Category: প্রিয় স্বদেশ

লোকসঙ্গীত সম্রাট আব্দুর রহমান বয়াতির ‘দেহঘড়ির’ অবসান

Presentation1-crop

‘মন আমার দেহ ঘড়ি সন্ধান করি কোন মিস্তরি বানাইয়াছে’ গানটির অন্যতম পৃষ্ঠপোষক এবং বাংলা লোকসঙ্গীতের অন্যতম পুরোধা আব্দুর রহমান বয়াতির (৭৬) ‘দেহ ঘড়িটি’ বন্ধ হলো গতকাল (১৯ অগাস্ট) সকাল সাড়ে সাতটায়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাযা, চীন, অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানসহ বিশ্বের প্রায় ৩২টি দেশে ভ্রমণ করে বাংলার লোকসঙ্গীতকে অবাঙালি বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত করিয়েছিলেন এই লোকসঙ্গীত শিল্পী। তার সঙ্গীত জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো: জর্জ বুশের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউজে লোকসঙ্গীত পরিবেশ করা। এছাড়া তিনি দেশের লোকসঙ্গীত শিল্পীদল নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

‘গাড়ি চলে না চলে না’ বলে বিদায় নিয়েছিলেন বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম এবার ছিলো ‘দেহ ঘড়ির’ পালা! ‘আরও বাঁচতে চাই’ বলে বিদায় নিয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদ এবং হুমায়ুন আজাদ। মৃত্যুকে চ্যা্লেন্জ করলেই যে মৃত্যু এতো শিঘ্র চলে আসবে, তা কি তারা জানতেন? জানতেন না লোকসঙ্গীত সম্রাট আব্দুল রহমান বয়াতিও। মাসের পর মাস হাসপাতালে শুয়েও আবার ফিরে আসার স্বপ্ন দেখেছিলেন। বলেছিলেন, আরও গান গাইবার চাই! দেহতত্ত্ব আর ভাবতত্ত্ব দিয়ে যিনি জীবনের মানে খুঁজেছেন তার গানে আর দরাজ কণ্ঠে, সেই কণ্ঠ আর কারও জীবনতত্ত্বকে চ্যালেন্জ করবে না। ‘মানুষটা ছিলো খুবই উদাস’ – শিল্পী মমতাজের কথা। উদাস তো হবেনই, নিজের চাওয়া-পাওয়া সম্পর্কে সচেতন থেকে আরও যা-ই হোক শিল্পচর্চা হয় না।

.

আব্দুর রহমান বয়াতি সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

পুরো নাম:  আব্দুর রহমান বয়াতি

পারিবারিক ডাকনাম: বয়াতি

পারিবারিক তথ্য: স্ত্রী, ৩ পুত্র ও ৩ কন্যা

পিতা ও মাতা: মরহুম তোতা মিয়া ও মরিয়ম বেগম

জন্ম ও মৃত্যু:  ১৯৩৯ (দয়াগঞ্জ, সূত্রাপুর, ঢাকা) – ১৯ অগাস্ট ২০১৩ (ঢাকা, জাপান বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতাল)

গায়ক জীবনের শুরু: ১৯৫৬

দলের নাম: আব্দুর রহমান বয়াতি দল (১৯৮২)

সঙ্গীতের প্রেরণা: প্রকৃতি ও মা

সঙ্গীত গুরু: কবি আলাউদ্দিন বয়াতি (কবি আলাউদ্দিন)। তিনিই ‘দেহঘড়ি’ গানটির গীতিকার।

অডিও এলবামের সংখ্যা: ৫০০

পুরস্কার: রাষ্ট্রপতি পুরস্কারসহ ৬টি জাতীয় পুরুস্কার

উল্লেখযোগ্য ঘটনা: যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউজে গান গাওয়া

বিশেষ এলবাম: ফিডব্যাক-এর ‘দেহঘড়ি’ (১৯৯৫) এলবামে তার দেহঘড়ির গানটি ফিউশন হয়

উল্লেখযোগ্য গানগুলো: ‘মন আমার দেহ ঘড়ি সন্ধান করি কোন মিস্তরি বানাইয়াছে’, ‘এই পৃথিবী যেমন আছে, তেমনি পড়ে রবে, সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে’, ‘দিন গেলে আর দিন পাবি না’

সঙ্গীত প্রচারের মাধ্যম: প্রধানত তিনি মঞ্চ শিল্পী। তাছাড়া বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং প্রাইভেট টিভি চ্যানেলে তিনি সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন। ‘অসতী’ (১৯৮৯) নামে হাফিজুদ্দিন পরিচালিত একটি সিনেমাতেও তিনি গান গেয়েছেন।

.

শেষ জীবনে আব্দুর রহমান বয়াতি

এতো সুনামের অধিকারী হয়েও এবং দেশের লোকসঙ্গীত শিল্পকে এমনভাবে সমৃদ্ধ করেও এই মহান শিল্পী শেষ জীবনে চিকিৎসার জন্য অন্যের কাছে হাত পাততে হয়েছে। শেষ জীবনে দৈনিক ১৫০০ টাকায় গান গেয়েও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিলো তার। ফুসফুস, কিডনি এবং স্নায়ু সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে কয়েক মাস পূর্বেই তিনি জাপান বাংলাদেশ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় নি। মৃত্যুর পুর্ব পর্যন্ত জাপান বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতাল তার ঔষধ ও চিকিৎসার খরচ বহন করে। ‘আমি আবার ভালো হইবার চাই, আমি আবারও গান গাইবার চাই’ বলে তিনি আকুতি প্রকাশ করেছিলেন উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে।

বাঙালি জাতি সঙ্গীতপ্রিয় জাতি, সঙ্গীত তাদের রক্তে। ভারতেও যারা সঙ্গীতে শত বছরের খ্যাতি ধারণ করে আছেন, তাদের অধিকাংশই বাঙালি! আব্দুল আলিম, আলাউদ্দিন, শাহ আব্দুল করিম বা আব্দুর রহমান বয়াতিদের গানে আমরা পাই শেখরের সন্ধান। জাতীয় পরিচয় পাই যে গানে, নিজেদের অস্তিত্বের সন্ধান পাই যাদের গানে, তারা একে একে চলে যাচ্ছেন আমাদের ছেড়ে। ক্রমেই যেন শেখড়-ছাড়া হয়ে যাচ্ছি আমরা!

.

কীভাবে শ্রদ্ধা জানাই!

শোকবার্তা বা একটি পোস্ট দিলেই শ্রদ্ধাপ্রদর্শন শেষ হয়ে যায় না। আমাদের উচিত তার সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। পাইয়ারেটেড বা ইন্টারনেট থেকে গান ডাউনলোড না করে কম করে হলেও দোকান থেকে গানের এলবাম কেনা হতে পারে সর্বশ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা প্রদর্শন। সরকারের নির্দিষ্ট বিভাগের উচিত, অবিলম্বে আব্দুর রহমান বয়াতির সৃষ্টিকর্মের তত্ত্বাবধান করা। আগামির প্রজন্মের জন্য তার প্রতিটি সৃষ্টি, তার জীবনী ইত্যাদি সংরক্ষণ করা উচিত এখনই। যতই দেরি হবে, ততই কমতে থাকবে তার সৃষ্টকর্মের সংখ্যা ও পরিমাণ।

দেশের অস্তিত্ত্ব বহনকারী লোকসঙ্গীত শিল্পী আব্দুর রহমান বয়াতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি !

1111

_____________________________________________________________

তথ্যসূত্র:

ক. দৈনিক ইত্তেফাক ও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম খ. স্বপ্নীল ডট কম  গ. প্রিয় নিউজ ডট কম ঘ. ছবি ইন্টারনেট থেকে।

.

.

পরিশিষ্ট: পাঠকের জন্য অতিরিক্ত কিছু তথ্য

১) ইউটিউবে: মাটির একখান ঘর বানাইয়া মেশিন দিছে তার ভিতর…. মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি

২) বিখ্যাত গানটির লিরিক: শিরোনামঃ মন আমার দেড় ঘড়ি, আব্দুর রহমান বয়াতী

একটি চাবি মাইরা দিলা ছাইড়া
জনম ভরি চলিতেছে।
মন আমার দেহ ঘড়ি সন্ধান করি
কোন মিস্ত্ররী বানাইয়াছে।

থাকের একটা কেস বানাইয়া মেশিন দিলো তার ভিতর
ওরে রং বেরংয়ের বার্নিশ করা দেখতে ঘড়ি কি সুন্দর।

ঘড়ির তিন পাটে তে গড়ন সারা
এই বয়লারের মেশিনের গড়া।
তিনশ ষাটটি ইশকুররম মারা ষোলজন পাহারা আছে।

ঘড়ি হেয়ার স্প্রিং ফ্যাপসা কেচিং লিভার হইলো কলিজায়
আর ছয়টি বলে
আজব কলে দিবানিশি প্রেম খেলায়।

ঘড়ি তিন কাটা বার জুয়েলে মিনিট কাটা হইলো দিলে
ঘন্টার কাটা হয় আক্কেলে
মনটারে সেকেন্ডে দিসে।

ঘড়ির কেসটা বত্রিশ চাকের, কলে কব্জা বেসুমার
দুইশো ছয়টা হাড়ের জোড়া, বাহাত্তর হাজারও তার।

ও মন, দেহঘড়ি চৌদ্দতলা, তার ভিতরে দশটি নালা,
একটা বন্ধ নয়টা খোলা গোপনে এক তালা আছে।

ঘড়ি দেখতে যদি হয় বাসনা
চলে যান ঘড়ির কাছে,
যার ঘড়ি সে তৈয়ার করে ঘড়ির ভিতর লুকাইছে,
ঘড়ির ভিতর লুকাইছে।

পর্দারও সত্তর হাজারে
তার ভিতলে লড়ে চড়ে
জ্ঞান নয়ন ফুটলে পরে দেখতে পারবেন চোখের কাছে।

ওস্তাদ আলাউদ্দিনে ভেবে বলছেন,
ওরে আমার মনবোকা,
বাউল রহমান মিয়ার কর্মদোষে হইল না ঘড়ির দেখা।

আমি যদি ঘড়ি চিনতে পারতাম,
ঘড়ির জুয়েল বদলাইতাম,
ঘড়ির জুয়েল বদলাইবো
কেমন যাই মিস্ত্ররীর কাছে?

মন আমার দেহঘড়ি
সন্ধান করি, কোন মিস্ত্রী বানাইছে।
মন আমার দেহঘড়ি
একটি চাবি মাইরা দিলা ছাইড়া
জনম ভরি চলিতেছে।
মন আমার দেহ ঘড়ি সন্ধান করি
কোন মিস্ত্ররী বানাইয়াছে।

৩) প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী ইতোমধ্যেই শ্রদ্ধাসহ শোকবার্তা পাঠিয়েছেন। দেশের সঙ্গীত ও শিল্পাঙ্গনের অনেকেই গিয়ে হাজির হয়েছেন জাপান-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে!

৪) আরও জানতে ভিজিট করুন:

http://www.gulf-times.com/bangladesh/245/details/363188/top-bangladeshi-folk-singer-dead

www.shopnil.com/home/meet-bangladesh/biography/302-abdur-rahman-boyati

www.news.priyo.com/entertainment/2011/07/01/folk-maestro-fights-life-appea-30397.html

http://www.thedailystar.net/beta2/news/abdur-rahman-boyati-no-more/

“দেহঘড়ি চলবে না আর” – মমতাজ

.

৫) দেশের এই স্বনামধন্য লোকসঙ্গীত সম্রাটকে কীভাবে শ্রদ্ধা জানাবো? আমি ভেবেছি ইন্টারনেট থেকে তার গানগুলো ডাউনলোড করার পরিবর্তে বাজারে গিয়ে তার কয়েকটি এলবাম কিনবো। পাঠকও ভেবে দেখতে পারেন!

 

___________________________________________________________________

**সামহোয়ারইন ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া

Capture1

বিপুল ভট্টাচার্য – একজন সৈনিকের পতন: শ্রদ্ধার্ঘ্য

মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্যচিত্র দিয়ে তৈরি তারেক-ক্যাথরিনের ‘মুক্তির গান’ দেখার জন্য যে কী সংগ্রাম করেছিলাম সেদিন পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে! তখনও ছাত্র। সিনেমাহলে তখনও ছাড়া হয় নি। গায়ের লোম সব দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধকালীন স্লোগান শুনে আর বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাঙালির গেরিলা অপারেশনের চিত্র দেখে; আর একজন মরমী শিল্পীর গান শুনে। একটি গানের দল ট্রাকে করে মুক্তাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে গান গেয়ে প্রাণে শক্তি যুগিয়েছিলো মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধার পরিবার, শরণার্থী কেন্দ্রের বেদনাহত মানুষগুলোকে। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গান শুনতো স্বদেশের জন্য গৃহহারা মানুষগুলো, যেন গানেই তারা খাবার আর শক্তি পাচ্ছে! কেউ নিরবে চোখের পানি ফেলতো, কেউবা গানে দিতো কণ্ঠ। সেই গানের দলের প্রাণ ছিলেন একজন ষোল বছরের যুবক। তার চোখে ছিলো বিষণ্নতা; ঠোঁট-মুখ শুকনো; দেহে খুব মাংস নেই – কিন্তু কণ্ঠে ছিলো প্রাণ-জুড়ানো সুর আর শক্তি।

তিনি বিপুল ভট্টাচার্য, যাকে আমি পড়ে চিনেছিলাম। তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদ তাকে ‘মুক্তির গানের প্রাণ’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। বিপুল না থাকলে কোন মুক্তির গান হতো না। স্বদেশের অন্তরবিদীর্ণ-করা গানগুলোকে প্রাণ দিয়েছিলেন বিপুল তার যাদুকরি কণ্ঠ দিয়ে।

গতকাল টিভিতে সংবাদটি শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। বিশ্বাস করা কঠিন ছিলো। আজ ডেইলি স্টারে ‘ফল অভ্ এ সোলজার’ শিরোনামের খবরটি পড়ে নিশ্চিত হলাম: একাত্তরে শব্দসৈনিক এবং ‘মুক্তি সংগ্রাম শিল্পী সংস্থার’ অন্যতম প্রধান শিল্পী বিপুল ভট্টাচার্য আর নেই। ফুসফুস ক্যানসারের সাথে ২০১০ থেকেই যুদ্ধ করছিলেন বিপুল। গানও বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো আর আগে থেকেই।

ডালিয়া নওশিন, গানের দলের সহশিল্পী, জানালেন, বিপুল তখন খুবই তরুণ। খুবই উদ্যমী এবং আনন্দোচ্ছ্বল ছিলেন। দেশের দুর্যোগ পরিস্থিতি নিজের দরদি কণ্ঠ দিয়ে বিপুল বড় শিল্পী হিসেবে আভির্ভূত হন। আরেকজন সহশিল্পী শাহিন সামাদ বললেন, বিপুল শুধু তার বন্ধু ছিলো না, ছিলো তার শিক্ষকের মতো। স্বাধীন বাংলা বেতারের অন্যতম শব্দসৈনিক তিমির নন্দী ছিলেন বিপুলের বাল্যবন্ধু। তার মতে, বিপুলের ঈশ্বরপ্রদত্ত কণ্ঠ দিয়ে বাঙালির শেখরের গানগুলোকে জনপ্রিয় করেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের সাথে ওপপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন এই মহান শিল্পী, যিনি শেষ জীবনে গান না গাইতে পেরে আফসোস করে গেছেন। যতটুকু গেয়েছেন, তারই বা কতটুকু প্রতিদান তিনি পেয়েছিলেন, তিনিই তা বলতে পারবেন। ছাত্রজীবনে আমার তরুন হৃদয় দগ্ধ হয়েছিলো এই মরমী শিল্পীর দরদি গানে। দেশের প্রতি কতটুকু মায়া আর ভালোবাসা থাকলে এমন প্রাণ-জুড়ানো গান গাওয়া যায়! মুক্তির গানেই আসল বিপুলকে আমি দেখেছিলাম। কেউ যদি ‘মুক্তির গান’ না দেখে থাকেন, তবে বিপুলকে চেনা যাবে না, তার মূল্যও বুঝা যাবে না। আজ তার মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত এবং বেদনাহত। গভীর শ্রদ্ধা জানাই মহান শিল্পীকে!

———————————————-

*আজকের জাতীয় দৈনিকে বিপুল ভট্টাচার্য:
দ্য ডেইলি স্টার
দৈনিক প্রথম আলো
ঢাকা ট্রিবিউন

**মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমার লেখাগুলো
১) মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান
২) দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ
৩) কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি
৪) চরমপত্রের চরম লেখক


[‘মুক্তির গান’ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য: বাঁ থেকে চতুর্থজন বিপুল ভট্টাচার্য্য]

লেখাটি সঞ্চালক কর্তৃক নির্বাচিত হয়েছিলো।

লেখাটি সঞ্চালক কর্তৃক নির্বাচিত হয়েছিলো।

*১৭৫২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ১১ দিন কম*

calendar-1752

তথ্যটি একটি ফেইসবুক পেইজে দেখে আঁতকে ওঠলাম। ‘পঞ্জিকা নিয়ে গঞ্জিকা-ভাষণ’ মনে করে প্রথমে বিশ্বাসই করি নি। পরে বিভিন্ন উৎস থেকে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম কথা ঠিক: ১৭৫২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ১১ দিন বাদ দেওয়া হয়। উদ্যোক্তা ব্রিটিশ রাজ দ্বিতীয় জর্জ (১৭৫৫-১৭৬৭)

কারণ কী: জুলিয়ান পঞ্জিকা থেকে গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকাতে পদার্পনের বছর হলো ১৭৫২।
হিসাব করে দেখা গেলো যে গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকাতে ১১দিন এগিয়ে আছে পৃথিবী। সুতরাং ব্রিটিশ রাজা দ্বিতীয় জর্জ-এর নির্দেশে ৩ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত এই ১১টি দিন বাদ দিয়ে পঞ্জিকাটি সমন্বয় করা হয়। পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরির নামে প্রবর্তিত হয় গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা।

প্রভাব: ওই মাসে কর্মীরা ১১দিন কম কাজ করেও পুরো মাসের মায়না পায়। সেই থেকে ‘পেইড লিভ’ বা পরিশোধিত ছুটির প্রবর্তন। রাজার জয় হোক ‘হেইল দ্য কিং!’ বলে শ্রমিকেরা চিৎকার জুড়ে দেয় তখন।

কিছু প্রাসঙ্গিক তথ্য: ঐতিহ্যগতভাবে এপ্রিল ছিলো বছরের প্রথম মাস, কোন দেশে মার্চ মাসেও! কিন্তু গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকায় জানুয়ারিকে করা হলো প্রথম মাস। মানুষ পুরাতন ঐতিহ্যে এতোই অভ্যস্ত হয়ে পড়ে যে, নতুনকে সহজে মানতে চায় না। তাই অনেকে এপ্রিল মাসেই অনেকে নববর্ষ পালন করতে লাগলো। গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা প্রবর্তনের পর, রাজা দ্বিতীয় জর্জ তা মানতে পারলেন না। অবশেষে ডিক্রি জারি করে জানিয়ে দেওয়া হলো যে, যারা এর পরও এপ্রিল মাসে নববর্ষ উদযাপন করবে তারা ‘বোকা ওরফে আহম্মক’ হিসেবে পরিচিত হবে। প্রবর্তিত হলো এপ্রিল ফুল দিবসের! তবে বিষয়টি প্রশ্নাতীত নয়।

লিপ ইয়ার অসঙ্গতি: জুলিয়ান পঞ্জিকা সম্রাট জুলিয়াস সিজার প্রবর্তন করেন খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬ অব্দে, চালু হয় ৪৭ অব্দ থেকে। ইউরোপ, আমেরিকা এবং সারা পৃথিবীতে ইউরোপীয় উপনিবেশগুলোতে জুলিয়ান পঞ্জিকা ছিলো একমাত্র গ্রহণযোগ্য পঞ্জিকা। গড় হিসাবে জুলিয়ান পঞ্জিকা ছিলো ৩৬৫.২৫ দিন দীর্ঘ, কারণ প্রতি চার বছর অন্তর ফেব্রুয়ারি মাসে একদিন লিপ ইয়ার গণনা করা হতো। কিন্তু গ্রিক জ্যোতির্বিদদের মতে, সঠিকভাবে সৌর বর্ষ বিবেচনা করলে বছরে ৩৬৫.২৫ দিনের চেয়ে কিছু কম হয়। এ অসঙ্গতিটি গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকায় সংশোধন করা হয়।

প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন: বাংলাদেশে আমরা এপ্রিল মাসের ১৪/১৫ তারিখে নববর্ষ অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ উৎযাপন করি, এর সাথে কি জুলিয়ান বা আসিরিয়ান পঞ্জিকার কোন যোগসূত্র আছে? না থাকলেও তাদের সাথে আমাদের সামঞ্জস্য দেখে মজা পেলাম

কৌতূহলীরা “September 1752 calendar” লেখে খোঁজ নিতে পারেন।

রাজা দ্বিতীয় জর্জ (১৭৫৫-১৭৬৭)

রাজা দ্বিতীয় জর্জ (১৭৫৫-১৭৬৭)

*প্রথম আলো ব্লগে পাঠকের প্রতিক্রিয়া*

—————————
তথ্যসূত্র: এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা ও উইকিপিডিয়া।

আজ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী দিবস এবং বাঙালির গর্বের দিন

483184

১) সামরিক দিবসে বেসামরিক আমার কী করার আছে!

আজ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী দিবস। বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষীদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং বিভিন্ন ক্যাজুয়াল্টিতে জীবনদানকারী সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য এ দিবসকে বেছে নেওয়া হয়েছে। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশন প্রতিষ্ঠিত হবার পর বিভিন্ন সংঘর্ষ, দুর্ঘটনা ও রোগাক্রান্ত হয়ে প্রায় ৩,১০০ সেনা, পুলিশ ও ভলানটিয়ার জীবন দান করেন। এর মধ্যে শতাধিক বাংলাদেশি সেনাসদস্য আছেন যা ভিনদেশে শান্তিপ্রতিষ্ঠার জন্য আত্মাহুতি দিয়েছেন। বিশ্বের দুর্যোগ ও যুদ্ধাক্রান্ত দেশগুলোতে শান্তি ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় বাংলাদেশ সেরা অবদানকারী যদি না হতো; যদি সারাবিশ্বে বাংলাদেশ নজিরবিহীন সুনামের অধিকারী না হতো, যদি সেখানে দেশের সূর্যসন্তানদের আত্মত্যাগ না থাকতো – তবে শান্তিরক্ষী দিবস নিয়ে আমাদের সাধারণ বেসামরিক মানুষদের ভাবনার কোনই কারণ থাকতো না। তাছাড়া জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের সকল শান্তির যোগানদাতা নয়, হতেও পারে নি। কেউ কেউ মনে করেন, এই শান্তিরক্ষীরা আধিপত্যবাদীদেরই শান্তি রক্ষা করছে।

সেটি বিতর্কের বিষয় হয়েই থাকুক, কিন্তু বাংলাদেশের জন্য শান্তিরক্ষা বা পিসকিপিং মিশন একটি গৌরবের বিষয় এবং পেশাদারিত্ব অর্জনের সুযোগ। একই সাথে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি নির্ভরযোগ্য ও স্থায়ি মাধ্যম এটি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ি পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ এখন সর্বোচ্চ সদস্যদাতা দেশ।

“দরিদ্র দেশ হয়েও বাংলাদেশ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে সর্বোচ্চ সহায়তাদানকারী দেশ। প্রায় ১০,০০০ সেনা ও পুলিস বাহিনী দিয়ে বিশ্বের ৪৫টি দুর্যোগ-আক্রান্ত অঞ্চলে নিযুক্ত আছে।…..হয়তো অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে সেনাবাহিনীতে এতো সদস্য নেই কিন্তু জনসংখ্যা-অধ্যুষিত এ দেশটিতে ৩ লাখ সেনাবাহিনী রয়েছে যারা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈরি প্রকৃতিতে আগে থেকেই অভ্যস্ত। এরা জানে কীভাবে দ্বন্দ্ব নিরসন করতে হয়।” (আলজাজিরা)

নাবিবিয়া, ইউগান্ডা, মোজাম্বিক, কম্বোডিয়া, সোমালিয়া, রোয়ান্ডা, সিয়েরালিওন, তাজিকিস্তান, পশ্চিম সাহারা, কসোভো, পূর্ব তিমুর, কঙ্গো, আইভোরিকোস্ট, ইউগোস্লাভিয়া, ইথিওপিয়াসহ কমপক্ষে ২৫টি দেশে বাংলাদেশি সেনাবাহিনী বীরত্বের সাথে শান্তি রক্ষায় নিয়োজিত আছে।

Presentation2-crop

 

২) দরিদ্র দেশের অন্তরটা কিন্তু কখনও দরিদ্র ছিলো না

তথাকথিত উন্নত দেশের আত্মস্বীকৃত মুরুব্বিয়ানরা দরিদ্র বলে আমাদের অর্জন আর কৃতীত্বকে প্রায়ই ছোট করার চেষ্টা করেছে । কিন্তু দরিদ্র হলেও মহৎ উদ্দেশ্য আত্ম বলিদানে কখনও পিছপা হয় নি এ তীতুমির, সূর্যসেন আর ক্ষুদিরামের বাংলাদেশের মানুষগুলো। তা হলে ন’মাসে স্বাধীনতা আসতো না। স্বাধীন হবার পর অর্থাৎ সদস্য প্রাপ্তির পর (১৯৭৪) থেকেই বাংলাদেশ জাতিসংঘের অন্যতম শান্তিসহায়ক দেশ হিসেবে কাজ করে এসেছে। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সময় (১৯৮৮) থেকে ইরাকে সেনাবাহিনীর পাঠানোর মধ্য দিয়ে প্রত্যক্ষ সহায়তা শুরু করে বাংলাদেশ। শুরুতে কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিলো – উচ্চ বেতনে বিদেশে থাকার পর স্বদেশে ফিরে সেনাসদস্যরা অপেক্ষাকৃত কম বেতনে আমার কাজে ফিরবে কিনা এরকমের আশংকা ছিলো। কিন্তু স্বদেশপ্রেমী সেনাবাহিনী এরকম আশংকা মিথ্যা প্রমাণ করেছে।

বিবিসি বাংলাদেশের সাহসী শান্তিরক্ষীদেরকে ‘ক্রিম অভ্ পিসকিপারস’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের সাহসিকতা, পেশাদারিত্ব ও আত্মত্যাগের প্রশংসা করেছে (২০০৪)।
তাদের পেশাদরিত্বকে ‘হাইয়েস্ট অর্ডার’ বা উন্নতমানের বলা হয়েছে এবং বিভিন্ন উচ্চতর দায়িত্বেও আমাদের সেনাকর্মকর্তারা সুযোগ পেয়েছেন।

জাতিসংঘের ভাষ্যমতে বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীর চাহিদা বেড়েই চলেছে কারণ, এদেশের সেনাসদস্যদের শৃঙ্খলাবোধ প্রশংসনীয়। এই মে মাসেই আরও ৬০০ সেনা যুক্ত হয়েছে জাতিসংঘের মূল বাহিনীতে।

৩) ১৪৩২ বাংলাদেশী শান্তিরক্ষী পুরস্কৃত

২০১২ সালে লাইবেরিয়াতে বাংলাদেশি সেনাবাহিনীর পেশাদার কর্মকাণ্ডের জন্য ১৪৩২ সেনাকে ‘জাতিসংঘ মেডাল’ প্রদান করা হয়। স্থানীয় লাইবেরিয়ান সৈন্যদেরকে প্রকৌশলী প্রশিক্ষণে বিশেষ সফলতার জন্য তাদেরকে এ অসামান্য স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য ওই প্রশিক্ষণ ছিলো খুবই প্রয়োজনীয়।

৪) সিয়েরালিওনে এক টুকরো বাংলাদেশ 

বাংলাদেশ ছাড়াও একটি আফ্রিকান দেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বাংলাদেশ নামে রাস্তাঘাট। ভাবতেই কেমন লাগে। বাংলাদেশের জাতীয় দিবসে অন্য দেশের মানুষের উল্লাস। দেশটির নাম সিয়েরালিওন। বিভিন্ন সামাজিক সেবা ছাড়াও ৫৪ কিলোমিটারের একটি রাস্তা নির্মাণ করে দিয়েছে আমাদের সেনাবাহিনী। সিয়েরালিওনসহ আফ্রিকান দেশগুলোতে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিরও একটি সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রাণসহ কিছু কোম্পানি শুরুও করেছে। এসূত্র ধরে ২০১০ সালে সেখানে বাংলাদেশ দূতাবাস খোলা হয়েছে।

 

২০১৩ শান্তিরক্ষী দিবসের ফ্লাইয়ার

২০১৩ শান্তিরক্ষী দিবসের ফ্লাইয়ার

৫) ২০১৩ শান্তিরক্ষী দিবস (২৯ মে)

২০১৩ সালের শান্তিরক্ষী দিবসের প্রতিবাদ্য বিষয় হলো: নতুন চ্যালেন্জের সাথে খাপ খাওয়ানো। দু’টি উদ্দেশ্য হলো ১) শান্তিরক্ষায় জীবনদানকারী সদস্যদের স্মৃতিতে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন এবং ২) যেসব পুরুষ ও নারী সদস্য এখনও পর্যন্ত পেশাদারিত্ব, সাহসিকতা এবং আত্মত্যাগ নিয়ে কাজ করছেন তাদেরকে স্বীকৃতি দেওয়া। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতেও রয়েছে বিশেষ আয়োজন। বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রে যারা শান্তিরক্ষায় প্রাণ হারিয়েছেন বা আহত হয়েছেন, একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আজ তাদের আত্মীয়দেরকে সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে।

 

৬) শেষ কথা

এপ্রসঙ্গে বহির্বিশ্বের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে একটি কথা প্রচলিত আছে। প্রতিটি সরকারের শেষ দিনগুলোতে যখন নির্বাচন নিয়ে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তখন সকলেই একটি পরিচিত বিপদের আশংকা করে থাকে। তা হলো, সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ বা কুদেতা। ২০০৭ সালে হতে হতেও অবশেষে সেটা হয় নি। সকলেই বিস্মিত। এর কারণ প্রধান হলো, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সুনাম, শৃঙ্খলার খেতাব এবং আন্তজার্তিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের সম্পৃক্ততা। বহির্বিশ্বের সুনামের প্রতি সুবিচার করেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের সংবিধানকে সমুন্নত রাখছে। এবারও (২০১৩) এরকম একটি আশংকাকে তারা নাকচ করে দিয়েছে। বিষয়টি যদি তা-ই হয়, তবে আমাদের সেনাবাহিনীকে নিয়ে গর্ব করতেই পারি আমরা।

বাঙালির গর্ব করার জায়গাগুলো খুবই কম। ক্রিকেট, গার্মেন্টস শিল্প, ক্ষুদ্রঋণ ইত্যাদির মধ্যে বহির্বিশ্বে শান্তি রক্ষা করতে সমর্থ হওয়া একটি আন্তর্জাতিক গৌরবের বিষয়। গৃহযুদ্ধ বা দুর্ভিক্ষ আক্রান্ত কিছু দেশকে আমরা দিচ্ছি শান্তি ও সমৃদ্ধির দিশা। এখানে আমরা দেবার গৌরব লাভ করছি। বাংলাদেশ ছাড়া আরও ১১৭টি দেশ আছে, যাদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম অবস্থানে। বিনিময়ে আমরা পাচ্ছি দেশের প্রশিক্ষণকে বিদেশের বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার সুযোগ; পাচ্ছি অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা আর পাচ্ছি আন্তর্জাতিক সুনাম। তবে তা এমনিতেই আসে নি। কঠিন মূল্যও আমাদেরকে দিতে হয়েছে। শতাধিক সূর্যসন্তানকে আ্মরা হারিয়েছি বিদেশের মাটিতে। জানি না তাদের পরিবার শুধু আর্থিক সহায়তা নিয়ে কীভাবে দিনাতিপাত করছে। সেনাবাহিনী বলেই আমরা যেন তাদেরকে অন্য গ্রহের প্রাণী মনে না করি। তারা আমাদেরই কারও আত্মীয় বা সহকর্মী হয়ে থাকবেন। আজ এই বিশেষ দিনে, তাদেরকে স্মরণ করি পরম শ্রদ্ধায় আর পরিবারকে জানাই আন্তরিক সহমর্মিতা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নিয়ে সত্যিই আমরা গর্বিত।

তথ্যসূত্র:
১) বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হোমপেইজ
২) বিবিসি ও আলজাজিরা (টিভি ও অনলাইন সংস্করণ)
৩) ডেইলি নিউ এইজ
৪) দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক কালের কণ্ঠ ও দৈনিক জনতা

 

প্রথম আলো ব্লগ

প্রথম আলো ব্লগ

[একটি পাবলিক ব্লগসাইটে লেখাটি সঞ্চালক কর্তৃক নির্বাচিত হয়েছিলো]

 

আগ্রহী পাঠকের জন্য:

*নীল হেলমেটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

*একজন লাইবেরিয়ানের হৃদয়ে বাংলাদেশ, একজন সহব্লগারের লেখা

*দেশে এবং বিদেশে বাংলাদেশি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী সম্মান অর্জন করেছে

*বিবিসি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন

 

Presentation2-crop

পোশাক শ্রমিকের অধিকার: বিজিমিয়া আসলে করে কী?

হ্রদের ওপর বিজিমিয়া’র প্রাসাদ

হ্রদের ওপর বিজিমিয়া’র প্রাসাদ

বিজিমিয়া আসলে কার সেবা করে?

সমস্যা এলেই এর তাৎক্ষণিক সমাধান চাই আমরা – সাথে জানতে চাই এর সূত্রপাত কোথায়। সবচেয়ে বেশি চাই, দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানটিকে সনাক্ত করতে। তাজরিন ট্রাজিডি, সাভার ট্রাজিডি, অগ্নিসংযোগ আর অন্তহীন শ্রমিক বিদ্রোহের ঘটনায় বার বার একটি প্রতিষ্ঠানের দিকে দৃষ্টি চলে যায়। একটি আঠারো-তলা ভবনের দিকে অসহায় মানুষের প্রশ্নগুলো গিয়ে জমা হয়। তারা আসলে কী করছে সেখানে? দেশের পোশাকশিল্পে তাদের কোনই নিয়ন্ত্রণ নেই? প্রতিষ্ঠানটি আসলে কিসের উদ্দেশ্য গড়ে ওঠেছে? অথচ দেশের পোশাকশিল্পকে যথাযথ দিকনির্দেশনা দিয়ে প্রগতির দিকে পরিচালনা দেবার লক্ষে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠেছিলো। বিজিএমইএকে বাংলা কথাবার্তায় ‘বিজিমিয়ার’ মতো শুনায়, যেমন ডিওএইচএসকে ‘ডিএস’ বলেন আমাদের রিকসাড্রাইভার ভাইয়েরা। বিজিমিয়া বিজি ফর নাথিং?

 

কাগজে-কলমে বিজিমিয়ার উদ্দেশ্য

বিজিএমইএ’র মৌলিক উদ্দেশ্য হলো উৎপাদনকারী, রপ্তানীকারক এবং আমদানীকারকদের মধ্যে আন্তরিকতা এবং পাস্পরিকভাবে অনুকূল সম্পর্কের জন্য, এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বৃদ্ধির জন্য একটি সুষম বাণিজ্যিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা। এটি বিজিএমইএ’র হোমপেইজে তারা নিজেরাই ঘোষণা করেছে। তাদের অনেক উদ্দেশ্যের মধ্যে প্রথম তিনটি উদ্দেশ্য হলো ১) সরকারি নীতিমালার প্রয়োগের মাধ্যমে পোশাকশিল্পের স্বার্থ রক্ষা এবং এ সেক্টরের সুষম অগ্রগতি সাধন করা; ২) গার্মেন্টস কর্মীদেরকে আইনসংগত সুবিধাদি এবং তাদের অধিকার বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বিজিএমইএ সদস্য এবং তাদের কর্মীদের স্বার্থ রক্ষা করা; ৩) বিদেশী এবং স্থানীয় পর্যায়ের ক্রেতা-প্রতিনিধির সাথে পরামর্শ ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পোশাকশিল্পের অগ্রগতি সাধন করা। বিজিএমইএ’র প্রধান একটি দায়িত্ব হলো এক্সপোর্ট অর্ডারের ভিত্তিতে কাপড়, সূতা, রঙ, পশমি সূতা ইত্যাদির পরিমাণ নির্ধারণ করে সদস্য কারখানার জন্য ইউডি (ইউটিলাইজেশন ডিক্লেয়ারেশন) ইস্যু করা। পোশাক কারখানাকে শিশুশ্রম মুক্ত করা বিজিএমইএ’র ‘ঈমানি দায়িত্ব’, কারণ তা না হলে স্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক স্মারকের বরখেলাপ হবে। বলা বাহুল্য ঈমানি দায়িত্বটিও যথাযথভাবে পালন করে নি আমাদের বিজিমিয়া, অর্থাৎ বিজিএমইএ – ফলে, চিরতরে বাজার-হারা!

 

তিন দশকে পোশাকশিল্পের উন্নয়ন

তিন দশকে পোশাকশিল্পের উন্নয়ন

বিজিমিয়ার জামিতিক গতিতে উন্নয়ন আর গরিবের হাতে মূলা

১৯৭৭ সালে মাত্র ১২টি পোশাক তৈরির কারখানাকে সদস্যপদ দিয়ে বিজিএমইএ’র যাত্রা শুরু। স্বল্পমূল্যে, অনেকে বলছে বিনামূল্যে, শ্রম পাওয়া যায় ঘণবসতির এ বাংলাদেশে। ফলে, বছরের পর বছর লাভ বেড়েছে, কারখানার সংখ্যা বেড়েছে, সেসাথে বেড়েছে কর্মীর সংখ্যা।

পোশাক শিল্পকে সুবিধা দেবার ক্ষেত্রে দেশের সরকারগুলো যেন প্রতিযোগিতায় নেমেছিলো। কী পায় নি তারা? কর অবকাশ বা ট্যাক্স হলিডে তো নিয়মিতই পাচ্ছে। এযাবত নগদ প্রণোদনা বা ক্যাশ ইনসেনটিভ হিসেবে পেয়েছে প্রায় দশ হাজার কোটি টাকা। ইউরোপ বা পশ্চিমা দেশ থেকে শুল্ক অব্যাহতি পাবার লক্ষে জিএসপি সুবিধা পাবার জন্য সরকারের সর্বোচ্চ প্রভাবকে তারা ব্যবহার করেছে প্রায় সব দলের আমলেই। শুধু ২০১১-২০১২ সালে তৈরি পোশাক থেকে ১৯ বিলিয়ন আয় হয় যা মোট বৈদেশিক আয়ের ৭৮%।

 

৪০ লাখ কর্মীর ৮০% ভাগই নারী

৪০ লাখ কর্মীর ৮০% ভাগই নারী

অধিক শ্রমিকের যোগান আর গরিবের পেটে লাথি

বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ কর্মীর ৮০% নারী কর্মী যারা প্রথাগতভাবেই কণ্ঠ উচ্চে তুলতে পারে না। সঙ্গত কারণেই তাদের নিয়ে কাজ করতে সুবিধা বেশি। ফলে নারী কর্মীর কর্মসংস্থানে অল্প প্রচেষ্টাতেই তা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এভাবে পোশাকশিল্পে নারীর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। অংশগ্রহণও বেড়েছে। অভাবের তাড়নায় গ্রাম থেকে পালানো কিশোরী মেয়েদের একমাত্র আশ্রয় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি। বানের পানিতে ভাসা কচুরিপানার মতো শহর ও উপশহরগুলোতে কর্মহীন কিশোর-কিশোরিদের ভিড় বাড়তে লাগলো। বাড়তে লাগলো অযাযিত শ্রমের যোগান। যোগান বেশি হলে চাহিদা কম, তাই শ্রমের দামও কম। কিন্তু শ্রমিকের পক্ষে তো অর্থনীতির মারপেঁচ মোতাবেক আচরণ করা সম্ভব নয়। তাদেরকে কাজ করতেই হবে – অন্তত পেটের ভাত তো জুটবে! এসুবিধাকে কাজে লাগাবে না এরকম নীতিবান ব্যবসায়ী কি আশা করা যায়?

 

শ্রমিকের অধিকার: ব্যবসায়ী না শুনে নীতির কাহিনি

বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ন্যূনতম বেতন নিয়ে বেশ জোড়ালো দাবি ওঠলো। পোশাক কারখানার পরিবেশ নিয়ে বিদেশী ক্রেতারা মিহিসুরে কিছু অভিযোগ করেই খেমতা দেন, কারণ এর চেয়ে বেশি বললেই ঝামেলা গিয়ে পড়বে এলসি’র ওপর। তাহলে বাকি থাকলো কে? আমাদের সুশীল সমাজ, যাদেরকে অনেকে ভিন্ন নামে চেনে। তাদের আওয়াজের সাথে রাষ্ট্রীয় কোন সহযোগিতা না থাকায় ওটা আওয়াজ পর্যন্তই থেকে যায়। মুখচেনা কিছু শ্রমিক নেতাকে ডেকে এনে একটি সাংবাদিক সম্মেলন করলেই কেল্লা ফতে! গার্মেন্টস মালিকদের কীইবা করার আছে বলুন? এতো কিছুর পরও তো তাদের শ্রমিকের অভাব হচ্ছে না। তারা কি দেশের নারীসমাজকে কর্ম দিয়ে দেশকে উদ্ধার করে দিয়েছে না? তাজরিন ফ্যাশনে অগ্নিকাণ্ডে যখন ১১২ শ্রমিক মারা গেলো তখন তাৎক্ষণিকভাবে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়, কারণ কমিটি বললে এখন আর কেউ বিশ্বাস করে না। যা হোক, ওই টাস্কফোর্স এসে সাংবাদিকদের বললো অবিলম্বে তারা দেশের পোশাককারখানা পরিদর্শন করবে। একটি কারখানা পরিদর্শনের পর, হোই পর্যন্তই ‍উহা শেষ!

এবার ভবনধসে মারা গেলো ৪০৫ শ্রমিক, তাই বেশি কিছু করতে হবে। তারা পুরস্কার ঘোষণা করলো, যারা ভবনমালিক সোহেল রানাকে ধরিয়ে দিতে পারবে তাদেরকে ৫লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। একজন সাবেক বিজিমিয়া বললেন, “ভাই এবারের ঘটনা ভিন্ন। সত্যিই আমাদের ভাবিয়ে তোলেছে।” এভাবে কিছুদিন মিডিয়ার সামনে তারা ঢাকঢোল পেটাবে। তারপর যেই লাউ সেই কদু!

 

দুধকলা খাইয়ে……

পৃথিবীর অন্য কোন দেশে কোন ব্যক্তিমালিকানাধীন শিল্পকে দেশের সরকার এতো সুবিধা দেয় নি। সরকারি ভর্তুকি, তাও নগদ অর্থে, কোন দেশে এরকম আছে কিনা জানা নেই। সুবিধা আর আস্কারা দেবার নিকৃষ্ট প্রমাণ হলো হাতিরঝিলের ওপর বিজিমিয়ার অবৈধ ১৮ তলা ভবন। বেআইনিভাবে সরকারি জমিতে গড়ে তোলা ভবনটিকে ভেঙ্গে ফেলার হুকুম আসলেও বিভিন্ন কায়দা-কানুন করে তারা স্থগিতাদেশ বের করেছে। এই হলো বিজিমিয়ার নীতি প্রতি শ্রদ্ধার নমুনা।

অতএব ভবনধসের পর অগ্নিকাণ্ড আবার অগ্নিকাণ্ডের ভবনধস এভাবে চলতেই থাকবে। খেয়াল রাখতে হবে, বিজিমিয়া হলো একটি গার্মেন্টস মালিক এসোসিয়েশন। যে দেশে ট্রেড ইউনিয়নের কার্যকারিতা নেই, নেই শ্রমিক সংগঠনের স্থায়ি কোন অস্তিত্ব, সে দেশে বিভিন্ন শিল্পের মালিকদের এসোসিয়েশনে ভরপুর। অতএব বিজিমিয়া বিজি আছেন তাদের নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে আর কীভাবে অধিক লাভ করা যায়। শ্রমিকের ন্যূনতম বেতন বা কর্মস্থলে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ দিলে কি লাভ থাকবে? জাতির কাছে এই প্রশ্ন রেখে শেষ করলাম।

 

*পাদটীকা: পরিস্থিতির উন্নয়ন না হলে পোশাকশিল্প ধ্বংস হবে শিঘ্রই। ইউরোপিয়ান কমিশন সম্প্রতি সাবধান করে দিয়েছে। হ্রাসকৃত বা বিনা শুল্কে ইউরোপে পোশাক রপ্তানি করার সুবিধা হারাবার সমূহ সম্ভাবনা। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নয়ন না হলে জেনারেলাইজড সিস্টেম অভ প্রেফারেন্স বা জিএসপি সুবিধা কেড়ে নেবার হুমকি দিয়ে তারা।

 

**তথ্যসূত্র:

1)  http://www.banglapedia.org/HT/B_0439.HTM

2)  http://www.prothom-alo.com/detail/date/2013-04-30/news/348863

3)  http://www.bgmea.com.bd/home/pages/aboutus#.UYKBEaL-E-Q

4)  http://www.thedailystar.net/beta2/news/bgmea-and-image-crisis/

 

*** প্রথম আলো ব্লগে পাঠক মন্তব্য

শ্রদ্ধাঞ্জলি: বিনোদ বিহারী চৌধুরীর তিন কাল ও বাঙালির শেষ বিপ্লবী

বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী

বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী

মাস্টারদা সূর্যসেন বলেছিলেন, ব্রিটিশরাজের হাত থেকে দেশকে স্বাধীন করার একটিই পথ হলো, ক্ষমতা দখল করা এবং প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করা। ত্রিমুখী লক্ষ্য নিতে হবে: প্রথমে দু’টি অস্ত্রাগার লুঠ করতে হবে তারপর উপড়ে দিতে হবে রেল লাইন, যাতে বাইরে থেকে খুব তাড়াতাড়ি সৈন্য আসতে না পারে। তৃতীয় কাজটি ছিলো, ইউরোপিয়ান ক্লাবকে উড়িয়ে দেওয়া, যেখানে ব্রিটিশ সৈন্য ও কর্মকর্তারা গান আর পান করে উল্লাস করে। সারা দেশ থেকে ব্রিটিশ সৈন্যরা জড়ো হবার পূর্বেই চট্টগ্রামকে স্বাধীন করতে হবে। নিজেদের জীবন দিয়ে স্বদেশীদের জন্য স্বাধীন করতে হবে দেশকে। হয় দেশের মুক্তি না হয় আত্মার মুক্তি। মাঝখানে কোন রাস্তা নেই। যুদ্ধ পরিকল্পনা উপস্থাপনার সময় কথাগুলো বলছিলেন বিনোদ বিহারীসহ প্রায় একশ’ তরুণের সামনে।

মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে প্রধান সহযোদ্ধারা ছিলেন প্রীতিলতা ওয়ায়েদ্দার, কল্পনা দত্ত, কালিপদ চক্রবর্তী, আম্বিকা চক্রবর্তী, মাখন ঘোষাল, তারাকিশোর দস্তিদার প্রমূখ অনেকে। বিনোদ বিহারী ছিলেন সূর্যসেনের তরুন সহযোগী। মাত্র ১৯ বছরের তরুন বিনোদকে পড়াশুনার পরামর্শ দিয়ে সস্নেহে এড়িয়ে যান মাস্টারদা। কিন্তু বিনোদের চাপে এবং অন্য কোন দলে যোগদানের হুমকিতে হাসিমুখে বরণ করেন।

চট্টগ্রামের তরুন বিপ্লব ১৯৩০

১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল বাঙালির ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল রাত। চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ। চরম সাহসিকতা ও চাঞ্চল্যকর রাত। সসস্ত্র বিপ্লবের জন্ম রজনী। ভারত স্বাধীনতার সংগ্রাম এগিয়ে গেলে চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ঘটনার ঔজ্জল্য কমে গেলেও এর গুরুত্ব ভোলার নয়।

সে রাতে ৬৫ তরুন বিপ্লবী স্বদেশপ্রেম আর স্বাধীনতার স্বপ্নে সজ্জিত হয়ে একত্রিত হয়েছিলেন মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে। তাদের লক্ষ্য ছিলো চট্টগ্রামকে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত করা। একযোগে তারা আক্রমণ করেছিলেন ব্রিটিশ সময়ের পুলিস স্টেশন, অস্ত্রাগার ও রেডিও স্টেশন।

অস্ত্র লুণ্ঠন, টেলিগ্রাফ অফিস ধ্বংস, রেললাইন কাকা, এবং দামপাড়া পুলিশ লাইনের অস্ত্র লুণ্ঠুন করে ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল থেকে তিন দিনের জন্য চট্টগ্রামকে স্বাধীন করে রাখেন ব্রিটিশ রাজের ক্ষমতা থেকে।

জঙ্গী বিপ্লবের শুরু। সূর্যসেন পলাতক। সমগ্র মহাভারত কেঁপে ওঠলো। একসময় সূর্যসেন ধরা পড়লেন। সাথে তারাকিশোর দস্তিদার ও তরুণী কল্পনা দত্ত। বিচার হলো সূর্যসেন ও তারাকিশোরের। ফাঁসি হলো তাঁদের। লাশ ফেলে দেওয়া হলো বঙ্গোপসাগরে। বিশ্বাসঘাতক আত্মীয়রা ১০,০০০ টাকার লোভ সংবরণ করতে না পেরে সূর্যসেনের সন্ধান জানিয়ে দেয় ব্রিটিশ পুলিসের কাছে। ১৯৩৪ সালের সূর্যসেনের ফাঁসি হয়।

বিপ্লবী চেতনায় দীক্ষিত হয়ে বিনোদ প্রথমবারের মতো সম্মুখযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন জালালাবাদ পাহাড়ে। সূর্যসেনের বিশ্বাসঘাতক আত্মীয়দেরকে হত্যা করেন বিনোদ বিহারীর দল। সেখানে তারা পুলিস দ্বারা বেষ্টিত হয়েছিলো। চোখের সামনে ১২জন সহযোদ্ধাকে মৃত্যুবরণ করতে দেখেন বিনোদ বিহারী।

গলায় বুলেটের আঘাত পেয়ে সহযোদ্ধাদের দুশ্চিন্তার কারণ হন। তাদের কেউ প্রস্তাব দিলো গুলি করে মেরে ফেলার, তাতে ব্যথা কমে যাবে! কিন্তু অন্যরা ভাবলো, হয়তো বিনোদ সুস্থ হয়ে ওঠবে।আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় চিকিৎসা নেন এবং সুস্থ হয়ে ওঠেন। ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত আত্মগোপনে থাকার পর গ্রেফতার হন এ বিপ্লবী। ব্রিটিশ রাজ তার মাথার দাম নির্ধারণ করেছিলো ৫০০ টাকা। ধরা পড়েন বিনোদ এবং গ্রেফতার হয়ে রাজপুতনায় কারাবন্দী হন বিনোদ বিহারী। সকল নির্যাতন এবং পাশবিকতাকে অতিক্রম করে তিনি ব্রিটিশদের বিদায় দেখেছেন। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল মিলে সাত বছর কাটিয়েছেন কারাগারে।

এর দু’বছর পরের ঘটনা। ব্রিটিশ সেনা অধ্যূষিত পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করে আহত হলেন পলাতক প্রীতিলতা ওয়ায়েদ্দার। ধরা পড়ে লাঞ্ছিত হবার ভয়ে পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে নিজেই নিজের জীবন নিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে প্রথম নারী শহীদ।

বিপ্লবের পরের দিনগুলো

স্বাধীনতা এসেছিলো। কিন্তু সুর্যসেন প্রীতিলতাদের সাথে যেরকম স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন সেটি তাদের পাওয়া হয় নি। দেশবিভাগের পর যখন হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেই ভারতে পারি দেন, তখন বিনোদ বিহারী চৌধুরী বেছে নিয়েছিলেন স্বদেশকেই। ছায়া স্বাধীনতার কঠিন পর্ব অতিক্রম করেন ১৯৪৭ এর পরের সময়টিতে। স্বপ্নভঙ্গ আর হতাশার সময়।

অবশেষে আসলো একাত্তর। বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের কাছে নিজের ভাগ্যকে ছেড়ে দেন। বছর শেষে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ পেয়ে নিজের অস্তিত্বও বিশ্বাসে নতুন শক্তি লাভ করেন।

বিনোদ বিহারী ব্রিটিশ-ভারতের সময় হতে বাংলাদেশ পর্যন্ত যাবতীয় রাজনৈতিক ও অধিকার আন্দোলনের সাক্ষী হয়ে সংগ্রাম করেছেন, প্রতিবাদ করেছেন। অর্জন করেছেন বিরল সম্মান ও সম্মাননা। আমৃত্যু তিনি অন্যায়, অবিচার, বৈষম্য আর সাম্প্রদায়িকতার বিপক্ষে সোচ্চার ছিলেন। মানবতাবিরোধী সংগ্রামে লড়াকু ভূমিকা পালন করে স্বদেশকে দিয়েছেন দীর্ঘসময়ের সঙ্গ। সাম্প্রতিক সময়েও তিনি ছিলেন চট্টগ্রামবাসীর অভিভাবকের মতো। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি থেকেছেন সকল মতের সকলের মধ্যমণি হয়ে।

জন্ম শতবার্ষিকীতে একটি দৈনিকের সাথে এক সাক্ষাৎকারে জীবনের শেষ চাওয়া কী জিজ্ঞেস করা হলো। উত্তরে তিনি যুবকদেরকে আরও সাহসী হতে বলেন। অবিচার এবং মিথ্যাকে ঘৃণা করার পরামর্শ দেন। “দেশকে ভালো বাসো। স্বদেশের মানুষের জন্য শ্রম দাও, দেশ বদলে যাবে।” ব্রিটিশ থেকে পাকিস্তান এবং পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হবার প্রক্রিয়ায় স্বদেশ ত্যাগের প্ররোচনা এসেছে বারবার। অনেকে চলেও গেছেন অপর বাংলায়। কিন্তু এতটুকু আত্মকেন্দ্রীক হতে পারেন নি বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী। স্ত্রী এবং দুই পুত্রসন্তান, সব হারিয়ে শেষ দিনগুলোতে নিজের অস্তিত্বের সাথে বিপ্লব করতে হয়েছে তাকে। স্বাধিকার আন্দোলনের সবগুলো ফটক অতিক্রম করে বাঙালি জাতির সর্বশেষ বিপ্লবী বিদায় নিলেন এ এপ্রিলেই, যে এপ্রিলে বিপ্লবের বীজ বুনেছিলেন ১৯৩০ সালে। কলকতার ফর্টিস হাসপাতালে ১০৩ বছর বয়সে গত ১০ এপ্রিল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মহান বিপ্লবীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি!

টাইমলাইন: বিনোদ বিহারী চৌধুরী

১৯১১: বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর জন্ম (১০ জানুয়ারি), চট্টগ্রাম
১৯২৭: আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবী দল ‘যুগান্তরে’ যোগদান
১৯২৯: কৃতীত্বের সাথে মাধ্যমিক পাশ (মেট্রিকুলেশন) করে বৃত্তি লাভ করেন

১৯৩০: চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনে সূর্যসেনের অন্যতম সহযোগী। সহসম্পাদক – কংগ্রেসের চট্টগ্রাম জেলা কমিটি।
১৯৩৩: অস্ত্রাগ্রার লুণ্ঠন মামলায় গ্রেফতার ও কারাবরণ।
১৯৩৪: প্রথম শ্রেণীতে উচ্চমাধ্যমিক (আই.এ) পাশ করেন – ব্রিটিশ রাজের ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকাবস্থায়
১৯৩৬: প্রথম শ্রেণীতে ডিসটিংশনসহ স্নাতক (বি.এ) পাশ করেন – ব্রিটিশ রাজের ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকাবস্থায়
১৯৩৯: ইংরেজিতে এম.এ পাশ করেন এবং দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে কর্মজীবনের শুরু
১৯৪০: চট্টগ্রাম কোর্টের আইনজীবি হিসেবে অনুশীলন শুরু করলেও শিক্ষকতাই ছিলো তার পেশা।
১৯৪০-১৯৪৬: বঙ্গীয় প্রাদেশিক নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং ১৯৪৬ সালে কংগ্রেসের চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক
১৯৪০: চট্টগ্রাম কোর্টের আইনজীবি কিরণ দাশের মেয়ে বিভা দাসকে বিয়ে করেন
১৯৫৪: পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের এমএলএ (১৯৫৪ পর্যন্ত)
২০১০: শততম জন্মদিনে তার জীবনীগ্রন্থ “অগ্নিঝড়া দিনগুলো” প্রকাশিত হয়।
২০১১: স্বাধীনতা পদক (সাল নিয়ে সন্দেহ আছে)
২০১৩: মৃত্যু (১০ এপ্রিল), কলকাতা ফর্টিস হাসপাতাল

সূত্র: দ্য ডেইলি স্টারসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম।

লস্ট এন্ড ফাউন্ড ক্ষুদ্রঋণ প্রবক্তা

তিনি এপ্রজন্মের আইকন, তার প্রমাণ পাওয়া গেলো যখন তারই গড়া প্রতিষ্ঠান থেকে অনেকটা আনসেরেমনিয়াসলি তাকে বের করে দেওয়া হলো। নিরপেক্ষ এবং নিঃশর্ত প্রতিবাদে তখন ফেটে পড়েছিলো দেশের তরুণ প্রজন্ম, যাদের লেজুড়বৃত্তি করার কোন প্রয়োজনই নেই। বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের বিশিষ্ট এ নাগরিকের নীরবতা সেই তরুণদেরকেই আঘাত করেছে। নীরবতা যে কত নিষ্ঠুর হতে পারে, এখন বুঝিয়ে বলা সহজ হলো!

আজ যোদ্ধাপরাধের বিচার ও জামাতের অপরাজনীতির প্রতিরোধে যখন দেশের তরুণ সম্প্রদায় একটি নজিরবিহীন জনসমর্থনের সৃষ্টি করেছে; দেশের মানুষের একাত্মতাকে যখন মুক্তিযুদ্ধের সাথে তুলনার প্রয়াস পেয়েছে; যখন দেশের আবালবৃদ্ধবনিতা আবারও ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে জাতীয় অস্তিত্বের সন্ধান পেয়েছে এবং যখন দেশের সকলেই আন্দোলিত হচ্ছে এদিক ওদিক – তখন একজন ব্যক্তিকে কোনদিকেই না পেয়ে সকলেই বিস্মিত। গত দু’মাসের উত্তাল গণজাগরণের দিনগুলোতে প্রায় সকল শ্রেণীর সকল পেশার মানুষকে উপস্থিত হয়ে একাত্মতা জানাতে দেখা গেছে। কেউ কেউ রাজনৈতিক কারণে বিরোধীতা করলেও প্রজন্ম চত্বরের আন্দোলনকে উপেক্ষা করতে পারে নি এর প্রধান প্রতিপক্ষও। হয় পক্ষে না হয় সুস্পষ্ট বিপক্ষে।

কিন্তু ক্ষুদ্রঋণে বৃহৎ খ্যাতি-পাওয়া জাতির কৃতী সন্তান আজ পর্যন্ত একটি শব্দও ব্যয় করেন নি। তাতে দেশের তরুণ সম্প্রদায় বিস্মিত ও আহত হয়েছে। এমন নয় যে, তিনি কথা কম বলেন বা রাজনৈতিক বক্তব্য এড়িয়ে চলেন। ২০০৭ সালের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি যখন অযাচিতভাবে দেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন তিনি তাৎক্ষণিক সমর্থন প্রকাশ করতে কুণ্ঠা করেন নি।

মহামান্য রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে সকল শ্রেণীর মানুষের শোক আমাদেরকে জাতি হিসেবে একত্রিত হবার সুযোগ করে দিলো। সরকার ও বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দকে কিছু সময়ের জন্য হলেও একত্রিত হতে দেখা গেলো সেদিন। অল্পতেই খুশি দেশের হতভাগা জনগণ তবু স্বস্তিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে। সকল স্বস্তিকে ছাড়িয়ে গেছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ও বিশ্বমানের সনদপ্রাপ্ত একজন ব্যক্তির আবির্ভাবে। শোকবার্তায় তার নামটি দেখে অনেকেই বিষ্মিত হয়েছেন।

ইন্টারনেটে প্রাপ্ত বিভিন্ন সূত্রমতে, তিনি এযাবত ৬৮টি দেশি-বিদেশি পুরস্কার, ১৫ টি সম্মাননা এবং বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২৮টি সম্মানসূচক ডিগ্রি পেয়েছেন। তিনি কী পুরস্কার পান নি, সেটিই এখন অনুসন্ধানের বিষয়। কিন্তু হতাশার বিষয় হলো, দেশের দুর্যোগে দেশের এ কৃতি সন্তান প্রায় লাপাত্তা। ভালো যে, একটি মৃত্যু উপলক্ষে দূর পশ্চিমের কোন দেশ থেকে তার আওয়াজ পাওয়া গেলো। তিনি ভালো থাকুন তার পরাক্রমশালী বন্ধু আর বিশ্বব্যাপী সুনাম নিয়ে।

.

*প্রথম আলো ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া

.

[২৭ মার্চ ২০১৩ তারিখে প্রিয় ডট কমে প্রকাশিত]

Capture240313

বিদেহী আত্মা ও দেহযুক্ত আত্মা সম্বন্ধে

210313

দেশের কৃতী রাজনীবিদ ও মহামান্য রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতের প্রধান বিরোধীদলীয় নেতার মন্তব্যে মন ছুঁয়ে গেলো। হরতাল প্রত্যাহার এবং সফর সূচি পরিবর্তনসহ বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন তিনি। বিষয়টি যথাযথভাবে প্রচার না করায় রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যমকে তিনি সমালোচনা করেছেন। খালেদা জিয়া শোকবার্তায় বলেন, “এই মৃত্যুতে বাংলাদেশ এক অভিজ্ঞ, মননশীল ও সুবিবেচক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে হারাল। “রুচি ও প্রজ্ঞার প্রকট অভাবের এই সময়ে তার মৃত্যু যে শূন্যতা সৃষ্টি করল, তা সহজে পূরণ হবার নয়।” আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের নেতা জিল্লুর রহমানকে মিতবাক, ভদ্র, নম্র একজন ভালো মানুষ উল্লেখ করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, “রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সম্পর্কে তিনি কখনো আক্রমণাত্মক ও অশালীন মন্তব্য করতেন না।” সর্বশেষ খবর হলো, মরহুম রাষ্ট্রপতির বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তিনি গণভবনে যাচ্ছেন।

প্রবীণ রাজনীতিবিদ আব্দুল জলিলের মৃতুতেও বিরোধীদল থেকে উষ্ণ সহানুভূতি প্রকাশ করা হয়েছে, যা আমার কাছে অনেক স্বস্তিদায়ক একটি বিষয় বলে মনে হয়েছে। মরহুম আব্দুল জলিলের সফলতা ও অর্জনকে বস্তুনিষ্ঠভাবে উপস্থাপন করে প্রশংসা জানানো হয়েছে। একই উষ্ণতা পরিলক্ষিত হয়েছে জৈষ্ঠ রাজনীতিবিদ আব্দুর রাজ্জাকের মৃত্যুতে। অনেক স্বাভাবিক হলেও, এবিষয়গুলো আমাকে চমৎকৃত করে।

বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো যেভাবে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে, তাতে আমজনতার মন এতোটা শংকিত হয় যে, মনে হয় তারা কখনও একে অন্যকে গ্রহণ করবেন না। কিন্তু, বিদেহী আত্মার প্রতি নেতিবাচক হতে আমরা এখনও শিখি নি। এতটুকু হৃদ্যতা এখনও অবশিষ্ট আছে আমাদের মানসিকতায়। অনেক অভিযোগ থাকলেও কোন মরহুম ব্যক্তিত্বের প্রতি আমরা সাধারণত নির্দয় হই না।

কৃতী রাজনীতিবিদ আব্দুল রাজ্জাক, আব্দুল জলিল এবং সর্বশেষে মহামান্য রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর সকল মতের রাজনীতিবিদদের সহানুভূতিশীল ও শোকার্ত মনোভাব দেখে সত্যিই আহ্লাদিত হলাম। সকলের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলতে চাই, আমাদের সমাজ হয়তো আরেকটু শান্তিপূর্ণ স্থান হতো যদি রাজনৈতিক নেতারা জীবিত নেতাদের প্রতি আরেকটু সৌহার্দ্য দেখাতেন যা তারা ‘বিদেহী আত্মার’ প্রতি দেখিয়ে থাকেন।

*ছবি ও অধিকাংশ তথ্য বিডিনিউজ.২৪ থেকে। দেখুন প্রথম আলো ব্লগে

বুদ্ধিমানের জন্য ইশারাই যথেষ্ট!

সবাই ছ্যাঁ ছ্যাঁ করছেন, কিন্তু এরকম উভয় সংকটে পড়লে সকলেই তা করতো। আর ওটাকে তো উভয় সংকট বলা চলে না, জলে কুমির ডাঙায় বাঘের মতো। ‘শ্যাম রাখি নাকি কুল রাখি’ অবস্থা। দূর থেকে সমালোচনা করা সহজ, কিন্তু অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে সকলেই বুঝতে পারেন। পলিটিক্স-এর মারপেঁচ রাজনীতিবিদেরাই বুঝেন। ওটা আমজনতার কাজ নয়।

আমিও প্রথমে বুঝতে পারি নি। ‘গণহত্যা’ ‘নাস্তিক’ ‘নষ্ট ছেলেমেয়ে’ ইত্যাদি মন্তব্যে বিস্মিত হয়েছি, হতাশও হয়েছি। পরে সবকিছু খোলাসা হয়ে গেলো। বুঝতে পারলাম রাজনীতির ওপরে আর কিছুই নেই। আগে চাই ক্ষমতা, তারপর দেশ ও জনগণের স্বার্থ।

নির্বাচন এগিয়ে এসেছে। এখন দরকার দলকে সংগঠিত করার, দরকার আন্দোলনের। এতোদিন তো কত চেষ্টাই হল, কর্মব্যস্ত জনতাকে আটকানো গেলো না। এতো বড় বড় দুর্নীতির ঘটনায়ও সরকারকে বেকায়দায় ফেলানো গেলো না! এবার যেহেতু ধর্ম নিয়ে জামায়াতিরা ইতিমধ্যেই একটি আলো-আধারি অবস্থা সৃষ্টি করতে পেরেছে, এখনই সুযোগ সরকারকে ঘায়েল করার। এমন পরিস্থিতিতে কি বন্ধুকে শত্রু করা চলে? ওই শাহবাগীরা যতই সংগঠিত হোক, ওরা কি বিএনপি’কে সাদরে গ্রহণ করবে? পুরাতন বন্ধু জামায়াতের চেয়ে কি প্রজন্ম চত্বরের ওরা বেশি কাজে আসবে? কখনও না।

তাছাড়া ওই গণজাগরণের আন্দোলন যদি সফল হয়, তার ফল কি বিএনপি’র ঘরে আসবে? কোন নিশ্চয়তা আছে? নেই, কারণ তারা তো বহু আগেই এ বিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। অতএব, যা করতে হবে তা পূর্ণ শক্তি দিয়েই করতে হবে। শাহবাগীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে, অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে। দ্বিধাদন্দ্বে অনেক কেটেছে দিন। আর নয়।

‘ব্লগাররা নাস্তিক’ বলে একটি ব্যাপক প্রোপাগান্ডা তো আগে থেকেই আছে। ওটাকে মিথ্যা প্রমাণ দায় কি বিএনপি’র? যেটা প্রচলিত থাকলেই রাজনৈতিক ফায়দা আসে, সেটাকে মুছে ফেলার কী দরকার আছে? বরং রাজনৈতিক রঙ লাগিয়ে ওটাকে যত বলা যায়, ততই মঙ্গল। পুনরাবৃত্তি হতে হতে মিথ্যা হয়ে যাবে সত্য। তাতে সুফল আসবে ঘরে। চেতনার গোষ্ঠী কিলাই!

তাতে গণমাধ্যম যা বলে বলুক, সুশীল সমাজ গোল্লায় যাক – ওরা কোন দিন বিএনপিকে সমর্থন দেয় নি, দেবেও না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা? ওটা একটা সেকেলে ব্যাপার! চেতনার ডাকে মানুষকে আহ্বান করতে তারা অভ্যস্ত নন – যতটা সিদ্ধহস্ত ধর্মের ব্যবহারে। তাই, যাতে দক্ষতা আছে আর যার মধ্য দিয়ে এগিয়ে এসেছে এতোটা পথ, সেপথেই কি এগিয়ে যাওয়া মঙ্গল নয়? বুদ্ধিমানের জন্য ইশারাই যথেষ্ট।

 

প্রথম আলো ব্লগে প্রকাশ

চিন্তা-চেতনা নিজ দায়িত্বে রাখুন!

নিজের চিন্তা অন্যের ওপর চাপানোর ফল ভালো হয় না

নিজের চিন্তা অন্যের ওপর চাপানোর ফল ভালো হয় না

১. সময়টা একটু কঠিনই হয়ে এসেছে। ‘মালামাল নিজ দায়িত্বে রাখুন’ বলার চেয়ে ‘যার যার চিন্তাচেতনা নিজ দায়িত্বে রাখুন’ বলাই এখন যুক্তিযুক্ত। নিজের চিন্তা অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার জন্যই যত সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। পরিবার ও সমাজ থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত এ চর্চা চলছে। সন্তানের দক্ষতা ও ঝোঁক বিবেচনায় না এনে মা-বাবারা এনজিনিয়ার হবার চাপ দিচ্ছেন। অন্যদিকে জনগণের সমস্যা ও তাদের চাওয়া-পাওয়াকে চিন্তা না করেই রাজনীতিবিদেরা নিজ নিজ দলীয় লক্ষ্যমাত্রাকে জনগণের বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে আমজনতার কী অবস্থা হতে পারে সহজেই ঠাওর করা যায়। তথাকথিত উন্নয়নসহযোগীরাও একই কায়দায় আমাদের ওপর চড়াও হয়েছে।

উন্নত দেশের এক উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ এলেন এদেশের কিষাণ জীবনের উন্নয়ন নিয়ে একটি গবেষণা করার জন্য। ধরুন, তিনি এলেন আম্রিকা থেকে! বুঝতেই পারছেন, উন্নয়নের বুদ্ধিতে তাদের মাথা ঠাসাঠাসি করে! গ্রামবাংলার ফসলের মাঠে গিয়ে প্রথমেই দেখলেন, এক কিষাণ গাছের নিচে ঘুমাচ্ছেন! আহা, এরকম অলস বলেই তো এদেশের উন্নয়ন হচ্ছে না – তিনি ভাবলেন। ডেকে তুলে কিষাণকে নাক-সোজা জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি ঘুমাচ্ছেন, তাহলে পরিবারের উন্নয়ন কীভাবে হবে?”

কৃষক বাবাজি তো আকাশ থেকে পড়লেন। এমনিতেই দুপুরের ঘুম, তার ওপর আবার ক্ষেতের আঁলে বিদেশি মানুষ। বিদেশি তো বিদেশি – আম্রিকান বিদেশি। আধাঘুমে তিনি উত্তর দিলেন, “উন্নয়ন কী?” এরকম প্রশ্নে আম্রিকান গবেষক আকাশে তারা দেখার কথা, যদি তার বস ওই প্রশ্ন করতেন। কিন্তু এটি তো গরিবের রাজ্য বাংলাদেশ। তাই, বিন্দুমাত্র বিব্রত বা আক্রান্ত না হয়ে, বুদ্ধিতে মাথা-ঠাসা বিশেষজ্ঞের মতো তিনি বললেন, “উন্নয়ন মানে হলো আপনার অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, যাতে বুঝা যাবে আপনি সুখে আছেন – আরামে আছেন।”

এতক্ষণে কিষাণ বাবাজির ঘুম নিশ্চিত ভেঙ্গেছে। তিনি সম্পূর্ণ চোখ খোলে প্রথমে দেখে নিলেন সেই আম্রিকান উন্নয়ন বিশেষজ্ঞকে। তারপর বললেন, “আমার ঘুম দেখে কি আপনি বুঝতে পারেন নি যে, আমি সুখে ছিলাম – আরামে ছিলাম?” বলা বাহুল্য, আম্রিকান ভদ্রলোক তার দোভাষির সাহায্য ছাড়াই কিষাণের কথাগুলো বুঝে ফেলেছিলেন। তাই, দোভাষিকে ইশারা করে তিনি ফিরে গেলেন অন্য গন্তব্যে। নিজেদের চিন্তাচেতনা অন্যের ওপর চাপালে যে কী হয়, ওটা হলো একটি ছোট দৃষ্টান্ত।

এই ধরুন গণজাগরণের কথাই বলি। তরুণেরা নিজ নিজ চেতনা আর স্বদেশ প্রেম দ্বারা উজ্জীবিত হয়ে এক অভাবনীয় বিপ্লবের সূচনা করলেন। আমাদের মুরুব্বি সম্প্রদায় সকলেই একবার করে চেষ্টা করলেন নিজ নিজ চিন্তা চাপিয়ে দেবার। সরকারি দলের কর্তারা প্রথম দিনই গিয়ে ‘যথানিয়মে’ নাস্তানুবুদ হয়ে ফিরলেন। তারপর বিরোধীদল গেলো এককভাবে। একজন সাবেক নগরপিতা গিয়ে নিজ দলের এজেন্ডা উপস্থাপন করে আসলেন। দলীয়ভাবে চেষ্টা করা হলো, যেন বিরোধীদলের দাবীও তরুণেরা তাদের দাবিনামায় যুক্ত করেন। তরুণেরা তো কারও কথা শুনার পাত্র নন, কারণ তারা বিয়াল্লিশ বছরে অনেক কথা শুনেছেন।

তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুতপ্রসারে পৃথিবীজুড়ে চলছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের রেনেসাঁ। সমগ্র পৃথিবী আজ একটি খোলা বই। সকলেই তা পড়তে পারে, জানতে পারে, যাচাই করে দেখতে পারে। ধর্মতত্ব থেকে শুরু করে সৃষ্টিতত্ত্ব, সমাজনীতি থেকে সমরনীতি, অর্থনীতি থেকে রাজনীতি পর্যন্ত – কী নেই! যদিও মানুষ সকল বিষয়েই জ্ঞানী হতে পারে না, কিন্তু নিজ নিজ বিষয়ে ‘প্রয়োজনীয় জ্ঞান’ তারা অর্জন করে নিচ্ছে। জ্ঞানের প্রয়োজন আপেক্ষিক – বুদ্ধিজীবীরা যতই অস্থির হোন – এটি সবার জন্য এক নয়। আমার এক বন্ধুর মা-বাবা সারাটি জীবন শেষ করে দিয়েছেন নিজ গ্রামের ভিটাতে – থানা শহরেও আসতে হয় নি তাদের। তাদের জীবনের জন্য জ্ঞান ততটুকুই দরকার ছিলো। তাই জ্ঞান বিতরণের কাজটিও সাবধানে করা উচিত। কে জানে আমাদের অজান্তেই হয়তো অপ্রত্যাশিত জ্ঞান কেউ অর্জন করে নিয়েছে!

 

২. পাগলের দেশে সুস্থ মানুষই পাগল শিরোমণি। গল্পটি সকলেই জানেন তবু বলছি। দেশের প্রধানমন্ত্রী গেলেন পাগলা-গারদ পরিদর্শন করতে। তিনি প্রত্যেকটি মানসিক রোগীর সাথে কথা বলছেন এবং তাদের চিকিৎসার খোঁজ নিচ্ছেন হাসপাতালের পরিচালকের কাছ থেকে। পাগলদের কৌতূহলের শেষ নেই: “এতো ভাব নিয়ে কথা বলছে, ওই লোকটি কে!” তাদের মনে প্রশ্ন। একজন তো জিজ্ঞেসই করে ফেললেন, “আমনে কেডা?” প্রধানমন্ত্রী হেসে বললেন, “আমি আপনাদের প্রধানমন্ত্রী।” বিন্দুমাত্র দেরি না করে, হাত বাড়িয়ে দিয়ে পাগলটি বললো, “আমিও প্রধানমন্ত্রী। লন হাত মিলাই!”

কীভাবে বুঝবেন যে, আপনি পাগল? (পাগল) বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রতি চারজনের একজন নাকি ‘খানিকটা পাগল’।

এবার ধরুন, আপনার বন্ধুদের মধ্যে তিন জনই বেশ সুস্থ, অর্থাৎ পাগল বলা যায় না। তাহলে হয়তো আপনিই সে ব্যক্তি! এটি একটি সহজ পদ্ধতি – ভুল কিছু থাকলেও ফেলে দেওয়া যায় না।

এবিষয়ে আরেকটি পাগলের কৌতুক দিয়েই শেষ করছি লেখাটি। পশ্চিমা দেশের এক পাগলা-গারদে এক ভদ্রলোক গেলেন দেখার জন্য। তার উদ্দেশ্য হলো, মানসিক রোগী সনাক্ত করার পদ্ধতি সম্পর্কে জানা।

হাসপাতালের পরিচালককে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তো, কীভাবে আপনারা নিশ্চিত হোন যে, অসুস্থ ব্যক্তিটি সত্যিই পাগল এবং তাকে ভর্তি করানো উচিত?”

মানসিক হাসপাতালের পরিচালক বললেন, “সাধারণত, আমরা একটি বাথটাবে পানি ভরে এর পাশে একটি চামচ, একটি মগ ও একটি বালতি রেখে দিই। দেখি সে কোন পদ্ধতিটি বেছে নেয়, বাথটাবটি খালি করার জন্য।”

“সুস্থরা হয়তো বালতিটিকে বেছে নেবে, কারণ বালতিই সবচেয়ে বড় এবং সুবিধাজনক।” ভদ্রলোকটি বিজ্ঞের মতো মতামত দিলেন।

“না, সেটা ঠিক নয়। সুস্থ ব্যক্তিটি টাবের নিচে পানি খালি করার সু্ইচটি খুলে দেবে।” হাসপাতালের পরিচালক তখন পেশাদারি দৃষ্টিতে অথিতির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তো আপনার বিছানাটি কি আপনি জানালার দিকে রাখতে চান?”

এবার বুঝুন, চিন্তাচেতনা সাবধানে প্রকাশ না করলে কী ফল হয়। শ্রোতার ধারণ-ক্ষমতা ও জ্ঞানের পরিধি না বুঝে কথা বললে উপরোক্ত পরিণতি ডেকে আনবে।  তাই বলছিলাম, নিজ নিজ চিন্তাচেতনা নিজ দায়িত্বে রাখাটাই এখন বুদ্ধিমানের কাজ!

 

ছবির জন্য কৃতজ্ঞতা: themeanings.com