প্রজেক্ট ম্যানেজার: পেশাদারিত্ব কোথা থেকে আসে? প্রকল্পের পক্ষ/বিপক্ষ কারা?

banner2-crop

প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক, পর্ব ৫। প্রজেক্ট ম্যানেজারের পেশাদারিত্ব। এপর্বের শুরুতেই একটি বেরসিক প্রশ্ন করতে চাই আমাদের ‘পেশাদারিত্ব’ নিয়ে। আমাদের পেশাদারিত্ব কেন এবং কীভাবে গড়ে ওঠে? এটি কি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্যের কারণে আসে, নাকি নিজের কাজের প্রতি একাগ্রতার ফল হিসেবে আসে?  কোন কোন সময় আমাদেরকে একটিকেই অগ্রাধিকার দিতে হয়। তাই বিষয়টি সম্পর্কে একচেটিয়া মনোভাব থাকা দরকার। পেশাদারিত্ব কি ব্যক্তির, নাকি প্রতিষ্ঠানের?  ব্যক্তি ছাড়া তো প্রতিষ্ঠান হতে পারে না, কারণ প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিরই সমষ্ঠি। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের সুনাম এবং কৌশলগত অবস্থানের কারণে কর্মীদের জন্য পেশাদারিত্ব অর্জনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অতএব নিরপেক্ষ উত্তর বলতে কিছু নেই। দিনশেষে প্রতিষ্ঠান অথবা ব্যক্তি, যেকোন একটিকে বেছে নিতে হবেই।

 

▶কীভাবে আসে পেশাদারিত্ব?

উপরোক্ত প্রশ্নে মোটাদাগে তিনটি পক্ষ আছে। প্রথম পক্ষটি বলবেন, আনুগত্য এবং ব্যক্তিগত উন্নয়ন বিষয়গুলো আপেক্ষিক। পরিস্থিতি মোতাবেক যেকোন একটি আগে বা পরে আসতে পারে। প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্যের ফলে কাজের সুযোগ আসে এবং কাজের সুযোগগুলোকে একাগ্রতার সাথে কাজে লাগালে পেশাদারিত্ব আসে। যাদের অভিজ্ঞতা আছে, তারা  নিজের কাজে স্বাধীনভাবে প্রচেষ্টা দিতে পারেন। কিন্তু যাদের দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা নেই, তাদেরকে আনুগত্য দেখিয়ে কাজটুকু বুঝে নিতে হয়। সেক্ষেত্রে কিছু অতিরিক্ত কাজ তো করতেই হবে! অতএব, সোজা উত্তর নেই।

দ্বিতীয় পক্ষটি হয়তো একটি সোজা উত্তরকে বেছে নেবে। তারা বলবেন, প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য ছাড়া পেশাদারিত্ব আসে না, কারণ প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া ব্যক্তির দক্ষতার কোনই মূল্য নেই।

তৃতীয় পক্ষটি আরও সোজা। তারা বলবেন, ব্যক্তির অংশগ্রহণ ছাড়া প্রতিষ্ঠান অচল। অতএব ব্যক্তির উন্নয়নই প্রথম। প্রতিষ্ঠান চাকরি দিলেও কোন ব্যক্তি যদি নিজ দায়িত্ব ভালোভাবে পালন না করে, তবে তো চাকরিই থাকে না। পেশাদারিত্ব আসবে কোত্থেকে!  অতএব, পেশাদারিত্ব আসে নিজের কাজের প্রতি একাগ্রতার ফলে।

 

▶ বর্তমান কাজে একাগ্রতাই কি পেশাদারিত্ব অর্জনের প্রথম পথ?

চলুন আলোচনার স্বার্থে তৃতীয় পক্ষটিকে সামনে নিয়ে আসি।  মনে করি, প্রথমত ব্যক্তির ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলেই পেশাদারিত্ব আসে, প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্যের কারণে নয়। প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য বিষয়টিও আপেক্ষিক। প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ যদি চাটুকারিতায় অভ্যস্থ না হয়, তবে তারা হয়তো বলবে, ‘প্রকল্পের কাজে অগ্রগতি না হলে আনুগত্য দিয়ে আমরা কী করবো?’  অতএব সাধারণ দৃষ্টিতে, নিজের কাজের প্রতি মনোযোগী হওয়াটাই প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য।

একজন প্রকল্প ব্যবস্থাপককে স্বার্থপরের মতো নিজের প্রকল্পের কাজেই মনসংযোগ করতে হয়। এটিই কর্তৃপক্ষের দেওয়া এসাইনমেন্ট।  এটিই তার পেশাদারিত্ব প্রদর্শন ও অর্জনের জায়গা।

এখানে বলে রাখি, উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের কর্মী হিসেবে শুধু ‘উন্নয়ন প্রকল্পতেই’ আলোকপাত করার চেষ্টা করছি। কীভাবে একজন সফল প্রকল্প ব্যবস্থাপক বিবর্তিত হয়ে ‘স্বপ্ন ব্যবস্থাপকে’ রূপ নিতে পারেন, সেটি তার বর্তমান প্রকল্পের অগ্রগতি থেকে বুঝতে পারা যায়।

 

▶প্রজেক্ট ম্যানেজারকে কি প্রতিষ্ঠানের অন্যসব বিষয় থেকে দূরে থাকা উচিত?

কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে ডিসট্রাকশন সৃষ্টি করতে পারে, সেটি স্বাভাবিক। তাদেরকে হয়তো একসাথে অনেকগুলো প্রকল্পের যোগান দিতে হয়। অনেক বিষয়ে মনোযোগ দিতে হয়। যেকোন সময় যেকোন প্রকল্প ব্যবস্থাপককে তারা বাড়তি কাজ দিতেই পারেন। প্রকল্প পরিচালকের নৈশভোজে যোগ দিতে হতেই পারে। এসব কাজের কোন্ গুলোতে প্রকল্প ব্যবস্থাপক যাবেন, কোন্ গুলোতে যাবেন না, সেটি বুঝার জন্য কেবল একটি প্রশ্ন নিজেকে করতে হয়। তা হলো, ‘তাতে কি আমার বর্তমান প্রকল্পটি উপকৃত হবে?’ উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে আরেকটি প্রশ্ন: কীভাবে কতটুকু/ কখন? উত্তর যদি ‘সন্তোষজনক না’ হয়, তবে যেকোন ভাবে কর্তৃপক্ষের অযাচিত আহ্বান থেকে নিজেকে দূরে রাখা উচিত। তবে পরিস্থিতিই বলে দেবে, কোনটি করণীয়।

 

▶প্রকল্পের সাথে জড়িত ভেতর/বাইরের পক্ষগুলোর গুরুত্ব কতটুকু?

প্রকল্পের উন্নয়নের সাথে যাদের স্বার্থ জড়িয়ে আছে, তারা হলো একেকটি পক্ষ। আবার প্রকল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য যাদের প্রভাব থাকতে পারে তারাও একটি পক্ষ। অন্যদিকে প্রকল্পকে সহায়তা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্যও একটি প্রভাবশালী পক্ষ আছে। এই ইতিবাচক ও নেতিবাচক সব পক্ষ নিয়েই একটি প্রকল্প এগিয়ে চলে। এদেরকে ছেড়ে প্রকল্পের অগ্রগতি ভাবা যায় না। তবে এসব পক্ষকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত বা বিচ্ছিন্ন করতে না পারলে প্রকল্পের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতি হয়।

প্রকল্প ব্যবস্থাপককে তাই বুঝে নিতে হয়, কাদেরকে তিনি গুরুত্বের সাথে সম্পৃক্ত করবেন এবং কাদেরকে তিনি গুরুত্বের সাথে প্রকল্পের কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন রাখবেন। আরেকটি পক্ষ আছে, যাদের সাথে সম্পৃক্ততা বা বিচ্ছিন্নতা উভয়ই বিপদজনক। তাদের জন্য একটি মাঝামাঝি অবস্থান আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখতে হয়।

একটি আদর্শ প্রজেক্ট প্রপোজালে এসব পক্ষ আগে থেকেই সনাক্ত করা থাকে। তাদের কার কী প্রভাব, নেতিবাচক নাকি ইতিবাচক এবং তাদেরকে কীভাবে মোকাবেলা করতে হবে, সবকিছু প্রকল্প প্রস্তাবনায় বর্ণিত থাকে। কিন্তু প্রকল্প ব্যবস্থাপককে বাস্তব পরিবেশে কাজ করতে হয় বলে তিনি এসব নিয়ে আলাদাভাবে ভাবতে পারেন না, যদি না সেটি আগে থেকেই সুনির্দিষ্ট থাকে। ফলে, প্রকল্প পরিকল্পনার সময়ই এর পক্ষ-বিপক্ষ নির্ধারণ করতে হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কেবল, সংযোজন-বিয়োজন করা যায়।

 

▶ প্রাসঙ্গিক কয়েকটি টিপস:

১) আপনার প্রজেক্টের সাথে জড়িত ফেরারেন্স দলিলপত্র (প্রজেক্ট চার্টার, প্রজেক্ট প্রপোজাল, বেইসলাইন সার্ভে, সংশ্লিষ্ট ইমেল ইত্যাদি) সবসময় হাতের কাছে রাখুন। সংক্ষিপ্ত সংস্করণের টেবিলে কিছু রেখে দিন, যেন অল্প সময়ে আপনি বুঝে নিতে পারেন।

২) প্রকল্পের সাথে বিভিন্ন অংশীজন (স্টেইকহোল্ডার) কারা, তাদের কতটুকু প্রভাব এসম্পর্কে নিয়মিত বিশ্লেষণ করুন। যথাযথ উপায়ে তাদের সাথে যোগাযোগ ও সম্পর্ক জোরদার করুন।

৩) প্রকল্পের কর্মীদের সাথে নিয়মিত বসুন, আনুষ্ঠানিক অথবা অনানুষ্ঠানিক ভাবে। তাদের মনোভাব দেখুন, তাদের সামর্থ্য বুঝার চেষ্টা করুন। নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে অনেক কিছুতে ঘাটতি পূরণ করা সহজ হয়।

৪) প্রকল্পের কর্মীদের নিয়ে ছোট ছোট কর্মশালার আয়োজন করুন, তাতে বিভিন্ন ইস্যুতে কর্মীদের ধারণা স্পষ্ট হবে। বাড়তি উপকারিতা হলো, তাতে আত্মবিশ্বাস এবং সম্পর্কের উন্নয়ন হয়।

৫) সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকারের সাথে প্রয়োজনীয় সম্পর্ক সৃষ্টি করুন। প্রয়োজনে তাদেরকে প্রকল্পের উদ্দেশ্য/অগ্রগতি সম্পর্কে হালনাগাদ করুন। গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতে তাদেরকে প্রকল্পের ঘটনার সাথে যুক্ত করুন। তাতে কোন আনুষ্ঠানিকতা বা অফিশাল প্রক্রিয়া ছাড়াই আপনার প্রকল্পটির অনুসন্ধান/তদারকি হয়ে যাবে – ভবিষ্যতের লাল-ফিতার দৌরাত্ম্য কমে আসবে।

৬) সমধর্মী অন্যান্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করুন। এসোসিয়েশনের সভাগুলোতে নিয়মিত অংশ নিন। সুযোগমতো দায়িত্বও নিন। এটি শুধু আপনার প্রকল্পের জন্য নয়, আপনার পেশাগত নেটওয়ার্কিংয়ের জন্যও দরকার। তবে প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকে সরাসরি উপকৃত করবে।

৭) নিয়মিত জার্নাল (সম্পন্ন/পরিকল্পিত কাজের তালিকা) রাখুন। এটি ভবিষ্যতের যেকোন প্রতিবেদন, জরিপ বা তদন্তের সময় বিশেষভাবে আপনার (প্রজেক্ট ম্যানেজার) উপকারে আসবে। কর্মীদের বা একক কাজের তদারকি করতেও সহায়ক হবে।

৮) একই স্বভাবের প্রকল্প/কর্মসূচি যারা পরিচালনা দিচ্ছে, তাদের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করুন। তাতে নিজ প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ কাজে আসবে। প্রাক্তন ম্যানেজারদের অভিজ্ঞতা (লেসন লার্ন্ট)গুলোর ওপর সুযোগ পেলেই দৃষ্টি দিন।

৯) কর্মসূচি/প্রোগ্রাম ব্যবস্থাপকের সাথে যথাযথ যোগাযোগ রক্ষা করুন। শুধু সাহায্যের জন্য যোগাযোগ করবেন না, সেটি হবে স্বার্থপর সম্পর্ক। প্রকল্পের সুখবরগুলোও জানানো যায়। তার সহযোগিতার কারণে কোথায়/কীভাবে আপনার প্রকল্প উত্তরোত্তর এগিয়ে চলেছে, এসব সুখবর দিতেও ভুলবেন না।

১০)  শুধু সাম্প্রতিক নয় এবং পরবর্তি কাজগুলোর দিকেও নিয়মিত দৃষ্টি রাখুন। তাতে নিকট ভবিষ্যতের সমস্যাগুলো আগে থেকেই আঁচ করতে পারবেন। প্রকল্পের কর্মীরা কাজের মানুষ – তারা নির্দেশ শুনে কাজ করতে অভ্যস্ত। তাদের ওপর পরিকল্পনার দায় চাপাবেন না (যদি না বিশেষভাবে অভিজ্ঞ হয়), তাতে কাজের অগ্রগতি ব্যহত হবে।

 

আলোচনাগুলো যথাসম্ভব সহজ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেন সংশ্লিষ্ট না হলেও বুঝতে পারা যায়। প্রজেক্ট ম্যানেজার-কেন্দ্রিক এই আলোচনা ক্রমেই ‘প্রজেক্ট প্লানিং’ এবং প্রজেক্ট বাস্তবায়নের দিকে ধাবিত হবে । (চলবে)

>পরবর্তি পর্ব

 

▶ পর্ব ৪:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ৫টি প্রক্রিয়া: পেশাদারিত্বের শুরু

▶ পর্ব ৩:  ৯টি তত্ত্বে প্রকল্পের সংজ্ঞা এবং সহজ কিছু দৃষ্টান্ত

▶ পর্ব ২:  যে ৫টি কারণে দৈনন্দিন জীবনে প্রকল্প আমাদেরকে উপকৃত করে

▶ পর্ব ১:  প্রকল্প ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক: কেন এবং কীভাবে

 


Sources consulted:

1. European Commission, EuropeAid Cooperation Office (2004) Aid Delivery Delivery Methods: Project Cycle Management Guidelines. Brussels, Belgium.

2. Institute, P.M. and Project, M.I. (2013) A guide to the project management body of knowledge (PMBOK guide). Fifth Edition. United States: Project Management Institute.

 

১৯১৩ সালে বাঙালির সুখস্মৃতি নিয়ে ২০১৩ সালের শুভেচ্ছা

সবার আগে নববর্ষের শুভেচ্ছা। ২০১৩ সালের ‘তেরো’ সংখ্যাটি নিয়ে কেউ যেন আমাদেরকে অস্থিরতা আর অনিশ্চয়তায় না ফেলে এজন্যই এই পোস্ট। কারণ, একশো বছর পূর্বে ১৯১৩ সালটি ছিলো বাঙালির ঐতিহাসিক বিজয়ের বছর। বাঙালির জন্য বাঙলা ভাষার জন্য। সেবিষয়ে বলার আগে বলছি, ভবিষ্যৎবাণীর কার্যকারীতা নিয়ে।

“আগামি দিন সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী করার চেয়ে বরং নিজেই তা ঘটিয়ে ফেলা উত্তম” (এক্সপ্রাইজ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্টাতা পিটার ডায়ম্যান্ডিস)।
অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে, পেশাদার ভবিষ্যদ্বক্তাদের চেয়ে নিজের অনুমানই অনেক সময় ঠিক হয়ে যায়। সামনের বছরে কী হবে এসব নিয়ে চিন্তিত না হয়ে নিজের চরকায় তেল দেওয়াই হবে উত্তম পন্থা। তা না হলে ১৩ নম্বরের ভুল ব্যাখ্যা নিয়ে নানান জনে নানান কথা শুনিয়ে দেবে আপনাকে। সংস্কারাচ্ছন্ন মানুষের অভাব নেই সমাজে। ২০১৩ সাল নিয়ে আশাবাদি হবার প্রচেষ্টায় চলুন দেখি একশ’ বছর আগে অর্থাৎ ১৯১৩ সালে এই বাঙলায় কী হয়েছিলো।

১৯১৩ সালের সাথে জড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্যের দু’জন দ্বিকপালের নাম। তাঁরা দু’জনই বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের সাথে জড়িয়ে আছেন। এঁদের একজন বর্তমান জাতীয় সংগীতের রচয়িতা এবং অন্যজনের রচিত দেশাত্ববোধক গানটি জাতীয় সংগীত হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছিলো দেশ স্বাধীনের পূর্ব পর্যন্ত। প্রথম জন হলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং দ্বিতীয় জন হলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়।

১৯১৩ সালে (নভেম্বর) গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। দু’বছর আগে ১৯১০ সালে গ্রন্থটি বাংলায় প্রকাশ পায় এবং ১৯১২ সালে কবি নিজেই তা ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। ইংরেজি গীতাঞ্জলী Gitanjali: Song Offerings’র ভূমিকা লেখেন কবি ডাব্লিউ বি ইয়েটস এবং তা যুক্তরাজ্যে প্রকাশিত হলে সমগ্র ইউরোপে সাড়া পড়ে যায়।

১৯১৩ সালে (মে) মৃত্যুবরণ করেন বাংলা দেশাত্মবোধক কাব্যসঙ্গীতের অন্যতম রচয়িতা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। তাঁর রচিত “ধনে ধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদেরই বসুন্ধরা” কালকালান্তরে বাঙালির হৃদয়ের গান হয়ে থাকবে। স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত স্বদেশী আন্দোলনে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবেই প্রচরিত হয়ে আসছিলো। দেশ স্বাধীন হবার পর গর্বিত বাঙালি রবীন্দ্রনাথের কবিতাটিকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে নির্বাচন করে, কিন্তু দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গানটি এখনও বাংলাদেশের দ্বিতীয় জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে সমাদৃত। কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ১৮৬৩ সালে (জুলাই) তৎকালীন ভারতের নদীয়ায় জন্মগ্রহণ করেন।

 

বিশ্বইতিহাসে ১৯১৩ সালের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ঘটনা:
রাজা হরিশচন্দ্র – চলচ্চিত্রটি (মে ৩) প্রকাশের মাধ্যমে ভারতীয় চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু।
নরওয়ে’র নারীরা ভোটাধিকার লাভ করেন।
চুরি-যাওয়া বিখ্যাত চিত্র ‘মোনা লিসা’ (লিওনার্দো দ্য ভিন্চি’র অমর সৃষ্টি) পুনরায় পাওয়া যায়।

 

নতুন বছরটি আমাদের জন্য নিয়ে আসুক পরিপূর্ণতা সুখ ও অগ্রগতি! শুভ নববর্ষ!! (৩১/১২/২০১২)

সূত্র: বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যক্তিগত অধ্যয়ন।

 

পাবলিক ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া: ৩১ ডিসেম্বর ২০১২

নীল জামা পড়া ওই নারী কে?

আদালত চত্বর থেকে বের হয়ে ভোঁ দৌড়! সম্মুখের ফটোসাংবাদিকেরা সেটিই ক্যামেরাবন্দি করে প্রকাশ করে দিলেন ইন্টারনেটে। ছবিটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লো বিভিন্ন মাধ্যমে। রাতারাতি তারকাখ্যাতি! গুরুত্বপূর্ণ রায় বের হয়েছে, ট্রাম্প ও তার সহযোগীদের নির্বাচনকালীন অপরাধ নিয়ে। রায় কী হলো সেটি আর প্রশ্ন নয়, দৌড়ের ছবিটি কার সেটিই হয়ে গেলো খবর!
.
কেউ বলছে, অলিম্পিকে নাম লেখাবার জন্য এই চেষ্টা। জুতো আছে? হ্যাঁ আছে তো! হাতে কাগজপত্রও আছে? টিভির সংবাদকর্মী। আদালতে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষেধ। তাই সর্বশেষ খবরটি সবার আগে দেবার জন্য তার এই চেষ্টা।
কেউ মন্তব্য করলেন, “বাহ, তবে সেই জুতোগুলো যত্ন করে রেখে দিন। পরবর্তি প্রজন্ম আপনার অসাধারণ কর্মজীবনের এই বিশেষ দিনের বাস্তবচিত্র উপলব্ধি করুক।” কেউ বলছে, কত প্রস্তুতি! তার প্রতি শ্রদ্ধা জেগে ওঠলো। মুক্ত গণমাধ্যমের এক প্রতীক হয়ে গেলেন সেই নারী। কে তিনি?
.
প্রশংসা ওখানেই শেষ নয়। একটি প্রখ্যাত জুতো কোম্পানি তার এথলেটিক সাংবাদিকতাকে শ্রদ্ধা জানাবার জন্য সহযোগিতা করার প্রস্তাবও দিয়ে দেয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের নৈতিকতার বিধি মোতাবেক, পেশাগত কাজের জন্য কোন প্রকার সুবিধা নিতে পারেন না।
.
কে সেই নারী? কোন প্রতিষ্ঠানের হয়ে সে কাজ করে? গত ২১সে অগাস্ট থেকে শুধু এই আলোচনা।
.

সেটি আমি। ক্যাসি সেমিওন।

.
অবশেষে সেই নারী নিজেই উত্তর দিলেন। “হ্যা, সেই নীল জামা পড়ে যে সাংবাদিক দৌড়াচ্ছিল সে আমি। ক্যাসি সেমিয়ন। আপনাদেরকে ধন্যবাদ।”
.
ক্যাসি সেমিয়ন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এনবিসি’র একজন সাংবাদিক। তবে এখনও তিনি শিক্ষানবীস। শুধু যে পুরো সাংবাদিক সমাজ তাকে নিয়ে গর্বিত তা নয়, তাকে নিয়ে গর্বিত এনবিসি নিউজ। এনসিবি’র একজন সিনিয়র সাংবাদিক টুইট করে বললেন, সেমিয়নকে নিয়ে আমরা গর্বিত।

দৌড়ের শুরু। দেখুন কাকে বেশি ফোকাসড মনে হচ্ছে!
.
এই ঘটনায় শুধু ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংবাদসংস্থা এনবিসিও সম্মানীত হয়েছে। অত্যন্ত কার্যকর উপায়ে। তাতে সন্দেহ নেই।
.
এটি হলো প্রাকৃতিক উপায়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রচার! প্রতিষ্ঠানকে আর প্রতিষ্ঠানের পণ্য বা সেবাকে মানুষের কাছে পরিচিত করাবার জন্য আমরা কতই না চেষ্টা করে যাচ্ছি। লাখ লাখ কোটি কোটি টাকা খরচ করি বিজ্ঞাপনে আর পাবলিক রিলেশনে।
.
শত হাজার কর্মী থাকে একটি প্রতিষ্ঠানে। প্রত্যেকেরই উচিত নিজেদের মতো প্রতিষ্ঠানকে প্রতিনিধিত্ব করা। নিয়মিত হোক, অথবা অননিয়মিত হোক, প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কর্মীর অবদান গুরুত্বপুর্ণ। নিরলসভাবে চেষ্টা করে গেলে কার চেষ্টায় একটি প্রতিষ্ঠান জেগে ওঠে বলা কঠিন। প্রতিষ্ঠানের কর্মীই সেরা বিজ্ঞাপন মাধ্যম!▲

Always বাংলা use করুন: ভাষামিশ্রণ সম্পর্কে সহব্লগারদের সুচিন্তিত মতামত

আজ মহান একুশে ফেব্রুয়ারি। বাঙালি জাতিয়তাবাদের শুরু হয়েছিল ভাষাগত বিভেদ থেকেই। বাংলার সাথে বাঙালির যত আবেগ, যত ভালোবাসা, সেটি অন্য কোন ভাষার ক্ষেত্রে তেমনভাবে আছে কিনা জানা নেই। ব্লগে প্রকাশিত একটি লেখায় সহব্লগারদের অংশগ্রহণ আমাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছিল। তিন-চার বছর আগের কথা। অনেকেই সামু’র ব্লগার। তাদের মন্তব্য নিয়ে আজকের মন্তব্য সংকলন। লেখার শিরোনাম ছিলো: বাংলা ভাষায় অন্য ভাষার মিশ্রণ। প্রকাশিত হয়েছিলো শুরুতে প্রথম আলো ব্লগ অবশেষে সামুতে । লেখাটির শেষে আমি আরও কিছু দৃষ্টান্ত/পরামর্শ আহ্বান করেছিলাম, যেন ভাষামিশ্রণের বাস্তবিক কিছু নমুনা সংগ্রহ করা যায়। সহব্লগাররা আমার অনুরোধ রেখেছেন! তাদের মন্তব্যে যেমন পেয়েছি গভীর অন্তর্দৃষ্টি, তেমনই পেয়েছি নিজ ভাষার প্রতি আকুণ্ঠ সমর্থন ও ভালোবাসা। এ লেখায় তাদের মতামতগুলো তুলে না ধরলে হয়তো লেখাটি অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। আমার লেখার প্রতি প্রশংসাসূচক মন্তব্য বা বাক্যাংশগুলো সংগত কারণেই বাদ রেখেছি।

১) ফেরদৌসা: এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা কথায় কথায় বলে: কুল, গাই, ওয়াটস আপ। আমি ‘চান্স’পেয়ে বলি: একটু ‘বিজি’আছি, আই এম ব্যাক ইত্যাদি। প্র/আ

২) লুৎফুন নাহার জেসমিন: কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধু-বউ আমাদের বাসায় বেড়াতে এলে দেখলাম বাচ্চাকে ইংরেজি শব্দ শেখানোর জন্য কীভাবে কথা বলছে। আমাদের কাছে তার একটি উক্তি খুব জনপ্রিয় হয়েছিলো: ‘বেবি বেবি, ডারটি!’ আমার মেয়েও মাঝে মাঝে বলে আর হাসে। প্র/আ

৩) স্বদেশ হাসনাইন: ভাষা তো বই পড়ে শিখছে না। টিভিতে হিন্দি চলছে চব্বিশ ঘণ্টা, ইংরেজির আগ্রাসন তো গোটা পৃথিবী জুড়েই। প্রযুক্তিতে হাজারো যন্ত্র তাদের মত শব্দ শেখাচ্ছে। কলকাতায় হিন্দি বাংলার যে রকম মিক্স হচ্ছে তাতে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। কোড মিক্সিং বলেন আর যাই বলেন, এটা থেকে পরিত্রানের চেয়ে একে গ্রহণযোগ্য একটা জায়গায় রাখা ইম্পোর্টেন্ট। সামু

৪) অনিন্দ্য অন্তর অপু: আমার মনে হয় নিজে সতর্ক হলে আর মাতৃভাষার ওপর মমত্ব থাকলে শুদ্ধ বাংলা চর্চা করা যায়। প্র/আ

৫) ইকথিয়ান্ডর: আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের একটা কথা মনে পড়ছে: “যে বাংলা জানে, সে বাংলায় সম্পূর্ণ বাক্য বলতে পারে, যে ইংরেজি জানে, সে সম্পূর্ণ বাক্যই ইংরেজিতে বলতে পারে। আর যারা কোনটাই জানে না, তাদেরই আশ্রয় নিতে হয় মিশ্রণের।” সামু

৬) গ্রাম্যবালিকা: আমি আমার গ্রামের কথা ১০০% পারি, কোন ইংরেজি বলতে হয় না, কিন্তু শুদ্ধ বাংলা পুরোপুরি পারিনা বলে ইংরেজী শব্দ বলতে হয়। সামু

৭) জনদরদী: আমি নিজেই বাংলার সাথে কিছু ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করি । বিশেষ করে প্রযু্ক্তির সাথে সম্পকিত শব্দগুলো । আমার বেশিরভাগ সময় ইংরেজির সমার্থক বাংলা শব্দ খুঁজে পেতে সমস্যা হয় । চেষ্টায় আছি সংশোধনের। সামু

৮) শহীদুল ইসলাম প্রামাণিক: (যথারীতি ছড়ায়) বাংলা ভাষার আন্দোলনে/ ইংলিশ বলে কত, এমন নেতা বাংলাদেশে/ আছে অনেক শত। তাই তো বলি, “বাংলা ভাষায়/ শুদ্ধ বাংলা চাই, বাংলার সাথে ইংলিশ বলা/ ‘লাইক’করি না তাই”।

৯) মনিরুল ইসলাম (মনির): এটা এখন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে, যা থেকে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব। যেখানে বাংলিশ বলাটাকে আধুনিক-মনা বুঝানো হয়, সেখানে কি করার আছে? এ থেকে উত্তরণের কোনো উপায় মনে হয় নেই। তবে সবাই যদি যার যার অবস্থান থেকে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করে, তাহলে হয়ত হলেও হতে পারে।

১০) মোহাম্মদ জমির হায়দার বাবলা: আরও কিছু উদাহরণ দিচ্ছি। জাস্টিফাই, সবচেয়ে বেটার, প্লাস এর সাথে যোগ করা যায়, আসল ফ্যাক্ট, স্বাভাবিকলি, মন্ত্রী-মিনিস্টার, আপনি তো দারুণ এক পাবলিক! ফাস্টে আমি বলি… ইত্যাদি। যিনি ভালো বাংলা বলতে পারবেন, তিনি অন্য ভাষা সহজেই রপ্ত করতে পারবেন। প্রফেসর সিরাজুল ইসলামকে বাংলার সাথে ইংরেজি বলতে শুনি নি। অথচ তিনি সারাজীবন পড়ালেন ইংরেজি! অবাক লাগে। জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে হলে ভালো করে নিজের ভাষার উপর দখল চাই। চাই বাংলা সংস্কৃতির প্রতি মমতা। নিজের ভাষাকে এড়িয়ে কোন জাতি উন্নতি করেছে কিনা আমার জানা নেই।

১১) মাটির ময়না: ডুড! জোস লিখেছেন। হায় বাঙালি!

১২) মুক্তমন৭৫: থ্যাংকস ব্রাদার। ইউ আর রিয়েলি জিনিয়াস। মাইরি কইলাম আপনে একটা চিজ! উই আর লুকিং ফর দ্য শত্রুজ।

১৩) ঘাস ফুল: আপনার লেখাটি পড়ে জীবনের লাইফটাকে বৃথা মনে হলো! প্রতিনিয়ত আমরা নিজের অজান্তেই কতো ইংরেজি হিন্দি শব্দ বাংলা ঢুকিয়ে দিয়ে অনর্গল নির্লজ্জের মতো কথা বলে যাচ্ছি। মাঝে মাঝে আবার গর্ববোধও করি, যা কি না বেশরমের চূড়ান্ত। এর জন্য শুধু সাধারণ মানুষকে দায়ি করলে ব্যাপারটি আমার কাছে একতরফা মনে হয়। এর জন্য দায়ি অনেকেই। আমাদের গণমাধ্যম, আমাদের সরকার, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা – কেউ তার দায় এড়াতে পারেন না। অন্যতম উদাহরণ হলো, আমাদের বিচার ব্যবস্থা। গণমাধ্যম বাংলা ভাষার প্রয়োগের ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করতে কোন বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারে নি। আরও অনেক কারণ আছে। মন্তব্যের ঘরে সব বলা সম্ভব নয়। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে টুকটাক হিন্দি বা ইংরেজি বললেও নিজের ভাষার প্রতি সম্মান আর শ্রদ্ধা আজন্ম ভালোবাসার মতো অটুট থাকবে। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’শুনার সাথে সাথেই এখনও মনের অজান্তে অশ্রু ঝরে।

১৪) নাজমুল হুদা: গত শতাব্দীর ষাটের দশকে ঢাকা কলেজে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে-নামতে পেন্সিল-দিয়ে-লেখা দেয়ালের এই কথাগুলো নিয়ে আমরা খুব মজা করতাম, “Always বাংলা use করুন”।

১৫) মুরুব্বী: আজকের এই অবস্থা বা ভাষার প্রেক্ষাপট অথবা প্রচলিত প্রক্ষেপণ একদিনে তৈরী হয় নি। যা আপনি পোস্টে আলোচনা করেছেন। বাইরের কথা বলবো না, চুপিচুপি বাংলিশ উচ্চারণ আমার ঘরেও বসত নিয়েছে। আজ শুদ্ধ উচ্চারণ যেন বিলাসিতা। পরিচ্ছন্ন বাংলা আজও অনেকের দুর্ভেদ্য। জানি না কবে প্রমিত ভাষা ফিরে আসবে আমাদের জনজীবনে। তবু আশায় বুক বেঁধে রই। কিছুক্ষণ আগে শহীদ বেদী থেকে আমার সন্তানদের নিয়ে রিকশায় ফিরতে গল্পচ্ছলে যখন ‘একুশ’মানে বোঝাচ্ছিলাম, আমাদের বোঝা টেনে-নিয়ে-চলা-রিকশাচালক অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিলেন: এ আমি কী বলি! বাড়ির গেটে নেমে অমিমাংসিত ভাড়া এক কথায় মেটাতে ভদ্রলোক মুগ্ধ চোখে তাকালেন। বললেন, ‘আমি পারি না আমার সন্তানদের এভাবে বোঝাতে।’ (শব্দনীড় ব্লগ)

১৬) নাজমুন নাহার: ভাষামিশ্রণের দৃষ্টান্তগুলো আসলেই মজার। কিন্তু সমস্যা হলো ভাষার এই যে মিশ্রণ – এটা হবে এবং হতে থাকবে। কতজন সতর্ক হতে পারে ভাষার এই ব্যবহারে? যেমন অফিস-আদালতে বাংলা বা ইংরেজি দু’টোই চলে। ইংরেজির ব্যবহার আভিজাত্যের প্রতীক বলে মনে করা হয় অফিসগুলোতে। তাই ইংরেজির ব্যবহার করতেই হবে, এরকম একটা অলিখিত ব্যাপার থাকে। কিন্তু এক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ চিঠিপত্র লেনদেনে বাংলা ব্যবহার করা যায়। করা হচ্ছে না! তবু ভাষায় পরিবর্তন হবেই। ১৮০০ সালের বাংলা অথবা ১৫০০ সালের দিকে বাংলা ভাষার যে অবস্থা ছিল, সে অবস্থা তো নেই এখন আর। এটা হয়েছে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠির সাথে আমাদের মিথষ্ক্রিয়তার ফলে। যেমন ‘টেবিল’এর শুদ্ধ বাংলা হলো ‘মেঝ’, চেয়ার হলো ‘কেদারা’।

এরকম আরও হাজার শব্দ বাংলা ভাষায় আছে, যেগুলো প্রকৃতপক্ষে বাংলা ভাষার শব্দ নয়। কিন্তু আমরা বাংলা ভাষায় ব্যবহার করছি অবলীলায়। তবে ভাষার এই যে মিশ্রণ, এটা সমাজের কিছু মানুষের – সকল মানুষের নয়। যেমন গ্রামবাংলার কোটি কোটি মানুষ এখনও ভাষার এই মেশামেশি বুঝে না বলে আমার ধারণা। কিন্তু ওখানে ভাষা পরিশুদ্ধ নয়। এক্ষেত্রে আশার কথা হলো: বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হচ্ছে, এক্ষেত্রে ব্লগগুলোও ভূমিকা রাখছে। শব্দনীড়

১৭) সাঈদ মোহাম্মদ ভাই: লেখাটি ডেফিনিটলি চমৎকার। তবে আমড়া এখন র’এর ওপর ব্রেক মেরে কথা বলি: র হয়ে গেছে ড়। যারা বাংলিশ ভাষাকে একসেপ্ট কড়ছেন না তাড়া ভীষণ অন্যায় কড়ছেন। সবাই ড়াবিশ।

১৮) জুলিয়ান সিদ্দিকী: আমরা দিনরাত নানা সংস্কৃতির চিপাগলি দিয়ে অতিক্রম করি, আমাদের প্রতিটি দিন। এক্ষেত্রে খুব সচেতন না থাকলে মিশ্রণ থেকে বাঁচার উপায় নেই। কিন্তু কথা হলো: আমরা কতক্ষণ সচেতন থাকবো বা আশপাশের লোকজনকে কতটুকু সচেতন রাখতে চেষ্টা করবো।

১৯) ফরিদুল আলম সুমন: আমি বিবর্তনে বিশ্বাসী। বিবর্তনের মধ্যেই পৃথিবী টিকে আছে। আমাদের সংস্কৃতি, পোশাক, ভাষা, কৃষ্টিতে মৌলিকত্ব থাকা উচিত। তবে মৌলিকত্ব সবসময় ‘অতীব জরুরি’নয়। যে ভাষায় যত বেশি বিদেশী প্রচলিত শব্দকে ধারণ বা গ্রহণ করা হয়েছে, সে ভাষা তত বেশি সমৃদ্ধ ও বিশ্বব্যাপী গ্রহণীয় হয়েছে। অতিমাত্রায় মৌলিকত্ব ধারণ করতে গিয়ে চাইনিজ ভাষা পৃথিবীবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্যতার বিচারে মার খাচ্ছে। এতো মৌলিকত্বে বিশ্বাসী চাইনিজরাও এখন ‘সিমপ্লিফাইড চাইনিজ’নামে আধুনিক, সংক্ষিপ্ত ও সহজ চাইনিজ ভাষার প্রবর্তন করেছে। আমরা বিশুদ্ধ বাংলার চর্চা করবো ঠিকই, তবে সেই সাথে যুগের চাহিদা অনুযায়ী বিদেশী শব্দকেও ঠাঁই করে দিতে হবে। আমরা ‘কেদারায়’বসতে পারিনি বেশিদিন, ‘চেয়ারে’বসতে হচ্ছে। ‘সন্দেশ’পড়তে পড়তে আমরা কীভাবে যেন ‘পত্রিকা’বা ‘সংবাদপত্র’পড়তে শুরু করেছি বুঝতেই পারিনি। ‘পেয়ালায়’চা খেতে খেতে নিজের অজান্তেই এখন ‘কাপে’চা খাচ্ছি। ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে আমরা যে ‘আভিজাত্য’বোধ করি, সেটা খুব সহজে যাবেনা। তাই কোডমিক্সিং দূর করতে হলে এ ব্যাপারে ব্যাপক গণসচেতনতা দরকার। কোডসুইচিং খুব একটা মন্দ নয়। নিজের ভাষা ছাড়াও অন্য যে কোনো ভাষায় শুদ্ধভাবে কথা বলতে পারাটা আমার কাছে স্মার্টনেস-ই মনে হয়। তবে স্থান-কাল-পাত্র তো অবশ্যই বিবেচ্য। বাংলা-হিন্দী-ইংরেজি মিশিয়ে যারা কথা বলেন, তাদের কাছে প্রশ্ন রাখা যেতে পারে: ‘আপনি কি উল্লিখিত যে কোনো একটি ভাষায় শুদ্ধভাবে কথা বলতে পারেন? যদি না পারেন, তাহলে তো আপনার একূল ওকূল দু’কুলই গেলো।

এবার একটু অন্য কথায় আসি। সামহোয়্যারইন ব্লগের জনপ্রিয় গল্পকার এবং রম্যলেখক আবুহেনা মো: আশরাফুল ইসলাম ফেইসবুক মারফত আমাকে পরামর্শ দিলেন, যেন ভাষার মিশ্রণ নিয়ে এবার কিছু একটা লেখি। এবার দেখুন তার ফেইসবুক স্ট্যাটাসে তিনি কী লিখলেন এবং সামু’র ব্লগাররা তাতে কী উত্তর দিলেন:

আবুহেনা মো: আশরাফুল ইসলামের ফেইসবুক স্ট্যাটাস/ ৪ ফেব্রুয়ারি:
একজনকে দেখলাম ফেসবুকের বাংলা করেছে ‘মুখবই’। কবি নির্মলেন্দু গুন মোবাইল ফোনের বাংলা করেছিলেন ‘মুঠোফোন’। আক্ষরিক অনুবাদ না হলেও এটা ঠিকই আছে। শুনতেও শ্রুতিমধুর। কিন্তু মুখবই শব্দটি আমার কাছে ভালো লাগছে না। তারচেয়ে বরং ফেসবুকের বাংলা ফেসবুক-ই থাক। যেমন কম্পিউটারের বাংলা কম্পিউটার, ওয়েবসাইটের বাংলা ওয়েবসাইট ইত্যাদি ইতিমধ্যেই বাংলায় বহুল প্রচলিত হয়ে গেছে। এগুলোর বাংলা করতে গেলে না বুঝবে বাঙালি, না বুঝবে অবাঙালি। উচ্চারণ করতে গেলে দুর্বল দাঁত ভেঙ্গে যাওয়ারও সম্ভাবনা আছে। এরকম কত ইংরেজি শব্দই তো বাংলা ভাষায় আত্মিকৃত হয়ে গেছে। তাতে বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি ছাড়া কোন ক্ষতি তো হয়নি। ভাষা আন্দোলনের মাস বলে সব কিছুর নামই বাংলায় রাখতে হবে, এমন দিব্যি কে দিয়েছে? আপনারা কী বলেন?

স্ট্যাটাসে বন্ধুদের/ব্লগারদের উত্তর:

শাহ আজিজ: এরকম করতে করতে operation searchlight এর কি করুন অনুবাদ করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রার্থী। কিছু শব্দকে বাংলায় আত্তীকরণ অতিআবশ্যিক কারন এর বিকল্প নেই।

মেজদা (কোহিনূর): সত্যি কথা ৷ যেমন হরলিক্সের কোন বাংলা প্রতিশব্দ নাই ৷
-শাহআজিজ: লাক্স এর নাই , ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির নাই
-গোলাম মোস্তফা: এখানে হরলিক্স কেমনে আইলো?
-শাহআজিজ: বাজার থেকে এসেছে। (এরপর অনেকের বাক্য বিনিময়…)

মোহাম্মদ জমির হায়দার বাবলা: দারুণ আলোচনা। পড়ে আসবো। মইনুল ভাই কী বলেন দেখি।
-মাঈনউদ্দিন মইনুল: কোন কথা হবে না। আবুহেনা ভাইয়ের পক্ষে ভোট চেয়ে এবার আমরা মাঠে নামতে পারি, বাবলা ভাই।

আহমেদ রব্বানী: বাংলাভাষায় অনেক বিদেশি শব্দ এসে স্বকীয় স্থান লাভ করেছে। এতে তো কোনো সমস্যা নেই। ফেসবুক, ডিজিটাল, মোবাইলসহ সময়ের প্রয়োজনে আরো শব্দ বরং বাংলাভাষার শ্রীবৃদ্ধিই করবে। চমৎকার একটি বিষয়কে সামনে আনবার জন্যে ধন্যবাদ প্রিয় হেনা ভাইকে।

মাঈনউদ্দিন মইনুল: কথায় যুক্তি আছে… আবুহেনা ভাই!!! খুব সতর্কভাবে দেখলাম কেউ বিরোধিতা করেন কিনা… করলে ভাষার মাসে আবার আরেকটা বায়ান্নো ঘটিয়ে দিতাম!

আমি একাধিক জায়গায় লেখেছি যে, ভাষা বহমান নদীর মতো। এর পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন, বিয়োজন অনিবার্য। এর কোনকিছুই চূড়ান্ত নয়। ব্যকরণ, অভিধান সবকিছুই পরিবর্তনশীল। ভাষার ব্যবহাকারীরাই নির্ধারণ করবে এর গতিপথ। ভাষাবিদেরা কেবলই এসব ঘটনাকে বিধিবদ্ধ করবেন।

কিন্তু আশংকা হলো সেই ভাষাভাষীদেরকে নিয়ে, যারা প্রযুক্তির প্রভাবে ভাষার যথেচ্ছাচার করছেন। সেটি হয়তো বাংলা ভাষার স্বাভাবিক অগ্রগতি বা গতিপথকে বিপথে নিয়ে যেতে পারে। যেসব ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন, সেসবের অনুগামী হতে পারে।

মাতৃভাষার জন্য সংগ্রাম করা এবং জীবন দিয়ে মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় করা – এটি একান্তই বাঙালির গৌরব। বায়ান্নো আমাদের, একুশ আমাদের। পৃথিবী থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি ব্যবহৃত ভাষাগুলো ইংরেজি, ফরাসী, চিনা, জার্মানি ইত্যাদি প্রভাবশালী ভাষার দৌরাত্ম্যে হারিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে ভাষাবিদেরা করছেন হাহাকার। তারা দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন বাঙালির, বাংলাদেশের; কারণ ভাষার জন্য নিজের প্রাণ দেবার দৃষ্টান্ত আমাদেরই। সেই আমরা যদি নিজ ভাষা ছেড়ে অন্য ভাষার প্রতি আসক্তি হই, নিজের ভাষায় অযাচিতভাবে বিদেশি ভাষার মিশ্রণ দেই, তবে আমরাই আমাদের গৌরবকে কলঙ্কিত করি।

ভাষা আন্দোলনে অর্জিত মাতৃভাষা হিসেবে বাংলা পৃথিবীর মানুষের কাছে একটি বিশেষ স্থান লাভ করে আছে। সেই বাংলা ভাষার নিজস্ব কোন স্বকীয়তা অবশিষ্ট থাকবে কিনা, এখন সেটি ভাবনার বিষয়।

মহান একুশ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সকল ভাষা শহীদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

[২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭] পাবলিক ব্লগে পাঠকের অভিমত

যে লেখাটি থেকে উপরোক্ত মন্তব্য প্রতিমন্তব্য: কোডমিক্সিং এবং ভাষার দূষণ: বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ। লেখাটি প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল প্রথম আলো ব্লগে।

আমার প্রিয় রসাত্মক ধনাত্মক উক্তিগুলো। পর্ব ৫।

শব্দের চেয়ে আলোর গতি বেশি। এজন্য কিছু মানুষকে কথা না বলা পর্যন্ত উজ্জ্বল দেখায়। (এলান ডান্ডেস)

নির্বোধের সঙ্গে তর্কে যাবেন না। তাহলে তারা আপনাকে তাদের পর্যায়ে নামিয়ে নেবে এবং তাদেরই অভিজ্ঞতা দিয়ে আপনাকে পরাজিত করবে। (মার্ক টোয়েন)

রাতে আমি ঘুমাতে পারি না এবং সকালে জাগতে পারি না। (বেনামি)

কেউ তার বউয়ের জন্য গাড়ির দরজা খুলে দিলে, বুঝতে হবে হয় গাড়িটি নতুন, নয়তো বউটি। (প্রিন্স ফিলিপ)

জীবন  কঠিন। এটি আরও কঠিন হবে যদি আপনি নির্বোধ হন।  (জন ওয়েন)

একজনের ধারণাকে নিজের লেখায় ব্যবহার করলে সেটি হয় চুরি; অনেকের ধারণাকে চুরি করলে সেটি হয় গবেষণা। (স্টিভেন রাইট)

নারী হলো টি ব্যাগের মতো; গরম পানিতে না ডুবানো পর্যন্ত বুঝা যায় না সে কত শক্ত। (ইলিনর রুজবেল্ট)

যারা বলে ‘টাকা দিয়ে সুখ কেনা যায় না’ তারা আসলে জানে না কোথায় শপিং করতে হয়।  (Gertrude Stein)

বরং চুপ থাকা ভালো, তাতে মানুষ ভাবতে পারে আপনি জ্ঞানী। তবু মুখ খুলে সন্দেহ দূর করে দেওয়া উচিত নয়। (আব্রাহাম লিংকন)

ডাক্তার জানালেন যে আমি আর মাত্র ছ’মাস বাঁচবো। কিন্তু যখন তার বিল দিতে পারলাম না, তখন তিনি আমাকে আরও ছ’মাস বাড়িয়ে দিলেন। (ওয়াল্টার ম্যাথিউ)

মৃত্যু হচ্ছে জীবনের সেরা উদ্ভাবন। এটি জীবনকে পুরোনো ও সেকেলে বিষয় থেকে মুক্ত করে। (স্টিভ জবস)

মাঝেমধ্যে অপরাধ না করার জন্য আমি অপরাধবোধে ভুগি। (মাইক হাকাবি/ মার্কিন রাজনীতিবিদ)


পড়ুন: পর্ব ৪

নার্সিসাস কাহিনির বাকি অংশ…

 নার্সিসাসের আত্মপ্রেমের পৌরানিক কাহিনিটি প্রায় সবারই জানা। নার্সিসাস প্রতিদিন একটি হ্রদের কিনারে বসে একদৃষ্টিতে পানির দিকে তাকিয়ে থাকতো। পানিকে দেখতে নয়, নিজেকে দেখতে। নিজের সৌন্দর্য্যে এতই মগ্ন থাকতো যে, নিজের অস্তিত্বের কথা ভুলে যেতো। ভুলে যেতো সকাল বিকাল দুপুরের কথা। আত্মমগ্ন এই যুবক একদিন সেই হ্রদের স্বচ্ছ পানিতে ঝাপিয়ে পড়লো! সাঁতরাতে নয়, অন্যমনস্কতার কারণে! গভীর পানিতে খেই হারিয়ে বেচারা ডুবেই মরলো। তারপর নার্সিসাসের পড়ে যাবার স্থানটিতে জন্ম নিলো একটি ফুলগাছ। নাম দেওয়া হলো, নার্সিসাস। আহা! নার্সিসাস যেন একটি দীর্ঘশ্বাসের নাম।
.
.
এবার চলে যাই গল্পের বাকি অংশে।
.
নার্সিসাসের মৃত্যুর পর বনদেবী এসে উপস্থিত হলেন সেই হ্রদের পাড়ে। এসে যা দেখলেন, তা দেবী নিজেও ধারণা করতে পারেন নি। তিনি দেখলেন হ্রদের পানি অশ্রুবিন্দুতে রূপান্তরিত হয়েছে। অথচ এটি ছিল স্বচ্ছ পানিতে পরিপূর্ণ ঝিকমিকে হ্রদ।
.
“তুমি কেন কান্না করছো?” বনদেবী বিস্ময় সংবরণ করে হ্রদকে জিজ্ঞেস করলেন।
“আমি নার্সিসাসের জন্য শোকাহত।” হ্রদের উত্তর।
.
দেবী ভাবলেন, তা হতেই পারে। নার্সিসাস তো সারাক্ষণ এই হ্রদের পাড়েই বসে থাকতো। এমন একজন সঙ্গী হারালে যে কেউ হতাশ হয়। দেবী বললেন,
“ওহ, বুঝেছি। সুদর্শন নার্সিসাসের জন্য তো তুমিই কান্না করবে।”
“নার্সিসাস বুঝি সুদর্শন ছিল?” হ্রদের নির্বিকার প্রশ্ন।
.
বনদেবী এবার আর নিজের বিস্ময় সংবরণ করতে পারলেন না। দেবী হলেও তো তার অনুভূতি আছে! এই বোকা হ্রদ এখন এসব কী বলছে?! নার্সিসাস দিনভর তো তার দিকেই তাকিয়ে তাকতো।
.
“নার্সিসাস সুদর্শন ছিল কিনা এটি তোমার চেয়ে কে আর বেশি জানে?” বনদেবীর সবিস্ময় জবাব।
.
প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন পেয়ে শোকাতুর হ্রদ নিরব হয়ে হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ কিছুই বললো না। বনদেবীও দৃষ্টি নামালেন না হ্রদের দিক থেকে।
.
কান্নারত হ্রদ এবার নিরবতা ভেঙ্গে উত্তর দেবার চেষ্টা করলো-
“আমি নার্সিসাসের মৃত্যুতে কান্না করছি, কিন্তু আমি কখনও নার্সিসাসের সৌন্দর্য্য লক্ষ্য করে দেখি নি। আমি কান্না করছি, কারণ যতবার নার্সিসাস আমার পাশে আসতো, ততবার আমি নিজেকে দেখতে পেতাম। নার্সিসাসের গভীর চোখের দৃষ্টিতে আমার সৌন্দর্য্য ভেসে ওঠতো। তাই প্রতিদিন আমি নার্সিসাসের অপেক্ষায় থাকতাম।”
.
.
গল্পের মর্মার্থ।
.
সমাজে আমরা একে অন্যের পরিপূরক। একজনের পরিপূর্ণতার জন্য প্রয়োজন অন্যের অংশগ্রহণ। কেউ একা একা পূর্ণতা পেতে পারে না। নিজেকে দেখার মানে অন্যকেও দেখার সুযোগ দেওয়া। কৃষক আত্মমগ্ন হয়ে ফসল না ফলালে সেটির উদ্বৃত্ত তিনি শহুরে মানুষগুলোকে দিতে পারতেন না।
.
আমরা সবাই আত্মমগ্ন হলেই সেটি স্বার্থপরতা, তা সবসময় ঠিক নয়। বরং নিজেদের আত্মমগ্নতায় আমরা অন্যকে প্রকাশ করি। সক্রেটিস বলেছেন, নিজেকে জানুন। আমাদের শিক্ষাগুরুরাও বলেন, নিজের জন্য একটি লক্ষ্য স্থির করতে। আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনে চিকিৎসক বলেন, নিজের যত্ন নিন। আত্মমগ্নতাই সৃষ্টির রহস্য বের করে দেয়। আত্মমগ্নতা আমাদেরকে আত্মবিকাশ, আত্মমূল্যায়ন ও আত্মপ্রকাশে সাহায্য করে।
.
আত্মউন্নয়ের সকল প্রশিক্ষণে আমরা আত্মমগ্নতার নির্দেশনাই পাই। শিক্ষা, জ্ঞানার্জন, ধ্যান, যোগব্যায়াম সবকিছুতে পাই আত্মমগ্নতার প্রেরণা। অথচ পৃথিবীর প্রায় সবকিছু আমাদেরকে আত্মমগ্ন হতে বাধা দেয়। এসব থেকে নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে থেকে অথবা বিচ্ছিন্ন রেখে আত্মমগ্ন হওয়া একটি কঠিন কাজ। এটিই আমাদের জীবনে পূর্ণতা প্রাপ্তির উপায়।
.
.
.

[পাওলো কোয়েলো’র “দি আলকেমিস্ট”-এর একটি অংশ অবলম্বনে]

নেতা বনাম নিরাপত্তা ও এরকম ৭টি প্রলোভন


নিরাপত্তা, জনপ্রিয়তা এবং সহকর্মীদের আনুগত্য একজন নেতার জন্য খুবই দরকার। দীর্ঘদিনের নিবেদিতপ্রাণ নেতৃত্বের জন্য এগুলোকে নেতার অর্জন বলেই বিবেচনা করা উচিত। অথচ শুরুতে এগুলো প্রলোভন হয়েই আসে। প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের জন্য এগুলো ফাঁদ হিসেবে কাজ করে। নিরাপত্তাকর্মীই নিরাপত্তার জন্য একনম্বর হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। সবচেয়ে অনুগত কর্মীটি কর্তৃপক্ষের আস্থার সুযোগে হয়ে ওঠে সবচেয়ে দুর্নীতিবাজ। নিজের নিরাপত্তার জন্য নিযুক্ত ‘আত্মীয় সহকর্মীটি’ অন্যান্য পেশাদার কর্মীদের জন্য ফ্রাংকেনস্টাইন হয়ে পুরো প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের মুখে ফেলে। অতিরিক্ত নিরাপত্তাবোধ, তথা জনপ্রিয়তা লাভের আকাঙক্ষা, তথা নিজেকে সকলের মনযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার ইচ্ছা দায়িত্বশীল মানুষদেরকে নিষ্ক্রীয় করে তোলে। এগুলো দায়িত্ব পালন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ অথবা পক্ষপাতহীনভাবে কাজ করার প্রধান প্রতিবন্ধকতা। এসবই নেতার জন্য প্রলোভন। এরকম সাতটি প্রলোভন নিয়ে আজকের লেখাটি।
.
.
প্রলোভন ১/ নিজের নিরাপত্তা কমফোর্ট জোন
নিরাপত্তা একটি ফাঁদের নাম। আরাম একটি ভণ্ড প্রেমিকার (প্রেমিকের) নাম। নিরাপত্তাবোধ একটি কারপুরুষোচিত অনুভবের নাম। কথাগুলো গড়পরতা কোন মানুষের জন্য নয়। বলছি, নেতার কথা। নেতা যতক্ষণ নিজের নিরাপত্তা আর আরামের বিষয়ে ব্যস্ত থাকেন, ঠিক ততক্ষণ সময় তার দল বা প্রতিষ্ঠান থাকে অবহেলিত। কমফোর্ট জোন একটি দল বা প্রতিষ্ঠানের জন্য মঙ্গলজনক, কিন্তু নেতার জন্য বিপদজনক। নেতার জন্য প্রথম প্রলোভন হলো, নিজের নিরাপত্তায় মগ্ন থাকা। এই বাক্স থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত নেতা কোন ‘আউট-অভ-দ্য-বক্স’ চিন্তা করতে পারেন না, কিন্তু দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, কোন সাহসী গন্তব্যের দিকে দলকে পরিচালনা দিতে পারেন না। ম্যাকিয়াভেলি বলেছেন, বিপদের মুখোমুখি না হয়ে মহৎ কিছু অর্জিত হয় নি।
.
প্রলোভন ২/ প্রাপ্তির প্রয়োজনীয়তাসবকিছুতে বিশেষ হবার আকাঙ্ক্ষা
অতিরিক্ত প্রাপ্তির লোভ নেতাকে দিকভ্রষ্ট করে। অতিরিক্ত শ্রদ্ধাবোধ, দলের সদস্যদের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত মনযোগ, অতিরিক্ত সেবা ও অতিরিক্ত অর্থের আকাঙ্ক্ষা – এসবই নেতার জন্য প্রলোভন। অর্থ ও বস্তুগত প্রয়োজনীয়তার কোন অন্ত নেই। মাসলো’র চাহিদা বিধি অনুসারে, মানুষের প্রয়োজনীয়তা ক্রমবর্ধমান। একটি পাবার সাথে সাথে এরচেয়ে উচ্চতর আরেকটি পাবার ইচ্ছা হয়। মোটরবাইকের মালিক হবার পর, গাড়ির মালিক হবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। গাড়ির মালিক হবার পর দেখা যায়, সেটি অন্যান্য গাড়ির মতো আকর্ষণীয় নয়। তখন গাড়ির ব্রান্ড পরিবর্তন করার ইচ্ছে হয়। ইত্যাদি। এটি হতেই পারে। অভাব অনুভব করা, আর যেকোনভাবে সে অভাবকে পূরণ করার জন্য বেপরোয়া হলেই সেটি অপরাধের দিকে নিয়ে যায়।
.
প্রলোভন ৩/ সম্পর্কের সুবিধাএকই সাথে ফাঁদ এবং সুযোগ
অনৈতিক সুবিধা। পদ ও সুখ্যাতির কারণে অনেক লোভনীয় সম্পর্কের সুযোগ হয়। বিপরীত লিঙ্গের এমন কাওকে পেয়ে যাবেন, যাকে দেখেই মনে হবে তাকে কাছে টানি; তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ি। হয়তো চাইলেই পেয়ে যাবেন। নেতাকে মনে রাখতে হবে, এটি শুধু ক্ষমতার অপব্যবহার নয়, এটি শুধু অনৈতিকতা নয়, এটি শুধু আপনার জনপ্রিয়তাকে কমিয়েই ছাড়বে না – এটি আপনার অতীত ও বর্তমানকে ধূলিস্যাৎ করে ছাড়বে। তিলে তিলে গড়া ব্যক্তি ইমেজকে, আপনার প্রতিষ্ঠানকে, আপনার কর্মীদলকে পরিচালনা দেবার আত্মবিশ্বাসকে, আপনার হুকুম দেবার শক্তিকে নিমিষে শেষ করে দেবে। পরদিন সকালে আপনি বের হবার শক্তিটুকু পাবেন না। এটি নেতৃত্বের প্রধান এবং প্রাচীণতম প্রলোভন, ইতিহাসে এবিষয়ে দৃষ্টান্তের অভাব নেই। কিন্তু অতিক্রম করতে পারলে এখান থেকে অপরিমেয় সম্ভাবনার দরজা খুলে যায়।
.
প্রলোভন ৪/ জনপ্রিয়তা… এর মিষ্টতাকে উপেক্ষা করাটা একটু কঠিনই
জনপ্রিয়তার প্রয়োজন আছে। এটি সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ করে, যোগাযোগকে সহজ করে। প্রতিষ্ঠান ও বৃহৎ স্বার্থকে অক্ষুণ্ন রেখেও জনপ্রিয়তা পাওয়া গেলে, সেটি সোনায় সোহাগা। কিন্তু সেটি যদি না হয়, তবে জনপ্রিয়তা নেতার জন্য একটি বিষের পেয়ালা মাত্র। এতে আসক্ত হবার মানে হলো নেতার অপমৃত্যু। ভক্ত ও সাগরেদ প্রাপ্তির লোভ এবং তাদের প্রতি আপনার বাড়তি দায়বদ্ধতা আপনার অগ্রগতিকে আটকে দেয়। নেতার প্রধান কাজ হলো সংশ্লিষ্টদের আস্থা অর্জন, জনপ্রিয়তা এর স্বাভাবিক পরিণতি। জনপ্রিয়তাকে উপযুক্ত মাত্রায় প্রয়োগ এবং প্রয়োজনে জনপ্রিয়তাকে এড়িয়ে যাবার মধ্যেই নেতার সফলতা। জনপ্রিয়তা লাভের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া নেতার কাজ নয়। নীতিতে অটল থাকতে চাইলে জনপ্রিয়তাকে বিসর্জন দিয়েই নেতাকে এগুতে হয়। যারা ভবিষ্যতকে দেখতে পায় না, তাদের সাথে নেতার ঐক্যমত সম্ভব নয়
.
প্রলোভন ৫/ পরিবার ও আত্মীয়… নেতার প্রধান প্রতিপক্ষ তার নিজের লোক
নেতার নিরাপত্তার জন্য এমন সময় আসে, যখন নিজের লোককে পদ বা সুযোগ দেবার প্রয়োজন হয়। নিজের মানুষদের জন্য বা আত্মীয়ের জন্য তার একটি দায় থাকেই। কাছের মানুষকে সুবিধা দেবার দায় সবারই থাকে। এমন সময় আসে যে, নেতা ইচ্ছে করলেই সেটি পারেন। এটি তখনই প্রলোভন হয়ে যায়, যখন নিজের পদের ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করতে হয়। পরিবার, আত্মীয় বা বন্ধুবান্ধবকে নিয়মবহির্ভুত সুযোগ পাইয়ে দেবার আকাঙ্ক্ষা নেতার জন্য বড় একটি প্রলোভন। এই প্রলোভনে পড়ে অনেকেই আস্থা হারিয়েছে এবং পদচ্যুত হয়েছে। সিদ্ধান্তগ্রহণ থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত সকল পর্যায়ে প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি করবে আপনার নিকটজনেরা। তাদের উপস্থিতি অন্যান্য সহকর্মীদের মধ্যে আপনার পক্ষপাতহীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। আপনার নেতৃত্বকে করবে বিপদসংকুল।
.
প্রলোভন ৬/ অযাচিত আনুগত্য বস নাকি প্রতিষ্ঠান?
কর্মীর আচরণে অতিরিক্ত আনুগত্য দেখা গেলে প্রথমেই সন্দেহ করা উচিত – কোন অতিরিক্ত বা অনৈতিক প্রাপ্তির পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে সেটি করে থাকতে পারে। আদর্শ নেতা ব্যক্তিগত আনুগত্যের অপেক্ষায় থাকতে পারেন না, কারণ সেটি তার নিরপেক্ষতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তিনি হয়তো অতিরিক্ত অনুগতদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করে বসতে পারেন। আদর্শ নেতা চান কর্মী প্রথমত দল বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনুগত হোক। সেটিই নেতার প্রতি প্রকৃত আনুগত্য।
.
প্রলোভন ৭/ কথা বলার আকুলতা… কথা কাজের প্রতিবন্ধকতা
শ্রোতা পেলে কথা বলার আকুলতায় আসবেই। পদবির খাতিরে কিছু দর্শকশ্রোতা জুটবেই। তারা শুনতেই চাইবে আপনার কথা, কারণ এই কথা থেকে তারা কিছু সিদ্ধান্ত পাবে; দিকনির্দেশনা পাবে। ঠিক একারণেই কথায় নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত, যেন অতিরিক্ত কিছু না বলা হয়। সবাই আগ্রহভরে আপনার কথা শুনবে, অন্তত দেখতে সেরকম দেখাবে। দেখবেন, তারা শুনেই যাচ্ছে। তাতে আপনি হয়তো আরও আগ্রহ পাবেন কথা বলার। কথা থেকে কথার শাখা প্রশাখা বের হয়ে বাক্য থেকে অনুচ্ছেদ, অনুচ্ছেদ থেকে গল্পে পরিণত হবে। তাতে অনিচ্ছাকৃত কিছু ভুল, কিছু অসর্তক অসত্য, অসময়ের অযাচিত কথা, কিছু মানবিক দুর্বলতার বিষয় বের হয়ে আসবে। এটি আপনাকে সবার সামনে বিপদাপন্ন করবে। শুধু তা-ই নয়, ভবিষ্যৎ কর্মপ্রক্রিয়াকেও করে তুলবে বাধাগ্রস্ত। কাজ করতে চাইলে বক্তৃতা বন্ধ করতে হবে। বক্তৃতা করতে চাইলে কাজ বন্ধ করতে হবে।
.
.

এলোমেলো লেখাটি ছুটির দিনের অলস চিন্তার ফসল। ক্রমান্বয়ে পরিমার্জিত হতে থাকবে। পরবর্তি পর্ব: নেতার শক্তির উৎস।

বাংলা ব্লগ ব্লগার ব্লগসাইট এবং সঞ্চালনা

ব্লগিং নিয়ে আমার কিছু প্যাচাল

 

নানাবিধ কারণে ব্লগে নিয়মিত লেখা হচ্ছে না। কিন্তু সময় পেলেই ব্লগ পড়ি এবং পড়লে মন্তব্য দিই। এটি করতে এখনও ভালো লাগে। এদিকে অনেক নতুন ব্লগারের আগমন হয়েছে। তার চেয়েও বেশি সংখ্যক পুরাতন ব্লগার আজ এখানে নেই। তবে কেউ কেউ পাসওয়ার্ড সমস্যার কারণে নতুন আইডি নিয়ে নতুনভাবে ফিরে এসেছেন। কেউবা ইমেইলে যোগাযোগ করে পাসওয়ার্ড পুনরুদ্ধার করে আগের নামেই ফিরে এসেছেন। ফেবুতে নিজেদের ফিরে আসার সংবাদ জানাচ্ছেন, বেশ ঘটা করে। ব্লগে ফিরে আসার চলমান প্রবণতাটি বেশ ভালো লাগছে।

কিন্তু তাতে কি ব্লগের স্থায়ি কোন সমাধান হবে? একসময় অসংখ্য বাংলা ব্লগসাইট ছিল, এখন তো নেই! তবু কেন এখানে আগের মতো পাঠক/ব্লগার নেই? এভাবেই কি শেষ হবে বাংলা ব্লগের ইতিহাস?

সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বজ্ঞান এবং জবাবদিহিতা না থাকলে বাংলা ব্লগের গৌরব ও অহংকার একসময় ইতিহাস হয়ে যাবে।

ব্লগের লেখা প্রসঙ্গে:

আমার অনেক প্রতিভাবান বন্ধুবান্ধব আছেন যারা ভালো লেখেন, ভালো চিন্তা করেন এবং ভালো বিশ্লেষণ করতে পারেন। তাদের লেখা পড়ে এবং বুদ্ধিদীপ্ত পোস্টগুলো দেখে অনেক সময় মজা পাই, উচ্ছ্বসিত হই।

সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে তাদের চিন্তাচেতনার বিস্তৃতি দরকার। কিন্তু আমরা যখন ব্যক্তি বা দল বা একটি নির্দিষ্ট মতবাদকে কেন্দ্র করে কথা বলি, তখন ‘বিষয়’ গুরুত্ব পায় না – ব্যক্তি বা মতবাদই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তখন নির্দিষ্ট মতবাদে সংশ্লিষ্ট মানুষ ছাড়া অন্যরা তাতে মনোযোগ দেয় না। অতিমাত্রায় সাবজেক্টিভ না হয়ে তারা যদি আরেকটু অবজেক্টিভ হতেন, ব্যক্তি বা দলকেন্দ্রিক না হয়ে তারা যদি আরেকটু বিষয়কেন্দ্রিক হতেন, তবে আরও বেশি মানুষকে তারা নিজের কথা শুনাতে পারতেন।

আমাদের সমাজে এত বিচ্ছিন্নতা এত মেরুকরণ আগে কখনও দেখি নি। সবাই তাদের মতো করে ঘটনাকে ব্যাখ্যা করে। কেউ বক্তার অবস্থান থেকে বিষয়কে উপলব্ধি করতে চায় না। এমন মানুষ খুব কমই আছেন, যাদেরকে বিনাবাক্যে বিনাশর্তে সবাই সম্মান জানায়। অবিসংবাদিত কিংবদন্তির অস্তিত্ব এসমাজে বিরল হয়ে গেছে।

ব্লগের সঞ্চালনা প্রসঙ্গে

সরকার আজকাল সঞ্চয়কে চরমভাবে নিরুৎসাহিত করছে। সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক সেভিংস বা এফডিআর ইত্যাদিতে সুদ কমিয়ে দিচ্ছে। ফিক্সট ডিপোজিটে সুদের হার মাত্র ৩ শতাংশ – ভাবা যায়? সঞ্চয়কে নিয়ন্ত্রণ করার কারণটি খুব সহজে অনুমান করা যায়। সরকার অর্থের সঞ্চালন চায়। উন্নত অর্থনীতির ভিত্তি ‘অর্থের সঞ্চয়’ নয় – অর্থের সঞ্চালন। তরল অর্থের নিয়মিত চলাচল।

মানুষের স্বাভাবিক সুস্থতার রাসায়নিক পরিমাপক হলো, তার রক্ত সঞ্চালনা বা ব্লাড সার্কুলেশন। এটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেকোন কারণে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে ওঠে। নিস্তেজ হয়ে মৃত্যুর দিকে নুইয়ে পড়ে। রক্ত সঞ্চালনা স্বাভাবিক রাখার জন্য মানুষ কতকিছু করে, কতকিছুই খায়! একই স্থানে একই পোস্চারে বসে থাকলে শরীরের নির্দিষ্ট অংশটি অবশ হয়ে আসে। এর কারণ হলো, রক্ত সঞ্চালনা বন্ধ হয়ে আসা।

একই কথা বলা যায় ব্লগের সঞ্চালনা নিয়ে। নিয়মিত সঞ্চালনা না থাকলে, শুধু পোস্টদাতাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় এর পাঠক – যারা সবাই ব্লগার না। দৈনিক এবং মাসিক হিট কমে যাবার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্লগ। মানসম্মত লেখাকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে নিয়ে আসা এবং অনাকাঙিক্ষত ঘটনা থেকে ব্লগকে নিরাপদে রাখাই ব্লগের সঞ্চালকের প্রধান কাজ। ব্লগ কার সহায়তায় চলে, ব্লগাররা টাকা পায় কিনা – ওসব শর্তে বাংলা ব্লগ শুরু হয় নি। ব্লগাররা টাকা পাবে এআশায় কেউ এখানে আসে নি।

সঞ্চালনা সম্পর্কে কিছু প্রস্তাব

সঞ্চালক নামটির সাথেই ‘গতিশীলতার বিষয়টি’ জড়িয়ে আছে। একটি পাবলিক ব্লগসাইটের স্বাভাবিক তৎপরতা ধরে রাখে এর নিয়মিত পরিবর্তন অর্থাৎ নিয়মিত সঞ্চালনা।

•সঞ্চালনা হতে পারে যান্ত্রিক
•সঞ্চালনা হতে পারে মানুষ পরিচালিত

অটোমেটেড মডারেশন দ্বারা ব্লগারদের পোস্টগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে, অনেক সময় আপত্তিকর লেখা প্রকাশ হয়ে যেতে পারে। বেশি বিপদজনক কিছু হয়ে গেলে, দিনের/সপ্তাহের একটি সময় হিউম্যান মডারেটর এসে শুধু চেক করে যেতে পারেন। সাধারণত, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে আপত্তিকর পোস্ট বন্ধ রাখার জন্য কিছু ‘প্রতীকী শব্দ’ বা বাক্যাংশ তালিকাভুক্ত করে রাখা যায়। একইভাবে তালিকাভুক্ত করে রাখা যায় ইতিবাচক ও গ্রহণযোগ্য শব্দ বা বাক্যাংশকে। যেসব পোস্টে শব্দগুলো থাকবে, সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে আটকে থাকবে অথবা শর্তানুযায়ী নির্বাচিত কলামে যাবে। এক্ষেত্রেও যদি কোন ভালো পোস্ট আটকে থাকে অথবা খারাপ পোস্ট প্রকাশিত হয়ে যায়, নির্দিষ্ট সময়ের হিউম্যান মডারেটর এসে সেগুলোকে সুধরে দিতে পারেন। নিয়মিত আপগ্রেড করতে থাকলে সিস্টেম বুদ্ধিমান হয়ে ওঠে: ভুলগুলো এক সময় কমে আসে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে স্বয়ংক্রিয় সঞ্চালনাকে গ্রহণ করা যায়, যদিও এতে এককালীণ কিছু খরচ জড়িত আছে।

হিউম্যান মডারেশন কঠিন, অনিয়মিত, ধারাবাহিকতাহীন এবং ত্রুটিযুক্ত। মানুষ দ্বারা পরিচালিত কোন কিছুই ত্রুটিমুক্ত এবং নিয়মিত হতে পারে না। ‘মানুষ মাত্রই ভুল’ কথাটি দিয়েই বুঝা যায় মানুষের ক্ষমতা কত সীমিত। তার পক্ষে একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর পোস্ট প্রকাশ/নির্বাচন করা অসম্ভব না হলেও কঠিন (এখানে সঞ্চালক বেতনভুক্ত বা অবৈতনিক সেটি বিবেচ্য নয়)। লেখার মান অনুযায়ি নির্বাচিত কলামে দেওয়া অথবা স্টিকি করার কাজটি হিউম্যান মডারেটরের মাধ্যমে হতে পারে। শুধুমাত্র বিশেষ লেখাকে নির্বাচন/স্টিকি করার জন্য একজন মানুষ এসে সঞ্চালনার কাজটি করে যেতে পারেন। তবে একাজটিও অটোমেটেড মডারেশন দ্বারা করা যায় এবং করতে দেখা যায়।

তারপরও হিউম্যান মডারেটর দ্বারা নিয়মিত সঞ্চালনার কাজটি করতে হলে সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয় বিবেচনায় রাখতে হয়। আমার দৃষ্টিতে মাত্র ৪টি বিষয় নিয়মিত তদারকি করলে যে কোন পরিস্থিতিতে একটি ব্লগসাইট অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে। তা হলো…..

১. নিয়মিতভাবে ব্লগ পোস্টগুলো প্রকাশিত হবে
২. গুরুত্বপূর্ণ পোস্টগুলো নির্বাচিত কলামে যাবে
২. দিনের/সপ্তাহের বিশেষ কোন পোস্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষণে যাবে/স্টিকি হবে
৪. অবাঞ্চিত/ অনাকাঙ্ক্ষিত/ নিয়মবহির্ভূত পোস্ট বাতিল হবে

একাজগুলো নিয়মিত না হলেই ব্লগের গতি কমে আসে। ঝিমিয়ে পড়ে। গতিহীন হয়ে পড়ে। ব্লগার/প্রদায়করা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েন। অভিজ্ঞ ব্লগাররা লেখা অন্যত্র প্রকাশ করেন। নবীন লেখকরা প্রেষণা হারিয়ে ফেলেন: অন্য কিছুতে মনযোগ দেন। অথবা আর মন্তব্যও করতে চান না। ব্লগে সচল ব্লগারের সংখ্যা দিন দিন কমতে থাকে। ব্লগার দ্বারাই ব্লগ সাইটের উন্নয়ন। ব্লগারই পাঠক, ব্লগারই হিটদাতা। ব্লগারই ব্লগসাইটের অত্যাবশ্যক অংশ।

সঞ্চালনা নিয়মিত থাকলে ব্লগার বা প্রদায়করা স্বাভাবিক মাত্রায় লেখতে থাকেন এবং পোস্ট প্রকাশ করতে থাকেন। অন্যের লেখায় মন্তব্য দেবার বিষয়টিও এর ওপরেই নির্ভরশীল। সেরা মন্তব্যকারীকে স্বীকৃতি দেবারও প্রয়োজন নেই, অথবা সৃজনশীল লেখা প্রতিযোগিতারও প্রয়োজন নেই।

সঞ্চালক মাত্র চারটি দায়িত্ব নিয়মিতভাবে করে যেতে পারলে, ব্লগে তৎপরতা বাড়বে এবং ব্লগে হিট বাড়বে। এমন ব্লগসাইটকে বিজ্ঞাপনদাতার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয় না। সময় উপযোগী নেতৃত্ব এবং নিয়মিত সঞ্চালনা থাকলে ব্লগ কারও বোঝা হবার কথা নয়, ব্লগ নিজেই নিজের খরচ যোগাড় করতে পারার কথা।

শেষ কথা

ব্লগ শুরু হয়েছিল বাংলা ভাষায় বাধহীন আত্মপ্রকাশকে প্রমোট করার জন্য। নিঃস্বার্থে। ব্লগাররাও এসেছেন নিঃস্বার্থে। লেখেছেন হৃদয় উজাড় করে। ব্লগে একটি লেখা দেবার জন্য অনেকে বিদ্যাসাগর বনেছেন। ঘটিয়েছেন একটির পর একটি বিপ্লব। ব্লগের লেখাকে কপি করে প্রকাশ করছে বিখ্যাত প্রিন্টমিডিয়াগুলো। কারণ, সামু আজ বাংলা ভাষায় সবচেয়ে বড় তথ্যভাণ্ডার – এটি কোন উইকিপিডিয়ার কাজ নয়।

সামুর জন্য কেউ কীভাবে SEO করেছিল জানা নেই, কিন্তু পেইজ ভিউ বলুন, ওয়েভ ট্রাফিক বলুন, এক সময় বাংলাদেশে সামুকে প্রথম কয়েকটির মধ্যে দেখা যেতো। কিন্তু সামু কি পাঠক/ব্লগারদের পরিবর্তিত প্রয়োজন এবং চলমান ট্রেন্ডকে ধারণ করতে পেরেছে? ভোক্তার চলমান প্রয়োজনকে বুঝতে না পারার জন্য মোবাইল ফোন জায়ান্ট নোকিয়ার পতন হয়েছিল – এখন পুনর্জনম নিয়েও টিকতে পারছে না।

আজ সামু কোথায়? অথচ আজও বাংলায় কোন বিষয়ে ‘গুগল সার্চ’ দিলে সামহোয়্যারইন ভেসে ওঠে। প্রশ্ন হলো, এটি কি ‘অকাল কিংবদন্তী’ অর্জন করবে? নাকি সময়ের সাথে নিজেকে সুধরে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবে? প্রশ্ন থাকলো ব্লগারসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি।

পাবলিক ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া: ১৫ অগাস্ট ২০১৭

———————————————
*ব্লগে লেখা ও ব্লগের সঞ্চালনা সম্পর্কে নতুন/পুরাতন চিন্তার সমন্বয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে এই পোস্ট।

সামু’র প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে ‘আমার’ সাক্ষাৎকার

 

১। আমাকে আমার প্রশ্ন: কী খবর… ব্লগ নিয়ে এত গবেষণা করলেন, অথচ এখন ব্লগে দেখাই যাচ্ছে না কেন?
আমার উত্তর: গবেষণা করি নি – পড়াশোনা করেছিলাম। তারপর যা উপলব্ধি হয়েছে, তা-ই তাৎক্ষণিকভাবে লেখে দিয়েছি।

২। আআপ্র: তার মানে হলো, আপনি আজকাল আর পড়ছেন না! তাই লেখছেন না? কী লজ্জার বিষয়!
আউ: আংশিক সত্য। আজকাল কাজের পড়া ছাড়া ‘পড়ার জন্য পড়া’ তেমন হচ্ছে না। কাজের পড়ায় বেশি আনন্দ পাচ্ছি মনে হচ্ছে। কাজকর্ম বিষয়ক লেখাগুলো ব্যক্তিগত ব্লগে তুলে রাখছি।

৩। আআপ্র: এখানে নয় কেন? যা ব্যক্তিগত ব্লগে দিতে পারেন, সেটি তো এখানেও প্রকাশ করতে পারেন। ব্লগের মায়া কি কমে গেলো?
আউ: এখানে প্রকাশ না করার অনেক কারণের মধ্যে একটি হলো, পাঠকের মন্তব্যের উত্তর দিতে পারবো না বলে। ব্লগের জন্য আগের মতোই মায়া আছে এ কথা বললে মিথ্যা হবে। তবে ব্লগকে মন থেকে মুছে ফেলি নি। এটা অনেক ব্লগারের জন্য সহজ কাজ নয়। তবু মায়া একটু কমে গেছে। মায়া-মহব্বত-ভালোবাসা প্রেমিকার প্রতিও এক থাকে না সবসময়।

৪। আআপ্র: তো বলছেন, মায়া কিছু কমেছে। সবকিছুর পেছনে কারণ থাকে। ব্লগের প্রতি মায়া কমে যাওয়ার কারণটা কি সহব্লগারদের জন্য শেয়ার করা যায়?
আউ: কাজের ব্যস্ততা আছে, এটি আগেও ছিল। তবু একে বাতিল করা যায় না। এটি একটি কারণ। অন্যদিকে, নানাভাবে ব্লগও তার আকর্ষণ হারিয়েছে। কর্তৃপক্ষ বা প্রতিষ্ঠাতাদেরও ব্লগের প্রতি মায়া কমেছে। এটিও প্রকৃতির নিয়ম। অথবা বলা যায়, তাদের কর্মপন্থায় পরিবর্তন এসেছে।

৫। আআপ্র: এসব কারণ দেখিয়ে যদি ব্লগে না আসেন, তবে কি বিষয়টি একটু আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেলো না? ব্লগের প্রতি ব্লগারের দায় বলে তো একটা বিষয় আছে। সেটি কি আপনি করছেন?
আউ: অভিযোগ মেনে নিচ্ছি। আত্মকেন্দ্রিক সমাজের প্রভাব আমার ওপরও পড়েছে। কিন্তু আমার অধিকাংশ পোস্টই ব্লগ এবং ব্লগের উন্নয়ন বিষয়ক। ব্লগের প্রতি ব্যক্তিগত দায় থেকে ব্লগার এবং কর্তৃপক্ষ সবারই জন্য লেখেছি। এই ব্লগেই আছে। মুছে ফেলিনি। সময় বদলেছে, ব্লগারদেরও রকম বদলেছে। পড়ার অভ্যাস বদলেছে। মাঝেমাঝে মনে হয়, আমার লেখার প্রাসঙ্গিকতা এসময়ের ব্লগে নেই। এর দায়ও হয়তো আমারই।

৬। আআপ্র: এসব যুক্তি ব্লগে না আসার কারণ হিসেবে যথেষ্ট নয়। যা হোক, এবার একটি ‘সার্বজনীন প্রশ্ন’ করি – ব্লগারের সাক্ষাৎকার নিলে এটি জিজ্ঞেস করতে হয়। ‘ব্লগ আর আগের মতো নেই’ এবিষয়ে আপনার অভিমত কী? 
আউ: সহমত। ব্লগ আর আগের মতো নেই, এটি সার্বজনীন সত্য কথা। ব্লগ হলো সময়ের সাক্ষী। সময় ও নদী এক জায়গায় থাকে না। অতএব ব্লগও আর আগের মতো নেই। তবে আক্ষেপের বিষয় হলো, ব্লগ খারাপ আর শূন্যতার দিকে মোড় নিয়েছে। এটি হতে দেওয়া উচিত ছিল না। কিছু মানুষ বা প্রতিষ্ঠান থাকা উচিত, যারা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবে। তারা আজ তেমনভাবে নেই। মান্না দে’র কফিহাউস (কলকাতার কলেজ স্ট্রিট) যেমন স্নিগ্ধতা হারিয়ে শুধুই প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ব্লগের অবস্থা আজ ঠিক তেমন।

৭। আআপ্র: এর কারণ কী? কী উপায় আছে এ থেকে বের হবার? 
আউ: এ থেকে বের হবার কোন উপায় দেখছি না, কারণ এমন পরিস্থিতি একদিনে একজনের মাধ্যমে হয় নি। এটি অনিবার্য পরিণতির দিকে যাচ্ছে। ভেতরে হয়তো অনেক কারণই আছে, কিন্তু বাইরের (সামাজিক ও রাজনৈতিক) কারণগুলো বড়ই খতরনাক। এখানে প্রতিরোধ সৃষ্টি করা কঠিন। তবু সামু কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ যে, অন্যান্য ব্লগের মতো একে তারা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় নি। যেকোন ভাবে চালিয়ে রেখেছে। দু’একজন অন্তপ্রাণ ব্লগার আছেন, যারা এখনও আগের মতোই লেখে যাচ্ছেন, মন্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। দু’এক বছর যাবত লেখছেন, এমন কিছু দায়িত্বশীল ব্লগার আছেন। আর নতুনেরা তো বরাবরই সুপার একটিভ। হয়তো তাদের জন্যই ব্লগটি টিকে আছে।

৮। আআপ্র: ব্লগের অব্স্থা এর চেয়ে কি ভালো হতে পারতো না? অন্তত সামু তো সব থেকে আলাদা! 
আউ: হয়তো হতে পারতো, কারণ সব বাংলা ব্লগের অবস্থা ম্রিয়মান। বন্ধ অথবা সংকোচিত। এর কিছু সুবিধা এ ব্লগ পেতে পারতো। বাংলা ব্লগের পাইয়োনিয়ার হিসেবে এব্লগের অবস্থা আরও ভালো হতে পারতো। এবং আমি বলছি, ভালোই তো। অন্য যেকোন বাংলা ব্লগের চেয়ে সামু’র অবস্থা নিঃসন্দেহে ভালো। তবে এখানে যারা ৪/৫/৭ বছর আগে ব্লগিং করেছেন/করছেন তাদের স্বপ্ন আর আকাঙ্ক্ষা ছিল হয়তো আরও ওপরে। তারা হয়তো একটু বেশিই প্রত্যাশা করে ফেলেছিল!

৯। আআপ্র: সামু কি কালজয়ী প্লাটফর্ম হতে পারে না? ব্লগার সহযোগে সামু কি সময়ের প্রতিবন্ধকতাকে জয় করতে পারে না?
আউ: অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষকে এভাবে চাপ দেওয়া যায় না। অনেকে শুরু করতে পারে, চালিয়ে যেতে পারে না। শুরু করার জন্য যে ধরণের মেধা প্রতিভা প্রতিশ্রুতিশীলতা দরকার, চালিয়ে যাবার জন্য হয়তো একটু ভিন্ন ধরণের চালিকা শক্তি বা এড্যাপ্টাবিলিটি প্রয়োজন হয়। ব্লগাররা তো অধিকাংশই ঘরকুনো, তা না হলে তারা ব্লগ লেখবে কীভাবে। ব্লগ টিকিয়ে রাখতে মাঝেমাঝে বাইরের শক্তিরও দরকার হয়।

১০। আআপ্র: এত বড় উত্তর দিলে তো পাঠক পড়বে না। যাহোক, সংক্ষেপে সামু’র প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী মূলক একটি বক্তৃতা দিন! 
আউ: সামু আজও যেভাবে দাঁড়িয়ে আছে, সেটি বাংলা ভাষার জন্য এবং বাংলাভাষী লেখক-পাঠকের জন্য সৌভাগ্য ও গৌরবের বিষয়। একাদশ প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে সামহোয়্যারইন ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা, কর্মী এবং ব্লগার-পাঠককে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা! সে সাথে মহান বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা!!

*পাবলিক ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৬

কাব্যকণা/ চিন্তাকণা

ছবি আঁকার ক্যানভাসটি হাঁটুজলে তিনপায়া স্ট্যান্ডের ওপর আটকে আছে। আর আমি আটকে আছি তোমাতে…! অথচ কী দুর্ভাগ্য তুমি কিনা আটকে আছো আকাশের তারা গণনায়। তুমি কি আজও বিশ্বাস করো না যে, বিশ্বের সবগুলো সৌরজগতের গ্রহ-নক্ষত্রের কক্ষপথ আটকে আছে শুধু একটি জায়গায়!

.

২)
একদিন প্রজাপতি হবো…
ভুলে যাবো এপর্বের সব বেদনা
সৃষ্ট হবে নূতন আমি’র;
তোমাকে নিয়ে হবে নূতন সূচনা।

.

৩)
তোমাকে ভালোবাসা বদঅভ্যাসে রূপ নিয়েছে…
ছেড়ে দিতে চাই তবু কেন যে পারি না!

.

৪)
বেড-ল্যাম্পের ঢাকনার মতো মস্ত আকারের উজিরটুপি পড়ে একদল মধ্যযুগী এসে আমাকে বললো, “জাহাপনা! আপনার বয়স বাইরা যাইতেছে … কথাবার্তা খিয়াল কইরা কইবাইন। কইবাইন অনেক কম। লেখবাইন আরও কম। শোনা তো একদমই নিষেধ! …একদম খাইয়ালবাম!” ঘুম ভেঙ্গে দেখি বেড-ল্যাম্পটি নেভানো হয় নি! [মার্চ ২০১৭]

.
৫)
প্রতিটি ফাগুন যেন জীবনের বার্ষিক নবায়ন… একবছর বেঁচে থাকার পুরস্কার। ফুল ফল প্রাণী আর মানুষকে একযোগে আন্দোলিত করে এই ফাগুন, যার বর্ধিত রূপ হলো চৈত্র আর বৈশাখ। অতএব ফাল্গুনকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে ঘোষণা দেবার দাবিতে যেকোন মুহূর্তে আন্দোলনের ডাক দিয়ে বসতে পারি!
(ফেইসবুক স্ট্যাটাস ২০/২/২০১৭))

.

৬)
বহুরূপী মানুষের ভিড়ে মুখোশ একটি চিরস্থায়ী অবয়ব। মনের বা মানের পরিবর্তনে এর কোন পরিবর্তন হয় না। মুখোশের নির্মোহ সৌন্দর্য্যে আমি মুগ্ধ হচ্ছি দিনকে দিন। এরচেয়ে স্বচ্ছ বা নির্দোষ আর কী হতে পারে! এমন একটি রূপ ধারণ করতে খুবই ইচ্ছে হয়, যা পরিবর্তন বিবর্তন বা রূপান্তরের ঝুঁকি থেকে মুক্ত। এমন কিছু হতে ইচ্ছে হয়, যার পর আর কিছু হবার প্রয়োজন থাকবে না।
(ফেইসবুক স্ট্যাটাস ১৫/২/২০১৭)

.

৭)
Keep silent and never try to promote others… be selfish and never try to work for the bigger majority… never try to improve quality in works… never try to talk in favor of morality, honesty, transparency etc… never try to promote high standards… but accept whatever is available and say ‘yes yes’ to seniors in all situations. My friend…your life will be a lot easier and full of friends. However, only one thing you’ll have to sacrifice… that is ‘a clean soul’ within you.
Already following those rules? Excellent! You are the smartest guy in the present day world! Cheers!!!
(Remember “Dr Faustus” of Marlowe?)
৩১/১/২০১৭

.

৮)
অন্তত আর একদিন আমরা সবাই একসাথে মিলিত হবো। একই বন্ধুদের একই সেই ব্যাচ। ঠিক আগের জায়গায়, আগের বিষয়গুলো নিয়ে আমরা আলোচনায় মেতে ওঠবো। হাসাহাসি হইহুল্লা করবো। আশেপাশে অথবা টেবিলের সামনে সেই আগের খাদ্যদ্রব্যগুলো থাকবে। আগের মতোই ঘড়ির কাটাকে স্বাধীনতা দিয়ে আড্ডায় হারিয়ে যাবো। আগের সেই গানগুলো ক্যাসেটপ্লেয়ারে বাজতে থাকবে। ঠিক আগের মতোই বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতায় সবকিছু অন্ধকার হয়ে যাবে, বন্ধ হয়ে যাবে গান। আর চাঁদের আলোয় সিলিং ফ্যানটি তখনও ঘুরতে দেখা যাবে। ঠিক তখনই জাগতিকতায় ফিরে আসবো। তখন আগের মতোই বলবো, বিদ্যুৎ চলে গেছে ভালোই হলো, এবার চলো ঘুমাতে যাই।
(ফেইসবুক স্ট্যাটাস ২২/১/২০১৭)

.

৯)
শিকাগোতে প্রেজিডেন্ট হিসেবে ওবামার শেষ বক্তব্যের শুরুতে দর্শক যেভাবে তাকে ১০মিনিট পর্যন্ত অভ্যর্থনা দিলো, তাতে আমি কেবল হাহাকার শুনতে পেলাম। এই হাহাকার আসন্ন ট্রাম্প প্রশাসনের আশঙ্কাকে মূর্ত করে দিয়েছে। ইসরায়েলি বসতির পক্ষে ভোট না দিয়ে ওবামা তার শান্তি পুরস্কারের জন্য একটু সুবিচার করে গেলেন শেষবেলায়। বিদায়… আমেরিকার সর্বশেষ প্রগতিশীল শাসক! আর কোন কালো মানুষকে কি মার্কিন শাসক হিসেবে দেখা যাবে?
(১১/১/২০১৭)

.

১০)
ফেইসবুক কবিদেরকে চেনার উপায় কী? (কয়েকটি ধারণা)
.
বিড়িমুখে মহাসুখে
উড়াই ধূম্রবৃত্ত [প্রোফাইল ফটো]
বিশ্বাস ধর্ম রাষ্ট্রের কথায় 
টলে না মোর চিত্ত। [সারবস্তুহীন আবেগী স্ট্যাটাস]
.
এদেশ এসমাজ, বলে রাখছি এই
আমার ছিল না, আমার নেই [এই মর্মে স্বদেশত্যাগী কাব্য]
.
দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা
দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু
ডিএসএলআর-নিসৃত
ফটোকাব্যে রেখে দিলাম বিন্দু। [ডিএসএলআর কবি]
.
[ঢাকা সংস্করণ: ২৮১২১৬]
[সমালোচনা নয়, একটি পর্যবেক্ষণ মাত্র]

.

১১)
পানসুপারিতে রঙিন করিয়া মুখ, গাড়োয়ান কহিলো, হুজুর ঘুমাইবার খায়েস থাকিলে আমার নিকটে বসা যাইবে না। আমিও ছাড়িবার পাত্তর নই, আসন ধরিয়া রাখিলাম। রাত্তির দ্বিপ্রহরে পহুচিলাম এমন এক গন্তব্যে, যেখানে রাত্তিরের ঘুম নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু প্রভাত হইতেই দেখি সবকিছু ছিল স্বপ্নমাত্র! আবারও রাত্তিরের প্রতীক্ষায় শুরু হইল দিবস। (ঘাটাইল ভ্রমণ/ ১৯ ডিসেম্বর ২০১৬)

.

১২)
বিনোদন মানুষের সহজাত চাহিদা, কিন্তু বাঙালির বিনোদনের বড়ই অভাব। কিছু মানুষের প্রিয় বিনোদন হলো অন্যের দোষত্রুটি নিয়ে দুর্বার অনুসন্ধানে ব্যস্ত থাকা। পরস্পরের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে সেখানে নিজেকে শান্তি-প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে তারা প্রাকৃতিকভাবেই সুদক্ষ। তাদের চোখে-মুখে-অন্তরে কেবলই সমস্যা আর দলাদলির কথা। আপনি তাদের কাছে অতি দ্রুত আপন হয়ে যাবেন, যদি আপনার সংগ্রহে থাকে অন্যের দুর্বলতার কিছু নমুনা। সত্য হোক মিথ্যা হোক, স্মিতহাস্যে তারা আপনাকে সুযোগ করে দেবে আরও কিছু বলার জন্য। তারা সমস্যাবিলাসী, বিবাদপ্রত্যাশী। অগ্রগতিতে নয়, দুর্গতিতে তাদেরকে মনে হয় অধিক মেধাবী। সম্পর্ক সৃষ্টি নয়, সম্পর্ক ভাঙনে তারা কৃতীত্ব নেয়। এদেরকে চেনা যায় না, হয়তো প্রমাণও করা যায় না, কেবল বুঝা যায়। এরা সমাজ ও সংগঠনের নিরব ঘাতক।
(ফেইসবুক স্ট্যাটাস ২৩/১১/২০১৬)

আমার প্রিয় রসাত্মক ধনাত্মক উক্তিগুলো। পর্ব ৪।

প্রতিষ্ঠানকে আপনার শিক্ষার ওপর হস্তক্ষেপ করতে দেবেন না।  (মার্ক টোয়েইন)

কিছু মানুষ পঁচিশেই মারা যায় এবং দাফন করতে পঁচাত্তর বছর লেগে যায়।  (বেন্জামিন ফ্রাঙ্কলিন)

তাড়াতাড়ি আমাকে কিছু মদ ঢেলে দাও, যেন মনকে সিক্ত করে মহৎ কিছু বলতে পারি। (এরিস্টোফিনিস)

বিজয়ীরা মদ যোগ্যতায় লাভ করলেও, ব্যর্থদের জন্য সেটি অত্যাবশ্যক! (নেপোলিয়ান)

হয় আরেকটু মদ ঢালো, নয়তো সামনে থেকে সরো! (রুমি)

ডায়েটের প্রথম দিন:  সব চর্বিযুক্ত খাবার বাসা থেকে খালি করে দিলাম। অনেক মজা লেগেছিল! (বেনামী)

ছুটির দিনগুলোতে আমার একটাই লক্ষ্য থাকে। তা হলো, মাঝে মাঝে নড়াচড়া করা, যেন কেউ মনে না করে যে আমি মারা গেছি। (বেনামী)

জীবনে সবসময় দ্বিতীয় একটি সুযোগ থাকে, যার নাম হলো, আগামিকাল। (নিকোলাস স্পার্কস)

আমার মানিব্যাগটি পেঁয়াজের মতো – খুলতে খুলতে চোখে পানি চলে আসে। (বেনামি)

মনে রাখবেন ‘আজই’ হলো সেই ‘আগামিকাল’, যাকে নিয়ে ‘গতকাল’ আপনি চিন্তিত ছিলেন। (ডেল কার্নেগি)

এবারের পর্বটির অধিকাংশ ‍উদ্ধৃতির জন্য রিডার্স ডাইজেস্ট-এর কাছে ঋণী। অনুবাদ লেখকের।


রসাত্মক ধনাত্মক উক্তির তৃতীয় পর্ব।