Category: প্রিয় স্বদেশ

কী আশ্চর্য ‘জয় বাংলা’ বললে এখন আর কেউ আমুলিক বলছে না!!

আমার এক মুক্তিযোদ্ধা চাচা কথায় কথায় বলতেন ‘জয় বাংলা’ – বিস্মিত হলে ‘জয় বাংলা’, হতাশ হলেও একই কথা! আর আনন্দ পেলে তো কোন কথাই নেই। ছোটকালে তিনি অনেক গল্প শুনিয়েছেন গেরিলা যুদ্ধের। কীভাবে তারা একটির পর একটি অপারেশন সফল করে পাকবাহিনীর ঘাঁটিগুলো গুঁড়িয়ে দিচ্ছিলেন। অনেক ব্যথা-বেদনার স্মৃতিও আছে। আছে স্বজন হারানোর বেদনা। কিন্তু সব বেদনাকে মুহূর্তে ভুলে যেতেন যখন একটি অপারেশন বা গেরিলা আক্রমণের পরিকল্পনা সামনে আসতো। সকল ব্যথাকে অট্টহাসিতে ওড়িয়ে দিতেন একটি অপারেশন সফল হলে।

“তোমাদের এতো ত্যাজ আসতো কোথা থেকে?” অবুঝ আমি দু’গালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করতাম। জবাবে আমার চাচাটি অনেক কথাই বলতেন, যার সবকিছু আমি বুঝতাম না, শুধু একটি কথা ছাড়া। দু’চোখে রক্তরোষ নিয়ে তিনি সেদিন বলেছিলেন, “দূর বোকা, ওদের তো জয় বাংলার মতো একটি রক্ত-গরম-করা স্লোগানই নাই! ওরা কীভাবে আমাদেরকে পরাজিত করবে!” জয় বাংলা বললে নাকি রাতের ভুতও পালাতো, পাঞ্জাবি তো দূরের কথা!

সে জয়বাংলা দেশ স্বাধীন হবার পর হয়ে গেলো দলীয় স্লোগান। অসম যুদ্ধে জয় বাংলা ধ্বজাধারীদের আত্মার জোর দেখে প্রতিবেশী দেশসহ সারা পৃথিবী সাহস যোগালো, সহযোগিতা দিলো, গান গাইলো। মাত্র নয়মাসে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষায় দেশ স্বাধীন হলো, কিন্তু জয়বাংলা হয়ে গেলো প্রায় নিষিদ্ধ। জয়বাংলা হয়ে গেলো হিন্দুদের স্লোগান!

জয় বাংলা নামক একটি স্লোগানে দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা শক্তি যুগিয়েছিল। জয়বাংলা শুধুই একটি স্লোগান ছিল না, এটি ছিল যুদ্ধ-আক্রান্ত বাঙালির জাতীয় পরিচয়। “আপনি কি জয়বাংলার লোক?” এপ্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ হলে শুরু হতো বাঙালির মধ্যে নতুন আত্মীয়তা, নতুন সম্পর্ক। মুক্তিযুদ্ধকালে জয়বাংলা বলে ভারতে বিনামূল্যে ট্রেনভ্রমণ করা যেতো। কিন্তু আজকাল জয়বাংলা বললে হয়তো আমাকে প্রথমেই একটি গোষ্ঠীভুক্ত করা হবে, অথচ ব্যক্তিগতভাবে বৃহৎ কোন দলের প্রতিই আমার আনুগত্য নেই বা ছিলো না। জয় বাংলাকে আমি বিজয়-আনয়নকারী রণধ্বণি বলেই জানি।

আজ তরুণ প্রজন্ম জেগেছে, তারা ফিরিয়ে এনেছে মুক্তিযুদ্ধের সিকোয়েল – মুক্তিযুদ্ধ দুই! স্বদেশপ্রেমে রেনেসাঁ এনে তারা সমগ্র জাতিকে আজ একত্রিত করলো। কথা অনেক বলা হয়েছিলো, তাই তারা নির্দেশ দিলো “এবার নীরব হোন”। দেশবাসীকে তিন মিনিট নীরব করিয়ে তারা প্রমাণ করলো যে, জয় বাংলা ফুরিয়ে যায় নি। পদ্মা মেঘনা যমুনা যে আপনার আমার ঠিকানা, একথাই ভুলতে বসেছিলাম। আজ তারা স্মরণ করিয়ে দিলো তাদের লক্ষকণ্ঠের বজ্রধ্বনি দিয়ে যে, এদেশ স্বাধীন হয়েছিলো রাজনৈতিক একতা দিয়ে ধর্মীয় চেতনা দিয়ে নয়। আজ লক্ষ লক্ষ তরুণ একত্রিত হয়ে জয় বাংলাকে ফিরিয়ে এনে যেন বাংলা মা’কে শাড়ি পড়ালো, জয় বাংলার শাড়ি! কী আশ্চর্য ‘জয় বাংলা’ বললে এখন আর কেউ আমুলিক বলে গালি দেয় না। জয় বাংলা!

 

প্রথম আলো ব্লগে এবং সামহোয়ার ইন ব্লগে প্রকাশিত।

শাহবাগ স্কয়ারে আমরা সবাই একটি দল – বাংলাদেশ

11111111

একে রাজনৈতিক সমাবেশ বলা চলে না, কারণ এটি কোন সমাবেশের স্থান নয়। এখানে নেই কোন সভাপতি বা প্রধান অতিথি। নেতা-নেত্রীদের জৈষ্ঠতার ক্রমিক আসনও ছিলো না। নির্দিষ্ট কোন মঞ্চও নেই, ট্রাকের ওপরে স্বতঃস্ফূর্ত বক্তৃতা আর গগণবিদারী স্লোগান। রূপসী বাংলা হোটেল থেকে টিএসসি, কাঁটাবন থেকে মৎস্যভবন – স্বতঃস্ফূর্ত জনতার ঢল। মিডিয়ার সবরকমের উপস্থিতিই সেখানে ছিলো, স্যাটেলাইটসহ – কিন্তু মিডিয়ার পক্ষে এ বিপ্লবের পুরোপুরি কাভারেজ দেওয়া কঠিন। শুধু দেখতে চাইলেও শাহবাগ স্কয়ারে যেতে হবে। যেখানে প্রবীণেরা নবীনদেরকে মাথায় হাত বুলিয়ে সাহস দিচ্ছে, অশ্রুনয়নে স্লোগানে শরিক হচ্ছে অগণিত তরুন – সেখানে না গিয়ে কী বুঝা যায়? আমি বলি দেখতে নয়, শরিক হতেই চলে আসুন শাহবাগ স্কয়ারে!!

বিপ্লব বুঝি এরকমই হয়! যেসব যুবক-যুবতি একাত্তরের রণাঙ্গণের শরিক না হতে পেরে আক্ষেপ করেছিলো, আজ বুঝি তাদেরই দিন! মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির ‘একাত্ম অজেয় শক্তি’ যারা দেখে নি, আজ তাদের দিন। এটি যেন দায়মুক্তি আর ঘাটতি পূরণের দিন। তা না হলে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি কেন আবার শিহরিত করবে সকলকে? তা না হলে শিশু নারী যুবক বৃদ্ধ লেখক মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র শিক্ষক অধ্যাপক উপাচার্য – সকলেই কেন ব্লগার আর অনলাইন একটিভিস্টদের ডাকে আসবে? স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব কখনও আনুষ্ঠানিকতা মানে না, মানতে পারে না।

তুমি কে আমি কে – বাঙালি বাঙালি। পদ্মা মেঘনা যমুনা – তোমার আমার ঠিকানা। দলে দলে মেয়েদের স্লোগান আসতেছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিক হতে। গতকাল বেশি মুগ্ধ হয়েছি যখন দেখেছি বয়স্ক চাচাদেরকে এবং শশ্রুময় হুজুরদেরকে বুকে প্লাকার্ড নিয়ে স্লোগানে জ্বলে ওঠতে। মুগ্ধ হয়েছি বোনদের আত্মবিশ্বাসী অংশগ্রহণ দেখে। দলে দলে মেয়েদের তাৎপর্যপূর্ণ এবং নিঃসংকোচ অংশগ্রহণ দেখে। আমাদের বোন লাকি স্লোগান দিচ্ছিলো “ক’তে কাদের মোল্লা – তুই রাজাকার তুই রাজাকার”।

এখানে কোন নেতা নেই, নেতার গর্জন নেই। নির্দিষ্ট কোন দল একে পরিচালনাও দিচ্ছে না। অথচ সকলে এক এবং একাত্ম। স্বাধীনতার শত্রুদেরকে নির্মূল করার জন্য কোন দলের প্রয়োজন নেই – প্রয়োজন এক হওয়ার। প্রয়োজন শুধু বাঙালি হওয়ার, বাংলাদেশি হওয়ার। যে কেউ স্লোগান দিচ্ছে, তাতে সবাই সাড়া দিচ্ছে, আর্তচিৎকারে কাঁপিয়ে তুলেছে শাহবাগের আকাশ।

এতো মানুষের ভিড়ে কোন ধাক্কাধাক্কি নেই। স্থান নিয়ে নেই বিতণ্ডা। সকলেই সকলের জন্য রাস্তা করে দিচ্ছে। মা-বোনেরা নির্দ্বিধায় এগিয়ে যাচ্ছে তাদের গন্তব্যের দিকে। আমাদের সমাজে সাধারণত ভিড়ের মধ্যে মেয়ে পুরুষ হাঁটা একটু অস্বস্তিকর। কিন্তু গতকাল তা ছিলো না। শিশু, নারী আর বৃদ্ধ মায়েরা নিশ্চিন্তে ভিড় ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছিলো, তাতে ছিলো সকলের সহযোগিতা। ছিলো না ‘দুঃখিত’ বলার প্রয়োজনীয়তা। যেন সবাই সবাইকে বুঝে নিয়েছে, মেনে নিয়েছে – বিপ্লব বুঝি এভাবেই আসে!

আমি বায়ান্নো ঊনসত্তর একাত্তর দেখিনি। ঢাকায় না থাকায় নব্বুইয়ের উভ্যূত্থানও দেখার সুযোগ হয় নি। কিন্তু দু’হাজার তেরো দেখেছি। যা দেখেছি তাতে আমি মুগ্ধ অভিভুত এবং গর্বিত। একে যুব বিপ্লব বলা উচিত। যুব বিপ্লব সফল হোক। শাহবাগে আমরা সবাই এক দল – বাংলাদেশ।

“যমুনার জল দেখতে কালো – চান করিতে লাগে ভালো”

Image

বর্ষায় যমুনার রূপ স্বাভাবিক থাকে না। ভরা নদি, বিস্তির্ণ জলরাশি ও দূরের তীর এক মায়াময় আবহ তৈরি করে। মেঘলা আকাশে গভীর যমুনা পানি সত্যিই কালো এবং ঝাপ দেওয়ার আহ্বানে পরিপূর্ণ! মন চায় দেই ঝাপ! 

২০০৫ সালের সেপটেম্বর। অবস্থান টাঙ্গাইলের ঘাটাইল। আধা-বৃষ্টি আধা-রোদের একঘেয়ে এক দিনে ইচ্ছে হলো যমুনায় নৌকা ভ্রমণ করার। অবস্থান ২ঘণ্টার কাছাকাছি থাকায় আয়োজন করতে বেশি দেরি হয় নি। জামালপুর এলাকার সাথে যাতায়াতে অভ্যস্ত এক বন্ধুর নির্দেশনায় বের হয়ে গেলাম ঘর থেকে।

বাসে মধুপুর ও ধনবাড়ি হয়ে তারাকান্দি (সরিষাবাড়ি, জামালপুর) যমুনা সার কারখানায় চলে গেলাম। সেখান থেকে জগন্নাথগঞ্জ ঘাট কাছেই। জগন্নাথগঞ্জ হলো একটি শাখা নদির মাথা যা যমুনায় এসে মিলেছে। এক পাড়ে নৌকাঘাট, অন্যপাড়ে বর্ষার পানিতে ভাসমান একটি গ্রাম দেখা যায়। নৌকা আমাদের জন্য প্রস্তুত ছিলো না। যোগাযোগ করা হলো। নৌকা আছে তো মালিক নেই। মালিক আছে তো ইঞ্জিনের তেল নেই। 

জিরজির বৃষ্টি নেমে আমাদের ভ্রমণের এডভেন্চার বাড়িয়ে দিলো। আমরা অপ্রতিরোধ্য: তারাকান্দি পর্যন্ত আসতে পেরেছি, এবার যমুনায় ভাসবোই। অনিশ্চয়তা পর্ব কাটানোর পর অবশেষে এক মুরুব্বি চাচার নৌকা পাওয়া গেলো। আমাদেরকে একনজর দেখে মনে হয় তার একটু মায়াই হলো।

প্রায় ঘণ্টা খানেক মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখলাম আবহকালের যমুনাকে। অদক্ষ হাতে ছবি তুললাম এপাড়ের ওপাড়ের সামনের। এ যেন অন্য এক যমুনা যা লেখাপড়া করে জানার চেষ্টা নিছকই বোকামি। উপন্যাসে কবিতায় আর প্রবন্ধের যমুনার চেয়েও আকর্ষণীয় এক যমুনাকে দেখে বৃষ্টির কথাও ভুলে গিয়েছিলাম। গোপালপুরের (টাঙ্গাইল) নলিন বাজারে এসে আমরা নামলাম। মাঝি চাচাকে ভাড়া পরিশোধ করে তাকিয়ে থাকলাম তাকে শেষবারের জন্য দেখে নেওয়ার জন্য। চাচা আমাদের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে নৌকা প্রস্তুত করছিলেন আবার জগন্নাথগঞ্জে ফিরে যাওয়ার জন্য। তার সাহায্য না হলে সেদিন তারাকান্দি থেকে চোখে হতাশার তারা নিয়ে সেদিন ফিরতে হতো। 

বাকি কথা ছবিতেই বলতে চেষ্টা করলাম:

Image

 

রাস্তার পাশে সরিষাবাড়ির প্রকৃতি দেখে যাচ্ছি।

 

Image

জগন্নাথগঞ্জ নৌকাঘাটে এসে কতক্ষণ কাটলো অনিশ্চয়তায়: নৌকা পাবো তো! 

 

Image

ঘাটের ওপাড়ে বর্ষার পানিতে ভাসমান এক গ্রাম: ওইগ্রামের মানুষগুলো কীভাবে জীবনধারণ করে? হাটবাজার স্কুল কোথায় তাদের? ভাবছি।

 

Image

মাঝিচাচাকে পেলাম কাণ্ডারি হিসেবে। কোন যুবক সাহস করে নি মেঘলা দিনে!

 

Image

জগন্নাথগঞ্জ নৌকাঘাটের সাথে ইতিমধ্যেই বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিলো। কবে আবার দেখবো!

 

Image

ইঞ্জিনে একটি সমস্যা দেখা দিলেও তা সেরে ওঠেছেন আমাদের মাঝিচাচা। নিশ্চিতভাবে বসলেন।

 

Image

একটি যাত্রিবাহী নৌকা অতিক্রম করে গেলো আমাদেরকে ঢেউয়ের দোলা দিয়ে!

 

Image

ওপাড় দেখা সহজ নয়! এ যেন প্রেম যমুনা: সাঁতার দিতে মন চাইছিলো, কিন্তু কার জন্য?

 

Image

শান্ত তীর ঘেষে যাচ্ছি আমরা। প্রকৃতি নীরব যেন দেখছে আমাদেরকে!

 

Image

ভাঙন দেখে কিছুক্ষণের জন্য মন অস্থির হলো। বাসিন্দারা কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেয়?

 

Image

শেষ হলো যুমনা ক্রুজ। মাঝিচাচা কথা না বাড়িয়ে নৌকা ফের প্রস্তুত করছেন ফিরে যাবার জন্য।

 

Image

গোপালপুরের নলিন বাজারে এসে আমরা আবার গাড়িতে ওঠলাম।

ঢাকা (মহাখালী) থেকে সরাসরি তারাকান্দির বাসে ওঠলে একেবারেই যমুনা সার কারখানায় ও জগন্নাথগঞ্জে যাওয়া যায়। সেখান থেকে নৌকা। আবহাওয়া ভালো থাকলে সহজেই নৌকা পাওয়া যায়। তবে টাঙ্গাইল শহরে এসে একদিন থাকার পরিকল্পনা থাকলে ভ্রমণে স্বস্তি পাওয়া যাবে।

 

*ছবি পোস্টটি একটি পাবলিক ব্লগসাইটে একবার প্রকাশিত হয়েছে – সাথে আছে পাঠকের তাৎক্ষণিক মন্তব্য

 

দ্য ইকোনোমিস্ট: হলুদ সাংবাদিকতা যাদের নীতি ও মাধ্যম

ECONOMIST

সংবাদ মাধ্যম হলো আধুনিক গণতন্ত্রে জনগণের অধিকার আদায়ে অন্যতম শক্তি, দ্বিতীয় সংসদ। কিন্তু চিন্তা করে দেখুন, যারা এদেশের মানুষ নয়, একটি দেশের স্বার্থের সাথে যাদের সম্পর্ক নেই, যাদের সম্পর্ক নেই সে দেশের কৃষ্টি-কালচার ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাথে — সেরকমের একটি সংবাদ মাধ্যমের কী দায় আছে সেদেশের মানুষের জন্য সত্যিকার সংবাদ প্রকাশের? গরম সংবাদ পরিবেশ করে বৈশ্বিক রাজনীতিতে ঘোলাজলের সৃষ্টি করা এবং তাতে কিছু মাছ ধরে নিতে পারলে, কী দরকার আছে একটি ভিন দেশের ইতিহাস আর স্বাধীনতার সংগ্রামকে গৌরবান্বিত করার?

বাংলাদেশের ইতিহাসে, পানি ঘোলাটে করে সবচেয়ে বেশি মাছ ধরার মোক্ষম সুযোগ হলো এখন। খবর বিক্রি করার উপযুক্ত বাজারও এখনই, কারণ এখন একটি পরাজিত পক্ষ মরিয়া হয়েছে তাদের অস্তিত্ত্ব টেকানোর জন্য, চামড়া বাঁচানোর জন্য। তারা কোন সময়ই দেশের মাটির পক্ষে ছিলো না, তারা চায় নি এদেশের স্বাধীনতা। পশ্চিমা প্রভাবশালী দেশগুলো যারা এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সুষ্পষ্টভাবে বিরোধীতা করেছে, সেসব দেশকে তারা সকল উপায়ে ক্ষেপিয়ে তুলছে এদেশের বিরুদ্ধে।

“It is often forgotten that the bloodshed in the spring was not all one-sided, and that the east Bengalis killed thousands of non-Bengalis.” (এটা প্রায়ই ভুলে যাওয়া হয় যে, মার্চের রক্তপাত কোনভাবেই একচেটিয়া ছিলো না। ভুলে যাওয়া হয় যে, বাঙালিরা হাজার হাজার অবাঙালিকে হত্যা করেছে।) দ্য ইকোনোমিস্ট, ডিসে/১৯৭১।

৩০ লাখের চেয়ে দ্য ইকোনোমিস্ট-এর কাছে হাজারের গুরুত্ব অনেক বেশি!

শুধু বর্তমান সরকার নয় বিগত যে কোন সরকারের আমলে দ্য ইকোমিস্ট-এর পরিবেশিত সংবাদগুলোতে একটু নজর দিয়ে দেখুন, তারা কাদের জন্য সংবাদ পরিবেশ করে।

গবীবের বউ সকলেরই বাউজ। বাংলাদেশের স্বার্থ ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক নিয়ে তাদের পেশাদারি বিশ্লেষণ দেখে যে কেউ বিভ্রান্ত হতে পারেন।
দেশের স্বার্বভৌমত্বের অন্যতম প্রতীক বিচারব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ ও ধ্বংস করে দেবার জন্য দ্য ইকোনোমিস্ট বর্তমানে কাজ করে যাচ্ছে। একাত্তরে দেশের মানবতা বিরোধী অপরাধের জন্য স্থাপিত আদালতের এক সম্মানীত বিচারকের ইমেল ও স্কাইপে আইডি হ্যাক করে তারা সেই বিচারপতিকে ব্লাকমেইল করছে। বিচারকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কোন মূল্য দ্য ইকোনোমিস্ট-এর কাছে নেই।

এদেশের মানুষকে সঠিক সংবাদ দেবার তাদের এতই দরকার? এদেশের প্রধান জাতীয় দৈনিক যেমন: প্রথম আলো, ইনকিলাব, ইত্তেফাক, ডেইলি স্টার, কালের কণ্ঠ প্রভৃতি পত্রিকার চেয়েও তারা এদেশের মানুষের প্রতি বেশি দরদী হয়ে পড়েছে।

এদের সংবাদ পরিবেশ করে পোস্টের আকার বৃদ্ধি করতে চাই না। দ্য ইকোমিস্ট-এর কয়েকটি শিরোনামের ভাষা দেখুন:
>বাংলাদেশ: আঁধারের চূড়ান্ত (নভে/২০১২)
>বাংলাশের বিষাক্ত রাজনীতি: হে দিল্লী কিছু করো! (মে/২০১২)
>বাংলাদেশ: এভাবে নয় (জুন/২০১০)
>বিডিআর বিদ্রোহের পর বাংলাদেশ: মন্দ নাকি উন্মত্ত? (মার্চ/২০০৯)
>বাংলাদেশ: মাইনাস টু সমাধান (সেপ/২০০৭)
>বাংলাদেশ: এক বেগমের পতন (খালেদার গ্রেপ্তারের পর) (মার্চ/২০০৭)
>বাংলাদেশের নির্বাচন ২০০১: বিন লাদেনের পক্ষে ভোট? (সেপ/২০০১)

অধিকাংশ সংবাদে কোন পাঠক মন্তব্য পাওয়া যায় নি।

সাংবাদিকেরা অবশ্যই সংবাদের পেছনে থাকবেন। তারা খবরের পেছনের খবরকে বের করে নিয়ে আসবেন পাঠকের জন্য। ঘটনার রহস্য উন্মোচন করে তারা পাঠককের সামনে সত্যিকার চিত্রটি তুলে ধরবেন। কিন্তু এর মানে তো এই নয় যে, তারা প্রতিনিয়ত একটি দেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, যোদ্ধাপরাধের বিচার – এসব বিষয় নিয়ে দায়িত্বহীন সংবাদ পরিবেশ করে যাবে! দেশের আইনের বাইরে থাকার সুযোগ নিয়ে তারা যাচ্ছে-তাই মতামত দিয়ে যাচ্ছে। বিভেদ সৃষ্টি করছে ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের।

দ্য ইকোনোমিস্ট আজকাল দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে মিঠা মিঠা কথা বলছে, তা কেবল বৃহত্তর সংবাদমাধ্যমগুলোর মতের সাথে সুর মেলানোর জন্য; এবং তাদের অন্যান্য ধ্বংসাত্মক সংবাদগুলো আমাদেরকে খাওয়ানোর জন্য। তারা কখনো এদেশের পক্ষে কথা বলে নি।

দেশের অবস্থান জানার জন্য দেশী সংবাদ মাধ্যমকে আমরা যদি বিশ্বাস না-ই করি, তবে ইকোনোমিস্ট ছাড়াও আরও বিদেশী মাধ্যম আছে, যাদের সততা শত বছর ধরে পরীক্ষীত। তাদের বিশ্লেষণে দৃষ্টি দিলে দ্য ইকোনোমিস্টকে বুঝা যায়। শুধু আওয়ামিলীগ নয়, বিগত যেকোন সরকারের সময়ের ইকোনোমিস্ট দেখুন। তারা সংবাদ বিক্রি করার জন্য সংবাদ লেখে। দেশের মানুষের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা, রাজনৈতিক মেরুকরণ জাগিয়ে রাখা, বিদেশ-নির্ভরতা বাড়িয়ে তোলা, দেশের রাজনীতিতে পাশ্চাত্য নেতৃত্বের স্থায়িকরণ আর হলুদ সাংবাদিকতা তাদের ব্যবসায়ের নীতি ও মাধ্যম।

আমাদের আছে কথা বলার প্রতিভা!

রমজান মাসে ইফতারের মুহূর্তে চারপাশের শান্ত-নিরব পরিবেশটি কেমন লাগে? ফাঁকা রাস্তা, কোথাও কোন হইহুল্লা নেই, সকলেই নিজেদের মধ্যে শান্ত। একটি কর্মোদ্যমী দেশে দিনের বেলার রাস্তাঘাট অনেকটা এরকমই: কোথাও কোন অনাকাঙ্ক্ষিত জটলা নেই, এখানে-সেখানে লোক দাঁড়িয়ে নেই, সকলেই নিজ নিজ কর্মস্থলে কাজে নিমগ্ন।

কিন্তু ইফতার মুহূর্তটি পার হলেই চিত্রটি কেমন? রাস্তায় দাঁড়িয়ে, ওভারব্রিজে জড়ো হয়ে, ফ্লাইওভারে পায়চারি করে, রাস্তার কোনায় বসে আছে মানুষ। কথা বলছে অথবা এমনিতেই দাঁড়িয়ে আছে। হতাশ হয়ে ভাবি, তারা সেখানে কী করে?

পৃথিবীর মানুষ যখন পিঁপড়ের মতো ব্যস্ত হয়ে কাজ করছে, জীবিকার সন্ধান করছে, বিন্দু থেকে সিন্ধু গড়ছে, গড়ে তুলছে শিল্প নগর আর বাসস্থান, তখন আমরা কী করছি?

সারাদিনমান চায়ের স্টলে বসে থেকে মানুষ শুধু কী কথা বলে? বিদেশীদের চোখে আমরা কেমন, সেটা একটু বিবেচনা করলে বুঝতে পারবো আমাদের সার্বিক চিত্রটি অন্যান্য পরিশ্রমী জাতিগুলোর সাথে কতটা বেমানান। এদেশে কর্মরত বিদেশী অতিথিরা আশ্চর্য হয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। এদেশের মানুষগুলো শুধু কথা বলার এত সময় পায় কোথায়? তারা খায় কী?

কোরিয়ান, মালয়েশিয়ান, সিংগাপুরি প্রভৃতি যেসব জাতির জন্ম আমাদেরই সময়ে তারা এদেশকে ভাবতো দুগ্ধমধুপ্রবাহী ও সমৃদ্ধ একটি জাতিগোষ্ঠী হিসেবে। তারা আমাদের সমৃদ্ধিতে ঈর্ষা করতো। কিন্তু আজ তারা আমাদের কর্মদাতা, তারা এদেশের শ্রমিককে কাজ না দিলে আমাদের জাতীয় আয়ে হাত লাগে। তাদের উন্নয়নের খোঁজ নিলে হয়তো আমরা দেখবো যে, গড়ে ওঠার সংগ্রামে তাদের সাপ্তাহিক ছুটিও ছিলো না।

আর আমরা?  ছুটি পেলেই যেন বাঁচি, যেন কাজই জীবনের উদ্দেশ্য নয়, অবকাশে থাকাই আমাদের কাম্য। আমাদের সরকারগুলো ছুটি মঞ্জুর করতে পারলেই খুশি। চাকরির আগে ছুটি ক’দিন, কখন অফিস শেষ হয়, এসব নিয়ে আগেই দর কষাকষি করি। বার্ষিক সাপ্তাহিক পার্বিক ঐচ্ছিক অর্জিত বর্ধিত বাবার জন্ম মায়ের জন্ম মৃত্যু আগমন নির্গমন সকল পর্বের জন্য চাই ছুটি। বৎসরের প্রায় অর্ধেক দিন কাটে আমাদের ছুটিতে।

ছুটি নিয়ে ফিরে যাই কর্মহীনতায় আর সৃষ্টিহীনতায়, গড়ে তুলি অলস আর কর্মবিমুখ প্রজন্ম। আমরা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য কেমন লিগ্যাসি রেখে যাচ্ছি, তা কি একবার প্রশ্ন করি? কীসের কৃতীত্ব আমরা রেখে যাচ্ছি, যা নিয়ে তারা বড় হবে? যাকে তারা বাড়িয়ে তুলবে?

পরিহাসের বিষয় একটি বিষয়ে আমরা পারদর্শী: আমাদের আছে কথা বলার প্রতিভা। দিনে কথা রাতে কথা অফিসে কথা বাথরুমে কথা ঘুমানোর সময় কথা জেগে ওঠার সময় কথা হাঁটতে হাঁটতে কথা দৌড়াতে কথা সাঁতরাতে কথা ইয়ে করতে করতে কথা।  আমরা জানি না আমাদের কথা থেকে মুনাফা করে নিচ্ছে ভিনজাতিরা। বিনিয়োগের চেয়েও অধিক মুনাফা তারা পাঠায় তাদের মাতৃপ্রতিষ্ঠানে! ঠিক ইস্ট ইন্ডিয়ান কোম্পানিগুলো যা করতো আমাদের ওপর একসময়!

আমাদের কথা থেকে ব্যবসা করার জন্য তারা বিক্রি করছে কথা বলার মেশিন, স্থাপন করছে অগণিত কথাকেন্দ্র!  এক কোটি, দু’কোটি, তিন কোটি, চার কোটি এভাবে তারা আমাদের কথা-বলা জনতার সংখ্যা হালনাগাত করছে।  প্রেরণা দিচ্ছে আরও কথা বলার। আমরা হয়ে যাচ্ছি একটি সম্ভাবনাময় কথা-বলা জাতি! কবে আমরা কথা বলা থামিয়ে দিয়ে কাজ করতে শুরু করবো?