’ শব্দটিকে বেশ আরামসে সব জায়গায় ব্যবহার করেন। তারা মনে করেন এর অর্থ হলো, আড্ডা দেওয়া বা গল্প করা। তাই নিজের সখ লেখতেও অনেকে গোসিপ বা গোসিপিং শব্দটি ব্যবহার করেন। এটি যে কত বড় ভুল, তা তারা জানেন না।

.

এরকম আরও অনেক ভুলই আছে, যা এমুহূর্তে মনে পড়ছে না সব। কিন্তু ভাষা যেহেতু বহমান নদীর মতো – ভাষার চেয়ে ‘ভাষীর’ গুরুত্ব বেশি। বহুল ব্যবহারের শক্তি দিয়ে ভুলই একসময় স্থায়ি হয়ে যায়। অভিধানে বিকল্প হিসেবে উল্লেখ করে ভুলকেই দেওয়া হবে অনুমোদন, যা পরবর্তি প্রজন্মের কাছে পুরোপুরি ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে।

.

.

________________________________________________________________________________________________

পরিশিষ্ট:

  1. সন্ধা বা রাতে প্রথম দেখায় সাক্ষাৎ হলে ‘গুড ইভনিং’ বলতে হয়। সন্ধা অথবা রাতে এমনটি বিকালেও বিদায় হলে, সেক্ষেত্রে ‘গুড নাইট’ বলা যায়।
  2. আড্ডা দেওয়া বা গল্প করা বলতে চাইলে ‘হ্যাং আউট’ বলা যায়। কিন্তু কখনও ‘গোসিপ/গোসিপিং’ বলা যায় না। গোসিপ বা গোসিপিং এর মানে খুবই নেতিবাচক, অর্থাৎ ‘কারও পেছনে বদনাম/দুর্নাম করা’ অথবা আড়ালে কথা বলা।
  3. দৈনন্দিন প্রয়োজনে ‘কেনাকাটা’ বুঝাতে শপিং বলা যায়, যদি ইংরেজি বলতেই হয়। ‘মার্কেটিং’ শব্দটি একেবারেই ভিন্ন অর্থ বহন করে। এর অর্থ হলো ব্যবসায়িক লাভের জন্য সেবা বা পণ্যের বাজারজাতকরণ।

চিঠিলেখা আয়োজনে প্রাকনির্বাচনী বক্তব্য ২: সাহিত্য মূল্যায়নের সমস্যাগুলো

প্রাকনির্বাচনী বক্তব্য ১ ‘চিপায় পড়িয়ে যাহা হয়’

৫) চিঠির নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট বক্তব্য 

বিগত পোস্টে শুধুই প্রাপ্তির কথা বলেছি। ‘চিপায় পড়েছি’ বলেছি কেবলই মজা করার জন্য, যদিও সে সম্পর্কে কিছু বলা হয় নি। প্রিয় সহব্লগারগণ কেবল প্রাপ্তির বিষয় পড়ে আমার ‘চিপায় পড়া’ নিয়ে মজা করেছেন। আপনাদের মজায় পাওয়া দেখে আমিও মজা পেয়েছি। সবান্ধবে বিপদে পড়লেও সেটা হেসেখেলে অতিক্রম করা যায়। প্রাপ্তিই সেখানে বেশি। এবারও প্রাপ্তির কথাই বলবো – শুধু ভিন্ন আঙ্গিকে। যে কোন বিষয়েই বিচার অনেক কঠিন, কিন্তু সাহিত্যকর্মের বিচার করা সবচেয়ে কঠিন মনে হয়েছে। সাহিত্য রচনায় কোন বিশেষ শর্ত আরোপ করা যায় না বলে এর বিচার করা মোটামুটি জটিল। আমার মতে, সকল চিঠি নির্বাচকই এ জটিলতার মুখোমুখি হবেন। চিঠিলেখা আয়োজনে প্রত্যেক সম্মানীত লেখক অবারিত স্বাধীনতা নিয়েছেন তাদের চিঠি রচনার ক্ষেত্রে। স্বাধীনতা পরিমাপ না করা গেলেও তা কিন্তু অসীম নয়: একজনে বেশি পেলে অন্যজনের কম পড়ে। কয়েকটি কারণ তুলে ধরলাম, যাকে পুরোপুরি সমস্যাও বলা যায় না।

.

ক) পূর্ব থেকে কোন শর্তাবলী বা ক্রাইটেরিয়া নির্ধারণ করা হয় নি: আমার ধারণা, না করাটাই ভালো, তাতে সকল পর্যায়ের লেখক যোগ দিতে উৎসাহিত বোধ করেছেন। লেখার মানউন্নয়ন করতে হলে প্রচুর লেখা চাই। পুরস্কার বা স্বীকৃতিটাই বড় বিষয় নয়।

.

খ) কোন কাঠামো বা প্রাপক বা অডিয়েন্স নির্ধারিত হয় নি: এটি পূর্বোক্ত কারণেই হয় নি। শুধু প্রকৃতি বা আকাশকে নয়, ‘নিজের’ সমীপেও চিঠি লিখেছেন এবং তা ভালোও লেগেছে। চিঠির সম্বোধন, ভাষা বা বিষয়-বিন্যাস নিয়ে কোন দিকনির্দেশনা ছিলো না। অনেকটা ‘লিখুন আপনার মনে যাহা চায়’-এর মতো। এতে নির্বাচকের জন্য সমস্যা হলেও, লেখায় এসেছে বৈচিত্র।

.

গ) প্রতিযোগিতার জন্য হলেও লেখকরা পেয়েছেন সর্বোচ্চ স্বাধীনতা: কেউ কবিতার ভঙ্গিতে, কেউ গল্পের ভঙ্গিতে আবার কেউ বা মাঝামাঝি ভঙ্গিতে চিঠি লিখেছেন। অন্তত শব্দের সংখ্যাটি ঠিক করে দেওযা যেতো। কেউ ২০০ শব্দে, কেউবা ২০০০ শব্দে চিঠি লিখেছেন।

.

ঘ) বিচারক/গণপাঠক সমীপে: প্রেরক-প্রাপকের মধ্যে আর কেউ নেই, অর্থাৎ এ চিঠি আর কেউ পড়বে না, এরকম মানসিকতা নিয়ে লেখা চিঠির সংখ্যা কম। যার নাম চিঠির প্রাপকের স্থানে আছে, একদম তাকেই উদ্দেশ্য করে সকল বক্তব্য বলা হয় নি। প্রচ্ছন্নভাবে বক্তব্যের গন্তব্য বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে গেছে: অনেকটা গণচিঠির মতো। এতে কোন অনিয়ম হয় নি, কারণ নিয়মই তো নেই – নির্বাচকের জন্য এটিও একটি চ্যালেন্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

.

ঙ) সীমানা নির্ধারণ না থাকায় প্রত্যেকেই স্ব স্ব বিষয়ের আঙ্গিকে ভালো লিখেছেন: প্রতেকেরই এরকম দাবি করার অধিকার আছে যে, তার চিঠিটি উত্তম হয়েছে, কারণ প্রতেক্যের চিঠির বিষয়ই আলাদা এবং অন্যের সাথে অতুলনীয়। কেউ ধারে, কেউবা ভারে; কেউ কবিত্বে, কেউবা প্রকৃত চিঠি লেখার দক্ষতায়; কেউ ভাষাগতভাবে এগিয়ে আবার কেউবা বিষয়গত ভাবে এগিয়ে। বিচারক এবার যাবেন কোথায়!
.

চ) নির্বাচক কমিটির বিচ্ছিন্নতা: কমিটি হলেই সেখানে মিটিং হবে, আলোচনা হবে, আর হবে সিদ্ধান্ত। এটিই সাধারণ রীতি। কিন্তু ব্লগারদের বেলায় সেটি সম্ভব হচ্ছে না, আমরা একেক জন একেক দিগন্তে বাস করি।

.

এসবের মধ্যেও কিন্তু নির্বাচক হিসেবে একটি চিঠি বের করতেই হবে। কেবলই একটি চিঠি। আমি তো কমপক্ষে ২০টি চিঠি পেয়েছি, যার প্রত্যেকটি স্ব স্ব ক্ষেত্রে উত্তম! কিন্তু বের করতে হবে একটি চিঠি – সেটি কার হবে? শত কর্মব্যস্ততার মাঝেও এটি আমার কাছে সবচেয়ে জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

.

৬) লেখকের ‘স্বাধীনতার’ একটুস খানি নির্বাচককে দেওয়া যায় না!?

আমাকে যদি বলা হতো ২০টি উত্তম চিঠি বের করতে হবে, তবে তা-ই করতে পারতাম। কিছু চিঠি সত্যিই বিশেষ স্থানে ওঠে এসেছে। চেতনা ও অনুভূতির শীর্ষে এসে কয়েকটি চিঠি এসে কঠিন প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছে। সৃষ্টি করেছে নির্বাচকের মনে পীড়াদায়ক দ্বন্দ্ব। বিবেকের কাছে স্বচ্ছ থাকতে চাইলে এটি যেন নির্বাচকের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা! অনেক উত্তমের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হবে। একটি চিঠিই নির্বাচন করতে হবে। অতএব পিঠে চট বেঁধেছি, ইচ্ছেমত সমালোচনা করুন নির্বাচকের। যারা সরাসরি করবেন না, মনে মনে করবেন, তাদের জন্য বার্তা কক্ষ খোলা থাকলো। সমালোচনা করার যথার্থ কারণ যেহেতু আছে, তাই অগ্রিম ক্ষমা প্রার্থনা করছি। শেষ চেষ্টা হিসেবে বলে নিচ্ছি: লেখকেরা যেহেতু অবাধ স্বাধীনতা পেয়েছেন, নির্বাচকদেরকে সেখান থেকে একটুখানি স্বাধীনতা বরাদ্দ দিন, তাহলেই বর্তে যাই!

.

৭) সহব্লগারদের কাছে আগাম অনুরোধ:

চিঠিলেখা আয়োজনের কারণে একটি নির্দিষ্ট সময় ব্লগে থাকতেই হয়েছে। কর্মজীবন এবং সংসার ধর্ম করেও নিয়মিত ব্লগে থেকে সহব্লগারদের হৃদয়-নিংড়ানো লেখাগুলোতে দৃষ্টি দেওয়াকে একটি পবিত্র দায়িত্ব মনে করেছি। জানি না নির্বাচক হিসেবে কতটুকু দায় পালন করতে পারলাম। তবে আমার কাজ প্রায় শেষ বলেই আমি মনে করি। এখন কাজ শুধু একটি চিঠিকে নির্বাচন করে ঘোষণা দেওয়া। অনেক কঠিন হলেও তা আমাকে করতেই হবে। সকল সহব্লগারের কাছে বিনীত অনুরোধ: যেহেতু আয়োজক এবং অংশগ্রহণকারী সকলেই এখানে স্বেচ্ছাসেবী, চলুন একে অন্যকে গ্রহণ করি আন্তরিকতা দিয়ে। সিদ্ধান্ত যা-ই হোক, মানবিকতাবোধ এবং নিজস্ব রুচিবোধকে তুলে ধরি। এ ধরণের প্রতিযোগিতাগুলোতে মানুষের মূল্যবোধগুলো সবচেয়ে বেশি পরীক্ষিত হয়।

.

৮) ভবিষ্যত আয়োজনে যা করা যেতে পারে:

সমস্যা উত্থাপন করলে কিছু সমাধানের প্রস্তাবও দিতে হয়। ২০১৩ সালের চিঠিলেখা আয়োজনে যুক্ত থেকে লেখা প্রতিযোগিতা সম্পর্কে আমার কিছু মতামত জড়ো হয়েছে। ছাত্রজীবনে, এমনকি কর্মজীবনেও, এরকমের কিছু কিছু আয়োজন করতে হয়েছে। অচেনা এলাকার বৈরি জনতা, সরকারি কর্মকর্তা, বেসরকারি প্রতিনিধি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি সকল পর্যায়ের লোকদেরকে নিয়ে এমন কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হয়েছে, যা ব্যর্থ হলে জুতা পড়ার সময় পাওয়া যেতো না! সেসব অভিজ্ঞতা থেকে শেষ পোস্টে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয় তুলে ধরতে চাই। শুধুই চিন্তায় খোরাক যোগাবার জন্য।

[প্রথম আলো ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া]

.

.

** প্রথম আলো ব্লগে চিঠি লেখা আয়োজনের নির্বাচক হবার অভিজ্ঞতা

এবিষয়ে পূর্বের পর্ব: প্রাকনির্বাচনী বক্তব্য ১ ‘চিপায় পড়িয়ে যাহা হয়’

চিঠিলেখা আয়োজনে প্রাকনির্বাচনী বক্তব্য ১: চিপায় পড়িয়ে যাহা হয়!

d3683c5f8da

১) চিপায় পড়িলে যাহা হয়: কিঞ্চিৎ গৌড়চন্দ্রিকা

কথায় আছে, কাহাকেও যদি একটু চিপায় ফেলিতে চাও, তবে তাহাকে নিকাহ করাইয়া দাও অথবা নির্বাচনে খাড়া করাইয়া দাও। আমার মনে হয়, সবকিছুরই আপডেট রহিয়াছে, বিবর্তন রহিয়াছে। অতএব এখন বলা উচিত, কাহাকেও চুপানি খাওয়াইতে চাইলে, বিচারক বানাইয়া দাও। চিঠিলেখা আয়োজনে বিচারক কমিটির অন্য সকলেই অভিজ্ঞ বিজ্ঞজন – একমাত্র আমিই হাতুড়ে লেখক! কী যাতনায় দিনাতিপাত করিতেছি, না পারি কহিতে – না পারি সহিতে। কারণ, ব্লগে লেখালেখি’র কর্মসূচি বৃদ্ধি করিবার নিমিত্তে আয়োজক মহাশয়কে তাগিদ দিতাম। এ্রইবার তাহার বিশেষ কর্মব্যস্ততার মধ্যে ইহা শুরু করাতে খুশিই হইয়াছিলাম। কিন্তু খুশি বিনাস করিলো নির্বাচক হবার প্রস্তাবে। তথাপি অন্য সকল ব্লগীয় প্রস্তাবের মতো নিরাপত্তিতে মানিয়া নিলাম। এখন আমার সামনে যোগ্যতম পত্রলিখকবৃন্দ আর পিছনে আয়োজকবৃন্দ। মধ্যিখানে আমি! যাহা হোক, আমি বর্তমানে কেমন শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় আছি তাহার বর্ণনা দিব পরবর্তি পোস্টে। এইবার বলি প্রাপ্তির কথা।

.

২) যাহা আমি শিখিলাম:

ছেলেবেলায় পাঠ্যপুস্তকে অনেক চিঠিই পড়িয়াছি। সঙ্গত কারণেই পিতার কাছে টাকা চাহিয়া পুত্রের চিঠিখানি বিশেষ খেয়াল আছে। লেখাপড়া মনযোগ বৃদ্ধি করতঃ ভালো ফলাফলের প্রেরণা দিয়া ছোটভাই/বোনের কাছে পত্র লিখ। তখন নিজেরই পড়াশুনার ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা! তথাপি তাহা খেয়াল আছে কিন্তু গুরুত্ব দিই নাই। চিঠির মর্যাদা তখন এতটা উপলব্ধি করি নাই, এইবার যাহা করিলাম। চিঠিলেখা আয়োজনে সম্পৃক্ত থাকিয়া বিরল অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হইলাম; বিচিত্র রকমের লেখার সাথে পরিচিত হইলাম আর জানিলাম চিঠি কাহাকে বলে, কত প্রকার এবং তাহা কী কী। বৈচিত্রময় চিঠির সমারোহে পড়িয়া চিঠি সম্পর্কে সকল পূর্ব ধারণার সংস্কার হইয়া গেলো। একজন প্রিয় সহব্লগার শুধু রিহার্সাল পর্ব দিয়াই চিঠিলেখা আয়োজনকে অনেক সার্থক করিয়া দিয়েছেন। ভিতরে ‘দ্রব্য’ থাকিলে যাহা হয়! তাহার চিঠিগুলোতে বাংলার সমাজ ও পারিবারিক জীবনের সুখ ও বিষাদের যে চিত্র ফুটিয়া ওঠিয়াছে তাহাতে অনেকের মতো আমিও মুগ্ধ।

.

৩) যাহা আমাকে বিমুগ্ধ করিয়াছে:

কবি কবিতা লেখিবেন, গল্পকার লেখিবেন গল্প – কিন্তু চিঠির বেলায় ব্যতিক্রম। সকলেই চিঠি লেখিতে পারেন। চিঠিতে কবিতার মতোই মনের গভীর অভিব্যক্তি প্রকাশ পাইতে পারে। তাই, চিঠি পড়ে সহব্লগারদের মনের গতিপথ সম্পর্কে কিছুটা জানিবার সুযোগ পাইলাম। কাহারো প্রেমিক-প্রেমিকার খবরও পাইয়া গেলাম এই যাত্রায়! একটি বিষয় আমাকে খুবই অনুপ্রাণিত করিয়াছে, তাহা হইলো: অধিকাংশ চিঠিই শুধু প্রেমের জন্য নহে, যদিও চিঠি স্বভাবগতভাবে প্রেমের কথাই কহে। সহব্লগাররা যে শুধুই প্রেম নামক একমুখি আবেগে ব্যপ্ত নহে, ইহা একটি জাতীয় সুখবর বলা যাইতে পারে। ‘জাতীয় সুখবর’ এইজন্যেই বলিলাম, কারণ স্বদেশকে নিয়া, মুক্তিযুদ্ধকে নিয়া, ভাষা আন্দোলনকে নিয়া, বাঙলাকে নিয়া, বিডিআর বিদ্রোহ, হরতাল, সাভার ট্রাজিডি নিয়ে বেশ কিছু চমৎকার চিঠি পড়িবার সৌভাগ্য আমার হইয়াছে। ইহাতে সহব্লগারদের স্বদেশ প্রেমের এক প্রেরণাদায়ক প্রমাণ পাইলাম। আরও ভালো লাগিয়াছে পিতা-মাতার প্রতি ভালোবাসা এবং তাহাদের প্রতি সহ-ব্লগারদের অনুভূতির প্রকাশ দেখিয়া। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চিঠি লিখা হইয়াছে পিতা-মাতার প্রতি। পিতারূপে শ্বশুরকে লক্ষ্য করিয়াও চিঠি লিখা হইয়াছে। তাহারা যে আমাদের জীবনে কতটুকু প্রভাব বিস্তার করিয়া আছেন, তাহা পরিমাপ করা না গেলেও অনুভব করিবার সুযোগ পাইলাম।

ইহাছাড়া প্রিয় প্রথম আলো ব্লগকে নিয়াও পত্র লিখিয়াছে আমাদের ক’জন সহব্লগার, যাদের অধিকাংশই প্রবাসী। প্রবাসীরাই কি তবে ব্লগকে বেশি প্রেম করেন? এই প্রশ্ন নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা চলিতে পারে। তবে আমি পূর্বাহ্নেই প্রবাসীদের পক্ষ নিয়া রাখিলাম! পক্ষপাতিত্ব না করিলে বিচারক হওয়া যায় না।

.

৪) চিঠিলেখা আয়োজনে ব্লগের কাটতি বাড়িয়াছে:

প্রথম আয়োজনে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম না। বিভিন্ন আলোচনায় ভাবিয়াছিলাম তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে চিঠিলেখার আর কী প্রয়োজন থাকিতে পারে। গণমানুষের সাহিত্য হিসাবে চিঠির যে আলাদা একটি গুরুত্ব রহিয়াছে, তাহা প্রায় ভুলিতেই বসিয়াছিলাম। উপরন্তু এই আয়োজনে অনেক ভালো কিছু লেখকের সন্ধান পেলাম, যাহারা ব্লগে নিয়মিত আসেন না, কেবলই চিঠিলেখা উপলক্ষে আসিয়াছেন। অথবা, আসলেও শুধু পড়িতেন আর মাঝে মাঝে মন্তব্য করিতেন, কিন্তু নিজেরা তেমনভাবে লিখিতেন না। যাহারা নিয়মিত লিখেন, তারাও ভিন্ন কিছু লেখার প্রয়াস পাইলেন এই উপলক্ষে। ব্লগার, পাঠক, অতিথির যাতায়াত বাড়িয়াছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এইসবই চিঠিলেখা আয়োজনের কারণে হইয়াছে। দীর্ঘদিনের বিরতির পর চিঠিলেখা আয়োজনের বদৌলতে আলো ব্লগে আঘাত, মানে হিটও বাড়িয়াছে এই দিনগুলোতে। একটি পাবলিক ব্লগে এই অর্জন অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক। আশা করছি আলোব্লগের কর্তারা এই কর্মচঞ্চলতাকে একটি স্থায়ি রূপ দিবার চেষ্টা করিবেন।

.

৫) চিঠি নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বক্তব্য: সকল চিঠির উপস্থাপনা শেষ হইলে, পরের পোস্টে বিস্তারিত জানাইবার চেষ্টা করিব।

[প্রথম আলো ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া]

** প্রথম আলো ব্লগে চিঠি লেখা আয়োজনের নির্বাচক হবার অভিজ্ঞতা

পোশাক শ্রমিকের অধিকার: বিজিমিয়া আসলে করে কী?

হ্রদের ওপর বিজিমিয়া’র প্রাসাদ

হ্রদের ওপর বিজিমিয়া’র প্রাসাদ

বিজিমিয়া আসলে কার সেবা করে?

সমস্যা এলেই এর তাৎক্ষণিক সমাধান চাই আমরা – সাথে জানতে চাই এর সূত্রপাত কোথায়। সবচেয়ে বেশি চাই, দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানটিকে সনাক্ত করতে। তাজরিন ট্রাজিডি, সাভার ট্রাজিডি, অগ্নিসংযোগ আর অন্তহীন শ্রমিক বিদ্রোহের ঘটনায় বার বার একটি প্রতিষ্ঠানের দিকে দৃষ্টি চলে যায়। একটি আঠারো-তলা ভবনের দিকে অসহায় মানুষের প্রশ্নগুলো গিয়ে জমা হয়। তারা আসলে কী করছে সেখানে? দেশের পোশাকশিল্পে তাদের কোনই নিয়ন্ত্রণ নেই? প্রতিষ্ঠানটি আসলে কিসের উদ্দেশ্য গড়ে ওঠেছে? অথচ দেশের পোশাকশিল্পকে যথাযথ দিকনির্দেশনা দিয়ে প্রগতির দিকে পরিচালনা দেবার লক্ষে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠেছিলো। বিজিএমইএকে বাংলা কথাবার্তায় ‘বিজিমিয়ার’ মতো শুনায়, যেমন ডিওএইচএসকে ‘ডিএস’ বলেন আমাদের রিকসাড্রাইভার ভাইয়েরা। বিজিমিয়া বিজি ফর নাথিং?

 

কাগজে-কলমে বিজিমিয়ার উদ্দেশ্য

বিজিএমইএ’র মৌলিক উদ্দেশ্য হলো উৎপাদনকারী, রপ্তানীকারক এবং আমদানীকারকদের মধ্যে আন্তরিকতা এবং পাস্পরিকভাবে অনুকূল সম্পর্কের জন্য, এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বৃদ্ধির জন্য একটি সুষম বাণিজ্যিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা। এটি বিজিএমইএ’র হোমপেইজে তারা নিজেরাই ঘোষণা করেছে। তাদের অনেক উদ্দেশ্যের মধ্যে প্রথম তিনটি উদ্দেশ্য হলো ১) সরকারি নীতিমালার প্রয়োগের মাধ্যমে পোশাকশিল্পের স্বার্থ রক্ষা এবং এ সেক্টরের সুষম অগ্রগতি সাধন করা; ২) গার্মেন্টস কর্মীদেরকে আইনসংগত সুবিধাদি এবং তাদের অধিকার বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বিজিএমইএ সদস্য এবং তাদের কর্মীদের স্বার্থ রক্ষা করা; ৩) বিদেশী এবং স্থানীয় পর্যায়ের ক্রেতা-প্রতিনিধির সাথে পরামর্শ ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পোশাকশিল্পের অগ্রগতি সাধন করা। বিজিএমইএ’র প্রধান একটি দায়িত্ব হলো এক্সপোর্ট অর্ডারের ভিত্তিতে কাপড়, সূতা, রঙ, পশমি সূতা ইত্যাদির পরিমাণ নির্ধারণ করে সদস্য কারখানার জন্য ইউডি (ইউটিলাইজেশন ডিক্লেয়ারেশন) ইস্যু করা। পোশাক কারখানাকে শিশুশ্রম মুক্ত করা বিজিএমইএ’র ‘ঈমানি দায়িত্ব’, কারণ তা না হলে স্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক স্মারকের বরখেলাপ হবে। বলা বাহুল্য ঈমানি দায়িত্বটিও যথাযথভাবে পালন করে নি আমাদের বিজিমিয়া, অর্থাৎ বিজিএমইএ – ফলে, চিরতরে বাজার-হারা!

 

তিন দশকে পোশাকশিল্পের উন্নয়ন

তিন দশকে পোশাকশিল্পের উন্নয়ন

বিজিমিয়ার জামিতিক গতিতে উন্নয়ন আর গরিবের হাতে মূলা

১৯৭৭ সালে মাত্র ১২টি পোশাক তৈরির কারখানাকে সদস্যপদ দিয়ে বিজিএমইএ’র যাত্রা শুরু। স্বল্পমূল্যে, অনেকে বলছে বিনামূল্যে, শ্রম পাওয়া যায় ঘণবসতির এ বাংলাদেশে। ফলে, বছরের পর বছর লাভ বেড়েছে, কারখানার সংখ্যা বেড়েছে, সেসাথে বেড়েছে কর্মীর সংখ্যা।

পোশাক শিল্পকে সুবিধা দেবার ক্ষেত্রে দেশের সরকারগুলো যেন প্রতিযোগিতায় নেমেছিলো। কী পায় নি তারা? কর অবকাশ বা ট্যাক্স হলিডে তো নিয়মিতই পাচ্ছে। এযাবত নগদ প্রণোদনা বা ক্যাশ ইনসেনটিভ হিসেবে পেয়েছে প্রায় দশ হাজার কোটি টাকা। ইউরোপ বা পশ্চিমা দেশ থেকে শুল্ক অব্যাহতি পাবার লক্ষে জিএসপি সুবিধা পাবার জন্য সরকারের সর্বোচ্চ প্রভাবকে তারা ব্যবহার করেছে প্রায় সব দলের আমলেই। শুধু ২০১১-২০১২ সালে তৈরি পোশাক থেকে ১৯ বিলিয়ন আয় হয় যা মোট বৈদেশিক আয়ের ৭৮%।

 

৪০ লাখ কর্মীর ৮০% ভাগই নারী

৪০ লাখ কর্মীর ৮০% ভাগই নারী

অধিক শ্রমিকের যোগান আর গরিবের পেটে লাথি

বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ কর্মীর ৮০% নারী কর্মী যারা প্রথাগতভাবেই কণ্ঠ উচ্চে তুলতে পারে না। সঙ্গত কারণেই তাদের নিয়ে কাজ করতে সুবিধা বেশি। ফলে নারী কর্মীর কর্মসংস্থানে অল্প প্রচেষ্টাতেই তা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এভাবে পোশাকশিল্পে নারীর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। অংশগ্রহণও বেড়েছে। অভাবের তাড়নায় গ্রাম থেকে পালানো কিশোরী মেয়েদের একমাত্র আশ্রয় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি। বানের পানিতে ভাসা কচুরিপানার মতো শহর ও উপশহরগুলোতে কর্মহীন কিশোর-কিশোরিদের ভিড় বাড়তে লাগলো। বাড়তে লাগলো অযাযিত শ্রমের যোগান। যোগান বেশি হলে চাহিদা কম, তাই শ্রমের দামও কম। কিন্তু শ্রমিকের পক্ষে তো অর্থনীতির মারপেঁচ মোতাবেক আচরণ করা সম্ভব নয়। তাদেরকে কাজ করতেই হবে – অন্তত পেটের ভাত তো জুটবে! এসুবিধাকে কাজে লাগাবে না এরকম নীতিবান ব্যবসায়ী কি আশা করা যায়?

 

শ্রমিকের অধিকার: ব্যবসায়ী না শুনে নীতির কাহিনি

বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ন্যূনতম বেতন নিয়ে বেশ জোড়ালো দাবি ওঠলো। পোশাক কারখানার পরিবেশ নিয়ে বিদেশী ক্রেতারা মিহিসুরে কিছু অভিযোগ করেই খেমতা দেন, কারণ এর চেয়ে বেশি বললেই ঝামেলা গিয়ে পড়বে এলসি’র ওপর। তাহলে বাকি থাকলো কে? আমাদের সুশীল সমাজ, যাদেরকে অনেকে ভিন্ন নামে চেনে। তাদের আওয়াজের সাথে রাষ্ট্রীয় কোন সহযোগিতা না থাকায় ওটা আওয়াজ পর্যন্তই থেকে যায়। মুখচেনা কিছু শ্রমিক নেতাকে ডেকে এনে একটি সাংবাদিক সম্মেলন করলেই কেল্লা ফতে! গার্মেন্টস মালিকদের কীইবা করার আছে বলুন? এতো কিছুর পরও তো তাদের শ্রমিকের অভাব হচ্ছে না। তারা কি দেশের নারীসমাজকে কর্ম দিয়ে দেশকে উদ্ধার করে দিয়েছে না? তাজরিন ফ্যাশনে অগ্নিকাণ্ডে যখন ১১২ শ্রমিক মারা গেলো তখন তাৎক্ষণিকভাবে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়, কারণ কমিটি বললে এখন আর কেউ বিশ্বাস করে না। যা হোক, ওই টাস্কফোর্স এসে সাংবাদিকদের বললো অবিলম্বে তারা দেশের পোশাককারখানা পরিদর্শন করবে। একটি কারখানা পরিদর্শনের পর, হোই পর্যন্তই ‍উহা শেষ!

এবার ভবনধসে মারা গেলো ৪০৫ শ্রমিক, তাই বেশি কিছু করতে হবে। তারা পুরস্কার ঘোষণা করলো, যারা ভবনমালিক সোহেল রানাকে ধরিয়ে দিতে পারবে তাদেরকে ৫লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। একজন সাবেক বিজিমিয়া বললেন, “ভাই এবারের ঘটনা ভিন্ন। সত্যিই আমাদের ভাবিয়ে তোলেছে।” এভাবে কিছুদিন মিডিয়ার সামনে তারা ঢাকঢোল পেটাবে। তারপর যেই লাউ সেই কদু!

 

দুধকলা খাইয়ে……

পৃথিবীর অন্য কোন দেশে কোন ব্যক্তিমালিকানাধীন শিল্পকে দেশের সরকার এতো সুবিধা দেয় নি। সরকারি ভর্তুকি, তাও নগদ অর্থে, কোন দেশে এরকম আছে কিনা জানা নেই। সুবিধা আর আস্কারা দেবার নিকৃষ্ট প্রমাণ হলো হাতিরঝিলের ওপর বিজিমিয়ার অবৈধ ১৮ তলা ভবন। বেআইনিভাবে সরকারি জমিতে গড়ে তোলা ভবনটিকে ভেঙ্গে ফেলার হুকুম আসলেও বিভিন্ন কায়দা-কানুন করে তারা স্থগিতাদেশ বের করেছে। এই হলো বিজিমিয়ার নীতি প্রতি শ্রদ্ধার নমুনা।

অতএব ভবনধসের পর অগ্নিকাণ্ড আবার অগ্নিকাণ্ডের ভবনধস এভাবে চলতেই থাকবে। খেয়াল রাখতে হবে, বিজিমিয়া হলো একটি গার্মেন্টস মালিক এসোসিয়েশন। যে দেশে ট্রেড ইউনিয়নের কার্যকারিতা নেই, নেই শ্রমিক সংগঠনের স্থায়ি কোন অস্তিত্ব, সে দেশে বিভিন্ন শিল্পের মালিকদের এসোসিয়েশনে ভরপুর। অতএব বিজিমিয়া বিজি আছেন তাদের নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে আর কীভাবে অধিক লাভ করা যায়। শ্রমিকের ন্যূনতম বেতন বা কর্মস্থলে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ দিলে কি লাভ থাকবে? জাতির কাছে এই প্রশ্ন রেখে শেষ করলাম।

 

*পাদটীকা: পরিস্থিতির উন্নয়ন না হলে পোশাকশিল্প ধ্বংস হবে শিঘ্রই। ইউরোপিয়ান কমিশন সম্প্রতি সাবধান করে দিয়েছে। হ্রাসকৃত বা বিনা শুল্কে ইউরোপে পোশাক রপ্তানি করার সুবিধা হারাবার সমূহ সম্ভাবনা। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নয়ন না হলে জেনারেলাইজড সিস্টেম অভ প্রেফারেন্স বা জিএসপি সুবিধা কেড়ে নেবার হুমকি দিয়ে তারা।

 

**তথ্যসূত্র:

1)  http://www.banglapedia.org/HT/B_0439.HTM

2)  http://www.prothom-alo.com/detail/date/2013-04-30/news/348863

3)  http://www.bgmea.com.bd/home/pages/aboutus#.UYKBEaL-E-Q

4)  http://www.thedailystar.net/beta2/news/bgmea-and-image-crisis/

 

*** প্রথম আলো ব্লগে পাঠক মন্তব্য

শ্রদ্ধাঞ্জলি: বিনোদ বিহারী চৌধুরীর তিন কাল ও বাঙালির শেষ বিপ্লবী

বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী

বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী

মাস্টারদা সূর্যসেন বলেছিলেন, ব্রিটিশরাজের হাত থেকে দেশকে স্বাধীন করার একটিই পথ হলো, ক্ষমতা দখল করা এবং প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করা। ত্রিমুখী লক্ষ্য নিতে হবে: প্রথমে দু’টি অস্ত্রাগার লুঠ করতে হবে তারপর উপড়ে দিতে হবে রেল লাইন, যাতে বাইরে থেকে খুব তাড়াতাড়ি সৈন্য আসতে না পারে। তৃতীয় কাজটি ছিলো, ইউরোপিয়ান ক্লাবকে উড়িয়ে দেওয়া, যেখানে ব্রিটিশ সৈন্য ও কর্মকর্তারা গান আর পান করে উল্লাস করে। সারা দেশ থেকে ব্রিটিশ সৈন্যরা জড়ো হবার পূর্বেই চট্টগ্রামকে স্বাধীন করতে হবে। নিজেদের জীবন দিয়ে স্বদেশীদের জন্য স্বাধীন করতে হবে দেশকে। হয় দেশের মুক্তি না হয় আত্মার মুক্তি। মাঝখানে কোন রাস্তা নেই। যুদ্ধ পরিকল্পনা উপস্থাপনার সময় কথাগুলো বলছিলেন বিনোদ বিহারীসহ প্রায় একশ’ তরুণের সামনে।

মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে প্রধান সহযোদ্ধারা ছিলেন প্রীতিলতা ওয়ায়েদ্দার, কল্পনা দত্ত, কালিপদ চক্রবর্তী, আম্বিকা চক্রবর্তী, মাখন ঘোষাল, তারাকিশোর দস্তিদার প্রমূখ অনেকে। বিনোদ বিহারী ছিলেন সূর্যসেনের তরুন সহযোগী। মাত্র ১৯ বছরের তরুন বিনোদকে পড়াশুনার পরামর্শ দিয়ে সস্নেহে এড়িয়ে যান মাস্টারদা। কিন্তু বিনোদের চাপে এবং অন্য কোন দলে যোগদানের হুমকিতে হাসিমুখে বরণ করেন।

চট্টগ্রামের তরুন বিপ্লব ১৯৩০

১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল বাঙালির ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল রাত। চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ। চরম সাহসিকতা ও চাঞ্চল্যকর রাত। সসস্ত্র বিপ্লবের জন্ম রজনী। ভারত স্বাধীনতার সংগ্রাম এগিয়ে গেলে চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ঘটনার ঔজ্জল্য কমে গেলেও এর গুরুত্ব ভোলার নয়।

সে রাতে ৬৫ তরুন বিপ্লবী স্বদেশপ্রেম আর স্বাধীনতার স্বপ্নে সজ্জিত হয়ে একত্রিত হয়েছিলেন মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে। তাদের লক্ষ্য ছিলো চট্টগ্রামকে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত করা। একযোগে তারা আক্রমণ করেছিলেন ব্রিটিশ সময়ের পুলিস স্টেশন, অস্ত্রাগার ও রেডিও স্টেশন।

অস্ত্র লুণ্ঠন, টেলিগ্রাফ অফিস ধ্বংস, রেললাইন কাকা, এবং দামপাড়া পুলিশ লাইনের অস্ত্র লুণ্ঠুন করে ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল থেকে তিন দিনের জন্য চট্টগ্রামকে স্বাধীন করে রাখেন ব্রিটিশ রাজের ক্ষমতা থেকে।

জঙ্গী বিপ্লবের শুরু। সূর্যসেন পলাতক। সমগ্র মহাভারত কেঁপে ওঠলো। একসময় সূর্যসেন ধরা পড়লেন। সাথে তারাকিশোর দস্তিদার ও তরুণী কল্পনা দত্ত। বিচার হলো সূর্যসেন ও তারাকিশোরের। ফাঁসি হলো তাঁদের। লাশ ফেলে দেওয়া হলো বঙ্গোপসাগরে। বিশ্বাসঘাতক আত্মীয়রা ১০,০০০ টাকার লোভ সংবরণ করতে না পেরে সূর্যসেনের সন্ধান জানিয়ে দেয় ব্রিটিশ পুলিসের কাছে। ১৯৩৪ সালের সূর্যসেনের ফাঁসি হয়।

বিপ্লবী চেতনায় দীক্ষিত হয়ে বিনোদ প্রথমবারের মতো সম্মুখযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন জালালাবাদ পাহাড়ে। সূর্যসেনের বিশ্বাসঘাতক আত্মীয়দেরকে হত্যা করেন বিনোদ বিহারীর দল। সেখানে তারা পুলিস দ্বারা বেষ্টিত হয়েছিলো। চোখের সামনে ১২জন সহযোদ্ধাকে মৃত্যুবরণ করতে দেখেন বিনোদ বিহারী।

গলায় বুলেটের আঘাত পেয়ে সহযোদ্ধাদের দুশ্চিন্তার কারণ হন। তাদের কেউ প্রস্তাব দিলো গুলি করে মেরে ফেলার, তাতে ব্যথা কমে যাবে! কিন্তু অন্যরা ভাবলো, হয়তো বিনোদ সুস্থ হয়ে ওঠবে।আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় চিকিৎসা নেন এবং সুস্থ হয়ে ওঠেন। ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত আত্মগোপনে থাকার পর গ্রেফতার হন এ বিপ্লবী। ব্রিটিশ রাজ তার মাথার দাম নির্ধারণ করেছিলো ৫০০ টাকা। ধরা পড়েন বিনোদ এবং গ্রেফতার হয়ে রাজপুতনায় কারাবন্দী হন বিনোদ বিহারী। সকল নির্যাতন এবং পাশবিকতাকে অতিক্রম করে তিনি ব্রিটিশদের বিদায় দেখেছেন। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল মিলে সাত বছর কাটিয়েছেন কারাগারে।

এর দু’বছর পরের ঘটনা। ব্রিটিশ সেনা অধ্যূষিত পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করে আহত হলেন পলাতক প্রীতিলতা ওয়ায়েদ্দার। ধরা পড়ে লাঞ্ছিত হবার ভয়ে পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে নিজেই নিজের জীবন নিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে প্রথম নারী শহীদ।

বিপ্লবের পরের দিনগুলো

স্বাধীনতা এসেছিলো। কিন্তু সুর্যসেন প্রীতিলতাদের সাথে যেরকম স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন সেটি তাদের পাওয়া হয় নি। দেশবিভাগের পর যখন হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেই ভারতে পারি দেন, তখন বিনোদ বিহারী চৌধুরী বেছে নিয়েছিলেন স্বদেশকেই। ছায়া স্বাধীনতার কঠিন পর্ব অতিক্রম করেন ১৯৪৭ এর পরের সময়টিতে। স্বপ্নভঙ্গ আর হতাশার সময়।

অবশেষে আসলো একাত্তর। বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের কাছে নিজের ভাগ্যকে ছেড়ে দেন। বছর শেষে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ পেয়ে নিজের অস্তিত্বও বিশ্বাসে নতুন শক্তি লাভ করেন।

বিনোদ বিহারী ব্রিটিশ-ভারতের সময় হতে বাংলাদেশ পর্যন্ত যাবতীয় রাজনৈতিক ও অধিকার আন্দোলনের সাক্ষী হয়ে সংগ্রাম করেছেন, প্রতিবাদ করেছেন। অর্জন করেছেন বিরল সম্মান ও সম্মাননা। আমৃত্যু তিনি অন্যায়, অবিচার, বৈষম্য আর সাম্প্রদায়িকতার বিপক্ষে সোচ্চার ছিলেন। মানবতাবিরোধী সংগ্রামে লড়াকু ভূমিকা পালন করে স্বদেশকে দিয়েছেন দীর্ঘসময়ের সঙ্গ। সাম্প্রতিক সময়েও তিনি ছিলেন চট্টগ্রামবাসীর অভিভাবকের মতো। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি থেকেছেন সকল মতের সকলের মধ্যমণি হয়ে।

জন্ম শতবার্ষিকীতে একটি দৈনিকের সাথে এক সাক্ষাৎকারে জীবনের শেষ চাওয়া কী জিজ্ঞেস করা হলো। উত্তরে তিনি যুবকদেরকে আরও সাহসী হতে বলেন। অবিচার এবং মিথ্যাকে ঘৃণা করার পরামর্শ দেন। “দেশকে ভালো বাসো। স্বদেশের মানুষের জন্য শ্রম দাও, দেশ বদলে যাবে।” ব্রিটিশ থেকে পাকিস্তান এবং পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হবার প্রক্রিয়ায় স্বদেশ ত্যাগের প্ররোচনা এসেছে বারবার। অনেকে চলেও গেছেন অপর বাংলায়। কিন্তু এতটুকু আত্মকেন্দ্রীক হতে পারেন নি বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী। স্ত্রী এবং দুই পুত্রসন্তান, সব হারিয়ে শেষ দিনগুলোতে নিজের অস্তিত্বের সাথে বিপ্লব করতে হয়েছে তাকে। স্বাধিকার আন্দোলনের সবগুলো ফটক অতিক্রম করে বাঙালি জাতির সর্বশেষ বিপ্লবী বিদায় নিলেন এ এপ্রিলেই, যে এপ্রিলে বিপ্লবের বীজ বুনেছিলেন ১৯৩০ সালে। কলকতার ফর্টিস হাসপাতালে ১০৩ বছর বয়সে গত ১০ এপ্রিল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মহান বিপ্লবীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি!

টাইমলাইন: বিনোদ বিহারী চৌধুরী

১৯১১: বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর জন্ম (১০ জানুয়ারি), চট্টগ্রাম
১৯২৭: আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবী দল ‘যুগান্তরে’ যোগদান
১৯২৯: কৃতীত্বের সাথে মাধ্যমিক পাশ (মেট্রিকুলেশন) করে বৃত্তি লাভ করেন

১৯৩০: চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনে সূর্যসেনের অন্যতম সহযোগী। সহসম্পাদক – কংগ্রেসের চট্টগ্রাম জেলা কমিটি।
১৯৩৩: অস্ত্রাগ্রার লুণ্ঠন মামলায় গ্রেফতার ও কারাবরণ।
১৯৩৪: প্রথম শ্রেণীতে উচ্চমাধ্যমিক (আই.এ) পাশ করেন – ব্রিটিশ রাজের ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকাবস্থায়
১৯৩৬: প্রথম শ্রেণীতে ডিসটিংশনসহ স্নাতক (বি.এ) পাশ করেন – ব্রিটিশ রাজের ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকাবস্থায়
১৯৩৯: ইংরেজিতে এম.এ পাশ করেন এবং দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে কর্মজীবনের শুরু
১৯৪০: চট্টগ্রাম কোর্টের আইনজীবি হিসেবে অনুশীলন শুরু করলেও শিক্ষকতাই ছিলো তার পেশা।
১৯৪০-১৯৪৬: বঙ্গীয় প্রাদেশিক নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং ১৯৪৬ সালে কংগ্রেসের চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক
১৯৪০: চট্টগ্রাম কোর্টের আইনজীবি কিরণ দাশের মেয়ে বিভা দাসকে বিয়ে করেন
১৯৫৪: পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের এমএলএ (১৯৫৪ পর্যন্ত)
২০১০: শততম জন্মদিনে তার জীবনীগ্রন্থ “অগ্নিঝড়া দিনগুলো” প্রকাশিত হয়।
২০১১: স্বাধীনতা পদক (সাল নিয়ে সন্দেহ আছে)
২০১৩: মৃত্যু (১০ এপ্রিল), কলকাতা ফর্টিস হাসপাতাল

সূত্র: দ্য ডেইলি স্টারসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম।

তানিয়াদের সকাল: নারীর জন্য কি কাজ আছে?

স্বামীকে বিদায় জানিয়ে দরজাটি বন্ধ করার পর মুহূর্তেই অভিমান আর বিষণ্নতায় পেয়ে বসলো তানিয়াকে। তানিয়া আহমেদ। সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট। স্বামী পারভেজ আহমেদ। ব্যাংকার। একমাত্র সন্তানকে নিয়ে নিউক্লিয়াস পরিবার – সঙ্গে ভাইবোন মাবাবা কেউ নেই। সকলেই গ্রামে বা অন্য শহরে।

পৌরফোনে তানিয়ার চাকরির দশ বছর পূর্ণ হলো আজ। সহকর্মীরা আজ তাকে নিয়ে কী কী করতো, কে কী ভাষায় অভিনন্দন জানাতো তা-ই ভাবছেন তানিয়া, আর বাসন মাঝছেন। জানালায় আকাশ দেখছেন আনমনে। কতকিছুই না মনে পড়ছে তার আজ! পৌরফোনে চাকরিটা হবে যখন বুঝতে পারলেন, তখন থেকেই তিনি বুঝতে পারলেন যে চাকরিটা তার করা হবে না। চাকুরির ইন্টারভিউতে নিয়োগকারীই সাধারণত প্রশ্ন করে, শর্ত দেয় – তানিয়ার বেলায় ছিলো তার উল্টো। ছুটি হবে কি না, মা হতে পারবেন কিনা, যাতায়াতের জন্য ট্রান্সপোর্ট হবে কি না ইত্যাদি। প্রশ্নকারীরা বিস্মিত হলেও উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলেন, কারণ তানিয়ার স্পষ্টবাদিতা তাদের পছন্দ হয়েছিলো। তারা মজাই পাচ্ছিলেন। বেতন ভাতা ইনক্রিমেন্ট প্রমোশন ইত্যাদি বিষয়ে কোন আগ্রহই নেই তানিয়ার। তার আগ্রহ ছিলো কাজটি কেমন হবে, সেটা করতে পারবেন কিনা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিলো অফিস তার যাতায়াতের ব্যবস্থা করবে কি না। খুশিতে কাঁদতেছিলেন তানিয়া ইন্টারভিউ রুমেই। কারণ চাকরিটা তার হয়েই গেলো এবং তা তখনকার বাজারে বেশ মোটা-বেতনের চাকরিই বলা যায়। স্বামী তো খুশি এবং বিস্মিতও; যেন এই প্রথম পারভেজ বুঝতে পারলেন যে স্ত্রীরা স্বামীর চেয়ে বেশি বেতন পেলে সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। চাকরি করার আনন্দ আর না করতে পারার আশংকায় হাবুডুবু তানিয়া বেতনের পরিমাণ নিয়ে কখনও ভাবেন নি।

আজ দশম বছরে তানিয়াকে জানালায় তাকিয়ে কাঁদতে হচ্ছে। চাকরিটা আছে বলেই হয়তো তানিয়াকে কাঁদতে হচ্ছে। অথচ প্রতিবারই তানিয়া অফিস থেকে একটি লাল চিঠির আশংকা করেন। এভাবে কতদিন সে অফিসকে ঠকাবে? এভাবে কতদিন শুনতে হবে মেয়েরা ফাঁকিবাজ, যখনতখন অফিসে অনুপস্থিত থাকে? সিনিয়র সহকর্মীরা তাকে বড্ড ভালোবাসে, তাকে বুঝার চেষ্টা করে এবং সহমর্মীতা দেখায়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সমপর্যায়ের সহকর্মীদের নিয়ে, যাদের নিয়োগ হয়েছে তারই সময়ে, তারা টিজিং করেই যাচ্ছে।

অমিতের জন্মের পর নির্ধারিত মাতৃ-ছুটির পরও তানিয়াকে একমাস বেশি ছুটি নিতে হয়েছিলো। এক সহকর্মী তো বলেই ফেললো, “বাব্বা! এতদিন পরও চাকরি থাকে! পরজনমে যেন নারী হয়ে জন্ম নেই, খোদার কাছে আমার এই প্রার্থনা!”

আরেক সহকর্মী তার চিরাচরিত শার্লকহোমস-টাইপের প্রশ্ন নিয়ে সেদিন চায়ের আড্ডাটিকে মাটি করে দিয়েছিলো। “আচ্ছা, এত অনুপস্থিত থাকার পরও আপনি এবার প্রমোশন পেলেন কী করে? বসও তো আপনাকে নিয়ে কোন কটুকথা বলতে শুনি নি!” তানিয়া এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে চান না। ছেলেরা ভালো করলে কোন প্রশ্ন নেই, সেটা স্বাভাবিকভাবে সকলে মেনে নেয়, কিন্তু মেয়েরা কর্মস্থলে সুনাম অর্জন করলে সকলেই সন্দেহের চোখে তাকায়। প্রতিষ্ঠানের জন্য এতো পরিশ্রম করেও তাকে নিরন্তর এরকম অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।

হঠাৎ অমিতের ‘আম্মু’ ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেলেন তানিয়া। অমিত ঘুম থেকে ওঠেছে। বাবার ভক্ত হলেও অমিত আজ মাকে বাসায় পেয়ে বেজায় খুশি। “জাহানারা খালা আসে নি কেন, আম্মু?” তানিয়া তার কী উত্তর দেবে? জাহানারা আসে বেড়িবাঁধের বস্তি থেকে। বিধবা জাহানারা গত দু’তিন মাস ধরে তানিয়াদেরকে সাহায্য করছে। তার প্রধান কাজ অমিতকে দেখাশুনা করা। ঠিক গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলো যে কীভাবে জাহানারা টের পেয়ে যায় সেটা তানিয়া আজও বুঝতে পারেন নি। যেদিন তানিয়ার অফিসে থাকার খুবই দরকার, ঠিক সেদিন জাহানারা আসে না! “আম্মু আম্মু, আবার যদি খালা না আসে তাহলে আব্বুকে বলো আমার সাথে থাকতে।” তা কী করে হয়! জাহানারা না আসলে তো তানিয়াকেই বাসায় থাকতে হবে। এই তো স্বাভাবিক। অমিতকে বুকে জড়িয়ে তানিয়া আরেকটি দিন অফিসের কথা ভুলে যাবার চেষ্টা করেন।

নারীর কথা: কেনো আমি একটি কর্মজীবন পাবো না?

আমি অনেকবার ভেবেছি জবটি করবো কি করবো না। অগণিত চাকরির প্রস্তাব আমি ফিরিয়ে দিয়েছি বিভিন্ন সামাজিক পারিবারিক ও যোগাযোগ সমস্যার কারণে। বর্তমান প্রস্তাবটি সব দিক দিয়ে উপযুক্ত মনে হচ্ছে। এটি আমার যোগ্যতা ও ব্যক্তিগত জীবন-দর্শনের সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। সকল বিবেচনায় একটি উপযুক্ত চাকরি হওয়া সত্ত্বেও চাকরিটি আমি করবো কিনা, সে সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না।

চাকরি করার পথে অনেকগুলো বাধার মধ্যে বড় দুটি বাধা হলো আমার মা হওয়া এবং আমার স্ত্রী হওয়া। আমি মা হতে চলেছি আগামি আট-ন’মাসের মধ্যে। প্রথমটি নিয়ে চিন্তিত নই, কারণ যে প্রতিষ্ঠানে যোগ দিবো, সেখানে মাতৃত্বকালীন ছুটি পাওয়া যাবে। তারপর একটি কাজের মানুষ যোগাড় করে নেবো। দ্বিতীয় বিষয়, আমার স্ত্রী হওয়ার বিষয়টিতে যে কেউ আঁতকে ওঠতে পারেন। তবে কি স্ত্রী হওয়া নারীর জন্য অস্বাভাবিক কিছু? না, তা মোটেই নয়। আমি মূলত আমার স্বামীর বিষয়টি মনে নিয়েই এ কথা বলেছি।

আমার স্বামীর কথা বলি। আমরা ভালোবেসে বিয়ে করেছি। তার যে বিষয়টিতে আমি বেশি দুর্বল ছিলাম, তা হলো নারীর প্রতি তার অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভক্তি। আমার স্বামী খুব মাতৃভক্ত মানুষ, এখনও বাড়িতে গেলে মায়ের হাতে ভাত খায়। নারী ঘর থেকে বের হয়ে কাজ করুক এবং দেশের কর্মশক্তিতে যোগ দিক এরকম মনোভাব সে সবসময়ই প্রকাশ করতো। রাস্তা-ঘাটে নারীর চলাচলে সামাজিক বাধা, পাবলিক বাহনে তাদের যাতায়াতের সমস্যা ইত্যাদি বিষয়ে আমার স্বামী সবসময়ই সোচ্চার।

এখনও তার মনোভাবের কোন পরিবর্তন দেখি না। কিন্তু আমার চাকরি করার বিষয়টি ওঠে আসাতে তাকে একদম নিশ্চুপ এবং নিরাবেগ দেখছি। এখন পর্যন্ত হ্যাঁ বা না কিছু পরিষ্কার করে বলছে না। “চাকরিটি কি করবো” এরকম প্রশ্নের জবাবে তার “হ্যাঁ, করো না!” জবাবে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না তার মনের কথাটি আসলে কী? এমনও নয় যে আমি তার বিশ্বাস ভঙ্গ করবো, কারণ নিজের সততায় আমার আত্মবিশ্বাস আছে। আমার স্বামীরও ওরকম আশঙ্কা আছে বলে মনে করি না।

সবমিলিয়ে এক কঠিন সময় অতিক্রম করছি আমি এখন। শুধুই চাকরি করবো বলে পড়াশুনা করি নি, কিন্তু শুধুই গৃহিনী হয়ে কিচেন মাস্টার হয়ে জীবন শেষ করবো – এরকম চিন্তাও করি নি। অন্যদিকে আমার স্বামীকেও আমি ভালোবাসি এবং আমি চাই সে ভালো থাকুক এবং তার কর্মজীবন গড়ে ওঠুক। এপর্যন্ত তার ক্যারিয়ারে বাধা সৃষ্টি করে এরকম কিছুই করি নি,বরং তাকে দিনের কাজের জন্য প্রস্তুত করতে যা-কিছু করণীয় সবই করে যাচ্ছি, যার বিবরণ এখানে শেষ করা যাবে না। আমি একজন সফল গৃহিনী থাকতে চাই, তাই বলে কি আমি একটি কর্মজীবন পাবো না?

ম্যাকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’ থেকে: পড়ুন নিজ দায়িত্বে!

prince-cover

ম্যাকিয়াভেলি সম্পর্কে প্রথমে পড়েছিলাম ছাত্রজীবনে। পড়ে থমকে গিয়েছিলাম, **য় বলে কী! মানুষ জন্মগতভাবেই নাকি শঠ, প্রতারক আর বিশৃঙ্খল – ডাণ্ডা ছাড়া ঠাণ্ডা থাকে না। ইতিহাস নাকি শুধুই বিজয়ীদের সৃষ্টি। ধার্মিকতার চেয়ে ভাণ ধরে থাকা নাকি অধিক গুরুত্বপূর্ণ! কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছিল সেখান থেকেই। দ্য প্রিন্স-খ্যাত ম্যাকিয়াভেলিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক বলা হয় এত বিতর্কিত কথা বলার পরও। কিন্তু কোথায় পাওয়া যাবে তার সেই কালজয়ী বই, দ্য প্রিন্স? পড়তেই হবে আমাকে, দেখতে হবে আরও কী আছে তাতে।

নৈতিকতার সাথে শাসনের কর্তৃত্ব ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শাসন তিনিই করবেন যিনি নিজে সৎ। দেশ শাসন করতে গেলে নীতিবান হতে হবে, সৎ হতে হবে। প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের সাথে থাকতে হবে মিল। এটা অত্যন্ত প্রচলিত একটি বিশ্বাস যে, সততা ও নৈতিকতা দিয়েই জনসাধারণের শ্রদ্ধা ও আনুগত্য আদায় করা যায়।

ম্যাকিয়াভেলি ঠিক এবিষয়টিতেই সজোরে আঘাত করেছেন তার দ্য প্রিন্স গ্রন্থের মাধ্যমে। নিজ দেশের শাসককে দেশ চালানোর জন্য সাদামাটা কিছু প্রায়োগিক জ্ঞান দেয়াই ছিল দ্য প্রিন্স-এর মূল উদ্দেশ্য, সাহিত্যচর্চা নয়। তার মতে শাসনক্ষমতার বৈধতা কোন নৈতিকতার মাপকাঠিতে আবদ্ধ নয়; কর্তৃত্ব আর ক্ষমতাই এখানে মূল বিষয়। যার ক্ষমতা আছে সে-ই শাসন করবে, নৈতিকতা কাউকে ক্ষমতায় বসায় না। সততা ও নৈতিকতার সম্পূর্ণ বিপরীতমুখে বসে ম্যাকিয়াভেলি বলছেন যে, ক্ষমতা অর্জন আর ক্ষমতা রক্ষা করাই রাজনীতির মূল নীতি। ক্ষমতার উপযুক্ত ব্যবহার দিয়েই জনগণের আনুগত্য অর্জন করতে হয়। রাজনীতি মানেই হলো ক্ষমতা ‘গ্রহণ আর প্রয়োগের’ নীতি। শাসকের প্রতি জনগণের ভালবাসা এবং জনগণের ভয় দুটোই থাকতে হবে। যদি দুটোই না থাকে সেক্ষেত্রে ভয়টি অন্তত থাকতে হবে। দেশের আইনশৃঙ্খলা বলতে বুঝাবে উপযুক্ত সংখ্যক সৈন্য বা আইনপ্রয়োগকারীর উপস্থিতি। নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ছাড়া শাসনের অধিকারের কোনই মূল্য নেই ম্যাকিয়াভেলির কাছে।

ম্যাকিয়াভেলি তার রাজনৈতিক মতাদর্শ থেকে অধিকার এবং বৈধতার ব্যাপারগুলো সম্পূর্ণ মুছে ফেলেন। আইন এবং শক্তি তার পরিবেশনায় একাকার হয়ে যায়। তিনি বলেন, “যেহেতু উত্তম অস্ত্র ছাড়া উত্তম আইন প্রতিষ্ঠিত হয় না, তাই অস্ত্র ছাড়া অন্য কোন কিছুকেই আমি বিবেচনায় আনবো না।” ম্যাকিয়াভেলির মতে, চরম ক্ষমতাশালী শাসককে জনগণ সর্বান্তকরণে মান্য করতে বাধ্য।
ম্যাকিয়াভেলিয়ান শাসকের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য থাকে:

১) ভয় বা ভালবাসা সৃষ্টিকারী তবে ঘৃণিত হবেন না;

২) জনগণের সমর্থন থাকবে;

৩) ব্যক্তিগত গুণাবলীর প্রকাশ থাকবে;

৪) অস্ত্র অর্থাৎ শক্তির প্রয়োগ থাকবে এবং

৫) বুদ্ধিমত্তা থাকবে।

 

ব্যক্তিগত গুণের বিষয়ে একটি দামি কথা বলেছেন তিনি: গুণ থাকার চেয়ে গুণের ভাণ করা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ! বুদ্ধিমত্তারও একটি আলাদা সংজ্ঞা আছে তার কাছে: জনগণের মনে ভয় এবং ভালবাসা জাগানোর মধ্যে উত্তম ভারসাম্য রক্ষা করতে পারাই হলো বুদ্ধিমত্তা।

 

নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি, ১৪৬৯ থেকে ১৫২৭ খ্রিস্টাব্দ। পুরো নাম নিকোলো ডি বারনার্ডো ডেই ম্যাকিয়াভেলি। ইটালিয়ান ইতিহাসবিদ, কূটনৈতিক, দার্শনিক এবং রেনেসাঁ যুগের লেখক। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক এবং ফ্লোরেন্স-ভিত্তিক এক মধ্যযুগীয় কূটনীতিক। রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়েছেন আর রাজনীতি নিয়ে যারা ঘাটাঘাটি করেন, তারা হয়তো ম্যাকিয়াভেলির নাম প্রতিদিনই জপেন। নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি লিখিত গ্রন্থগুলো হলো: দ্য প্রিন্স, ফ্লোরেনটাইন হিস্টরিজ, দ্য ডিসকোর্স, দ্য আর্ট অভ ওয়ার এবং মান্দ্রাগোলা। এগুলোর মধ্যে দ্য প্রিন্স-এর জন্যই তিনি আজ আমাদের কাছে স্মরণীয় এবং উল্লেখযোগ্য। পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত আর সমালোচিত এ বইটি লেখা হয়েছিল ১৫১৪ সালে কিন্তু প্রকাশ পেয়েছিল ১৫৩২ সালে, তার মৃত্যুর পর। ডাব্লিউ কে ম্যারিয়ট কর্তৃক ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে দ্য প্রিন্স প্রকাশিত হয় ১৯০৮ সালে।

দ্য প্রিন্স লেখা হয়েছিল অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে এবং ম্যাকিয়াভেলির কর্মজীবনে পুনর্বাসনের প্রচেষ্টা হিসেবে। বিখ্যাত হবার জন্য নয়, ক্ষমতাসীন রাজা মেডিসি’র দয়াদৃষ্টি লাভের জন্য রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টিতে ভরপুর এ গ্রন্থটি লেখা হয়েছিল। মূলত ম্যাকিয়াভেলি ছিলেন মেডিসি প্রশাসনের বিপক্ষে এবং এজন্য মেডিসি’র ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পর নির্যাতনটাও সহ্য করতে হয়েছিল ম্যাকিয়াভেলিকে সেরকমই। দেওয়া হয়েছিল বাধ্যতামূলক অবসর। এ অবসরে থেকেই জন্ম নেন লেখক ম্যাকিয়াভেলি।

 

নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি’র দ্য প্রিন্স থেকে কিছু উল্লেখযোগ্য উদ্ধৃতি:

শুধুই তুলনা ও বিশ্লেষণের জন্য উদ্ধৃতিগুলো উপস্থাপন করা হলো। এর কিছু কিছু অত্যন্ত আপত্তিজনক এবং লৌমহর্ষক, তবে অধিকাংশ কথাই কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক এবং ব্যক্তি জীবনে বিবেচনার দাবী রাখে।

১) আপনার উপস্থিতি সকলেই দেখতে পায়, আপনি আসলে কেমন, তা মাত্র কয়েকজনে বুঝে।

২) যদি কাউকে আঘাত করতেই হয়, তা এমন তীব্র করা উচিত যাতে তার প্রতিশোধপরায়নতাকে আর ভয় পেতে না হয়।

৩) বিপদের মুখোমুখী না হয়ে মহৎ কিছুই অর্জিত হয় নি।

৪) *ভালবাসার কারণ না হয়ে ভয়ের কারণ হওয়াই অধিক নিরাপদ কারণ ভালবাসার সাথে দায়বদ্ধতার সম্পর্ক আছে; মানুষের সংকীর্ণতার কারণে তা সুযোগ পেলেই লঙ্ঘিত হতে পারে। কিন্তু আপনাকে ভয় পেলে শাস্তির ভয়ে তারা তা লঙ্ঘন করতে পারে না।

৫) সত্যি কথাটি বললে যে আপনি অপমানিত হবেন না, একথাটি না জানানো পর্যন্ত মানষের তোষামোদ আপনি থামাতে পারবেন না।

৬) সকল পথই বিপদজনক, তাই বিপদকে এড়িয়ে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়, বিপদকে হিসেব করে সুদৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ভুল করে উচ্চাকাঙক্ষা করুন, ভুল করে আলসেমি করবেন না। সাহসী কাজ করার জন্য শক্তি সঞ্চয় করুন, কষ্টভোগ করার জন্য শক্তির দরকার নেই।

৭) মানুষ প্রধানত দু’টি তাড়নায় পরিচালিত হয়: ভালবাসা অথবা ভয়।

৮) মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে এতই সহজ এবং তাদের তাৎক্ষণিক চাহিদা দ্বারা এতই নিয়ন্ত্রিত যে, একজন প্রতারকের জন্য ঠকাবার লোকের অভাব হয় না।

৯) সিংহ ফাঁদ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে না এবং শেয়াল পারে না নেকড়ে থেকে নিজেকে নিরাপদে রাখতে। তাই আপনাকে শেয়াল হতে হবে যাতে ফাঁদ চিনতে পারেন, আর সিংহ হতে হবে যাতে নেকড়ে তাড়াতে পারেন।

১০) *যেহেতু ভয় আর ভালবাসা একসাথে থাকতে পারে না, আমাদেরকে অবশ্যই যেকোন একটি বেছে নিতে হয়। ভালবাসার পাত্র হওয়ার চেয়ে ভয়ের পাত্র হওয়াই অধিক নিরাপদ।

১১) ফলই উপায়কে বিচার করে।

১২) যে প্রতারণা করতে চায়, সে প্রায়ই এমন কাউকে পাবে যে প্রতারিত হতে চায় ।

১৩) ইচ্ছা যদি বড় হয়, তাহলে প্রতিবন্ধকতা বড় থাকতে পারে না।

১৪) *মানুষকে হয় আদর করা উচিত, নয়তো পিষে মারা উচিত। ছোটখাটো আঘাত করতে পরিশোধ নেবার সুযোগ নেবে, কিন্তু যদি তাকে সম্পূর্ণ অচল করে দেন তাহলে তাদের আর কিছুই করার থাকে না।

১৫) মানুষ সাধারণত ছুঁয়ে নয় দেখেই বিচার করতে চায়। এর কারণ হলো, সকলেই দেখতে পারে, কিন্তু খুব কম লোকই স্পর্শ করে অনুভব করতে পারে।

১৬) এটা মনে রাখতে হবে যে, একটি নতুন পদ্ধতি পরিকল্পনা করার মতো কঠিন কিছুই হতে পারে না; একটি নতুন পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি সন্দেহজনক এবং একটি নতুন পদ্ধতিকে পরিচালনা দেবার চেয়েও কঠিন কিছু হতে পারে না। এর কারণ হলো, একজন অগ্রগামী উদ্যোক্তাকে রক্ষণশীলদের বৈরিতার মুখে পড়তে হয় যারা পুরাতন পদ্ধতির সুবিধাভোগী। নতুন পদ্ধতির সুবিধা প্রত্যাশী বা সমর্থনকারীর সম্ভাবনা বিরল।

১৭) ধারাবাহিকভাবে সফলতা পেতে চাইলে সময়ের সাথে আচরণ পরিবর্তন করতে হবে।
১৮) মানুষ কীভাবে জীবনধারণ করে আর কীভাবে করা উচিত – তাতে এতই ব্যবধান যে, কেউ যদি কী হচ্ছে সেটা নিয়ে অনুসন্ধান না করে, কী হওয়া উচিত সেটা নিয়ে অনুসন্ধান করে, তাহলে তার এই শিক্ষা তাকে রক্ষা না করে তাকে ধ্বংস করে।

১৯) যেমন খুশি তেমনই সাজো।

২০) *ধার্মিকতা দেখানোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নেই।

২১) ইতিহাস লেখা হয় বিজয়ীদের দ্বারা।

২২) বুদ্ধিমানদের উচিত মহান ব্যক্তিদের পথ অনুসরণ করা এবং তাদেরকে অনুসরণ যারা উৎকর্ষ অর্জন করেছেন। এতে তাদের মহত্বটুকু না পেলেও কোনভাবে তার কিছু অংশ পাওয়া যায়।

২৩) ভালবাসা এবং ভয় দুটিই পাওয়া উত্তম। তবে দুটিই একসাথে না পেলে মানুষের ভয় পাওয়াটাই অধিকতর ভাল।

২৪) *একজন শাসকের বুদ্ধির পরিমাপ করার প্রথম পদ্ধতিটি হলো: তাঁর চারপাশের লোকগুলোর দিকে দৃষ্টি দেওয়া।

২৫) প্রয়োজনের তাগিদ না পেলে মানুষ ভাল কাজ করে না। সুযোগ পেলে তারা যা খুশি তা-ই করে, তাতে বিশৃঙ্খলা আর বিভ্রান্তি নিয়ে আসে।

২৬) যুদ্ধ, এর আকার আর উপাদান ছাড়া একজন রাষ্ট্রনায়কের আর কোন বস্তু বা চিন্তা থাকা উচিত নয়। একজন শাসকের জন্য এটিই উপযুক্ত শিল্পকলা।

২৭) *যুদ্ধ এড়ানোর কোন সুযোগ নেই। তবে স্থগিত করা যায় এবং এর সুবিধা পাবে আপনার শত্রু।

২৮) প্রত্যেকেই ‘কী হওয়া উচিত’ বুঝার জন্য ‘কী হয়েছে’ নিয়ে অনুসন্ধান করা উচিত। পৃথিবীর সকল যুগে সংঘটিত বিষয়ের প্রাচীন নিদর্শন রয়েছে।

 

২৯) মানুষ সম্পর্কে সাধারণভাবে এটা বলা যায়: তারা অকৃতজ্ঞ, অবাধ্য, অসৎ এবং শঠ; বিপদে আতঙ্কিত এবং লাভের প্রত্যাশী। প্রেমের বাধ্যকতা এই ঘৃণ্য প্রাণীরা সুযোগ পেলেই ভেঙ্গে ফেলে, কিন্তু শাস্তির ভয় তাদেরকে শৃঙ্খলায় বেধে রাখে।

মানুষ, সমাজ এবং রাষ্ট্রনীতি নিয়ে ম্যাকিয়াভেলি’র চিন্তাচেতনা এতই প্রতিক্রিয়াশীল যে, তা পড়ার পর আমি বগিচ্যুত হবার যোগার। পরে আমাকে আবার মহাত্মা গান্ধী ও গৌতম বুদ্ধ পড়তে হয়েছিল। বিশেষত *তারকাচিহ্নিত বক্তব্যগুলোর ব্যাপারে পাঠককে সংবিধিবদ্ধ সতর্কিকরণ করছি: এগুলো অনুসরণ করলে আপনি ভয়ংকর প্রাণীতে অধঃপাতিত হবার উজ্জ্বল সম্ভাবনা আছে!

 

যা-ই হোক, আমাদের দেশের হরতাল-অবরোধে পুলিশের লাঠিচার্জে বিরোধীদল কেন ম্যাকিয়াভেলি’র নাম করে সরকারকে সমালোচনা করে, এখন বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে গেলো। ম্যাকিয়াভেলিয়ান, মধ্যযুগীয় আর লৌমহর্ষক – শব্দগুলো প্রায় একই অর্থে ব্যবহৃত হয়, কারণ ওই সময়ে প্রেম জাগানোর চেয়ে ভয় জাগানোই ছিল অধিকতর নিরাপদ। খেয়াল রাখতে হবে আমরা কিন্তু মধ্যযুগে নেই আর!

 

 


পঠনতালিকা:
Atkinson, J.B. and D. Sices (eds.), 1996, Machiavelli and His Friends: Their Personal Coorespondence, DeKalb: Northeastern Illinois University Press.
Machiavelli, N., 1965, The Chief Works and Others, A. Gilbert (trans.), 3 vols., Durham: Duke University Press.
Machiavelli, N., 1988, The Prince, Q. Skinner and R. Price (eds.), Cambridge: Cambridge University Press.