Category: কর্মজীবন

প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক: কেন এবং কীভাবে?

project-manager

একটি প্রজেক্টের ম্যানেজার হতে পারা অপরিমেয় অভিজ্ঞতা প্রাপ্তির সুযোগ এনে দেয়। একটি প্রজেক্ট যেন একটি স্বপ্নের মতো; সঠিকভাবে শেষ হলে স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুখ পাওয়া যায়। কিন্তু কিছু কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ছাড়া আমাদের কর্মসমাজে ‘প্রজেক্ট’ এবং ‘ম্যানেজার’ ধারণাগুলো সুষ্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় না। অনেক প্রজেক্ট সৃষ্টি হয়, কেবল মাঝপথে থেমে যাবার জন্য। অনেক প্রজেক্ট শুরুই হয় না। অনেক প্রজেক্ট শুরু হয়, কিন্তু শেষ হয় না। অনেক প্রজেক্ট শেষ হয়, তবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।  কিছু প্রজেক্ট সফলভাবেই শেষ হয়, তবে যে গন্তব্যকে লক্ষ্য করে সেগুলোর সূচনা, তা শেষ পর্যন্ত ঠিক থাকে না।  কিছু প্রজেক্ট সফলভাবে শেষ হয়ে ‘সঠিক গন্তব্যেই’ পৌঁছায়, কিন্তু খরচ ও সময়মাত্রা বেড়ে যায় অসহনীয়ভাবে ।

বেসরকারি সংস্থায় অনেক প্রজেক্ট প্রপোজাল হয় এবং তাতে কিছু প্রকল্পে দাতাগোষ্ঠি অনুমোদন দিয়ে অর্থযোগান দেন। এসব প্রকল্প যেভাবেই শেষ হোক, দেশের নিপীড়িত জনগোষ্ঠির কিছু উন্নয়ন হয়। এসব উন্নয়ন সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক এবং সুদূরপ্রসারী। কিন্তু পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে পেশাদারিত্বের অভাবে উদ্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জিত হয় না, অথবা কিছু ক্ষেত্রে হলেও তা প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয় না। সেখানে পেশাদারিত্ব একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দেয়।

 

পেশাদারিত্ব কার বেশি দরকার, দাতার নাকি বাস্তবায়নকারী সংস্থার?  এটি স্তর বিশেষে ভিন্ন হয়। যারা প্রকল্পের পরিকল্পনা করেন, এবং যারা বাস্তবায়ন করেন, তাদের উভয় পক্ষেরই পেশাদারিত্ব থাকতে হয়। তবে সেটি আপেক্ষিক; বাস্তবায়নকারীর পেশাদারিত্ব আর অর্থদাতা প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্বকে একই মাত্রায় দেখা যায় না। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বা তৃতীয়পক্ষের দ্বারা প্রকল্প পরিকল্পনা করালে, যথাযথ সমন্বয় না থাকলে প্রকল্প বাস্তবায়কদের সাথে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।  তাতে সফলভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কমে যায়।

কর্পোরেট হোক বেসরকারি সংস্থা হোক, প্রকল্পকে ‘প্রকল্প’ হিসেবে গ্রহণ না করলে তাতে সফলতার আশা করা যায় না।  প্রকল্পের স্বভাবটি হলো এই যে, এটি নির্দিষ্ট সময়ান্তে শেষ হবে; এর উপকরণ ও পদ্ধতি হবে ফলাফল-কেন্দ্রিক।  প্রকল্পের কর্মীদের লক্ষ্য থাকবে একটিই: নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে প্রকল্পটি সঠিকভাবে শেষ করা এবং প্রতিবেদন করা।

আমাদের দেশে কিছু নির্মাণ প্রকল্পের দিকে দৃষ্টি দিলেই বুঝতে পারি, একটি প্রকল্পকে ‘প্রকল্প’ হিসেবে না নিলে কী বিপদ হতে পারে। দেশে ব্যক্তি ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ইমারত, বৃহৎ সেতু, ফ্লাইওভার ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা একটি বিশেষায়িত জ্ঞান। একজন আমজনতার দৃষ্টিতেও যদি তাকাই, তবে অনেক সীমাবদ্ধতা ও অনিয়মের চিত্র আমাদের সামনে ফুটে ওঠে।

 

দাতাগোষ্ঠিকে প্রকল্পের স্বপ্ন দেখিয়ে অনেক অনুদান আসে বাংলাদেশে। লক্ষ্য থাকে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠিকে নির্দিষ্ট সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উন্নয়ন দেখাবার। দাতা অথবা বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্বের অভাবেই হোক, অথবা অসততার কারণেই হোক, সব প্রকল্প ‘ফলাফলমুখী প্রচেষ্টা’ দেখাতে পারে না, যতটা তাদের প্রতিবেদনে দেখা যায়।

এদেশে প্রকল্প অথবা ফলাফলমুখী উদ্যোগ বা উদ্যোক্তার যে কত অভাব, তা একটি সহজ পর্যবেক্ষণ (hypothetical observation) থেকে বুঝতে পারা যায়। তা হলো, দেশীয় প্রতিষ্ঠানে বিদেশী সিইও’র উপস্থিতি। এদেশেরই প্রতিষ্ঠান এদেশেরই মূলধন, ভোক্তাও এদেশেরই; কিন্তু প্রধান নির্বাহী আসেন সুদূর পশ্চিম দেশ থেকে; অথবা প্রতিবেশি কোন দেশ থেকে। সুনির্দিষ্ট দৃ্ষ্টান্ত এবং গবেষণা দিয়ে এটি প্রমাণ করা যায়, কিন্তু আপাত দৃষ্টিতে বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য।

 

দেশের প্রাতিষ্ঠানিক আচার-আচরণ এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক অবস্থান যদি ‘পাখির চোখেও’ একবার  দেখি, তবে চলমান স্থবিরতা (creeping pace) এবং অবহেলার চিত্রটি চোখে পড়ে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকে বিশেষায়িত জ্ঞান বা দক্ষতা হিসেবে দেখা হচ্ছে না এখনও। সরকারি প্রকল্পগুলোতে পদাধিকার বলে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে এরকম বালখিল্যতার কারণেই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের মুখ দেখে না। একবছরের প্রকল্প শেষ হয় চতুর্থ বছরে; নষ্ট হয় সময়; অপচয় হয় জনগণের টাকা; প্রলম্বিত হয় জনদুর্ভোগ।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও এর ব্যতিক্রম নেই, যিনি প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ব্যক্তি, তিনিই প্রকল্পেরও অধিকর্তা। যিনি প্রকল্পের মৌলিক বিষয়গুলোই জানেন না, তাকে দেওয়া হয় ‘কর্মসূচি’ পরিচালনার দায়িত্ব। এখানে কর্মসূচিকে ‘প্রকল্প’ বলা হয়, প্রকল্পের তো কোন চিহ্নই থাকে না।  বছরের পর বছর চলে যায়, প্রকল্প শেষ হয় না। কারণ খুঁজলে দেখা যায়, সেখানে ‘শেষ’ বলে কোন বিষয় আদতেই ছিলো না। এতে প্রকৃতপক্ষে কাদের উন্নয়ন হয় আর কাদের ক্ষতি হয়, বুঝতে পারার জন্য গবেষণা করতে হয়।  প্রকল্পের ‘স্বাভাবিক পরণতি’ হিসেবে সুফল আসে না, সুফল দেখতে গবেষণার অপেক্ষা করতে হয়।

 

প্রকল্পকে বাস্তবায়নের পথে নিয়ে যাবার পরিক্রমায় কিছু অনন্য অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়।  একে শুধু ‘অভিজ্ঞতা’ বললে কমই বলা হয়। এই অভিজ্ঞতা এতই অমূল্য যে, এটি শিক্ষা, প্রশিক্ষণ অথবা শুধুই অর্থের বিনিময়ে পাওয়া যায় না।  অনেক সময়, অধ্যবসায় এবং লক্ষ্যভিত্তিক প্রচেষ্টার পরিণতিতে আসে ‘প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা’।

কর্মজীবনের শুরুতে কয়েকটি ক্ষুদ্রাকৃতির প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ হয়েছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করার সময়ে, কয়েকটি ফলমুখী কর্মসূচি (result-focused program) বাস্তবায়ন করার অভিজ্ঞতা হয়েছে।  ২০০৪ থেকে ২০১১ পর্যন্ত, আট বছরে নিয়মিত কাজের পাশাপাশি, পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত তিনটি এসাইনমেন্টকে ‘প্রকল্প’ হিসেবে বাস্তবায়ন করার সুযোগ নিয়েছিলাম। এসবের পাশাপাশি, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা (project management) সংক্রান্ত কিছু সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছিলো। প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং প্রাসঙ্গিক প্রশিক্ষণের এই দীর্ঘ পরিক্রমায় কিছু উপলব্ধি সৃষ্টি হয়েছে, যা উপরোক্ত শিরোনামে তুলে ধরতে চাই, যেন দেশের অভিজ্ঞ প্রকল্প ব্যবস্থাপকদের মতামত পাওয়া যায়। তাতে যদি প্রকল্প ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে চলমান স্থীতাবস্থা থেকে এগিয়ে যাবার পথ সৃষ্টি হয়, সেটি হবে পরম আনন্দের বিষয়।

 

 

Capture

 

▶ প্রকল্প ব্যবস্থাপক থেকে ‘স্বপ্ন ব্যবস্থাপক’

উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে একযুগেরও বেশি সময় ধরে কাজ করতে গিয়ে শিখেছি যে, একটি প্রকল্প শুধু একটি স্বপ্ন নয়; স্বপ্নের চেয়ে একটু সহজ। কারণ, ভালোভাবে চিন্তা করতে পারলে এবং পরিকল্পনাগুলো সুর্নিদিষ্ট করতে পারলে, বাস্তবায়নের সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ। প্রকল্প এবং জীবনের পরিকল্পনা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা এবং এসংক্রান্ত একাডেমিক জ্ঞান ঝালাই করছি কিছুদিন যাবত। সহজভাবে একটু একটু করে লেখে যাবো সপ্তাহান্তে। শপথ নিয়েছি, বেশি চাপ নেবো না মাথায়, তাহলে শুরুই করা যাবে না। প্রকল্প নিয়ে লেখালেখিকেও ‘আরেকটি প্রকল্প’ হিসেবে নিয়েছি, কারণ ৫৫০জন (ফেইসবুকের ২৫০ এবং ওয়ার্ডপ্রেসের ৩০০) পাঠকের প্রতি আরও বেশি গুরুত্ব দিতে চাই।

  • শুরু: শনিবার ৩ সেপটেম্বর থেকে, শনিবার বিকাল ৩টায়
  • লেখার স্টাইল: যেভাবে মাথায় আসছে, সেভাবেই ব্লগে তুলে দিচ্ছি
  • লেখার মান: বিষয় এবং ভাষার প্রাঞ্জলতার প্রতিই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি
  • ভাষা: ইংরেজি এবং পারিভাষিক শব্দ যথাসম্ভব এড়িয়ে চলছি

 

আমাদের ব্যক্তিগত জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোকে মাইক্রো-প্রজেক্ট হিসেবে দেখতে পারি। তাতে কঠিন কাজগুলোতে আরও নির্দিষ্টভাবে মনোনিবেশ করা যায়।  ‘প্রকল্পের ধারণা’ কীভাবে প্রাত্যাহিক জীবনেও আমাদের প্রচেষ্টাকে ফলমুখী করে তোলে, সেটি পরবর্তি পোস্টে তুলে ধরবো। পাঠককে পরবর্তি পোস্টগুলো অনুসরণ করার অনুরোধ জানিয়ে প্রথম পর্বটি শেষ করছি।  (২৫ অগাস্ট ২০১৬)

 

 


পরবর্তী পর্ব

কর্মস্থলে অপ্রত্যাশিত প্রতিবন্ধকতা ও গঠনমূলক সমালোচনা

 

কয়েক বছর আগে আমার এক বন্ধু তার কোম্পানির কিছু সিনিয়র কর্মকর্তার ব্যাপারে আমার কাছে অভিযোগ করছিলেন।  কোম্পানীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত থাকার পর তাদের পদগুলোতে নতুন লোক নেওয়া হয়েছে। “সবগুলো ছিল একেকটি অপদার্থ” আমার বন্ধুটি বলতে লাগলেন।  “এরা কেউই আমার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে নি।”

আমি জানতাম আমার এই বন্ধুটি একজন পারফেক্শনিস্ট, অর্থাৎ খুঁতখুঁতে – সবকিছুই নিখুঁতভাবে করার জন্য তিনি সবসময়ই চেষ্টা করেন। তার পদচ্যুত কর্মকর্তাদের অযোগ্যতার বিবরণ শুনার পর আমার মনে হলো, সেই কর্মকর্তাদের মধ্যে খুব সমস্যা নেই, বরং তাদেরকে যিনি নিয়োগ দিয়েছেন তার মধ্যেই সমস্যা।

আমার বন্ধুটি যখন তার সাবেক কর্মীদের সম্পর্কে তার নেতিবাচক মূল্যায়ন শেষ করলেন, আমি যথাসম্ভব বিচারকের ভূমিকায় না যাবার চেষ্টা করলাম। সরাসরি সমালোচনা না করে আমি বললাম, “কর্মীদের ব্যর্থতার পেছনে আমি শুধু একটি কারণই প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখতে পাচ্ছি।” আমি যে তাকেই ইশারা করছি, আমার বন্ধুটি তৎক্ষণাৎ তা বুঝে নিলেন। তিনি আমার মন্তব্যটি ইতিবাচকভাবেই নিলেন এবং কর্মীর প্রতি তার ব্যক্তিগত চাহিদাগুলো পুনর্বিবেচনা করলেন।  আমার এই মৃদু ভর্ৎসনার জন্য আমার এই বন্ধুটি একদিন আমাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন।

হয়ত সেদিন আমি চুপ করে থাকতে পারতাম। কোন কথা না বলে তার অভিযোগগুলো আমি শুধু শুনেই যেতে পারতাম।  কিন্তু আমি মনে করলাম সমস্যাটি একটি নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করার জন্য তাকে সাহায্য করা উচিত। যদিও কাউকে দুঃখ না দিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করা কঠিন, কিন্তু বন্ধু বন্ধুর কাছ থেকে আন্তরিক সমালোচনা পেতে পারে।

জ্ঞান সাধকেরা বলে থাকেন: যে লোক খোসামুদে কথা বলে তার চেয়ে যে সংশোধনের কথা বলে, সে শেষে বেশি সম্মান পায়।

এধরণের পরিস্থিতির আরেকটি দিক হলো, অন্য ব্যক্তিটি কীভাবে পরামর্শটি গ্রহণ করলো এবং কীভাবে তা কাজে প্রয়োগ করলো।  কর্মীদের অযোগ্যতাকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে আমার বন্ধুটি হয়ত মনে মনে আমার মতামতটি প্রত্যাখ্যান করতে পারতেন। হয়তো তিনি বিনয়ের সাথে আমার মন্তব্যটি গ্রহণ করে গোপনে সংশোধন হতে পারতেন। এবিষয়ে নিচে আরও কিছু দিক তুলে ধরা হলো।

সংশোধনের কথা গ্রহণের মনোভাব সফলতা নিয়ে আসে। একটি আন্তরিক সমালোচনা শৃঙ্খলার পূর্বশর্ত। কারণ সমালোচক তার সংশোধনমূলক কথা দিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে সহায়তা দিতে পারেন। তাতে সংশ্লিষ্ট সকলেই উপকৃত হন।  প্রবাদে বলা হয়েছে: যে শাসন মানে সে জীবনের পথে চলে, কিন্তু যে সংশোধনের কথা অগ্রাহ্য করে সে বিপথে যায়। প্রবাদে আরও আছে: যে লোক শাসন অগ্রাহ্য করে সে অভাবে পড়ে ও লজ্জা পায়, কিন্তু যে লোক সংশোধনের কথায় কান দেয় সে সম্মানিত হয়।

ইতিবাচক সমালোচনা গ্রহণ না করা বোকামী।  কর্মক্ষেত্রে প্রায়ই আমরা সমস্যার এত নিকটে অবস্থান করি যে সঠিক সমাধান খুঁজে পাই না। আস্থাভাজন বন্ধু বা সহকর্মীর চিন্তা থেকে এমন তথ্য বের হয়ে আসে যা সরাসরি উপেক্ষা বা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। “যে লোক শাসন ভালবাসে যে জ্ঞান ভালবাসে, কিন্তু যে লোক সংশোধনের কথা ঘৃণা করে সে পশুর সমান।” (প্রবাদ)।

একটি সময়োচিত বিরোধিতা ধ্বংসাত্মক পরিণতি থেকে রক্ষা করে। আপনি যদি অপরিচিত রাস্তায় চলে কোন বিপদের মুখে পড়েন, তখন আপনি এমন ব্যক্তির সহযোগিতা চাইবেন যিনি ওই রাস্তায় হেঁটেছেন। একই কাজ করবেন আপনি কোন বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নেবার পূর্বেও। “জ্ঞানী লোকের দেওয়া শিক্ষা জীবনের ঝর্ণার মত; তা মানুষকে মৃত্যুর ফাঁদ থেকে দূরে রাখে।” (প্রবাদ)।

 

আলোচনা এবং আত্মমূল্যায়নের জন্য কিছু বিষয়:

১)      সংশোধন বা সমালোচনার কথায় আপনি কীভাবে প্রতিক্রিয়া করেন? আপনি কি আত্মরক্ষামূলক আচরণ করেন? আপনি প্রত্যাখ্যানমূলক আচরণ করেন, নাকি গ্রহণমূলক মনোভাব দেখান? আপনার উত্তরের পক্ষে ব্যাখ্যা দিন।

২)       অন্য দিক দিয়ে বিবেচনা করলে, আপনি যখন দেখেন কেউ কোন ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেক্ষেত্রে তার বিরোধিতা করা কতটুকু সহজ বা কঠিন বলে আপনার মনে হয়? সম্ভব হলে দৃষ্টান্ত দিন।

৩)      প্রবাদের কথামতো তোষামোদকারী নয় অবশেষে সমালোচনাকারীই পুরস্কৃত হন। এবিষয়ে আপনার মতামত কী? আপনার মতামতের পক্ষে যুক্তি দিন।

৪)      প্রবাদের কোন্ কথাগুলো আপনার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য বলে মনে হয়?

 

(ফটো সংগৃহীত)

 

 


[মূল ধারণা: রিক বক্স – বিশ্বব্যাপী পেশাজীবীদের পথপ্রদর্শক।  লেখাটি পাঠক প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রকাশিত। ১০ সেপটেম্বর ২০১৪]

স্বশিক্ষিত ক্ষণজীবীরা: বলছিলাম সাউথ পোলারদের কথা…

স্বশিক্ষিত প্রতিভাবানরা

স্বশিক্ষিত প্রতিভাবানরা

 

মালয়েশিয়া নামের দেশটির অধিকাংশ মোবাইল গ্রাহকের তথ্য এখন হ্যাকারদের হাতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষকোটি টাকা হ্যাকারদের দখল থেকে মুক্ত করা যায় নি। অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনের টুইটার একাউন্ট হ্যাক হয়েছিল। রাশিয়ান হ্যাকাররা লক্ষ লক্ষ ইমেল একাউন্ট হ্যাক করেছে। বিশ্ববিখ্যাত হ্যাকারের নাম হলো জুলিয়ান অ্যাসান্জ, যিনি উইকিলক্স-এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশের কূটনৈতিক দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করছেন। পানামা পেপার এবং এবারে প্যারাডাইজ পেপারস এর মতো গোপন প্রতিবেদন দিয়ে ফাঁস করে দেওয়া হয়েছে কীভাবে তথাকথিত জনপ্রিয় ব্যক্তিরা দেশের কর ফাঁকি দিয়ে বিদেশে ব্যবসা করছেন।

“প্রিয় হ্যাকার, দয়া করে একটু কি বলবেন, কীভাবে আমাদের ব্যাংকের তথ্যগুলো চুরি করলেন?” কোন হ্যাকার কি খুব সহজেই এ প্রশ্নের উত্তর দেবে? অথচ এরকম প্রশ্নের উত্তর জানতে চায় এমন ব্যক্তি বা সংস্থার সংখ্যা এখন আর গোনা যায় না। কিন্তু কেমন হয় যদি হ্যাকারসহ ‘সমাধানটিকে’ কব্জা করা যায়? চাকুরির বাজারে পেশাদার হ্যাকারদের চাহিদাটি এমনই ‘বিশেষ’ যে, একে সাধারণ বলা যায় না। অথচ দেখা যাবে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডিও পেরোতে পারে নি অনেকে। বিল গেটসের কথাই মনে করে দেখুন: “গণিতে আমি খুবই কাঁচা ছিলাম কিন্তু বন্ধুটি ছিলো খুবই দক্ষ। বর্তমানে সে একটি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী আর আমি সেই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান।”

শুধু পাশ্চত্যে নয়, প্রাচ্যেও ‘অশিক্ষিত’ প্রকৌশলীদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। ‘অশিক্ষিত’ শব্দটি ব্যবহার করায় আমার আপত্তি আছে। শুধু সনাক্ত করার জন্য বললাম – আদতে তারা স্বশিক্ষিত এবং শৌখিন প্রকৌশলী।

“ধীরে ধীরে প্রচলিত শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় বা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়া গুগলকর্মীর সংখ্যা বাড়ছে। গুগলের কিছু কিছু টিমে ১৪ শতাংশ কর্মীর প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ডিগ্রি নেই।” এটি একটি পত্রিকার খবর । অবশ্য গুগল জানিয়েছে যে, প্রাতিষ্ঠানিক সনদপ্রাপ্ত কোন প্রার্থীর যদি কোডিং এবং গাণিতিক বিষয়ে দক্ষতা থাকে, তবে তারাও অগ্রাধিকার পাবে।

.

আরও কিছু দৃষ্টান্ত

ছোটবেলায় ভিডিও গেম খেলতে খেলতে যে ছেলে/মেয়েটি সময় এবং অর্থ অপচয় করে মা-বাবার যন্ত্রণার কারণ হয়েছে, সে ছেলে/মেয়েটি চৌদ্দ বছর না পেরোতেই চাকরি পেয়ে গেলো একটি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানে। উচ্চ বেতনে এবং ভিআইপি মর্যাদায়। ভিআইপি মর্যাদার একটি চিহ্ন হলো, যে কোন সময় যে কোন জায়গায় অফিস করতে পারবেন। বাসায় থাকলেও চলবে। শুধু অন্য কোন সমগোত্রীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ রাখা যাবে না। বিশ্বাস করা কঠিন হলেও একটি ‘প্রতিযোগিতা-প্রবণ’ ভিডিও গেম তৈরির প্রতিষ্ঠানে বিষয়টি অসম্ভব নয়।

প্রতিভা এবং অধ্যাবসায়ের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গুরুত্বহীন। বিখ্যাত অ্যাপেল কম্পিউটারের জনক স্টিভ জবসও ছোটবেলায় তেমনই এক শিশু ছিলেন। মার্ক জাকারবার্গ বা বিল গেট্স-এর বেলায়ও কথাটি ঠিক, কারণ তারা প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যা অর্জনের পূর্বেই নিজ নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠা পান।

.

স্বশিক্ষিত প্রতিভাবানরা, যারা কিছু দেশে ‘সাউথপোলার’ হিসেবে সমাদৃত

কারিগরি বিষয়ে সাউথ পোলারদের আধিপত্য বেশি হলেও সৃজনশীল সকল পেশায়ই তাদের আধিক্য আছে। লেখক উপন্যাসিক গল্পকার বা ব্লগার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, এমন অনেক ব্যক্তিই আমাদের সামনে আছেন, যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ভালোমত শুরু বা শেষ করতে পারেন নি।

‘যা পছন্দ তাতেই লেগে থাকার’ বিষয়টি আমাদের দেশের শিক্ষা পদ্ধতি বা সমাজ ব্যবস্থায় ততটা স্বীকৃতি পায় না। ক্রিকেটের অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান যখন খেলতে শুরু করেন, তখন তিনি মা-বাবার আনুকূল্য পান নি। দাদাজান বিনাচিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করার কারণে পিতার অখণ্ডনীয় নির্দেশ হলো ছেলে/মেয়েকে ডাক্তারই হতে হবে। খোঁজ নিয়ে দেখা যাবে, সে হয়তো সঙ্গীত বা ছবি আঁকাআঁকিতে ইতোমধ্যেই নিজ প্রতিষ্ঠানে খ্যাত অর্জন করেছে। ভারতীয় ‘থ্রি ইডিয়টস’ ছবিটির কাহিনী এরকম সমাজের কথাই বলে।

.

সাউথপোলারদের স্বভাব ও জীবনে সাধারণত যা থাকে:

*আগ্রহ: মাত্র দু’একটি বিষয়ে তাদের আগ্রহ থাকে কেন্দ্রীভূত;
*কৌতূহলী: বিষয়টিতে কৌতূহল নিবৃত্ত করতে চেষ্টা করে মরিয়া হয়ে;
*বেদনাহত/ বিষাদাক্রান্ত: জীবনে থাকে এক বা একাধিক না-পাওয়ার বেদনা;
*প্রচলিত অর্থে অক্ষম: শারীরিক/মানসিক অক্ষমতা থাকতে পারে;
*বঞ্চিত: থাকতে পারে সামাজিক উপেক্ষা/বঞ্চনার বেদনা;

*মেইভারিক: সাধারণত প্রচলিত দৃষ্টান্তের বিপক্ষে তাদের অবস্থান, একটু বাউণ্ডুলে – একটু বিপ্লবী;
*একমুখী/একগুঁয়ে: অন্য কোন বিষয়, তা যতই কামনার বিষয় হোক, তারা সেগুলো উপেক্ষা করতে পারে;
*প্রেরণায় চালিত: তারা প্রেরণার কাঙ্গাল এবং কারও চোখে স্বার্থপরও;
*দৃষ্টান্ত:  কাজী নজরুল ইসলাম, ম্যাক্সিম গোর্কি, বেন্জামিন ফ্রাংকলিন, লিওনার্দো দ্য ভিন্চি, আরনেস্ট হেমিংওয়ে
*ক্ষণজন্মা: প্রেরণার খাবার দিতে গিয়ে শরীরের চাহিদাকে উপেক্ষা করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বীকৃতি পাবার পূর্বেই মৃত্যু!

.

অতএব, সাউথপোলার কারা?

যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেয়েও নিজের প্রতিভা এবং মজ্জাগত মেধার সফল প্রয়োগ করে কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করেছে, পশ্চিমা বিশ্বের ‘অলিখিত ভাষায়’ তারা ‘সাউথ পোলার’ হিসেবে পরিচিত। আমাদের দেশে ‘স্বশিক্ষিত’ অভিধায় আংশিতভাবে তারা পরিচিত। ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে তাদের সরব উপস্থিতি আমরাও টের পাবো। কর্মক্ষেত্রে সফলতার মূল মন্ত্র হলো: ‘যা ভালোবাসো তা-ই করো এবং যা করো তা-ই ভালোবাসো।’ প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার বিষয়টি এক সময় এসে ফাইলবন্দি হয়ে যায়। শুধু দক্ষতা আর যোগ্যতার বিষয়টিই তখন মুখ্য হয়ে ওঠে। আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে চাইলে ‘ভেতরের শক্তিকে’ কাজে লাগাতে হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রাকৃতিকভাবে অর্জিত নিজের অমূল্য শক্তির প্রয়োগ ঘটাতে হবে।

.

কেন এই নামকরণ?

সাউথ পোল বা দক্ষিণ মেরু এমন একটি জায়গা যেখানে ক্যামেরার দৃষ্টি যায় না।  খুব বেশি আলোচনা নেই দক্ষিণ মেরু নিয়ে। সকলেই উত্তর মেরু নিয়ে মুখর হয়ে থাকে, কারণ এটি অনুসন্ধানীদের জন্য সহজ এবং প্রচলিত উপায়ে ভ্রমণ করা যায়।  কিন্তু দক্ষিণ মেরু একটি অনাবিষ্কৃত অঞ্চল। দক্ষিণ মেরুকে বুঝার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয়।আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা দিয়েই তথাকথিত মেধাবীদেরকে বের করে আনা যায়।  পরীক্ষার ফলাফল দিয়েই তাদেরকে নির্ধারণ করা হয়।  কিন্তু স্বশিক্ষিতদেরকে আবিষ্কার করতে হয় এবং তাতে চেষ্টা লাগে।  সমাজের প্রচলিত মাণদণ্ডে তারা অনেকাংশেই অনাবিষ্কৃত। তারা দক্ষিণমেরুর বাসিন্দা, তারা সাউথপোলার।
.

.

সাউথপোলারদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হওয়া উচিত?

পরিবার: পরিবারই মানুষের গড়ে ওঠার সূতিকাগার।  এখান থেকেই শিশু তার অভ্যাসগুলোকে বেছে নেয় এবং নিজেকে আবিষ্কার করে। মা-বাবার দায়িত্ব হবে, প্রথমত তাদের সন্তানের স্বাভাবিক প্রবণতাটি বুঝা।  যেহেতু সকলেই শিশুবিশেষজ্ঞ নন, তাদের উচিত হবে সন্তানের পছন্দ মতো তাদেরকে খেলতে এবং কিছু করতে দেওয়া।  গান, ছবি আঁকা, কিছু বানানো অথবা কিছু ভাঙ্গা… এসব বিষয় আপাত দৃষ্টিতে ক্ষতিকর হলেও সন্তানের ভবিষ্যতের এজন্য এসবের সুযোগ করে দিতে হবে।

প্রতিষ্ঠান:  প্রতিষ্ঠান অবশ্য এককভাবে কিছু করতে পারে না, যদি না দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সমর্থন না থাকে। তবু অনেক শিক্ষক প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র হয়ে অনেক শিশুকে জীবনের পথ দেখিয়েছে।  তারা শুধুমাত্র একটি কাজ করেছেন, তা হলো শিক্ষার্থীদের যেকোন সৃষ্টিকে স্বীকৃতি বা প্রেরণা দেওয়া।  শিক্ষকের প্রশংসা মানেই হলো সামনে যাবার পাথেয়।  কবি নজরুলকে তার শিক্ষকরাই আবিষ্কার করেছিলেন। তাই শিক্ষকদের উচিত হবে, শিক্ষার্থীদের নিজস্বতাকে সম্মান করা এবং একইভাবে সকলকে পড়ালেখার জন্য চাপ না দেওয়া।

সমাজ:  ইতিহাস বলে যে, সমাজ সবসময়ই প্রতিভাবানদেরকে দেরিতে চিনেছে। সমাজ একটি বৃহত্তর পরিসর।  একে নির্দেশ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। মা-বাবাই সমাজের নিকটতম প্রতিনিধি।  তারা যদি নিজেদেরর সন্তানকে চিনতে না পারেন, তবে সমাজের কাছে শিশুরা আরও বেশি অচেনা হয়ে যায়।  প্রথম দায়িত্ব হলো, মা-বাবার।  বন্ধু এবং প্রতিবেশীর সামনে সন্তানদেরকে তিরষ্কার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।  তাহলেই বন্ধুবান্ধব এবং প্রতিবেশীরা সেই শিশুকে ভালোমতো মূল্যায়ন করতে পারবে।

.

.

[সর্বশেষ সম্পাদনা, ১৩ নভেম্বর ২০১৭। একটি ফেইসবুক স্ট্যাটাস বিস্তৃত হয়ে এই লেখার উদ্ভব।  প্রথম প্রকাশ প্রথম আলো ব্লগ; তারপর সামহোয়্যারইন ব্লগ/ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ ]

.

.


টীকা: প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিতদের মধ্যেও ‘সাউথপোলার সিনড্রোম’ থাকা অসম্ভব নয়!

উৎসর্গ: পৃথিবীর তাবৎ সাউথপোলারদেরকে।
উৎস: পর্যবেক্ষণ এবং ব্যক্তিগত প্রেরণা।

৬৬তম জাতিসঙ্ঘ এনজিও সম্মেলন: অংশগ্রহণকারীর অভিজ্ঞতা

জাতিসঙ্ঘের ডিপার্টমেন্ট অভ্ পাবলিক ইনফরমেশন (UN DPI/NGO Conference) এর এনজিও বিষয়ক সম্মেলনটি প্রথমবারের মতো কোন এশিয়ান দেশে হলো। মূলত ৬৬টি সম্মেলনের ৬০টিই হয়েছে নিউইয়র্কে, ৫টি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে এবং ১টি সম্প্রতি হয়ে গেলো দক্ষিণ কোরিয়ার পর্যটন নগরি গিয়ংজুতে। গিয়ংজু সউল থেকে ৪/৫ ঘণ্টার দূরত্বে, দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে। কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন নিদর্শনে পূর্ণ। সম্মেলনের উদ্দেশ্য এবং আয়োজন সম্পর্কে ধারণা দেবার জন্য এই লেখা।

অফিসের বিগ বস যখন সেদিন আচমকা ডেকে নিয়ে বললেন, ‘আপনাকেই যেতে হবে, সব কাজ গুছিয়ে ফেলুন’ তখন আমি একই সাথে খুশি এবং চিন্তিত। চিন্তিত ছিলাম কারণ ডিপার্টমেন্টে নিয়মিত ব্যস্ততাটুকু কীভাবে কাটিয়ে ওঠবো ভাবছিলাম। অন্যদিকে খুশি ছিলাম, কারণ এটি কোন প্রাতিষ্ঠানিক সেমিনার নয়, জাতিসঙ্ঘের এনজিও বিষয়ক সম্মেলন। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, এনজিও প্রতিনিধি, সিভিল সোসাইটি প্রতিনিধি এবং শিক্ষাবিদরা একত্রিত হয় এই সম্মেলনে। জাতিসঙ্ঘের কোন সম্মেলনে যোগ দিতে পারা আমার জন্য বিশাল প্রাপ্তি। ফলে আমি হ্যাঁ অথবা না, কিছুই বলতে পারলাম না। বলার সুযোগও ছিল না।

 

‘মানসম্মত শিক্ষা’, সম্মেলনের মূল আলোচ্য বিষয়। বিশ্ব নাগরিকের জন্য মানসম্মত শিক্ষা। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিক্ষার বিস্তার ও পৃষ্ঠপোষকতায় বেসরকারি সংস্থার অবদান সুবিদিত। তাই জাতিসঙ্ঘ চায়, এমডিজি পর্যায়ে যেমনভাবে এনজিওগুলো সহায়তা দিয়েছে, সেটি এসডিজিতেও অব্যাহত থাকুক।

জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব বান কি মুন বললেন, কোন বড় কর্মসূচি এনজিও’র সহযোগিতা ছাড়া অকল্পনীয়। একই সাথে যুবসমাজকে তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। ‘আমি কোরিয়ার মানুষ। কোরিয়া আজকের মতো ছিল না। অনেক কষ্ট করতে হয়েছে আমাদের। এক সময়ে খোলা আকাশের নিচে বিদ্যা লাভ করেছে যে ছেলেটি, সে আজ জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব হয়ে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।’ উদ্বোধনী পর্বের এ মুহূর্তটি ছিল আবেগপূর্ণ। হাজার প্রতিনিধির বিশাল সম্মেলন কক্ষটিতে পিনপতন নিরবতা।

আবেগ (প্যাশন) থাকতে হবে নিজেদের কাজে। সেই সাথে থাকতে হবে মমত্ববোধও (কমপ্যাশন)। বান কি মুনের এই কথাগুলো আমাকে স্পর্শ করলো।

তারপর বক্তৃতায় এলেন মি. ইল হা ই, গুড নেইবারস ইন্টারন্যাশলের প্রতিষ্ঠাতা প্রেজিডেন্ট। তিনি সম্মলেনের সহ-সভাপতি। শিশুর অধিকার ও মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে গুড নেইবারস-এর দু’টি কর্মশালা ছিল। ছিল প্রদর্শনী স্টল। প্রদর্শনীতে সেইভ দি চিলড্রেন ও ওয়ার্ল্ড ভিশনসহ সকল বড় এনজিওদের মাঝে বাংলাদেশের কোন সংস্থাকে দেখা গেলো না। জানি না কেন।

যা হোক, ব্ক্তৃতায় এলেন, রাশেদা কে চৌধুরি। তিনি গণশিক্ষার বিশ্ব ফোরামের ভাইস-প্রেজিডেন্ট। একই সাথে বাংলাদেশের গণসাক্ষরতা অভিযানের প্রধান। শাড়ি-পড়া রাশেদা আপাকে দেখে গর্বিত বোধ করলাম। শেষ দিকে তার সাথে ছবি তোলার প্রতিযোগিতায় আমি যেতে চাই নি। অন্যদেশকে সুযোগ দিলাম। তবে দেখা করেছি, কথা বলেছি।

তিন দিনের সম্মেলনে মোট পাঁচটি রাউন্ড টেবিল আলোচনা ছিল। সবগুলোতেই অংশ নিয়েছি। একটিতে প্যানেলিস্ট হিসেবে আবার রাশেদা কে চৌধুরীকে পেলাম। মানসম্মত শিক্ষার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিমতটি তিনিই রাখলেন। তিনি বললেন, সবার আগে রাষ্ট্রগুলো তাদের জাতীয় নীতিতে শিক্ষাকে সেভাবে গ্রহণ করতে হবে। মুহুরমুহু করতালির মাঝে আমার হাতগুলোও ছিলো। শিক্ষার মান ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিয়ে অনেক আলোচনাই হলো, যা এই লেখায় তুলে ধরা সম্ভব নয়।

ইউথ ককাস। যুব সম্মেলন। প্রতিদিন সকালে আয়োজিত হয়েছে তরুণ-তরুণীদের নিয়ে যুব সম্মেলন। প্রথমটিতে স্বয়ং জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব উপস্থিত ছিলেন।

দেখা হলো ঢাকা আহসানীয়া মিশন এবং আহসানীয়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেজিডেন্ট জনাব কাজী রফিকুল আলমের সাথে। বয়স্ক ভদ্রলোক একাই সম্মেলনের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। আমাকে দেখে বিস্মিত। কীভাবে এলাম! যা হোক, তার সাথে দ্বিতীয়বার দেখা হলো সম্মেলন কক্ষে।

অধিকার নিয়ে, রাষ্ট্রীয় অপব্যবস্থা নিয়ে, সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা নিয়ে এবং মুক্তমতের জন্য মানুষের জীবন দেওয়া… ইত্যাদি বিষয়ে এতো সাহসী এবং শানিত বক্তব্য আমি কখনও শুনি নি, দেখি নি। দর্শক সকলে স্তব্ধ, তারপর বজ্রপাতের মতো করতালি। অবশেষে বক্তার সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, তার বক্তৃতা অগণিত মানুষকে শক্তি দেয়, এটি তিনি জানেন কি না। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। ছবি তোললাম এবং পরিচয় বিনিময় করলাম। তিনি জাতিসঙ্ঘের এনজিও বিষয়ক এসোসিয়েশনের চেয়ারপার্সন, ব্রুস নট।

সম্মেলনে ছিল নজিরবিহীন নিরাপত্তা। পুরো গিয়ংজুতে গিয়ংজুর মানুষ ক’জন জানতে পারলাম না, কারণ রাস্তাঘাট সব ফাঁকা। হয়তো মানুষ আসলেই কম। শুধুই সম্মেলনের অংশগ্রহণকারী। অংশগ্রহণকারীদেরকে সম্মেলনের অনেক পূর্বেই প্রাথমিক নিরাপত্তার পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়েছে। নিরাপত্তা সনদ নিজ দেশ থেকেই পাওয়া গেছে, ইমেলে। তারপর সেই সনদ নিয়ে যেতে হয়েছে নিবন্ধন বিভাগে। সেখানে পাসপোর্ট তথ্য যাচাই করে, একই সাথে ফটো তুলে তৈরি করা হয় পরিচয়পত্র। পরিচয়পত্র নিয়ে নিরাপত্তার সর্বশেষ আনুষ্ঠানিকতা শেষে সম্মেলন কেন্দ্রে প্রবেশ।

সুপরিকল্পিত আয়োজন। দৈনিক খাবারের জন্য আলাদাভাবে ত্রিপল টানিয়ে ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইংরেজিতে নির্দেশ, লোকেশন ম্যাপ, ইংরেজিভাষী পুলিশ। আবর্জনা ব্যবস্থাপনা। সবকিছু গুছানো। সবশেষে সীমাহীন খাবারের আয়োজন নিয়ে গণ বুফে। আন্তর্জাতিক খাবারের বিশাল মেলা। সবার জন্য। কয়েকটি কক্ষ নিয়ে আয়োজিত হয় এই খাবারের মেলা। খেলাম এবং ঘুরে ঘুরে তদন্ত করলাম, কোথাও কোন ঘাটতি আছে কিনা। পেলাম না। হাজার মানুষ একসাথে খেলেন, কোনকিছুর অভাব ছিল না। আমার মতে এটি ছিলো সম্মলনের বড় আকর্ষণ। কোরিয়ান আয়োজকরা দেখিয়ে দিলো যে, তারা যতই হিসেবি হোক না কেন খাবারের বেলায় ততটা হিসেব করে না।

 

মোবাইল ফোনে তোলা কিছু ছবি:

 

001 002 003

3-Rasheda Chowdhury 2-Ilha Yi President 1-Ban Ki Moon

013 012 011

008 007 005 004


7-Exhibition Stall
4-Group PHoto

শেষ ছবিটি শুধুই গুড নেইবার্স প্রতিনিধিদের।

 

 

তাৎক্ষণিক প্রকাশ: ৪ঠা জুন ২০১৬/ সামহোয়্যারইন ব্লগ/ পাঠকপ্রতিক্রিয়া

প্রশংসা যেভাবে সম্পর্কের জাল বিস্তার করে

 

11061602

সম্প্রতি একটি কর্মশালায় এমন একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে ফেসিলিটেটর হিসেবে পেলাম, যার অভিনব উপস্থাপনা নতুন একটি বিষয়ে আমাকে আগ্রহী করে তোলেছে।  বিষয়টি হলো: ‘গণ স্বাস্থ্য’, পাবলিক হেলথ।  দেশের সরকার গ্রাম পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক দিয়েও দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছে না।  প্রথমত চিকিৎসকরা গ্রামে থাকতে রাজি নন; দ্বিতীয়ত প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার কারণে।  দেশের মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত সকলেই বিদেশমুখী। মধ্যবিত্তরা যাচ্ছে ভারতে, উচ্চবিত্তরা সিঙ্গাপুর থাইল্যান্ড অথবা অস্ট্রেলিয়ায়। প্রফেসর ডক্টর কিমের প্রশ্নোত্তর-ভিত্তিক প্রশিক্ষণের সময় বারবারই আমি দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার দিকে দৃষ্টি দিচ্ছিলাম।  তার বর্ণনায় নিজ দেশের পরিস্থিতি আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠলো, অথচ তিনি বাংলাদেশ নিয়ে কিছুই বলেন নি।  ভেবে দেখলাম যে, গরীব দেশের জন্য পাবলিক হেলথই একমাত্র ভরসা, কারণ সকলেই তো ভারতে বা সিংগাপুরে যেতে পারে না।

মনে মনে প্রফেসর কিমের প্রতি কৃতজ্ঞ হলাম।  সুযোগ পেয়ে তাকে বললাম, আপনি গণস্বাস্থ্যের প্রফেসর নন, এটি আপনার জন্য খুবই ছোট একটি নাম।  আপনি গণস্বাস্থ্যের প্রফেট (প্রবক্তা) এবং আমি দারুণভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছি।  খুশিতে তিনি উজ্জ্বল হয়ে ওঠলেন। এসুযোগে আমি গণস্বাস্থ্য সম্পর্কে বেশ কিছু প্রাসঙ্গিক সমস্যা তার সামনে তুলে ধরলাম এবং তার সহায়তা প্রার্থনা করলাম। এবং পেলামও। বাকি সময়ে বিভিন্ন সুযোগে তিনি আমাকে গণস্বাস্থ্য সম্পর্কে এমন পরামর্শ দিলেন, যাকে আমি অতিরিক্ত প্রাপ্তি বলে মনে করি।  কর্মশালার অন্য কোন প্রশিক্ষণার্থী এত সুযোগ পায় নি।

তারপর আমাদের মধ্যে পরিচয় বিনিময় হলো। সম্প্রতি আমার কর্মস্থলে গণস্বাস্থ্য নিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু করার জন্য আমার ওপর দায়িত্ব পড়েছে।  বিষয়টি নিয়ে আমি খুবই চিন্তিত।  কিন্তু প্রফেসরের সাথে কথা বলার পর আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, ভবিষ্যতে যে কোন সময়ে তার কাছ থেকে সবরকমের সহযোগিতা পাবো অথবা তার মাধ্যমে উপায় বের করতে পারবো।

অন্যের কাছে সহায়তার অনুরোধ সম্পর্ক সৃষ্টির উত্তম পন্থা হিসেবে কাজ করে।  সেখানে প্রাসঙ্গিক প্রশংসা থাকলে, সেটি বিশেষ গ্লু হিসেবে কাজে আসে। একটি প্রাসঙ্গিক মূল্যায়ন এবং একটি প্রশংসা এভাবেই একটি মূল্যবান সম্পর্ক সৃষ্টিতে সাহায্য করে।

 

জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের জন্য কত কিছুই না আমরা করি। কিন্তু  কিছু পথ অনেকের কাছে অধরাই থেকে যায়। কারণ, অত্যন্ত আত্মকেন্দ্রিকভাবে নিজেদেরকে সজ্জিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। মানবিক উপায়গুলো নিয়ে ভাবার সময় পাই না। দক্ষতা আর অভিজ্ঞতার জন্য অনেক শ্রম ও সময় দিচ্ছি আমরা।  স্বাভাবিকভাবেই সেটি আমাদেরকে সম্মানিত এবং গর্বিত করে।  হয়তো প্রথমত এভাবেই চেষ্টা করতে হয়।  কিন্তু কখনও কি মনে হয় নি যে, সেগুলো অপর্যাপ্ত?

মাঝেমাঝে কি এমন মনে হয় না যে, আমাদের ‘সামর্থ্যের দম্ভ’ সম্পর্ক সৃষ্টিতে বাধা তৈরি করে? অজান্তেই অন্যের কাছে অহংকারী করে তোলে?  অথচ দেখুন,  অফিসের নতুন কর্মীটি খুব সহজেই বড়কর্তার আপন হয়ে যায়।  সে কিছুই শিখেনি, মাত্রই সেদিন যোগ দিয়েছে! আমরা কিন্তু বিস্মিত হই! মাঝেমাঝে মনে হয় না যে, ব্যক্তিগত দুর্বলতাই মানুষকে অন্যের কাছে আপন করে তোলে?

কর্মস্থলে যারা দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন, তাদেরই উদ্দেশ্যে মনস্তাত্ত্বিকরা বলেন, প্রথমে চাই আন্তরিকতা, তারপর দক্ষতা।  প্রথমে আন্তরিকতা দেখিয়ে মানুষকে আপন করতে হয়, তারপর আসে দক্ষতা বা সামর্থ্য প্রদর্শনের বিষয়।  এই পরম্পরাটি সম্পর্ক সৃষ্টি ক্ষেত্রে অবশ্য পালনীয়।

মানুষ মাত্রই ভুল।  মানুষ মাত্রই অসম্পূর্ণতা। অসম্পূর্ণতা স্বাভাবিক এবং মানবিক। আমরা অতিমানব দেখে খুব একটা অভ্যস্ত নই।  হঠাৎ কাউকে এমন পেলে, তাদেরকে শ্রদ্ধা জানাই এবং অনুপ্রাণিত হই। কিন্তু সম্পর্ক সৃষ্টির জন্য চাই কিছু অসম্পূর্ণতা।

আমাদের দুর্বলতা এবং ছোট ছোট ভুল অন্যের কাছে নিজেদেরকে পরিচিত করে তোলে।  তারা আপন ভাবতে শুরু করে তখনই, যখন তাদের দুর্বলতাগুলো অামাদের মধ্যেও দেখতে পায়।  বিষয়টি এতই গভীর এবং বিশ্লেষণসাপেক্ষ যে, এক লেখায় শেষ করা যায় না। তবে গভীরভাবে ভাবলে সহজ হয়ে আসে।

নিজের দুর্বলতায় অন্যের সাহায্য চাওয়া এবং অন্যের মধ্যে ইতিবাচক বিষয় দেখতে পাওয়া দু’টি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক গুণ।  সুন্দর মন অন্যের মধ্যে সুন্দরকে দেখতে পায়।  ইতিবাচক মনোভাবই ইতিবাচক অভিজ্ঞতা পেতে সাহায্য করে।

 

110616

“যে ব্যক্তি প্রশংসা পায়, সে সবসময়ই প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কিছু করে।”

 

একটি আন্তরিক এবং সত্যিকার প্রশংসা যেভাবে সম্পর্ক সৃষ্টি করে:

  • ইতিবাচকতা বৃদ্ধি পায়, নেতিবাচকতা (থাকলেও) দৃষ্টির বাইরে চলে যায়
  • ইতিবাচক বিষয়ে অন্য ব্যক্তিটি অনুপ্রাণিত হয়
  • মন্তব্যকারী গভীর চিন্তাশীল ও বিচক্ষণ ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়
  • অন্য ব্যক্তিটি ভিন্নভাবে নিজেকে আবিষ্কার করতে পারে এবং মন্তব্যকারীর কথা মনে রাখে
  • অন্য ব্যক্তিটির ইতিবাচকতা বৃদ্ধি পায় এবং এজন্য সে মন্তব্যকারীর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে…ইত্যাদি

 

প্রসংশা করতে পারা মানে হলো, একটি কঠিন মানবিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া। মানুষের ইতিবাচক দিকগুলো দেখতে পাওয়া এবং স্বীকৃতি দেওয়ার কাজটি একটু কঠিন, কারণ আত্ম অহমিকা। আত্ম অহমিকা আমাদেরকে আত্মপ্রকাশে বাধা সৃষ্টি করে। অন্যের ভালো দিক দেখা এবং স্বীকৃতি দেবার মধ্য দিয়ে সে গুণগুলো নিজের মধ্যেও গ্রহণ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

নিজের মূল্যায়ন করলে দেখতে পাই যে, খুব বেশি প্রশংসা আমি করি না। বরং মানুষের অসম্পূর্ণতাই বেশি চোখে পড়ে। কারও মধ্যে ইতিবাচক কিছু দেখতে পাই না।  শুরুতেই তার নেতিবাচক এবং দুর্বলতার প্রতি দৃষ্টি আটকে যায়। সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হলো, আত্মকেন্দ্রিকতা এবং স্বার্থপরতার কারণে অন্যের বিষয় নিয়ে বেশি ভাবি না। ফলে, তার ভালো দিকটি আড়ালে পড়ে যায় এবং তার সঙ্গে সম্পর্ক আগায় না। এভাবে তো কর্মজীবন চলতে পারে না!

 

 

 

 


টীকা: লেখাটি প্রশংসা, সম্পর্ক সৃষ্টি এবং কর্মস্থলে নেটওয়ার্কিং বিষয়ক। অন্যের ভালো দিকের প্রতি মনযোগী হওয়া সম্পর্কে উৎসাহ দেবার জন্য লেখাটি প্রস্তুত করা হয়েছে। তোষামোদি বা অসৎ স্তুতিবাদের সাথে একে মেশানো যায় না।

১১টি দক্ষতা, যা শেখা কঠিন কিন্তু জীবনের জন্য দরকারি

বাজারে অনেক রকমের দক্ষতার সদাই হয়।  মানুষ আজ কত দক্ষ হয়ে ওঠছে, সেটি বিশ-ত্রিশ বছর আগের মানুষের সাথে তুলনা করলেই বুঝা যায়।  কিন্তু পরিতাপের বিষয়টি হলো, মানুষ একদিক দিয়ে দক্ষ হচ্ছে, অন্যদিক দিয়ে সম্পর্কগুলো নষ্ট হচ্ছে।  বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, পরিবার ভেঙ্গে যাচ্ছে, ডিভোর্সের হার বেড়ে যাচ্ছে।  উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষের বড় ক্ষতিটি হলো, নিজের ক্যারিয়ার ধ্বংসের মুখে পড়ে যাচ্ছে। তাই তথাকথিত দক্ষতাগুলো থেকে নিজেকে একটু ভিন্ন অবস্থানে রাখা উচিত।

পুনরাবৃত্তি হলেই দক্ষতা চলে আসে।  অথবা বাস্তব জীবনে চর্চার মাধ্যমে আসে।  কিন্তু কিছু দক্ষতা আছে, যা কর্মজীবীদের প্রশিক্ষণ ম্যানুয়ালে তেমন নেই।  কিছু বিষয় আছে, যা প্রচলিত অর্থে দক্ষতা নয়, কিন্তু দক্ষতার চেয়েও বেশি সুফল এনে দেয়।  সেগুলো একটু কঠিন, কারণ শুধু পুনরাবৃত্তি দিয়ে হয় না, উপলব্ধি আর দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের মাধ্যমে আসে।  কঠিন হলেও এসবের অনেক উপকারিতা আছে।

-চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা-

-অপ্রয়োজনীয় আলাপ বা অন্যের সম্পর্কে গালগপ্পো নিয়ন্ত্রণ করতে পারা-

-নিজের কাজে মনসংযোগ রাখতে পারা-

-অন্যকে শোনা-

-কোন সময় চুপ থাকতে হয় সেটি বুঝতে পারা-

-নিজের সাথে ইতিবাচক কথোপকথন-

-অভ্যাসের ধারাবাহিকতা-

-অন্যের কাছে সাহায্য চাওয়া-

-সময় ব্যবস্থাপনা-

-অন্যের প্রতি সহানুভূতি থাকা-

-ঘুমের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা-

✿✿✿✿✿✿✿

1313-crop

১১)  চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা

আমরা আমাদের চিন্তারই ফসল। আমরা যা ভাবি যেভাবে ভাবি, আমাদের আচরণ তা-ই প্রকাশ করে। প্রথমত চিন্তাকে যাচাই করতে হয়, যেন সেখানে ক্ষতিকারক কিছু না থাকে।  চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে, আমরা যা করতে চাই তা করতে পারি।

কিন্তু সকলেই যা করতে চায় তা করতে পারে না। এজন্য বলা হয়, সবাই ভালোভাবে ভাবতে পারে না।  অথবা, সবাই ভালোভাবে তাদের চিন্তাকে প্রকাশও করতে পারে না। চিন্তাকে সুষ্টুভাবে প্রকাশ করতে পারলেই একে নিয়ন্ত্রণ করার দক্ষতা চলে আসে।

এর সাথে আরেকটি দক্ষতা জড়িয়ে আছে: সকল অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকার দক্ষতা।  এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দক্ষতা।  মিথ্যা আত্মসন্তুষ্টি নয়, কিন্তু পরিস্থিতিকে ঠাণ্ডা মাথায় মূল্যায়ন করে করণীয় নির্ধারণ করতে পারা।

অতীত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে শুদ্ধ করাই হলো ভালো চিন্তার ফল।

১০)  অপ্রয়োজনীয় আলাপ বা অন্যের সম্পর্কে গালগপ্পো নিয়ন্ত্রণ করতে পারা

মানুষের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সম্পর্ক।  টাকাকড়ি সবই হারালে পাওয়া যায়, কিন্তু সম্পর্ক হারালে তা কখনও পূর্বের অবস্থায় পাওয়া যায় না। তাই সম্পর্ক গড়া এবং রক্ষা করা জীবনের জন্য খুবই দরকারি।

সম্পর্ক রক্ষার জন্য প্রথম শর্ত হলো আস্থা। অনেকের মতে, এই আস্থাকে নষ্ট করে ফেলার জন্য প্রথমে দায়ি হলো, পেছনে কথা বলার অভ্যাস।  কারও অনুপস্থিতিতে তার বিষয়ে নেতিবাচক আলোচনা করলে তাতে আস্থা নষ্ট হয়ে যায়।

কিন্তু মজার বিষয় হলো, অন্যের পেছনে কথা বলা খুবই মজার এবং তাতে দ্রুত কারও বন্ধু হয়ে যাওয়া যায়। প্রবাদে আছে, দু’জনের শত্রু একই ব্যক্তি হলে সেই দু’জনের মধ্যে বন্ধুত্ব অনিবার্য। কিন্তু সম্পর্ক ও আস্থার দিক থেকে এটি খারাপ একটি অভ্যাস। একজনের সাথে শত্রুতা অনেকের সাথে আস্থার সংকট সৃষ্টি করতে পারে।  তাই অন্যের পেছনে আলাপ নিয়ন্ত্রণ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।

এসব পরিস্থিতিতে যা করতে হয়, তা হলো নিশ্চুপ থাকা।  কৌশলে অন্য বিষয়ে আলোচনাকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়। অথবা বলা যায়, “আমরা কি বিষয়টি বদলাতে পারি?”  ক্রিড়া বা রাজনীতির মতো জনপ্রিয় অথবা গরম ইস্যু ছেড়ে দেওয়া যায় আলোচনার টেবিলে।

Image result for concentration

৯)  নিজের কাজে মনসংযোগ রাখতে পারা

মনসংযোগ ধরে রাখা কঠিন কাজ। এ দক্ষতা অর্জন করতে কারও কারও জীবন শেষ হয়ে যায়।

নিজের কাজে লেগে থাকা কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি দক্ষতা।  কারণ বর্তমান যোগাযোগ প্রচুক্তির এদিনে বাড়তি বিপত্তির শেষ নেই।  মোবাইল ফোন, মেসেজ এলার্ট, সোস্যাল নেটওয়ার্কিং, ইমেইল, ইন্টারকমে সহকর্মী, বসের কল ইত্যাদি লেগেই আছে।  যারা নিজের অবস্থানকে উন্নত করতে চান, তারা এসবকে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আটকে রাখেন।

মনযোগ নষ্ট করার আরেকটি সহজাত প্রবণতা হলো অন্যের কাজে নাক গলানো। অন্যের দুর্বলতা নিয়ে মেতে থাকা। নিজের কাজে মনোযোগ দিলে অন্যদিকে মনোযোগ দেওয়া অসম্ভব।

অন্যের ভুলত্রুটি থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিজের দুর্বল দিকগুলোতে মনোযোগ দিলেই কেবল উন্নয়ন সম্ভব।  মনসংযোগ ধরে রাখতে পারা একটি মূলবান দক্ষতা।

৮)  অন্যকে শোনা

কিছু মানুষ আছে যারা শুনে অর্ধেক, বুঝে চারভাগের একভাগ এবং চিন্তা করে শূন্য পরিমাণ, কিন্তু প্রতিক্রিয়া করে দ্বিগুন।  তারা কথা না বলে শুনতে পারে না। কিন্তু শোনা মানে হলো ‘চুপ থাকা’।

মানুষের সাথে সম্পর্কের শুরু হয় তাকে শোনার মধ্য দিয়ে।

শোনার মধ্য দিয়ে অনেক পেশাগত ও সামাজিক সমস্যার সমাধান এমনিতেই হয়ে যায়।

একটি ব্যস্ততম কল সেন্টারের ব্যবস্থাপককে জিজ্ঞেস করা হলো, কীভাবে তিনি অগণিত অভিযোগের নিষ্পত্তি করেন। ব্যবস্থাপক শুধু সংক্ষেপে জানালেন যে, ৮০% অভিযোগ শুধু শুনে এবং লিখে রাখাতেই সমাধান হয়। বাকি ১০% অভিযোগ শেষ হয় অপেক্ষায়। অর্থাৎ কিছুদিন পর্যবেক্ষণে রাখলেই ১০% অভিযোগের সমাধান হয়। মাত্র ১০% অভিযোগ নিয়ে বাস্তবিকভাবে তাদেরকে কাজ করতে হয়। এক্ষেত্রে মূল চাবিকাঠি হলো, গ্রাহকের অভিযোগগুলো পূর্ণ মনযোগ এবং সহানুভূতির সাথে শুনে যাওয়া।

শোনা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দক্ষতা যেটি নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে আয়ত্ত করা যায়।  এর নিজস্ব কিছু কৌশল আছে যা ব্যক্তিগত আগ্রহের মাধ্যমে নিজের আচরণে অন্তর্ভুক্ত করা যায়

Image result for keep shut up

৭)  কোন্ সময় চুপ থাকতে হয় সেটি বুঝতে পারা

কোন বিষয়ে রাগ অথবা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হয় না।  আমাদের চারপাশে অনেক সমস্যা আছে, যা একার পক্ষে সমাধান করা যায় না।  আমাদের দরকার শুধু চুপ থাকা।  অথবা উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করা।

অনেক সময় কথা বলার চেয়ে নিশ্চুপ থাকাই সঠিক অবস্থান। তা না হলে পরে পস্তাতে হতে পারে। নিরবতাই উপযুক্ত উত্তর, এমন পরিস্থিতিতে আমরা সকলেই পড়ি।  শুধু দরকার সেটি বুঝতে পারার।

চুপ থাকা মানেই দায়িত্ব এড়িয়ে চলা নয়, অন্যকে করার সুযোগ করে দেওয়া।

চুপ করা মানে অন্যকে কথা শেষ হতে দেওয়া।

চুপ করা মানে নিজের সঠিক মেজাজটুকু ফিরে পাবার জন্য সময় নেওয়া।

অনেক বিষয় আছে যা নিজের মধ্যে রাখাই উত্তম।  আমরা যখন রাগ করি, অথবা যখন হতাশ হই, বা যখন বিরক্ত হই, তখন কিছু না বলাই ভালো। তাতে অপ্রয়োজনীয় বা অনাকাঙ্ক্ষিত মুখ থেকে বের হয়ে আসতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ কোন সিদ্ধান্ত না নিয়ে চুপ করে চিন্তা করাই উত্তম। মেজাজ স্বাভাবিক হলে সঠিক পদক্ষেপটি গ্রহণ করা যায়।

যখন আমরা উত্তেজিত হয়ে পড়ি, সেটা চরম দুঃখে অথবা চরম আনন্দের কারণে হতে পারে, তখন নিজের মুখকে বন্ধ রাখলে ভবিষ্যত আক্ষেপ থেকে নিজেকে বাঁচানো যেতে পারে।

কাজটি খুবই কঠিন, কিন্তু যারা এটি আয়ত্ত করতে পেরেছেন তারাই শুধু জানেন এর কত উপকার।

৬)  নিজের সাথে ইতিবাচক কথোপকথন

অন্যেরা আমাদের সম্পর্কে কী ভাবে, অবশেষে সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় না।  গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা নিজেরা নিজের সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করি।

নিজের সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে সময় লাগে।  কিছু অমূল্য গুণ আছে যা অনেকেরই থাকে না।  অথচ সেটি আমাদের দরকার। এজন্য নিজেদের সাথে ইতিবাচক থাকা খুবই প্রয়োজন।

ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে আত্মসমালোচনা করলে অভাবনীয় ফল আসে।  এটি মূলত নিজের সাথে ‘নেতিবাচক কথা’ বলা। চর্চা করলে আস্তে আস্তে সেটি ইতিবাচক এবং প্রেরণামূলক আত্মকথনে রূপ নিতে পারে।

৫)  অভ্যাসের ধারাবাহিকতা

কোন একটি  বিষয়ে ধারণা নিতে চাইলে প্রয়োজন নিয়মিত চর্চা।

তাই প্রথমেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে বিষয়টি সময় দেবার মতো কি না।  তাতে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে কি না।

যদি উত্তর হ্যাঁ-সূচক হয়, তবে শেষ না হওয়া পর্যন্ত লেগে থাকতে হবে।  একেবারে বাদ দেবার চেয়ে বরং অনিয়মিতভাবে করাও উত্তম।

অনেকে নিজের অবস্থান ভালো করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করে, কিন্তু সেখানে পৌঁছে অথবা কাছাকাছি গিয়ে আন্তসন্তুষ্টিতে ভোগে। অথবা অলসতায় পড়ে যায়। এসবকে অতিক্রম করার জন্য যা কিছু করা হয়, সেটিই অভ্যাসের ধারাবাহিকতা।

৪)  অন্যের কাছে সাহায্য চাওয়া

একটি চাকরির সাক্ষাৎকারে নিয়োগকর্তারা সাফ জানিয়ে দিলেন যে, “আপনি একাজটি করতে পারবেন না যদি অন্যের সাহায্য নেবার ইচ্ছা বা দক্ষতা না থাকে।” নিজের কাজে অন্যকে সম্পৃক্ত করতে পারা একটি দারুণ দক্ষতা।

চাকরিতে যোগদানের পর দেখা গেলো পূর্বে ব্যক্তি তার চাকরিটি হারিয়েছিলেন শুধু এজন্য যে, তিনি সমস্যাকে গোপন করতেন এবং কারও অংশগ্রহণের সুযোগ রাখতেন না।

অন্যের সাহায্য নেওয়ার মধ্যে অতিরিক্ত যে জিনিসটি পাওয়া যায় তা হলো, কাজের মধ্যে অংশীদারিত্ব বেড়ে যায়। এর সফলতা ও ব্যর্থতায় সকলেই ভাগ পায়। কাজটি হয়ে যায় সকলের। কিন্তু কৃতীত্ব একজনেরই, যিনি সকলকে সম্পৃক্ত করতে পারলেন।

এখানে আরেকটি বিষয় হলো, ঠিক ‘কখন অন্যের সাহায্য নেবার প্রয়োজন’ সেটি বুঝতে পারা। অন্যের অংশগ্রহণ কখন দরকার, সেটি পরিমাপ করতে পারা আরেকটি বিশেষ গুণ।

অন্যের সাহায্য গ্রহণের মধ্য দিয়ে আমরা অন্যের সামর্থ্যকে যেমন মাপতে পারি, তেমনি পারি নিজের নেতৃত্বদানের যোগ্যতাকে যাচাই করতে।

বিষয়টি একই সাথে অন্যের আস্থা অর্জনেরও সুযোগ করে দেয়। তাতে ক্রমেই আমাদের গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যায়। এটি একটি দক্ষতা বটে!

৩)  সময় ব্যবস্থাপনা

সময় ব্যবস্থাপনার কোন  সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি বা পথনির্দেশ আজও আবিষ্কৃত হয় নি। বিষয়টি পুরোপুরি ব্যক্তির একক সৃজনশীলতার ওপর নির্ভরশীল।

অন্যদিকে একটি প্রতিষ্ঠানের জুনিয়র থেকে সিনিয়র পদের ব্যক্তি সবারই সময় সীমাবদ্ধতাকে মেনে চলতে হয়।

ফলে সময় ব্যবস্থাপনা যারা ভালোমতো করতে পারেন, তারা সকলের মনযোগ আকর্ষণ করেন সহজেই। চাকরিদাতারাও এ গুণটিকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করেন এবং এটি কর্মী মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

একজন জৈষ্ঠ্য কর্মকর্তা বলেছিলেন, কাজটি করা নয়, কাজটির ‘পরিকল্পনা করাই’ আমার কাছে সবচেয়ে বেশি কঠিন লাগে। এর একটিই কারণ, কাজ অনুযায়ি সময়কে উপযুক্তভাবে ভাগ করতে পারা।

সময় ব্যবস্থাপনার সাথে সংশ্লিষ্ট আরেকটি দক্ষতা হলো, অগ্রাধিকার বুঝতে পারা। কোন্ কাজটি আগে, এবং কোন্ কাজটি পরে করতে হবে।

একটি ‘টু-ডু লিস্ট’ এখানে সহজ উপায়।  তাহলে নিজের কাজগুলো ‘দৃশ্যমান পরিকল্পনায়’ রূপ নেয় এবং সময় ব্যবস্থাপনা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়।

২)  অন্যের প্রতি সহানুভূতি থাকা

আমরা যত দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং চৌকস কর্মকর্তা হই না কেন, অন্যের অনুভূতির প্রতি যত্নশীল না হলে ওসব যোগ্যতা কোন কাজেই আসে না।  ওগুলি বরং আত্মঅহংকারে ফুলিয়ে তোলে আমাদেরকে।

অন্যের অনুভূতির প্রতি গুরুত্ব না থাকলে ‘নিজেদের যোগ্যতা ও দক্ষতা’ কেবলই প্রতিপক্ষ তৈরি করে।

নিজেদের যুক্তি ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আমরা মানুষকে মুগ্ধ করতে পারি, কিন্তু তারা আমাদের আচরণ দ্বারাই কেবল প্রভাবিত হয়।  মানুষ আমাদের কথা শুনে, কিন্তু আচরণকে অনুভব করে।  এই অনুভবই তাদের বেশি মনে থাকে।

অন্যের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব থাকলে, জীবনের অনেক কিছু সহজ হয়ে যায়।  সবচেয়ে বেশি সহজ হয় যেটি, তা হলো সম্পর্ক।

অন্যকে আপন করতে পারা একটি বিরল মানবিক গুণ, যা মুহূর্তে আমাদেরকে অন্যের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে।

অন্যের প্রতি সহানুভূতি একটি বিশেষ গুণ।  কর্মক্ষেত্রে একে দক্ষতা বলা হয়, কারণ নিজের চেষ্টা দিয়েই কেবল একে অর্জন করা যায়।

১)  ঘুমের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা

যোগ ব্যায়াম মানুষের দেহ ও মনকে সতেজ করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।  কিন্তু দালাই লামা বলেছেন, ঘুমই সর্বোত্তম যোগ ব্যায়াম।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায় যে, যারা ঘুমের রুটিন মেনে চলতে সমর্থ হয়েছেন তারা শোয়া মাত্রই ঘুমিয়ে পড়তে পারেন।  এবং সময়মতো ঘুম থেকেও ওঠতে পারেন।  কর্মজীবীরা জানেন, এই অভ্যাস কত মূল্যবান।

যারা দিনের সময়টিতে সতেজ এবং ক্লান্তিহীন থাকতে চান, কেবল তারাই জানেন পর্যাপ্ত ঘুমাতে পারা কত ভালো একটি গুণ।

পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার বিষয়টি অনেকটাই ব্যক্তির অভ্যাসের ওপর নির্ভর করে।  যারা রাতে ভালো ঘুমাতে চান, সাধারণত তারা বিকালের পর ক্যাফেইনযুক্ত কিছু পান করেন না। বিভিন্নভাবে শারীরিক খসরত বাড়িয়ে দেন। তাদের ধূমপানের অভ্যাস তাদের কম, অথবা নেই।  তারা ঘুমের বেশ আগেই টিভি অথবা কম্পিউটারটি বন্ধ করে দেন।

কেউ কেউ বিছানার পাশে বই রাখেন।  ঘুমের আগে প্রিয় বইটি পড়লে ঘুম আসতে পারে।

কিছু কারণ আছে প্রাকৃতিক।  যেমন: কাজের চাপ থাকা, কোন ডেডলাইন সামনে থাকা, ব্যবসায়িক লোকসান। ইত্যাদি নানাবিধ দুশ্চিন্তা।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, কম ঘুমের কারণেই মানুষের দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়। আবার দুশ্চিন্তা বেড়ে যাবার কারণেই কম ঘুম হয়।

যারা ঘুমকে দৈনন্দিন সকল কাজের মধ্যে মিলিয়ে নিতে পেরেছেন, তারাই কাজ এবং বিশ্রামকে আলাদা করতে পারেন। তাই আধুনিক কর্মজীবীরা ঘুমকে একটি দক্ষতা হিসেবে বিবেচনা করেছেন।


বিজনেস ইনসাইডার এবং লেখকের আরেকটি পোস্ট অবলম্বনে।

ছবিগুলো গুগল অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত।

 

নীলসমুদ্র: প্রতিযোগিতামুক্ত পরিবেশ, সফলতার নতুন দিগন্ত!

নিজের পেনশনের টাকা দিয়ে ব্যবসায় শুরু করে নূরুল ইসলাম সাহেব মহাফ্যাসাদে পড়েছেন। একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং চারটি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঝখানে তার বইয়ের দোকান। দোকান শুরুর পূর্বে তিনি পাশ্ববর্তী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করেছিলেন। তারা সকলেই তাকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিল। সৌভাগ্যক্রমে বেশ ক’জন শিক্ষক তার কর্মজীবনের পূর্ব পরিচিতও। কিন্তু তবু তিনি সমগোত্রীয় বুকস্টোরগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় ঠিকতে পারলেন না।

 

এরকম পরিস্থিতিতে তার বড় ছেলে সফিকুল ইসলাম কিছুদিন দোকানে বসে দেখলেন যে, তার বাবার বইয়ের দোকানটির জেগে ওঠার কোনই সম্ভাবনা নেই।  তার প্রধান কারণ হলো প্রতিবেশী বুকস্টোরগুলো, যাদের আছে অনেকদিনের অভিজ্ঞতা এবং সুবিস্তৃত ক্রেতা সমাজ (customer base)। দীর্ঘদিন বইয়ের ব্যবসায় থেকে তারা সব বয়সের ক্রেতার আস্থা অর্জন করেছে। পার্শ্ববর্তী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা একনামে তাদেরকে চেনে। তিনি দেখলেন যে, নতুন একটি বুকস্টোর দিয়ে বৃহৎ বুকস্টোরগুলোর সাথে একটি ‘অসম প্রতিযোগিতায়’ লিপ্ত হয়েছেন তার বাবা। শেষ কথা হলো এই যে, বইয়ের দোকান দিয়ে তাদের আর বাণিজ্য করা সম্ভব নয়।

 

অতএব সফিকুল ইসলাম তার শিক্ষাজীবনের তাত্ত্বিক জ্ঞান দিয়ে বাজার গবেষণা করে দেখলেন যে, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করা প্রায় অসম্ভব। তাই তিনি বাবার সাথে পরামর্শ করে আপাতত শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে লক্ষ্য করে ব্যবসায়কে চাঙ্গা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এউদ্দেশ্যে তিনি বইয়ের প্রান্তিক সরবরাহকারীদের সাথে চুক্তি করলেন, যারা অপেক্ষাকৃত কমমূল্যে এমনকি সহজশর্তে বাকিতেও বই দিতে প্রস্তুত থাকবে। তাছাড়া, ব্যবসায়ের ধরণেও একটি বড় পরিবর্তন আনলেন: বুকস্টোরের স্থানকে সামান্য বিস্তৃত করে পাঠাগার সুবিধা যুক্ত করলেন। পার্শ্ববর্তী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন যে, বিদেশি দামিদামি বইগুলো আর কিনে পড়তে হবে না। নামমাত্র মূল্যে পাঠাগারের সদস্য হয়ে শিক্ষার্থীরা বই পড়তে পারবে এবং বাড়িতেও নিতে পারবে।

 

এভাবে তিনি ভিন্ন এবং অভিনব উপায়ে ক্রেতাদেরকে দোকানের দিকে আকৃষ্ট করলেন। ফলে অন্যান্য অভিজ্ঞ বুকস্টোরের সাথে তাদের আর প্রতিযোগিতায় যেতে হলো না। বাজারের অন্যান্য বুকস্টোরগুলোও তাদেরকে আর প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করলো না। দু’বছর পরের ফলাফল হলো অনেকটা এরকম:  বাপ-বেটার বইয়ের দোকানটি অবশেষে একটি লাভজনক ‘বাণিজ্যিক পাঠাগারে’ রূপান্তরিত হলো। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীতে তারা সীমাবদ্ধ থাকলো না: স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ অন্যান্য পেশার মানুষেরাও তাদের ক্রেতা হয়ে আসলো। অন্যদিকে বাজারে তাদের কোন প্রতিদ্বন্দ্বীও রইলো না। নিজেদের সৃজনশীলতায় তৈরি ক্রেতা দিয়েই তারা ব্যবসায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলেন।

 

(2)

বর্তমান যুগে কোন বিষয়ে পসার লাভ করতে হলে, দু’টি পথ আছে: ক) প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়া এবং খ) প্রতিযোগিতাকে এড়িয়ে যেতে পারা। প্রতিযোগিতা জয়ী হওয়া একটি কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ এবং অশুভ পথ, কারণ তাতে দ্বন্দ্ব বাড়ে, প্রতিপক্ষ সৃষ্টি হয়। এখানে জয় ছাড়া অন্যকিছু কাম্য নয়। এটি কোন খেলা নয় যে, পরাজয়কে সহজভাবে মানা যায়। এখানে হারা মানে হলো, ধ্বংস হয়ে যাওয়া। অতএব আধুনিক বিশ্বে, দ্বিতীয় উপায়টিই মানুষ বেছে নিচ্ছে। মানুষ আজকাল এমন পরিস্থিতিকে বেছে নিচ্ছে, যেখানে প্রতিযোগিতা বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক।

 

প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার জন্য হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতায় ‘রক্তাক্ত’ পরিবেশ সৃষ্টি করাকে বলা হয় ‘রেড ওশন’ বা লালসমুদ্র কৌশল। প্রতিপক্ষরা একে অন্যের ধ্বংস চায়। এটি কখনও কাম্য নয়, কিন্তু পরিস্থিতি বাধ্য করে।

 

অন্যদিকে, নিজেদের কৌশলে সৃজনশীল পরিবর্তন এনে প্রতিযোগিতার প্রভাবমুক্ত ব্যবসায়িক পরিবেশ সৃষ্টি করাকে বলা হয় ‘ব্লু ওশন’ বা নীলসমুদ্র কৌশল।  বাধাহীন নীলসমুদ্রে এগিয়ে চলে সফলতার জাহাজ। প্রতিপক্ষরা প্রতিবেশীর মতো হয়ে যায়। বর্তমান লেখাটি নীলসমুদ্রকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছে।

 

নীলসমুদ্র কৌশলের ৮টি বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যার পর্যালোচনা করলে এ সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন ধারণা পাওয়া যায়।  এই ৮টি বৈশিষ্ট্য সংশ্লিষ্ট প্রবক্তাদের নিজস্ব হোমপেইজ থেকে উদ্ধৃত:

 

১) এটি তথ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত

২) এটি ব্যতিকম এবং কম খরচের

৩) এটি বাজারে প্রতিযোগিতাহীন (uncontested) পরিস্থিতি সৃষ্টি করে

৪) সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এখান থেকে পদ্ধতি এবং কাঠামোগতভাবে সহায়তা লাভ করেন

৫) এটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়

৬) এতে ঝুঁকি কমে কিন্তু সুযোগ বাড়ে

৭) বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৌশল প্রতিষ্ঠিত হয় এবং

৮) এটি সমান-সমান জয়ের (win-win) পরিস্থিতি সৃষ্টি করে:

 

 003

১. এটি তথ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত: এই কৌশল তথ্যভিত্তিক এবং ১৫০বার পরীক্ষা করে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একশ’ বছরের পুরানো ৩০টি শিল্পউদ্যোগের ওপর এর পরীক্ষা হয়।

২. এটি ব্যতিক্রম এবং কম খরচের: নীলসমুদ্র কৌশলটি একই সাথে অভিনব এবং সাশ্রয়ী। লালসমুদ্রের সাথে তুলনা করে একে বিকল্পহীন কৌশল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

৩. এটি বাজারে প্রতিযোগিতাহীন (uncontested) পরিস্থিতি সৃষ্টি করে: প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়া নয়, কিন্তু একটি উদ্যোগকে পরিমার্জন করার মধ্য দিয়ে এখানে প্রতিযোগিতাকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ করে তোলা হয়।

৪. সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এখান থেকে পদ্ধতি এবং কাঠামোগতভাবে সহায়তা লাভ করেন: এই পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট শিল্পউদ্যোক্তা উপাত্ত এবং পদ্ধতিগত সহায়তা লাভ করেন। (এদের হোমপেইজে সহজভাবে একটি ফ্রেইমওয়ার্ক উপস্থাপন করা হয়েছে।)

৫. এটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়: বর্তমান পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ করে, অপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলোকে ছেঁটে দিয়ে ধারাবাহিকভাবে এটি অর্জিত হয়। এখানে ‘নন-কাস্টমারকে’ বানানো হয় কাস্টমার, অর্থাৎ যারা এখনও ক্রেতা হয় নি, তারাও ক্রেতাতে রূপান্তরিত হয়। চারটি সহজ ধাপে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

৬. এতে ঝুঁকি কমে কিন্তু সুযোগ বাড়ে:  উদ্যোক্তার একটি নতুন ধারণাকে আর্থিক তাৎপর্য দেওয়া হয়। বিমূর্ত ধারণাটি মূর্তিমান বস্তুতে পরিণত হয়। এতে নেতিবাচক ঝুঁকিকে ‘ইতিবাচক’ বা লাভজনক ঝুঁকিতে পরিণত করা হয়। ফলে ঝুঁকি পরিণত হয় সুযোগে।

৭. বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৌশল প্রতিষ্ঠিত হয়: কৌশলটি সামষ্টিক, অর্থাৎ সবকিছুকে অন্তর্ভুক্ত করে প্রণীত। এটি সহজে বুঝতে পারা যায় এবং বুঝাতে পারা যায়।

৮. এটি সমান-সমান জয়ের (win-win) পরিস্থিতি সৃষ্টি করে: এখানে কেউ প্রতিপক্ষ নয়, এমনকি ক্রেতাও নয়। ক্রেতা পায় অর্থের উপযুক্ত মূল্য এবং বিক্রেতা পায় লাভ। মূল্য, লাভ এবং ক্রেতা – এইটি তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে ক্রেতা ও বিক্রেতার জন্য সমান-সমান জয়ের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়।

 

 

উপসংহার:

বিজনেস এবং ক্যারিয়ার ডিভেলপমেন্ট-এর জন্য নীলসমুদ্র কৌশলটি সারা বিশ্বে আজ বহুল আলোচিত এবং একই সাথে সমাদৃত।  উন্নয়ন এবং সফলতার ‘হট ইস্যু’ হিসেবে একে দেখা হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের কোন গণমাধ্যমে নীলসমুদ্র বা ব্লু ওশন স্ট্র্যাটেজি নিয়ে তেমন কোন আলোচনা নেই দেখে বিস্মিত হয়েছি। সার্চ এন্জিনে খোঁজ নিয়ে দেখলাম, একটি বাংলা পত্রিকায় এবিষয়ে সামান্য কিছু আলোচনা করা করেছিল। তাতে ‘নীলসমুদ্র’ সম্পর্কে স্পষ্ট কোন ধারণা পাওয়া যায় না, বরং কঠিন কঠিন ব্যবসায়িক পরিভাষা দিয়ে আরও জটিল করা হয়েছে। একটি সুস্থ সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য নীলসমুদ্র কৌশলটি এদেশেও আলোচিত হোক, এজন্যই এই লেখার অবতারণা।

 

কীভাবে আমি ‘নীলসমু্দ্রকে’ পেলাম। আমাদের প্রতিষ্ঠানটি এর উন্নয়ন সহযোগীদের (সুবিধাভোগী) আর্থিক চাহিদা বিবেচনা করে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার জন্য কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। অর্থাৎ সহযোগীদেরকে আর্থিক স্বাবলম্বিতার পথ দেখানো হচ্ছে। এউদ্দেশ্যে বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগ নিয়ে চলছে চুলছেড়া বিশ্লেষণ। তারই অংশ হিসেবে ‘নীলসমুদ্র কৌশলের’ সাথে পরিচিত হই। বিষয়টির শেখড় যে এত গভীরে তা প্রথমে বুঝতে পারি নি। শুধু ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও ‘নীলসমুদ্র’ একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজের কথা বলে।

 

 

———————

টীকা:

ক) পারিভাষিক শব্দ এবং তাত্ত্বিক আলোচনাকে যথাসম্ভব পরিহার করা হয়েছে। পরবর্তী কোন সময়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করার ইচ্ছা আছে। তবে এবিষয়ে আগ্রহীরা ‘blue ocean’ লেখে বাটিচালান দিতে পারেন।

খ) তথ্যসূত্র: বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যক্তিগত পড়া; ব্লু ওশন স্ট্র্যাটেজি ডট কম; বিজনেস নিউস ডেইলি ডট কম এবং হার্বার্ড বিজনেস রিভিউ ডট ওআরজি

আকর্ষণীয় হবার ৩৬ উপায়! (সংগৃহীত)

আকর্ষণীয় হতে চায় না এমন কেউ নেই।  যে প্রাকৃতিকভাবেই আকর্ষণীয়, সেও আকর্ষণীয় হতে চায়। এমনকি যে বলে, আমার ওসবে আগ্রহ নেই, সেও চায়। কিন্তু কীভাবে আমি আকর্ষণীয় হবার ৩৬ উপায় পেলাম এবং কেনই এখানে হাজির করলাম, তা না বলে পারছি না।  একটি প্রবন্ধের জন্য কিছু উপাত্তের খোঁজ করতে গিয়ে একটি অসম্ভব চমৎকার ব্লগসাইটের দেখা পেলাম। নাম তার Live Bold and Bloom। নামেই অনেক কিছু পাওয়া যায়।  তো চোখ বুলাতে গিয়ে কিছু আই-ক্যাচিং বিষয়ে দৃষ্টি পড়লো। পড়ে চমৎকৃত হয়েছি। অনেক বিষয়েই নিজের চিন্তার সাথে মিল পেয়েছি। তাই বাংলা ভাষায় রূপান্তর করে আটকে রাখার সিদ্ধান্ত নিলাম। পাঠকদের কারও কারও ভালো লাগতেও পারে।  পুরোপুরি অনুবাদ করি নি, কনটেক্চুয়ালাইজ করেছি।

  1. নিজস্ব কিছু আদর্শ স্থির করুন।  নিজের মূল্যবোধ, পছন্দ-অপছন্দ, নিজের সীমাবদ্ধতা, নীতিবোধ এবং নিজের আগ্রহের বিষয়গুলো স্থির করে নিন। তাতে সহজেই অন্যের আদর্শ/দর্শনকে চোখ বন্ধ করে মেনে নিতে হবে না।
  2. নিজের মূল্যবোধের সাধে তুলনা না করে কোনকিছু সরাসরি গ্রহণ করবেন না।  স্বীকৃতি পাবার আশায় অন্যের মতামত দ্বারা পরিচালিত হবেন না।  সেটাই গ্রহণ করুন, যা আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল্যবান।
  3. নিজের বিচারবুদ্ধির ওপর ভরসা করুন এবং যাচাই করে গ্রহণ করুন।  নিজের পছন্দ ও উপভোগের বিষয়টি পাবার জন্য চেষ্টা করুন, দু’একবার ব্যর্থ হলেও।
  4. মানুষ যেরকম, তাকে সেভাবেই গ্রহণ করুন।  অন্যকে বিচার করা এবং সমালোচনা করা কমিয়ে দিন। মানুষের দুর্বলতার চেয়ে সবল দিকের প্রতি মনোযোগ দিন।  নিজেকে নিঃশেষ করে না দিয়ে কঠিন মানুষের সাথে কাজ করতে শিখুন।
  5. আন্তরিকভাবেই অন্যের কথা শুনুন।  শুধু শোনা এবং বোঝা নয়, তার চেয়েও বেশিকিছু করুন।  তাদেরকে বুঝতে দিন যে, আপনি তাদের কথাকে উপভোগ করছেন।  (অবশ্যই, পরিস্থিতি সেরকম হলে।)
  6. জীবনের জটগুলোকে খুলে দিন।  সততাকে ফিরিয়ে আনুন।  অন্যকে ক্ষমা করে দিন, অথবা অন্যের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিষ্পত্তি করুন। এসব বিষয় নিয়ে নিজের শক্তির অপচয় করবেন না।
  7. স্বাস্থ্যসম্মত অভ্যাস গড়ে তুলুন।  প্রতিদিন কিছু ব্যায়াম করুন এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খান।  আপনার স্বাস্থ্যকে সাপোর্ট দিন, আবেগকে নয়। কাউকে আকর্ষণ করার জন্য নয়, নিজেকে শ্রদ্ধা করছেন বলেই এটি করুন।
  8. ঘটনাকে আপনিই সম্পন্ন করুন। কারও অপেক্ষা নয়। সামনের কাজটিতে নিজেই হাত দিন। আপনিই হোন প্রেরণাদায়ী ও অনুঘটক। আপনার উৎসাহ সকলে দেখুক।
  9. শুধু মুখে নয় কাজেও দেখান যে, অন্যকে আপনি গুরুত্ব দিচ্ছেন।  অন্যরা কেন আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ এটি তাদেরকে দেখান।
  10. মানুষের শ্রেষ্ঠ রূপটিতে আপনার দৃষ্টি দিন।  অন্যরা যেমন আছে শুধু সে বিষয়টিতে আবদ্ধ না থেকে তারা ‘কী হতে পারে’ সেটিতে মনযোগ দিন।  সৌহার্দ্যের সাথে এই দর্শনটি প্রয়োগ করুন।
  11. আপনার চাহিদার বিষয়টি খেয়াল রাখুন। দেখে নিন সম্পর্কের কোন বিষয়টি আপনার জন্য মূল্যাবান এবং গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন ছাড়া যোগাযোগ করবেন না।
  12. গঠনমূলক কথা বলুন।  আপনার কথায় প্রেরণা, উন্নয়ন, উৎসাহ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করুন।  ‘গঠনমূলক সমালোচনাও’ করবেন না।
  13. হাসুন সহজেই।  নিজেকে হালকা রাখুন।  জীবনকে এত কঠিনভাবে নেবেন না। মজা করার চেষ্টা করুন এবং মজার বিষয় খুঁজুন।
  14. গসিপিং ও পেছনে কথা বলা বন্ধ করুন। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অন্যের সমালোচনা করা বন্ধ করুন।
  15. অভিযোগ নয়, অনুরোধ করুন।  কারও নিকট থেকে কিছুর দরকার হলে সরাসরি চান। অভিযোগ থাকলেও সেটি অনুরোধের আকৃতিতে প্রকাশ করুন।
  16. সরাসরি পরিস্থিতির মোকাবেলা করুন।  কোন কিছুতে অসন্তুষ্টির সৃষ্টি করলে সেটি সহ্য করবেন না। নরমভাবে কিন্তু সুস্পষ্টভাবে নেতিবাচক বিষয়ের নিষ্পত্তি করুন।
  17. বিতর্ক এড়িয়ে চলুন।  অনুকূল পরিস্থিতি না থাকলে কথা বাড়াবেন না, হেসে এড়িয়ে চলুন।
  18. চাইলেই সাহায্য করুন। মনে করবেন না যে, কেউ আপনার সাহায্য চায় অথবা আপনি তার ভালো বুঝতে পারেন। সঙ্গে থাকুন, কিন্তু চাইলেই কেবল সাহায্য দিন।
  19. আন্তরিকভাবে খবর নিন, কিন্তু দূরত্ব বজায় রাখুন।  কারও সমস্যায় আপনি গভীরভাবে সমব্যাথী এটি তাদেরকে বুঝতে দিন, কিন্তু তার সমস্যায় আপনি ডুবে যাবেন না।
  20. অন্তর দিয়ে দেখুন, দৃষ্টি দিয়ে নয়।  বাহ্যিক বিষয়কে পাশ কাটিয়ে ভেতরের মানুষটি দেখুন।  পোশাক-পরিচ্ছদ, অর্থ প্রতিপত্তি এসব কিছুই নয়।  আসল মানুষটিকে দেখুন।
  21. অন্তরে ‘না’ থাকলে বাইরে ‘হ্যাঁ’ বলবেন না। ইচ্ছার বিরুদ্ধে হ্যাঁ বললে ভেতরে অসন্তোষ থেকেই যাবে।  তখনই হ্যাঁ বলুন যখন আপনি সম্পূর্ণ রাজি।
  22. আপনি যে কৃতজ্ঞ সেটি অপরপক্ষকে বুঝতে দিন।  তাকে বুঝতে দিন যে তার কারণে আপনার জীবনে কতটুকু শান্তি এসেছে।
  23. অন্যকে অপরাধী করবেন না।  এমন কিছু করার চেষ্টা করবেন না, যাতে অন্য ব্যক্তিটি নিজের পছন্দ, সিদ্ধান্ত বা কাজ নিয়ে অপরাধী বা ভুল করেছে মনে করে।
  24. প্রত্যাশার চেয়ে বেশি দেবার চেষ্টা করুন।  কখনও প্রতিশ্রুতি দেবেন না।  তবে উদারভাবে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি দেবার চেষ্টা করবেন।
  25. পারস্পরিকভাবে উন্নয়ন হয় এমন সম্পর্ক গড়ে তুলুন।  কখনও নিয়ন্ত্রণ করবেন না, বা নির্ভরশীল হবেন না।  এমন সম্পর্ক সৃষ্টি করুন, যাতে উভয়পক্ষই পারস্পরিকভাবে উপকৃত এবং উন্নীত হয়।
  26. বৃহৎ হবার চেষ্টা করুন।  অন্যকে ছোট করে নিজে কৃতীত্ব নেবেন না অথবা প্রশংসা করার সময় নিজেকে আটকাবেন না।  যখন স্বীকৃতি দেবার প্রয়োজন হয় এবং যখন সাহায্যের প্রয়োজন হয় তখনই দিন।
  27. বিনয়ী হবার জন্য যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস অর্জন করুন।  নিজের দুর্বলতা নিয়ে রসিকতা করার সামর্থ্য অর্জন করুন এবং ভুলত্রুটি স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকুন।
  28. শেখার জন্য প্রস্তুত থাকুন।  নিজের অতিরিক্ত বুদ্ধি এবং উচ্চতা প্রদর্শন করবেন না।  স্বীকার করুন যে সবখানেই শেখার বিষয় আছে।  এমনকি জুনিয়রদের নিকট থেকেও শেখার আছে।
  29. অন্যের সাথে সম্পৃক্ত হোন, তবে জড়িয়ে যাবেন না।  অন্যের প্রতি আন্তরিক আগ্রহ প্রদর্শন করুন।  ‘আমি’ বলার চেয়ে ‘আপনি/তুমি’ শব্দটি বেশি ব্যবহার করুন।  মনযোগ দিয়ে শুনুন এবং প্রতিক্রিয়া দিন।
  30. উপহার দিন চাহিদা মোতাবেক।  শুধু ইমপ্রেস করার জন্য অথবা আপনার কাছে যা গুরুত্বপূর্ণ সেটি উপহার দেবেন না, অন্যের চাওয়ার বিষয়টিকে বিবেচনায় রাখুন।
  31. নিজেকে সবসময় চ্যালেন্জে রাখুন।  গড়পড়তা মানুষ হিসেবে আটকে থাকবেন না অথবা অতীতের সফলতায় সন্তোষ্টি নেবেন না।  নতুন নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যান এবং নিজের উৎসাহকে প্রয়োগ করুন।
  32. মানসিক চাপ থেকে দূরে থাকুন।  জীবনকে এমন সহজ রাখুন, যেখানে চাপ, হইহুল্লা বা মনযোগ নষ্ট হবার মতো কিছু থাকবে না।  চিন্তা এবং মনযোগ দেবার মতো পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ দিন।
  33. ‘বর্তমান মুহূর্তের’ অপরিমেয় ক্ষমতাকে কাজ লাগান।  এই মুহূর্তটির চেয়ে মূল্যবান আর কোন কিছুই নেই। এই সময়টিকে আপনার শ্রেষ্ট সময় করে নিন।
  34. হারানো বিষয় ফিরে পাবার চেষ্টা করবেন না।  আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরের কোন ব্যক্তি বা পরিস্থিতি নিয়ে চেষ্টা করবেন না।  উপযুক্ত সময় ও সুযোগের অপেক্ষা করুন।
  35. বিবর্তিত হতে থাকুন।  আত্ম-উন্নয়নের পথে চলুন এবং অধিকতর ভালো সুযোগের অপেক্ষায় থাকুন।
  36. মেনে নিন যে আপনি সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারবেন না।  আপনার উন্নয়ন হলে এবং আকর্ষণ বাড়লে, কিছু মানুষ আপনার দিকে মুখ ফেরাবে।  সেই কিছু মানুষগুলোই আপনার জন্য অভাবনীয় সফলতা এনে দেবে।

নিজেকে আকর্ষণীয় এবং গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য আরও কি কোন বিষয় আপনার মনে আছে?  তবে সেটি মন্তব্যের ঘরে লেখে দিতে পারেন।

ব্লগসাইট যেভাবে ‘ব্লু চিপ স্ট্যাটাস’ লাভ করতে পারে

 

একটি ব্লগসাইট কীভাবে ব্লু চিপ স্ট্যাটাস লাভ করতে পারে? তার আগে চলুন ভেবে নেই, সেরকম একটি ব্লগসাইটের কী কী বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। ব্লু চিপ ভূষিত ব্লগসাইট হবে জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত, সর্বমহলের কাছে নির্ভরযোগ্য এবং আস্থাশীল একটি ব্লগিং ও নিউজ প্লাটফরম। সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, সেটি হবে আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং লাভজনক একটি প্রতিষ্ঠান। স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে শুরু হলেও ব্লগসাইটটি ক্রমান্বয়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হবে এবং মানসম্পন্ন লেখার জন্য তারা ব্লগারদেরকে রয়্যালটি দিতেও সক্ষম হবে। সেটি হবে নতুন, পুরাতন এবং পেশাদার ব্লগারদের মিলনমেলা। একই সাথে সংবাদমাধ্যম, তথ্যভাণ্ডার, সাহিত্য সম্ভার এবং রেফারেন্স গাইড।

 

বর্তমান পৃথিবী হলো ‘যা নাই ইন্টারনেটে, তা নাই পৃথিবীতে’ তত্ত্বে বিশ্বাসী। খবরের কাগজের একটি লেখা বা প্রবন্ধ, দিনশেষে পত্রিকাটি ভাঁজ করলেই লেখার মৃত্যু ঘটলো। কিন্তু অনলাইনের একটি লেখা চিরজীবন্ত এবং রেফারেন্স করার জন্য সর্বদা প্রস্তুত। অন্যদিকে, এযুগের মানুষগুলো সবকিছু ইন্টারনেট থেকে পেতে আগ্রহী। নিজের মোবাইলটি খুঁজতে গেলেও তারা গুগল সার্চ দিতে চায়। অতএব, একটি ব্লগসাইটও লাভজনক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হতে পারে। বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে ব্লগ কর্তৃপক্ষের লক্ষ্যমাত্রা এবং ভবিষ্যতকে পরিমাপ করতে পারার সামর্থ্যের ওপর। সুর্নির্দিষ্টভাবে পরিকল্পনা করতে পারলে শুধু ব্লগসাইট যে লাভবান হবে, তা নয়। এখানে যারা প্রদায়ক হিসেবে যারা প্রতিদিন বিভিন্ন ক্যাটেগরিতে লেখে যাচ্ছেন, তারাও লাভবান হতে পারেন।

 

প্রথমত, মনোভাবের পরিবর্তন ঘটাতে হবে। ব্লগসাইট সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতা, বিশ্বাস ও ধারণাকে ঢেলে সাজাতে হবে একবিংশ শতাব্দির বাস্তবতায়। দেশের অন্যান্য অলাভজনক এবং খুঁড়িয়ে চলা ব্লগসাইটগুলো থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে আসতে হবে। ব্লগসাইটকে ১২ মাসের সুনির্দিষ্ট পরিচালনা দিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা যায়, এই তত্ত্বে বিশ্বাস করতে হবে। মনে রাখতে হবে, প্রিন্ট মিডিয়া আজ ক্ষয়িষ্ণু শিল্পে পরিণত হয়েছে এবং অনলাইন মিডিয়া এখন জ্যামিতিকভাবে ক্রমবর্ধমান।

 

দ্বিতীয়ত, ব্লগে হিট বাড়ানোর জন্য চাই সুর্নিদিষ্ট রোডম্যাপ। চাই অ্যালেক্সা রেটিং এর নিয়মিত বিশ্লেষণ। প্রথম লক্ষ্য হবে সকল ভালো মানের ব্লগারকে একত্রিত করা এবং দ্বিতীয় লক্ষ্য হবে সকল প্রকার পাঠকের মনযোগকে নিজেদের দিকে পরিচালিত করা। তৃতীয় লক্ষ্য হবে বিজ্ঞাপন দাতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। এই তিন প্রকার হিট বাড়ানোর জন্য চেষ্টাও হবে তিন প্রকার। মাস এবং কোয়ার্টার ভিত্তিক হিট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা এবং একই সাথে সমধর্মী ব্লগসাইটগুলোর হিট স্ট্যাটাস নজরে রাখা।

 

তৃতীয়ত, একই সাথে আয়ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা করা, কারণ নিজস্ব আয় ব্যতিরেকে কোন ব্লগসাইট মানসম্মতভাবে দীর্ঘদিন পরিচালিত হতে পারে না। আর্থিক লাভের প্রত্যাশা না থাকলে প্রতিষ্ঠানের গুণগত মান বাড়ানোরও কোন প্রেরণা থাকে না। অতএব কোন্ সময় থেকে ব্লগের আয় তার ‘সংস্থাপন ব্যয়ের’ সমান হবে, কোন সময় তা মোট ব্যয়ের চেয়ে বেশি হবে এবং কোন সময় ব্লগসাইটের কর্তৃপক্ষ আয় গুণতে শুরু করবেন, সেই মাইলস্টোনগুলো নির্ধারণ করা। সংস্থাপন ব্যয়ের সাথে একজন নিয়মিত সঞ্চালকের একবছরের ভাতা বিবেচনায় রাখতে হবে।

 

চতুর্থত, দেশের আইন এবং প্রদায়কদের লেখার স্বভাবকে বিবেচনায় রেখে ক. লেখা প্রকাশের নীতিমালা (ব্লগারদের জন্য) এবং খ. সম্পাদকীয় নীতিমালা (সঞ্চালকের জন্য) প্রণয়ন করা। সেই ভিত্তিতে নিয়মিতভাবে ১. ব্লগপোস্ট প্রকাশ করা; ২. লেখা নির্বাচিত করা এবং ৩. লেখা স্টিকি করা।  স্টিকি লেখাকে সাব-এডিটোরিয়ালের মর্যাদা দেওয়া এবং সেভাবেই গুরুত্ব প্রদান করা।

 

ওপরে কেবল একটি অতি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা দেবার চেষ্টা করা হলো। প্রতিষ্ঠান কখনও ‘দেখি কতদূর যায়’ মনোভাব নিয়ে শুরু হয় না। অন্তত ১২ মাসের একটি প্রাক্কলিত খসড়া নিয়ে শুরু হয়।  (সমাপ্ত)

 

 

*********************************

Directly Transferred from Ghuriblog.com

*********************************

 

,    ৯৮ বার পঠিত   সম্পাদনা করুন

12 thoughts on “ব্লগসাইট যেভাবে ‘ব্লু চিপ স্ট্যাটাস’ লাভ করতে পারে”

  1. হামিদ বলেছেন:

    ঘুড়ি ব্লগ ব্লু চিপ স্টাটাস লাভের পথে এগিয়ে যাক সেই প্রত্যাশা রইল ……

    শুভেচ্ছা নিন মইনুল ভাই ৷

  2. আরজু মুন জারিন বলেছেন:

    মনোভাবের পরিবর্তন ঘটাতে হবে। ব্লগসাইট সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতা, বিশ্বাস ও ধারণাকে ঢেলে সাজাতে হবে একবিংশ শতাব্দির বাস্তবতায়। দেশের অন্যান্য অলাভজনক এবং খুঁড়িয়ে চলা ব্লগসাইটগুলো থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে আসতে হবে। ব্লগসাইটকে ১২ মাসের সুনির্দিষ্ট পরিচালনা দিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা যেই, এই তত্ত্বে বিশ্বাস করতে হবে। মনে রাখতে হবে, প্রিন্ট মিডিয়া আজ ক্ষয়িষ্ণু শিল্পে পরিণত হয়েছে এবং অনলাইন মিডিয়া এখন জ্যামিতিকভাবে ক্রমবর্ধমান।…

    বাহঃ তাইতো..বিজ্ঞাপন পাওয়া গেলে আস্তে আস্তে যে কোন ব্লগ লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রুপান্তরীত হতে পারে। তখন ভাল লেখার রয়ালটি দেওয়া যেতে পারে লেখককে।লেখকদের কষ্টের পারিশ্রমিক ও মিলবে। এখন শুধু ব্লগে শুধু কমেন্টস করে প্রেরনা দেওয়া হয়।তাও মাঝে মাঝে ব্লগার সমাবেশ এত কম হয় …কমেন্টস ও খূঁজে পাওয়া যায়না।এ যদি হত নিঃসন্দেহে ব্লগার পাঠক সমাবেশ অনেক বেড়ে যেত ।ব্লগ হত অনেক প্রানবন্ত ..অনেক জনপ্রিয়। চলন্তিকার আনোয়ারুল হক খান কিন্তু চলন্তিকাকে এভাবে চালাচ্ছেন। যার লেখা ষ্টিকি হয় তাকে ,সেরা প্রদায়কদের পুরস্কার এর ব্যাবস্থা করছেন।তা কিন্তু তিনি নিজের পকেট থেকে করছেন । পত্রিকা প্রকাশ করছেন নিজের খরচে।আমি ,কাশেম ভাই টাকা অফার করা স্বত্বেও তিনি নেননি।উনি ও চেষ্টা করছেন বিজ্ঞাপন বাড়াতে।

    খুব ভাল আইডিয়া মইনুল ভাই।ঘুড়িতে তো বরং চলন্তিকার তুলনায় বড় লেখকরা লিখছেন। কতৃপক্ষ অবশ্যই এ নিয়ে ভাবতে পারেন কিভাবে আস্তে আস্তে ব্যাবসায়িক দিকে নেওয়া যায়।এ তে দোষের কিছু নাই।কবি সাহিত্যকরা ও বাস্তব পৃথিবীর মানুষ।তাদের কে ও ডাল চাল কিনতে হয়।:P..

    আর ও লিখতে ইচ্ছে হচ্ছে …সময় কম..আবার আসছি পরে।শুভকামনা এখনকার জন্য।

  3. আরজু মুন জারিন বলেছেন:

    ব্লগে হিট বাড়ানোর জন্য চাই সুর্নিদিষ্ট রোডম্যাপ। চাই অ্যালেক্স রেটিং এর নিয়মিত বিশ্লেষণ। প্রথম লক্ষ্য হবে সকল ভালো মানের ব্লগারকে একত্রিত করা এবং দ্বিতীয় লক্ষ্য হবে সকল প্রকার পাঠকের মনযোগকে নিজেদের দিকে পরিচালিত করা। তৃতীয় লক্ষ্য হবে বিজ্ঞাপন দাতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। এই তিন প্রকার হিট বাড়ানোর জন্য চেষ্টাও হবে তিন প্রকার। মাস এবং কোয়ার্টার ভিত্তিক হিট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা এবং একই সাথে সমধর্মী ব্লগসাইটগুলোর হিট স্ট্যাটাস নজরে রাখা…*****************

    আমি ও আশা করছি ঘুড়ি ব্লগ ব্লু চিপ ষ্ট্যাটাস অর্জনে এগিয়ে যাবে।অনেক ধন্যবাদ মইনুল ভাই ব্লগ সম্পর্কে পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গির জন্য। আপনার জন্য অনেক শুভকামনা ঘুড়ি ব্লগের সাথে সাথে। আপনরা দুজনে আস্তে আস্তে ব্লু আইকনে পরিনত হন এই কামনা রইল।

  4. এম এ কাশেম বলেছেন:

    বর্তমান পৃথিবী হলো ‘যা নাই ইন্টারনেটে, তা নাই পৃথিবীতে’ তত্ত্বে বিশ্বাসী। খবরের কাগজের একটি লেখা বা প্রবন্ধ, দিনশেষে পত্রিকাটি ভাঁজ করলেই লেখার মৃত্যু ঘটলো। কিন্তু অনলাইনের একটি লেখা চিরজীবন্ত এবং রেফারেন্স করার জন্য সর্বদা প্রস্তুত। অন্যদিকে, এযুগের মানুষগুলো সবকিছু ইন্টারনেট থেকে পেতে আগ্রহী। নিজের মোবাইলটি খুঁজতে গেলেও তারা গুগল সার্চ দিতে চায়। অতএব, একটি ব্লগসাইটও লাভজনক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হতে পারে। বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে ব্লগ কর্তৃপক্ষের লক্ষ্যমাত্রা এবং ভবিষ্যতকে পরিমাপ করতে পারার সামর্থ্যের ওপর। সুর্নির্দিষ্টভাবে পরিকল্পনা করতে পারলে শুধু ব্লগসাইট যে লাভবান হবে, তা নয়। এখানে যারা প্রদায়ক হিসেবে যারা প্রতিদিন বিভিন্ন ক্যাটেগরিতে লেখে যাচ্ছেন, তারাও লাভবান হতে পারেন।

    চমৎকার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষন

    শুভেচ্ছা সতত।

  5. sabuj ahmed বলেছেন:

    দারুণ প্রবন্ধ দারুণ

  6. নূর মোহাম্মদ নূরু বলেছেন:

    আগের মতোই চমৎকার তথ্যবহুল সিরিজ
    ধন্যবাদ মইনুল ভাই ব্লুচিপস সম্পর্কে
    অনেক কিছু জানার সুযোগ করে
    দেবার জন্য।

  7. কামাল উদ্দিন বলেছেন:

    খুবই মূল্যবান কথাগুলো বলেছেন, এবার কর্তৃপক্ষ যদি এসব বিবেচনায় নেয় তাহলে ঘুড়ি ব্লগই হতে পারে সেরা।

  8. ১. নিজের মোবাইলটি খুঁজতে গেলেও তারা গুগল সার্চ দিতে চায়।
    ২. ‘যা নাই ইন্টারনেটে, তা নাই পৃথিবীতে’

    একটি ভাল ব্লগ প্লাটফর্মের আশায় আমরা।

  9. সোহেল আহমেদ বলেছেন:

    জানার নেই শেষ
    জানার জন্য বড়োই সুন্দর
    আহা আহা বেশ।

    শুভেচ্ছা মইনুল ভাই

  10. রব্বানী চৌধুরী বলেছেন:

    ” একটি ব্লগসাইট কীভাবে ব্লু চিপ স্ট্যাটাস লাভ করতে পারে? তার আগে চলুন ভেবে নেই, সেরকম একটি ব্লগসাইটের কী কী বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। ব্লু চিপ ভূষিত ব্লগসাইট হবে জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত, সর্বমহলের কাছে নির্ভরযোগ্য এবং আস্থাশীল একটি ব্লগিং ও নিউজ প্লাটফরম। সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, সেটি হবে আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং লাভজনক একটি প্রতিষ্ঠান। স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে শুরু হলেও ব্লগসাইটটি ক্রমান্বয়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হবে এবং মানসম্পন্ন লেখার জন্য তারা ব্লগারদেরকে রয়্যালটি দিতেও সক্ষম হবে। সেটি হবে নতুন, পুরাতন এবং পেশাদার ব্লগারদের মিলনমেলা। একই সাথে সংবাদমাধ্যম, তথ্যভাণ্ডার, সাহিত্য সম্ভার এবং রেফারেন্স গাইড।”

    বৈশিষ্টগুলি পড়ে মনে হচ্ছে এর সবই থাকছে আমাদের ঘুড়িতে, প্রবন্ধটি তবে বাঁধাই করে রাখা হলো। জীবনের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত হোক , প্রযুক্তির এই সংযোজন শেয়ার করার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা জানবেন মইনুল ভাই।

  11. রুকসানা হক বলেছেন:

    // বর্তমান পৃথিবী হলো ‘যা নাই ইন্টারনেটে, তা নাই পৃথিবীতে’ তত্ত্বে বিশ্বাসী। খবরের কাগজের একটি লেখা বা প্রবন্ধ, দিনশেষে পত্রিকাটি ভাঁজ করলেই লেখার মৃত্যু ঘটলো। কিন্তু অনলাইনের একটি লেখা চিরজীবন্ত এবং রেফারেন্স করার জন্য সর্বদা প্রস্তুত। অন্যদিকে, এযুগের মানুষগুলো সবকিছু ইন্টারনেট থেকে পেতে আগ্রহী। নিজের মোবাইলটি খুঁজতে গেলেও তারা গুগল সার্চ দিতে চায়। অতএব, একটি ব্লগসাইটও লাভজনক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হতে পারে। বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে ব্লগ কর্তৃপক্ষের লক্ষ্যমাত্রা এবং ভবিষ্যতকে পরিমাপ করতে পারার সামর্থ্যের ওপর। সুর্নির্দিষ্টভাবে পরিকল্পনা করতে পারলে শুধু ব্লগসাইট যে লাভবান হবে, তা নয়। এখানে যারা প্রদায়ক হিসেবে যারা প্রতিদিন বিভিন্ন ক্যাটেগরিতে লেখে যাচ্ছেন, তারাও লাভবান হতে পারেন। //

    খুবই মুল্যবান একটি লিখা । শুভকামনা ।

  12. মাহমুদ০০৭ বলেছেন:

    আপনার সাথ একমত ।
    আর আমার মতে ব্লগ ভালভাবে চালানো কোন ব্যাপার না ।সবাই ভাল কন্টেন্ট পড়তে চায়।
    প্রয়োজন খোলামন আর সদিচ্ছা র। ইউজাররা যাতে সহজে স্বচ্ছন্দে
    ব্লগসাইট ব্যবহার করতে পারে তার ব্যবস্থা রাখা।

    ঘুড়ি ব্লগ এখনো ইউজার ফ্রেন্ডলি হয়নি । তাই এখানে প্রাণপণে চাইলে ও মন বসাতে পারছি না।
    আশা করি সঞ্চালকরা এসব বিষয় বিবেচনায় রাখবেন ।

    বাংলা ভাষার ভূগোল ও ভোক্তা অনেক বিস্তৃত । এর ভেতরেও কেউ ব্যবসা করতে না জানলে এটা তার ব্যর্থতা ।
    আসলে চলছে চলুক মানসিকতা দিয়ে বেশিদুর আগানো যায় না । ব্লগ এর ব্যাপারে এখনো সেই
    মেন্টালিটি র প্রয়োগ দেখছি ।

    ভাল থাকবেন মইনুল ভাই । ব্লগ সাইট ব্লু চিপস হোক । ব্লগীয় বাজার বুল মার্কেটে পরিণত হোক।;)

‘ব্লু চিপ’ কী – এত কেন আলোচনা?

 

1.

‘ব্লু চিপ’ জিনিসটা কী, এতো কেন আলোচনা?  কেন প্রতিটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ব্লু চিপ স্ট্যাটাস পেতে চায়।  কেন শেয়ার মার্কেটে একটি ব্লু চিপ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের এত কদর? ব্লু চিপ মানবসম্পদ ব্যবস্থানায় কীভাবে একটি প্রতিষ্ঠান সকল কর্মীর জন্য একটি স্থিতিশীল সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করতে পারে? কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কেন ব্লু চিপ অর্জনের পেছনে সমস্ত অর্থসম্পদ এবং মানবসম্পদকে ঢেলি দিচ্ছে? ব্লু চিপ বিষয়টি আসলে কী। কেন এটি এত আরাধ্য, সকলের কাছে?

 

মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে বারবার চোখের সামনে ভেসে ওঠলো ব্লু চিপের নীল আভা। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য পরামর্শ পেতে চাইলেও চোখের সামনে ভেসে ওঠে ব্লু চিপ। সকলকিছুর উত্তম আদর্শ দিয়ে তৈরি ব্লু চিপ আমাকে আকৃষ্ট করতে থাকলো বিগত কয়েক মাস ধরে। তাতে আমি আকৃষ্ট হয়ে সবকিছু ভুলে ব্ল চিপের পেছনে ধাওয়া শুরু করলাম। ব্লু চিপ যেন এক মায়া হরিণ, যত আগাই ততই সে পিছিয়ে গিয়ে আমাকে আরও আকৃষ্ট করে। আমি আরও এগিয়ে যাই।

 

ব্লু চিপ যেন এক গুপ্ত ধন, যার পেছনে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান হুমড়ি খেয়ে লেগে আছে গোপনে! কিন্তু কেউ তা প্রকাশ করছে না।  কেউ বলছেও না কীভাবে কোন পথে তারা চেষ্টা করছে অথবা আদৌ চেষ্টা করছে কিনা। তবে প্রতিটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গোপন লক্ষ্য হলো একটি ব্লু চিপ।  পোকার খেলার নীল চাকার (ব্লু ডিস্ক) মতো এটি প্রয়োজনীয় এবং অজেয় হয়ে ওঠে সকল দুর্যোগে। দাবা খেলার মন্ত্রীর (কুইন) মতো এটি সকল পরিস্থিতিতে সক্ষম এবং নির্ভরযোগ্য। বিশ্বমন্দার আর রাজনৈতিক অস্থিরতার এই পৃথিবীতে কে না চায় একটি ‘ব্লু চিপ খচিত’ প্রতিষ্ঠান? এই পরিস্থিতিতে আমার কৌতূহল হলো, একটি ব্লগসাইট যখন ‘ব্লু চিপ স্ট্যাটাস’ লাভ করে, তখন সেটি কী কী সুবিধা পায়? প্রশ্নগুলো এভাবে বেড়েই চললো…

 

2.

এমন কি কখনও দেখেছেন যে, পণ্যের দাম যতই বাড়ে মানুষের চাহিদা ততই বেড়ে যায়?  অবশ্য যোগান কম থাকলে যে তার তুলনায় চাহিদা বেশি হবে, সেটি তো আমরা কবেই শিখেছি। এখানে বিশেষ কোন বিজ্ঞান নেই। অর্থাৎ সাপ্লাই নেই, চাহিদা দ্বিগুণ, মূল্য বেশি। এরকম পরিস্থিতির সাথে আমরা মোটামুটি পরিচিত। কিন্তু দাম বাড়লেও যে চাহিদা স্থিতিশীল থাকে অথবা বহুগুণে বাড়তে থাকে, সেরকম কোন পণ্যের নাম কি আপনার মনে পড়ে? হয়তো মনে পড়ে।

 

সেবা ও পণ্যের ‘গুণগত মান এবং দাম’ দিয়ে কোন প্রতিষ্ঠান এমন একটি ভোক্তা সমাজ গড়ে তুলেছে যে, তারা কোন অবস্থাতেই তাদের মত পাল্টাবে না। প্রয়োজনে অর্ডার দিয়ে দু’মাস অপেক্ষা করবে, তবু তার নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের জিনিসটিই চাই। আমাদের দেশে ‘বাটা’ জুতার সেরকম একটি মার্কেট গড়ে ওঠেছিল, এখনও তার কিছু চিহ্ন টিকে আছে।

 

‘…দ্য সেইম স্কয়্যার খোঅলিটি’ বলে একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান কলার ঝাঁকিয়ে বলে যে, পণ্যের গুণগত মান আগের মতোই আছে। অর্থাৎ তারা জানে যে, তাদের পণ্যের গুণ এবং বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে ইতিমধ্যেই ভোক্তারা অবগত এবং আস্থাশীল। এইরকম প্রতিষ্ঠানগুলোর না আছে স্টক মার্কেটে ধ্বংস হবার ভয়, না আছে রাজনৈতিক অস্থিরতার ভয়। বিধ্বংসী সুনামিতে তারা একটু টলতে পারে, কিন্তু পড়ে যাবার নয়।

 

এসবই হলো একটি ব্লু চিপ প্রতিষ্ঠানের গুণাগুণ।

 

সেই ১৯২৩ অথবা ১৯২৪ সালের কথা। জনৈক ওলিভার গিনগোল্ড চাকরি করতেন ডাউ জোনস নামের একটি মার্কিন প্রকাশনা ও আর্থিক তথ্য ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানে। প্রতিষ্ঠানটি তখন একটি পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দীর্ঘস্থায়ি সুনামের অধিকারী। যা হোক, মেরিল লিন্চ নামের একটি স্টক এজেন্সিতে ওলিভার গিনগোল্ড বসে আছেন। তিনি দেখতে পেলেন যে, কোন কোন শেয়ার ২০০ অথবা ২৫০ ডলারেরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। অথচ দাম বেশি থাকলেও এর প্রতি ক্রেতাদের চাহিদা কমছে না। বিষয়টি দেখে তিনি যে বাণী দেন, সেটি থেকেই ব্লু চিপ শব্দটি ‘উৎপন্ন’ হয়। তিনি বললেন, “ডাউ জোনসে ফিরে গিয়ে আমি এই ‘ব্লু চিপ’ কোম্পানিগুলো’ নিয়ে লেখতে চাই”।

 

ব্লু চিপ শব্দটি কোথা থেকে আসলো?  পোকার খেলার প্রধান চাকাগুলো হলো সাদা, লাল এবং নীল। এদের মধ্যে নীল চাকার মূল্যমান সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ একটি হোয়াইট চিপের মূল্য যদি হয় ১ ডলার, তবে রেড চিপের মূল্য হবে ৫ ডলাল। সেখানে ব্লু চিপের মূল্য হবে ২৫ ডলার। ঠিক এই ব্লু চিপকে লক্ষ্য করে মিস্টার ওলিভার গিনগোল্ড দামি কোম্পানিগুলোর নাম নিয়েছিলেন।

 

ব্লু চিপ হল জাতীয়ভাবে স্বীকৃত, সুপ্রতিষ্ঠিত এবং আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান।  ব্লু চিপ প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত উচ্চমানের সেবা বা পণ্য উচ্চদামে বিক্রি করে, যা ব্যাপকভাবে জনসমাদৃত। এসব কোম্পানি সকল পরিস্থিতিতে টেকসই। একটি বৈরি আর্থিক পরিবেশেও তারা লাভজনকভাবে ব্যবসায় পরিচালনায় সক্ষম। এসবই তারা করতে পারে দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা, নির্ভরযোগ্যতা এবং ক্রেতাসমাজে আস্থাশীলতার কারণে।

 

একই অর্থ নিয়ে ব্লু চিপ শেয়ারকেও নিরাপদ শেয়ার মনে করা হয়। শেয়ার মার্কেট যতই ‘ডাউন’ থাকুক, এই শেয়ারের ধ্বংস নেই।  এর কারণ হলো, অর্থ বাজারে ব্লু চিপ স্ট্যাটাসযুক্ত প্রতিষ্ঠানের রয়েছে দীর্ঘস্থায়ি নির্ভরযোগ্যতা।  বিনিয়োগকারী ব্লু চিপ শেয়ার কিনে যেমন নিজেদের নামকে উচ্চে তুলতে পারে, তেমনি উচ্চে তুলতে পারে তাদের আর্থিক অবস্থান।

 

৩টি বিশ্ববিখ্যাত আর্থিক প্রতিষ্ঠান যাদেরকে ব্লু চিপ কোম্পানি বলে সমীহ করা হয়:

১.  ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম /BP

২.  হংকং সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন / HSBC

৩.  ব্রিটিশ অ্যামেরিকান টো্ব্যাকো