Category: প্রিয় সমাজ

অনলাইন জীবন কি প্রাত্যাহিক জীবনকে বাধাগ্রস্ত করছে? চলুন খুঁজে দেখি!

work_home_play_sleep_cartoon_this_modern_life_

 

আমার ব্লগার বন্ধুটি তার কাজ বদলানোর পর আর ব্লগিং করেন না। ফেইসবুকেও খুব একটা দেখা যায় না। অনেক সহপাঠি তাকে খুঁজেন অনলাইনে। বেশ ভালোই লেখতেন। আমি একটু বিস্মিতই হলাম, কারণ তার একটি পাঠকবলয় গড়ে ওঠেছিল, যা হয়তো অনেকে ঈর্ষা করবে।

একদিন মুখোমুখি আড্ডায় অনেক কারণ জানালেন তিনি। তার বর্তমান কাজটি এরকম যে, কম্পুতে বসে অন্যকিছু করার সুযোগ হয় না; ব্লগিংয়ের প্রশ্নই আসে না। কম্পুতে বসলেও নির্দিষ্ট কিছু কাজ থাকে তার সামনে। তাছাড়া অফিসের নৈমিত্তিক ব্যস্ততায়, ব্যক্তিগতভাবে কম্পুতে কিছু করা অস্বস্তিকর। তবে তিনি আত্মস্বীকার করে জানালেন যে, শারীরিকভাবে তিনি অনেক সুস্থ এবং হালকা অনুভব করেন আজকাল। তার পূর্বের কাজে বেশি বসে থাকার কারণে ‘মোটিয়ে’ গিয়েছিলেন এবং বেশকিছু রোগ-ব্যামারও বাধিয়ে ফেলেছিলেন। এসব নিয়ে তার স্ত্রীর সাথে বচসা লেগেই থাকতো। এবার তার সাংসারিক জীবনও আগের চেয়ে ভালো। সম্প্রতি তিনি জানালেন যে, ব্লগিং ভুলে যান নি, ভোলার নয়। বরং প্রাত্যাহিক জীবনে ব্লগিংয়ের সামাজিকতাকে প্রয়োগ করছেন এবং অনিয়মিতভাবে লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছেন, যা হয়তো বই আকারে বের হতে পারে।

এবার একজন প্রাক্তন সহকর্মীকে নিয়ে একটি বেদনাদায়ক ঘটনা বলছি। আমরা একসাথে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে গেলে, তিনি একটি সংবাদ মাধ্যমে গিয়ে যোগদান করেন। তার মুখেই বলা এই কাহিনি। আমি ছাড়া হয়তো আর কেউ জানে না। তাদের অফিসে এক সময় সকলেই ফেইসবুক টুইটার ইত্যাদি ব্যবহার করতো এবং ‘লাইক-শেয়ারিং’ ইত্যাদি নিয়ে অনেক মজাও হতো চা’য়ের আড্ডায়। তাদের সিনিয়র কর্মকর্তাও এসবের বাইরে ছিলেন না। একটি সংবাদ মাধ্যম হিসেবে কাজের ফাঁকে একটু আড্ডার প্রয়োজন থাকতেই পারে। কিন্তু অবাধে ফেইসবুক ও অন্যান্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের বিষয়টি অধিকতর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে আসে। তারা দেখলেন অথবা ধারণা করলেন যে, এতে অফিসের স্বাভাবিক পরিবেশ এবং গতিশীলতা ভিন্নদিকে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে তাদের সিনিয়র ব্যবস্থাপক ঘোষণা দিয়েই অফিসে ফেইসবুক বা এরকম মাধ্যমগুলোর ব্যবহার নিষেধ করে দেন। নিষেধাজ্ঞা জারির কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে সতর্ক করতে হলো, কারণ পুরোনো অভ্যাস অনেকেই হঠাৎ ছাড়তে পারে নি! মাসখানেক পর শাস্তিসহ পুনঃসতর্কবার্তা জারি হলো! এরই মধ্যে সেই সিনিয়রের একটি পোস্টে ‘লাইক’ দিয়ে আমার সহকর্মী বন্ধুটি অফিস কর্তৃপক্ষকে বিশাল অস্বস্তিতে ফেলে দেন। ‘লাইক’ দেবার সময়টি ছিল অফিস টাইমের মধ্যে! যা হোক, ঘোষিত শাস্তি মোতাবেক, তাকে শোকজসহ বরখাস্ত করতে হয়। কিন্তু তার মতো একজন কর্মীকে তারা হারাতেও চাচ্ছেন না। কর্তৃপক্ষ একটি ফ্রেন্ডলি মিটিংয়ে তাকে প্রশ্ন করে, তিনি এখন কী করতে চান। হয়তো তারা চেয়েছিলেন ক্ষমা করে দিতে! আমার সহকর্মী বন্ধুটি একটু নাকউঁচু টাইপের: ভাঙবে কিন্তু মচকাবে না! তিনি পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন। বিষয়টি আক্ষেপজনক হলেও ওখানেই শেষ হয়। কিন্তু চরম একটি শিক্ষা হলো সংশ্লিষ্টদের। ব্যাপারটি এরকম দাঁড়ালো যে, ফেইসবুক ব্যবহার করার কারণে তার চাকরিটিই থাকলো না।

আরেকজন সেলিব্রেটি ফেইসবুকারের গল্প বলছি, যার অগণিত বন্ধু এবং চার হাজারের ওপরে অনুসারি আছে ফেইসবুকে। তিনি মূলত ব্লগ থেকেই ‘সেলিব্রেটি নবুয়ত’ পেয়েছেন, যদিও তখনও তিনি এইচএসসিও পাশ করেন নি। সিরিয়াস লেখক বা কবি বা গল্পকার নন। ফান পোস্ট আর চলমান বিষয় নিয়ে রসাত্মক লেখায় পাঠককে জমিয়ে রাখতেন। এসবের পাঠক বেশি! ক্রমান্বয়ে বিশাল একটি ভক্ত সম্প্রদায় গড়ে ওঠে তার। টিনেজ পেরোনো ছেলেমেয়েদের জন্য এটি কিন্তু বিশাল প্রাপ্তি! স্বপ্নের মতো বিশাল! বলা যায়, তিনি রীতিমতো খ্যাতির মগডালে ওঠেছিলেন। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে যে, এটি শুধুই ভার্চুয়াল স্পেইস। একে বাস্তব জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির সাথে না মেশাতে পারলে অর্থহীন সময় ক্ষেপন মাত্র। বাস্তবিক সমাজে টিকে থাকার মতো যদি কিছু না থাকে, তবে শুধুই আকাশে বসত করে একে টিকিয়ে রাখা কঠিন। বাস্তব জীবনের বন্ধুরাই মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়, অন্যদিকে ভার্চুয়াল বন্ধুরা শুধু মাত্র ‘রেস্ট ইন পিস’ অথবা একটি ‘লাইক’ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করে। অসম্ভব রকমের প্রচার ও সুখ্যাতি থাকলে এবং বাস্তবের সাথে তার যোগসূত্র থাকলে, এক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম আসতে পারে।

পরবর্তি ঘটনা যা হোক, সেই সেলিব্রেটিকে আর দেখা যাচ্ছে না! এই প্রস্থান হঠাৎ হয় নি। গত ৩/৪ বছরকে তার ‘উইথড্রয়াল পিরিয়ড’ বলা যায়। মানে হলো, পরিবারের চাপে আর পরীক্ষার নৈকট্যে, যেভাবেই হোক তার চেতনা হয় এবং ভার্চুয়াল জগৎ থেকে বাস্তবিক জগতে ফিরে যান। হয়তো উচ্চতর পড়াশোনা করছেন, নয়তো চাকরিতে প্রবেশ করেছেন। আমার বন্ধু তালিকা থেকেও উধাও; বোধ হয় ফেইসবুক পরিচয়টিকেও নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছেন! অথবা, কে জানে, হয়তো ভিন্ন নামে আছেন!

আড্ডাবাজিতে আমার একটু দুর্বলতা থাকায়, এর কুফলটুকু আমি বুঝার চেষ্টা করছি। ব্লগিং যখন ‘আড্ডাফায়িং’ পর্যায়ে চলে যায়, তখন কীভাবে যে সময় চলে যায় বুঝা যায় না। সেটি নিজের এবং প্রতিষ্ঠানের উভয়ের ক্ষতি। প্রতিটি চাকরিজীবি মানুষের দিবাকালীন আটটি ঘণ্টা আর্থিক মানদণ্ডে সুনির্দিষ্ট করা আছে। এর প্রতিটি ঘণ্টার আছে আর্থিক মূল্য। কাজ থাকুক অথবা না থাকুক, সময়টি প্রতিষ্ঠানের। প্রতিষ্ঠানের পক্ষে-বলা মানুষ খুবই কম, তাই গায়েপড়ে কেউ সতর্ক নাও করতে পারে। এখানে বিবেকই একমাত্র নির্দেশিকা। তাই অফিসে বসে সামাজিক যোগাযোগে কতটা সময় দেওয়া যায়, কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, এবং কতটুকু দিলে সেটি উপেক্ষা করার মতো, সেটি নিজের বিবেক দ্বারাই বিচার করা যায়।

ব্যক্তিগত সময়কেও (যেমন ছুটির দিন অথবা দিনের বাকি সময়) উদারভাবে ভার্চুয়াল সমাজে না দিয়ে কিছু সময় পরিবার, বন্ধু ও নিকাটাত্মীয়কে দেওয়া উচিত। এখন সময় এসেছে হাল টেনে ধরার। বিষয়টি নেশার পর্যায়ে চলে গেছে এবং কিছু কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ইতিমধ্যেই সংবাদমাধ্যমে আসতে শুরু করেছে।

ব্লগার/ফেইসবুকারদেরকে আলোচনার স্বার্থে কয়েকটি ভাগে যদি ভাগ করি, তবে নিজেদের অবস্থান বুঝতে পারবো।

▲ভার্চুয়াল মানব ১:

ব্লগ, ফেইসবুক, টুইটার, স্কাইপ, ফ্লিকার… প্রায় সব জায়গায় তার বিচরণ। একটি থেকে আরেকটি মাধ্যমে তিনি প্রায় ১৮ ঘণ্টা এপার-ওপার করেন। তাদের মধ্যে কারও কারও প্রাসঙ্গিক প্রযুক্তিবিদ্যা থাকার কারণে, ইন্টারনেটে থাকাটা মোটামুটি ‘ছোয়াবের বিষয়’ বলে ধরে নিয়েছেন। কারও আছে নিজস্ব ব্লগ, ওয়েবপোর্টাল বা সংবাদমাধ্যম। কেউ আবার অনলাইন সংবাদমাধ্যমে চাকরি করেন। তাদের মধ্যে একদল আছেন যারা চাকুরিসূত্রে অনলাইনে লটকে থাকেন, আরেকদল নেশা ও অপরিণামদর্শীতার কারণে।

▲ভার্চুয়াল মানব ২:

এদের অধিকাংশই একটি উদ্দেশ্য নিয়ে অনলাইনে সময় দেন। ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুম আসা পর্যন্ত তারা অনলাইনেই থাকতে চান, তবে কাজের চাপে সেটি পারেন না। ফলে সেটি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি এবং প্রাত্যাহিক জীবন ও সুস্বাস্থ্যের পরিপন্থী।

▲ভার্চুয়াল মানব ৩:

এই দলটি পেশাজীবী। সময় পেলে সর্বান্তকরণে অনলাইনে থাকেন। ব্লগে অথবা সামাজিক মাধ্যমে। সহপাঠিদের সাথে আড্ডা দেন, নিজেদের জীবনের ঘটনাগুলোকে শেয়ার করেন। স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি নয়। কারণ তাছাড়াও তাদের অনেক আগ্রহের বিষয় আছে, যা ভার্চুয়াল সমাজ দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়।

▲ভার্চুয়াল মানব ৪:

সকল বয়সেই একটি কাজহীন দল আছে। কেউ কাজ পাচ্ছে না, কেউ অবসরপ্রাপ্ত, কারওবা কাজের বয়সই হয় নি। তারা বিনোদন করতে অথবা স্মৃতি জমা করার জন্য অনলাইনে আসেন। কিন্তু নিজেরা কোন আর্থিক পেশায় যুক্ত না থাকায়, ততটা সময় অনলাইনে থাকতে পারেন না। এদের মধ্যে যারা বয়স্ক বা অবসরপ্রাপ্ত, তাদের অনেক সামাজিক কাজও থাকে।

যা হোক, এভাবে হয়তো ভার্চুয়াল মানব ৫… ১০, ১৫ অথবা ২০ পর্যন্ত যাওয়া যায়। কিন্তু শ্রেণীভেদের একটি সীমা থাকা উচিত। আমাদের অনলাইন জীবনেরও একটি সীমা থাকা উচিত, কারণ বাস্তবতাকে কিছু সময়ের জন্য ভুলে গেলেও এটি আমাদের পেছন ছাড়বে না। ভার্চুয়াল বিষয়গুলো খুব বেশি হলে অনুঘটক হতে পারে, অথচ বাস্তবতা দিয়েই জীবন গড়ে ওঠে।

বাসা হোক কিংবা কর্মস্থল, আমরা যেন আশেপাশের মানুষগুলোকে খেয়াল করি! কম্পিউটার বা স্মার্টফোনটি খোলা থাকতেই পারে, কিন্তু সে সাথে আমরাও খোলা থাকি বাস্তবতার দিকে!

 

 

প্রথম প্রকাশ: সামহোয়্যারইন ব্লগ। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

———————–

Image courtesy: baroneenglish.blogspot.com

এসডিজি কেন? কী বিশেষত্ব এতে আছে? এমডিজি’র সাথে এর কী সম্পর্ক/পার্থক্য?

sdg photo

এমডিজি ছিলো বিশ্বনেতাদের প্রণীত সার্বজনীন উন্নয়ন পরিকল্পনা। এমডিজি’র মাধ্যমে বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধানরা উন্নয়নের ৮টি বিষয়ে একমত হয়ে স্ব স্ব দেশের উন্নয়নের চেষ্টা করেছেন বিগত ১৫ বছরে। কিছু লক্ষ্য পূরণ হয়েছে, কিছু বাকি থেকেছে। এমডিজি’র মাধ্যমে উন্নয়ন সম্পর্কে বিশ্বনেতাদের মধ্যে ঐকমত্য সৃষ্টি হলেও, এতে দারিদ্রের মূল কারণে (root cause) দৃষ্টিপাত করা যায় নি। জেন্ডার বৈষম্যে গুরুত্ব দেওয়া যায় নি এবং সার্বিক উন্নয়নের বিষয়গুলো থেকেছে অবহেলিত। এমডিজি’র মেয়াদ শেষ হলেও ১০০ কোটি মানুষ এখনও দরিদ্র সীমার নিচে, অর্থাৎ তাদের দৈনিক আয় ১.২৫ ডলারের নিচে।

এমডিজিতে মানবাধিকার বিষয়ে কোন উল্লেখ ছিল না এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়টিও ছিল অস্পষ্ট। তাত্ত্বিকভাবে সকল দেশে প্রযোজ্য হলেও শুধুমাত্র দরিদ্র দেশগুলোতে এটি প্রয়োগ করা হয়েছে। অর্থ দিয়েছে তথাকথিত ধনী দেশগুলো।

এভাবেই ২০১৫ সালে এমডিজি’র নির্ধারিত ১৫ বছরের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এসডিজি হলো গত ১৫ বছরে প্রচলিত এমডিজি’র সম্প্রসারিত ও হালনাগাদ রূপ। এতে টেকসই উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ধনী এবং গরীব সকল দেশকেই যথাযথভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সংক্ষেপে এসডিজি: ১. দারিদ্র্য বিমোচন; ২. ক্ষুধামুক্তি; ৩. সুস্বাস্থ্য; ৪. মানসম্মত শিক্ষা; ৫. জেন্ডার সমতা; ৬. বিশুদ্ধ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন; ৭. ব্যয়সাধ্য ও টেকসই জ্বালানি; ৮. সবার জন্য ভালো কর্মসংস্থান; ৯. উদ্ভাবন ও উন্নত অবকাঠামো; ১০. বৈষম্য হ্রাসকরণ; ১১. টেকসই শহর ও সম্প্রদায়; ১২. (সম্পদের) দায়িত্বশীল ব্যবহার; ১৩. জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধ; ১৪. সমুদ্রের সুরক্ষা; ১৫. ভূমির সুরক্ষা; ১৬. শান্তি ও ন্যায়বিচার; ১৭. লক্ষ্য অর্জনের জন্য অংশিদারিত্ব। ১৭টি লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করার জন্য বিশ্বের প্রায় সকল দেশ একমত হয়েছে জাতিসক্সেঘর অতিসাম্প্রতিক এক সাধারণ সভায়। আমাদের সরকার প্রধানও সেখানে ছিলেন।

এসডিজি’র বিশেষ দিকগুলো:

১) সম্পূর্ণতা/ Zero – Total Achievement: ২০১৫ সাল পর্যন্ত এমডিজি’র উদ্দেশ্য ছিল ক্ষুধা ও অভাবমুক্ত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে অন্তত ‘অর্ধেক পথ’ আগানো। এসডিজি’র লক্ষ্য হলো কাজটি সম্পূর্ণ শেষ করা, অর্থাৎ ২০৩০ নাগাদ কোন ক্ষুধা বা খাদ্যাভাব থাকবে না – জেরো হাংগার ও zero poverty। সম্পূর্ণ অর্জনের জন্য শতভাগ মনযোগ, শতভাগ অংশগ্রহণ এবং শতভাগ ক্ষমতায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

২) সার্বজনীনতা/ Universal: ধনী দেশগুলো গরীব দেশগুলোকে সাহায্য করবে, এই ছিল এমডিজি’র বাস্তবতা। এরপর অনেক পরিবর্তন এসেছে বিশ্ব সমাজে। ODA-র পরিমাণ নামতে নামতে শূন্যে চলে এসেছে। সমস্যাটি দেশ বা জাতিভিত্তিক নয়। সমস্যা হলো, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং ধনী গরীবের পার্থক্য, যা সকল দেশেই আছে। ইউরোপের মতো ধনী মহাদেশে তিনকোটি বস্তিবাসী আছে। তাই এসডিজিতে সকল দেশকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।

৩) সর্বব্যাপী/ Comprehensive: এমডিজিতে ৮টি লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এসডিজি’র জন্য উচ্চপর্যায়ের কমিটি প্রথমে ১২টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু দারিদ্রতার মূলোৎপাটন, মানবাধিকার, বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতা, এবং সুশাসনকে বিবেচনায় এনে ওপেন ওয়ার্কিং গ্রæপ মোট ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরে। এটিই চূড়ান্ত। টেকসই উন্নয়নের জটিল বিষয়গুলো এমডিজিতে সেভাবে স্থান পায় নি, যা এসডিজিতে গুরুত্ব পেয়েছে।

৪) ক্ষুধামুক্তির শর্তাবলী/ Hunger Issues: ‘ক্ষুধামুক্তির তিনটি স্তম্ভকে’ (নারীর ক্ষমতায়ন, সকলকে সম্পৃক্তকরণ এবং স্থানীয় সরকারের সাথে অংশিদারিত্ব) এমডিজিতে তেমন গুরুত্ব দেওয়া যায় নি। জেন্ডার, ক্ষমতায়ন, এবং সকল পর্যায়ে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ইত্যাদি জটিল বিষয়গুলোকে এসডিজিতে আরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

৫) অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা/ Inclusive Goal-setting: এমডিজি নির্ধারিত হয়েছিল টপ-ডাউন প্রক্রিয়ায়, অর্থাৎ উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ ও বিশ্বনেতাদের অংশগ্রহণে। কিন্তু এসডিজি নির্ধারণে সকল পর্যায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে, যা বিশ্বে এর আগে কখনও হয় নি। প্রায় ১০০ দেশের সাথে মুখোমুখি সভা হয়েছে এবং কোটি মানুষের মতামত সংগ্রহ করা হয়েছে বিভিন্ন জরিপের মাধ্যমে।

৬) দারিদ্রতা থেকে ক্ষুধাকে আলাদাকরণ/ Distinguishing Hunger and Poverty: এমডিজিতে ক্ষুধা ও দারিদ্রকে একসাথে MDG1-এ রাখা হয়েছিল। মনে করা হয়েছিল একটি সমাধান হলেই আরেকটির সুরাহা হয়ে যাবে। কিন্তু এসডিজিতে খাদ্য এবং পুষ্টি নিরাপত্তাকে ‘দারিদ্রতা’ থেকে আলাদাভাবে দেখা হয়েছে।

৭) অর্থায়ন/ Funding: এমডিজিতে মনে করা হয়েছিল যে, ধনী দেশগুলো থেকে সহায়তা নিয়ে দারিদ্রতা দূর করা যাবে। কিন্তু বাস্তবে সেটি সফলতা পায় নি। এসডিজিতে টেকসই এবং সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রধান কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তাতে সংশ্লিষ্ট দেশের রাজস্ব বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

৮) শান্তি প্রতিষ্ঠা/ Peace Building: বিগত ১৫ বছরে দেখা গেছে যে শান্তিপূর্ণ এবং সুশাসনভুক্ত দেশগুলো অগ্রগতি লাভ করেছে। ১৫ বছর পর এখন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধুমাত্র বিরোধপূর্ণ দেশগুলোতেই ‘তীব্র দারিদ্রতা’ থেকে যাবে। ক্ষুধা ও দারিদ্রতাকে দূর করার জন্য তাই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। কিন্তু এটি এমডিজিতে গুরুত্ব পায় নি, এসডিজিতে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

৯) মূল্যায়ন ও জবাবদিহিতা/ M&E and Accountability: পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন ও জবাবদিহিতা সম্পর্কে এমডিজিতে কিছুই বলা নেই। এসডিজিতে ২০২০ সালের মধ্যে তথ্য বিপ্লব ঘটানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। তাতে জাতীয় পর্যায়ে মানুষের আয়, বয়স, জেন্ডার, নৃতাত্বিক তথ্য, অভিবাসন পরিস্থিতি, ভৌগলিক অবস্থান এবং অন্যান্য তথ্য সম্পর্কে মানসম্মত, সময়নিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য বিবরণ তৈরি করা হবে।

১০) মানসম্মত শিক্ষা/ Quality Education: এমডিজিতে কেবল সংখ্যার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যেমন: ভর্তির সর্বোচ্চ হার, পাশের হার ইত্যাদি। তাতে সংখ্যা বাড়লেও গুণগত মান গিয়ে তলায় ঠেকেছে। কিন্তু এসডিজিতে মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমে একটি ‘মানবিক বিশ্ব’ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

একনজরে এসডিজি বা বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা

১. দারিদ্র্য বিমোচন [No Poverty]: সর্বত্র এবং সবধরণের দারিদ্র্যতা দূর করা;
২. ক্ষুধামুক্তি [Zero Hunger]: ক্ষুধা দূর করা, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টি অর্জন, এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থা চালু করা;
৩. সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ [Good Health & Well being]: স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন নিশ্চিত করা এবং সব বয়সের সকলের জন্য কল্যাণ বৃদ্ধি;
৪. মানসম্মত শিক্ষা [Quality Education]: অন্তর্ভূক্তিমূলক, সমতাপূর্ণ ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সবার জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষা সুযোগ সৃষ্টি;
৫. জেন্ডার সমতা [Gender Equality]: জেন্ডার সমতা অর্জন করা এবং সব নারী ও তরুণীর ক্ষমতায়ন;
৬. বিশুদ্ধ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন [Clean Water & Sanitation]: সবার জন্য পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের সুযোগ এবং এর টেকসই ব্যবস্থাপনা;
৭. ব্যয়সাধ্য ও টেকসই জ্বালানি [Affordable & Sustainable Energy]: সবার জন্য ব্যয়সাধ্য, নির্ভরযোগ্য, টেকসই এবং আধুনিক জ্বালানির সুযোগ নিশ্চিতকরণ;
৮. সবার জন্য ভালো কাজ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি [Decent Work & Economic Growth]: সবার জন্য টেকসই, অন্তর্ভূক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পূর্ণকালীন ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান এবং ভালো কাজ নিশ্চিতকরণ;
৯. শিল্প, উদ্ভাবন ও উন্নত অবকাঠামো [Industry, Innovation & Infrastructure]: দীর্ঘস্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা, অন্তর্ভূক্তিমূলক এবং টেকসই শিল্পায়ন এবং উদ্ভাবনকে প্রেরণা দেওয়া;
১০. বৈষম্য হ্রাসকরণ [Reduced Inequalities]: দেশের ভেতরে এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যকার বৈষম্য দূর করা;
১১. টেকসই শহর ও সম্প্রদায় [Sustainable Cities and Communities]: শহর এবং মানুষের বাসস্থানকে অন্তর্ভূক্তিমূলক, নিরাপদ, দীর্ঘস্থায়ী এবং টেকসই করে তোলা;
১২. (সম্পদের) দায়িত্বশীল ব্যবহার [Responsible Consumption & Production]: টেকসই ভোগ ও উৎপাদন রীতি নিশ্চিত করা;
১৩. জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধ [Climate Action]: জলবায়ূর পরিবর্তন ও প্রভাব মোকাবেলায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ;
১৪. সমুদ্রের সুরক্ষা [Life below Water]: টেকসই উন্নয়নের জন্য মহাসাগর, সাগর এবং সামুদ্রিক সম্পদের সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহার;
১৫. ভূমির সুরক্ষা [Life on Land]: ভূমির উপরিস্থ পরিবেশ-ব্যবস্থার সুরক্ষা, পুনঃস্থাপন এবং টেকসই ব্যবহার; টেকসই বন ব্যবস্থাপনা; মরুকরণ রোধ ও বন্ধ করা; ভূমিক্ষয় রোধ করা এবং জীববৈচিত্রের ক্ষতি বন্ধ করা;
১৬. শান্তি ও ন্যায়বিচার [Peace, Justice & Strong Institutions]: টেকসই উন্নয়নের জন্য শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভূক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা; সকলের জন্য ন্যায়বিচারের সুযোগ সৃষ্টি; এবং সর্বস্তরে কার্যকর, জবাবদিহি এবং অন্তর্ভূক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা;
১৭. লক্ষ্য অর্জনের জন্য অংশিদারিত্ব [Partnerships for the Goals]: বাস্তবায়নের উপায়গুলো শক্তিশালী করা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য বৈশ্বিক অংশিদারিত্ব পুনর্জীবিত করা।


যেভাবে নির্ধারণ করা হয় এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা:

এমডিজি’র মতো জাতিসঙ্ঘের চারদেয়ালের ভেতরে বসে এসডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় নি। ২০১৫ সাল পরবর্তি সময়ের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় ২০১২ সালের রিয়ো প্লাস টুয়েন্টি (রিয়ো ডি জেনিরো, ব্রাজিল) শীর্ষ সম্মেলনে। সম্মেলনের ফলশ্রুতিতে ‘দ্য ফিউচার উই ওঅন্ট’ শীর্ষক ঐতিহাসিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যাকে বলা যায় এসডিজি’র রূপরেখা। তারা (১৯৩ সদস্য রাষ্ট্র) একটি ওপেন ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করে খসড়া লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করার জন্য তাদেরকে ক্ষমতায়ন করেন।

ওপেন ওয়ার্কিং গ্রুপ ৭০টি দেশের প্রতিনিধি নিয়ে এবং ১০০ দেশের সাথে মুখোমুখি সভার মধ্য দিয়ে (ওপরে বলা হয়েছে) চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা প্রণয়ন করে (২০১৫/অগাস্ট)। তাছাড়াও জাতিসঙ্ঘ ‘বৈশ্বিক কথোপকথন’, পরিবার জরিপ এবং ‘মাই ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক জরিপের আয়োজন করে। সব তথ্য ও উপাত্ত ওপেন ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রতিবেদনে যুক্ত হয়।

১৭টি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান:

সংখ্যাগরিষ্ট রাষ্ট্র এসডিজি’র লক্ষ্যমাত্রাগুলো নিয়ে সন্তুষ্ট (এমডিজি’র ক্ষেত্রে এটি ছিল না)। তবে ইংল্যান্ড ও জাপানসহ হাতেগুণা কয়েকটি রাষ্ট্র মৃদু দ্বিমত প্রদর্শন করেছে। কোন কোন দেশ ১৭টি লক্ষ্যমাত্রাকে খুব বেশি এবং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না বলে মত দিয়েছে। ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জনসমক্ষেই বলেছেন যে, তিনি ১২টিতে একমত, ১০টি হলে ভালো। তবে কোন্ লক্ষ্যমাত্রাগুলোতে তারা ‘একমত’ তা তিনি স্পষ্ট করেন নি।

জাতিসঙ্ঘের বিশেষ উপদেষ্টা (আমিনা মোহাম্মেদ) বলেছেন যে, লক্ষ্যমাত্রাগুলোকে ১৭ পর্যন্ত নামিয়ে আনতে তাদের অনেক কষ্ট হয়েছে। আরও কমানো হলে তা প্রবল বিরোধীতার মুখে পড়বে এবং নারীর ক্ষমতায়ন, সুশাসন, শান্তি ও নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়গুলো বাদ পড়তে পারে।

MDG-2015-infographic-Latif_0
[২০১২ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রোগ্রেস]
শেষকথা: আরেক ফর্দ লক্ষ্যমাত্রার কী দরকার ছিল?এমডিজি’র লক্ষ্য ও অর্জন নিয়ে যত সমালোচনাই হোক না কেন, এর মধ্য দিয়ে বিশ্বরাজনীতিতে উন্নয়ন বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উন্নয়ন ইস্যুতে একতাবদ্ধ থাকার কারণে স্নায়ুযুদ্ধ (রাশা বনাম যুক্তরাষ্ট্র) স্নায়ুতেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। অর্থাৎ ২০০০ সালে এমডিজি’র পাশাপাশি শুরু হয়েছে উন্নয়নের বিশ্ব রাজনীতি। আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে বৈশ্বিক রাজনীতিতে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা। তাতে যতই রাজনীতি থাকুক না কেন দরিদ্র দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় নি, বরং নানাভাবে উপকৃত হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি, দ্বিপাক্ষিক, বহুপাক্ষিক সংস্থা গড়ে ওঠেছে যেন এমডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অপেক্ষাকৃত পিছিয়েপড়া দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়া যায়। ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা এবং পুষ্টির মতো মৌলিক ইস্যুতে বিগত দেড় দশকে গরিব দেশগুলো পেয়েছে প্রচুর সহযোগিতা। এর অধিকাংশই সম্ভব হয়েছে এমডিজি নামক একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত উন্নয়ন এজেন্ডা থাকার কারণে।

২০১৫ সালে শেষ হয়ে গেলো এমডিজি’র যুগ। এবার কেমন হবে? কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তন, আর্থিক মন্দা, কর্মসংস্থান, মুক্তবাজার বাণিজ্য, খাদ্যাভাব, মারাত্মক রোগ ইত্যাদি ইস্যুতে বিশ্ববাসীকে আবার এক করা যায়? কীভাবে চালিয়ে যাওয়া যায় উন্নয়নের রাজনীতি? এ নিয়ে গত তিন বছর ধরে (২০১২ থেকে) হয়েছে নানা পর্যায়ের গবেষণা। বলা যায়, এমডিজি বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নিয়েছে এর সর্বাধুনিক ও সময়োপযোগী রূপ, এসডিজি। ‘এস’ মানে সাসটেইনেবল, টেকসই, স্বয়ংসম্পূর্ণ। এসডিজিকে বলা যায় বিশ্বের সার্বিক উন্নয়নে বিশ্বনেতাদের প্রতিশ্রুতিমালা, যা প্রণীত হয়েছে সকলের অংশগ্রহণে। বিগত কয়েক দশকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন কিছু হয়েছে – এবার দরকার উন্নয়নকে স্থায়ীকরণ, প্রবৃদ্ধিতে ধরে রাখা। সর্বোপরি, উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব থেকে বিশ্ববাসীকে মুক্তি দেওয়া এবং বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যাকে (নারী) অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা। দেখা যাক আগামি ১৫ বছর (২০১৬-২০৩০) কেমন যায়!

ক. পরিশিষ্ট:

*ODA: Official Development Assistance উন্নত দেশগুলো থেকে ‘সরকারি সাহায্য’, যা DACএর মাধ্যমে বিতরণ হয়। DAC/ Development Assistance Committee হলো জাতিসঙ্ঘের OECD-এর অধীন একটি সংস্থা (OECD= Organization for Economic Cooperation and Development)। ODA সহায়তা বিতরণের নির্দেশক হিসেবে বহুল ব্যবহৃত।

*MDG/এমডিজি: Millennium Development Goal বা সহস্রাব্দি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (২০০০-২০১৫)। চরম দারিদ্র্য দূরীকরণ; সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা; জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণ ও নারীর ক্ষমতায়ন; শিশুমৃত্যুর হার কমানো; মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়ন; এইডস ও ম্যালেরিয়াসহ মারাত্মক রোগগুলোর প্রতিরোধ; পরিবেশের ভারসাম্যতা নিশ্চিতকরণ এবং উন্নয়নের জন্য বৈশ্বিক অংশিদারিত্ব – এই ৮টি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এমডিজি প্রণীত হয়েছিল।

*উন্নয়নকর্মী হিসেবে এমডিজি/এসডিজি নিয়ে কিছু-না-কিছু নাড়াচাড়া করতে হয় প্রতিনিয়তই। সেখান থেকে কিছু ‘মৌলিক বিশ্লেষণ’ সহব্লগারদের পাঠের উপযোগী করে এবং পারিভাষিক শব্দ যথাসম্ভব পরিহার করে উপস্থাপন করা হলো। বাকি বিষয় খবরের কাগজে পাওয়া যাবে।

*প্রথম প্রকাশ: ০৭ ই অক্টোবর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:৩৫। সামহোয়্যারইন ব্লগ

————————————————————————–

খ. তথ্যসূত্র:

a. sustainabledevelopment.un.org [accessed on 3/Oct/2015]
b. theguardian.com/global-development [accessed on 28/Sep/2015]
c. United Nations, The Future We Want, 2012

যেসব কারণে সেলিব্রেটিদেরকে হিংসা করতে ইচ্ছে হয় না

file (3)-crop

খ্যাতিমানদের জীবন নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই।  তারা কীভাবে তাদের প্রাত্যাহিক জীবনকে উপভোগ করছে, এসব নিয়ে নানা জল্পনাকল্পনা থাকে মানুষের মনে।  সামান্য অনুসন্ধান করে উচ্ছ্বসিত হবো নাকি হতাশ হবো সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না।  গসিপ বা ট্যাবলয়েড পত্রিকাগুলো কেন এত উল্টাসিধা সংবাদ ছাপে, এর কিছু কারণ খুঁজে পেয়েছি।  বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনে সামান্য দৃষ্টিপাত করে যা জেনেছি, তাতে তাদের প্রতি অনুকম্পা জাগে।

এঁরা কীভাবে বেঁচে আছেন, এটি একটি বিস্ময়ের বিষয় বটে। এদের না আছে বন্ধু, না আছে আত্মীয়। একটি পর্যায়ে নিজ পরিবারও হাতছাড়া! না আছে স্বাধীন চলাফেরা করার পথ, না আছে মৌলিক চাহিদা পূরণের সুযোগ। দায় বেশি আয় কম! আয় আছে তো দশগুণ দায়ও আছে। আছে আয়কর-ওয়ালা; আর আছে দাতাসংস্থার মিষ্ট চাপ। এঁরা না কইতে পারেন, না সইতে পারেন অবস্থা। একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরলাম। দৃষ্টান্তে বেশি গেলাম না, পাছে লেখা বড় হয়ে যায়!

খ্যাতিমান মানুষদের সামাজিক দায় বেশি। গায়ক, নায়ক, আঁকিয়ে, নাচিয়ে যে-ই হোক না কেন, বিখ্যাতদের সামাজিক দায়িত্ব বেড়ে যায় অনেক গুণে। তারা পান থেকে চুন কষলেই পত্রিকার শিরোনাম, সঙ্গে আসে মানুষের বদনাম। দু’দিনেই বিখ্যাত হয়ে যান কুখ্যাত। বউয়ের গায়ে হাত পড়লে পৃথিবীতে কোন স্বামী নেই, তার মাথা ঠাণ্ডা থাকবে। স্ত্রীকে অত্যুক্ত করতে দেখে যেকোন স্বামী অভিভাবকত্ব প্রমাণ করার জন্য হলেও ন্যূনতম প্রতিক্রিয়া দেখাবে। দেশের একজন খ্যাতিমান ক্রিড়াবিদ তার স্ত্রীর সম্মান রক্ষায় একটু চেষ্টা করায় গণমাধ্যমে তোলপাড় লেগে গেলো। শেষ পর্যন্ত বহিষ্কার! সামাজিক মাধ্যমে তাকে তুলোধুনা করা হলো। খ্যাতিমান মানুষদের ভালো থাকার দায়ও বেশি।

 

খ্যাতিমান মানুষদের ভুল করার সুযোগ সীমিত। কারণ মানুষ তাদেরকে দেবতা জ্ঞান করে। তারা রিক্সাওয়ারার খারাপ ব্যবহারে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেন না। তারা তরকারি ওয়ালার সাথে তর্কাতর্কিতে জড়িয়ে পড়তে পারেন না, টাকা যত বেশিই দাবি করুক।

খ্যাতিমান মানুষদের চুপ থাকার দায় বেশি। সব কথা, সব শব্দ তারা ব্যবহার করতে পারেন না – ট্যাগ লেগে যাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে! পরের দিনের সফর বাতিল! অন্যেরা যে কথা অহরহ বলে বেড়াচ্ছে, সেলিব্রেটিরা সেটি বললেন, তো মরলেন। খ্যাতিমান, আপনি কোন মডেলের সাথে প্রেমে জড়ালেন। সঙ্গে কিলকিল করবে টিকটিকির দল (প্রেস)। আপনার জান কয়লা বানিয়ে ফেলবে প্রশ্নের পর প্রশ্ন দিয়ে। বললেন, “ওটা আমার ব্যক্তিগত বিষয়।” উত্তরে তারা বলবে, সেলিব্রেটিদের সমস্ত তথ্য জনগণের সম্পদ। এবার আপানি যাবেন কই? ওই সাম্বাদিককে মারপিট করবেন? এটা আমপাবলিকের কাজ, আপনার নয়। যদি করেই ফেলেন, তবে নিশ্চিত থাকুন, দেশের গণমাধ্যম আপনাকে আত্মহত্যার পর্যায়ে নিয়ে যাবে। খ্যাতিমান মানুষদের সহনশীলতার দায়ও বেশি।

খ্যাতিমান মানুষদের চলার জায়গা সীমিত। তারা সব জায়গায় সব বাহনে চলতে পারেন না। তাতে তাদের সামাজিক স্ট্যাটাসে যা-ই হোক, নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। নিরাপত্তা কর্মীরা এসে সোজা পাজকোলা করে বাড়িতে পৌঁছে দেবে। সঙ্গে একটি বকাও দেবে, “আপনার মতো সম্মানী ব্যক্তি এভাবে চলাফেরা করছেন, আমাদেরকে আগে জানাবেন না?” খ্যাতিমান মানুষদের জনসমক্ষে থাকার সুযোগ সীমিত। খ্যাতিমান মানুষদের সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রটুকুও ছোট। বাথরুম থেকে বেডরুম পর্যন্ত সীমিত – অবশ্য যদি গোপনীয় সিসি ক্যামেরা না থাকে।

খ্যাতিমান মানুষদের মৌলিক চাহিদা পূরণের স্বাধীনতা কম। শুধু মৌলিক চাহিদা কেন, কোন চাহিদাই এরা নিজ চেষ্টায় পূরণ করতে পারবেন না। সেলুন থেকে শুরু করে হাসপাতাল পর্যন্ত কোত্থাও তাদের চলাফেরা করার সুযোগ নেই। বিখ্যাত হয়ে কর্মহীন হয়েছেন? তো গেছেন! এর চেয়ে ‘সুইসাইড খাইয়া হালান’! হরিণের নিজের মাংসই তার পয়লা শত্রু। আপনার খ্যাতি তখন আপনার বিপক্ষে কাজ করবে। শুধুমাত্র কৌতুকাভিনেতা হিসেবে পরিচিতির কারণে চাকরি হারাতে হয়েছে একজন পরিচিত খ্যাতিমানের। আর কোত্থাও তার কাজ জুটলো না। খ্যাতিমানদের গরিব হতে নেই, কেউ ভাত দেবে না – সুযোগ পেলে আপনাকে নিয়ে একটা সেলফি তুলতে পারে। ভুলেও টাকা বা কাজ অফার করবে না, পাছে আপনি অপমানিত হন!
এতসব দায়দায়িত্বের পরও মানুষের ইচ্ছে জাগে খ্যাতিমান হবার। হুমায়ূন আজাদের একটি প্রবচন অনেকটা এরকম: মানুষ যখন বিখ্যাত হতে চায়, তখন শুধুই চায় অন্যেরা তাকে দেখুক। কিন্তু কিছুদিন পরই সে কালোচশমা লাগিয়ে ঘুরে, যেন কেউ তাকে দেখতে না পায়। সেলিব্রেটি হওয়া অনেকটা দিল্লিকা লাড্ডুর মতো। না হলে আফসুস, হবার পরও আফসুসের অন্ত নেই।

তবে খ্যাতিমান মানুষদের মহৎ কাজ করার সুযোগ বেশি। তারা চাইলেই কয়েকশ’ লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে পারেন নিমিষে। একটি ফোনকলে গ্রামের ভাঙ্গাসেতুটি মুহূর্তে মেরামত সম্পন্ন! নিজের খরচ ছাড়াই প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গকে একটি জনমুখী কাজে সংযুক্ত করতে পারেন। খ্যাতিমান মানুষদের অন্যকে সহায়তা করার সুযোগ বেশি।

 

অর্জিত খ্যাতি আর আরোপিত খ্যাতি বলে দু’টি বিষয় আছে। যারা নিজেদের শ্রম ও মেধা দিয়ে খ্যাতি অর্জন করেন, তারা উপরোক্ত দায়সকল পূরণ করতে মজাই পান। কিন্তু খ্যাতি যাদের ওপর ইচ্ছা-অনিচ্ছায় এসে পড়েছে, তারা এর মূল্য বুঝতে পারেন না। তারা হঠাৎ সৌভাগ্য বা লটারির মতো খ্যাতিকে পেয়ে শুধু ‘পাবার বিষয়গুলোতে’ মনযোগ দেন। তারা ‘সামাজিক দায়ের’ মতো ব্যাপারগুলো বুঝতে পারেন না। কিন্তু বিখ্যাত হবার পর নেবার চেয়ে দেবার দায় বেশি, যদিও অনেকেই উল্টোটা করেন। উল্টোদিকে গেলেই পত্রিকার শিরোনাম – বিখ্যাত থেকে কুখ্যাত। তবে যারা খ্যাতির দায় পূরণ করতে পারেন, তারা অবশেষে সত্যিকারভাবে দেবতায় পরিণত হন। মৃত্যু তাদের বিদায় ঘটাতে পারে না। তারা অমর। (২৫ডিসে২০১৪)
.
.

.
—————————————–—————————————–
ফিচার ফটো: ফটো সার্চ ডট কম।

গীতিকার গোবিন্দ হালদার: A Tribute

180115.pptx-crop

মুক্তিযুদ্ধের একটি সময়ে এরকম নিয়ম হলো যে, বিদেশী লেখক বা শিল্পীর গান স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রে পরিবেশন করা হবে না। ঠিক এভাবেই নিভৃতাচারি গোবিন্দ হালদারের নামটি আরও নিভৃতে হারিয়ে যায়। তার পূর্বে বেশ কিছুদিন তার রক্ত-গরম-করা গানগুলো স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রে পরিবেশিত হয়েছিল। ওই নীতিমালা গ্রহণের পর তার নামটি আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। এমনকি বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরও মুক্তিযুদ্ধে অবদানকারীদের তালিকায় তার নামটি থাকে নি। গোবিন্দ হালদারকে বাঙালী কেন তেমনভাবে জানে না, এই হলো দ্য ডেইলি স্টার থেকে প্রাপ্ত তথ্য।

এরপরের সরকারগুলো আর গোবিন্দ হালদারকে তেমনভাবে স্মরণ না করলেও, স্বাধীন বাংলাদেশের বেতার তার সাথে পরবর্তিতে একটি চুক্তি করে। কিন্তু চুক্তিমতো তিনি নিয়মিত গীতিকার হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। তার গানগুলো গাওয়া হলেও এর রয়্যালটি তিনি পুরোপুরি পান নি। “তারা আমাকে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত খরচের ভাউচার পাঠিয়েছে, আমি সইও করেছি।  তথাপি আমার ন্যায্য পাওনা থেকে আমি বঞ্চিত হয়েছি।” ১৯৮৫ সালের তারকালোকে প্রকাশিত তার নিবন্ধ থেকে উদ্ধৃত।

তিনি সেই গোবিন্দ হালদার, যিনি লেখেছিলেন- ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলো যারা’ ‘পূর্বদিগন্তে সূর্য ওঠেছে রক্ত লাল রক্ত লাল’ ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা’ ইত্যাদি জনপ্রিয় দেশের গানগুলো, যা শক্তি দিয়েছিল দেশপ্রেমিক বাঙালিকে, সাহস দিয়েছিল মুক্তিকামী যোদ্ধাদেরকে। দেশ স্বাধীন হবার পরপরই তার লেখা ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ গানটি যেন বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের আত্মার ধ্বনি হয়ে ওঠে। বীর শহীদদেরকে আপাময় বাঙালি শ্রদ্ধা জানাবার ভাষা খুঁজে পায় তার এই গানে। একাত্তর সালের যুদ্ধাবস্থায়ও গোবিন্দ হালদার তার নতুন প্রেরণদায়ক গানগুলো নিয়ে বিশেষ ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, যুদ্ধরত ও যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। মুক্তিকামী বাঙালির কাছে।

হালদার ১৯৩০ সালে ভারতের বনগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। বনগাঁওয়ে স্কুলজীবন শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তিতে তিনি ভারতের আয়কর বিভাগে চাকরি নেন এবং ১৯৮৮ সালে সেখান থেকে অবসর গ্রহণ করেন। প্রায় ৩,৫০০ সেমি-ক্লাসিক, বাউল, গণসঙ্গীত, আধুনিক গান এবং কীর্তন তিনি লেখেছেন। মেয়ে গোপা হালদারের মতে, প্রায় ৩,০০০ গান তার আজও অপ্রকাশিত। অনেক কবিতাও তার অপ্রকাশিত। অল ইন্ডিয়া রেডিও এবং দূরদর্শন তার কিছু গান প্রচার করেছে। ‘দূর দিগন্তে’ (১৯৮৯) নামে তার একটি কাব্য সংকলন বের হয়ে ছিল এবং ৫০০ কপির প্রায় সবগুলোই বিক্রি হয়েছিল। জানা যায়, অর্থাভাবে আর পুনর্মুদ্রণ করতে পারেন নি।

কিডনি সমস্যা নিয়ে গত ১৩ ডিসেম্বরে  কলকাতার জিতেন্দ্র নারায়ণ রয় পলিক্লিনিকে ভর্তি হন ৮৪ বছরের স্বদেশপ্রেমী গীতিকার গোবিন্দ হালদার। একমাসেরও বেশি সময় সেখানে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত ১৭ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন বাংলাদেশের এই অকৃত্রিম বন্ধু।

গত ডিসেম্বরে ভারত সফরের সময় আমাদের রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। আমাদের রাষ্ট্রপতি তাকে এই বলে সম্মান প্রদর্শন করেন: “তিনি আমাদেরই একজন। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন সাহসী যোদ্ধা ছিলেন।” অসুস্থতার খবর শুনে আমাদের প্রধানমন্ত্রীও তাকে ফোন করেছিলেন এবং তার চিকিৎসার যাবতিয় দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন মতাদর্শের সরকারগুলো তাকে যথাযথ মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হলেও, ২০১২ সালে স্ট্যান্ডিং ওভেশন সহকারে তাকে স্বাধীনতা-উত্তর সনদ প্রদান করে বাংলাদেশ সরকার। ফ্রেন্ডস অভ লিবারেশন ওয়্যার এওয়ার্ড নিতে অবশ্য তিনি আসতে পারেন নি, শারীরিক কারণে। তার কন্যা গোপা হালদার এসেছিলেন।

অনেক সাধারণ জীবনযাপন ছিল গোবিন্দ হালদারের। অসাধারণেরা আমজনতার কাছে এমনই ‘সাধারণ’ ছিলেন চিরকাল। এজন্যই হয়তো তার নামটি তত বিস্তৃতি পায়নি এই স্বাধীন বাংলাদেশে। কিন্তু তার অমর গানগুলো যতবার উচ্চারিত হবে দিগন্তে, ততবার মনে পড়বে সুরকার ও গীতিকার গোবিন্দ হালদারের কথা। শ্রদ্ধাঞ্জলি!

————————–

তথ্যসূত্র: দ্য ডেইলি স্টারসহ বিভিন্ন বাংলা পত্রিকা।

https://d19tqk5t6qcjac.cloudfront.net/i/412.html

https://d19tqk5t6qcjac.cloudfront.net/i/412.html

https://d19tqk5t6qcjac.cloudfront.net/i/412.html

https://d19tqk5t6qcjac.cloudfront.net/i/412.html

বিদ্যালয় আমারে শিক্ষিত হতে দিলো না

posterJuri-crop

 

১) আজকাল পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে আমাদের মাননীয় মন্ত্রী-সচিবরা যেভাবে দৌড়াদৌড়ি করেন, তাতে প্রশ্ন জাগে: আসলে পরীক্ষা কারা দিচ্ছে আর কারা পাশ করছে। আমার স্কুল জীবনের এক বন্ধু মেট্রিকের টেস্ট পরীক্ষায় গণিতে ফেল করে হৃদয় উজাড় করে প্রধানশিক্ষকের কাছে অনুরোধ করেছিল, যেন তাকে একটিবার সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু বিদ্যালয়ের সুনামে অতিরিক্ত যত্ন্শীল প্রধানশিক্ষক সে অনুরোধে কর্ণপাত করলেন না। “আমার বিদ্যার্জন এখানেই শেষ” বলে সেই যে বিদ্যালয় ছাড়লো, আর তাকে দেখা যায় নি বিদ্যালয়ের আঙ্গিনায়। এইচএসসি’র প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষার ফলাফলে নিজের নাম না দেখে “আমার আর বাড়ি যাওয়া হলো না রে!” বলে আমার এক সহকর্মীর আদরের সন্তান আত্মহত্যা করে। তথাকথিত ভালো ছাত্র হয়েও শুধুমাত্র জিপিএ-৫ না পাওয়ার কারণে আত্মহত্যা করে আমাদের এই প্রিয় স্বদেশে।

 

উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া শিক্ষাব্যবস্থায় পরিচালিত আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যে এভাবে কত জীবন নষ্ট করছে কে জানে। পরিস্থিতিটি এরকম দাঁড়িয়েছে যে, “তুমি যদি শিক্ষিত হতে চাও, তবে তোমাকে পাশ করতে হবে।” আমাকে পাশ করতে হবে গণিত ইংরেজি ভূগোল বিজ্ঞান ইতিহাস পৌরনীতিতে। আমার কিসে আগ্রহ, আমার কিসে ঝোঁক বা আমি কী বিষয়ে নিজেকে গড়ে তুলতে চাই সেটা এখানে বিবেচ্য নয়। “আগে পাশ দাও, পরে যা-খুশি হও, অথবা না হও।”

 

পাবলিক বাসে বসলে অনেক মজার কথপোকথন শুনা যায়। দুই সহযাত্রী আমার পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন:
-ভাবছি একটা মাস্টার্স ডিগ্রি নিতেই হবে। শ্বশুরবাড়িতে মুখ দেখাতে পারছি না।
-তা কোন বিষয়ে আপনি মাস্টার্স করতে চান? অন্যজনের জিজ্ঞাসা।
-আমি তো বাণিজ্যে স্নাতক করেছি, কিন্তু বাণিজ্যের কোন বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়ার ধৈর্য্য এখন আমার নেই। তাই বাংলা অথবা ইসলামের ইতিহাসে পড়তে পারি।

এথেকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা তথা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কেমন ধারণা হয়?

 

২) স্যুটেট-বুটেড ব্যক্তিটি যখন তার বিএমডাব্লিউ’র জানালা দিয়ে পরিচ্ছন্ন রাস্তায় খালি বোতল বা সিগারেটের প্যাকেট ফেলে দিয়ে গাড়ি হাঁকে, তখন কি তাকে শিক্ষিত মনে হয়? পথচারিকে ধোয়াচ্ছন্ন করে দিয়ে কালো সানগ্লাস পরিহিত ব্যক্তিটি যখন সিগারেট ফুঁকে, তখন কি মনে হয় সে শিক্ষিত? মাত্র পাঁচটি টাকার জন্য আমরা যখন একজন খেটে-খাওয়া রিক্সাওয়ালার গায়ে হাত তুলি, তখন কি মনে হয়, শিক্ষা আমাদেরকে কিছু করতে পেরেছে? শহরের অধিকাংশ মানুষই উচ্চশিক্ষিত, তারপরও কি গাড়িতে ওঠার সময় লাইনে দাঁড়াবার জন্য তাদেরকে ধমকাতে হয় না? যে সমাজে নারীর জন্য গাড়িতে আলাদা বরাদ্দ করে রাখতে হয়, এবং বাসের চেংড়া যাত্রীদেরকে আসনে বসিয়ে রেখে বয়স্ক নাগরিককে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, সে সমাজের শিক্ষা যে কোন কাজের আসে নি, তা কি বলার অপেক্ষা রাখে?

 

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মান নিয়ে আলোচনা করতে খুব মজা পাই আমরা, কারন কিছু কিছু প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান পাবলিক প্রতিষ্ঠানের চেয়েও ভাল হবার পরও অন্যান্যদের জন্য তারা গলা উঁচু করতে পারছে না। তাছাড়া তাদের আছে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। অথচ দেশের একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে স্নাতক পড়ার জন্য এবার মাত্র দু’জন ছাত্র কোয়ালিফাই করেছে। এটি কি শিক্ষার্থীর দুর্বলতা, নাকি শিক্ষা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বলা মুসকিল। আমার প্রশ্ন, আমাদের কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি গুণগত মানের ক্ষেত্রে ‘গড়পরতা’ ওপরে ওঠতে পেরেছে? গড়পরতা সকলেই কি সনদপত্র বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান নয়?

 

৩) মার্কিন লেখক মার্ক টোয়েন (১৮৩৫-১৯১০) বলেছিলেন, “আমি কখনও আমার শিক্ষাকে বিদ্যালয় দ্বারা বাধাগ্রস্ত হতে দেই নি।” কমপিউটার জিনিয়াস বিল গেটসও খুব ভালো ছাত্র ছিলেন না। নিজের শিক্ষা সম্পর্কে হারবার্ড ড্রপআউট বিল গেটস এর একটি মজার উক্তি হলো এরকম: “গণিতে আমি খুবই কাঁচা ছিলাম কিন্তু আ্মার বন্ধু খুব ভালো ছিলেন গণিতে। বন্ধুটি বর্তমানে মাইক্রোসফটের একজন সেরা প্রকৌশলী আর আমি এর চেয়ারম্যান!”

বিখ্যাত কম্পিউটার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডেল’ এর মালিক মাইকেল ডেল কলেজে ওঠেই পড়াশুনা ছেড়ে দিয়েছিলেন কম্পিউটার বিক্রয়ের সময় বের করার জন্য।

কমপক্ষে ১০০০ প্রযুক্তির পেটেন্ট-এ্রর মালিক ও বিদ্যুতের আবিষ্কারক টমাস আলভা এডিসনের (১৮৪৭-১৯৩১) কথা কে না জানে! নিজ বিদ্যালয়ে ‘স্টুপিড’ বলে পরিচিত এই খ্যাতনামা বিজ্ঞানী মার খেতে খেতে শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন।

স্বশিক্ষিত কিন্তু কীর্তিমান মনীষীদের তালিকাটি একেবারে ছোট নয়। তারা প্রমাণ করেছেন, সত্যিকার শিক্ষা শুধুই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পণ্য নয়।

আমাদের নতুন শিক্ষানীতিতে অনেক বিষয়ই সংস্কার করা হয়েছে। কিন্তু পা্বলিক পরীক্ষার পাশের হারকে সরকারের কৃতীত্ব দেখানোর যে প্রবণতা দেখা দিয়েছে, তাতে বিভ্রান্ত না হয়ে পারি না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজেই আজ শিক্ষাবিস্তারের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সুশিক্ষিত মানেই স্বশিক্ষিত। শিক্ষার্থীর স্বাধীনতাই শিক্ষা বিস্তারের প্রধান উপায়। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীর স্বাধীনতাকে কেড়ে নিয়েছে। কেড়ে নিয়েছে তাদের স্বশিক্ষিত হবার সুযোগ। শিক্ষার্থীকে অবাধে তাদের পছন্দমতো শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ যদি না দেওয়া হয়, এবং সামগ্রিক শিক্ষার সাথে যদি নৈতিক শিক্ষাকে যুক্ত না করা হয়, তবে আমাদের বিদ্যালয়গুলোই হবে প্রকৃত শিক্ষাগ্রহণের প্রধান প্রতিবন্ধকতা।

  (৮ অক্টো ২০১২/ ব্লগস্পট থেকে স্থানান্তরিত)

https://d19tqk5t6qcjac.cloudfront.net/i/412.html

https://d19tqk5t6qcjac.cloudfront.net/i/412.html

আউটসোর্সিং: শোষণ ও তোষণের মাঝে…

আউটসোর্সিং আমাদেরকে অনেক কিছু দিয়েছে। নাই মামার চেয়ে কানা মামার সুবিধা দিয়েছে। কিছুই যেখানে করতে পারতাম না, সেখানে ঘরে বসে নিজের পরিবারের সাথে থেকে দু’টি পয়সা আয় করে চলতে পারছি। বিশাল বড় পাওয়া।

মা-বাবার লাখ লাখ টাকা খরচ করে এন্জিনিয়ার হয়েছি, কম্পিউটার এন্জিনিয়ার। সেই সনদ দিয়ে কোন প্রতিষ্ঠানের প্রধান হতে না পারলেও, সামাজিক কোন অবস্থান সৃষ্টি করতে না পারলেও, কোন প্রকার পদবী অর্জন করতে না পারলেও, টাকা তো আয় করতে পারছি! “তুই কী করস রে?” উত্তরে বলি, “আউটসোর্সিং”।

-আউটসোর্সিং? এইডা আবার কী চাকরি?
-চাকরি না। আত্মকর্মসংস্থান।

বুঝতে পারি, এই কথা বলার মধ্যে কতটুকু অহংকার কাজ করে একজন ফ্রিল্যান্সারের মনে। কিন্তু বন্ধুরা যখন সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনে বিভিন্ন পদবী নিয়ে সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে, তখন একটু হলেও ভেতরের কোথাও বেদনার সৃষ্টি হয়। অথবা দেখা গেলো, কেউ কোন বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হয়ে বাড়ি গাড়ি নিয়ে ‘পুরোপুরি সেটলড লাইফ লিড’ করছে। তখন হঠাৎ করেই প্রশ্ন জাগে, শুধুই কি অর্থের জন্য পড়াশুনা করেছি, সমাজে কি পরিচয়ের একটুও দরকার ছিলো না?

আমি বলছি তাদের কথা, যারা আউটসোর্সিংয়ের দরজায় প্রবেশ না করলে নিজেদের একাডেমিক সনদ দিয়ে সরকারি/বেসরকারি/কর্পোরেট সেক্টরে ভালো একটি চাকরির সংস্থান করতে পারতো। দরজা খোলা, তাই প্রবেশ করেছে। বন্ধ থাকলে হয়তো সামনের দিকে এগিয়ে আরও উন্নতর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারতো। শুধুই তাদের কথা বলছি।

তাদের জন্য আমার ব্যথিত নই, যারা উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে অথবা না করে, শুধুমাত্র ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় বেইসিক কম্পিউটার অপারেটিং রপ্ত করেছে। তারপর নিজের প্রচেষ্টায় গ্রাফিক্স বা ওয়েবডিজাইনিং অথবা এসইও শিখে আউটসোর্সিংয়ের জগতে বিশাল বাজার তৈরি করেছে। শুধু নিজের জন্য নয়, সমগোত্রীয় অন্যদের জন্যও তারা সৃষ্টি করেছে নিশ্চিত কর্মসংস্থান। নিজের বাড়িতে আপনজনের সাথে থেকেই তারা সংসারের আর্থিক চাহিদা মেটাচ্ছে। এমনকি অতিরিক্ত সম্পদেরও মালিক হচ্ছে। তাদের জন্য আমার কোন আফসোস নেই, কারণ অন্যথায় তারা আরও নিম্নস্থরের কাজে নিযুক্ত হতে হতো। অথবা বেকারত্বের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে অপরাধ জগতে ঢুকে যেতো। তাই, তাদের এই উত্তরণে আমি বরং গর্বিত।

আমি তাদের জন্য, সেসব ছোট-ভাইবোনদের জন্য ব্যথিত হই, যারা অনেক অর্থ ও মেধা দিয়ে শিক্ষাজীবনের প্রায় সবগুলো স্তর অতিক্রম করেছে। আত্মসিদ্ধির মহাসড়কে আর ক’টা দিন হাঁটতে পারলেই তারা আরও সম্মানজনক একটি কর্মসংস্থান অথবা সামাজিক অবস্থান অর্জন করতে পারতো। কিন্তু আউটসোর্সিংয়ের ‘কুইক মানি’ তাদেরকে আত্মসিদ্ধির পথকে রুদ্ধ করে দিয়েছে। তাদেরকে থামিয়ে দিয়েছে গ্রাফিক্স আর ওয়েব ডিজাইনের মাঝে। অন্যথায়, তারা বৃহত্তর সমাজে নিজের অবস্থান তো নিশ্চিত করতে পারতোই, সে সাথে দেশ ও জাতির উন্নয়নের ডিজাইন করতে পারতো।

আমি খুব চাচ্ছিলাম কেউ আমাদের চোখগুলো খুলে দিক। আমরা যে আউটসোর্সিংয়ের নামে নতুন নীলকুটির শোষণে পড়েছি, তা কেউ আমাদেরকে বলে দিক। আমি যুক্তি খুঁজতেছিলাম, কীভাবে এমন একটি জনপ্রিয় বিষয়ের বিপরীতে কথা বলা যায়। বস্তুত, আমি এর বিপক্ষে নই, চাই শুধু দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। চাই আরও নেগোশিয়েশন হোক, বাঙালির ক্ষমতা বাড়ুক শ্রমের দামটি আরেকটু বেশি হাঁকার। আর চাই, সম্ভাবনাময় ও প্রতিশ্রুতিশীল নতুন প্রজন্ম ওখান থেকে সোজা বের হয়ে আসুক। এসে জাতি ও দেশ গঠনের অন্যান্য কাজে হাত দিক।

আমার মনের কথাগুলো যেন অবিকল পেয়ে গেলাম একটি ব্লগপোস্টে। লিখেছেন সাবেক মন্ত্রী ও রাজনীতিবিদ আবু সাঈদ :

“ইদানীং নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে, লাখো বেকারের কাজের সংস্থান হবে। কীভাবে হবে? বিশ্বায়নের প্রভাব এখানেও হাত দিয়েছে এবং এর দূতিয়ালি করার মহাজনদের দেখা যাচ্ছে। প্রযুক্তির পরিভাষায় এর নাম ‘আউটসোর্সিং’। করপোরেট বিজনেস হাউস, বড় বড় কোম্পানি তাদের গোটা কাজের কিছু অংশ বাইরে থেকে করিয়ে নিতে চায়। কারণ সস্তা মজুরি। আমেরিকায় যে কাজে শ্রমিকের পাওনা ঘণ্টায় ২৫ ডলার, মেক্সিকােতে তা ১ ডলার, চীনে ৫০ সেন্ট, ভিয়েতনামে ৩০-৩৫ সেন্ট, বাংলাদেশে ১২ সেন্ট। এই ‘আউটসোর্সিং’-এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম ঝুঁকে পড়ছে। রাত জেগে দীর্ঘ সময় ব্যয় করে তারা যা শ্রম-মজুরি পাচ্ছে তাকে তারা লাভ মনে করে। আসলে তারা যে শোষিত হচ্ছে এ কথা বুঝলেও তাদের করার কিছুই নেই।

মায়ের কানের গয়না বিক্রি করে যারা পরীক্ষার ফিস দিয়েছে, বাবার একমাত্র ধানী জমিটি বিক্রি করে যারা সেশন চার্জ দিয়েছে, সেসব মেধাবী তরুনদের মাথায় ‘নব’ লাগিয়ে শোষণ করে নিচ্ছে তাদের জীবনী শক্তি। আউটসোর্সিংয়ের মায়ায় আটকে গিয়ে তারা আর উন্নততর বা সৃষ্টিশীল কিছু চোখে দেখছে না। তারা আর বের হতে চায় না, ঘরেই বসে থাকতে চায়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, শোষিত হচ্ছে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এবং মহানন্দে!

এমন কি কোন আঁকিয়ে আছেন? কোন কার্টুনিস্ট? যিনি যথাযথভাবে এবং কোন ভুলবুঝাবুঝির সৃষ্টি না করে উপরের চিত্রটি ছবিতে রূপান্তর করতে পারেন? 

 

 

—————————-
প্রথম প্রকাশ এবং পাঠক প্রতিক্রিয়া

আলাদা পোস্টের মাধ্যমে সহব্লগারের প্রতিক্রিয়া এক। এবং প্রতিক্রিয়া দুই

কীভাবে মানুষকে আরও ভালোভাবে শুনা যায়/ শোনা The Art of Listening

১) প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়াই আপনি একটি পরিস্থিতিতে বিয়ে করেছেন।সেটি করেছেন প্রেম করে এবং পরিবার-পরিজনকে না জানিয়ে। এর যথাযথ কারণ এবং যুক্তি আপনার কাছে হয়তো আছে। কিন্তু ভিন্ন সম্প্রদায়ে বিয়ে হবার কারণে পরিবার এবং সমাজও আপনার প্রতিপক্ষ হয়ে আছে। ভীষণ মানসিক চাপে আপনি একেকটি ঘণ্টা অতিক্রম করছেন। এপরিস্থিতিতে আপনার বাবাই, যিনি একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিও, আপনাকে সাহায্য করতে পারেন। কিন্তু সমস্যা হলো আপনার বাবা কখনও আপনাকে প্রাপ্তবয়স্ক এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে মেনে নেন নি। এবং এক্ষেত্রেও বাবা হবেন আপনার প্রধান সমস্যা। আপনার ধারণা আপনার কঠোর বাবা যদি আপনার যুক্তিগুলো শুনেন, তবে অবশ্যই আপনাদেরকে মেনে নেবেন। তিনি যদি তা মেনে নেন, তবে কেউ আর আপনাদেরকে বিপদে ফেলতে পারবে না। অন্যদিকে যদি কথাগুলো না শুনাতে পারেন, তবে পরিস্থিতি হবে সম্পূর্ণ বিপরীত। কিন্তু যদি আপনার বাবা আপনাকে না শুনেন তবে কেমন হতে পারে পরিস্থিতি?

আপনি মন-প্রাণ দিয়ে যাচ্ছেন কেউ আপনার কথাটি অন্তত শুনুক। আপনার ভেতরে অনেক কথা/ অভিমত/ তথ্য জমে আছে, আপনি যাচ্ছেন নির্দিষ্ট ব্যক্তিটি সেটি শুনুক। সে আপনার কথায় সম্মতি দিক অথবা না দিক, অন্তত আপনার কথাগুলো শেষ হতে দিক – এরকম পরিস্থিতি আপনার কি কখনও মনে হয়েছে? আপনার কি কখনও মনে হয়েছে যে, কেউ আপনার কথায় কর্ণপাতই করে নি? অথবা শুনেও শুনে নি? অনেক চেষ্টা করে কারও মনযোগ আকর্ষণের কথা কি আপনার মনে পড়ে? এরকম অসহায় পরিস্থিতিতে আপনার কেমন লাগে?

২) একটা সময় ছিল যখন বলা হতো, মানুষের অন্তরের প্রবেশের পথটি হলো তার পাকস্থলি। অর্থাৎ, মানুষকে ভালোভাবে ভোজন করিয়ে তার অন্তরে প্রবেশ করা যায়। কিন্তু আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় যোগাযোগের মাধ্যম যেমন বদলেছে, তেমনই বদলেছে মানুষের অন্তরের প্রবেশের রাস্তা! এই ব্যবস্থায় মানুষের অন্তরে প্রবেশের পথটি হলো তার কথায় কর্ণপাত করা। মানুষ যত রাবিশ বলুক, সে চায় তার কথা শুনাতে। তার কথা যে শুনবে, সেই পাবে তার অন্তরে প্রবেশের গোপন চাবি। বর্তমান সমাজে একজন ভালো শ্রোতা মানেই হলো ভালো বোদ্ধা। “ভালো একজন শ্রোতা শুধুই জনপ্রিয় নন, অবশেষে দেখায় যায় যে, চূড়ান্ত কথাগুলো তার কাছে জমা হয়ে আছে।” (উইলসন মিজনার) আজকের লেখাটি পৃথিবীর ভালো শ্রোতাদেরকে উৎসর্গ করছি, যারা বিশেষ কিছু করে নয়, শুনেই মানুষের মনে শান্তি এনেছেন।

একটি ব্যস্ততম কল সেন্টারের ব্যবস্থাপককে জিজ্ঞেস করা হলো, কীভাবে তিনি অগণিত অভিযোগের নিষ্পত্তি করেন। ব্যবস্থাপক শুধু সংক্ষেপে জানালেন যে, ৮০% অভিযোগ শুধু শুনে এবং লিখে রাখাতেই সমাধান হয়। বাকি ১০% অভিযোগ শেষ হয় অপেক্ষায়। অর্থাৎ কিছুদিন পর্যবেক্ষণে রাখলেই ১০% অভিযোগের সমাধান হয়। মাত্র ১০% অভিযোগ নিয়ে বাস্তবিকভাবে তাদেরকে কাজ করতে হয়। এক্ষেত্রে মূল চাবিকাঠি হলো, গ্রাহকের অভিযোগগুলো পূর্ণ মনযোগ এবং সহানুভূতির সাথে শুনে যাওয়া।

দেশের ডাক্তারদের নিয়ে যখন সমালোচনা হয়, তখন একজন সুদক্ষ শ্রোতা এবং ব্যতিক্রমী ডাক্তারের কথা আমি স্মরণ করি। তাতে ডাক্তারদের প্রতি আমার অসন্তুষ্টি থাকে না। কর্মজীবনে আমি এই ডাক্তারকে পেয়েছি, যিনি আমার প্রকল্পে কাজ করেছেন আমার টিমমেট হিসেবে। সুন্দর হাতের লেখায় তার প্রেসক্রিপশনও ছিলো ব্যতিক্রম – সবাই পড়তে পারতো। তার কাছে রোগী আসতো অন্যের কাঁধে হাত দিয়ে আর ফিরে যেতো একা হেঁটে। এটি কোন বিস্ময়কর বিষয় নয়, অথবা ডাক্তারেরও যে খুব বেশি হাতযশ ছিলো তা নয়। বিষয়টি হলো সম্পর্কের। তিনি সবার সাথে মিশতে পারতেন এবং আন্তরিকভাবে শরীর সম্পর্কে প্রশ্ন করতে পারতেন। সবচেয়ে বড় বিষয়, তিনি ছিলেন একজন উত্তম শ্রোতা। তার সাথে কথা বলে রোগী মানসিক শক্তি তখনই ফিরে পেতো। বাকিটুকু ওষুধ আর বিশ্রামের বিষয়।

৩) আমি তোমাকে শুনি = ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’

আমাদের সমাজের অবস্থা হলো এরকম: বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, নিয়েছে আবেগ। পাশাপাশি বসে স্মার্টফোনে আঙ্গুল চালাচ্ছি, অথচ পাশে বসা আপন মানুষটির কথা শুনছি না। এত কাছে থেকেই আজ আমরা কত দূরে চলে গেছি। ইমেলের পর যেমন চিঠিলেখার প্রচলন চলে গেছে, তেমনি স্মার্টফোনের ফ্রি-চ্যাটিং এর যুগে কথা বলা ও কথা শোরনার প্রচলন কমে যাচ্ছে। মানুষ হয়ে যাচ্ছে দারুণভাবে আত্মকেন্দ্রিক। এরকম এক ধ্বংসায়মান সমাজ ব্যবস্থায়, ‘অন্যের কথা মনযোগ দিয়ে শোনা’ একটি বিরল মানবিক গুণে পরিণত হচ্ছে। শুনলেও অন্যকে চেনা যায়, সম্পর্ক গড়া যায়; এগিয়ে যাওয়া যায়। এখন ‘তোমাকে আমি শুনি’ হলো ‘তোমাকে আমি ভালোবাসি’ বলার আধুনিক রূপ। (অবশ্য, ব্লগীয় যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিষয়টি হতে পারে একটু অন্যরকম: ‘আপনার লেখা আমি পড়ি’।)

‘ভালোবাসার প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে শোনা।’ (পল টিলিচ) কিন্তু এবিষয়ে আমার ব্যক্তিগত দুর্বলতাটি অত্যন্ত সহজাত। তাহলো আমি কোনকিছুতে যখন মনযোগ দেই, তখন আমার দেহ-মন-প্রাণ চলে যায় সেটিতে। কী বই, কী কম্পিউটার, কী টিভির সংবাদ অথবা নাটক। তখন অন্য কোনকিছু আমার কানেও আসে না, চোখেও ভাসে না। ধরুন টিভিতে খবর দেখছি, তখন আমার সঙ্গীনীটি কোন বক্তব্য বা অভিমত বা অভিযোগ নিয়ে আসলেন, প্রথমমত সেটি আমার কর্ণেই প্রবেশ করে না। অভ্যাসগতভাবে হুম বা হ্যাঁ দিয়ে অনেক বার ধরা পড়েছি। কিন্তু আমার সঙ্গীনীটি খুব অভিমানী। যখনই প্রমাণিত হয়েছে যে, আমি না শুনেই জবাব বা সম্মতি দিয়েছি অথবা যখন সাব্যস্ত হয়েছে যে, তার গুরুত্বপূর্ণ কোন কথা আমি শুনি নি, তখন থেকেই ‘অবরোধ’ শুরু। মানে তার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। অন্তত বেশ কিছু সময় চলে যাবে, স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে। তার যুক্তিটি হলো, আমি তার কথায় গুরুত্ব দেই না। অথচ সে যে আমাকে অন্য কিছুতে ব্যস্ত থাকার পরও কথা বলেছে, তার কোন দোষ নেই! এ নিয়ে আমাদের মধ্যে প্রায়ই খুঁনসুঁটি হয়। তার হিসাবটি খুব সোজা, তার ধারণা তার কথা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। সামান্য একটি শোনার বিষয় থেকে সম্পর্ক অবনতির দিকে যেতে পারে, যদি অন্যান্য বিষয়ও অনুকূল না থাকে।

সম্প্রতি একটি টিভি শো’তে অনুষ্ঠানের পরিচালক পুরস্কার বিজয়ী শিশুটিকে জিজ্ঞেস করলেন,
-তো, তুমি বড় হলে কী হতে চাও?
-বড় হয়ে আমি পাইলট হতে চাই।
মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসের হারিয়ে-যাওয়া বিমানটির কথা মনে করে দর্শকরা হেসে ওঠলো। তাতে শিশুটিকে আড়ষ্ট দেখাল।

সঞ্চালক একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ফের জিজ্ঞেস করলেন,
-ভালো কথা। ধরো তোমার বিমানটির সকল মেশিন একসাথে বন্ধ হয়ে গেলো। তখন তুমি কী করবে?
-সকলকে বলবো সিটবেল্ট বেঁধে শক্ত হয়ে বসে থাকতে।
-আর তুমি?
-আমি সাথে সাথে প্যারাশুট পড়ে বিমান থেকে জাম্প দেবো।
এবার দর্শকদের হাসিতে সঞ্চালক নিজেই প্রায় থেমে গেলেন। কিন্তু দর্শকদের হাসির মধ্যে শিশুটি তখন কাঁদছে। শিশুটির প্রতি সঞ্চালক তার মনসংযোগ কমালেন না।
-কেন তুমি জাম্প দেবে?
-আমি তো তাদেরকে ফেলে যাবো না! আবার ফিরে সাহায্য নিয়ে আবার ফিরে আসবো।

শেষ কথাটি না শুনে আমরা প্রায়ই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, অথবা নিজেদের অভিজ্ঞতা দিয়ে অন্যের কথা বিচার করি। ঠিক এই বিষয়টি মানুষকে ভালো শ্রোতা হতে দেয় না। আমরা অর্ধেক শুনি, এক চতুর্থাংশ বুঝি এবং প্রতিক্রিয়া করি দ্বিগুণ। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বলেছেন, “কেউ কিছু বললে তাকে পুরোপুরি শুনুন। কিছু মানুষ আছে তারা কখনও অন্যের কথা শুনে না।”

৪) ভালোভাবে শোনার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

শোনার অভ্যাস ‘সম্পর্ক তৈরি ও রক্ষায়’ দারুণ সহায়তা করে।
•তাদের আস্থা বেড়ে যায়
•তারা সম্মানীত বোধ করে
•সহজেই আপন হয়
•শ্রোতার প্রতি আনুগত্য বেড়ে যায়
•ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়
•সম্পর্ক গড়ে ওঠে/ বৃদ্ধি পায়

অন্যের কথা শুনলে তাৎক্ষণিকভাবে শ্রোতা যেসব সুবিধা পেয়ে থাকেন:
•বক্তার মনের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়
•শ্রোতা সম্পর্কে কোন নেতিবাচক অনুভূতি থাকলে সেসম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়
•ভবিষ্যতে কীভাবে তার সাথে আচরণ করতে হবে, তা জানা যায়
•ব্যক্তিগত দুর্বলতা/সবলতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়
•শ্রোতার প্রতি শ্রদ্ধা/আনুগত্য সৃষ্টি হয়

শোনার জন্য যেসব মানসিক প্রস্তুতির প্রয়োজন:
•নিজের মনে আগ্রহ সৃষ্টি করা
•সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কে নেতিবাচক চিন্তা দূর করা
•বিষয়টির সাথে মানসিকভাবে সম্পৃক্ত হওয়া
•ভেতরের বাধাগুলো দূর করা;
•মনকে উন্মুক্ত করে দেওয়া;

বাহ্যিক প্রস্তুতি:
•যে কথা বলে, তার দিকে তাকানো;
•স্বাভাবিক এবং স্বস্তিতে থাকা – অস্থিরতা না দেখানো;
•চোখে চোখ রাখা (ভুল প্রয়োগ যেন না হয!);
•বাইরের বাধা-বিপত্তিগুলো সরিয়ে রাখা;
•সঠিকভাবে ‘সারা’ দেওয়া;
•অভিযোগ শুনলেও কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা;
•একই অভিমত বা একই অভিজ্ঞতা থাকলেও সেটি এখন বলার দরকার নেই;
•বক্তার কথায় মনযোগ দেওয়া, অন্য কোন কথা বলার প্রস্তুতি বন্ধ করতে হবে;

আচরণগত বিষয়গুলো:
•স্মিত হাস্যে বক্তাকে কথা বলা চালিয়ে যেতে দেওয়া
•পরিস্থিতি বুঝে ‘আচ্ছা/ তাই নাকি/ হুম/ বুঝতে পেরেছি/ বলতে থাকুন’ ইত্যাদি বলা
•মুখমণ্ডলে একই বক্তব্য রাখা: বিরক্তি বা অস্বস্তির চিহ্ন না রাখা
•‘আপনার কথা আমি যাচাই করে দেখছি/ দেখবো’ এরকম মনোভাব না দেখানো
•বক্তার কথাকে বুঝার জন্য অথবা আরও স্পষ্ট হবার জন্য প্রশ্ন করা যায়
•কিছু বলতে/ যোগ করতে চাইলে, কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা

সাবধানতা:
•‘আপনি কি নিশ্চিত?’ এরকম বক্তব্য না দেওয়া
•‘পরিস্থিতি এত খারাপ না’ এরকম কথা না বলা
•কোনভাবেই বিতর্ক বা বক্তার কথাকে চ্যালেন্জ না করা
•বিষয় পরিবর্তন না করা, বা অন্য বিষয়ে জাম্প না করা
•কোনভাবেই কথায় বাধা সৃষ্টি না করা
•কোনভাবেই বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ না হওয়া
•‘অধিকাংশ মানুষই শুনে বলার জন্য।’ বলার সুযোগের অপেক্ষায় শুনবেন না।

অন্যের কথা শুনতে যেসব বিষয় বাধার সৃষ্টি করে:
•মানুষটি (বক্তা) সম্পর্কে নেতিবাচক পূর্বধারণা
•আগে থেকেই কিছু ধারণা করে ফেলা
•অন্যমনষ্কতা
•বক্তা সম্পর্কে অসম্মানবোধ
•বক্তা সম্পর্কে গোপন অভিযোগ/অভিমান
•আত্মঅহমিকা

অন্যের কথা শুনতে পারা একটি শিল্প: অভিজ্ঞদের পরামর্শ:

•কাজ বন্ধ করুন – যে কথা বলতেছে তার দিকে দৃষ্টি দিন
•তার কথা শুনুন এবং শান্ত হয়ে বসুন/দাঁড়ান
•হ্যাঁ বলে অথবা মাথা দিয়ে সাড়া দিন
•না বুঝলে অথবা আরও পরিষ্কার হবার জন্য প্রশ্ন করুন
•গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিশ্চিত হবার জন্য আবার পুনরাবৃত্তি করতে পারেন।
(উপরোক্ত পদক্ষেপগুলো ক্ষেত্রবিশেষে বিভিন্ন হতে পারে।)

৫) ‘শোনা’ সম্পর্কে বিখ্যাত কয়েকটি উক্তি:

ভালোবাসার প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে শোনা। -পল টিলিচ

•শুনতে আমি পছন্দ করি। শোনা থেকে আমি অনেক শিখেছি। অধিকাংশ মানুষ শুনতে চায় না। -আরনেস্ট হেমিংওয়ে

•যেসব সফল ব্যক্তির কথা আমি শুনেছি, তারা অধিকাংশই বলেছেন কম, শুনেছেন অনেক বেশি। -বারনার্ড বারুচ

শোনার জন্য চেষ্টা লাগে। শুধুই শুনে যাওয়ার মধ্যে কিছু নেই – হাসেরাও শুনে। -আইগর স্ট্রাভিনস্কি

ভালো একজন শ্রোতা শুধুই জনপ্রিয় নন, অবশেষে দেখায় যায় যে, চূড়ান্ত কথাগুলো তার কাছে জমা হয়ে আছে। -উইলসন মিজনার

•মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক প্রয়োজনটি হচ্ছে অন্যকে বুঝা এবং বুঝতে দেওয়া। অন্যকে বুঝার সবচেয়ে উত্তম পথটি হচ্ছে, তাদের কথা শুনা। -ড. র্যা লফ নিকোলস

ভালো শ্রোতা হতে মহৎ মানুষ হতে হয়। -ক্যালভিন কুলিজ

আমাদের কান দু’টি কিন্তু মুখ একটি। অর্থাৎ আমাদেরকে বলার চেয়ে বেশি শুনতে হয়। -জেনো অভ সিটিয়াম

অধিকাংশ মানুষই বুঝার ইচ্ছা নিয়ে শুনে না; তারা বলার প্রস্তুতি নিয়ে শুনে। -স্টিফেন আর কোভি

শোনার বিষয়টি হৃদয় হতে আসে; অন্যের কাছে আসার অকৃত্তিম ইচ্ছা, যা উভয়কেই আকর্ষিত করে এবং শান্তি দেয়। -সারা হার্ট

৬) সর্বাঙ্গে শুনা

চোখ রাখুন বক্তার চোখে – এদিক ওদিক তাকাবেন না, আকাশের তারা গুণবে না
কর্ণযুগল সদা প্রস্তুত – অনেক কিছু না শুনতে চেয়ে শুধু কথা শুনায় মনোযোগ দিন
মুখ থাকুক বন্ধ – গুণ গুণ করে গান গেয়ে ওঠবেন না!
হাতগুলো শান্তভাবে কোলে/টেবিলের ওপর রাখুন – পকেটেও রাখতে পারেন!
পদযুগল – মেঝেতে রাখুন – কটকট করে ফ্লোরে সুর তুলবেন না
দেহখানি বক্তা বরাবর ধরে রাখুন – তবে যথা দূরত্বে!
মস্তিষ্ক – মহাদুষ্টু। একে একান্তই আলোচ্য বিষয়ে ধরে রাখুন!
হৃদয় – বক্তার বিষয়ের প্রতি আন্তরিক হোন। শোনার বিষয়টি হৃদয় হতে আসে

*** কর্মজীবন/জীবন দর্শন নিয়ে সামু’তে প্রকাশিত অন্যান্য পোস্টগুলো:

সাউথপোলার/ স্বশিক্ষিত ক্ষণজীবীরা
কর্মক্ষেত্রের শুরুর দিনগুলো কেমন হওয়া চাই
ইনার পিস – আত্মার শান্তি
কৃত্তিম উপায়ে হাসুন!

—————–
পরিশিষ্ট:

ক. ‘অন্যকে শোনা’ নিয়ে ব্যক্তিগত অনুসন্ধানের একটি লিখিত রূপ এটি। লেখক নিজেও এবিষয়ের শিক্ষার্থী!
খ. বিভিন্ন উৎস থেকে ছড়িয়ে থাকা তথ্যগুলো একসাথে করে উপস্থাপন করা হলো। কিছু কিছু কনসেপ্ট সংগৃহীত হলেও ভাষাগত সত্ত্ব লেখকের নিজের।
গ. ইংরেজি বক্তব্যের ছবিগুলো ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।
ঘ. বাংলা বক্তব্যের ছবিগুলো লেখকের নিজের।
ঙ. অন্যকে শোনা নিয়ে লেখকের অনুসন্ধান চলতেই থাকবে।

 

[সামহোয়ারইন ব্লগে প্রথম প্রকাশ এবং পাঠক প্রতিক্রিয়া: ২৪ মে ২০১৪]

ভিয়েতনামি কন্যার গ্রাজুয়েট হয়ে ওঠার কাহিনি

তাইতি নুয়েন। বয়স বিশ। ভিয়েতনামের মেকং ডেল্টা এলাকার এক হতদরিদ্র পরিবারের নয় সন্তানের অষ্টম সন্তান। দরিদ্রতা এবং নিজ পরিবারের সাথে এক প্রকার যুদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত গ্রাজুয়েট ডিগ্রি অর্জন করেন এই অসাধারণ নারী। ভূষিত হন নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর ‘গ্রাজুয়েট অভ্ দ্য ইয়ার’ খেতাবে। তাইতি তার গ্রামেরও প্রথম গ্রাজুয়েট।

একাধিকবার বই পুড়িয়েও পড়াশুনা থেকে মন ফেরাতে পারেন নি তাইতি’র মা। তাই স্নাতক সনদ অর্জনের কাজটি খুব সহজ ছিল না তার জন্য। প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ হবার পরই পড়াশুনা বন্ধ করে দিয়ে হো-চি-মিন শহরে গিয়ে কাজের মেয়ের কাজ নিতে হয় তাইতিকে।

অষ্টম শ্রেণীতে থাকা অবস্থায় তাইতি’র মা তার সব বই পুড়িয়ে দেন। উদ্দেশ্য, তাইতিকে পড়াশুনা থেকে মন সরিয়ে কাজে পাঠানো। অভাবি মাকে দোষারোপ করে নি তাইতি। বরং তার তার বাধাকে প্রেষণা হিসেবে নিয়েছে। অন্যদের থেকে ধার করে পড়েও তাইতি পরীক্ষায় ভাল ফলাফল ধরে রাখে।

দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়ার সময় আবারও বই পুড়িয়ে দেন তার বাবা-মা। এখানেও তারা বাধা হতে পারেন নি। দ্বাদশ শ্রেণী পাশ করে তাইতি গোপনে কলেজে ভর্তির জন্য পড়তে থাকে। কিন্তু মা-বাবা ভেবেছিলেন, হয়তো এপর্বে এসে তাইতি সংসারের হাল ধরবে। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় একদিন মা’র চোখে ধরা পড়ে যায়। তাতেই মা তাকে রাগ করে বলেন, “দেখিস তুই পরীক্ষায় ফেইল করবি!”

কলেজে ভর্তি পরীক্ষার দিন যেখানে অন্য সকল ভর্তিচ্ছু ছেলেমেয়ের মা-বাবা এসেছেন সাহস দেবার জন্য, তাইতি’র মা তাকে পাঠিয়েছেন নির্মম এক অভিশাপ দিয়ে! কিন্তু মায়ের অভিশাপ আশির্বাদ হিসেবে কাজে এসেছিল তাইতি’র জন্য। কলেজে পড়াশুনার সুযোগ সে পেয়েছিল।

এত কিছুর পরও পরিবারের সহায়তা ছাড়া তাইতি’র কলেজে পড়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিন্তু ছাত্রজীবনের অর্থ সংগ্রহের একটি সুযোগও হাতছাড়া করে নি । কাজ করেছে বিভিন্ন কারখানায়। সাপ্তাহিক ছুটি, নববর্ষের ছুটি অন্য সকল শিক্ষার্থীর জন্য আনন্দের বিষয় হলেও, তাইতি সেটিকে কাজ করে অর্থ উপার্জনের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়েছে। হাঁসের সুপের দোকানে কাজ করেছে রাত দু’টা অবধি। ভিয়েতনাজের নববর্ষ উদযাপনের রাতে সকলে যখন আনন্দ উৎসব আর আতশবাজি ফুটানোয় ব্যস্ত, তখন কর্মব্যস্ত তাইতি শুধু দূর থেকে একবার তাকানোর সুযোগ পেতো।

কলেজ পর্যায়ে তাইতি চরম কৃচ্ছ্রতা আর মিতব্যয়ীতায় জীবন অতিবাহিত করেছে। বাংলাদেশি পাঁচশো টাকায় তার সপ্তাহের থাকা-খাওয়া চলতো। অপুষ্টিতে ভোগেছে এবং ক্লাসে একাধিকবার জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাবার ঘটনাও তার আছে। সহপাঠি এবং শিক্ষকেরা টের পেলেন যে, তাইতি না খেয়ে থাকে এবং তার খরচের টাকা নেই! এটি তার আত্মসম্মানকে আঘাত করলেও পরবর্তিতে তার ক্লাসমেট এবং শিক্ষকেরা তাকে অনেক সাহায্য করেছে।

একটি ছোট কক্ষে আরও দু’জন শিক্ষার্থীর সাথে তাইতি থাকতো। টেবিল ল্যাম্প লাগিয়ে কাউকে বিরক্ত না করে অর্ধরাত পর্যন্ত পড়াশুনা করতো সে। একটি সমাজকল্যান সংস্থা তার সাহায্যে এগিয়ে আসায় তাকে পরবর্তিতে না খেয়ে মারা যেতে হয় নি। তারা তাকে একটি সাইকেলও দিয়েছিলো – তাতে তার যাতায়াত খরচ বাঁচতো।

‘একটি ছেলেকে শিক্ষিত করলে একজন মানুষ শিক্ষিত হয়, কিন্তু একজন মেয়েকে শিক্ষিত করলে একটি গ্রাম শিক্ষিত হয়।’ নারীর শিক্ষা একজনের মধ্যে শেষ হয় না – একথাটি তাইতি’র ক্ষেত্রে আরও সত্য। সে পরবর্তিতে তার ছোট ভাইবোনদেরকেও তাদের আগ্রহ ও অবস্থানমতো পড়াশুনা করে ভালো কাজের সন্ধান দিয়েছে। তার জেলে ভাইকে কলেজে ভর্তি করিয়েছে।

তাইতি’র স্বপ্ন ইংরেজি শিক্ষক হওয়া। মা-বাবা যখন দেখতে পেলেন যে, তাইতি খুব শিঘ্রই একটি ভালো-বেতনের চাকরি পেতে যাচ্ছে, তারা তখন তাকে বুঝতে শুরু করেছেন। এরপর থেকে তার ইচ্ছাকেও মূল্য দিতে শুরু করলেন।

বর্তমানে তাইতি তার নিজ গ্রামের শিশুদের শিক্ষার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। সে শিক্ষার পক্ষে জনমত তৈরি করতে চায়। ‘আমি মানুষের ধারণা বদলে দিতে চাই’ এ হলো তার কথা। ‘এভাবেই আমি আমার সমাজকে প্রতিদান দিতে চাই।’ আমাদের সমাজেও এরকম ঘটনা অনেক হয়তো আছে। কত রকমের সামাজিক এবং পারিবারিক বাধাকে জয় করে একটি মেয়েকে জিপিএ-ফাইভ পাচ্ছে, হয়তো সকলে তার খবর রাখি না। তাইতি তাদের সকলের জন্য প্রেরণা হয়ে থাকবে।

.

.

[প্রথম প্রকাশ এবং পাঠক প্রতিক্রিয়া]

———————-
*নিউইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে। নিবন্ধটি পড়েই বুকমার্ক করে রেখেছিলাম। জানি না বাংলাদেশি কোন পত্রিকায় খবরটি এসেছে কিনা। এশিয়ার দেশগুলো নারীর ওঠে আসার সংগ্রাম প্রায় একই।

নারী অধিকার সংশ্লিষ্ট অন্যান্য লেখাগুলো:

::: অনলাইন পত্রিকাগুলোর আগ্রাসী ‘ট্যাবলয়েড’ স্বভাব এবং জাতীয় পত্রিকার রুচিশীলতা

ব্যবসায়ী চৌধুরি আলমের একমাত্র মেয়ে নোমিতা। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে অকালে আলম সাহেবের স্ত্রী মারা যান। মেয়ের ভবিষ্যত সম্পর্কে নিশ্চিত না হতে পেরে আলম দ্বিতীয় বিয়েতে মত দেন নি। ব্যবসায়ে পূর্ণ মনযোগ এবং কর্মশক্তি প্রয়োগ করেন। একমাত্র সংকল্প, মেয়েকে ভালো একটি জীবনের সন্ধান করে দেওয়া।

মেধাবী ছাত্রী নোমিতা এ-লেভেলস শেষ করলে বাংলাদেশী হবার সুবাদে নিজে থেকেই একটি ব্রিটিশ স্কলারশিপ যোগাড় করে। কিন্তু বাবা বেঁকে বসেন। বাবার ইচ্ছা ছিলো দেশেরই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেবেন। পিতৃ হৃদয়ের প্রত্যাশা ছিলো, তাতে মেয়ে চোখের সামনে থাকবে। কিন্তু আত্মীয়-বন্ধুরা তাকে বুঝালো যে, মা-মরা মেয়েকে এখানে যথাযথ দেখাশুনা করা যাবে না। বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশি ছেলেমেয়েরা অন্যরকম প্রেরণা পায় পড়াশুনা করার।

নোমিতার লন্ডন যাবার দু’বছরের মধ্যে আলম গ্রেফতার হন। তার ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জের ধরে একটি জাতীয় পত্রিকার মালিকের সাথে তার বিরোধ তৈরি হয়। সেই পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদের প্রেক্ষিতে কয়েক দিনের মধ্যেই চোরাচালান এবং সিন্ডিকেট ব্যবসায়ের অভিযোগে আটক তিনি হন। এরপর থেকে কযেকটি পত্রিকা নোমিতার প্রাত্যাহিক জীবন নিয়ে চমকপ্রদ খবর দিতে শুরু করে।

এবার একটি সংবাদ দেখুন*:

“মা নেই বাবা জেলে। তাকে দেখাশোনা করার কেউ নেই। তাই সারাক্ষণ নিজের খাম-খেয়ালিপনায় মত্ত থাকেন ঢাকার কুখ্যাত সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী নোমিতা চৌধুরি। নোমিতা একজন পূর্ণ বয়স্ক নারী। দেখতেও মন্দ নয়। ব্রিটেনে পড়াশুনা ও বড় হওয়া। বাঙালির মেয়ে হলেও পশ্চিমা সংস্কৃতি তাকে ভীষণ ভাবে টানে। তাই প্রেমিক হিসেবে কোনো বাংলাদেশী যুবককে চান না নোমিতা। তাঁর চোখে বাংলাদেশীদের চেয়ে বরং ব্রিটিশরা ভালো। পশ্চিমারা নাকি সুখে থাকার মন্ত্র জানে! সেই নীতিতে নোমিতাও বিশ্বাসী। হইহুল্লা আর বাহ্যিক সুখটাই তার কাছে প্রধান বিষয়।

ভালো-মন্দ বুঝার বয়স নোমিতার হয়েছে। কিন্তু মা-বাবার অনুপস্থিতিতে আজকাল বেসামাল জীবন যাপন করছেন নোমিতা। বন্ধুদের সঙ্গে মাঝরাতের পার্টিতে হৈ-হুল্লোড় করতে আজকাল তার খুব পছন্দ। প্রায়ই তাকে বিভিন্ন পার্টিতে দেখা যায়। এই তো সেদিনের কথা। টাওয়ার হ্যামলেটের কলামবিয়া রোডে একটি লেট নাইট পার্টিতে তাকে খুব বেসামাল অবস্থায় দেখা যায়। শুধু তাই নয়, সেদিন রাতে তার এক বন্ধুর সাথে খুবই ঘনিষ্ট অবস্থায় দেখা যায়। অবশ্য এখানে বিস্মিত হবার কিছুই নেই। একজন কালোবাজারির মেয়ের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি কিছু তো আশা করা যায় না!”

‘এই তো সেদিন’… অর্থাৎ একদিনের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে করে তারা বিশাল বড় একটি কাহিনি রচনা করতে পারেন। এরকম মুখরোচক সংবাদ এখন ব্রাউজার খুললেই চোখে পড়বে। ঘটনা কতটুকু সত্য সেটি অন্য বিষয়, কিন্তু পত্রিকাগুলোর উদ্দেশ্য যে ভালো নয়, তা নিশ্চিত বলা যায়। মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে ব্যবচ্ছেদ করে সংবাদ বিক্রি করে তারা সমাজের কী উন্নয়ন করে আমার উপলব্ধিতে আসে না।

সম্প্রতি অগণিত অনলাইন পত্রিকার বিস্তৃতিতে বিষয়টি অনেকটা মহামারি আকার ধারণ করেছে। আগে জানতাম, ব্লগার বা অনলাইন একটিভিস্টরা ‘হিট খোর’ – তাদের একটি বড় অংশ হিট বা ক্লিক সংখ্যার জন্য প্রায় বেপরোয়া হয়ে খাটে। নানান রকমের চটুল লেখা দিয়ে পাঠকের দৃষ্টিকে মিলিসেকেন্ড সময়ও যদি ধরে রাখা যায়, তবেই তাদের হলো। হিট, ক্লিক আর লাইক এর সংখ্যা দিয়ে তারা নিজেদের গ্রহণযোগ্যতার বিচার করে।

আরেকটি পক্ষ আছে যারা বাস্তবিক জীবনেও কম জনপ্রিয় নন। তবুও ফেইসবুকে ভক্তের সংখ্যা লক্ষাধিক না হলে তাদের চলে না। লক্ষাধিক থেকে মিলিয়নাধিক। এর মধ্যে প্রায় সকল শ্রেণীই আছেন: অভিনেতা, স্পোর্টম্যান, মডেল, নেতা, মন্ত্রী এবং খ্যাতিমান লেখক। ভক্তের সংখ্যা একটি বড় মাইলস্টোনে পৌঁছালে তারা আবার গর্বের সাথে ঘোষণাও দেন। যেমন, সেদিন একজন খুবই বিখ্যাত অভিনেত্রী তার একটি সেল্ফি দিয়ে ধন্যবাদ জানালেন ভক্তদেরকে।

যা হোক, যে বিষয়টি আমাকে বেশি বিস্মিত করেছে, তা হলো কয়েকটি প্রথম সারির জাতীয় দৈনিকও এই পাল্লায় নেমেছে। আমি তাদের প্রিন্ট সংস্করণের পাঠক, তাই নাম প্রকাশ করছি না। হিট ক্লিক আর ফলোয়ার সংখ্যা তাদেরও দরকার। সাইবার সমাজে গ্রহণযোগ্যতার একটি প্রতীক হিসেবে তারা দেখছেন একে। আর এজন্যই মরিয়া হয়ে লেগেছেন ফলোয়ার ও হিটের পেছনে। প্রিন্ট মাধ্যমে কোন স্বল্পবসনা রমনীর ছবি বা পরকীয়া প্রেমের রোমাঞ্চকর সংবাদ দিতে তারা যতটুকু সাবধানতা অবলম্বন করতেন, অনলাইনে সেটি দিব্বি প্রকাশ করে দিচ্ছেন। এতে তাদের পেশাগত সততা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে যে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন।

লাইফস্টাইল বা চটুল বিষয়ে পোস্ট দিয়ে তারা চটুল পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করছেন। পোস্টগুলো অনেকটা এরকম:

>অমুক নায়িকার বিয়ে ও ডিভোর্সের সাত অথবা বারো কাহন…

>অমুক নায়িকার সাথে তমুক নায়কের অবকাশ যাপন

>দাম্পত্য জীবনে সুখী হবার ৭টি সূত্র…

>পুরুষের যে ১০টি বিষয় নারীর অপছন্দ বা পছন্দ

>নারী যে ১০টি বিষয় লুকাতে চায় বা প্রকাশ করতে চায়

>নিজের নগ্ন ছবি আপলোড করায় অমুকের বিবাহবিচ্ছেদ (সাথে অবশ্যই একটি দৃষ্টান্ত)

>অমুক নায়িকার ৭ স্বামী (ভেতরে গিয়ে দেখবেন সেটি সিনেমার কাহিনি!)

>কর্মস্থলে নারীকে অপছন্দ করার ১০টি কারণ ইত্যাদি ইত্যাদি (সবচেয়ে ডিসগাস্টিং!)

যে কোন উপায়ে একটি ‘হিট’ পাওয়ার জন্য তারা আপসহীন। এজন্য কারণে অকারণে অর্ধনগ্ন ছবি দিতেও তারা পিছপা হন না। মজার ব্যাপার হলো এসবের অধিকাংশই তারা প্রিন্ট মাধ্যমে প্রকাশ করেন না। তবে কি সাইবার সমাজকে তারা কোন সমাজই মনে করছেন না? তারা কি ধরে নিচ্ছেন যে, ইন্টারনেটে যারা বিচরণ করে তারা মানুষ না, তারা এদেশের না। তারা বিপথে পরিচালিত হলে এদেশের সমাজ কলুষিত হবে না? এই কি তাদের ধারণা?

———–
*চৌধুরি আলমের ঘটনা এবং সংশ্লিষ্ট খবরটি একটি প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে লেখা হয়েছে।

 

**লেখাটি প্রথমে সামহোয়ারইন ব্লগে প্রকাশিত হয়েছে।

বঙ্গভূমিতে Minister’s English-এর আবির্ভাব



১) তখন আমি উচ্চমাধ্যমিকে পড়ছি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক বন্ধু আমাকে জানালেন যে, আমাদের প্রিয় বঙ্গভূমিতে নাকি ইংরেজিতে কথা বলা নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা হয়। আমি তো হতবাক। ইংরেজি প্রতিযোগিতা আবার কী জিনিস! তাই বিষয়টি সম্পর্কে জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকলাম। তাদের এলাকায় কে কতটুকু সাবলীলভাবে ইংরেজিতে কথা বলতে পারে, তা নিয়ে প্রতিযোগিতা হয়। কারা এসব প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়? মাধ্যমিক পর্যায়ের ইংরেজি শিক্ষকেরা। কীভাবে এবং কী বিষয় নিয়ে তারা ইংরেজিতে কথা বলে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেলো। 

ঘটনাক্রমে কিছুদিন পর বন্ধুর এক আত্মীয় আসলেন ঢাকায় বেড়াতে। বন্ধুটি জানালেন যে, তিনি ইংরেজিতে খুবই পারদর্শী এবং এলাকায় খুবই পরিচিত। সঙ্গতকারণেই জিজ্ঞেস করলাম, “তবে তো তিনি ওই প্রতিযোগিতার একজন প্রতিযোগীও।” বন্ধুর উত্তর ইতিবাচক। কৌতূহল নিবৃত্ত করার একটি সুযোগ পেয়ে গেলাম। ভগ্নীপতি হওয়াতে তার সাথে মিশতে বেশি আনুষ্ঠানিকতা করতে হয় নি। অনেক কথার ফাঁকে ‘ইংরেজি প্রতিযোগিতা’ সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করে বসলাম। মনে হলো, জামাইবাবু অপ্রস্তুত। তার প্রথম প্রশ্ন হলো কীভাবে আমি ‘বিষয়টি’ জানলাম। “আরে এটা কোন প্রতিযোগিতা না।” তাহলে কী?

জানতে পারলাম, মুখস্ত করা ইংরেজি নিয়ে তারা প্রতিযোগিতা করতেন আর গ্রামের কিছু মানুষকে বোকা বানাতেন। 
উদ্দেশ্য কী? 
-উদ্দেশ্য কিছুই না – মজা করা। 
তো কোথা থেকে আপনারা ইংরেজি ব্যবহার করতেন?
-ইংরেজির কি অভাব আছে নাকি? রচনা বই থেকে! 

তাহলে তো প্রচলিত কৌতুকটি আবার বলতে হয়। অজপাড়াগাঁয়ে আবিষ্কৃত হলো এক বিস্ময় বালকের, যে জলের মতো হরহর করে ইংরেজি বলতে পারে। তার নিরক্ষর মা-বাবা এবং ইংরেজি না-জানা প্রতিবেশিরা তো তাকে মাথায় তুলে রাখে। এত ইংরেজি সে কীভাবে শিখলো! কোন একদিন কিছু ইংরেজি ভাষাভাষী লোকের আবির্ভাব হলো গ্রামে। হয়তো কোন গবেষণা বা বেড়াবার উদ্দেশ্য ছিল তাদের। গ্রামের লোকেরা ধরাধরি করে ওই বিস্ময় বালককে নিয়ে আসলো তাদের সামনে, ইংরেজি বলার জন্য। উপায়ান্তর না দেখে বিদেশি অতিথিরা ওই বালকের সাথে সৌজন্যতামূলক কিছু কথা জিজ্ঞেস করলেন। যেমন: হাই, হাউ আর ইউ ডুয়িং? অথবা, হাউ ডিড ইউ লার্ন ইংলিশ ফ্রম দিস ভিলিজ? ইত্যাদি। ছেলেটির কোন উত্তর নেই। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। গ্রামের লোকদের তো আর ‘তর’ সইহো হচ্ছে না! ততক্ষণে প্রায় সকলেই জড়ো হয়েছিলো তামাশা দেখার জন্য। তারা এই নিরবতায় হতাশ না হয়ে আরও উৎসাহ দিতে লাগলো। পরিস্থিতি যখন প্রেস্টিজের বিপরীতে চলে যাচ্ছিল, ঠিক তখন আচমকা মুখ খুললো ছেলেটি। হর হর করে ‘দ্য কাউ’ রচনাটি বলে ফেললো! ইংলিশ অতিথিরা একটি কথাও মাঝখানে বলতে পারলেন না! পারার কথাও না। গ্রামের মানুষও আগে থেকে ধারণা করেছিলো যে, তারা কিছুই বলতে পারবে না।



২) স্ট্যান্ডার্ড এবং শুদ্ধ ইংরেজিকে ‘কুইনস ইংলিশ’ বা ‘অক্সফরড ইংলিশ’ বা ‘বিবিসি ইংলিশ’ বলা হয়। তাছাড়া ‘কিংস ইংলিশ’ বলেও একটি বিখ্যাত গ্রামার আছে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, শুদ্ধ ইংরেজির বিষয়টি পুরোপুরি রাজা-মন্ত্রীদের বিষয়। এখানে শিক্ষার বিষয়টি তত জড়িত নয়। 

আমাদের দেশে এখন ‘মিনিস্টারস ইংলিশ’ নামে আরও একটি স্ট্যান্ডার্ড চালু হয়ে গেছে, অনেকটা আমাদের অজান্তেই। আমরা খুব স্বাভাবিক দৃষ্টিতেই দেখি যে, ক্ষমতায় থাকলে কথা-বার্তায় ইংরেজির ব্যবহার বেড়ে যায়। সামনে আগেরই মতোই বাংলা-ভাষী মানুষ আছে, কিন্তু যেহেতু তারা মিনিস্টার, ইংরেজিতে কথা বলাকে একটি অত্যাবশ্যক ডেকোরাম হিসেবে তারা প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

আরও আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, ‘মিনিস্টারস ইংলিশ’ বলে একটি কিম্ভূতকিমাকার ও মজাদার ‘স্ট্যান্ডার্ড’ তারা প্রতিষ্ঠা করেছেন। বঙ্গ এই দেশে মিনিস্টারস ইংলিশ মানে হলো ‘ইংরেজির ভেতরে বাংলা’ অথবা বাংলার অন্তরে বেনিয়া! উদাহরণ:রাজনীতির ভেতরে পলিটিক্স। এটি বর্তমান সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের সৃষ্টি। আমাদের ধারণা, মিনিস্টারস ইংলিশ বলতে পারার কারণেই আজ তিনি মিনিস্টার! 

আরও কিছু উদাহরণ: (এখানে পাঠক আরও কিছু যুক্ত করতে পারেন)
১) We are looking for শত্রুজ। সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর
২) I am একদম fed up। বর্তমান অর্থ মন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত।
৩) He should maintain some level of শিষ্টাচার। ঐ।

সর্বশেষ মিনিস্টারস ইংলিশটি অতি সম্প্রতি উৎপাতিত ‘হইয়াছে’।
একদম ফ্রেশ!


বলা বাহুল্য, উপরে কেবল প্রকাশিত দৃষ্টান্তগুলো ধারণ করতে পেরেছি। এরকম উচ্চমানের ইংলিশ তারা প্রতিদিন উৎপাদন করে যাচ্ছেন। অতএব, এখন থেকে যারা শুদ্ধ ইংরেজিতে কথা বলতে চান, তারা কুইনস ইংলিশ ‘ফালাইয়া দিয়া’ মিনিস্টারস ইংলিশে টকিং করুন! পিলিস!

 

————

*লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো সামহোয়ারইন ব্লগে। তারিখ ৪ এপ্রিল ২০১৪