ডায়েরি: ধাক্কা খেয়ে ছক্কা মেরে সেন্চুরি

১) লঞ্চ ছাড়ার আগেই সদরঘাটের লঞ্চ থেকে পড়ে গেলো একটি শিশু। যাত্রীদের মধ্যে হাহাকার রব। শীতের বুড়িগঙ্গা! টলমলে ঠাণ্ডা পানিতে কে নামবে শিশুটিকে বাঁচাতে? ইতস্তত করতে করতে শিশুটি ডুবে ডুবে অবস্থা। সারেংসহ লঞ্চের সকল স্টাফও যাত্রীদের সাথে এসে যোগ দিয়েছে। সকলেই তামাসা দেখছে, কিন্তু পরিস্থিতি ভয়ানক।

হঠাৎ দেখা গেলো একজন ভদ্রলোক ঝাঁপ দিয়ে পড়েছেন একদম শিশুটির কাছে। কাতড়াতে কাতড়াতে সাঁতরাতে সাঁতরাতে তুলে ধরলেন অসহায় শিশুটিকে। স্বস্তি ফিরে এলো লঞ্চের সমস্ত যাত্রীকূলে। ভদ্রলোক ফিরে আসলে, সকলের কৃতজ্ঞতার চাহনি পড়লো তার ওপর। কিন্তু ভদ্রলোকের কোন তোয়াক্কা নেই বরং রাগে ক্ষোভে সকলের দিকে তাকিয়ে কাকে যেন খুঁজতে লাগলেন। একজন যাত্রী এগিয়ে এসে বলেই দিলেন, “ভাই! একটি মহৎ কাজ করেছেন আপনি!”

ভদ্রলোকের রাগ যেন দু ডিগ্রি বেড়ে গেলো। যেন ওই লোকটিকেই তিনি খুঁজতেছিলেন। সকলকে স্তম্ভিত করে দিয়ে দক্ষিণ বঙ্গীয় ভাষায় বললেন, “আরে রাহেন আপনের মহৎ কাজ! কিডা আমারে ধাক্কা দিলো, হেইডা আগে কন।”

২) বর্তমান ঢাকায় সুদক্ষ মিলিটারি দারোয়ান পাবেন, স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী পিওন পাবেন, কিন্তু হাত-পা-ওয়ালা একটি কাজের লোক পাবেন না শত চেষ্টায়ও। পরিবারের প্রধান ব্যক্তিটির অকস্মাৎ অসুস্থতার ফলে আমি চোখে অন্ধকার দেখতে লাগলাম। নিরুপায় হয়ে ঘরের অনেক কাজই আমাকে করতে হয়েছে, যা কখনও করি নি। বিয়ের পর আরও বেশি বিমুখ হয়েছি গৃহের কাজে, মোজাটাও ধুই নি! বউয়ের চূড়ান্ত আশকারা পেয়ে ওগুলো করার পরিস্থিতিও হয় নি। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ঠিক ওই ধাক্কা-খাওয়া ভদ্রলোকের মতো হয়েছে। বাধ্য হয়ে, হেন কোন কাজ নেই যা আমি করি নি। যাবতীয় গৃহস্থালী কাজ করেও রোগীর সেবা করতে হয়েছে! শুধু তা-ই নয় মুখের হাসিও অটুট রাখতে হয়েছে, পাছে রোগীর মনে হতাশা আসে!

সুস্থ হয়ে আমার স্ত্রী তো আমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এমন কি নিজ জেলায় অবস্থানকারী আমার মা-ও। মা জানেন সন্তানের স্বভাব! “তুই রান্না করেছিস! বাচ্চাদেরকে তুই খাইয়েছিলে?” মোবাইলে আমার মায়ের বিস্ময়। বান্ধবীরা অসুস্থতার কথা জিজ্ঞেস করতেই আমার স্ত্রী সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের রচনামূলক উত্তর দিয়ে দিচ্ছেন। আমি কতকিছু করেছি তার বিস্তারিত বিবরণ। মাঝে মাঝে দু’একটা শুনেও ফেলছি আমি। বুঝতে পারি নি কত বড় মহৎ কর্ম আমি করে ফেলেছি। কিন্তু তাতে আমার মোটেও গুরুত্ব নেই। শুধুই ভাবছি, ঈশ্বর কী রকম দুর্দশায়ই না ফেলেছিলেন। এরকম পরিস্থিতিতে পড়লে তো বিলাই গাছে ওঠবেই! আমি কোন্ ছাড়! মনে মনে বলি, “কিডা আমারে ধাক্কা দিলো….!”

*পুনশ্চ: ভালো প্রশিক্ষণ হয়ে গেছে এসুযোগে। রান্নার কাজটিকে জনমের ভয় ছিলো। সেটা অনেকটাই কেটে গেছে। গিয়ানের কথা হলো, বউয়ের ওপর সবকিছু ছেড়ে দিয়ে আর কুঁড়ে হওয়া চলবে না। এর পর যদি আবার কেউ ধাক্কা মারে! 

২৬ জানুয়ারি ২০১৩।

.

.

[প্রথম আলো ব্লগে পাঠক বন্ধুদের প্রতিক্রিয়া]

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s