প্রকল্প বাস্তবায়নে যোগাযোগের দক্ষতা কতটুকু প্রাসঙ্গিক?

একটি প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের জন্য যোগাযোগের দক্ষতা কতটুকু প্রাসঙ্গিক? প্রথাগতভাবে আমরা জানি জনবল, অর্থ এবং অবকাঠামো নিশ্চিত হয়ে গেলেই সংগঠন করা যায়। এরপরও কি যোগাযোগ দক্ষতার প্রয়োজন আছে?

এটি বুঝতে গেলে আমাদের দেখতে হবে কেন প্রকল্পগুলো ব্যর্থ হয়। একটি প্রকল্প ব্যর্থ, বিলম্বিত, ব্যয়বহুল (বাজেটের তুলনায়) এবং স্থগিত হয় কেন? জনবল, অর্থ এবং অবকাঠামো থাকলেই কি প্রকল্পের সফলতা নিশ্চিত হয়?

গবেষণায় দেখা যায় যে, প্রতি ৫টি প্রকল্পের মধ্যে ১টি প্রকল্প ব্যর্থ হয় কেবল যথাযথ যোগাযোগের অভাবে। একটি প্রকল্পের কর্মী এবং দাতা থেকে শুরু করে সাপ্লাইয়ার পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের যোগাযোগ প্রয়োজন হয়। প্রকল্পের কর্মীকে বলা যায় প্রকল্পের প্রাণশক্তি। তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রজেক্ট টিমের মধ্যকার যোগাযোগ। অফিস প্রক্রিয়ায় আর দলিল-দস্তাবেজের নিচে চাপা পড়ে থাকে প্রকল্পের দৈনন্দিন কাজ। সভা, কর্মশালা, অনুমোদন, সিদ্ধান্তগ্রহণ ইত্যাদি বিষয় প্রকল্পের ডেডলাইন অর্জনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

দেশের অফিস সংস্কৃতি উপনিবেশ আমলের সর্বশেষ ঐতিহ্যটুকু ধরে রেখেছে, যা বিলেতেও এখন আর হয়তো নেই। প্রথাগত যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকটাই ‘টপ-ডাউন’ বা জৈষ্ঠতা-নির্ভর, যা অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনার পরিপন্থী। তাতে প্রকল্পের কর্মীরা যথাযথ অংশগ্রহণ করতে পারেন না। সেভাবে অবদানও রাখতে পারেন না। মাইক্রো-ম্যানেজমেন্ট-এর কারণে ব্যবস্থাপক-নির্ভর প্রকল্পগুলো অধিকাংশই বিপদগামী হয়। উৎপাদনমুখীতা সেখানে গুরুত্ব পায় না, আনুষ্ঠানিকতার ছড়াছড়ি।

প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তৃতি অফিস ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। এখন সময় গতিশীল যোগাযোগের। ব্যাংকিং থেকে সফটওয়্যার, করপোরেট থেকে উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান – সবখানে এসেছে ফলাফলমুখী যোগাযোগ। ফলে প্রথাগত যোগাযোগ ব্যবস্থা কঠিন পরীক্ষায় পড়েছে। গতিশীল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে প্রযুক্তির ভাষায় বলা হয় অ্যাজাল কমিউনিকেশন

২।    অ্যাজাল কমিউনিকেশন কী?

▶প্রকল্পমুখী প্রতিষ্ঠান থেকে অ্যাজাল কমিউনিকেশনের উৎপত্তি: অ্যাজাল কমিউনিকেশনের জন্ম হয়েছে উৎপাদনমুখীতাকে অগ্রাধিকার দেবার জন্য। প্রক্রিয়া নয় ফলাফলই এখানে মুখ্য। আনুষ্ঠানিকতা নয়, তথ্যের আদানপ্রদানই অগ্রাধিকার পায়।

উৎপাদন, মুনাফা, ডেডলাইন মোতাবেক মানসম্পন্ন কাজ সম্পন্ন করা যেখানে অগ্রাধিকার পায়, সেখানে সিনিয়র-জুনিয়র পার্থক্য ততটা গুরুত্ব বহন করে না।

▶প্রচলিত যোগাযোগ ব্যবস্থার বিপরীত: প্রচলিত যোগাযোগ ব্যবস্থার বিপরীত অবস্থাকে অ্যাজাল কমিউনিকেশন বলা যায়। এই প্রক্রিয়ায় মানবিক যোগাযোগ বা সম্পর্ককেন্দ্রিক যোগাযোগ গুরুত্ব পায়। অর্থাৎ সম্পর্ক এবং কাজ পাশাপাশি চলে।

আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের চেয়ে, মুখোমুখি বা ব্যক্তিগত পর্যায়ের যোগাযোগ এখানে প্রধান বিষয়। প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এবং বাইরে এই নীতি অনুসরণ করা হয়।

কাগজ বা প্রমাণভিত্তিক যোগাযোগ প্রায় করা হয় না, যদি না ভবিষ্যৎ যোগাযোগ, অডিট অথবা আইনী বিষয় জড়িত না থাকে।

▶অ্যাজাল শব্দের ব্যবচ্ছেদ: আভিধানিক অর্থ: দ্রুত এবং সাবলীল; ক্ষীপ্র; চটপটে; গতিশীল।বাংলায় ‘গতিশীল’ বলা গেলেও সেটি পূর্ণ তাৎপর্য বহন করে না। টেলিকমিউকেশন, সফটওয়্যার কোম্পানি এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার চর্চা থেকে অ্যাজাল কমিউনিকেশনের উৎপত্তি। অ্যাজাইল, কিন্তু ’অ্যা’-এর ওপর চাপ। যেসব সংগঠন অ্যাজাল, বলা যায়, তাদের আজিলিটি/ক্ষীপ্রতা আছে।

 

৩।    অ্যাজাল কমিউনিকেশন থেকে কী পাওয়া যায়?

▶সহজ ব্যবস্থাপনা, গতিশীল টিম: সরলতা বা সিমপ্লিসিটি অগ্রাধিকার। সর্বনিম্ন রিসোর্স নিয়ে সর্বোচ্চ ফলাফল। ছোট ছোট ‘ক্রস-ফাংশনাল’ টিম। বড় কাজগুলোকে ছোট অংশে ভাগ করে কর্মীর জন্য সহজ করে দেওয়া হয়। টিম ম্যানেজারের প্রধান কাজ থাকে, ’ব্যাকলগ’ সম্পর্কে সচেতন থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিমকে কাজে নিযুক্ত করা।

▶প্রক্রিয়া বা আনুষ্ঠানিকতার উর্ধ্বে ব্যক্তি এবং পারস্পরিকতা: অপ্রয়োজনীয়ডকুমেন্টেশন সৃষ্টি না করে মুখোমুখি সম্পর্ককে যোগাযোগের সর্বোত্তম মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হয়। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সহযোগিতা, নিরন্তর শেখা ও সমন্বয়সাধণের মধ্যে টিমের কাজ এগিয়ে চলে।

▶ভুল, সীমাবদ্ধতা, বিলম্ব, অনিশ্চয়তার উন্মুক্ত সমাধান: এখানে ভুল গোপনে থাকে না, সীমাবদ্ধতা ব্যক্তিকে সংকুচিত করে না, বিলম্ব অপ্রত্যাশিতভাবে আসে না এবং অনিশ্চয়তাকে সুনিশ্চিত মনে করা হয়। ভুল সার্বজনীন এবং স্বাভাবিক, কিন্তু সেটি টিমের অর্জনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে না। যথাশীঘ্র এবং তাৎক্ষণিকভাবে ভুল সনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অ্যাজাল অফিসে বিলম্ব এবং অনিশ্চয়তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত – কর্মী জানে কোথায় এবং কখন।

 

৯।    অ্যাজাল প্রিন্সিপাল – ১২টি অ্যাজাল নীতিমালা

ক) ক্রেতার সন্তুষ্টিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ১)  ত্বরিত এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, যেন ক্রেতা/পৃষ্ঠপোষকের সন্তুষ্টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়
২)  ক্রেতা/পৃষ্ঠপোষকের কাছ থেকে প্রতিযোগিতাপূর্ণ সুবিধা নেবার স্বার্থে সকল পরিবর্তন/সংস্কারকে স্বাগত জানায়
৩)  স্বল্প সময়ের বিরতিতে মধ্যবর্তী এবং চূড়ান্ত কাজের ফলাফল হালনাগাদ করে
৪)  নিয়মিতভাবে কর্মী এবং পৃষ্ঠপোষক একসাথে প্রকল্পের বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে
খ) স্বপ্রণোদিত প্রজেক্ট টিম ৫)  কর্মোদ্দীপ্ত ব্যক্তিদের নিয়ে প্রজেক্ট টিম গঠিত হয়, তাদেরকে প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও সহযোগিতা দেওয়া হয় এবং কাজটি সম্পন্ন করার জন্য তারা আস্থাভাজন হয়
৬)  মুখোমুখি কথোপকথনকে তথ্য আদানপ্রদানের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত মাধ্যম মনে করা হয় (যা আনুষ্ঠানিক নয়)
৭)  সফলতা পরিমাপ করার জন্য ফলাফলকেই সূচক হিসেবে গণ্য করা হয়, ‘প্রক্রিয়া’ নয় (আমাদের ক্ষেত্রে যা পারফর্মেন্স ইন্ডিকেটর)
৮)  অ্যাজাইল প্রক্রিয়ায় টেকসই উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, যেখানে প্রকল্পের কর্মী, পৃষ্ঠপোষক এবং অংশগ্রহণকারীরা একসময় বিচ্ছিন্নভাবেও একই ফল দেয়
গ) অন্তহীন উন্নয়ন ৯)  গতিশীলতা বাড়াবার জন্য পেশাদারিত্ব, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং উন্নত পরিকল্পনার দিকে অব্যাহত মনোযোগ থাকে
১০) সহজতা বা সহজভাবে কাজটি সম্পন্ন করার দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, অর্থাৎ সর্বনিম্ন ব্যয়ে সর্বোচ্চ ফলাফল
১১)  স্বপ্রণোদিত ব্যক্তিবর্গের সমন্বিত উদ্যোগের ফলে উৎকৃষ্ট এবং সুদূরপ্রসারী প্রকল্প সম্পন্ন হয়
১২)  অধিকতর কার্যকর এবং ফলবাহী হবার জন্য প্রকল্পের কর্মীরা নিয়মিত একত্রিত হয়ে নিজেদের আচরণ ও কর্মপ্রক্রিয়াকে মূল্যায়ন করে গতিশীল ও পরিশুদ্ধ করে তোলে
Contextualized to Vernacular Project Management, focusing on Development Projects

 

Graph collected from open source

এপ্রসঙ্গে পূর্বের একটি পোস্ট: ১৩ উপায়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকে নিয়ে আসুন হাতের মুঠোয়

 

পরবর্তি পর্ব: অ্যাজাল কমিউনিকেশন-এর সাথে প্রচলিত যোগাযোগ পদ্ধতির পার্থক্য

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s