বাংলা ব্লগ ব্লগার ব্লগসাইট এবং সঞ্চালনা

ব্লগিং নিয়ে আমার কিছু প্যাচাল

 

নানাবিধ কারণে ব্লগে নিয়মিত লেখা হচ্ছে না। কিন্তু সময় পেলেই ব্লগ পড়ি এবং পড়লে মন্তব্য দিই। এটি করতে এখনও ভালো লাগে। এদিকে অনেক নতুন ব্লগারের আগমন হয়েছে। তার চেয়েও বেশি সংখ্যক পুরাতন ব্লগার আজ এখানে নেই। তবে কেউ কেউ পাসওয়ার্ড সমস্যার কারণে নতুন আইডি নিয়ে নতুনভাবে ফিরে এসেছেন। কেউবা ইমেইলে যোগাযোগ করে পাসওয়ার্ড পুনরুদ্ধার করে আগের নামেই ফিরে এসেছেন। ফেবুতে নিজেদের ফিরে আসার সংবাদ জানাচ্ছেন, বেশ ঘটা করে। ব্লগে ফিরে আসার চলমান প্রবণতাটি বেশ ভালো লাগছে।

কিন্তু তাতে কি ব্লগের স্থায়ি কোন সমাধান হবে? একসময় অসংখ্য বাংলা ব্লগসাইট ছিল, এখন তো নেই! তবু কেন এখানে আগের মতো পাঠক/ব্লগার নেই? এভাবেই কি শেষ হবে বাংলা ব্লগের ইতিহাস?

সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বজ্ঞান এবং জবাবদিহিতা না থাকলে বাংলা ব্লগের গৌরব ও অহংকার একসময় ইতিহাস হয়ে যাবে।

ব্লগের লেখা প্রসঙ্গে:

আমার অনেক প্রতিভাবান বন্ধুবান্ধব আছেন যারা ভালো লেখেন, ভালো চিন্তা করেন এবং ভালো বিশ্লেষণ করতে পারেন। তাদের লেখা পড়ে এবং বুদ্ধিদীপ্ত পোস্টগুলো দেখে অনেক সময় মজা পাই, উচ্ছ্বসিত হই।

সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে তাদের চিন্তাচেতনার বিস্তৃতি দরকার। কিন্তু আমরা যখন ব্যক্তি বা দল বা একটি নির্দিষ্ট মতবাদকে কেন্দ্র করে কথা বলি, তখন ‘বিষয়’ গুরুত্ব পায় না – ব্যক্তি বা মতবাদই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তখন নির্দিষ্ট মতবাদে সংশ্লিষ্ট মানুষ ছাড়া অন্যরা তাতে মনোযোগ দেয় না। অতিমাত্রায় সাবজেক্টিভ না হয়ে তারা যদি আরেকটু অবজেক্টিভ হতেন, ব্যক্তি বা দলকেন্দ্রিক না হয়ে তারা যদি আরেকটু বিষয়কেন্দ্রিক হতেন, তবে আরও বেশি মানুষকে তারা নিজের কথা শুনাতে পারতেন।

আমাদের সমাজে এত বিচ্ছিন্নতা এত মেরুকরণ আগে কখনও দেখি নি। সবাই তাদের মতো করে ঘটনাকে ব্যাখ্যা করে। কেউ বক্তার অবস্থান থেকে বিষয়কে উপলব্ধি করতে চায় না। এমন মানুষ খুব কমই আছেন, যাদেরকে বিনাবাক্যে বিনাশর্তে সবাই সম্মান জানায়। অবিসংবাদিত কিংবদন্তির অস্তিত্ব এসমাজে বিরল হয়ে গেছে।

ব্লগের সঞ্চালনা প্রসঙ্গে

সরকার আজকাল সঞ্চয়কে চরমভাবে নিরুৎসাহিত করছে। সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক সেভিংস বা এফডিআর ইত্যাদিতে সুদ কমিয়ে দিচ্ছে। ফিক্সট ডিপোজিটে সুদের হার মাত্র ৩ শতাংশ – ভাবা যায়? সঞ্চয়কে নিয়ন্ত্রণ করার কারণটি খুব সহজে অনুমান করা যায়। সরকার অর্থের সঞ্চালন চায়। উন্নত অর্থনীতির ভিত্তি ‘অর্থের সঞ্চয়’ নয় – অর্থের সঞ্চালন। তরল অর্থের নিয়মিত চলাচল।

মানুষের স্বাভাবিক সুস্থতার রাসায়নিক পরিমাপক হলো, তার রক্ত সঞ্চালনা বা ব্লাড সার্কুলেশন। এটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেকোন কারণে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে ওঠে। নিস্তেজ হয়ে মৃত্যুর দিকে নুইয়ে পড়ে। রক্ত সঞ্চালনা স্বাভাবিক রাখার জন্য মানুষ কতকিছু করে, কতকিছুই খায়! একই স্থানে একই পোস্চারে বসে থাকলে শরীরের নির্দিষ্ট অংশটি অবশ হয়ে আসে। এর কারণ হলো, রক্ত সঞ্চালনা বন্ধ হয়ে আসা।

একই কথা বলা যায় ব্লগের সঞ্চালনা নিয়ে। নিয়মিত সঞ্চালনা না থাকলে, শুধু পোস্টদাতাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় এর পাঠক – যারা সবাই ব্লগার না। দৈনিক এবং মাসিক হিট কমে যাবার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্লগ। মানসম্মত লেখাকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে নিয়ে আসা এবং অনাকাঙিক্ষত ঘটনা থেকে ব্লগকে নিরাপদে রাখাই ব্লগের সঞ্চালকের প্রধান কাজ। ব্লগ কার সহায়তায় চলে, ব্লগাররা টাকা পায় কিনা – ওসব শর্তে বাংলা ব্লগ শুরু হয় নি। ব্লগাররা টাকা পাবে এআশায় কেউ এখানে আসে নি।

সঞ্চালনা সম্পর্কে কিছু প্রস্তাব

সঞ্চালক নামটির সাথেই ‘গতিশীলতার বিষয়টি’ জড়িয়ে আছে। একটি পাবলিক ব্লগসাইটের স্বাভাবিক তৎপরতা ধরে রাখে এর নিয়মিত পরিবর্তন অর্থাৎ নিয়মিত সঞ্চালনা।

•সঞ্চালনা হতে পারে যান্ত্রিক
•সঞ্চালনা হতে পারে মানুষ পরিচালিত

অটোমেটেড মডারেশন দ্বারা ব্লগারদের পোস্টগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে, অনেক সময় আপত্তিকর লেখা প্রকাশ হয়ে যেতে পারে। বেশি বিপদজনক কিছু হয়ে গেলে, দিনের/সপ্তাহের একটি সময় হিউম্যান মডারেটর এসে শুধু চেক করে যেতে পারেন। সাধারণত, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে আপত্তিকর পোস্ট বন্ধ রাখার জন্য কিছু ‘প্রতীকী শব্দ’ বা বাক্যাংশ তালিকাভুক্ত করে রাখা যায়। একইভাবে তালিকাভুক্ত করে রাখা যায় ইতিবাচক ও গ্রহণযোগ্য শব্দ বা বাক্যাংশকে। যেসব পোস্টে শব্দগুলো থাকবে, সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে আটকে থাকবে অথবা শর্তানুযায়ী নির্বাচিত কলামে যাবে। এক্ষেত্রেও যদি কোন ভালো পোস্ট আটকে থাকে অথবা খারাপ পোস্ট প্রকাশিত হয়ে যায়, নির্দিষ্ট সময়ের হিউম্যান মডারেটর এসে সেগুলোকে সুধরে দিতে পারেন। নিয়মিত আপগ্রেড করতে থাকলে সিস্টেম বুদ্ধিমান হয়ে ওঠে: ভুলগুলো এক সময় কমে আসে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে স্বয়ংক্রিয় সঞ্চালনাকে গ্রহণ করা যায়, যদিও এতে এককালীণ কিছু খরচ জড়িত আছে।

হিউম্যান মডারেশন কঠিন, অনিয়মিত, ধারাবাহিকতাহীন এবং ত্রুটিযুক্ত। মানুষ দ্বারা পরিচালিত কোন কিছুই ত্রুটিমুক্ত এবং নিয়মিত হতে পারে না। ‘মানুষ মাত্রই ভুল’ কথাটি দিয়েই বুঝা যায় মানুষের ক্ষমতা কত সীমিত। তার পক্ষে একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর পোস্ট প্রকাশ/নির্বাচন করা অসম্ভব না হলেও কঠিন (এখানে সঞ্চালক বেতনভুক্ত বা অবৈতনিক সেটি বিবেচ্য নয়)। লেখার মান অনুযায়ি নির্বাচিত কলামে দেওয়া অথবা স্টিকি করার কাজটি হিউম্যান মডারেটরের মাধ্যমে হতে পারে। শুধুমাত্র বিশেষ লেখাকে নির্বাচন/স্টিকি করার জন্য একজন মানুষ এসে সঞ্চালনার কাজটি করে যেতে পারেন। তবে একাজটিও অটোমেটেড মডারেশন দ্বারা করা যায় এবং করতে দেখা যায়।

তারপরও হিউম্যান মডারেটর দ্বারা নিয়মিত সঞ্চালনার কাজটি করতে হলে সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয় বিবেচনায় রাখতে হয়। আমার দৃষ্টিতে মাত্র ৪টি বিষয় নিয়মিত তদারকি করলে যে কোন পরিস্থিতিতে একটি ব্লগসাইট অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে। তা হলো…..

১. নিয়মিতভাবে ব্লগ পোস্টগুলো প্রকাশিত হবে
২. গুরুত্বপূর্ণ পোস্টগুলো নির্বাচিত কলামে যাবে
২. দিনের/সপ্তাহের বিশেষ কোন পোস্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষণে যাবে/স্টিকি হবে
৪. অবাঞ্চিত/ অনাকাঙ্ক্ষিত/ নিয়মবহির্ভূত পোস্ট বাতিল হবে

একাজগুলো নিয়মিত না হলেই ব্লগের গতি কমে আসে। ঝিমিয়ে পড়ে। গতিহীন হয়ে পড়ে। ব্লগার/প্রদায়করা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েন। অভিজ্ঞ ব্লগাররা লেখা অন্যত্র প্রকাশ করেন। নবীন লেখকরা প্রেষণা হারিয়ে ফেলেন: অন্য কিছুতে মনযোগ দেন। অথবা আর মন্তব্যও করতে চান না। ব্লগে সচল ব্লগারের সংখ্যা দিন দিন কমতে থাকে। ব্লগার দ্বারাই ব্লগ সাইটের উন্নয়ন। ব্লগারই পাঠক, ব্লগারই হিটদাতা। ব্লগারই ব্লগসাইটের অত্যাবশ্যক অংশ।

সঞ্চালনা নিয়মিত থাকলে ব্লগার বা প্রদায়করা স্বাভাবিক মাত্রায় লেখতে থাকেন এবং পোস্ট প্রকাশ করতে থাকেন। অন্যের লেখায় মন্তব্য দেবার বিষয়টিও এর ওপরেই নির্ভরশীল। সেরা মন্তব্যকারীকে স্বীকৃতি দেবারও প্রয়োজন নেই, অথবা সৃজনশীল লেখা প্রতিযোগিতারও প্রয়োজন নেই।

সঞ্চালক মাত্র চারটি দায়িত্ব নিয়মিতভাবে করে যেতে পারলে, ব্লগে তৎপরতা বাড়বে এবং ব্লগে হিট বাড়বে। এমন ব্লগসাইটকে বিজ্ঞাপনদাতার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয় না। সময় উপযোগী নেতৃত্ব এবং নিয়মিত সঞ্চালনা থাকলে ব্লগ কারও বোঝা হবার কথা নয়, ব্লগ নিজেই নিজের খরচ যোগাড় করতে পারার কথা।

শেষ কথা

ব্লগ শুরু হয়েছিল বাংলা ভাষায় বাধহীন আত্মপ্রকাশকে প্রমোট করার জন্য। নিঃস্বার্থে। ব্লগাররাও এসেছেন নিঃস্বার্থে। লেখেছেন হৃদয় উজাড় করে। ব্লগে একটি লেখা দেবার জন্য অনেকে বিদ্যাসাগর বনেছেন। ঘটিয়েছেন একটির পর একটি বিপ্লব। ব্লগের লেখাকে কপি করে প্রকাশ করছে বিখ্যাত প্রিন্টমিডিয়াগুলো। কারণ, সামু আজ বাংলা ভাষায় সবচেয়ে বড় তথ্যভাণ্ডার – এটি কোন উইকিপিডিয়ার কাজ নয়।

সামুর জন্য কেউ কীভাবে SEO করেছিল জানা নেই, কিন্তু পেইজ ভিউ বলুন, ওয়েভ ট্রাফিক বলুন, এক সময় বাংলাদেশে সামুকে প্রথম কয়েকটির মধ্যে দেখা যেতো। কিন্তু সামু কি পাঠক/ব্লগারদের পরিবর্তিত প্রয়োজন এবং চলমান ট্রেন্ডকে ধারণ করতে পেরেছে? ভোক্তার চলমান প্রয়োজনকে বুঝতে না পারার জন্য মোবাইল ফোন জায়ান্ট নোকিয়ার পতন হয়েছিল – এখন পুনর্জনম নিয়েও টিকতে পারছে না।

আজ সামু কোথায়? অথচ আজও বাংলায় কোন বিষয়ে ‘গুগল সার্চ’ দিলে সামহোয়্যারইন ভেসে ওঠে। প্রশ্ন হলো, এটি কি ‘অকাল কিংবদন্তী’ অর্জন করবে? নাকি সময়ের সাথে নিজেকে সুধরে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবে? প্রশ্ন থাকলো ব্লগারসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি।

পাবলিক ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া: ১৫ অগাস্ট ২০১৭

———————————————
*ব্লগে লেখা ও ব্লগের সঞ্চালনা সম্পর্কে নতুন/পুরাতন চিন্তার সমন্বয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে এই পোস্ট।

2 comments

ঘুড্ডির পাইলট শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s